ডাকপ্রিয়র_চিঠি
লেখিকাঃ_রিক্তা ইসলাম মায়া
০৪
প্রিয় পুরুষ,
আপনার প্রতি অসম্ভব ভালো লাগা থেকে আজ আমি চিঠি লিখতে বসেছি। আমার প্রথম চিঠিটা আপনার হাতে আছে, আর সেটা আপনি পড়ছেন, এই ভেবে অদ্ভুত অনুভূতি হচ্ছে। আপনি জানেন? আপনি আমার জীবনে হুট করেই চলে এসেছেন। আর সেজন্য আমিও চাই আপনার জীবনে হুট করে জড়িয়ে যেতে। আমার এই চিঠিটা পেয়ে আপনি হয়তো ভাবছেন, কে আমি? কেনই বা আপনাকে এমন চিঠি লিখছি? আসলে আমি কে, সেটা আপনি সময়সাপেক্ষে জানতে পারবেন। তবে আমি কিন্তু আমার পড়াশোনার মতোই আপনার প্রতি ভীষণ মনোযোগী। আপনি কি হবেন আমার গল্পের উপন্যাস? যার প্রতিটি পৃষ্ঠা আমি বারবার পড়েও কখনো বিরক্ত হব না? আর না আগ্রহ কমবে, বরং পরের পৃষ্ঠায় কী আছে সেটা জানার আগ্রহে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আপনাকে পড়তে মন চাইবে। আমি জানি আপনি খুব ভালো ছাত্র, তাই উপন্যাসের চেয়ে ভালো কোনো উপমা দিতে পারলাম না। আমার জানা নেই এর চেয়ে ভালো কী উদাহরণ দেব আপনাকে নিয়ে। তবে আপনার কাছে যদি আরও উত্তম কোনো উদাহরণ জানা থাকে, তাহলে চট করে একটা চিঠি লিখে পাঠিয়ে দিন আমায়। তবে খবরদার, চিঠি পাঠাতে গিয়ে কিন্তু আমাকে খুঁজতে আসবেন না। আমি আগেই বলে রাখছি, সময় হলে আমি নিজেই আপনার সামনে দাঁড়াব। ততদিন না-হয় আমার বেনামি চিঠিগুলো গ্রহণ করুন।
ইতি
পত্রকন্যা
মারিদ হাতে চিঠিটা এই নিয়ে তৃতীয়বার পড়েছে। প্রত্যেকবার একই অনুভূতি তাঁর। অপরিচিতার থেকে পাওয়া প্রথম চিঠির উত্তরে মারিদও জীবনে প্রথমবারের মতোন কাউকে নিয়ে চিঠি লিখতে বসেছে। মারিদের মতো একজন ব্যক্তিত্বের মানুষ কাউকে চিঠি লিখবে এটা অসম্ভব কিছু ছিল। অথচ মারিদ নিজের সকল ধরা-ছোঁয়ার নিয়ম ভেঙে আজ চিঠি লিখতে বসেছে অপরিচিতার নামে। মারিদের ধারণা, মানুষটি যদি অপরিচিতা হয়, তাহলে মারিদ সবকিছু করতে প্রস্তুত। তাছাড়া এই কাজগুলো মারিদ জোরপূর্বক করছে এমন নয়। মারিদের অদ্ভুত একটা ভালো লাগা কাজ করছে এসবকে ঘিরে। এই যে, ঘণ্টার পর ঘণ্টা ফোনে কথা বলা, অপরিচিতার অনুপস্থিতিতে তাঁকে মিস করা, এখন আবার তার নামে বেনামি চিঠি লেখা—এই সবগুলো মারিদের কাছে ইন্টারেস্টিং বিষয়। আর যেটাতে মারিদ আলতাফ ইন্টারেস্ট ফিল করে, সেটা মারিদ আলতাফ ডেফিনিটলি করবেই। মারিদ দক্ষ হাতে কলম চালিয়ে সাদা কাগজে লিখল…
মিস পত্রকন্যা,
আমার মতো একজন মানুষ কখনো কাউকে নিয়ে এইভাবে বসে চিঠি লিখবে, এটা অসম্ভব কিছু ছিল। অথচ আজ আপনাকে নিয়ে চিঠি লিখে আমার অসম্ভব ব্যাপারটাও সম্ভব করে ফেললাম। বাকি রইল আপনার গল্পের উপন্যাস হওয়া নিয়ে। তাহলে বলব, আপনি খুব আবেগি মানুষ পত্রকন্যা। আর জীবন আবেগ দিয়ে চলে না। চিঠি লেখা, উপন্যাস হওয়া—এইগুলো সব কাল্পনিক চিত্র দিয়ে গড়া। আর আমি কারও জীবনে কাল্পনিক অস্তিত্ব হতে চাই না। বাস্তব হতে চাই। যে বাস্তবতা চাইলে কেউ মিথ্যা বানাতে পারবে না, কাল্পনিক বলে অস্বীকার করতে পারবে না। শুধু সত্য বলে একসেপ্ট করতে হবে। আমি হলে কারও বাস্তব হতে চাইব, উপন্যাস নয়। বাকি রইল আপনি কে? তাহলে বলব, আপনাকে জানার আগ্রহ আমার আকাশসমান হলেও আপাতত আপনাকে দেখতে চাইব না। সময় যখন চেয়েছেন তখন দিলাম। তবে আমি অধৈর্য হওয়ার আগে সামনে হাজির হবেন।
ইতি
আমার পরিচয়টা আপনার জানা। তাই নাম উল্লেখ করলাম না। আপনার বেনামি চিঠির, বেনামি সে।
চিঠিটা লিখে মারিদ কলম রাখল। ভাঁজ করা কাগজটি চিঠির খামে রাখল। তনিমার দেওয়া চিঠির অপর পৃষ্ঠায় একটা ঠিকানা রয়েছে। মারিদ সেই ঠিকানায় চোখ বোলাল। মারিদের লেখা চিঠিটা যে এই ঠিকানায় দিতে হবে সেটা বুঝতে পেরে মারিদ ভাবল, সে কাল অফিসে যাওয়ার পথে এই ঠিকানায় তার লেখা চিঠিটা রেখে যাবে। চিঠি লেখা শেষে মারিদ তনিমার দেওয়া চিঠিটা যত্ন করে তুলে রাখল তাঁর লকারে। এখন রাত বারোটা। দুপুরে সে রিফাতের সঙ্গে লাঞ্চ করে অফিসে চলে গিয়েছিল। কাল রাতের অনিদ্রা থাকায় মারিদ অফিসের রেস্টরুমে ঘণ্টা দুয়েক ঘুমিয়েও নিয়েছিল। তবে এর মধ্যে অপরিচিতার চিঠিটা সে অফিসে পৌঁছে একবার পড়েছিল। আর এখন বাসায় এসে দুবার পড়েছে। কিন্তু এত সময়ের মাঝে অপরিচিতার কোনো খবর নেই। বলতে গেলে মেয়েটি গায়েব হয়ে আছে। আজ সারাদিন তাদের কথা হয়নি আর না অপরিচিতার ফোন এসেছে। যদিও দুপুরে মেয়েটি তাকে ফোন করেছিল, তবে দুজনের কথা হয়নি তখন। এখন রাত বারোটার বেশি, অথচ এখনো খবর নেই। আচ্ছা মেয়েটার কি কোনো সমস্যা হয়েছে? চিন্তিত মারিদ কপাল কুঁচকে হাতে ফোনটাই ‘বসন্তের পাখি’ নামক সেইভ নাম্বারে ডায়াল করতে করতে সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। এতক্ষণ সে সোফায় বসে অপরিচিতার নামে বেনামি চিঠি লিখছিল। আজ ছাদে যেতে মন চাইছে না বলে সে বিছানায় আধশোয়া হয়ে বসল। বিছানার পাশের সুইচবোর্ডের বাটন চেপে রুমের আলো নিভল। অল্প আলোর ডিমলাইট জ্বালিয়ে কর্নার টেবিল হতে রিমোট নিয়ে এসির পাওয়ার বাড়িয়ে রিমোটটি যথাস্থানে রাখল। ততক্ষণে মারিদের ফোনে অপরিচিতার কলটিও কেটে গেল। সংযোগ বিচ্ছিন্ন হতেই মারিদের কুঁচকে যাওয়া কপাল আরও কুঁচকে গেল। মেয়েটি হঠাৎ কোথায় হারিয়ে গেল সেই ভেবে মারিদ আবারও কল মেলাল। দুঃখজনকভাবে এইবারও মারিদের ফোনটি রিসিভ হলো না।
পরপর দু’বার মারিদের কল রিসিভ না হওয়াতে, মারিদের চিন্তার রেশ আরও খানিকটা বেড়ে যাওয়ায় কয়েক সেকেন্ড সময় নিয়ে ভাবল, হয়তো অপরিচিতা আজ ঘুমিয়ে পড়েছে। কাল রাতের অনিদ্রা থেকে আজ হয়তো সকাল সকাল ঘুমিয়ে পড়েছে—বিষয়টি ভেবে খানিকটা স্বাভাবিক হলো মারিদ। তবে অপরিচিতা ঘুমানোর আগে মারিদকে একবার বলে গেলে হয়তো এই মুহূর্তে মারিদের টেনশন হতো না। মারিদ খানিকটা ভেবে হাতে ফোন বিছানার উপর রেখে সে পুনরায় সোফায় গিয়ে বসল। টেবিলের উপর থাকা ল্যাপটপটি অন করে তাদের ওয়েবসাইট ভিজিট করতে লাগল মনোযোগ সহকারে। এই সপ্তাহে তাদের ব্র্যান্ডের বেশ কিছু প্রোডাক্ট মার্কেটে লঞ্চ হবে। সেগুলোর প্রসেসিং কাজ চলছে। ম্যানেজার থেকে শুরু করে মারিদের পার্সোনাল অ্যাসিস্ট্যান্টেরও ইমেইল এসেছে। মারিদ জরুরি ভিত্তিতে সেই ইমেইলগুলো চেক করতে গিয়ে ফোনের কথা ভুলে গেল। মারিদের অবহেলায় ফেলে রাখা ফোনটি বিছানার উপর নিঃশব্দে ভাইব্রেশন হতে লাগল বারবার। অথচ কাজে ডুবে থাকা মারিদের সেদিকে লক্ষ্য হলো আরও ঘণ্টাখানেক পর। হঠাৎ বেখেয়ালে বিছানায় চোখ পড়তেই দেখতে পেল ফোনের আলো। বাম হাতে ল্যাপটপের শাট ডাউন টেনে বন্ধ করে উঠে গেল বিছানার দিকে। কোমর ঝুঁকে বিছানা থেকে ফোন নিতে নিতে স্ক্রিনে ভাসল ‘বসন্তের পাখি’ নামটি। ঠোঁটের কোণে স্মিত হাসির রেখা টেনে ফোন রিসিভ করল। মারিদ ‘হ্যালো’ বলার আগেই ফোনের ওপাশ থেকে মেয়েলি কন্ঠে অভিযোগ তুলে বলল…
‘আপনি আর কখনো আমার সামনে অন্য কাউকে বিয়ের কথা বলবেন না।’
প্রতিবারই অপরিচিতা তাঁকে ফোন দিয়ে সালাম দেয়। অথচ আজ সালামের বদলে অভিযোগ করল। মারিদ বেশ বুঝতে পারছে অপরিচিতা দুপুরে রিফাতের বলা ‘মারিদের বিয়ের’ ব্যাপারটা নিয়ে অভিমান করে ছিল এতক্ষণ। আর এজন্য এতটা সময় নিয়ে মারিদের সাথে কথা বলেনি। মূলত অপরিচিতার রিয়াকশন দেখার জন্যই তো তখন মারিদ অপরিচিতার ফোনটা রিসিভ করেছিল রিফাতের কথাগুলো শোনাতে। এবার অপরিচিতা মারিদকে নিয়ে কতটুকু সিরিয়াস সেটা তো বাজিয়ে দেখা দরকার। মারিদ এক হাতে ফোন কানে চেপে অপর হাতে তার সুন্দর চুলে হাত বুলাতে বুলাতে মৃদু গলায় বলল…
‘কেন?’
‘আমার শুনতে ভালো লাগে না।’
‘কেন?’
‘অসহ্য লাগে।’
‘কেন?’
‘আমি চাই না আপনার বিয়ে হোক।’
‘কেন?’
‘আপনাকে অন্য মেয়ের জামাই সাজলে সুন্দর দেখাবে না।’
‘কেন?’
‘অন্য মেয়ের সাথে আপনাকে মানাবে না তাই।’
‘তাহলে কার সাথে মানাবে?’
‘আমি জানি না।’
‘তাহলে কে জানে?’
‘আমি কিভাবে বলব?’
‘ আপনি বলতে না পারলে কে বলতে পারবে সেটার সন্ধান করুন মিস। আমার বউ লাগবে। বিয়ে করব না?’
‘না।’
‘কেন?’
‘আমি বলেছি তাই।’
‘আপনি বললেই শুনতে হবে?’
‘হ্যাঁ।’
‘কেন?’
‘জানি না।’
‘কারণটা জানুন মিস। জেনে আমাকেও জানান। অপেক্ষায় আছি। বউ লাগবে শীঘ্রই।’
তীব্র অধিকারবোধ নিয়ে পরপর কথাগুলো বলল ফোনের ওপাশের মেয়েটি। মারিদ কানে ফোন চেপে বিছানায় আধশোয়া হয়ে বসল। নতুন নতুন প্রেমে পড়ার অনুভূতিগুলো অদ্ভুত হয়। অদ্ভুত ভালো লাগা কাজ করে মনে। ফোনের এপাশের ওপাশের দুই পাশের মানুষ দুটোই জানে তারা দুজন দুজনকে অলরেডি পছন্দ করে ফেলেছে। পছন্দ না করলে কেউ এত সময় নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কথা বলে না। মারিদের কথায় ফোনের ওপাশের মেয়েটি চুপ। মারিদের বউ লাগবে বিষয়টা যে অপরিচিতাকে ইঙ্গিত করে বলেছে মারিদ, সেটা বুঝে অবুঝের মতো রইল মেয়েটি। মারিদের কথার প্রসঙ্গ পাল্টে ফোনের ওপাশের মেয়েটি হঠাৎ অদ্ভুত প্রশ্ন করে বলল…
‘আচ্ছা আপনি কালো ফুল পছন্দ করেন?’
অপরিচিতার হঠাৎ প্রশ্নে মারিদ তীক্ষ্ণ গলায় বলল…
‘কালো ফুল?’
মারিদের পাল্টা প্রশ্নে মেয়েটি একইভাবে আবারও বলল…
‘হ্যাঁ কালো অভিশপ্ত ফুল। পছন্দ করেন?’
‘ফুল আবার অভিশপ্ত হয় নাকি?’
মারিদকে পাল্টা প্রশ্ন করতে দেখে মেয়েটি অদ্ভুত ভঙ্গিতে রহস্যময় গলায় বলল..
‘হ্যাঁ হয়। কালো টকটকে অভিশপ্ত ফুল আমার ভীষণ পছন্দের। কালো রঙের উপর আপনি আর কোনো রঙ ছড়াতে পারবেন না। এজন্য মূলত আমার কালো রঙের ফুল পছন্দ। তাছাড়া কালো ফুলের একটা চমৎকার বৈশিষ্ট্য আছে কি জানেন? কালো ফুল দিয়ে আপনি কাউকে ব্ল্যাক ম্যাজিক করে সহজে মেরেও ফেলতে পারবেন। আর সেটা কেউ টেরও পাবে না। চমৎকার না ব্যাপারটা?
ফোনের ওপাশের মেয়েটিকে হঠাৎ মারিদের কাছে অদ্ভুত লাগল। তারপরও মারিদ অপরিচিতার কথায় বিশেষ পাত্তা দিল না। মারিদ এসব অভিশপ্ত ফুল, কিংবা ব্ল্যাক ম্যাজিকে বিশ্বাসী নয়। তাই মারিদ অপরিচিতার কথাগুলো মজা ছলে নিতে ফোনের ওপাশ থেকে অপরিচিতা ফের মারিদকে অদ্ভুত প্রশ্ন করে বলল…
‘আচ্ছা আপনার মানুষের মাংস পছন্দ?’
‘না!’
‘আমার পছন্দ।’
‘ওকে।’
‘আচ্ছা আপনি মানুষের রক্ত পান করেছেন কখনো?’
‘না! তবে আপনারটা পেলে অবশ্যই পান করব।’
মারিদের কথায় মেয়েটিও তাল মিলিয়ে বলল…
‘ তাহলে একদিন অবশ্যই পান করাব আপনাকে।’
‘অপেক্ষায় রইলাম।’
ফোনের ওপাশের মেয়েটির অদ্ভুত আর রহস্যময় প্রশ্নে মারিদও নির্লিপ্তভাবে তাল মেলাল। যেন মেয়েটির এসব কথাগুলো বেশ স্বাভাবিক মারিদের নিকট। মারিদ মেয়েটিকে সন্দেহ না করে বরং স্বাভাবিকভাবে কথা চালিয়ে বলল…
‘রাতে খেয়েছেন?’
‘হ্যাঁ! আপনি?’
‘হুম।’
তারপর আবারও দুজনে চুপ। কয়েক সেকেন্ডের নীরবতা ভেঙে ফোনের ওপাশে মেয়েটি হঠাৎ মারিদকে বলল…
‘আচ্ছা আপনার সমুদ্র ভালো লাগে?’
‘না।’
‘কেন?’
‘জানি না। তবে পছন্দ না।’
মারিদ প্রকৃতি প্রেমি মানুষ নয়। আর না সে বেশি আবেগ দেখাতে পারে। মারিদের যখন যা ভালো লাগে সে সেটাই করে। আবেগ দেখিয়ে সাগর, পাহাড় কিংবা সমুদ্র পছন্দ না। মারিদের কথায় ফোনের ওপাশের মানুষটি উচ্ছ্বাস কন্ঠে জানিয়ে বলে…
‘ আমার সমুদ্র পছন্দ। খোলা আকাশ পছন্দ। খোলা আকাশের নিচে সমুদ্রের জলে পা ডুবিয়ে একাকী হাঁটতে পছন্দ। কিন্তু কখনো এসব দেখা বা করা হয়নি। জীবনে কখনো দেখা হবে কিনা তাও জানি না।
ফোনের ওপাশের মেয়েটি উচ্ছ্বসিত কন্ঠে কথা গুলো বলতে বলতে শেষে কেমন নরম হয়ে গেল। মারিদ বলল..
‘ সমুদ্র দেখা কঠিন কিছু নয় মিস। চাইলেই একবার নয় শতবার দেখা যায়।
‘সবার জীবন কি আর আপনার মতো এতো স্বাধীন? কিছু মানুষের জীবন পরাধীনও হয়।’
‘আপনি পরাধীন?’
মারিদ তৎক্ষনাৎ পাল্টা প্রশ্ন করতে ফোনের ওপাশের মেয়েটি উত্তর করল না। বরং মারিদের কথার প্রসঙ্গ পাল্টাতে চেয়ে বলল….
‘ আচ্ছা বাকি কথা ছাড়ুন। আজকে সারাদিন কী করেছেন তা বলুন।’
মেয়েটিকে প্রসঙ্গ পাল্টাতে দেখে মারিদ সন্দেহে কপাল কুঁচকাল। অপরিচিতার সম্পর্কে মারিদ কিছু না জানলেও এতটা বুঝতে পারছে মারিদের অপরিচিতা হয়তো কোনো ঝামেলায় আছে, হয়তো পারিবারিক কোনো কিছু হবে বলে সে মারিদকে বলতে চাইছে না এজন্য প্রসঙ্গ পাল্টাচ্ছে বারবার । কিন্তু মারিদও বেশ দৃঢ়তার সঙ্গে অপরিচিতাকে প্রসঙ্গ পাল্টাতে না দিয়ে বলল…
‘আমি আপনাকে স্বাধীনতা দিলে আপনি হবেন আমার?’
মারিদ সরাসরি অপরিচিতাকে তার হওয়ার প্রস্তাবটা করল। অপরিচিতা মারিদের কথায় বেশ কিছুক্ষণ চুপ রইল। তারপর খুবই নরম সুরে ভাঙা গলায় মারিদকে বলল…
‘সবার জীবন সুখময় নয় ব্যবসায়িক সাহেব। কেউ কেউ আমার মতন অভিশপ্ত কালো ফুলও হয়। আমার জন্য কেউ শান্তিতে থাকতে পারে না। তাই আমি আপনার জীবনটাও অশান্তিময় করতে চাই না। আপনার সাথে কথা বলার এই সময়টুকু আমার জীবনে বেস্ট সময়। ভবিষ্যতে কী হবে জানি না। তবে আপনাকে খুব মিস করব।’
কথা গুলো বলার সময় ফোনের ওপাশের মেয়েটি বোধহয় কাঁদছিল। মারিদ ঠিকঠাক ঠাহর করতে পারছিল না। কারণ অপরিচিতা মেয়েটি যথাসম্ভব নিজেকে মারিদের থেকে লুকানোর চেষ্টা করছে। মারিদ কপাল কুঁচকে সন্দেহ পোষণ করে বলল…
‘মিস করবেন মানে? ছেড়ে যাবেন নাকি?’
‘আপনাকে ছেড়ে দেওয়ার সাধ্য আমার নেই। খুব ভাগ্য করে আপনাকে পেয়েছি।’ আপনাকে হারালে আমি হতভাগী।
আজ বেশ ইমোশনাল আর ঘোলাটে লাগল অপরিচিতার কথাগুলো মারিদের কাছে। মারিদ সোজাসাপটা প্রশ্ন করে ফোনের ওপাশের মেয়েটিকে বলল…
‘কিছু হয়েছে মিস অপরিচিতা? কোনো সমস্যা? আমাকে বলুন আমি সবকিছু ঠিক করে দিব। বিশ্বাস রাখুন।
‘ কিছু হয়নি।
‘আমাকে নির্ভয়ে বলুন মিস। আমি শুনতে চাই। ওয়াদা করছি, আপনার সকল সমস্যার সমাধান হবো আমি।’
মারিদের কথায় ফোনের ওপাশের মেয়েটি নরম হতে গিয়েও হলো না। বরং স্বাভাবিক কণ্ঠে হেসে উঠল বলল….
‘ ব্যবসায়িক সাহেব চাপ নিয়েন না। নো সমস্যা ডু ফুর্তি। সিরিয়াস হওয়ার কিছুই নেই, আমি মজা করছিলাম এতক্ষণ। আপনি আমাকে নিয়ে এতো সিরিয়াস হলে তো আমি সত্যি সত্যি আপনার প্রেমে পড়ে যাব। তখন হবে আরেক সমস্যা। আচ্ছা যায় হোক! আপনি কি সত্যি বিয়ে করবেন?’
মারিদ মারিদ বালিশে মাথা রাখতে রাখতে বলল…
‘আপনি চাইলে অবশ্যই।’
‘আর আমি না চাইলে?’
‘জল ঘোলা করবেন না। বিপদে কিন্তু আপনিই পরবেন। আমি কিন্তু ছেড়ে দেওয়ার মানুষ নই।’
‘যদি পরিচয় না দিই তখন?’
‘আপনাকে খুঁজে বের করা কঠিন কিছু নয়। চাইলে বাজিয়ে দেখতে পারেন। দুই ঘন্টার মধ্যে আপনিসহ আপনার সকল তথ্য আমার সামনে হাজির হয়ে যাবে। দেখবেন?’
মারিদের কথায় ফোনের ওপাশের মেয়েটির মাঝে ভয় দেখা গেল। মেয়েটি তাড়াহুড়োয় বলল….
‘প্লিজ না। এমনটা করবেন না। আমাকে একটু সময় দিন, আমি নিজে এসে আপনার সামনে দাঁড়াব। ততদিন প্লিজ আমাকে খুঁজবেন না। অনুরোধ রইল।
অপরিচিতা বারবার একই কথা বলায় মারিদ ভারি শ্বাস ফেলল। তারপর রাত জেগে দুজন কথা বলল আরও ঘণ্টাখানেক সময়। তারপর ডায়াল কলে থেকেই একটা সময় দুজন ঘুমিয়ে পড়ল। ফোনের ওপাশের মেয়েটিই আগে ঘুমিয়ে ছিল কথা বলতে বলতে। সেজন্য মারিদও আর কল কাটল না। বরং মারিদের কেন যেন অপরিচিতার ভারি নিশ্বাসের শব্দটা ভালো লাগল। মনে হচ্ছে অপরিচিতা তার পাশেই ঘুমাচ্ছে। মারিদ বিছানায় উপুড় হয়ে শুতে শুতে ফোনের স্পিকার বাড়াল। তীব্র ঘুমে সেও ঘুমিয়ে যেতে যেতে শুনল ফোনের ওপাশের অপরিচিতার ঘন শ্বাস। তারপর? তারপর এইভাবেই দিন যাচ্ছে রাত পোহাচ্ছে। প্রেম করবে না, করবে না করেও অপরিচিতা মেয়েটি দিন দিন মারিদের প্রতি পজেসিভ হয়ে উঠল। মুখে ‘ভালোবাসি’ না বললেও দুজনের মধ্যে অদৃশ্য সম্পর্ক গড়ে উঠল ততদিনে। খাওয়া-দাওয়া, ঘুম—সকল খবরই রাখা হয় একে অপরের, অথচ অপরিচিতা মারিদকে নিজের পরিচয় তখনো জানায়নি। এর মাঝে মারিদ সেদিন সকালে অফিসে যাওয়ার পথে তনিমার চিঠির উত্তর পাঠাল। তারপর থেকে মারিদের সঙ্গে তনিমার বেনামি চিঠি আদান-প্রদান হতে লাগল। রাতে ফোনালাপ আর দিনে সাপ্তাহিক চিঠি মাধ্যম হয়ে উঠল মারিদের জীবনে ধারাবাহিক নিয়ম। এই ধারাবাহিকতা মারিদের জীবনে চলল আরও তিন মাস। কেউ কারও খবর জানে না। তনিমা জানে না ওর চিঠি সোহাগের জায়গায় কার কাছে যাচ্ছে। আর মারিদ জানে না অপরিচিতা নামক মানুষটি কে? কার সাথে সে কথা বলছে। কেমন একটা ঘোলাটে গোলকধাঁধায় ফেঁসে গেল তিনটি জীবন। আর এই শুরুটা হয়েছিল অপরিচিতার ফোন থেকে আর শেষটা হলো অপরিচিতার ফোনেই। এই সেদিন বিকালে মারিদ ওর অফিসের মিটিংয়ে বসেছিল। সঙ্গে তার বাবা-চাচারা ছিল। যেহেতু বোর্ড মিটিং ছিল তাই মারিদের ফোনটি সাইলেন্ট ছিল। বিকাল তখন চারটে নাগাদ। হঠাৎ অপরিচিতার কল তার ফোনে অনবরত আসতে লাগল। ভো ভো কম্পনে মারিদ টেবিলের উপর ফোনটি দেখেও বারবার সাইড বাটন চেপে সাইলেন্ট করে দিচ্ছিল। যেহেতু মিটিংয়ে ছিল, সে কলটা রিসিভ করতে পারছে না। মারিদ খুব স্বাভাবিকভাবে কলটা সাইলেন্ট করে দিলেও খুব অস্বাভাবিকভাবে অপরিচিতার কল আসতে লাগল। মারিদ ফোনটি উল্টে দেওয়ায় সেটা দেখল না। মারিদের মিটিং আরও চল্লিশ মিনিট পর শেষ হতেই সে ফোনটি হাতে নিল। ফোনের লাইট অন করে দেখল বিগত চল্লিশ মিনিটে অপরিচিতার কল এসেছে ১০৬টি। এতো ফোন কল দেখে মারিদের ভিতরটা যে হঠাৎ মুচড়ে উঠল। দ্রুততার সঙ্গে কল করতে গিয়ে তৎক্ষণাৎ ফোন আসল অপরিচিতার নাম্বার থেকে। মারিদ ফোন রিসিভ করে কানে তুলতেই ফোনের ওপাশ থেকে একটা অস্থির, উত্তেজিত, ভয়ার্ত গলা শোনাল। অপরিচিতা হাঁফানো গলায় ঝরঝর করে কাঁদতে কাঁদতে বলল….
‘আমাকে বাঁচান ব্যবসায়িক সাহেব। প্লিজ আমাকে বাঁচান। ওরা আমাকে মেরে ফেলবে। আমি মরতে চাই না। প্লিজ আমাকে বাঁচান। আমি অনেক বড়…’
‘ ঐ মাইয়াডা ধর। হারামজাদি বাচ্চা যেন পালাইতে না পারে। ধর! ধর!’
অপরিচিতা কান্না আর ফোনের ওপাশের পুরুষালি কণ্ঠে মারিদের মস্তিষ্ক তড়াক করে উঠল। তার অপরিচিতা বিপদে আছে বুঝতে পেরে মারিদ দিশেহারা ভঙ্গিতে উত্তেজিত গলায় বলল…
‘অপরিচিতা, কী হয়েছে আপনার? কোথায় আছেন আপনি? আমাকে লোকেশন বলুন। আমি এক্ষুনি আসছি। হ্যালো? হ্যালো?’
মানুষের হইচই আর অপরিচিতার দৌড়ানোর শব্দ ছাড়া মারিদের কানে তেমন কিছুই এলো না। দিশেহারা মারিদ অস্থির উত্তেজিত ভঙ্গিতে জেদি গলায় ‘আহহহ’ বলে চিৎকার করতেই পাশের কেবিন থেকে মারিদের বাবা-চাচা, রিফাত, মারিদের অ্যাসিস্ট্যান্টসহ সবাই দৌড়ে এলো। মারিদ তখনও কানে ফোন নিয়ে ‘অপরিচিতা, অপরিচিতা’ বলে চিৎকার করে ডাকছে। মারিদের বাবা নিজের ছেলেকে পাগলের মতো আচরণ করতে দেখে তিনিও দৌড়ে এলেন, মারিদকে শান্ত করতে বারবার তিনিও অস্থির হচ্ছিলেন। এর মাঝে হঠাৎ অপরিচিতার গলা শোনা গেল। ঝরঝর করে কাঁদতে কাঁদতে মারিদকে আকুতি স্বরে বলল…
‘আমি আর কতক্ষণ বাঁচব জানি না। অলরেডি একটা গুলি খেয়ে দৌড়াচ্ছিলাম এতক্ষণ আর আপনাকে ফোন দিচ্ছিলাম। আপনি আমার ফোন তুলছিলেন না বলে বারবার আল্লাহকে ডাকছিলাম। মরে যাওয়ার আগে অন্তত শেষবার আপনার সাথে একটু কথা বলতে চাই। ভীষণ ভালোবাসি আপনাকে। এতটা ভালোবাসি যতটা ভালোবাসলে আপনার জন্য আবার বাঁচতে চাইব। আমাকে ক্ষমা করবেন। আমি কথা রাখতে পারলাম না।’
অপরিচিতা কথায় মারিদের গলা চেপে আসল তীব্র বুকফাটা আর্তনাদে। হাহাকার বুকে জল জমলো চোখে কোণে। একটু করে বলল…
‘জান, প্লিজ!
মারিদের অসহায়ত্বের আর্তনাদ চোখে পড়ার মতো ছিল। উপস্থিত সকলে মারিদের দিকে তাকিয়ে। এর মাঝে শোনা গেল ফোনের ওপাশের কতগুলো পুরুষের হইচই। কেউ একজন চিৎকার করে বলছে….
‘এই শালিকে সবাই মিলে গুলি কর। গুলি কর। মাইরা দে। মাইর দে।
লোকগুলোর চিৎকারের সঙ্গে সঙ্গে পরপর গুলির শব্দ শোনা গেল সেই সাথে অপরিচিতার গগন কাঁপানো চিৎকার… তারপর? তারপর সঙ্গে সঙ্গে টুটু করে অপরিচিতা কলটি বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল। হয়তো ফোনটি হাত থেকে পড়ে ভেঙে গেছে তাই…
চলিত…
Share On:
TAGS: ডাকপ্রিয়র চিঠি, রিক্তা ইসলাম মায়া
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ১৮(প্রথমাংশ+শেষাংশ)
-
ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ১০
-
ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ১৫
-
ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ১
-
ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ২২
-
ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ৬
-
ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ১৪
-
ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ৮
-
ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ১২
-
ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ৭