Golpo কষ্টের গল্প ডাকপ্রিয়র চিঠি

ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ২৬


ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ২৬

লেখিকাঃরিক্তাইসলাম মায়া

২৬
পহেলা মার্চ ২০১৫
সময় ১:৪৫। গায়ে সবুজ সাদা স্কুল ড্রেস পরে সুখ ঢাকা মেডিকেল কলেজের পার্কিং জোনে দাঁড়িয়ে। হাতে পরীক্ষার ফাইলটা বগলের নিচে চেপে ঠোঙা থেকে ঝালমুড়ি মুখে তুলে চিবোচ্ছে আর চঞ্চল চোখ দুটো এদিক-সেদিক ঘোরাচ্ছে। হাতে আরও কিছু খাবার আছে, তবে সেটা গাড়ির হুডের উপর রাখা। সুখ রিফাতের গাড়িতে পিঠ ঘেঁষে ঝালমুড়ি চিবোচ্ছে। অসময়ে সুখকে ঢাকা মেডিকেল কলেজে নিয়ে এসেছে রিফাত। আজ সুখের একটা গ্রুপের পরীক্ষা ছিল। সুখ সায়েন্সের স্টুডেন্ট। পড়াশোনাও ভালো, তবে বেশ দুষ্টু। মারিদ, রাদিল কেউ ঢাকা না থাকায় সুখকে পরীক্ষার হল থেকে রিফাতই নিয়ে আসে। যাওয়ার সময় সুখের বাবা নিয়ে যায় আর ফেরার সময় রিফাত নিয়ে আসে। হঠাৎ কলেজে কাজ থাকায় সুখকে সঙ্গে নিয়েই কলেজে এসেছে রিফাত। পার্কিং এরিয়ায় সুখকে চিপস, আইসক্রিম, চকলেট, ঝালমুড়ি হাবিজাবি কিনে দিয়ে সে কলেজের ভেতরে গিয়েছে, গোটা বিশ মিনিট পেরুতে চলল। এতে সুখের বিরক্তি নেই। সুখ এর আগেও বহুবার এসেছে এই ঢাকা মেডিকেল কলেজের চত্বরে। এখানকার বেশ কিছু স্টুডেন্ট সুখকে রিফাতের বোন আর রাদিলের আত্মীয় বলে চেনে। রিফাত ঢাকা মেডিকেলে শিক্ষকতা করছে প্রায় দুবছর হতে চলল। রাদিল সাত-আট মাস হবে। সুখ রিফাতের সঙ্গে এসেছে কয়েকবার। রাদিল কখনো সুখকে নিয়ে কলেজে আসেনি, সেজন্য স্টুডেন্টরা যারা সুখকে চেনে তারা সবাই রিফাতের বোন হিসেবেই সুখকে চেনে।

সুখ চঞ্চল। লম্বা বেশ একটা না হলেও দেখতে সাদা কাগজের মতন ফর্সা। গোলগাল শরীর, চোখ দুটো সবচেয়ে আকর্ষণীয়। ধূসর রঙের চোখ, যেমনটা মারিদেরও রয়েছে। ভাই-বোন দুজনেরই ধূসর রঙের চোখ—এটা তারা নানির থেকে পেয়েছে। ক্যাম্পাস থেকে বেরোতে দূর থেকে সুখকে রিফাতের গাড়ির সঙ্গে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে তনিমা মাহিকে নিয়ে দৌড়ে এল। বেশ কয়েক দিন ধরে তনিমা রিফাতের পার্সোনাল নাম্বারটা জোগাড় করতে চাচ্ছে কথা বলার জন্য, কিন্তু সুযোগ পাচ্ছে না। আজ সুখকে দেখে তনিমা তাড়াহুড়োয় ক্লাস থেকে ছুটে এসেছে কথা বলতে। তনিমা সুখকে চেনে। এর আগেও বেশ কয়েকবার রিফাতের সঙ্গে দেখেছে। রিফাত বলেছিল সুখ তার বোন, কিন্তু কী রকম বোন হয় সেসব খোলাসা করে বলেনি কখনো। তনিমা ধরে নিল সুখ রিফাতের আপন বোন হয়। কথায় কথায় সুখের কাছ থেকে রিফাতের নাম্বার চেয়ে নেবে কোনো এক বাহানায়। তনিমা তাড়াহুড়ো করে দৌড়ে সুখের সামনে দাঁড়াতে হাঁপাতে লাগল। বড় বড় নিশ্বাসে সুখকে বলল…

‘হাই কিউটি!

গায়ে স্কুল ড্রেস। গলায় স্কার্ফটা ঝুলছে। লম্বা চুলগুলো দুটো বেণি করে দুপাশে ফেলা। হঠাৎ আসা দুটো মেয়েকে সুখ দেখে মুড়ি চিবোতে চিবোতে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল…

‘ আপনারা আমাকে চেনেন?

তনিমা সোজা হয়ে দাঁড়াল। কাঁধে ব্যাগটা টেনে বলল…

‘তুমি আমাদের রিফাত স্যারের বোন না?

‘ জি।

‘তাহলে সেইভাবেই আমরা তোমাকে চিনি। বেশ কয়েকবার দেখেছিলাম রিফাত স্যারের সঙ্গে এই কলেজে আসতে। তাই ভাবলাম আজ তোমার সাথে পরিচিত হয়ে নেয়। আমি তনিমা, আর ওহ আমার বান্ধবী মাহি। তোমার নাম কী কিউটি?

চঞ্চল সুখ বেশ ঝটপট উত্তর দিয়ে বলল…

‘আমি রিদিতা সৈয়দ সুখ। ডাক নাম পাখি।

তনিমা অবাক গলায় বলল…

‘ আল্লাহ! এতগুলা নাম তোমার?

তনিমাকে অবাক হতে দেখে সুখ চঞ্চল ভঙ্গিতে হেঁসে মাথা নাড়িয়ে বলল..

‘ আসলে আমাদের একান্নবর্তী পরিবার তো? তাই যার যেটা মন চেয়েছে আমাকে একটা করে নাম উপহার দিয়েছে।

‘ যায় বলো, তোমার সুখ নামটা কিন্তু খুব সুন্দর এবং ইউনিক। নামের সাথে সাথে তুমি দেখতেও খুব সুন্দর কিউটি।

তনিমার কথায় বেশ উৎসাহ পেল সুখ…

‘সবাই তাই বলে আমি সুন্দর। তবে তুমি ক্রাশ খেয়েছ আপু?

সুখের কথায় বেশ অবাক হলো তনিমা ও মাহি। তনিমা বলল…

‘আমার ক্রাশ খেতে হবে?

‘বারে! তুমি আমার প্রশংসা করছ আর ক্রাশ খাবে না বুঝি? তুমি ক্রাশ না খেলে আমি তোমাকে আমার ভাইয়ের নাম্বার কেন দেব? আগে ক্রাশ খাও তারপর নাম্বার চাও।

তনিমা ও মাহি দুজন চমকে একে অপরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করল। তনিমা ও মাহি যে সুখের কাছে সুখের ভাইয়ের নাম্বার চাইতে এসেছে, সেটা সুখ জানল কীভাবে? তনিমা কিছু বলবে তার আগেই মাহি ভারি গলায় বলল…

‘তুমি কীভাবে জানলে কিউটি?

তনিমা ও মাহি অপরিচিত হওয়ায় তারা সুখের ভণ্ডামির লেভেল জানে না। সুখ বেশ অভিজ্ঞের মতো করে মুখে ঝালমুড়ি পুরে চিবোতে চিবোতে বলল…

‘আপনারা দুজনই দৌড়ে আসার সময় একজন আরেকজনকে জোরে বলছিলেন রিফাত স্যারের বোন থেকে তার ভাইয়ের নাম্বার নিয়ে নেব কোনো একটা বাহানা বানিয়ে। আমি ভাবলাম বাহানা কেন বানাবেন? এর থেকে বরং আমাকে কিছু ঘুষ দেন পটে যায় , একটা নারকেল পানি খাওয়ান, আমি নাম্বার দিয়ে দিচ্ছি। আসলে রিফাত ভাই আমাকে খাবার কিনে দিয়ে গেছে কিন্তু পানি দিয়ে যায়নি। আমার ঝাল লেগেছে, হাতে টাকাও নেই। তাই ঘুষ চাচ্ছি। ভবিষ্যৎ ভাবি হলে দ্বিগুণ চার্জ লাগবে, এখন অল্পতে পোষাবে!

তনিমা ও মাহি দুজনই হতবাক, বাকরুদ্ধ হয়ে একে অপরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করছে। সুখ সোজা তনিমাকে ভাবি ডাকছে। তার মানে সুখ বুঝতে পারছে তনিমা কোনো ইনটেনশনে সুখের কাছে রিফাতের নাম্বার চাইতে এসেছে। তনিমা হাঁসফাঁস করল। মেয়ে হয়েও লজ্জা পাচ্ছে সুখ হঠাৎ ভাবি ডাকায়। মনে অদ্ভুত মিশ্রণের অনুভূতি হচ্ছে। তনিমা কথা না বাড়িয়ে ব্যাগ থেকে একশো টাকা বের করে মাহিকে দিয়ে বলল…

‘একটা নারকেল পানি নিয়ে আয় দ্রুত। যাহ।

মাহি টাকা নিয়ে চলে গেল। এর ফাঁকে রিফাতকে দেখা গেল ক্যাম্পাস হতে বেরিয়ে এদিকটায় আসতে। রিফাতকে দেখে তনিমা ভয় পেয়ে তাড়াহুড়ো করল। রিফাত সামনে থাকলে সে সুখের থেকে রিফাতের নাম্বারটা নিতে পারবে না। তনিমা দ্রুত সুখকে তাড়া দিয়ে বলল…

‘তোমার ভাইয়ের নাম্বারটা দাও সুখ।

সুখ কথা না বাড়িয়ে পটপট করে তনিমাকে মারিদের নাম্বারটা দিয়ে দিল। কারণ সুখের ভাই মারিদ, রিফাত নয়—রিফাত সুখের ফুফাতো ভাই হয়। তনিমা ক্লিয়ার করে বলেনি তার কার নাম্বার চাই। তাই সুখের ভাই হিসেবে মারিদের নাম্বার সুখ তনিমাকে দিয়ে দিল। রিফাত তনিমার স্যার হয়, সেই সুবাদে তনিমার কাছে রিফাতের নাম্বার থাকাটা স্বাভাবিক। যদি সুখের কাছে তনিমা রিফাতের নাম্বার চাইত, তাহলে তনিমা অবশ্যই বলত—’রিফাত স্যারের নাম্বারটা দাও সুখ’। তনিমা বলেছে ‘তোমার ভাইয়ের নাম্বারটা দাও সুখ’, সুখের ভাই বলতে মারিদকে বুঝে সুখ, সেজন্য সুখ মারিদের নাম্বার তনিমাকে দিয়ে দিল। তনিমা দ্রুত হাতে নাম্বারটা বইয়ের একটা পৃষ্ঠায় লিখে বইটা বন্ধ করে সুখকে ধন্যবাদ দিয়ে বলল….

‘অসংখ্য ধন্যবাদ কিউটিপাই। আমি তোমার থেকে নাম্বার নিয়েছি এটা প্লিজ রিফাত স্যারকে বোলো না, কেমন?

‘আচ্ছা।

এর মাঝে মাহি নারকেল পানি নিয়ে এল। তনিমা মাহির থেকে নারকেল পানি নিয়ে সুখকে দিয়ে বলল…

‘আমাদের আবার দেখা হবে কিউটিপাই। আজ আসি।

সুখ তনিমার থেকে ডাব নিয়ে বলল…

‘ওকে ভাবি।

তনিমা ফের লজ্জায় মিইয়ে গেল। রিফাতকে কাছাকাছি আসতে দেখে কিছু বলতে পারল না, শুধু মাহিকে নিয়ে দৌড়ে পালিয়ে গেল। রিফাত দেখেছে তনিমার কাছ থেকে সুখ নারকেল পানি নিতে। রিফাত কাছাকাছি এসে বলল…

‘ওরা তোকে নারকেল পানি দিল কেন?

‘আমার ঝাল লেগেছে তাই দিয়েছে উনারা। তুমি তো আর আমাকে পানি কিনে দিয়ে যাওনি তাই না।

‘আমি পানি কিনে দিয়ে যাইনি বলে তুই মানুষের থেকে চেয়ে খাবি? তোর কাছে টাকা ছিল না কিনে খেতি?

সুখ মুখ বাকিয়ে বলল..

‘তুমি আমাকে এখানে নিয়ে এসেছ, আমি এখন তোমার দায়িত্ব। তাহলে আমি কেন নিজের টাকা খরচ করে কিছু খাব? তুমি পানি খাওয়াতে না পারলে তোমার স্টুডেন্ট খাওয়াবে, একই তো কথা। তাছাড়া আমি মাগনা কিছু খাইনি। তোমার একটা কিডনি আপুদের কাছে বন্ধক রেখে এই নারকেল পানিটা নিয়েছি। কাল আপুদের টাকা দিয়ে নিজের কিডনি ছাড়িয়ে নিয়ো তাহলেই হবে।

সুখ গাড়ির দরজা টানল হাতে নারকেল পানি নিয়ে। রিফাত ভারি আশ্চর্য গলায় বলল…

‘তুই আমার কিডনি বন্ধক রেখেছিস তোর সামান্য নারকেল পানির জন্য?

‘হ্যাঁ। তো কী, তোমার জন্য আমার টাকা খরচ করব নাকি আজব।

‘ভণ্ডর বাচ্চা ভণ্ড, দাঁড়া তুই!
~~
হঠাৎ করে আকাশে রঙ বদলেছে। সকাল থেকেই থানচির আকাশ মেঘলা। অসময়ে গুঁড়িগুঁড়ি বৃষ্টির আগমন। থেকে থেকে আকাশে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। মারিদ, রাদিল, হাসিব সন্ধ্যায় ঢাকা ফিরে যাবে। মারিদের জন্য নতুন গাড়ি আর ড্রাইভার এসেছে ঢাকা থেকে। বৃষ্টি হওয়ায় আজ হাসপাতালে কাজ বন্ধ, তবে প্রজেক্টের কাজের যা যা প্রয়োজন সেসব মারিদ তদারকি করছে। সঙ্গে হাসান, মাজিদ, সাজিদও আছে। আজ রাদিল বাড়ি থেকে বেরোয়নি, রাদিলের গায়ে জ্বর। সে ঘরে শুয়ে। হাসিব গিয়েছে মারিদের সঙ্গে।

অবেলায় আলেহা আজ শ্বশুরবাড়ি চলে যাচ্ছে। আলেহার শ্বশুর-শাশুড়ি না থাকায় আলেহা একাই জীবনযাপন করছে নিজ বাড়িতে। সঙ্গে একটা কাজের মেয়ে থাকে, ফুলি। ফুলি আজ সকালে ফোন করেছে—আলেহার ফসলের ক্ষেত কে যেন নষ্ট করে দিয়েছে, আলেহা যেন জলদি বাড়িতে ফিরে। খবর পেয়ে তাড়াহুড়ো করে আলেহা গায়ে বোরকা জড়াল। রশিদকে ফোন করে অটোরিকশাটা ডাকাল। রশিদের অটোরিকশা সিকদার বাড়ির উঠোনে দাঁড়ানো। আলেহাকে নূরজাহান জড়িয়ে কাঁদছে। বাকিরা সবাই আলেহাকে ঘিরে দাঁড়িয়ে বিদায় জানাতে। শাহানা থেকে আলেহা ভিতর ঘর হতে বিদায় নিয়ে এসেছে। তারানূর বারবার শাড়ির আঁচলে চোখ মুছছে। আশনূর, নদী বারান্দায় দাঁড়িয়ে। আলেহা নূরজাহানের মাথায় হাত রেখে বলল…

‘কাঁদিস না। ফুপি আবার আসব। তখন অনেক দিন থাকব তোদের সাথে, কেমন? এখন শান্ত হ।

নূরজাহান মাথা নাড়িয়ে সম্মতি দিল। আলেহা এক হাতে নূরজাহানকে জড়িয়ে পেছনে তাকাতে আশনূরকে পাশে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখল। আলেহা অপর হাত বাড়িয়ে আশনূরকে ডেকে বলল…

‘কাছে আয় আশনূর।

আশনূর কাছে এল। আলেহা অপর হাতে আশনূরকে বুকে জড়িয়ে বলল…

‘নূরজাহান তোর ছোট বোন হয় আশনূর। তোর আম্মা নূরজাহানকে কষ্ট দিলেও তুই নূরজাহানকে কখনো কষ্ট দিস না আশনূর। নূরজাহানকে তোর হেফাজতে রেখে যাচ্ছি। খেয়াল রাখিস ছোট বোনের।

আশনূর মাথা নাড়িয়ে সম্মতি দিয়ে বলল…

‘আচ্ছা খেয়াল রাখব। কিন্তু তুমি আরও কটা দিন থেকে যাও না ফুপি।

‘থাকতে পারলে অবশ্যই থাকতাম। তোদের ছাড়া আমারও মন টিকবে না ঐ বাড়িতে। মন ছটফট করবে ভিষণ।

‘তাহলে চিরকালের জন্য আমাদের সঙ্গে থেকে যাও না ফুপি? তুমি একা মানুষ ঐ বাড়িতে থেকে কী করবে?

‘আমি একা মানুষ হয়েছি তো কী হয়েছে? মেয়ে মানুষের স্বামীর ঘরই শেষ ঠিকানা হয়। নারী নিজের শেষ ঠিকানা ছেড়ে থাকতে পারে না। যখন তোর বিয়ে দেব, তখন তুইও বুঝবি—বাপের বাড়ির সুখের চেয়ে স্বামীর ঘরে একা জীবনও অনেক শান্তির হয়।

আশনূর কথা বাড়াল না। তারানূর মেয়ের জন্য কাঁদছে। আলেহা আশনূর ও নূরজাহানকে ছেড়ে তারানূরকে জড়িয়ে ধরে কপালে চুমু খেয়ে বলল…

‘বাচ্চাদের মতো করে কাঁদার স্বভাব তোমার আর যাবে না আম্মা। আমার বিয়ে হয়েছে ত্রিশ বছর হলো, তারপরও তোমার আমাকে শ্বশুরবাড়িতে পাঠাতে কাঁদতে হয় কেন আম্মা?

‘তুই তো মাইয়া জম্মা দেস নাই। হের লাইগা আমার বেদন তুই বুঝবি না আলেহা। একটা মাইয়া জম্ম দিয়া হেরে শ্বশুর বাইত্তে পাঠাইতি তাইলে বুঝতি মাগো বেদন কেমন।

আলেহা চুপ থেকে তারানূরকে কাঁদতে দিল। ঝিরঝিরে বৃষ্টির মধ্যে গিয়ে বসল অটোরিকশাতে। সকলে বারান্দায় দাঁড়িয়ে। আলেহা বারবার নূরজাহানের দিকে তাকাচ্ছে। আলেহার মনটা ভীষণ অস্থির, চঞ্চল হচ্ছে নূরজাহানের চিন্তায়। মনটা কেমন কু ডাকছে অজানা ভয়ে। আলেহা গাড়িতে বসে ফের নূরজাহানকে কাছে ডাকল। নূরজাহান মাথায় ওড়না দিয়ে গাড়ির সামনে দাঁড়াতে আলেহা দুহাতে নূরজাহানের গাল চেপে কপালে চুমু খেয়ে বলল…

‘আমার মনটা কেমন জানি কু ডাকছে নূরজাহান। তোর জন্য ভিষণ ভয় লাগছে। মনে হচ্ছে বড় কোনো বিপদ হবে কারো। আল্লাহ জানে কার কী হয়। তুই সাবধানে থাকিস। কোনো কিছু হলে আমাকে ফোন করবি মনে থাকবে?

‘ জি।

আলেহা চলে গেল। নূরজাহান বৃষ্টি-বাদলের মধ্যে আরও কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে আলেহার গাড়িটা দেখল, যতক্ষণ দেখা যায় ততক্ষণ। আলেহা চলে যেতে সকলে যার যার ঘরে গেল। নূরজাহান নিজের ঘরে গিয়ে বসল। মন ছটফট নূরজাহানেরও করছে। অদ্ভুত অস্থিরতায় ভেতরটা ছটফট করছে, সেটা আলেহাকে বলতে পারেনি। মাগরিবের আজান পড়ছে। অসময়ে বৃষ্টির আগমনে চারদিকটা বেশ অন্ধকারে ছেয়ে গেছে। গ্রামে বিদ্যুতের অভাব বেশিভাগ সময়ই দেখা যায়, একটু বৃষ্টি বাদল হলেই কারেন্ট থাকে না। আজও কারেন্ট নেই। ঘরে ঘরে হারিকেন আর কুফিতে আগুন জ্বালানো হয়েছে। তারানূর, নূরজাহান নামাজে বসেছে। নূরজাহান নিজের ঘরে নামাজ পড়ছে, তারানূর বসার ঘরে। মারিদের গাড়ি গেটের বাইরে দাঁড়িয়ে, একটু পর মারিদরা চলে যাবে। শাহানা মারিদের জন্য নাস্তা তৈরি করছে। এই কয়েক দিনে নূরজাহানের কাটা পা-টাও অল্প শুকিয়ে এসেছে, তবে ক্ষত বড় হওয়ায় পুরোপুরি সেরে ওঠেনি। আরও সময় লাগবে।
মারিদরা সন্ধ্যা ছয়টার নাগাদ সবার থেকে বিদায় নিয়ে গাড়িতে উঠে বসেছে। মারিদ বেশ কয়েকবার এদিক-সেদিক তাকিয়ে মনের অজান্তে নূরজাহানের খোঁজ করেছে, কিন্তু বিদায়বেলায় নূরজাহানের দেখা পায়নি সে কোথাও। মারিদ এবার চলে যাচ্ছে, তবে আবার কবে ফিরবে তার ঠিক নেই। হয়তো মাস লাগতে পারে আবার তারও বেশি সময় লাগবে। ঝরঝর বৃষ্টিতে মারিদ গম্ভীর ম্লান মুখে জানালার কাঁচ ঘেঁষে অন্ধকারাচ্ছন্ন আকাশে তাকাল। সামনের মিররে দুটো ওয়াইপার বিরতিহীন কাঁচে ওঠানামা করছে বৃষ্টির পানি পরিষ্কার করতে। মারিদ, রাদিল পেছনে বসা। হাসিব ড্রাইভারের সামনে বসেছে। পরিবেশ শান্ত। রাদিল খানিকটা অসুস্থ, গায়ে জ্বর থাকায় সে সিটে হেলান দিয়ে ঘুমাচ্ছে। লম্বা জার্নি করতে হবে। গাড়ি করে থানচি থেকে ঢাকা পৌঁছাতে দশ-বারো ঘণ্টা সময় লাগবে। থানচি সদর পেরিয়ে সবে চট্টগ্রাম মহাসড়কে উঠেছে মারিদের গাড়ি।

সময় ৮:০৫। গাড়িতে বসা ওদের দুই ঘণ্টা পেরিয়ে গেল অতঃপর, তারপরও মারিদ সেই আগের ন্যায় গম্ভীর অবিচল ভঙ্গিতে বসে। নড়াচড়া, কথাবার্তা কিছুই বলছে না। হঠাৎ নীরবতা ভেঙে মারিদের ফোন বাজে। অপরিচিত নাম্বার দেখে মারিদ রিসিভ করল না। অশান্ত মনে কিছু ভালো লাগছে না। মনে হচ্ছে অপরিচিতাকে ভীষণ মিস করছে। একবার, দুইবার, তিনবার পরপর যখন কয়েকবার একই নাম্বার থেকে কল এল, মারিদ কপাল কুঁচকে ফোনের স্ক্রিনে নাম্বারটা দেখল। একদিন এমনভাবে অপরিচিতাও তাঁকে রং নাম্বার থেকে কল করেছিল। এই আননোন নাম্বারটা কি অপরিচিতা হয়ে যেতে পারে না? আজ কি প্রকৃতি তাঁর কথা শুনতে পারে না? মারিদ ফোন রিসিভ করে কানে তুলে গম্ভীর এবং লোহময় গলায় বলল…

‘আসসালামু আলাইকুম। কে বলছেন?

তনিমা বুক চেপে বসে। রিফাতের কণ্ঠস্বর ফোনে এতো ভারি আওয়াজ শোনাতে পারে সেটা তনিমার জানা ছিল না। এই ফোনের ব্যক্তির ভারি আওয়াজে তনিমার এক মুহূর্তে জন্য মনে হলো—এটাই ওর চিঠিওয়ালা। স্বপ্নে কল্পনায় কতশত বার তনিমা এই ভারি আওয়াজের চিঠিওয়ালাকেই কল্পনা করেছিল। আজ যেন তনিমার সকল স্বপ্ন, কল্পনা সত্যি হলো। তনিমার ধুকপুক বুকে হাত-পা ঠান্ডা শীতল হয়ে এল। কম্পিত স্বরে মারিদের সালামের উত্তর নিয়ে তনিমা বলল…

‘ ওয়ালাইকুম সালাম। আমি পত্রকন্যা। আপনার বসন্তের পাখি আমাক….

তনিমার শেষ বাক্য শেষ হওয়ার আগেই গর্জে চিৎকার করল মারিদ…

‘কী?

তনিমা চমকাল। ভয়ও পেল হঠাৎ ভয়ংকর চিৎকারের। রিফাত কেন চিৎকার করল তনিমা বুঝল না। তনিমা ফের ভয়ে ভয়ে বলল…

‘ আসলে এক বছর আগে আমরা ঢাকা মেডিকেল চত্বরে চিঠি আদান-প্রদান করেছিলাম প্রায় তিন থেকে চার মাসের মতন। আপনার কি আমাকে মনে আছে? আমি সেই পত্র কন্যা।

মারিদ নিস্তব্ধ, বাকরুদ্ধ, অতি শকড হয়ে বসে রইল। গত একটা বছর মারিদ যে অপরিচিতাকে খুঁজে পাওয়ার আশায় আসমান-জমিন এক করেছে, সেই অপরিচিতা আজ তার দুয়ারে নক করছে। বলছে সে তার বসন্তের পাখিকে চেনে কি না। তনিমা উত্তরের আশায় বসে। মারিদ থেকে উত্তর না পেলে তনিমা বুঝতে পারছে না সত্যি কি রিফাত স্যার তনিমার চিঠিওয়ালা কি না। তনিমার বুকের স্পন্দন দ্রুত বেগে লাফাচ্ছে। মারিদ আরেকটু সময় উত্তর দিতে দেরি করলে তনিমা নিজেই হার্ট অ্যাটাক করে বসবে উত্তর শোনার আগে। মারিদ ক্লান্ত এবং শ্বাসরুদ্ধকর কম্পিত গলায় স্বল্প আওয়াজে আওড়াল…

‘অপরিচিতা? আপনি অপরিচিতা?

চিঠিতে মারিদ তনিমাকে প্রায়শই ‘অপরিচিতা’, ‘বসন্তের পাখি’, ‘পত্রকন্যা’ এসব নামে সম্বোধন করত বলে তনিমা এই নামে পরিচিত। তনিমা তৎক্ষণাৎ সম্মতি দিয়ে বলল…

‘হ্যাঁ! আপনি আমাকে চিনেছেন?

ক্লান্ত এবং অবিশ্বাস্য গলায় মারিদ সিটে ধপ করে শরীর ছেড়ে দেয়। মারিদ ক্লান্ত গলায় বলল…

‘আপনি কোথায় হারিয়ে গিয়েছিলেন অপরিচিতা? আপনার বিরহে আমি পাগল হয়ে যাচ্ছি। আমাকে একটা কল করতে আপনার এতো সময় লাগল?

তনিমা ঝরঝর করে কেঁদে ফেলল অনাকাঙ্ক্ষিত কিছু শোনায় যাওয়ায়। কান্নার দারুণ খুব অল্পতেই তনিমার হেঁচকি উঠে যায়। মারিদ কেমন নিস্তব্ধ, নিষ্ক্রিয় ভঙ্গিতে তনিমার কান্নার শব্দ শুনছে। তনিমা বলল…

‘আপনি অনেক পাষাণ চিঠিওয়ালা। আমাকে কিছু না বলে কোথায় হারিয়ে গেলেন? আমার দেওয়া শেষ চিঠিটা অবধি আপনি নিতে আসেন নি। আপনি কেন কোনো কিছু না বলে হঠাৎ হারিয়ে গেলেন? আপনাকে আমি এই এক বছরে কতশতবার, কত হাজার বার খুঁজেছি। আপনি আমার সাথে কেন এমন করলেন? কেন হঠাৎ হারিয়ে গেলেন?

কয়েক সেকেন্ডের জন্য মারিদ অপরিচিতাকে খুঁজে পাওয়ার উত্তেজনায় খেয়াল করতে পারেনি ফোনের ওপাশের নারীটির গলার স্বর তার অপরিচিতার সঙ্গে মিল নেই। সম্পূর্ণ ভিন্ন দুটো কণ্ঠ। মারিদ চট করে বলল…

‘আপনার নাম কী অপরিচিতা?

তনিমা প্রথমে নিজের নাম বলতে দ্বিধা করল। কিন্তু তারপরও মিথ্যার আশ্রয় না নিয়ে কান্না মিশ্রিত গলায় বলল…

‘তনিমা শেখ। বাড়ি ঢাকা, গুলশান এক-এ।

মারিদ চমকাল। মারিদের বাড়ি গুলশান দুইয়ে। এতো কাছাকাছি থেকেও মারিদ কীভাবে অপরিচিতাকে খুঁজে পেল না? অপরিচিতার খোঁজে কত জেলা, কত মানুষ, কত তথ্যের পরে মারিদ থানচি হাসান সিকদারের বাড়িতে পৌঁছাল, অথচ আজ শুনতে পাচ্ছে অপরিচিতা ঢাকার বাসিন্দা? মারিদ এই তথ্যটা মিস করল কীভাবে?এমনটা তো হওয়ার কথা না। অস্থির অশান্ত মারিদ তৎক্ষণাৎ বলল…

‘আমি আপনার সাথে দেখা করতে চাই অপরিচিতা।

‘এখন নাকি?

‘রাত বারোটায় দেখা করতে পারবেন? বেশি সময় নেব না, একটু সময় হবে? আপনাকে দেখার তৃষ্ণার্তে আমার চোখ দুটো ব্যাকুল হয়ে আছে। এক পলক দেখব অপরিচিতা, আসবেন আপনি?

ঢাকার যান্ত্রিক শহর। দিন-রাত সমান। মানুষের যাতায়াতের ভিড় সবসময় লেগে থাকে রাস্তা জুড়ে। তনিমা বলল…

‘আমি তো এখন বাসায় নেই। ধানমন্ডি ফুফির বাসায় আছি।

‘আপনার লোকেশন দেন, আমি ওখানে আসব।

তনিমা লোকেশন দিতে মারিদ কল কেটে দিল। গাড়ি করে রাত বারোটার মধ্যে ঢাকা পৌঁছানো অসম্ভব। মারিদ হাসিবকে উদ্দেশ্য করে বলল…

‘হাসিব গাড়ি ঘোরা। চট্টগ্রাম এয়ারপোর্টে চল। রাত বারোটার মধ্যে ঢাকা পৌঁছাতে চাই আমি। কুইক!

রাদিল বাদে হাসিব ও ড্রাইভার দুজনই শুনেছে মারিদের ফোনকলের কথা। হাসিব ভারি অবাক হয়েছে মারিদকে অপরিচিতার সাথে কথা বলতে দেখে। হাসিব মারিদকে প্রশ্ন না করে সম্মতি দিয়ে বলল…

‘জি স্যার হয়ে যাবে।

ড্রাইভার চট্টগ্রামের এয়ারপোর্টের দিকে গাড়ি ঘোরাল। রাদিল পাশের সিটে ঘুমিয়ে। মারিদ অশান্ত বুকে সিটে গা এলিয়ে কপালে হাত ঠেকাল। দীর্ঘদিনের টানাপোড়েনের বুকটা হঠাৎ যেন শান্ত হতে চাইছে এবার। দীর্ঘ এই পথটা শেষ হবে কবে? মারিদ যখন অপেক্ষার প্রহর গুনছে, হঠাৎ মারিদের টনক নড়ল। বন্ধ চোখে পাতা খুলে হিসাব মেলাতে বসল—আজকের মেয়েটির কণ্ঠ কি অপরিচিতার কণ্ঠ ছিল? নাকি ভিন্ন কণ্ঠধারী কেউ ছিল। মেয়েটি বলেছিল মারিদের সঙ্গে তিন মাস চিঠি আদান-প্রদান করেছে কিন্তু মারিদ তো ছয়-সাত মাস অপরিচিতার সঙ্গে ফোনে কথাও বলেছিল, তাহলে মেয়েটি সেটা কেন উল্লেখ করল না? মারিদ কি আবার হিসেবে ভুল করছি কোথাও?
~~
রাত নয়টা। বৃষ্টির বেগ বেড়েছে মনে হয়। হাসান ও মাজিদ গিয়েছে এই অসময়ে হাসপাতালে প্রজেক্টের কাজে। কনস্ট্রাকশন সাইট থেকে একজন সিকিউরিটির কল এসেছে—কারা যেন হাসপাতালের মাল চুরি করার চেষ্টা করেছে। খবরটা পেয়েই হাসান মাজিদকে নিয়ে এই ঝড়-বৃষ্টির রাতেই লাঠি হাতে বেরিয়ে যায়। বাড়িতে সাজিদ আছে কিন্তু সে যায়নি, ঘরে শুয়ে। নূরজাহান সন্ধ্যা থেকেই ঘরে শুয়ে ছিল, হঠাৎ নূরজাহানের ঘরের উত্তর দিকের দরজায় কে যেন কড়া নাড়ল। একবার, দুইবার, বারবার। নূরজাহান ঘুম থেকে ধড়ফড়িয়ে উঠে বসে ভয়ার্ত গলায় বলল…

‘কে? কে দরজাটা ধাক্কাচ্ছে?

খুব পরিচিত গলা কানে ভেসে এল। শাহানা বলল…

‘আমি। তুই দুয়ার খুইলা বাইরে আয়।

শাহানার গলা পেয়ে নূরজাহান স্বাভাবিক ভাবেই খাট থেকে নামল। শাহানা সচরাচর নূরজাহানকে কখনো প্রয়োজনেও ডাকে না। আজ কোন প্রয়োজনে ডাকছে, তাও সামনের দরজা না দিয়ে বাড়ির পেছনের দরজা দিয়ে—সেটা নূরজাহান ঠাহর করতে পারল না। সরল মনে নূরজাহান দরজা খুলে শাহানাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখল বৃষ্টির মাঝে ছাতা নিয়ে। শাড়ির ওপর গায়ে কালো চাদর জড়িয়ে, মাথায় বড় ছাতা। নূরজাহান দরজা থেকে বেরিয়ে সিঁড়িতে পা রেখে বলল…

‘আম্মা, এই বৃষ্টির মাঝে আপনি বাইরে কেন? কোথায় যাচ্ছেন? ঘরে আসুন।

শাহানা নূরজাহানের মুখের দিকে তাকাল কয়েক সেকেন্ড। তারপর শান্ত এবং লোহময় গলায় বলল..
.
‘আমার লগে আয়।

‘কোথায় যাব আম্মা?

শাহানার কথার সঙ্গে সঙ্গে পাল্টা প্রশ্ন করল নূরজাহান। শাহানা উত্তর না দিয়ে সামনের দিকে হেঁটে বলল…

‘ফরিদ ভাই খবর পাঠাইছে তোরে লইয়া তাগো বাইত্তে যাইতে। কী কাম জানি আছে।

ফরিদ সিকদার হাসানের বড় ভাই। নূরজাহানকে বেশ আদর করে। হাসানের বাড়ির থেকে একটু দূরে যে বাড়িটা আছে ঐ বাড়িটাই ফরিদের। নূরজাহানকে আসতে বলে বৃষ্টি-বাদলের মাঝে শাহানা হাঁটতে শুরু করে। নূরজাহান গায়ে কোনো রকম ওড়না জড়িয়ে ঘর থেকে বেরুল। শাহানা চলে যাচ্ছে বলে নূরজাহান ঘরের দরজাটা বাহির থেকে চাপিয়ে তাড়াহুড়োয় শাহানার পেছন পেছন হাঁটছে। পায়ে স্যান্ডেলে চপচপ শব্দ করছে। টিপটিপ বৃষ্টিতে নূরজাহান শাহানার ছাতার নিচে ঢুকতে চাইলে শাহানা ছাতা সরিয়ে নেয়। শাহানার ছাতার নিচে নূরজাহানের জায়গা হবে না ভেবে নূরজাহান শাহানার পেছনে হাঁটল। টিপটিপ বৃষ্টিতে অল্পতেই ভিজে গেল সে। অন্ধকার রাতে শাহানা হাতে করে কোনো কৃত্রিম আলো বা লাইট নিয়ে আসেনি। তবুও সরল মনে নূরজাহান সৎ মায়ের এক ডাকে চলে এসেছে। ফরিদের বাড়ির উল্টো পথে শাহানা নূরজাহানকে নিয়ে হাঁটতে থাকলে নূরজাহান বলল..

‘আম্মা আমরা কই যাচ্ছি? ফরিদ চাচার বাড়ি তো উল্টো পথে। আমরা ভুল পথে হাঁটছি।

‘বেশি কথা কইবি না। আমরা ভুল পথে না, ঠিক পথেই যাইতাছি। জলদি হাট।

নূরজাহান ভিজতে ভিজতে শাহানার দেখানো ষড়যন্ত্রের রাস্তায় হাঁটল। সৎ মায়ের প্রতি অগাধ ভালোবাসা আর বিশ্বাস আজ নূরজাহানের ধ্বংসের কারণ হয়ে দাঁড়াল। নূরজাহান সবসময় শাহানার একটুখানি ভালোবাসার চাইত, আর শাহানা চাইত সৎ মেয়ে নূরজাহানের থেকে মুক্তি। আর একটু পথ হাঁটলে শাহানা মুক্তির দেখা পাবে। সিকদার বাড়ির পূর্বের পাহাড়ি অঞ্চল। সেখানে আদিবাসীদের বসবাস আছে। বৃষ্টির রাতে গ্রামবাসীরা যার যার ঘরে। রাস্তাঘাট খালি। একটা কুকুর পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে না, সুনসান নীরবতা। দুই পাহাড়ের মাঝে সরু রাস্তাটা অন্ধকারে তলিয়ে। রাস্তার মোড়ে কয়েকজন পুরুষালি অবয়ব দেখা গেল কালো কাপড়ে মুখ বেঁধে রেইনকোট পরে দাঁড়িয়ে কারো অপেক্ষায়। নূরজাহান এতক্ষণ সাহসী থাকলেও লোকগুলো দেখে ভয়ে জড়সড় হয়ে শাহানাকে পেছন থেকে আঁকড়ে ধরে ফিসফিস করে বলল…

‘আম্মা আমরা কই যাচ্ছি? সামনে ডাকাত দলের মতো কতগুলো লোক দাঁড়িয়ে। আম্মা চলুন আমরা বাড়ি ফিরে যাই।

লোকগুলো বেশ দ্রুত পায়ে ঘিরে দাঁড়াল শাহানা ও নূরজাহানকে। যেন এতক্ষণ ওদের অপেক্ষাতেই এখানে দাঁড়িয়ে ছিল। নূরজাহান ভয়ে আঁতকে উঠে শাহানাকে জড়িয়ে ধরে চিৎকার করে বলতে লাগল

—’আম্মা চলেন পালাই, ওরা ডাকাত দল, আম্মা, আম্মা চলেন।

নূরজাহান জানে মা মমতাময়ী হয়; মা ছলনাময়ী ষড়যন্ত্রকারী হয় সেটা নূরজাহানের জানা ছিল না। নূরজাহান শাহানাকে জড়িয়ে নিয়ে পালাতে চাচ্ছে অথচ শাহানা ঠায় দাঁড়িয়ে। একটা পালোয়ান গঠনের লোক তৎক্ষণাৎ নূরজাহানের হাত টানতে শুরু করলে নূরজাহান চিৎকার করল…

‘এই, কে আপনারা? কী চান? ছাড়েন আমাকে। যেতে দিন আমাদের। ছাড়েন। আম্মা, আম্মা আমাকে বাঁচান! আম্মা!

আজ মনে হয় শাহানা বয়রা, কানে শুনতে পায় না। নূরজাহানের চিৎকার শাহানা শুনতে পাচ্ছে না। মোটা লোকটা মুহূর্তে নূরজাহানকে পেছন থেকে জাপটে জড়িয়ে নূরজাহানের মুখ চেপে ধরল। নূরজাহান লাফাচ্ছে ছাড়া পাওয়ার জন্য ছটফট করছে। শাহানা নিষ্ক্রিয় চোখে নূরজাহানের ছটফটানি দেখে বলল…

‘আমার কাম শেষ। আমি যাই। এই আপদ যেন আমার বাইত্তে আর না যাই। নিজের লগেই রাখিস।

সাত-আটজন লোকের মধ্যে একটা লোকও শাহানার কথার উত্তর দিল না। কালো কাপড়ে মুখ বাঁধা সবার। নূরজাহান বুঝে গেল লোকগুলোর হাতে তুলে দেওয়ার জন্যই শাহানা সকলের অনুপস্থিতিতে নূরজাহানকে পেছনের দরজা দিয়ে ডেকে নিয়ে এসেছে। নূরজাহান হঠাৎ লোকটার হাতে কামড় দিয়ে নিজেকে ছাড়িয়ে দৌড়ে এসে শাহানাকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে চিৎকার করে বলল…

‘আম্মা! ওহ আম্মা! আপনার পায়ে পরি দয়া করে আপনি আমার সর্বনাশ করবেন না। আপনি আমার আম্মা লাগেন। দরকার হইলে আমাকে আপনি মেরে ফেলেন, তারপরও কোনো পুরুষের হাতে কলঙ্কিত হতে দিয়েন না আম্মা। আমার প্রতি এতো নির্দয় হয়েন না আপনি। আপনাকে আমি ভিষণ ভালোবাসি আম্মা।

শাহানা শুনল, কিন্তু ঠায় দাঁড়িয়ে রইল। লোকগুলো নূরজাহানকে টেনেহিঁচড়ে শাহানার থেকে ছাড়িয়ে নিল। নূরজাহানের চিৎকার, হাহাকার শাহানা শুনল না। কেমন শক্ত ভঙ্গিতে বাড়ির পথে হেঁটে চলে এল। লোকগুলো নূরজাহানকে অজ্ঞান করে কোথায় নিয়ে গেল শাহানাও জানে না। মানিকের সঙ্গে শাহানার চুক্তি হয়েছে। শাহানা মানিকের হাতে নূরজাহানকে তুলে দেবে আজ রাত আটটায়। কথা অনুযায়ী শাহানা নূরজাহানকে নিয়ে ঠিক রাত আটটায় বেরুল এবং লোকেশন অনুযায়ী মানিকের বলা জায়গায় নূরজাহানকে তুলে দিয়ে বাড়ি ফিরছিল। মানিকের জিপের সঙ্গে শাহানার পথেই দেখা। মানিক শাহানাকে রাত আটটার সময় নূরজাহানকে নিয়ে আসার কথা বললেও মানিক সঠিক সময়ে উপস্থিত থাকতে পারেনি হঠাৎ ঝামেলায় পড়ে যাওয়ায়। মানিক আটটা বিশে শাহানাকে বলা লোকেশন অনুযায়ী নিজের ছেলেপেলে নিয়ে যাওয়ার পথে শাহানার সঙ্গে দেখা হলো। জিপের হেডলাইটের আলোয় শাহানার মুখটা স্পষ্ট হতে মানিক গাড়িটা থামিয়ে উৎসুক হয়ে জিপ থেকে নেমে বলল…

‘ আসসালামু আলাইকুম শাশুড়ি আম্মা, আমার নূরজাহান কই?

‘তোমার লোকদের কাছে দিয়া আইছি নূরজাহানরে।

মানিক ভারি আশ্চর্য গলায় শাহানাকে বলল…

‘ আমার লোকের কাছে দিয়া আইছেন মানে? কী কন এইগুলা শাশুড়ী? আমিই তো মাত্র এহোন আইলাম। এই বুড়ি, তুই কার কাছে আমার নূরজাহানরে দিয়া আইছস হাছা কইরা ক, নইলে তোরে আমি জানে মাইরা ফালামু কিন্তু!

মানিক কথাটা বলে তেড়েফুঁড়ে গেল শাহানার দিকে। শাহানা বিরক্তির ভঙ্গিতে বলল।

‘ঝামেলা কইরো না মানিক, আমি তোমার কথা মতো নূরজাহানরে দিয়া আইছি কিছু লোকের কাছে। এহোন আমারে জ্বালাইয়ো না। তোমার লোকগুলো নূরজাহানরে লইয়া ঐ পাহাড়ের পথের দিকে গেছে। তুমি ঐদিকেই যাও পাইবা লোকগুলোরে। আমারে আর বিরক্ত কইরো না। আমার কাম শেষ।

শাহানার কথায় মানিক পাগল হওয়ার মতন হয়ে গেল। শখের নূরজাহান যে অন্য কারো হাতে পড়েছে সেটা বুঝতে পেরে মানিক গর্জে চিৎকার করল। চট করে শাহানার গলা চেপে হিংস্র বাঘের ন্যায় বলল…

‘এই শালীর বুড়ি! আমার নূরজাহানের যদি কিচ্ছু হয় তাইলে তোরে আমি জানে মাইরা ফালামুরে, জানে খাইয়া ফালামু। তোর বংশ আমি নির্বংশ কইরা দিমু বুড়ি!

শাহানার হাতের ছাতা রাস্তায় পড়ে যায়। শাহানা ছাড়া পাওয়ার জন্য ছটফট করতে থাকলে বেলাল জিপ থেকে চিৎকার করে বলে…

‘ভাইজান, এহোন মাথা গরম না কইরা জলদি আয়েন আগে ভাবিরে খুঁজি। সময় বেশি হয় নাই লোকগুলো ভাবিরে লইয়া গেছে। ভাবিরে বাঁচাইতে হইব।

মানিক বেলালের কথায় শাহানাকে ধাক্কা মেরে দূরে সরিয়ে দিয়ে দৌড়ে গিয়ে জিপে উঠে বসল। গাড়ি টান দিতে দিতে মানিক আঙুল তুলে শাহানাকে শেষবার শাসিয়ে বলল…

‘শালীর বুড়ি, আমারে খালি নূরজাহানরে লইয়া আইতে দে। তোর কবর আমিই দিমু!

মানিকের জিপ চলে গেল নূরজাহানকে নিয়ে যাওয়া পথে। শাহানা কাঠ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল কিছুক্ষণ। তারপর কাদা মাটির রাস্তা থেকে ছাতাটা নিয়ে বেশ স্বাভাবিক ভাবে বাড়ির পথে হাঁটল, যেন কিছুই হয়নি—সবকিছু শান্ত স্বাভাবিক। বাড়িতে শাহানা সামনের দরজা দিয়ে না ঢুকে কলপাড় হয়ে পুকুরঘাটে গেল পায়ের কাদা পরিষ্কার করতে। হঠাৎ পেছন থেকে আশনূর বলল…

‘নূরজাহান কই আম্মা?

আশনূরের গলায় শাহানা ভেতরে ভেতরে ভয় পেলেও মুখের ভঙ্গিমা বেশ বিরক্ত। তিক্ত গলায় বলল…

‘নূরজাহান কই আমি কেমনে কমু? আমি কি কাউরে কোলে লইয়া ঘুরি যে জানমু কই আছে?

শাহানার পেছনে নূরজাহানকে বাড়ি থেকে বেরোতে জানালা দিয়ে দেখেছে আশনূর। আশনূর একবার শাহানাকে পেছন থেকে ডেকে জিজ্ঞেস করতে চেয়েছিল ওরা কই যাচ্ছে, কিন্তু ততক্ষণে শাহানা নূরজাহানকে নিয়ে সিকদার বাড়ির গেট পেরিয়ে যাওয়ায় আশনূর ডাকার সুযোগ পায়নি। নূরজাহানের বাড়ির বাইরে যাওয়া নিষেধ হওয়ার পরও শাহানা নূরজাহানকে নিয়ে বাইরে গিয়েছে, আবার নূরজাহানকে ছাড়া বাড়িতেও ফিরেছে একা। এতো রাতে বৃষ্টির মধ্যে নূরজাহান যাবে কই? শাহানা তো নূরজাহানকে পছন্দ করে না, তারপরও নূরজাহানকে নিয়ে এতো রাতে কোথায় গিয়েছিল শাহানা? শাহানার অস্বীকারে আশনূর সন্দিহান গলায় বলল…

‘আম্মা আমি তোমারে দেখছি নূরজাহানরে লইয়া বাড়ি থেইক্কা বাইর হইতে। এহোন নূরজাহান কই কও?

শাহানা বেশ কর্কশ গলায় বলল…

‘কতগুলা জাত শত্রু পেটে ধরছি আমি। যাহ ঘরে যা তুই। মাইনষের মাইয়া লাইগা তোর এতো পরান পোড়ে ক্যান?

‘নূরজাহানের লগে আমার রক্তের সম্পর্ক আছে আম্মা, এর লাইগা পরান পোড়ে। তুমি হাছা কইরা কও আম্মা নূরজাহান কই? নইলে আমি কিন্তু চিল্লাইয়া সবারে কমু তুমি নূরজাহানরে কই জানি রাইখা আইছো!

অতিরিক্ত রাগে শাহানা আশনূরকে একটা চড় মেরে বলল…

‘একটা নষ্টা পেটে ধরছি আমি। তুই চিল্লাইলে আমার কী হইব? আমি কি কাউরে ডরাই? মাগি ছেড়ি ভাইগা গেছে চেয়ারম্যানের পোলা মানিকের লগে। দেখ গিয়া এতক্ষণ…

‘আম্মা!

আশনূর চিৎকার করে উঠল। চোখ টলমল করছে অশ্রুতে। আশনূর অন্ধকারের মাঝে মায়ের দিকে রাগে, ক্ষোভে, ঘৃণিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল…

‘আমার দেখা সবচেয়ে নিকৃষ্ট মা তুমি। শুধুমাত্র নিজের জেদের জন্য নূরজাহানকে তুমি এতো বড় বিপদে ফেললেন। আজ থেকে তুমি আমার জন্য মৃত। এই জীবনে কোনোদিন তোমাকে মা বলে ডাকব না। তোমার সাথে আমার সকল সম্পর্ক শেষ!

আশনূর আর দাঁড়াল না। দৌড়ে ঘরে গেল, ঐ অবস্থায় রামদা আর অপর হাতে হাসানের ফেলে যাওয়া বাটন ফোনটি নিয়ে বৃষ্টির মাঝে বেরোতে শাহানা আঁতকে উঠল। দৌড়ে আশনূরের পথ শাহানা আটকাতে চাইলে, আশনূর মুহূর্তে রামদাটি নিজের গলায় চেপে ধরে হিংস্র বাঘের ন্যায় ক্ষ্যাপা ভঙ্গিতে বলল…

‘আজ আমার পথ আটকাইও না আম্মা। তাহলে এখানে একটা লাশ পড়ে যাবে। আজ যদি নূরজাহানকে সহিসালামতে না ফিরাতে পারি, তাহলে আজ আমার লাশও পড়বে। তোমার পাপের শোধ আমি আমার রক্তের বিনিময়ে করব!

শাহানা ঠায় দাঁড়িয়ে রইল। হাত-পা কাঁপছে আশনূরকে রামদা হাতে একা বেরিয়ে যেতে দেখে। আশনূর সিকদার বাড়ির গেট পেরিয়ে যেতেই শাহানা নিজের মেয়ের জন্য হাউমাউ করে চিৎকার করে কাঁদতে লাগল। তারানূর, সাজিদ, নদী দৌড়ে ঘর থেকে বের হলো। কী হয়েছে বারবার শাহানাকে প্রশ্ন করতে থাকলেও শাহানা মুখ খুলল না বরং কেঁদেই যাচ্ছে। এতো বুঝিয়েও লাভ হলো না বারবার কাঁদছে। তারানূর বেশ কয়েকবার নূরজাহান ও আশনূরকে ডেকেও যখন সাড়াশব্দ পেল না, তখন তারানূর মনে করল বৃষ্টির মাঝে হয়তো দুবোন ঘুমিয়ে পড়েছে। অথচ শাহানার ষড়যন্ত্রে নূরজাহানের পাশাপাশি আশনূরের জীবনটাও রিস্কে পড়ে গেল, আর সেই খবর কেউ পেল না। মাজিদ, হাসান হাসপাতালের প্রজেক্টে; মারিদ চলে যাচ্ছে। কে বাঁচাবে নূরজাহানকে? মানিক সঠিক সময়ে নূরজাহানের কাছে পৌঁছাবে কি না তাও জানা নেই। আজ ভাগ্য নয়, নিজের আপনজনের ষড়যন্ত্রের শিকার নূরজাহান।

চলিত…

ডাকপ্রিয়র_চিঠি

লেখিকাঃরিক্তাইসলাম মায়া

২৬
পহেলা মার্চ ২০১৫
সময় ১:৪৫। গায়ে সবুজ সাদা স্কুল ড্রেস পরে সুখ ঢাকা মেডিকেল কলেজের পার্কিং জোনে দাঁড়িয়ে। হাতে পরীক্ষার ফাইলটা বগলের নিচে চেপে ঠোঙা থেকে ঝালমুড়ি মুখে তুলে চিবোচ্ছে আর চঞ্চল চোখ দুটো এদিক-সেদিক ঘোরাচ্ছে। হাতে আরও কিছু খাবার আছে, তবে সেটা গাড়ির হুডের উপর রাখা। সুখ রিফাতের গাড়িতে পিঠ ঘেঁষে ঝালমুড়ি চিবোচ্ছে। অসময়ে সুখকে ঢাকা মেডিকেল কলেজে নিয়ে এসেছে রিফাত। আজ সুখের একটা গ্রুপের পরীক্ষা ছিল। সুখ সায়েন্সের স্টুডেন্ট। পড়াশোনাও ভালো, তবে বেশ দুষ্টু। মারিদ, রাদিল কেউ ঢাকা না থাকায় সুখকে পরীক্ষার হল থেকে রিফাতই নিয়ে আসে। যাওয়ার সময় সুখের বাবা নিয়ে যায় আর ফেরার সময় রিফাত নিয়ে আসে। হঠাৎ কলেজে কাজ থাকায় সুখকে সঙ্গে নিয়েই কলেজে এসেছে রিফাত। পার্কিং এরিয়ায় সুখকে চিপস, আইসক্রিম, চকলেট, ঝালমুড়ি হাবিজাবি কিনে দিয়ে সে কলেজের ভেতরে গিয়েছে, গোটা বিশ মিনিট পেরুতে চলল। এতে সুখের বিরক্তি নেই। সুখ এর আগেও বহুবার এসেছে এই ঢাকা মেডিকেল কলেজের চত্বরে। এখানকার বেশ কিছু স্টুডেন্ট সুখকে রিফাতের বোন আর রাদিলের আত্মীয় বলে চেনে। রিফাত ঢাকা মেডিকেলে শিক্ষকতা করছে প্রায় দুবছর হতে চলল। রাদিল সাত-আট মাস হবে। সুখ রিফাতের সঙ্গে এসেছে কয়েকবার। রাদিল কখনো সুখকে নিয়ে কলেজে আসেনি, সেজন্য স্টুডেন্টরা যারা সুখকে চেনে তারা সবাই রিফাতের বোন হিসেবেই সুখকে চেনে।

সুখ চঞ্চল। লম্বা বেশ একটা না হলেও দেখতে সাদা কাগজের মতন ফর্সা। গোলগাল শরীর, চোখ দুটো সবচেয়ে আকর্ষণীয়। ধূসর রঙের চোখ, যেমনটা মারিদেরও রয়েছে। ভাই-বোন দুজনেরই ধূসর রঙের চোখ—এটা তারা নানির থেকে পেয়েছে। ক্যাম্পাস থেকে বেরোতে দূর থেকে সুখকে রিফাতের গাড়ির সঙ্গে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে তনিমা মাহিকে নিয়ে দৌড়ে এল। বেশ কয়েক দিন ধরে তনিমা রিফাতের পার্সোনাল নাম্বারটা জোগাড় করতে চাচ্ছে কথা বলার জন্য, কিন্তু সুযোগ পাচ্ছে না। আজ সুখকে দেখে তনিমা তাড়াহুড়োয় ক্লাস থেকে ছুটে এসেছে কথা বলতে। তনিমা সুখকে চেনে। এর আগেও বেশ কয়েকবার রিফাতের সঙ্গে দেখেছে। রিফাত বলেছিল সুখ তার বোন, কিন্তু কী রকম বোন হয় সেসব খোলাসা করে বলেনি কখনো। তনিমা ধরে নিল সুখ রিফাতের আপন বোন হয়। কথায় কথায় সুখের কাছ থেকে রিফাতের নাম্বার চেয়ে নেবে কোনো এক বাহানায়। তনিমা তাড়াহুড়ো করে দৌড়ে সুখের সামনে দাঁড়াতে হাঁপাতে লাগল। বড় বড় নিশ্বাসে সুখকে বলল…

‘হাই কিউটি!

গায়ে স্কুল ড্রেস। গলায় স্কার্ফটা ঝুলছে। লম্বা চুলগুলো দুটো বেণি করে দুপাশে ফেলা। হঠাৎ আসা দুটো মেয়েকে সুখ দেখে মুড়ি চিবোতে চিবোতে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল…

‘ আপনারা আমাকে চেনেন?

তনিমা সোজা হয়ে দাঁড়াল। কাঁধে ব্যাগটা টেনে বলল…

‘তুমি আমাদের রিফাত স্যারের বোন না?

‘ জি।

‘তাহলে সেইভাবেই আমরা তোমাকে চিনি। বেশ কয়েকবার দেখেছিলাম রিফাত স্যারের সঙ্গে এই কলেজে আসতে। তাই ভাবলাম আজ তোমার সাথে পরিচিত হয়ে নেয়। আমি তনিমা, আর ওহ আমার বান্ধবী মাহি। তোমার নাম কী কিউটি?

চঞ্চল সুখ বেশ ঝটপট উত্তর দিয়ে বলল…

‘আমি রিদিতা সৈয়দ সুখ। ডাক নাম পাখি।

তনিমা অবাক গলায় বলল…

‘ আল্লাহ! এতগুলা নাম তোমার?

তনিমাকে অবাক হতে দেখে সুখ চঞ্চল ভঙ্গিতে হেঁসে মাথা নাড়িয়ে বলল..

‘ আসলে আমাদের একান্নবর্তী পরিবার তো? তাই যার যেটা মন চেয়েছে আমাকে একটা করে নাম উপহার দিয়েছে।

‘ যায় বলো, তোমার সুখ নামটা কিন্তু খুব সুন্দর এবং ইউনিক। নামের সাথে সাথে তুমি দেখতেও খুব সুন্দর কিউটি।

তনিমার কথায় বেশ উৎসাহ পেল সুখ…

‘সবাই তাই বলে আমি সুন্দর। তবে তুমি ক্রাশ খেয়েছ আপু?

সুখের কথায় বেশ অবাক হলো তনিমা ও মাহি। তনিমা বলল…

‘আমার ক্রাশ খেতে হবে?

‘বারে! তুমি আমার প্রশংসা করছ আর ক্রাশ খাবে না বুঝি? তুমি ক্রাশ না খেলে আমি তোমাকে আমার ভাইয়ের নাম্বার কেন দেব? আগে ক্রাশ খাও তারপর নাম্বার চাও।

তনিমা ও মাহি দুজন চমকে একে অপরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করল। তনিমা ও মাহি যে সুখের কাছে সুখের ভাইয়ের নাম্বার চাইতে এসেছে, সেটা সুখ জানল কীভাবে? তনিমা কিছু বলবে তার আগেই মাহি ভারি গলায় বলল…

‘তুমি কীভাবে জানলে কিউটি?

তনিমা ও মাহি অপরিচিত হওয়ায় তারা সুখের ভণ্ডামির লেভেল জানে না। সুখ বেশ অভিজ্ঞের মতো করে মুখে ঝালমুড়ি পুরে চিবোতে চিবোতে বলল…

‘আপনারা দুজনই দৌড়ে আসার সময় একজন আরেকজনকে জোরে বলছিলেন রিফাত স্যারের বোন থেকে তার ভাইয়ের নাম্বার নিয়ে নেব কোনো একটা বাহানা বানিয়ে। আমি ভাবলাম বাহানা কেন বানাবেন? এর থেকে বরং আমাকে কিছু ঘুষ দেন পটে যায় , একটা নারকেল পানি খাওয়ান, আমি নাম্বার দিয়ে দিচ্ছি। আসলে রিফাত ভাই আমাকে খাবার কিনে দিয়ে গেছে কিন্তু পানি দিয়ে যায়নি। আমার ঝাল লেগেছে, হাতে টাকাও নেই। তাই ঘুষ চাচ্ছি। ভবিষ্যৎ ভাবি হলে দ্বিগুণ চার্জ লাগবে, এখন অল্পতে পোষাবে!

তনিমা ও মাহি দুজনই হতবাক, বাকরুদ্ধ হয়ে একে অপরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করছে। সুখ সোজা তনিমাকে ভাবি ডাকছে। তার মানে সুখ বুঝতে পারছে তনিমা কোনো ইনটেনশনে সুখের কাছে রিফাতের নাম্বার চাইতে এসেছে। তনিমা হাঁসফাঁস করল। মেয়ে হয়েও লজ্জা পাচ্ছে সুখ হঠাৎ ভাবি ডাকায়। মনে অদ্ভুত মিশ্রণের অনুভূতি হচ্ছে। তনিমা কথা না বাড়িয়ে ব্যাগ থেকে একশো টাকা বের করে মাহিকে দিয়ে বলল…

‘একটা নারকেল পানি নিয়ে আয় দ্রুত। যাহ।

মাহি টাকা নিয়ে চলে গেল। এর ফাঁকে রিফাতকে দেখা গেল ক্যাম্পাস হতে বেরিয়ে এদিকটায় আসতে। রিফাতকে দেখে তনিমা ভয় পেয়ে তাড়াহুড়ো করল। রিফাত সামনে থাকলে সে সুখের থেকে রিফাতের নাম্বারটা নিতে পারবে না। তনিমা দ্রুত সুখকে তাড়া দিয়ে বলল…

‘তোমার ভাইয়ের নাম্বারটা দাও সুখ।

সুখ কথা না বাড়িয়ে পটপট করে তনিমাকে মারিদের নাম্বারটা দিয়ে দিল। কারণ সুখের ভাই মারিদ, রিফাত নয়—রিফাত সুখের ফুফাতো ভাই হয়। তনিমা ক্লিয়ার করে বলেনি তার কার নাম্বার চাই। তাই সুখের ভাই হিসেবে মারিদের নাম্বার সুখ তনিমাকে দিয়ে দিল। রিফাত তনিমার স্যার হয়, সেই সুবাদে তনিমার কাছে রিফাতের নাম্বার থাকাটা স্বাভাবিক। যদি সুখের কাছে তনিমা রিফাতের নাম্বার চাইত, তাহলে তনিমা অবশ্যই বলত—’রিফাত স্যারের নাম্বারটা দাও সুখ’। তনিমা বলেছে ‘তোমার ভাইয়ের নাম্বারটা দাও সুখ’, সুখের ভাই বলতে মারিদকে বুঝে সুখ, সেজন্য সুখ মারিদের নাম্বার তনিমাকে দিয়ে দিল। তনিমা দ্রুত হাতে নাম্বারটা বইয়ের একটা পৃষ্ঠায় লিখে বইটা বন্ধ করে সুখকে ধন্যবাদ দিয়ে বলল….

‘অসংখ্য ধন্যবাদ কিউটিপাই। আমি তোমার থেকে নাম্বার নিয়েছি এটা প্লিজ রিফাত স্যারকে বোলো না, কেমন?

‘আচ্ছা।

এর মাঝে মাহি নারকেল পানি নিয়ে এল। তনিমা মাহির থেকে নারকেল পানি নিয়ে সুখকে দিয়ে বলল…

‘আমাদের আবার দেখা হবে কিউটিপাই। আজ আসি।

সুখ তনিমার থেকে ডাব নিয়ে বলল…

‘ওকে ভাবি।

তনিমা ফের লজ্জায় মিইয়ে গেল। রিফাতকে কাছাকাছি আসতে দেখে কিছু বলতে পারল না, শুধু মাহিকে নিয়ে দৌড়ে পালিয়ে গেল। রিফাত দেখেছে তনিমার কাছ থেকে সুখ নারকেল পানি নিতে। রিফাত কাছাকাছি এসে বলল…

‘ওরা তোকে নারকেল পানি দিল কেন?

‘আমার ঝাল লেগেছে তাই দিয়েছে উনারা। তুমি তো আর আমাকে পানি কিনে দিয়ে যাওনি তাই না।

‘আমি পানি কিনে দিয়ে যাইনি বলে তুই মানুষের থেকে চেয়ে খাবি? তোর কাছে টাকা ছিল না কিনে খেতি?

সুখ মুখ বাকিয়ে বলল..

‘তুমি আমাকে এখানে নিয়ে এসেছ, আমি এখন তোমার দায়িত্ব। তাহলে আমি কেন নিজের টাকা খরচ করে কিছু খাব? তুমি পানি খাওয়াতে না পারলে তোমার স্টুডেন্ট খাওয়াবে, একই তো কথা। তাছাড়া আমি মাগনা কিছু খাইনি। তোমার একটা কিডনি আপুদের কাছে বন্ধক রেখে এই নারকেল পানিটা নিয়েছি। কাল আপুদের টাকা দিয়ে নিজের কিডনি ছাড়িয়ে নিয়ো তাহলেই হবে।

সুখ গাড়ির দরজা টানল হাতে নারকেল পানি নিয়ে। রিফাত ভারি আশ্চর্য গলায় বলল…

‘তুই আমার কিডনি বন্ধক রেখেছিস তোর সামান্য নারকেল পানির জন্য?

‘হ্যাঁ। তো কী, তোমার জন্য আমার টাকা খরচ করব নাকি আজব।

‘ভণ্ডর বাচ্চা ভণ্ড, দাঁড়া তুই!
~~
হঠাৎ করে আকাশে রঙ বদলেছে। সকাল থেকেই থানচির আকাশ মেঘলা। অসময়ে গুঁড়িগুঁড়ি বৃষ্টির আগমন। থেকে থেকে আকাশে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। মারিদ, রাদিল, হাসিব সন্ধ্যায় ঢাকা ফিরে যাবে। মারিদের জন্য নতুন গাড়ি আর ড্রাইভার এসেছে ঢাকা থেকে। বৃষ্টি হওয়ায় আজ হাসপাতালে কাজ বন্ধ, তবে প্রজেক্টের কাজের যা যা প্রয়োজন সেসব মারিদ তদারকি করছে। সঙ্গে হাসান, মাজিদ, সাজিদও আছে। আজ রাদিল বাড়ি থেকে বেরোয়নি, রাদিলের গায়ে জ্বর। সে ঘরে শুয়ে। হাসিব গিয়েছে মারিদের সঙ্গে।

অবেলায় আলেহা আজ শ্বশুরবাড়ি চলে যাচ্ছে। আলেহার শ্বশুর-শাশুড়ি না থাকায় আলেহা একাই জীবনযাপন করছে নিজ বাড়িতে। সঙ্গে একটা কাজের মেয়ে থাকে, ফুলি। ফুলি আজ সকালে ফোন করেছে—আলেহার ফসলের ক্ষেত কে যেন নষ্ট করে দিয়েছে, আলেহা যেন জলদি বাড়িতে ফিরে। খবর পেয়ে তাড়াহুড়ো করে আলেহা গায়ে বোরকা জড়াল। রশিদকে ফোন করে অটোরিকশাটা ডাকাল। রশিদের অটোরিকশা সিকদার বাড়ির উঠোনে দাঁড়ানো। আলেহাকে নূরজাহান জড়িয়ে কাঁদছে। বাকিরা সবাই আলেহাকে ঘিরে দাঁড়িয়ে বিদায় জানাতে। শাহানা থেকে আলেহা ভিতর ঘর হতে বিদায় নিয়ে এসেছে। তারানূর বারবার শাড়ির আঁচলে চোখ মুছছে। আশনূর, নদী বারান্দায় দাঁড়িয়ে। আলেহা নূরজাহানের মাথায় হাত রেখে বলল…

‘কাঁদিস না। ফুপি আবার আসব। তখন অনেক দিন থাকব তোদের সাথে, কেমন? এখন শান্ত হ।

নূরজাহান মাথা নাড়িয়ে সম্মতি দিল। আলেহা এক হাতে নূরজাহানকে জড়িয়ে পেছনে তাকাতে আশনূরকে পাশে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখল। আলেহা অপর হাত বাড়িয়ে আশনূরকে ডেকে বলল…

‘কাছে আয় আশনূর।

আশনূর কাছে এল। আলেহা অপর হাতে আশনূরকে বুকে জড়িয়ে বলল…

‘নূরজাহান তোর ছোট বোন হয় আশনূর। তোর আম্মা নূরজাহানকে কষ্ট দিলেও তুই নূরজাহানকে কখনো কষ্ট দিস না আশনূর। নূরজাহানকে তোর হেফাজতে রেখে যাচ্ছি। খেয়াল রাখিস ছোট বোনের।

আশনূর মাথা নাড়িয়ে সম্মতি দিয়ে বলল…

‘আচ্ছা খেয়াল রাখব। কিন্তু তুমি আরও কটা দিন থেকে যাও না ফুপি।

‘থাকতে পারলে অবশ্যই থাকতাম। তোদের ছাড়া আমারও মন টিকবে না ঐ বাড়িতে। মন ছটফট করবে ভিষণ।

‘তাহলে চিরকালের জন্য আমাদের সঙ্গে থেকে যাও না ফুপি? তুমি একা মানুষ ঐ বাড়িতে থেকে কী করবে?

‘আমি একা মানুষ হয়েছি তো কী হয়েছে? মেয়ে মানুষের স্বামীর ঘরই শেষ ঠিকানা হয়। নারী নিজের শেষ ঠিকানা ছেড়ে থাকতে পারে না। যখন তোর বিয়ে দেব, তখন তুইও বুঝবি—বাপের বাড়ির সুখের চেয়ে স্বামীর ঘরে একা জীবনও অনেক শান্তির হয়।

আশনূর কথা বাড়াল না। তারানূর মেয়ের জন্য কাঁদছে। আলেহা আশনূর ও নূরজাহানকে ছেড়ে তারানূরকে জড়িয়ে ধরে কপালে চুমু খেয়ে বলল…

‘বাচ্চাদের মতো করে কাঁদার স্বভাব তোমার আর যাবে না আম্মা। আমার বিয়ে হয়েছে ত্রিশ বছর হলো, তারপরও তোমার আমাকে শ্বশুরবাড়িতে পাঠাতে কাঁদতে হয় কেন আম্মা?

‘তুই তো মাইয়া জম্মা দেস নাই। হের লাইগা আমার বেদন তুই বুঝবি না আলেহা। একটা মাইয়া জম্ম দিয়া হেরে শ্বশুর বাইত্তে পাঠাইতি তাইলে বুঝতি মাগো বেদন কেমন।

আলেহা চুপ থেকে তারানূরকে কাঁদতে দিল। ঝিরঝিরে বৃষ্টির মধ্যে গিয়ে বসল অটোরিকশাতে। সকলে বারান্দায় দাঁড়িয়ে। আলেহা বারবার নূরজাহানের দিকে তাকাচ্ছে। আলেহার মনটা ভীষণ অস্থির, চঞ্চল হচ্ছে নূরজাহানের চিন্তায়। মনটা কেমন কু ডাকছে অজানা ভয়ে। আলেহা গাড়িতে বসে ফের নূরজাহানকে কাছে ডাকল। নূরজাহান মাথায় ওড়না দিয়ে গাড়ির সামনে দাঁড়াতে আলেহা দুহাতে নূরজাহানের গাল চেপে কপালে চুমু খেয়ে বলল…

‘আমার মনটা কেমন জানি কু ডাকছে নূরজাহান। তোর জন্য ভিষণ ভয় লাগছে। মনে হচ্ছে বড় কোনো বিপদ হবে কারো। আল্লাহ জানে কার কী হয়। তুই সাবধানে থাকিস। কোনো কিছু হলে আমাকে ফোন করবি মনে থাকবে?

‘ জি।

আলেহা চলে গেল। নূরজাহান বৃষ্টি-বাদলের মধ্যে আরও কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে আলেহার গাড়িটা দেখল, যতক্ষণ দেখা যায় ততক্ষণ। আলেহা চলে যেতে সকলে যার যার ঘরে গেল। নূরজাহান নিজের ঘরে গিয়ে বসল। মন ছটফট নূরজাহানেরও করছে। অদ্ভুত অস্থিরতায় ভেতরটা ছটফট করছে, সেটা আলেহাকে বলতে পারেনি। মাগরিবের আজান পড়ছে। অসময়ে বৃষ্টির আগমনে চারদিকটা বেশ অন্ধকারে ছেয়ে গেছে। গ্রামে বিদ্যুতের অভাব বেশিভাগ সময়ই দেখা যায়, একটু বৃষ্টি বাদল হলেই কারেন্ট থাকে না। আজও কারেন্ট নেই। ঘরে ঘরে হারিকেন আর কুফিতে আগুন জ্বালানো হয়েছে। তারানূর, নূরজাহান নামাজে বসেছে। নূরজাহান নিজের ঘরে নামাজ পড়ছে, তারানূর বসার ঘরে। মারিদের গাড়ি গেটের বাইরে দাঁড়িয়ে, একটু পর মারিদরা চলে যাবে। শাহানা মারিদের জন্য নাস্তা তৈরি করছে। এই কয়েক দিনে নূরজাহানের কাটা পা-টাও অল্প শুকিয়ে এসেছে, তবে ক্ষত বড় হওয়ায় পুরোপুরি সেরে ওঠেনি। আরও সময় লাগবে।
মারিদরা সন্ধ্যা ছয়টার নাগাদ সবার থেকে বিদায় নিয়ে গাড়িতে উঠে বসেছে। মারিদ বেশ কয়েকবার এদিক-সেদিক তাকিয়ে মনের অজান্তে নূরজাহানের খোঁজ করেছে, কিন্তু বিদায়বেলায় নূরজাহানের দেখা পায়নি সে কোথাও। মারিদ এবার চলে যাচ্ছে, তবে আবার কবে ফিরবে তার ঠিক নেই। হয়তো মাস লাগতে পারে আবার তারও বেশি সময় লাগবে। ঝরঝর বৃষ্টিতে মারিদ গম্ভীর ম্লান মুখে জানালার কাঁচ ঘেঁষে অন্ধকারাচ্ছন্ন আকাশে তাকাল। সামনের মিররে দুটো ওয়াইপার বিরতিহীন কাঁচে ওঠানামা করছে বৃষ্টির পানি পরিষ্কার করতে। মারিদ, রাদিল পেছনে বসা। হাসিব ড্রাইভারের সামনে বসেছে। পরিবেশ শান্ত। রাদিল খানিকটা অসুস্থ, গায়ে জ্বর থাকায় সে সিটে হেলান দিয়ে ঘুমাচ্ছে। লম্বা জার্নি করতে হবে। গাড়ি করে থানচি থেকে ঢাকা পৌঁছাতে দশ-বারো ঘণ্টা সময় লাগবে। থানচি সদর পেরিয়ে সবে চট্টগ্রাম মহাসড়কে উঠেছে মারিদের গাড়ি।

সময় ৮:০৫। গাড়িতে বসা ওদের দুই ঘণ্টা পেরিয়ে গেল অতঃপর, তারপরও মারিদ সেই আগের ন্যায় গম্ভীর অবিচল ভঙ্গিতে বসে। নড়াচড়া, কথাবার্তা কিছুই বলছে না। হঠাৎ নীরবতা ভেঙে মারিদের ফোন বাজে। অপরিচিত নাম্বার দেখে মারিদ রিসিভ করল না। অশান্ত মনে কিছু ভালো লাগছে না। মনে হচ্ছে অপরিচিতাকে ভীষণ মিস করছে। একবার, দুইবার, তিনবার পরপর যখন কয়েকবার একই নাম্বার থেকে কল এল, মারিদ কপাল কুঁচকে ফোনের স্ক্রিনে নাম্বারটা দেখল। একদিন এমনভাবে অপরিচিতাও তাঁকে রং নাম্বার থেকে কল করেছিল। এই আননোন নাম্বারটা কি অপরিচিতা হয়ে যেতে পারে না? আজ কি প্রকৃতি তাঁর কথা শুনতে পারে না? মারিদ ফোন রিসিভ করে কানে তুলে গম্ভীর এবং লোহময় গলায় বলল…

‘আসসালামু আলাইকুম। কে বলছেন?

তনিমা বুক চেপে বসে। রিফাতের কণ্ঠস্বর ফোনে এতো ভারি আওয়াজ শোনাতে পারে সেটা তনিমার জানা ছিল না। এই ফোনের ব্যক্তির ভারি আওয়াজে তনিমার এক মুহূর্তে জন্য মনে হলো—এটাই ওর চিঠিওয়ালা। স্বপ্নে কল্পনায় কতশত বার তনিমা এই ভারি আওয়াজের চিঠিওয়ালাকেই কল্পনা করেছিল। আজ যেন তনিমার সকল স্বপ্ন, কল্পনা সত্যি হলো। তনিমার ধুকপুক বুকে হাত-পা ঠান্ডা শীতল হয়ে এল। কম্পিত স্বরে মারিদের সালামের উত্তর নিয়ে তনিমা বলল…

‘ ওয়ালাইকুম সালাম। আমি পত্রকন্যা। আপনার বসন্তের পাখি আমাক….

তনিমার শেষ বাক্য শেষ হওয়ার আগেই গর্জে চিৎকার করল মারিদ…

‘কী?

তনিমা চমকাল। ভয়ও পেল হঠাৎ ভয়ংকর চিৎকারের। রিফাত কেন চিৎকার করল তনিমা বুঝল না। তনিমা ফের ভয়ে ভয়ে বলল…

‘ আসলে এক বছর আগে আমরা ঢাকা মেডিকেল চত্বরে চিঠি আদান-প্রদান করেছিলাম প্রায় তিন থেকে চার মাসের মতন। আপনার কি আমাকে মনে আছে? আমি সেই পত্র কন্যা।

মারিদ নিস্তব্ধ, বাকরুদ্ধ, অতি শকড হয়ে বসে রইল। গত একটা বছর মারিদ যে অপরিচিতাকে খুঁজে পাওয়ার আশায় আসমান-জমিন এক করেছে, সেই অপরিচিতা আজ তার দুয়ারে নক করছে। বলছে সে তার বসন্তের পাখিকে চেনে কি না। তনিমা উত্তরের আশায় বসে। মারিদ থেকে উত্তর না পেলে তনিমা বুঝতে পারছে না সত্যি কি রিফাত স্যার তনিমার চিঠিওয়ালা কি না। তনিমার বুকের স্পন্দন দ্রুত বেগে লাফাচ্ছে। মারিদ আরেকটু সময় উত্তর দিতে দেরি করলে তনিমা নিজেই হার্ট অ্যাটাক করে বসবে উত্তর শোনার আগে। মারিদ ক্লান্ত এবং শ্বাসরুদ্ধকর কম্পিত গলায় স্বল্প আওয়াজে আওড়াল…

‘অপরিচিতা? আপনি অপরিচিতা?

চিঠিতে মারিদ তনিমাকে প্রায়শই ‘অপরিচিতা’, ‘বসন্তের পাখি’, ‘পত্রকন্যা’ এসব নামে সম্বোধন করত বলে তনিমা এই নামে পরিচিত। তনিমা তৎক্ষণাৎ সম্মতি দিয়ে বলল…

‘হ্যাঁ! আপনি আমাকে চিনেছেন?

ক্লান্ত এবং অবিশ্বাস্য গলায় মারিদ সিটে ধপ করে শরীর ছেড়ে দেয়। মারিদ ক্লান্ত গলায় বলল…

‘আপনি কোথায় হারিয়ে গিয়েছিলেন অপরিচিতা? আপনার বিরহে আমি পাগল হয়ে যাচ্ছি। আমাকে একটা কল করতে আপনার এতো সময় লাগল?

তনিমা ঝরঝর করে কেঁদে ফেলল অনাকাঙ্ক্ষিত কিছু শোনায় যাওয়ায়। কান্নার দারুণ খুব অল্পতেই তনিমার হেঁচকি উঠে যায়। মারিদ কেমন নিস্তব্ধ, নিষ্ক্রিয় ভঙ্গিতে তনিমার কান্নার শব্দ শুনছে। তনিমা বলল…

‘আপনি অনেক পাষাণ চিঠিওয়ালা। আমাকে কিছু না বলে কোথায় হারিয়ে গেলেন? আমার দেওয়া শেষ চিঠিটা অবধি আপনি নিতে আসেন নি। আপনি কেন কোনো কিছু না বলে হঠাৎ হারিয়ে গেলেন? আপনাকে আমি এই এক বছরে কতশতবার, কত হাজার বার খুঁজেছি। আপনি আমার সাথে কেন এমন করলেন? কেন হঠাৎ হারিয়ে গেলেন?

কয়েক সেকেন্ডের জন্য মারিদ অপরিচিতাকে খুঁজে পাওয়ার উত্তেজনায় খেয়াল করতে পারেনি ফোনের ওপাশের নারীটির গলার স্বর তার অপরিচিতার সঙ্গে মিল নেই। সম্পূর্ণ ভিন্ন দুটো কণ্ঠ। মারিদ চট করে বলল…

‘আপনার নাম কী অপরিচিতা?

তনিমা প্রথমে নিজের নাম বলতে দ্বিধা করল। কিন্তু তারপরও মিথ্যার আশ্রয় না নিয়ে কান্না মিশ্রিত গলায় বলল…

‘তনিমা শেখ। বাড়ি ঢাকা, গুলশান এক-এ।

মারিদ চমকাল। মারিদের বাড়ি গুলশান দুইয়ে। এতো কাছাকাছি থেকেও মারিদ কীভাবে অপরিচিতাকে খুঁজে পেল না? অপরিচিতার খোঁজে কত জেলা, কত মানুষ, কত তথ্যের পরে মারিদ থানচি হাসান সিকদারের বাড়িতে পৌঁছাল, অথচ আজ শুনতে পাচ্ছে অপরিচিতা ঢাকার বাসিন্দা? মারিদ এই তথ্যটা মিস করল কীভাবে?এমনটা তো হওয়ার কথা না। অস্থির অশান্ত মারিদ তৎক্ষণাৎ বলল…

‘আমি আপনার সাথে দেখা করতে চাই অপরিচিতা।

‘এখন নাকি?

‘রাত বারোটায় দেখা করতে পারবেন? বেশি সময় নেব না, একটু সময় হবে? আপনাকে দেখার তৃষ্ণার্তে আমার চোখ দুটো ব্যাকুল হয়ে আছে। এক পলক দেখব অপরিচিতা, আসবেন আপনি?

ঢাকার যান্ত্রিক শহর। দিন-রাত সমান। মানুষের যাতায়াতের ভিড় সবসময় লেগে থাকে রাস্তা জুড়ে। তনিমা বলল…

‘আমি তো এখন বাসায় নেই। ধানমন্ডি ফুফির বাসায় আছি।

‘আপনার লোকেশন দেন, আমি ওখানে আসব।

তনিমা লোকেশন দিতে মারিদ কল কেটে দিল। গাড়ি করে রাত বারোটার মধ্যে ঢাকা পৌঁছানো অসম্ভব। মারিদ হাসিবকে উদ্দেশ্য করে বলল…

‘হাসিব গাড়ি ঘোরা। চট্টগ্রাম এয়ারপোর্টে চল। রাত বারোটার মধ্যে ঢাকা পৌঁছাতে চাই আমি। কুইক!

রাদিল বাদে হাসিব ও ড্রাইভার দুজনই শুনেছে মারিদের ফোনকলের কথা। হাসিব ভারি অবাক হয়েছে মারিদকে অপরিচিতার সাথে কথা বলতে দেখে। হাসিব মারিদকে প্রশ্ন না করে সম্মতি দিয়ে বলল…

‘জি স্যার হয়ে যাবে।

ড্রাইভার চট্টগ্রামের এয়ারপোর্টের দিকে গাড়ি ঘোরাল। রাদিল পাশের সিটে ঘুমিয়ে। মারিদ অশান্ত বুকে সিটে গা এলিয়ে কপালে হাত ঠেকাল। দীর্ঘদিনের টানাপোড়েনের বুকটা হঠাৎ যেন শান্ত হতে চাইছে এবার। দীর্ঘ এই পথটা শেষ হবে কবে? মারিদ যখন অপেক্ষার প্রহর গুনছে, হঠাৎ মারিদের টনক নড়ল। বন্ধ চোখে পাতা খুলে হিসাব মেলাতে বসল—আজকের মেয়েটির কণ্ঠ কি অপরিচিতার কণ্ঠ ছিল? নাকি ভিন্ন কণ্ঠধারী কেউ ছিল। মেয়েটি বলেছিল মারিদের সঙ্গে তিন মাস চিঠি আদান-প্রদান করেছে কিন্তু মারিদ তো ছয়-সাত মাস অপরিচিতার সঙ্গে ফোনে কথাও বলেছিল, তাহলে মেয়েটি সেটা কেন উল্লেখ করল না? মারিদ কি আবার হিসেবে ভুল করছি কোথাও?
~~
রাত নয়টা। বৃষ্টির বেগ বেড়েছে মনে হয়। হাসান ও মাজিদ গিয়েছে এই অসময়ে হাসপাতালে প্রজেক্টের কাজে। কনস্ট্রাকশন সাইট থেকে একজন সিকিউরিটির কল এসেছে—কারা যেন হাসপাতালের মাল চুরি করার চেষ্টা করেছে। খবরটা পেয়েই হাসান মাজিদকে নিয়ে এই ঝড়-বৃষ্টির রাতেই লাঠি হাতে বেরিয়ে যায়। বাড়িতে সাজিদ আছে কিন্তু সে যায়নি, ঘরে শুয়ে। নূরজাহান সন্ধ্যা থেকেই ঘরে শুয়ে ছিল, হঠাৎ নূরজাহানের ঘরের উত্তর দিকের দরজায় কে যেন কড়া নাড়ল। একবার, দুইবার, বারবার। নূরজাহান ঘুম থেকে ধড়ফড়িয়ে উঠে বসে ভয়ার্ত গলায় বলল…

‘কে? কে দরজাটা ধাক্কাচ্ছে?

খুব পরিচিত গলা কানে ভেসে এল। শাহানা বলল…

‘আমি। তুই দুয়ার খুইলা বাইরে আয়।

শাহানার গলা পেয়ে নূরজাহান স্বাভাবিক ভাবেই খাট থেকে নামল। শাহানা সচরাচর নূরজাহানকে কখনো প্রয়োজনেও ডাকে না। আজ কোন প্রয়োজনে ডাকছে, তাও সামনের দরজা না দিয়ে বাড়ির পেছনের দরজা দিয়ে—সেটা নূরজাহান ঠাহর করতে পারল না। সরল মনে নূরজাহান দরজা খুলে শাহানাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখল বৃষ্টির মাঝে ছাতা নিয়ে। শাড়ির ওপর গায়ে কালো চাদর জড়িয়ে, মাথায় বড় ছাতা। নূরজাহান দরজা থেকে বেরিয়ে সিঁড়িতে পা রেখে বলল…

‘আম্মা, এই বৃষ্টির মাঝে আপনি বাইরে কেন? কোথায় যাচ্ছেন? ঘরে আসুন।

শাহানা নূরজাহানের মুখের দিকে তাকাল কয়েক সেকেন্ড। তারপর শান্ত এবং লোহময় গলায় বলল..
.
‘আমার লগে আয়।

‘কোথায় যাব আম্মা?

শাহানার কথার সঙ্গে সঙ্গে পাল্টা প্রশ্ন করল নূরজাহান। শাহানা উত্তর না দিয়ে সামনের দিকে হেঁটে বলল…

‘ফরিদ ভাই খবর পাঠাইছে তোরে লইয়া তাগো বাইত্তে যাইতে। কী কাম জানি আছে।

ফরিদ সিকদার হাসানের বড় ভাই। নূরজাহানকে বেশ আদর করে। হাসানের বাড়ির থেকে একটু দূরে যে বাড়িটা আছে ঐ বাড়িটাই ফরিদের। নূরজাহানকে আসতে বলে বৃষ্টি-বাদলের মাঝে শাহানা হাঁটতে শুরু করে। নূরজাহান গায়ে কোনো রকম ওড়না জড়িয়ে ঘর থেকে বেরুল। শাহানা চলে যাচ্ছে বলে নূরজাহান ঘরের দরজাটা বাহির থেকে চাপিয়ে তাড়াহুড়োয় শাহানার পেছন পেছন হাঁটছে। পায়ে স্যান্ডেলে চপচপ শব্দ করছে। টিপটিপ বৃষ্টিতে নূরজাহান শাহানার ছাতার নিচে ঢুকতে চাইলে শাহানা ছাতা সরিয়ে নেয়। শাহানার ছাতার নিচে নূরজাহানের জায়গা হবে না ভেবে নূরজাহান শাহানার পেছনে হাঁটল। টিপটিপ বৃষ্টিতে অল্পতেই ভিজে গেল সে। অন্ধকার রাতে শাহানা হাতে করে কোনো কৃত্রিম আলো বা লাইট নিয়ে আসেনি। তবুও সরল মনে নূরজাহান সৎ মায়ের এক ডাকে চলে এসেছে। ফরিদের বাড়ির উল্টো পথে শাহানা নূরজাহানকে নিয়ে হাঁটতে থাকলে নূরজাহান বলল..

‘আম্মা আমরা কই যাচ্ছি? ফরিদ চাচার বাড়ি তো উল্টো পথে। আমরা ভুল পথে হাঁটছি।

‘বেশি কথা কইবি না। আমরা ভুল পথে না, ঠিক পথেই যাইতাছি। জলদি হাট।

নূরজাহান ভিজতে ভিজতে শাহানার দেখানো ষড়যন্ত্রের রাস্তায় হাঁটল। সৎ মায়ের প্রতি অগাধ ভালোবাসা আর বিশ্বাস আজ নূরজাহানের ধ্বংসের কারণ হয়ে দাঁড়াল। নূরজাহান সবসময় শাহানার একটুখানি ভালোবাসার চাইত, আর শাহানা চাইত সৎ মেয়ে নূরজাহানের থেকে মুক্তি। আর একটু পথ হাঁটলে শাহানা মুক্তির দেখা পাবে। সিকদার বাড়ির পূর্বের পাহাড়ি অঞ্চল। সেখানে আদিবাসীদের বসবাস আছে। বৃষ্টির রাতে গ্রামবাসীরা যার যার ঘরে। রাস্তাঘাট খালি। একটা কুকুর পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে না, সুনসান নীরবতা। দুই পাহাড়ের মাঝে সরু রাস্তাটা অন্ধকারে তলিয়ে। রাস্তার মোড়ে কয়েকজন পুরুষালি অবয়ব দেখা গেল কালো কাপড়ে মুখ বেঁধে রেইনকোট পরে দাঁড়িয়ে কারো অপেক্ষায়। নূরজাহান এতক্ষণ সাহসী থাকলেও লোকগুলো দেখে ভয়ে জড়সড় হয়ে শাহানাকে পেছন থেকে আঁকড়ে ধরে ফিসফিস করে বলল…

‘আম্মা আমরা কই যাচ্ছি? সামনে ডাকাত দলের মতো কতগুলো লোক দাঁড়িয়ে। আম্মা চলুন আমরা বাড়ি ফিরে যাই।

লোকগুলো বেশ দ্রুত পায়ে ঘিরে দাঁড়াল শাহানা ও নূরজাহানকে। যেন এতক্ষণ ওদের অপেক্ষাতেই এখানে দাঁড়িয়ে ছিল। নূরজাহান ভয়ে আঁতকে উঠে শাহানাকে জড়িয়ে ধরে চিৎকার করে বলতে লাগল

—’আম্মা চলেন পালাই, ওরা ডাকাত দল, আম্মা, আম্মা চলেন।

নূরজাহান জানে মা মমতাময়ী হয়; মা ছলনাময়ী ষড়যন্ত্রকারী হয় সেটা নূরজাহানের জানা ছিল না। নূরজাহান শাহানাকে জড়িয়ে নিয়ে পালাতে চাচ্ছে অথচ শাহানা ঠায় দাঁড়িয়ে। একটা পালোয়ান গঠনের লোক তৎক্ষণাৎ নূরজাহানের হাত টানতে শুরু করলে নূরজাহান চিৎকার করল…

‘এই, কে আপনারা? কী চান? ছাড়েন আমাকে। যেতে দিন আমাদের। ছাড়েন। আম্মা, আম্মা আমাকে বাঁচান! আম্মা!

আজ মনে হয় শাহানা বয়রা, কানে শুনতে পায় না। নূরজাহানের চিৎকার শাহানা শুনতে পাচ্ছে না। মোটা লোকটা মুহূর্তে নূরজাহানকে পেছন থেকে জাপটে জড়িয়ে নূরজাহানের মুখ চেপে ধরল। নূরজাহান লাফাচ্ছে ছাড়া পাওয়ার জন্য ছটফট করছে। শাহানা নিষ্ক্রিয় চোখে নূরজাহানের ছটফটানি দেখে বলল…

‘আমার কাম শেষ। আমি যাই। এই আপদ যেন আমার বাইত্তে আর না যাই। নিজের লগেই রাখিস।

সাত-আটজন লোকের মধ্যে একটা লোকও শাহানার কথার উত্তর দিল না। কালো কাপড়ে মুখ বাঁধা সবার। নূরজাহান বুঝে গেল লোকগুলোর হাতে তুলে দেওয়ার জন্যই শাহানা সকলের অনুপস্থিতিতে নূরজাহানকে পেছনের দরজা দিয়ে ডেকে নিয়ে এসেছে। নূরজাহান হঠাৎ লোকটার হাতে কামড় দিয়ে নিজেকে ছাড়িয়ে দৌড়ে এসে শাহানাকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে চিৎকার করে বলল…

‘আম্মা! ওহ আম্মা! আপনার পায়ে পরি দয়া করে আপনি আমার সর্বনাশ করবেন না। আপনি আমার আম্মা লাগেন। দরকার হইলে আমাকে আপনি মেরে ফেলেন, তারপরও কোনো পুরুষের হাতে কলঙ্কিত হতে দিয়েন না আম্মা। আমার প্রতি এতো নির্দয় হয়েন না আপনি। আপনাকে আমি ভিষণ ভালোবাসি আম্মা।

শাহানা শুনল, কিন্তু ঠায় দাঁড়িয়ে রইল। লোকগুলো নূরজাহানকে টেনেহিঁচড়ে শাহানার থেকে ছাড়িয়ে নিল। নূরজাহানের চিৎকার, হাহাকার শাহানা শুনল না। কেমন শক্ত ভঙ্গিতে বাড়ির পথে হেঁটে চলে এল। লোকগুলো নূরজাহানকে অজ্ঞান করে কোথায় নিয়ে গেল শাহানাও জানে না। মানিকের সঙ্গে শাহানার চুক্তি হয়েছে। শাহানা মানিকের হাতে নূরজাহানকে তুলে দেবে আজ রাত আটটায়। কথা অনুযায়ী শাহানা নূরজাহানকে নিয়ে ঠিক রাত আটটায় বেরুল এবং লোকেশন অনুযায়ী মানিকের বলা জায়গায় নূরজাহানকে তুলে দিয়ে বাড়ি ফিরছিল। মানিকের জিপের সঙ্গে শাহানার পথেই দেখা। মানিক শাহানাকে রাত আটটার সময় নূরজাহানকে নিয়ে আসার কথা বললেও মানিক সঠিক সময়ে উপস্থিত থাকতে পারেনি হঠাৎ ঝামেলায় পড়ে যাওয়ায়। মানিক আটটা বিশে শাহানাকে বলা লোকেশন অনুযায়ী নিজের ছেলেপেলে নিয়ে যাওয়ার পথে শাহানার সঙ্গে দেখা হলো। জিপের হেডলাইটের আলোয় শাহানার মুখটা স্পষ্ট হতে মানিক গাড়িটা থামিয়ে উৎসুক হয়ে জিপ থেকে নেমে বলল…

‘ আসসালামু আলাইকুম শাশুড়ি আম্মা, আমার নূরজাহান কই?

‘তোমার লোকদের কাছে দিয়া আইছি নূরজাহানরে।

মানিক ভারি আশ্চর্য গলায় শাহানাকে বলল…

‘ আমার লোকের কাছে দিয়া আইছেন মানে? কী কন এইগুলা শাশুড়ী? আমিই তো মাত্র এহোন আইলাম। এই বুড়ি, তুই কার কাছে আমার নূরজাহানরে দিয়া আইছস হাছা কইরা ক, নইলে তোরে আমি জানে মাইরা ফালামু কিন্তু!

মানিক কথাটা বলে তেড়েফুঁড়ে গেল শাহানার দিকে। শাহানা বিরক্তির ভঙ্গিতে বলল।

‘ঝামেলা কইরো না মানিক, আমি তোমার কথা মতো নূরজাহানরে দিয়া আইছি কিছু লোকের কাছে। এহোন আমারে জ্বালাইয়ো না। তোমার লোকগুলো নূরজাহানরে লইয়া ঐ পাহাড়ের পথের দিকে গেছে। তুমি ঐদিকেই যাও পাইবা লোকগুলোরে। আমারে আর বিরক্ত কইরো না। আমার কাম শেষ।

শাহানার কথায় মানিক পাগল হওয়ার মতন হয়ে গেল। শখের নূরজাহান যে অন্য কারো হাতে পড়েছে সেটা বুঝতে পেরে মানিক গর্জে চিৎকার করল। চট করে শাহানার গলা চেপে হিংস্র বাঘের ন্যায় বলল…

‘এই শালীর বুড়ি! আমার নূরজাহানের যদি কিচ্ছু হয় তাইলে তোরে আমি জানে মাইরা ফালামুরে, জানে খাইয়া ফালামু। তোর বংশ আমি নির্বংশ কইরা দিমু বুড়ি!

শাহানার হাতের ছাতা রাস্তায় পড়ে যায়। শাহানা ছাড়া পাওয়ার জন্য ছটফট করতে থাকলে বেলাল জিপ থেকে চিৎকার করে বলে…

‘ভাইজান, এহোন মাথা গরম না কইরা জলদি আয়েন আগে ভাবিরে খুঁজি। সময় বেশি হয় নাই লোকগুলো ভাবিরে লইয়া গেছে। ভাবিরে বাঁচাইতে হইব।

মানিক বেলালের কথায় শাহানাকে ধাক্কা মেরে দূরে সরিয়ে দিয়ে দৌড়ে গিয়ে জিপে উঠে বসল। গাড়ি টান দিতে দিতে মানিক আঙুল তুলে শাহানাকে শেষবার শাসিয়ে বলল…

‘শালীর বুড়ি, আমারে খালি নূরজাহানরে লইয়া আইতে দে। তোর কবর আমিই দিমু!

মানিকের জিপ চলে গেল নূরজাহানকে নিয়ে যাওয়া পথে। শাহানা কাঠ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল কিছুক্ষণ। তারপর কাদা মাটির রাস্তা থেকে ছাতাটা নিয়ে বেশ স্বাভাবিক ভাবে বাড়ির পথে হাঁটল, যেন কিছুই হয়নি—সবকিছু শান্ত স্বাভাবিক। বাড়িতে শাহানা সামনের দরজা দিয়ে না ঢুকে কলপাড় হয়ে পুকুরঘাটে গেল পায়ের কাদা পরিষ্কার করতে। হঠাৎ পেছন থেকে আশনূর বলল…

‘নূরজাহান কই আম্মা?

আশনূরের গলায় শাহানা ভেতরে ভেতরে ভয় পেলেও মুখের ভঙ্গিমা বেশ বিরক্ত। তিক্ত গলায় বলল…

‘নূরজাহান কই আমি কেমনে কমু? আমি কি কাউরে কোলে লইয়া ঘুরি যে জানমু কই আছে?

শাহানার পেছনে নূরজাহানকে বাড়ি থেকে বেরোতে জানালা দিয়ে দেখেছে আশনূর। আশনূর একবার শাহানাকে পেছন থেকে ডেকে জিজ্ঞেস করতে চেয়েছিল ওরা কই যাচ্ছে, কিন্তু ততক্ষণে শাহানা নূরজাহানকে নিয়ে সিকদার বাড়ির গেট পেরিয়ে যাওয়ায় আশনূর ডাকার সুযোগ পায়নি। নূরজাহানের বাড়ির বাইরে যাওয়া নিষেধ হওয়ার পরও শাহানা নূরজাহানকে নিয়ে বাইরে গিয়েছে, আবার নূরজাহানকে ছাড়া বাড়িতেও ফিরেছে একা। এতো রাতে বৃষ্টির মধ্যে নূরজাহান যাবে কই? শাহানা তো নূরজাহানকে পছন্দ করে না, তারপরও নূরজাহানকে নিয়ে এতো রাতে কোথায় গিয়েছিল শাহানা? শাহানার অস্বীকারে আশনূর সন্দিহান গলায় বলল…

‘আম্মা আমি তোমারে দেখছি নূরজাহানরে লইয়া বাড়ি থেইক্কা বাইর হইতে। এহোন নূরজাহান কই কও?

শাহানা বেশ কর্কশ গলায় বলল…

‘কতগুলা জাত শত্রু পেটে ধরছি আমি। যাহ ঘরে যা তুই। মাইনষের মাইয়া লাইগা তোর এতো পরান পোড়ে ক্যান?

‘নূরজাহানের লগে আমার রক্তের সম্পর্ক আছে আম্মা, এর লাইগা পরান পোড়ে। তুমি হাছা কইরা কও আম্মা নূরজাহান কই? নইলে আমি কিন্তু চিল্লাইয়া সবারে কমু তুমি নূরজাহানরে কই জানি রাইখা আইছো!

অতিরিক্ত রাগে শাহানা আশনূরকে একটা চড় মেরে বলল…

‘একটা নষ্টা পেটে ধরছি আমি। তুই চিল্লাইলে আমার কী হইব? আমি কি কাউরে ডরাই? মাগি ছেড়ি ভাইগা গেছে চেয়ারম্যানের পোলা মানিকের লগে। দেখ গিয়া এতক্ষণ…

‘আম্মা!

আশনূর চিৎকার করে উঠল। চোখ টলমল করছে অশ্রুতে। আশনূর অন্ধকারের মাঝে মায়ের দিকে রাগে, ক্ষোভে, ঘৃণিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল…

‘আমার দেখা সবচেয়ে নিকৃষ্ট মা তুমি। শুধুমাত্র নিজের জেদের জন্য নূরজাহানকে তুমি এতো বড় বিপদে ফেললেন। আজ থেকে তুমি আমার জন্য মৃত। এই জীবনে কোনোদিন তোমাকে মা বলে ডাকব না। তোমার সাথে আমার সকল সম্পর্ক শেষ!

আশনূর আর দাঁড়াল না। দৌড়ে ঘরে গেল, ঐ অবস্থায় রামদা আর অপর হাতে হাসানের ফেলে যাওয়া বাটন ফোনটি নিয়ে বৃষ্টির মাঝে বেরোতে শাহানা আঁতকে উঠল। দৌড়ে আশনূরের পথ শাহানা আটকাতে চাইলে, আশনূর মুহূর্তে রামদাটি নিজের গলায় চেপে ধরে হিংস্র বাঘের ন্যায় ক্ষ্যাপা ভঙ্গিতে বলল…

‘আজ আমার পথ আটকাইও না আম্মা। তাহলে এখানে একটা লাশ পড়ে যাবে। আজ যদি নূরজাহানকে সহিসালামতে না ফিরাতে পারি, তাহলে আজ আমার লাশও পড়বে। তোমার পাপের শোধ আমি আমার রক্তের বিনিময়ে করব!

শাহানা ঠায় দাঁড়িয়ে রইল। হাত-পা কাঁপছে আশনূরকে রামদা হাতে একা বেরিয়ে যেতে দেখে। আশনূর সিকদার বাড়ির গেট পেরিয়ে যেতেই শাহানা নিজের মেয়ের জন্য হাউমাউ করে চিৎকার করে কাঁদতে লাগল। তারানূর, সাজিদ, নদী দৌড়ে ঘর থেকে বের হলো। কী হয়েছে বারবার শাহানাকে প্রশ্ন করতে থাকলেও শাহানা মুখ খুলল না বরং কেঁদেই যাচ্ছে। এতো বুঝিয়েও লাভ হলো না বারবার কাঁদছে। তারানূর বেশ কয়েকবার নূরজাহান ও আশনূরকে ডেকেও যখন সাড়াশব্দ পেল না, তখন তারানূর মনে করল বৃষ্টির মাঝে হয়তো দুবোন ঘুমিয়ে পড়েছে। অথচ শাহানার ষড়যন্ত্রে নূরজাহানের পাশাপাশি আশনূরের জীবনটাও রিস্কে পড়ে গেল, আর সেই খবর কেউ পেল না। মাজিদ, হাসান হাসপাতালের প্রজেক্টে; মারিদ চলে যাচ্ছে। কে বাঁচাবে নূরজাহানকে? মানিক সঠিক সময়ে নূরজাহানের কাছে পৌঁছাবে কি না তাও জানা নেই। আজ ভাগ্য নয়, নিজের আপনজনের ষড়যন্ত্রের শিকার নূরজাহান।

চলিত…

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply