Golpo কষ্টের গল্প ডাকপ্রিয়র চিঠি

ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ২৮ প্রথমাংশ


ডাকপ্রিয়র_চিঠি

লেখিকা:রিক্তাইসলাম মায়া

২৮_প্রথমাংশ
থানচি জেলা পর্বতময় এলাকা। থানচি গ্রামে ছোট-বড় বেশ অনেক পাহাড় দেখা যায়। দূর থেকে পাহাড়গুলো দেখলে মনে হবে এক পাহাড় অন্য পাহাড়ের বুক ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে। পাহাড়ে চাকমা, মারমা, সাঁওতাল, আদিবাসী বসবাস আছে। বলা যায় থানচি গ্রামের পূর্বাঞ্চলে আদিবাসী গোষ্ঠীর বসবাস রয়েছে। কালিঘাটি স্থানটির নামকরণ হয়েছে থানচির সবচেয়ে উঁচু কালি পাহাড়ের নাম ধরে। কালি পাহাড়ের মাটি অনেকটা কয়লার মতো কালো, শক্ত লোহার দণ্ডায়মান। শক্ত মাটিতে চাষবাস হয় না। বড় বড় বন্য গাছ আর লতাপাতায় কালি পাহাড় সবসময় অন্ধকারে তলিয়ে থাকে। এখানে আদিবাসীর সঙ্গে জঙ্গি, সন্ত্রাসী, ডাকাত দলের উৎপাতও দেখা যায় বেশ। কিছুদিন পরপর কালি পাহাড়ের আশেপাশে মানুষের মরদেহ পাওয়া যায়। পুলিশ এই নিয়ে বেশ কয়েকবার তদন্ত করে কোনো রিপোর্ট পায়নি সাধারণ মানুষ। সাধারণ মানুষ আজও জানে না কালি পাহাড়ে মূলত কী হয়? কারা থাকে? কেন মৃত মানুষের লাশ পাওয়া যায়।

কালি পাহাড়ের সবচেয়ে উঁচু অংশটাকে কালিঘাটি বলে। সেখানে বিদ্যুৎ নেই। দিনের বেলায় এখানে সাধারণ মানুষ আসতে ভয় পায়, রাতের বেলা মরণঘাটি বলে কালিঘাটিকে। অন্ধকার ঘাঁটিতে তাবু গেঁথেছে দুটো। মাঝ উঠুনে গাছের ডালপালায় বড় আগুন জ্বালিয়ে। দাউদাউ করা আগুনে চারপাশটা উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। গাছে গাছে বাঁধা আছে আগুনে বেশ কিছু মসাল। উঠুনের একপাশে দুটো কাঁচাপাকা বাঁশের মাচা বাঁধা। বাঁশের সেই একটা চকির ওপর রক্তাক্ত নূরজাহানকে শুয়াল মানিক। নূরজাহানকে বিয়ে করবে বলে আজ মানিক নিজের পছন্দের একটা সাদা শার্ট পরেছে তাঁর কালো শরীরে। পছন্দের শার্টটা আজ তার গায়ের রক্তে লাল হয়ে গেছে। শরীরে জায়গায় জায়গায় তাজা ক্ষত। গরগর করে রক্ত পড়ছে ধারালো ছুরির আঘাতে ক্ষতবিক্ষত হওয়া কালো বলিষ্ঠ শরীর থেকে।

মানিক যবে থেকে নূরজাহানের প্রেমে পড়েছে তবে থেকে মানিক নিজেকে নূরজাহানের চোখে সুদর্শন দেখানোর জন্য রোজ জিম করত। মানিক নূরজাহানকে চিনে বছর চারেক সময় হবে। তখন একজন সাধারণ বখাটে ছেলেদের মতো উগ্র চলাফেরা আর মোটাতাজা শরীর বহন করত মানিক সওদাগর। শুধুমাত্র নূরজাহানের চোখে সুন্দর লাগার জন্য নিজের বিপুল পরিবর্তন ঘটিয়ে একজন সুদর্শন যুবকের ন্যায় হয়েছে। আজ মানিকের সেই সুদর্শন শরীর অসংখ্য জখম তার নূরজাহানের সম্মানে বাঁচাতে। পেটের বাম পাশে ডাকাত দলের একজনের ছুরি মানিকের পেটে ঢুকেছে। সেখান হতে এখনো গলগল করে রক্ত ঝরছে আর কিছুক্ষণ এভাবে চললে মানিক রক্তাল্পতায় মারা যাবে। আশেপাশে ডাকাত দলের দশ-বারোজন লোক অজ্ঞান কিংবা জখম অবস্থায় পড়ে। কিশোর, মন্টু, আশিক সকলেই আহত অবস্থায় বসে। জ্ঞান হারায়নি কিন্তু বেশ দূর্বল সবাই। কিছুক্ষণ আগে এখানে যে মরণ যুদ্ধ হয়েছিল এই মুহূর্তে সেটা শ্মশানঘাটে পরিণত হয়েছে। মানিক আজ আর একটু দেরি করে পৌঁছালে হয়তো প্রথমে নূরজাহান ডাকাত দলের হাতে নির্যাতিত হতো তারপর ইজ্জত খোয়ে মরত। মানিক ডাকাত দলের পিছন পিছন ছুটে আসে নূরজাহানকে বাঁচাতে কালিঘাটে। দুটো গাছের মাঝে নূরজাহানকে শিকলে বেঁধে ডাকাত দলের একজন চাবুক মারছিল, আর অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করে নূরজাহানের কাছে কিছু একটা চাইছিল তাদের দিতে। নূরজাহানের কাছে ডাকাত দলের কী এমন আছে মানিক জানে না। তবে যাই থাকুক তার জন্য পুরো ডাকাত দল মরিয়া হয়ে উঠেছে নূরজাহানকে মারতে। ডাকাত দলের বাকিরা নেশা করে নিজেদের প্রস্তুত করছিল নূরজাহানকে ভোগের জন্য। ডাকাতদের অতিরিক্ত নেশা করার জন্য এই যাত্রায় মানিক নূরজাহানকে বাঁচাতে সক্ষম হয়েছে।

মানিক নূরজাহানকে বিয়ে করার প্রস্তুতি নিয়ে এসেছিল বলে সে সঙ্গে করে তেমন হাতিয়ার নিয়ে আসেনি। সঙ্গে দুই-একটা লাঠি নিয়ে এসেছিল, প্রথমে সেসব দিয়ে মানিক ডাকাত দলের ওপর হামলা করে তারপর ডাকাত দলের দা-ছুরি দিয়েই দুইপক্ষের বিশাল যুদ্ধ হয়। এই যুদ্ধে কেউ বাদ পড়েনি ক্ষতবিক্ষত হতে। কেউ মরেছে কেউ বা অজ্ঞান হয়েছে। বেলাল ঝন্টু একটু সুস্থ থাকায় মানিক ওদের নিজের বাড়িতে পাঠিয়েছিল নিজের বাপ-চাচাকে বলতে গ্রামবাসীকে নিয়ে কালিঘাটিতে আসতে। এখান থেকেই মানিক ক্ষতবিক্ষত শরীর নিয়ে নূরজাহানকে বিয়ে করবে। তারপর চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে যাবে নয়তো মানিক এখন হাসপাতালে চলে গেলে সে আর সুযোগ পাবে না নূরজাহানকে বিয়ে করার। মানিক দাঁতে দাঁত পিষে নূরজাহানকে বাঁশের চকির ওপর শুইয়ে নূরজাহানের মাথার পাশে বসল। নূরজাহানকে কোলে নিতে গলা দিয়ে রক্ত বের হচ্ছে কাশি সঙ্গে। কাশতে কাশতে মানিক হাতের উল্টো পিঠে ঠোঁটের কোণায় রক্তটুকু মুছে দুর্বল গলায় ডাকল নূরজাহানকে….

‘ নূরজাহান? এই নূরজাহান? কথা কও, চাইয়া দেখো তোমার কিচ্ছু হয় নাই। আমি তোমারে বাঁচাইয়া আনছি। এই নূরজাহান উঠো। এই চাঁদ। চাঁদ।

দুগালে থাপ্পড়ের দাগ, দুহাতে গলা চেপে ধরলে যেমন আঙুলের দাগে কালো হয়ে যায় তেমন হয়ে আছে নূরজাহানের গলা। শরীরে অসংখ্য চাবুকের আঘাতের কালশিটে পড়ে গেছে। নূরজাহান জ্ঞান হারিয়েছিল মানিকের আসার পূর্বেই। কপালে রক্তে নূরজাহানের গালের দুপাশটা ভিজে গলা গড়িয়ে নিচে নেমে গেছে। অথচ এই রক্তাক্ত নূরজাহান সৌন্দর্যের শুদ্ধতা ছড়িয়ে চারপাশটা যেন উজ্জ্বল করছে। নূরজাহানকে দেখার এই প্রথম মানিক নূরজাহানকে ছুঁয়েছে, এত কাছ থেকে মুগ্ধ নয়নে দেখছে। কতদিন? কত মাস পর মানিক নূরজাহানের সৌন্দর্য মুগ্ধ চোখে দেখছে। আজকের পর আর কোনো বাধা থাকবে না নূরজাহানকে দেখার। মানিক নিজের রক্তাক্ত কম্পিত হাতটা নূরজাহানের গালের দিকে বাড়িয়েও হাতটা তৎক্ষণাৎ নিজের রক্তভেজা শার্টে মুছে নিল। মানিকের রক্তমাখা ময়লা হাতে নূরজাহানের সৌন্দর্য যদি নোংরা হয়ে যায়? মানিক একবার দুবার নিজের রক্তমাখা শার্টে নিজের হাতটা পরিষ্কার করেও বারবার হাতে রক্ত লাগছে। মানিক তৃষ্ণার্ত চোখে নূরজাহানের দিকে তাকিয়ে ক্ষীণ স্বরে আওড়াল….

~ আমার তৃষ্ণার্ত চোখ শুকিয়ে যাবে তারপরও তোমাকে দেখার আকাঙ্ক্ষা কখনো ফুরাবে না নূরজাহান।

শুদ্ধ এবং স্পষ্ট ভাষায় মানিক কথাটা আওড়াল। এই শুদ্ধ ভাষা সে নূরজাহানের জন্য শিখেছিল, নিজেকে পরিবর্তন করতে। নূরজাহান হচ্ছে সুন্দর চাঁদ। যাকে পাওয়ার স্বপ্ন সবাই দেখে। আর মানিক হচ্ছে সুন্দর চাঁদের গায়ে লেগে থাকা কলঙ্কিত দাগ। যা চাঁদ চাইলেও ধুয়েমুছে ফেলতে পারবে না। তাই মানিক আর নূরজাহান পাশাপাশিই মানায়। মানিক তৃষ্ণার্ত চোখে নূরজাহানের দিকে তাকিয়ে আলতো করে নূরজাহানের গাল ছুঁয়ে দিল। নূরজাহানের গাল ছোঁয়া আঙুলের মাথাগুলো প্রথমে নিজের কপালে তারপর ঠোঁটে ছুঁয়ে মানিক গভীর চুমু খেল। নূরজাহানের গায়ে ওড়না নেই, জামা ছেঁড়া বিষয়টি মানিকের নজরে আসতে মানিক তৎক্ষণাৎ আশেপাশে তাকিয়ে নূরজাহানের ওড়না খোঁজ করল। ডাকাত দল নূরজাহানকে নিয়ে আসার সময় নূরজাহানের ওড়না কোথায় পড়েছে কে জানে? মানিক আশেপাশে তাকিয়ে নূরজাহানের ওড়না না পেয়ে সে নিজের রক্তাক্ত শার্ট খুলে নূরজাহানের গায়ে জড়াল। মানিকের চোখ ধীরে ধীরে অন্ধকার হয়ে যাচ্ছে। শরীরের তাজা ক্ষতে তখনো গলগল করে রক্ত ঝরছে, মরণ যন্ত্রণায় কাতর হয়ে মানিকের মনে হচ্ছে সে এই মুহূর্তে মারা যাবে। মানিক মারা গেলে তার নূরজাহানকে কে দেখবে? ওরা এখনো ডাকাতের আস্তানায় আছে। এসব জায়গায় ডাকাত দল দশ-বারোজন হয় না। হয় একশ-দুইশও বেশি। যদি বেলাল, ঝন্টু ঠিক সময় গ্রামবাসীদের নিয়ে এখানে পৌঁছাতে না পারে তাহলে আবারও ডাকাত দলের কবলে পড়বে ওরা। মানিকের শরীরে এতটুকু ক্ষমতা নেই যে নূরজাহানের জীবন বাঁচাতে আবার লড়বে। মানিকের জীবন মনে হচ্ছে আজ এখানেই শেষ। নূরজাহানকে দেখেও মনে হচ্ছে আধমরা হয়ে পড়ে। নিঃশ্বাস খুব ধীরে ধীরে পড়ছে নূরজাহানের। মানিক নূরজাহানের কাছে মুখটা বাড়িয়ে ক্ষীণ স্বরে অদ্ভুত আবদার করে বলল….

~ তুমি স্বর্গে থাইকো নূরজাহান আমি নরকে থাকমু নে তারপরও আমার লগে চলো নূরজাহান। তোমারে দুনিয়াতে রাইখা মইরা যাওনের মতোন বিচ্ছেদ আমি সইতে পারুম না নূরজাহান। তোমারে লইয়া বাঁচতে না পারলাম লও এক লগে মইরা যাই। পরপারে আমাগোর মিলন না হোক তোমারে দূর থেইকা দেখবার তো পারমু? আমার এইতেই হইব নূরজাহান। কও সঙ্গে যাইবা আমার?

কিশোর আশিক মন্টু রক্তাক্ত শরীর নিয়ে উঠে বসেছে। সবার মাথা ঝিমঝিম করে চক্কর দিচ্ছে। সবার থেকে আশিককে একটু সুস্থ দেখা যাচ্ছে। মানিক নূরজাহানের পেট বরাবর মাটিতে বসে। নূরজাহান বাঁশের চকির ওপর অজ্ঞান অবস্থায় শুয়ে। মানিক নূরজাহানকে কথা শেষে গলগল করে রক্ত বমি করতে দুচোখ ঝাপসা হয়ে এল। ঝাপসা চোখের পাতা খুলে মানিক শুধু নূরজাহানকে দেখতে চাইল, নূরজাহানকে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষায় মানিক মৃত্যুকে বাজিমাত দিতে চাচ্ছে। মৃত্যুকে বাজিমাত করে হলেও সে এই মূহুর্তে নূরজাহানকে বিয়ে করতে চায়, ভাগ্যে লিখতে চায় নূরজাহান নামক পবিত্র চাঁদ। কিন্তু ভাগ্য আজ মানিকের বেলায় বড়ই নিষ্ঠুর। পাওয়া চাঁদটাকে রেখে মানিক ক্রমশই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছে। মানিক বেহুঁশ হওয়ার আগে দুহাতের মুঠোয় শক্ত করে নূরজাহানের একটা হাত জড়িয়ে ধরল। নূরজাহানের হাতের শিরায় মানিকের তাজা রক্ত লেপটে। মানিক নূরজাহানের হাতে কপাল ঠেকিয়ে বেহুঁশ হওয়ার আগে কিছু পরিচিত মানুষের হৈচৈ কানে গেল। কোনো মেয়ে নূরজাহানের নাম নিয়ে চিৎকার করছে, আশিক কিশোর মন্টুর গলাও শোনা গেল মানিক ভাই, মানিক ভাই বলে চিল্লাতে। সকলেই মানিক আর নূরজাহানের দিকে দৌড়ে আসছে। মানিক শেষবার ঝাপসা চোখে নূরজাহানের দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করল…

‘ তোমার বিচ্ছেদে নয় ভালোবাসায় আমার মৃত্যু হোক নূরজাহান।

আশনূর, মারিদ, হাসিব, রাদিল, মারিদের ড্রাইভার জসিম সকলেই নূরজাহান ও মানিককে ঘিরে ধরল। আশনূর হাউমাউ চিৎকার করে নূরজাহানকে জড়িয়ে ধরল। আশিক কিশোর মন্টু বেহুঁশ মানিককে টেনে ধরল। মানিক বেহুঁশ অবস্থায়ও নূরজাহানের হাত শক্ত করে চেপে যেন অচেতন অবস্থায় নূরজাহানকে নিজের কাছে রাখার অদম্য চেষ্টা। অচেতন মস্তিষ্কে ধীরে ধীরে মানিকের হাত ঢিলে হয়ে যায়। মারিদ একটানে মানিকের হাত নূরজাহান থেকে ছাড়িয়ে নেয়। আশিক কিশোর মন্টুর দুর্বল শরীরে রক্তাক্ত মানিককে উঠাতে কষ্ট হচ্ছে। জখম ওরাও পেয়েছে। আশনূর নূরজাহানের শরীরের আঘাত দেখে ভেবেছে নূরজাহানের সঙ্গে খারাপ কিছু হয়েছে। আশনূর চিৎকার করে বলল…

‘ কে আমার নূরজাহানের গায়ে হাত দিয়েছে? আমি সব কয়টাকে জবাই করে তারপর এখান থেকে আমার বোনকে নিয়ে যাব। বল কোন জানোয়ারের দল?

কিশোর আশিক মন্টু তিনজন মানিককে নিয়ে যাচ্ছে হসপিটালের জন্য। দ্রুত চিকিৎসা না দিলে মানিক অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে মারা যাবে। আশনূরের চিৎকারে মোটাতাজা মন্টু হইহই করে বলল…

‘ আশনূর বুবু আমাগো নূরজাহান ভাবির গায়ে কেউ হাত দেয় নাই। মানিক ভাই নূরজাহান ভাবির কোনো ক্ষতি হইতে দেয় নাই। আমরা এইখানে আওনের আগে ডাকাত দল নূরজাহান ভারিরে গাছের লগে বাইধা চাবুক মারছিল হের লাইগা নূরজাহান ভাবির শরলে চাবুকের মাইরের দাগ পড়ছে। নূরজাহান ভাবি নিষ্পাপ। হের কিচ্ছু হই নাই।

মন্টুর কথার মাঝে মারিদ আশনূরকে ঠেলে নূরজাহানকে চট করে কোলে তুলে নিল। আশনূর এই এই করতে করতে উঠে দাঁড়াল সঙ্গে সঙ্গে। মানিক নূরজাহানকে বাঁচিয়েছে সেজন্য মারিদও মানিকের সাহায্য করে হাসিবকে বলল…

‘ হাসিব মানিক ও তাদের লোকদের দ্রুত হাসপাতালে নিতে সাহায্য কর। আমাদের এখান থেকে বের হতে হবে।

‘ জি স্যার।

হাসিব ড্রাইভার জসিমকে নিয়ে মানিককে কাঁধে করে পাহাড় থেকে নেমে যাচ্ছে। আশিক কিশোর মন্টু তিনজনের হাঁটার শক্তি আছে বলে ওরা হেঁটেই যাচ্ছে হাসিবদের পিছনে। মারিদ নূরজাহানকে নিয়ে ওদের পিছনে গেল না। বলা যায় না যদি মানিকের কোনো লোকজন আবার নূরজাহানের জন্য আক্রমণ করে বসল। এমনিতেই নূরজাহানের অবস্থা খারাপ। দ্রুত হাসপাতালে নিতে হবে। মারিদ সতর্কতা অবলম্বন করল। ভাবল মানিককে নিয়ে যাওয়ার একটু পর যাবে ওরা, কালি পাহাড়ের অন্য কোনো রাস্তা ধরে নূরজাহানকে নিয়ে মারিদ নেমে যাবে। মারিদ নূরজাহানকে নিয়ে দ্রুত একটা তাঁবুর ভিতরে ঢুকল। এরমধ্যে টিপটিপ বৃষ্টি একটু বেড়েছে মনে হয়। চারপাশে ঝুমঝুম বৃষ্টি হচ্ছে। উঠুনের বড় আগুনটা নিভে যাচ্ছে ধীরে ধীরে। গাছে বাঁধা আগুনের মশালগুলো অতি বৃষ্টিতে নিভে যায়। কালিঘাটি কালো অন্ধকারে তলিয়ে যায় মূহুর্তে। চারপাশ থেকে হঠাৎ মানুষের হৈচৈ আর কলরব শোনা গেল। পুনরায় ডাকাত দল আক্রমণ করতে ছুটে আসছে নাকি অন্য কিছু—বিষয়টা বুঝতে রাদিল মারিদকে নূরজাহানের সঙ্গে তাঁবুতে থাকতে বলে সে দৌড়ে অন্ধকারের মধ্যে বেরিয়ে যায়। ঝড় বৃষ্টি আর অন্ধকারের মধ্যে রাদিল পাহাড়ের রাস্তা সঠিক ঠাহর করতে না পেরে অসুস্থ শরীর নিয়ে রাদিল পা পিছলে পাহাড় থেকে পড়ে যায় খাদে। রাদিলের চিৎকারে আশনূর মারিদ দুজন আতঙ্কে পড়ে গেল। মারিদ নূরজাহানকে তাঁবুর ভিতরে বিছানায় শুইয়ে সে উঠতে গেলে আশনূর হাতে রামদা নিয়ে মারিদকে নূরজাহানের সঙ্গে থাকতে বলে বলল…

‘ আপনি নূরজাহানের সঙ্গে থাকুন মারিদ সাহেব। আমাদের দুজন একত্রে বের হওয়া ঠিক হবে না। বাইরে হয়তো ডাকাত দল আবার আক্রমণ করেছে। আমি রাদিল সাহেবকে দেখতে যাচ্ছি, আমার চিৎকার শোনার সাথে সাথে আপনি নূরজাহানকে নিয়ে তাঁবুর পিছনে কাপড় ছিঁড়ে বেরিয়ে যাবেন।

মারিদ আশনূরের বাঁধা দিয়ে বলল…

‘ আপনি নূরজাহানের সঙ্গে থাকুন আশনূর। আমি হ্যান্ডেল করছি আক্রমণকারীদের। আপ…

মারিদকে থামিয়ে আশনূর বলল….

‘ দুটো মেয়ে একত্রে মোকাবিলা করতে পারব না মারিদ সাহেব। নূরজাহান বেহুঁশ। কোনো কিছু হলে আপনি নূরজাহানকে নিয়ে বেরিয়ে যেতে পারবেন। আমি পারব না সেটা। তাই আমাকে বাইরে যেতে দিন।

তাবুতে ঝরঝর করে বৃষ্টির পানি পড়ছে। আশনূর হাতে রামদা চেপে সাবধানে বেরিয়ে যায়। মানুষের হৈচৈ চিৎকার শব্দটা খুব নিকটে বোঝা যাচ্ছে। এর মাঝে অন্ধকারে গর্তে পড়ে রাদিল মারিদ ও আশনূরকে ডাকছে সাহায্যের জন্য। আশনূর পাহাড়ের পশ্চিম দিকে গেল রাদিলের চিৎকার শুনে। পাহাড় বেয়ে নামতে নামতে আশনূর বেশ নিচে নেমে গেল। অন্ধকার তাঁবুতে বৃষ্টির মধ্যে একাকী রেখে গেল মারিদ আর নূরজাহানকে। কয়েক মিনিটের মাঝে তাঁবুর আশেপাশে গ্রামের মানুষের হৈচৈ, চিৎকার আর কলরব শোনা গেল। সকলেই বৃষ্টিতে ভিজে আশেপাশে টর্চ লাইট মেরে নূরজাহান আর মানিকের তল্লাশি করছে। মানিকের সাজানো গোছানো পরিকল্পনা ছিল। হাসানের মেয়ে নূরজাহানকে মানিকের সঙ্গে একত্রে দেখে গ্রামবাসী যেন জোর করে বিয়ে দেয়। জোর বলতে ঐ হাসান সিকদারকে জব্দ করা আরকি। হাসান মেয়ে বিয়ে দিতে চায় না মানিকের সঙ্গে সেজন্য মানিকের চাচা হারুন সওদাগর আর বাবা মোল্লা সওদাগর মিলে গ্রামের কিছু মাথাওয়ালা লোকদের টাকা খাইয়ে পরিকল্পনা অনুযায়ী এখানে নিয়ে এসেছে দুজনের বিয়ে দিতে। যদিও মানিক নূরজাহানকে নিয়ে চেয়ারম্যান বাড়িতে যাওয়ার কথা ছিল কিন্তু হঠাৎ মানিক নূরজাহানকে নিয়ে কালিঘাটি পাহাড়ে আসায় তাদের পরিকল্পনা পাল্টে গ্রামের ছোট-বড় মেয়ে-ছেলে, মহিলা-পুরুষ সকলকে একত্র করে বড়সড় দরবার সাজিয়ে সওদাগর পরিবার নিয়ে এসেছে নূরজাহান আর মানিকের বিয়ে দিতে। হারুন সওদাগর ও মোল্লা সওদাগরকে খবর দিয়েছে বেলাল, ঝন্টু। দুজনের আহত শরীর দেখে মোল্লা চেয়ারম্যান ওদের হাসপাতালে পাঠিয়ে উনারা এসেছেন। লাঠিয়াল ছেলেপেলে নিয়ে যখন সবকিছু ভাঙচুর করছিল তখন মারিদ নূরজাহানকে বুকে জড়িয়ে তাঁবুর পিছনের কাপড় ছিঁড়ে বেরিয়ে যেতে গিয়ে ধরা পড়ে যায় গ্রামবাসীর হাতে। নূরজাহান তখন অজ্ঞান অবস্থায় মারিদের বুকে। নূরজাহানের শরীরের দাগ আর গায়ের ছেঁড়া কাপড় দেখে গ্রামবাসী হইহই করে মারিদ ও নূরজাহানকে ঘিরে ধরে পেটাতে লাগল। মারিদ নূরজাহানের ওপর পড়ে নূরজাহানকে বাঁচাতে লাগল। মারিদের পিঠে লাঠির আঘাতে জখম হচ্ছে। বৃষ্টির তেজ বাড়ছে। কাদা মাটিতে মারিদ-নূরজাহান দুজনই লেপটে। দুহাতে নূরজাহানকে বুকে জড়িয়ে মারিদ। সকলেই নূরজাহানকে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করছে কেউ বা থুতু ছিটচ্ছে। হারুন, মোল্লা সওদাগর মানিকের জায়গায় মারিদকে দেখে বিস্ময়ে অবাক হলো। ওরা আদেশ করার আগেই ছেলেপেলে মারিদ ও নূরজাহানকে পেটাতে লাগল। হারুন এই কয়েকদিনে মারিদের ক্ষমতা সম্পর্কে অবগত হয়েছে। মারিদ কোনো সাধারণ লোক নয় মারিদের পিছনে মন্ত্রীসদস্য লোক জড়িত। মারিদের কিছু হলে হারুন সওদাগর ফেঁসে যেতে পারে। হারুনের মাথায় ছাতা ধরে একজন কর্মচারী দাঁড়িয়ে। হারুন মারিদকে না মারতে আদেশ করে বলল….

‘ এই তোরা মারিদ সাহেবকে মারিস না। হাসানের নষ্ট মেয়েটাকে বের কর। আজকে এই মেয়ের বিচার হবে ভরা মজলিসে। মেয়েটাকে গাছের সঙ্গে বাঁধ সবাই।

হারুনের আদেশে হইহই করে উঠল সবাই। সকলে নূরজাহানের বিচার চায়। কিছু বানোয়াট আর টাকা খাওয়া লোক ছিল গ্রামবাসীদের ভিড়ে। সেই ভিড়ে কয়েকজন লোক মারিদ থেকে নূরজাহানকে আলাদা করতে এগিয়ে গেল। বৃষ্টি কাদা-মাটিতেও নূরজাহানের রূপ চোখে লাগার মতন। মানিক সওদাগর হাসানের মাইয়া নূরজাহানের পিছনে না থাকলে গ্রামবাসীর সকলেই কমবেশি হাসানের এই সুন্দরী মাইয়ারে বিয়া করার প্রস্তাব দিত। কিন্তু মানিকের জন্য কেউ নূরজাহানের দিকে চোখ তুলে তাকাতে পারেনি কখনো। আজ মোক্ষম সুযোগ এসেছে, আসমানের পরীর মতো সুন্দর হাসানের মেয়েরে ওরা ছুঁয়ে দেখবে। আজ মানিক নেই, কোনো বাধাও নেই। নিজেদের মনের বাসনাও পূরণ হবে। লোকগুলো মারিদকে টেনে নূরজাহানের দিকে হাত বাড়াতে মারিদ হিংস্র বাঘের ন্যায় গর্জে উঠল।

মারিদের হঠাৎ গর্জনে সকলেই ভয়ে পিছিয়ে যায়। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা একজন লাঠিয়াল ছেলের হাত থেকে প্রথমে একটা বাঁশ তারপর রামদা কেড়ে নিয়ে মারিদ এলোমেলো আঘাত বসাল এগিয়ে আসা লোকগুলোর একজনের ওপর। মারিদের আঘাতে উচ্চ চিৎকারে একজন লোক কাঁধ চেপে মাটিতে বসে গেল। ক্ষিপ্ত পরিবেশ আরও উত্তেজিত হয়ে গেল মারিদের প্রহারে। একা মারিদের বিপক্ষে গোটা গ্রামবাসী বিক্ষোভে দাঁড়িয়ে। সকলেই হইহই করে লাঠিসোটা যা আছে নিয়ে তেড়ে ছুটল মারিদকে আঘাত করবে। মারিদ নূরজাহানের সামনে কাদা-মাটিতে লেপটে একহাতে বাঁশ অপর হাতে রামদা নিয়ে দাঁড়িয়ে। বৃষ্টির পানিতে শরীরে মাটি ছুঁয়ে ছুঁয়ে পরছে। মারিদ হাতের মুঠোয় রান-দা পিষে গর্জনে বলল….

‘ কারও যদি ক্ষমতা থাকে তাহলে আমাকে ঠেঙ্গিয়ে মেয়েটিকে ছুঁয়ে দেখা। খোদা কসম আজ এখানে লাশের বন্যা বয়ে যাবে। একজনও জান নিয়ে ফেরত যাবে না। আয়! সাহস থাকলে ছুঁয়ে দেখা।

চলিত….

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply