🖋️ #ডাকপ্রিয়র_চিঠি
লেখিকাঃরিক্তাইসলাম মায়া
১৮_প্রথমাংশ
অসময়ে একটা সুরেলা কণ্ঠ বাতাসে গুঞ্জনে ভেসে বেড়াল। শীতে কনকনে ঠাণ্ডায় মানুষ সেই সুরের তালে হারালো। পথঘাটে চলা দৈনন্দিন জীবনের মানুষগুলো সেই উচ্চ কণ্ঠের গানে পা থেমে যাচ্ছে। রাস্তায় দাঁড়িয়ে গানের সুরে হারাচ্ছে। ব্যক্তিটি যেন নিজের সর্বোচ্চ আবেগ ঢেলে ধরলো উচ্চ স্বরের গান। সুরে সুরে গাইল…
তোমারে আমি যে কত ভালোবাসি গো।
বুঝাবো কেমনে বুঝাবো…
তোমারে না পেলে, জানি আমি জানি গো
মরিবো অকালে মরিবো।
ভালোবেসে ঠাই দিও, পরাণে গো।
পাশে থেকো জীবনে মরণে
আমি তোমারই, প্রেম অ-ভিখারীইই
ভালোবেসে ঠায় দিও পরাণে গো অ অ অ
পাশে থেকো জীবনে মরণে
শীতকালীন খেজুরের রস পাহাড়িয়ান এলাকায় বেশ প্রচলিত। শীতের পিঠার সাথে যেমন খেজুরের রস খাওয়ার প্রচলন আছে, ঠিক তেমনই থানচিতে মানুষ শীতকালে কাঁচা খেজুরের রস শরীর গরম করতে পান করে থাকে। মানুষ বলে খেজুরের রসে নেশা হয়। মানিক সওদাগর নেশা করতে চায় না। আপাতত শীত কমাতে খেজুরের রস চাই। গলা অবধি রসে ডুবে থাকা ছোট কলসিতে টকটক শব্দে চুমুক বসাল। এক চুমুকে কলসির অর্ধেক রস পান করেই, অতি মধুর সুরে গান গাইল। মানিক সওদাগর মানুষ যেমনই হোক, তার গান এই গ্রামের সকলের প্রিয়। যে একবার শুনেছে মানিক সওদাগরের গান, সে যেন মনের অজান্তে হারিয়েছে। গান শেষ হতেই মন্টু ঝন্টু দুই সহকারীর একজন উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে বলল…
‘ ভাইজান, আপনের কন্ঠের লাহান একখানা গলা আমাগো পুরা জীবনে একখান হুনিনাই। ভাইজান, আপনে আরেকখান গান ধরেন। আমরা বাজনা বাজাই।
কথাটা ঝন্টু বলল। মন্টু হাতে আরও একটা রসের হাঁড়ি নিয়ে দাঁড়িয়ে। চোখেমুখে উচ্ছ্বাস। মানিক সওদাগর, মন্টু, ঝন্টু এই তিনজন বাদে সঙ্গে আরও তিনজন আছে: কিশোর, বেলাল, আশিক। হাতের রসের হাঁড়িগুলো রাস্তার প্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা খেজুর গাছ থেকে নামিয়েছে বেলাল। গাছের মালিক যদি দেখেও থাকে বিনা অনুমতিতে মানিক সওদাগর রসের হাঁড়ি নামিয়ে খেয়েছে, তারপরও কেউ এগিয়ে এসে প্রশ্ন করবে না। এই এলাকায় থাকতে চাইলে কেউ মানিক সওদাগরকে অবমাননা করার মতো সাহস দেখাবে না। বরং এলাকাবাসী সওদাগর পরিবারকে খুব মান্য করে চলে। এবার এই মান্য করাটা লোকের ভয় নাকি অন্য কিছু সেটাতে সওদাগর পরিবারের কিছু যায় আসে না। মন্টু ঝন্টুর কথার তাল মিলিয়ে বলল…
‘হ ভাইজান, আরেকখান গানো টান দেন। আপনের গান হুনলে পরাণডা জুড়াই যায়। আমরা তাল দিমু ভাই আপনে ধরেন।
মানিক সওদাগর হাতের অর্ধেক হওয়া রসের হাঁড়িটা রাস্তায় ফেলে ভেঙে দিল। গাড়ী উপর থেকে লাফিয়ে নামল সেই ভাঙা কলসির টুকরোর উপর পা রেখে খেঁকিয়ে বলল…
‘ মানিক সওদাগর হইল তার মর্জির মালিক, হের মর্জি ধরলে গান গাইব না ধরলে গাইবো না। তোগো কথায় মানিক সওদাগরের মর্জি চলে না। এহোন ক, আমার নূরজাহান কয়? এই সড়ক দিইয়া আইবো নাকি অন্য সড়কে যাইব?
ঝন্টু, মন্টু, কিশোর, বেলাল, আশিক সবার মাঝে আশিক বেশ বুদ্ধিমান ছেলে। হালকা পাতলা গঠনের আশিককে মানিক সওদাগরের কাজের লোকও বলা যায়। মানিক সওদাগর যখন থানচিতে থাকে না, তখন এই আশিকই মানিক সওদাগরের হয়ে এলাকার সকল তথ্য জোগাড় করে রাখে। পরে মানিক সওদাগর এলাকায় ফিরলে সেই সব জোগাড় করা তথ্য জানায়। মানিকের কথা শেষ হতে আশিক চট করে বলল…
‘ভাই, ভাবি এই পথ দিইয়াই আইবো। আমি সক্কালে দেখছি তাগো কলেজে যাইতে। ফিরতি পথ তো এইডাই। এই পথ দিইয়া না আইলে যাইব কয়?
মানিক সওদাগরের অনেকগুলো শখের মধ্যে একটা শখ তার গাড়ি-প্রতি। এতক্ষণ সে কালো জিপ গাড়িটির সামনের ইঞ্জিনে বসেছিল। এখন গাড়ি সামনে দাঁড়িয়ে দুহাত কোমরে রেখে অদূরে রাস্তার দিকে তাকিয়ে বলল…
‘ দুনিয়াতে অনিশ্চিত অপেক্ষার লাহান কঠিন শাস্তি আর কিচ্ছু নাই আশিক। তোগো ভাবি আইবো কি আইবো না এই অনিশ্চয়তা লইয়া বইসা থাহোনের থেইক্কা বরং আমরা হের কাছে যাওন বুদ্ধিমানের কাম। চল, তোগো ভাবির কলেজে যাই আশিক।
‘ জে ভাই চলেন।
হৈ হৈ করে সকলে গাড়িতে ঠেসাঠেসি করে উঠল।
বেলাল গাড়ি ড্রাইভিং সিটে। পাশের সিটে মানিক সওদাগর। পিছনে যাত্রী সিটে দাঁড়িয়ে মুঠো পাতলু মতো দেখতে ঝন্টু মন্টু, আর আশিক, কিশোর। গাড়ি চলল থানচির সদরে নূরজাহানের কলেজে।
~~
ফেব্রুয়ারি মাস। কলেজ পড়ুয়া স্টুডেন্টদের বছরের শেষ যাত্রা। এপ্রিলে নূরজাহানের ইন্টার ফার্স্ট ইয়ারের ফাইনাল পরীক্ষা। এখন ফেব্রুয়ারী মাস প্রায় শেষের দিকে। সে কলেজে খুব কম সময়ই উপস্থিত থাকে। পরীক্ষা কিংবা বিশেষ জরুরি কাজ ছাড়া নূরজাহান কলেজে আসে না। আর এজন্য অবশ্য কলেজের প্রিন্সিপালের নিকট হাসান সিকদারই দরখাস্ত করে রেখেছিলেন বছর শুরুতে। নূরজাহান প্রি-টেস্ট পরীক্ষা শেষে কলেজ থেকে বেরুলো। রাস্তার ফুটপাত ঘেঁষে দাঁড়িয়ে ঝালমুড়ি, ফুচকা, আচার, আমড়া, পানিপুরি-সহ নানান খাবারে চলছে ক্রেতা- বিক্রেতাদের ভিড়। কলেজের পাশে দুটো দোকানও রয়েছে। হাসান সিকদার একটা দোকান হতে পানি কিনছেন মেয়েদের জন্য। ওনার বাম হাতে লম্বা দা-টি মাথা দিয়ে কাঁধে চেপে ধরে ফতোয়ার পকেট হতে টাকা বের করছেন বিল মেটানোর জন্য। নূরজাহানকে কলেজ হতে বেরুতে তিনি দেখেননি। নূরজাহান লম্বা কালো বোরখার নিচে হতে আশেপাশে তাকিয়ে বাবার সন্ধান করল। নূরজাহান পড়াশোনার জীবনে কখনো বাবা-মায়ের হাত ছাড়া স্কুলে কিংবা কলেজের মাটিতে পা রাখেনি। আজও ছোটবেলার মতো করে হাসান সিকদার কলেজের বাইরে বসে থাকেন মেয়ের অপেক্ষায়। নূরজাহানের কলেজ শেষে মেয়েকে নিয়ে বাড়ি ফেরেন তিনি। আজও তার ব্যতিক্রম নয়। নূরজাহান ফুটপাত ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আশেপাশে বাবার খোঁজ করতে চোখে পড়ল মানিক সওদাগরের কালো জিপ গাড়িটিকে কিছু দূরে দাঁড়িয়ে থাকতে। নূরজাহান ভয়ে নাকি সম্মানের তাগিদে খানিকটা পিছিয়ে গেল নিজেকে আড়ালে করে। বোরখার আড়ালে ঢাকা নূরজাহানের মুখভঙ্গি বুঝা গেল না। কিন্তু কোথা থেকে মানিক সওদাগর ঠিকই নূরজাহানের সম্মুখে দাঁড়াল সটান হয়ে। বোরখার উপর দিয়ে নূরজাহানের দিকে কাতর দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল…
‘ আমার নূরজাহান তুমি কেমন আছো?
কালো রঙের পাতলা নেকাবের আড়ালে নূরজাহানের চোখ ঢাকা। মানিক নেকাবের উপর দিয়ে নূরজাহানের দিকে কাতর দৃষ্টিতে তাকিয়ে হাত বাড়িয়ে নূরজাহানের গাল ছুঁতে চাইলে তৎক্ষনাৎ নূরজাহান আবারও পিছনে গেল। জড়সড় ভঙ্গিতে আশেপাশের মানুষদের আড়চোখের দৃষ্টি পরখ করে বলল…
‘ প্লিজ আমাকে ছুবেন না। দূরে যান। আমাকে যেতে দিন।
নূরজাহানের অস্থির মনোভাব মানিক বোরখার উপর থেকেই দেখে কাতর গলায় বলল…
‘ আমার ভালোবাসা তুমি নূরজাহান। যখন দেখি তোমার চোখে আমার জন্য ভয়, তখন আমি দগ্ধ হয়। তোমার বিরহ আমায় ভীষণ পোড়ায় নূরজাহান। একটু কি ভালোবাসা যায় না নূরজাহান? একটু আমার হইয়া দেখো না নূরজাহান, তোমার জন্য আমি তাজমহল বানাইতে না পারি, ছোট একটা নূরজাহানমহল ঠিকই বানামু। আর সেই মহলের তুমি হইবা রাজা আর আমি হইব তোমার রানী।
পাশ থেকে মোটা করে মন্টু আমতা আমতা করে মানিককে সংশোধিত করে বলল…
‘ভাই, আপনে রাজা হইবেন আর ভাবি রানী। আপনে তো বেডা মানুস, আর ভাবি মাইয়া মানুস। তাইলে ভাবি রাজা হইব কেমনে?
মানিক সওদাগরের দৃষ্টি নূরজাহানের উপর থেকে নড়লো না আর না মন্টুর কথায় বিরক্তি, রাগ কোনোটা প্রকাশ করল। মানিক সওদাগরের তৃষ্ণার্ত চোখ নূরজাহানের দিকে তাকিয়ে বলল…
‘ আমার রাজ্যে রাজা ও নূরজাহান, রানীও নূরজাহান। আমারে তোমার দাস বানাইয়া রাইখো নূরজাহান। তবুও আমার হইয়া যাও। আমি তুমি বিনা নিঃস্ব। এই দেখো আমি তোমার লাইগা শুদ্ধ ভাষায় কথাও কইতে পারি। এই দেখো আমি শিখছি শুদ্ধ ভাষা। তারপরও কয় আমার হইবা তুমি।
হঠাৎ করে নূরজাহান মানিক সওদাগরের পাশ কাটাতে চাইলে পথ আঁটকে বাঁধা দেয় মানিক। নূরজাহান শক্ত গলায় বলল…
‘পথ ছাড়ুন। তামাশা করবেন না। মানুষ দেখছে। আমাকে যেতে দেন।
নূরজাহানের কথায় শক্ত গলায় মানিকও তাল মিলিয়ে বলল…
‘যে তোমারে দেখবার চাইব, সে প্রথমে মানিক সওদাগরে ঠেঙাতে হইব নূরজাহান। আর মানিক সওদাগরে ঠেঙানোর সাহস এই জেলায় কারও বুকে নাই নূরজাহান।
কোথা থেকে একটা তেজি হাতে দা উঠে আসল মানিক সওদাগরের গলায়। দা-টা ধরেছে আশনূর। পাশেই একজন ব্যবসায়ী ডাব কাটছিলেন, আশনূর সেখান থেকেই দা-টা উঠিয়ে ধরেছে মানিকের গলায়। আশনূর নূরজাহানকে নিজের পিছনে আড়াল করে মানিক সওদাগরের মুখোমুখি হয়ে বলল…
‘মানিক ভাই, পিছিয়ে যান। নূরজাহানরে পথ ছাড়ুন। নয়তো আপনার গলা কেটে আমি জেলে যেতে দ্বিধাবোধ করব না।
হঠাৎ আশনূরের আগমনে মানিক সওদাগর কিঞ্চিত ভ্রুর কুঁচকে গলায় ঠেকানো আশনূরের দা-টি দেখে পর মূহুর্তে আশনূরের দিকে তাকিয়ে হেয়ালি করে বলল…
‘ এই তোরা দেখ আমাদের সহজসরল আশনূরও ছুরি চালানো শিখে গেছে। এই তোরা বাহবা দে আমাদের আশনূরকে।
আশনূরের দা-টা মানিকের গলায় আরও খানিকটা জোড়ালো ভাবে চাপিয়ে ধরে তেজি গলায় বলল…
‘শুধু ছুরি চালানো না, সময়ে গলাও কাটতে পারি মানিক ভাই। তাই সাবধান। সহজসরল ভেবে ভুল করবেন না কিন্তু। এই নূরজাহান, চল।
মানিকের গলায় দা ঠেকিয়ে আশনূর এক হাতে নূরজাহানের হাত চেপে পাশ কাটাতে চাইলে মানিক আশনূরের দা-এর উপর দিয়ে নূরজাহানের পথ আটকাল। আশনূরকেসহ প্যাঁচিয়ে নূরজাহানের হাত চেপে মানিক কাতর গলায় বলল…
‘তোমারে মেলা দিন ধইরা দেখি না নূরজাহান। তোমার চাঁদ মুখখানা আমারে একবার দেখাও। তোমার বিরহে আমি রোজ পুড়ি নূরজাহান। পুরতে পুরতে ছাই। আমার প্রতি কি একটু সদয় হওয়া যায় না নূরজাহান? একটু চাঁদ মুখখানা দেখাও না আমারে নূরজাহান।
এর মাঝে রাস্তার ওপাশ হতে হৈ হৈ করে দা হাতে দৌড়ে আসে হাসান সিকদার। পানির বোতলটা রাস্তায় পরে রইল। নূরজাহান আশনূরকে ঘিরে মানিক সওদাগরের লোকজন দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে তিনি উত্তেজিত এবং ক্ষিপ্ত ভঙ্গিতে দেয়াল হয়ে দাঁড়ালেন মেয়েদের সামনে। দু’হাতে ঠেলেঠুলে মানিক সওদাগরের থেকে মেয়েদের ছাড়িয়ে ধাক্কা
দিতে মানিক দূর ছিটকে পড়ল। পিছনে মানিক সওদাগরের ছেলেপেলেরা দাঁড়িয়ে থাকতে তাঁরা হৈ হৈ করে মানিক সওদাগরকে ধরল পড়া থেকে। পালোয়ান টাইপের কিশোর এর মাঝে হাসান সিকদারের দিকে তেড়ে গিয়ে হাতের লাঠি উঠিয়ে ভারী মারতে সেই লাঠির আঘাত পড়ল আশনূরের মাথায়। আশনূর ‘আল্লাহ গো’ চিৎকার করে মাথা চেপে ধরতে নূরজাহানও চিৎকার করল তক্ষুনি ‘বুবু’ বলে।
কিশোর আঘাতটা হাসান সিকদারকে করতে চেয়েছিল। আশনূর মাঝে থাকায় সে হাসান সিকদারকে টেনে ধরে বাঁচাতে গিয়ে ভারীটা লাগে ওর মাথায়। মেয়েদের চিৎকারে হাসান সিকদার দিকদিশা হারিয়ে তিনি হাতের দা-টা ফেলে আশনূরকে ধরতে সুযোগে কিশোর দ্বিতীয় আঘাতটা করতে চাইল হাসান সিকদারকে। নূরজাহান আশনূরকে ছেড়ে হাসান সিকদারের ফেলে দেওয়া দা-টা মাটি থেকে নিয়ে কিশোরের পায়ে কোপ মারতে কিশোর চিৎকার করে লাঠি ফেলে মাটিতে বসে গেল রক্তাক্ত পা ধরে। সঙ্গীকে আহত হতে দেখে বেলাল ক্ষিপ্ত ভঙ্গিতে এগিয়ে আসল। কিশোরের লাঠিটা মাটি তুলে তেড়ে গেল নূরজাহানকে মারতে। দু’হাতে লাঠি উঠিয়ে নূরজাহানকে মারতে চাইলে মূহুর্তে গর্জে উঠল মানিক সদাগর…
‘এই হারামির বাচ্চা মারিস না, মারিস না। আমার নূরজাহানরে মারিস না খবরদার।
বেলাল থেমে গেলেও নূরজাহান থেমে গেল না। রাস্তা থেকে ইটের টুকরো উঠিয়ে মারলো বেলালের কপালে। বেলাল কপাল চেপে চিৎকার করতে ঝন্টু মন্টু আশিক হৈ হৈ করে এগিয়ে এসে কিশোর বেলালকে ধরলো। আর মানিক সবাইকে ডিঙ্গিয়ে নূরজাহানের দু’হাত টেনে ধরে ব্যাকুল গলায় বলল…
‘নূরজাহান, অ নূরজাহান তুমি ব্যথা পাইছো? দেখাও আমারে তুমি কোথায় ব্যথা পাইছো?
আশনূরকে ছেড়ে হাসান সিকদার উঠে ধাক্কা দিয়ে মানিকে নূরজাহানের থেকে আলাদা করে গালি দিয়ে বলল…
‘ কুত্তার জাত, কুলাঙ্গারের দল, আমার মাইয়ার থেইক্কা দূরে যাহ, নইলে তোর মতো কুলাঙ্গারের আমি খুন করমু জানোয়ারের বাচ্চা।
আবারও ছিটকে পরল মানিক। এবার পরেছে ডাবের ভ্যানগাড়ির উপর। তাতে হাতের কনুই গাড়ীতে লেগে খানিকটা ছিঁড়ে গেল। মানিক তিলমিলিয়ে উঠে হাসান সিকদারের দিকে তেড়েফুঁড়ে গেল। হাসান সিকদারকে হাত উঠিয়ে ঘুষি
মারতে চেয়ে বলল…
‘ শালার বুইড়া শশুর। তোরে আমি…
পর মুহূর্তে নূরজাহান সামনে আছে দেখে বাকি গালিটুকু গিলে বাধ্য ছেলের নেয় হাত নামিয়ে চমৎকার হাসলো। লোকে বলে মানিক সওদাগরের গানের গলা আর তাঁর মন মাতানো হাসি জগতবাসী পাগল। দুটোই মনোমুগ্ধকর। মানিক চমৎকার হেঁসে হঠাৎ সালাম দিয়ে ভদ্রলোকের নেয় বলল…
‘ আসসালামু আলাইকুম শশুর আব্বা। আপনের মেয়ে আমার জামাই, আরে না আমার মেয়ে আপনার জামাই, আরে থুক্কু, আপনি আমার মেয়ের জামাই, ধুর বাল, আমি আপনের মেয়ে জামাই। আয়েন আপনের লগে কোলাকুলি করি আব্বা।
মানিক সওদাগর দু’হাত মেলে দিল কোলাকুলি করতে।
অথচ কিছুক্ষণ আগেই এই লোকটাকে সে মারতে চেয়েছিল। মূহুর্তে কেমন রুপ বদলে ফেলল মানিক সওদাগর। হাসান সিকদার মুখভর্তি থুতু মানিকের উপর না ফেললেও তাঁকে উদ্দেশ্য করে রাস্তায় ফেলে বলল…
‘তোর মতো জানোয়ারের মুখে ওয়াক থু। জীবন দিমু তারপরও তোর কাছে মাইয়া বিয়া দিমু না কুলাঙ্গার।
মানিক অপমানিত হয়েও হাসলো। হাসতে হাসতে একটা কঠিন কথা বলে ফেলল…
‘ আপনের জীবনের বিনিময়ে যদি নূরজাহান আমার হয় তাইলে আপনার জীবনেই সয়। আমি কিন্তু আপনে শশুর বইলা ছাইড়া দিমু না চাচা। বুইঝা লইয়েন।
হাসান সিকদার রক্তাক্ত আশনূর-নূরজাহানকে ধরে অটোরিকশাতে উঠালো। রশিদ অটোরিকশা চালাতে শুরু করলো। পিছন থেকে মানিক সওদাগর অটোরিকশা চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে খোলা গলায় উচ্চ স্বরে আবারও গান ধরল নূরজাহানের উদ্দেশ্যে…
~ মন যে কেন মানে না।
তুমি ছাড়া কিছু বুঝে না।
আর যাতনা সহে না, সহে না আ আ।
তবুও তোমার প্রেমের আমি পড়েছি,
বেঁচে থেকেও যেন মরেছি,
তোমার নামে বাজি ধরেছি, ধরেছি।
নূরজাহানের কলেজটা থানচি সদরে অবস্থিত। এতক্ষণ চারপাশে মানুষ নীরব দর্শক হয়ে তিনজন মানুষকে হেনস্তা হওয়ার দৃশ্যটা দেখেছে। কেউ এগিয়ে আসেনি মানিক সওদাগরের বিরুদ্ধে। থানচি জেলায় বেশ নাম-ডাকে পরিচিত সওদাগর পরিবার। ক্ষমতার অপব্যবহার সওদাগর পরিবার থেকেই হয়ে থাকে। মানুষ চোখে দেখে তারপর চুপ হয়ে যায়, যেন কিছু ঘটেনি, স্বাভাবিক নেয়। আশনূর নূরজাহান একই কলেজে পড়ে কিন্তু দুজনের হল দুটো। আশনূর নিজের হল থেকে বেরিয়ে বাবার খোঁজই করছিল। এর মাঝে নূরজাহানকে ঘিরে মানিক সওদাগরকে দেখে সে এদিকটায় ছুটে আসে নূরজাহানকে বাঁচাতে। দুই বোনে বনিবনা না থাকলেও আশনূর কখনো বাহিরের লোকের সামনে নূরজাহানকে অপদস্থ কিংবা একা ছাড়ে না। দুই বোনের রেষারেষি চার দেয়ালের ভিতরে, বাইরে নয়।
গান শেষে মানিক আশিককে বলল…
‘ শহরে তিনটা পোলা, নাম জানি কি কইছিলি আশিক?
আশিক ঝন্টু মন্টুর সাহায্যে বেলাল কিশোরকে ধরে উঠাচ্ছিল ডাক্তার কাছে নিয়ে যাবে বলে। কিশোরের চেয়ে বেলালের আঘাতটা অল্প কম হলেও দুজন বেশ আঘাত পেয়েছে। আশিক মানিককের কথার মানে বুঝতে না পেরে বলল…
‘জে ভাই, কেডা? কার কথা কন?
‘হাসান মেম্বারের বাড়িতে উঠছিল যে তিনটা পোলা, তাগো নাম কি আছিল রে?
‘রিফাত, হাসিব, মারিদ।
‘এগো মধ্যে লিডার কে?
‘কইতে পারুম না ভাই। তয় রিফাত পোলাডা ডাক্তার আছিল।
‘ কি কামে আইছিল এই গেরামে?
আশিক সকল তথ্য দিয়ে গরগর করে বলল…
‘ আমাগো গেরামে হাসপাতাল বানাইবার চায়, এ লাইগা ভাবিগো বাইত্তে উঠছিল। হাসান মেম্বারই তাগোরে দাওয়াত দিয়া নিজের বাইত্তে নিছিল।
আশিকের কথা শেষে মানিক মুখ কুঁচকে বেশ তিক্ততা প্রকাশ করে বলল…
‘শালার বুইড়া শশুর, না মরা পযন্ত শান্তি নাই। যত নষ্টের মূল শালা বুইড়াই। কখন যে উপরে যাইব আর হের মাইয়া আমার হইব আল্লাহ জানে।
চলবে…..
[ বানান ভুল ম্যানশন করবেন কমেন্টে]
💌#ডাকপ্রিয়র_চিঠি
লেখিকাঃরিক্তাইসলাম মায়া
১৮_ দ্বিতীয়াংশ
রাত বারোটা পেরিয়ে একটার ঘরে। মধ্যরাতে তনিমা পড়ার টেবিলে বসে। চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা। ডাক্তারি পড়তে গিয়ে তনিমাকে বেশ রাত অবধি পড়তে হয়। চোখের সমস্যাটা তনিমা যখন নাইনে উঠল, তখন থেকেই দেখা দেয়। তবে পড়া ছাড়া তনিমাকে কখনো চশমা পরতে দেখা যায় না। তনিমাদের বাসা গুলশান এক নাম্বরে। তনিমার বাবা জাবেদ শেখ এই বাড়িটা পৈতৃকভাবে পেয়েছিলেন। জাবেদ শেখের তিন ভাই। পাঁচ শতকের বাড়িটায় তিন ভাই মিলে ছয় তলা ভবন বানিয়ে প্রত্যেক ভাই দুতলা করে ভাগে পেয়েছেন। প্রতি তলা দুই ইউনিটের ফ্ল্যাট। বারোটি ফ্ল্যাটে তিন ভাই চারটে করে ফ্ল্যাট পেয়েছে। তিন ভাই তিনটে ফ্ল্যাটে থাকছে আর বাকি ফ্ল্যাটগুলো ভাড়া দেওয়া। ঢাকার বাড়িওয়ালা মানুষগুলো ভাড়ার টাকায় চলে। তনিমারাও তাই। জাবেদ শেখের দুই ছেলে এক মেয়ে—তুহিন, রাফিন, তনিমা। তনিমা সবার ছোট। তুহিন মারিদদের সমবয়সী। তবে সে বিয়ে করে এক সন্তানের বাবা। তনিমাদের সঙ্গে একই ফ্ল্যাটে থাকে। রাফিন মেজো। সে রাজনীতির পাশাপাশি এ বছর মাস্টার্সে ভর্তি হয়েছে। জাবেদ শেখ একজন অবসরপ্রাপ্ত আর্মি অফিসার। বর্তমানে পেনশনের টাকায় তনিমাকে পড়াচ্ছেন মেডিক্যালে। বড় ছেলে তুহিন বসুন্ধরা গ্রুপে চাকরি করছে। তুহিনের স্ত্রী সেও হাইস্কুলের শিক্ষিকা। বলা যায়, তনিমাদের পরিবারের সবাই শিক্ষিত।
তনিমা হাতের পেনসিলটা খাতার ওপর রেখে, চোখ থেকে চশমা খোলে দু-চোখ বেশ কয়েকবার ঝাপটাল। সন্ধ্যা থেকে একটানা পড়ার টেবিলে বসে থাকতে থাকতে ওর কোমর-পিঠ বেঁকে যাচ্ছে। ক্লাসের অ্যাসাইনমেন্টগুলো আরও খানিকটা বাকি। ক্লান্ত তনিমা কাঁধের পিছনে এক হাত রেখে আলসেমিতে আড়মোড়া ভাঙল। অনেকক্ষণ যাবত পড়ায় চোখে খানিকটা ঝাপসা দেখছে, শরীর মেসমেস করছে। ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন থাকলে সময়, ঘণ্টা হিসাব করে পড়া যায় না; বরং কঠিন অধ্যবসায় করে পড়তে হয়। তনিমার ডাক্তার হওয়ার স্বপ্নটা জাবেদ শেখের। বাবার স্বপ্ন পূরণের লক্ষ্যে তনিমা দিন-রাত এক করে পড়ছে। বাবাকে ভীষণ ভালোবাসে সে। জাবেদ শেখ যা বলেন, তনিমা বাধ্য মেয়ের মতো তা মেনে নেয়। তনিমা খুব চঞ্চল মেয়ে নয়, আবার গম্ভীর চুপচাপ সেও নয়। যারা মধ্যস্থতায় থাকে, তনিমা সেই ধরনের মেয়ে। হঠাৎ দরজায় নক হওয়ায় তনিমা পিছন ফিরে তাকাল। দেখল জাবেদ শেখ হাতে চায়ের কাপ নিয়ে নক করেছেন দরজায়। মধ্যরাতে জাবেদ শেখকে দেখে তনিমা ভ্রু কুঁচকে বলল…
‘আব্বু তুমি এতো রাতে? ঘুমাওনি?
জাবেদ শেখ তনিমার ঘরে ঢুকতে ঢুকতে মিথ্যা বাহানা দিয়ে বলল…
‘ আমি তো ঘুমিয়েই পড়েছিলাম। তারপর হঠাৎ স্বপ্নে দেখলাম আমার মেয়ে বলছে, আব্বু দুধ-চায়ের সঙ্গে গরম গরম শিঙাড়া খাব, তুমি জলদি জলদি নিয়ে আমার ঘরে এসো তো। মেয়ের ডাক শুনে আর ঘুমিয়ে থাকতে পারলাম না। চলে আসলাম।
চায়ের কাপের সঙ্গে একটা পলিথিনের প্যাকেটও রয়েছে জাবেদ শেখের হাতে। তিনি চায়ের কাপ, শিঙাড়ার প্যাকেট তনিমার বইয়ের পাশে রেখে টেবিলের একটা চেয়ার টেনে বসতে তনিমা ভ্রু কুঁচকে বলল…
‘ তুমি এত রাতে বাইরে গিয়েছিলে আব্বু?
জাবেদ শেখ ফের বাহানা দিয়ে বলল…
‘এত রাত কোথায়, মাত্র একটা বাজে। আর ঢাকা শহরে রাত বারোটা মানে সন্ধ্যা ছয়টা। এখানে ভয় কিসের?
জাবেদ সাহেবের কথায় তনিমা অসন্তুষ্ট ভঙ্গিতে বলল…
‘তোমার হার্টের সমস্যা, হার্টে রিং বসানো হয়েছে, হাইপ্রেশার, শ্বাসকষ্ট সবই আছে। বারবার সিঁড়ি দিয়ে ওঠানামা করলে তোমার বুক ধড়ফড় করে, তারপরও কেন বারবার সিঁড়ি বেয়ে ওঠানামা করো আব্বু? তোমাকে কতবার বললাম আমার জন্য কিছু আনতে তোমাকে নিচে যেতে হবে না, আমারটা আমি নিজে গিয়ে নিয়ে আসব। আর নয়তো রাফিন ভাই, তুহিন ভাই আছে, ওদের বললে, ওরা নিয়ে আসবে। তুমি কেন যাও? যদি কোনো অঘটন ঘটে তাহলে কী হবে বলো?
তনিমার শাসনের জাবেদ শেখ প্রসন্ন হেসে বলল..
‘ যদি কিছু হওয়ার থাকে তাহলে সেটা ঘরে বসেও হবে বুঝেছিস? অসুস্থতার বাহানা দিয়ে আমার মেয়ের আবদার অপূর্ণ রাখতে পারি না।
‘আমি তোমার কাছে কিছু চেয়েছি আব্বু? তাহলে এসব কেন করো?
জাবেদের হাসি মুখটা হঠাৎ মলিন হয়ে গেল। উদাস গলায় বলল…
‘তুমি আবদার করো না বলেই আমার দুঃখ হয় আম্মু। আমার একটাই মেয়ে তুমি, আর তুমিই আমার অসুস্থতার জন্য আমার কাছে আবদার করা ছেড়ে দিয়েছো। অথচ আমি অপেক্ষায় বসে থাকি, আমার ছোট্ট তনিমা কখন আব্বু আব্বু বলে আমার কাছে অনেক আবদার করবে, আর আমি তার সব আবদার পূরণ করব।
জাবেদ শেখের মন খারাপে তনিমা চায়ের কাপটা হাতে নিলো। কাপে চুমুক দিয়ে বলল…
‘আমি আর ছোট নেই আব্বু। বড় হয়ে গেছি।
কথাটা তনিমা সহজ ভাবেই বলেছিল কিন্তু এতে জাবেদ শেখের আরও মন খারাপ হলো। তিনি অপেক্ষিপ নিয়ে বলল..
‘ তুমি বড় হয়ে আমাকে পর করেছ। আমার ছোট তনিমাই ভালো ছিল, সারাক্ষণ আমার হাত ধরে ঘুরে বেড়াত আর শতশত আবদার করতো। বাবার মেয়েদের বড়ো হতে নেই আম্মু। বড় হলে তাদের পর করতে হয়। অন্যের ঘরে পাঠাতে হয়।
‘তাহলে তুমি পাঠিয়েও না, রেখে দাও আমায়। আমিতো থাকতেই চাই।
‘আমি যদি পারতাম, তাহলে আমার মেয়েকে চিরকাল আমার ঘরে রেখে দিতাম। মেয়েরা পরের ঘরের সৌন্দর্য। আমি কেন আমার কোল শূন্য করে মেয়েকে পরের ঘরে পাঠাতে চাইছি, সেটা তুমি যেদিন মা হবে সেদিন বুঝবে। তুমি মা না হলে এই বাবার বেদন বুঝবে না।
তনিমা প্যাকেট ছাড়িয়ে গরম গরম শিঙাড়া নিয়ে তাতে কামড় বসাল। চা আর গরম শিঙাড়া খুব পছন্দের খাবার তনিমার। সেজন্য জাবেদ শেখ তনিমাকে মিথ্যা স্বপ্নের কথা বলে এইগুলো নিয়ে এসেছেন। খাবার খেতে খেতে তনিমা বাবার কথা শুনল। তনিমা মনে হলো জাবেদ শেখ এতো রাতে তনিমাকে কিছু বলতে এসেছে। তাই সে বলল…
‘তুমি কি কিছু বলবে বাবা?
জাবেদ শেখ মেয়ের প্রতি খুবই যত্নশীল। তনিমার ছোট-বড় সিদ্ধান্ত জাবেদ শেখই নেন, এতে অবশ্যই তনিমার সম্মতিও নিয়ে থাকেন তিনি। পকেট থেকে জাবেদ সাহেব একটা খাম বের করে তনিমার সামনে রেখে বললেন…
‘এখানে একজন ডাক্তারের বায়োডাটা ও ছবি আছে। ছেলেটা ঢাকা মেডিকেলের টিচার। এর পাশাপাশি ছেলেটার পারিবারিক ব্যবসাও আছে। বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান সে। দেখতে শুনতেও বেশ। তোমার মায়েরও বেশ পছন্দ হয়েছে ছেলেকে। তুমি ছেলেটাকে একবার দেখে নিয়ো। তোমার পছন্দ হলে আমরা একদিন ছেলেটার পরিবারকে আসতে বলব।
তনিমা শিঙাড়া চিবোতে চিবোতে মুখটা ধীরে ধীরে স্থির হয়ে আসল। হঠাৎ বিয়ের প্রস্তাবে তনিমার মন খারাপ হলো, কিন্তু মুখ ফুটে জাবেদ শেখকে কিছু বলল না। জাবেদ শেখ তনিমার মেডিক্যাল পড়ার মাঝে বিয়ের প্রস্তাব রাখতেন না, যদি না তিনি পরপর তিনবার হার্ট অ্যাটাক করতেন। জাবেদ শেখ জীবিত অবস্থায় তনিমাকে বিয়ে দিয়ে যেতে চান, যেন তার মৃত্যুর পর তনিমা ভাইদের অবহেলার পাত্রী না হয়। তুহিন বউ নিয়ে সংসার করছে। সে তার নিজের সংসার নিয়ে ব্যস্ত। বাবা-মা, ভাই-বোনদের প্রতি তার লক্ষ্য নেই। রাফিন বিয়ে করেনি, তবে ছাত্রলীগের রাজনীতিতে জড়িয়ে উচ্ছৃঙ্খল আর বেপরোয়া হয়ে রাত-বিরেতে বাইরে থাকে। রোজ একটা করে নালিশ আসে রাফিনের নামে। চার-পাঁচটা পুলিশ কেসও হয়ে আছে। রাজনীতিতে জড়িত থাকায় সে দুই-এক দিন জেলে থেকে, তারপর বাড়ি ফেরে আসে। এই নিয়ে তনিমাদের ঘরে কত ঝামেলা হয়। তুহিন ও তার স্ত্রী প্রায় রাফিনের উচ্ছৃঙ্খল চলাফেরার জন্য বাসায় জাবেদ শেখও তাঁর স্ত্রীর সঙ্গে রাগারাগি করে। এই চিন্তায় চিন্তায় জাবেদ শেখ পরপর তিনবার হার্ট অ্যাটাক করে, উনার হার্টে রিং বসানো হয়েছে। উনার হাইপ্রেশার, শ্বাসকষ্টের সমস্যাও আছে। সেজন্য জাবেদ শেখ জীবিত অবস্থায় মেয়েকে বিয়ে দিয়ে যেতে চান। নয়তো উনার অনুপস্থিতিতে উনার আদরের মেয়ের অবহেলা-অনাদর পাবে বলেই জাবেদ সাহেব এই অসময়ে তনিমার বিয়ের কথা ভাবছেন। এটা তনিমাও জানে, আর জানে বলেই সে চুপ থাকে। জাবেদ শেখকে চিন্তায় ফেলতে চায় না। তবে বিয়েটা করা আপাতত তনিমার পক্ষে সম্ভব নয়। অজানা চিঠিওয়ালার খোঁজ পেয়েই তনিমা বিয়েতে বসবে, তার আগে নয়। তনিমা জাবেদ শেখকে বিয়ের ব্যাপারটায় তৎক্ষণাৎ ‘না’ করল না। তৎক্ষণাৎ ‘না’ করলে জাবেদ সাহেব কষ্ট পাবেন। ভাববেন তনিমা উনার কথা রাখছেন না। পরে এক সময় তনিমা জাবেদ শেখকে বিয়ের ব্যাপারটা বুঝিয়ে বলবে। তনিমা জাবেদ শেখের দেওয়া খামটি সরিয়ে রেখে বলল…
‘ ঢাকা মেডিকেলের টিচার হলে, লোকটি কিন্তু আমার স্যার হবে। তুমি কি আমাকে আমার স্যারকে বিয়ে করতে বলছো আব্বু?
‘ছেলেটা শিক্ষিত, লন্ডন থেকে পিএইচডি করেছে। পরিবার ভালো। সেজন্য বিয়েটা আমি হাতে নিয়েছি। তুমি ভালো থাকবে সেখানে। তাছাড়া স্যাররা কি বিয়ে করে না তনি?
তনিমা কথা বাড়াল না। চুপচাপ শিঙাড়ায় কামড় বসাল। ভেতর পুড়ছে অজানা চিঠিওয়ালার টানে। এইভাবে কতদিন চুপ থেকে বাবাকে না করবে, তনিমার জানা নেই। তবে বাবার অসুস্থতার কথা চিন্তা করে হলেও তনিমাকে খুব দ্রুত বিয়ে করতে হবে। জাবেদ শেখ আরও কিছুক্ষণ তনিমার সঙ্গে বসে থেকে চলে গেলেন। জাবেদ চলে যেতে তনিমা বইয়ের ভাঁজ হতে একটা ছোট চাবি বের করল। সেই চাবি দিয়ে পড়ার টেবিলের একটা ড্রয়ার খুলে সেখান হতে এক বক্স চিঠি বের করল। চিঠিগুলো সাদা খামে মোড়ানো। চিঠির পিছনে লেখা—চিঠিওয়ালার চিঠি। তনিমা বক্স হতে একটা চিঠি খুলে পড়া শুরু করল…
‘ আমার প্রিয় পুত্রকন্যা,
আপনাকে নিয়ে যখন ভাবতে বসি, তখন আমার মাঝে অন্য কোনো ভাবনা কাজ করে না। আমার মন-মস্তিষ্কের মাঝে তখন শুধু আপনার বিচরণ। মনে হয় আমি কোনো মোহ-মায়ায় আটকে গেছি। যে মায়া আমাকে বাঁধতে জানে কিন্তু তার নিবারণ ধ্বংসাত্মক। আমি হারিয়েছি, আপনার মাঝে ডুবেছি। বেরুনোর পথ জানা নেই। আপনি আমার জীবনে হঠাৎ বসন্তের পাখির মতো আগমন করেছেন। যে পাখির নাম, ঠিকানা, পরিচয়, যার কিছুই আমি জানি না। আমি এক অজানা বসন্তের পাখির প্রেমে পড়েছি। আমাকে বাঁচান বসন্তেরপাখি। ধরা দিন।আপনিহীনা আমি শূন্য।
ইতি
আপনার চিঠিওয়ালা।
চমৎকার লেখনীতে মিষ্টি প্রেমের চিঠি। তনিমার কাছে এমন চিঠি পনেরো-বিশটা মতো জমা আছে। সবগুলো চিঠিই তনিমা শতাধিকবারের বেশি পড়ে ফেলেছে। যত পড়ে, ততই অনুভূতিগুলো তাজা করে এই চিঠিগুলো। অজানা চিঠিওয়ালাকে খোঁজার আকাঙ্ক্ষায় বারবার ভাবায়। তনিমা হাতে চিঠিটা নিয়ে খোলা বইয়ের ওপর মাথা ঠেকায়। চোখে বিন্দু বিন্দু অশ্রুকণা। একই চিঠিটা সে আবার পড়ছে চোখ বুলিয়ে, তখনই বেখেয়ালি চোখ যায় খোলা নোটের দিকে। বায়োকেমিস্ট্রি বইয়ের একটা নোট। নোটে লেখা রিফাতের। রিফাত তনিমাদের বায়োকেমিস্ট্রি ক্লাস করায়। ক্লাসে সিট হিসেবে সবাইকে সাজেশন দেওয়া হয়েছে। এটা থেকে সামনের সপ্তাহে পরীক্ষা নেওয়া হবে তনিমাদের। কিন্তু সিটে লেখার সঙ্গে চিঠির লেখাগুলো যেন প্রায়শই মিলে যাচ্ছে। তনিমা ধড়ফড়িয়ে উঠে বসল। উত্তেজনায় বুক কাঁপছে। কাঁপাকাঁপা হাতে তনিমা দুটো লেখা মেলাতে চোখে পানি জমল। মনে হচ্ছে রিফাতই চিঠিগুলো লিখেছে তনিমাকে। আসলেই কি তাই? এই চিঠির পিছনের মানুষটা কি তাহলে রিফাত? নাকি তনিমার ভ্রম? তনিমা অতি উত্তেজনায় দু’হাতে মুখ ঢেকে হঠাৎ ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। অন্ধকারে যেন এক বিন্দু আলোর দেখা পেল চিঠিওয়ালাকে ঘিরে।
~~
‘আসসালামু আলাইকুম, কে বলছেন?
মিষ্টি স্বরে মিষ্টি সালাম। এই কণ্ঠস্বর মারিদের ভুলার নয়। ভীষণ পরিচিত, আর কষ্টদায়ক এই কণ্ঠ। এই কণ্ঠ খুঁজে মারিদ দিশেহারা, বিনিদ্র রাত কাটিয়েছে শত শত দিন। মারিদ কানে ফোন চেপে নিস্তব্ধ, নিশ্চুপ বসে। বুক কাঁপছে, অস্থির লাগছে। ফোনের ওপাশের কণ্ঠের মেয়েটি কারও কথা শুনতে না পেয়ে ফের মিষ্টি স্বরে ডাকল। বলল…
‘হ্যালো, কেউ আছেন? শুনতে পাচ্ছেন আমাকে? হ্যাঁলো…
হঠাৎ নূরজাহানের কান থেকে ফোন ছিনিয়ে নিল আশনূর। ফোনের ওপর ওড়না চেপে নূরজাহানকে শাসিয়ে বলল…
‘তোর সবখানে অশান্তি না করলে শান্তি লাগে না? একটা দিনের জন্য হলেও তো আমাদের শান্তি দিতে পারিস। তোকে মানা করা হয়েছে না কারও ফোন না ধরতে? তুই কেন আব্বার ফোন রিসিভ করতে গেলি? এখন আবার আব্বাকেও মারবি অলক্ষ্মীর বাচ্চা।
নূরজাহান অপরাধী গলায় মিনমিন করে বলল…
‘আব্বার ফোনটা বারবার রিং হচ্ছিল বুবু। সেজন্য রিসিভ করেছিলাম।
‘ফোন রিং হলেই তোকে রিসিভ করতে হবে? তোকে কেউ বলছে ফোন রিসিভ করতে? তোর এই অলক্ষ্মীর কাজের জন্য একদিন আমরা সপরিবারে সবাই মরব। শুধু তুই বেঁচে থাকবি কালনাগিন হয়ে। সর।
‘ সরি বুবু।
আশনূর দাঁত কিড়মিড় করে নূরজাহানের অপরাধী মুখটার দিকে তাকাল। ফোনের ওপাশে মারিদ তখন লাইনে৷ আছে। তবে নূরজাহান আর আশনূরের কথা শুনেনি সে। আশনূর ফোনের ওপর কাপড় চেপে ধরে ছিল তাই। তখন হাসান সিকদার ঘরে ঢুকলেন। বসার ঘর হতে ডাকছেন নূরজাহানকে পানি দিতে। বড্ড পানির তৃষ্ণা পেয়েছে উনার। হাসান সিকদারের ডাকে নূরজাহান চলে যেতে আশনূর ফোন নিয়ে বসার ঘরে গেল। হাসান সিকদারের দিকে ফোন দিয়ে স্বাভাবিক স্বরে বলল…
‘আব্বা, আপনার ফোন। হয়তো কেউ কল করেছে। আমি রিসিভ করেছিলাম, আপনি কথা বলুন।
আশনূর নূরজাহানকে বাঁচাতে মিথ্যাটা বলল। নূরজাহানের বাড়ির কারও ফোন ধরার অনুমতি নেই। হাসান সিকদার নিজেই না করেছেন কিছু কারণবশত। সেজন্য নূরজাহানের ফোন রিসিভ করার বিষয়টা আশনূর নিজের ওপর নিয়েছে। হাসান সিকদার আশনূর হতে ফোনটা নিতে গিয়ে চোখ গেল আশনূরের কপালের দিকে। কালকে মানিক সওদাগরের ছেলেদের আঘাতে আশনূরের কপাল ফেটেছিল বলে সেখানে ব্যান্ডেজ করা হয়েছে। আজ আশনূর, নূরজাহান কেউ কলেজে যায়নি, নূরজাহানের প্রি-টেস্ট পরীক্ষা থাকা সত্ত্বেও না। মানিক সওদাগর গ্রামে থাকলে নূরজাহানের বাড়ি বাইরে বের হওয়া নিষেধ হয়ে যায়। হাসান সিকদার আশনূরের কপালের দিকে তাকিয়ে হাতে ফোনটা নিয়ে চিন্তিত ভঙ্গিতে বললেন…
‘তোমার কপালের ব্যথাটা এহোন কেমন আশনূর?
‘ জি আব্বা ভালো।
‘ঔষধগুলা খাইছো?
‘জি আব্বা।
আশনূর সম্মতি দিয়ে চলে যায়। আশনূর নূরজাহানের চেয়ে বড়, অথচ হাসান আশনূরকে ‘তুমি’ আর নূরজাহানকে ‘আপনি’ করে সম্বোধন ও যত্নও করেন বেশি। অনেকে বলে হাসান মেম্বার বাবা হিসেবে দুই মেয়ের প্রতি বৈষম্য করেন। নূরজাহানকে যতটা ভালোবাসেন, আশনূরের বেলায় তা নেই। এই নিয়ে অবশ্য আশনূর কখনো অভিযোগ করেনি।
হাসান কানে ফোন ধরতে মারিদকে বারবার ‘হ্যালো! হ্যালো! হ্যালো!’ বলতে শুনলেন। তিনি বললেন…
‘হ্যালো কে?
হাসানের গলা পেতে মারিদ ঝটপট বলল…
‘আপনার ফোন কে রিসিভ করেছিল আঙ্কেল?
হাসান সিকদার নূরজাহানের ফোন রিসিভ করার ব্যাপারটা জানতো না বলে তিনি আশনূরের নামটায় বললেন।
‘আমার মাইয়া আশনূর। তয় তুমি কেডা?
মারিদ মনে মনে বেশ কয়েকবার আশনূরের নাম আওড়াল। এই তো! মনে হচ্ছে সে তার অপরিচিতাকে খুঁজে পেয়েছে বহুদিন পর। মারিদ নিজেকে স্থির করে সালাম দিয়ে বলল…
‘আসসালামু আলাইকুম আঙ্কেল, আঙ্কেল আমি মারিদ। চিনতে পেরেছেন?
মারিদকে চিনতে পেরে প্রসন্ন হাসলেন হাসান। উৎফুল্লতায় উত্তর দিয়ে বললেন…
‘হ বাজান, তোমারে চিনবার পারছি। তুমি কেমন আছো? তোমার আম্মা-আব্বা বাড়ির সক্কলে কেমন আছে?
‘জি আঙ্কেল সবাই ভালো আছে। আমিও ভালো আছি আপনাদের দোয়ায়।
‘ভালা থাকলেই ভালা। তয় তোমরা তো আর আইলা না বাজান। ফোনও দিলা না। কইছিলা তোমরা আট-দশ দিন পর ফিইরা আইবা, এহন বিশ দিন চাইল্লা গেছে আর আইলা না। আমি ভাবছি তোমরা আর আইবা…
‘ কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলাম আঙ্কেল, সেজন্য আপনার সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারিনি। তবে কাল আমরা আসব আঙ্কেল। সেজন্য আপনাকে ফোন করলাম। আপনি জমি দেখেছেন আঙ্কেল? আমি কিন্তু সঙ্গে করে দুজন ইঞ্জিনিয়ার নিয়ে আসব। তাঁরা জায়গা দেখে হসপিটালের প্রজেক্টের ডিজাইন তৈরি করবে।
‘হ বাজান আমি কয়েকখানা জমি দেইখা রাখছি, তয় তোমরা আইসা আবার একবার দেইখা লও। এই কয়েকখানা জমি থেইক্কা যেটা তোমাগো পছন্দ হইব, ঐটাতে কাজ আগাইও। তোমরা কখন আইবা বাজান?
‘রাত হবে আঙ্কেল।
‘ঠিক আছে, আমি তোমাগোর অপেক্ষায় থাহোম।
‘জি আচ্ছা। আসসালামু আলাইকুম আঙ্কেল।
‘ওয়ালাইকুম সালাম।
মারিদের কল কেটে যেতেই বসার ঘরের খাটে পা তুলে বসে থাকা তারানূর বেগম হাতের চৌরাতায় সুপারি কুটকুট করে কাটতে কাটতে হাসানের উদ্দেশে বললেন…
‘কেডাই ফোন দিছিল হাসান?
‘শহরের মারিদ সাব আম্মা।
‘ক্যান ফোন দিছিল?
‘মারিদ সাব কাল আইব কইসে। হের লাইগা হাসপাতালের জমি দেখছি কিনা ঐটা জিগাইতেছিল আম্মা।
বসার ঘরে সোফা, টি-টেবিল, টিভি, আলনা, কেবিনেট, কর্নার সেটের পাশাপাশি ঘরে একটা কালো রঙের বার্নিশ করা চার পায়ের খাটও রয়েছে একপাশে। তারানূর বেগম সেই খাটে বসে সুপারি কাটছেন হাতে ধারালো চুরাতায়। খেঁকখেঁক স্বভাবের তারানূর বেগম চতুর বটে। মারিদরা শহর থেকে আসবে শুনে তিনি ছেলেকে সাবধান করে বললেন…
‘চেয়ারম্যানের বড় পোলা গেরামে আইছে। হের গেরামে থাকতে আমাগো বাইত্তে কোনো পোলা ঢুকবার দিব না। ঝামেলা করব। তুই শহুরে পোলাগোলারে কয়ডা দিনের লাইগা কইয়া দে, হাসপাতালে জমি যে কয়ডা দেখছিলি ঐটিগুলা জমির মালিক বেচব না, হের লাইগা তোরে কয়ডা দিন সময় দিতে কইবি আবার নতুন কইরা জমি দেইখা তাগো ফোন করলে হেরপর যেন তারা গেরামে আইয়ে।
তারানূরের কথাগুলো ফেলার নয়। চেয়ারম্যানের ছেলে মানিক সওদাগরের জন্য হাসানের পরিবারের জীবন নরক হয়ে আছে। বিশেষ করে নূরজাহানের। মানিক সওদাগর গ্রামে আছে মানে নূরজাহানের বাইরে যাওয়া নিষেধ। চেয়ারম্যানের ছেলে মানিক জোর-জুলুম কিংবা ক্ষমতার জোরে হলেও হাসানের পরিবারের ওপর দাপট দেখিয়ে বেড়ায়। হাসান গায়ের জোরে, লাঠি-তলোয়ার নিয়ে যতটা পারে মানিক সওদাগরের প্রতিবাদ করে, কিন্তু আইনিভাবে কিছুই করতে পারে না মানিকের। আইন মানিক সওদাগরের কথায় চলে। হাসানের কোনো মামলা-মোকদ্দমা, থানা-পুলিশ নেয় না। এই নিয়ে কত কিছু হয়েছে। বলতে গেলে সর্বস্বান্ত হয়ে আজ হাসান সিকদার বাড়িতে বসেছে। এই যে কাল তাদের রাস্তায় আঘাত করল। আশনূরের মাথা ফাটালো। রাস্তায় এত মানুষ দেখেও কেউ প্রতিবাদে এগিয়ে আসেনি। আসবেও না মানিক সওদাগরের বিরুদ্ধে। যে আসবে, তার জীবনই নরকে পরিণত হবে। এমন রোজ কিছু না কিছু হয়। অতি আঘাতে আঘাতে দেওয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে বলেই আজ হাসানের পরিবার অস্ত্র হাতে ঘোরে। হাসান মা তারানূর বেগমের কথায় তেজি ভঙ্গিতে বললেন…
‘যা হবার হইব তখন দেইখা লমু। আমি হাসপাতালের কাম আটকামু না আম্মা। এই গেরামের মানুষের বহু আশার পর আজ একখানা ভালো কাম হইতাছে। আমাগো গেরামে হাসপাতাল হইব, এই খুশিতে গেরামের মানুষ এলাকার মসজিদে জিলাপি দিসে। তাগো খুশি আমি ভাঙবার পারুম না আম্মা। আমি মারিদ সাবগো কইরা দিসি, তাঁরা কালই আইব। মারিদ সাবরা হইল সরকারি লোক। হেগোরে কিছু করতে গেলে তখন সরকারিভাবে চেয়ারম্যান ও তার পোলার বিচার হইব। তুমি নিশ্চিন্তে থাহো আম্মা। কিচ্ছু হইব না।
মারিদ কান থেকে ফোন নামিয়ে বসল। মারিদের কেবিনে রাদিলও বসা। মারিদই ফোন করে রাদিলকে ডেকে থানচিতে হসপিটালের কাজে কী কী করণীয়, পরামর্শ করতে। রাদিলের সঙ্গে আলোচনা শেষে সে হাসান সিকদারের ফোনে কল করেছিল, কিন্তু ভাগ্যবশত সেই কল রিসিভ করে নূরজাহান। মারিদ নূরজাহানের কণ্ঠে তার ‘অপরিচিতা’কে খুঁজে পায়। কয়েক সেকেন্ডের জন্য মারিদ নিস্তব্ধ, থমকে বসে। মারিদ ইচ্ছাকৃতভাবে কথা বলেনি নূরজাহানের সঙ্গে। সে নূরজাহানের কণ্ঠে আরও কথা শুনতে চেয়েছিল, কিন্তু মাঝে আশনূর এসে ফোন নিয়ে যাওয়ায় সেটা আর হলো না। হাসান সিকদার নূরজাহানকে কল রিসিভ করতে দেখেননি, তার কাছে আশনূর ফোনটা নিয়ে যাওয়ায় তিনি ভেবেছিলেন আশনূরই মারিদের কলটা রিসিভ করেছে। সেজন্য মারিদ উনাকে প্রশ্ন করায় তিনি তখন আশনূরের নামটা বলে মারিদকে। মারিদ ধরে নেয় হাসান সিকদারের বড় মেয়ে আশনূরই মারিদের অপরিচিতা। আশনূরের কণ্ঠে তার অপরিচিতাকে খুঁজে পাওয়া গেছে। অপরিচিতা বলেছিল সে কালো। আশনূর শ্যামবর্ণের। তারমানে আশনূরই মারিদের অপরিচিতা। মারিদ উত্তাপ ও অশান্ত মনে যখন থম মেরে বসে, তখন রাদিল মারিদের মনোভাব লক্ষ করে বলল…
‘কী হয়েছে মারিদ? এনিথিং রং?
‘অপরিচিতাকে খুঁজে পেয়েছি।
‘কী? সত্যি? কে সে?
‘হাসান মেম্বারের বড় মেয়ে আশনূর।
‘তুই শিওর হলি কীভাবে?
‘আমার ফোনটা আশনূর রিসিভ করেছিল। এক বছর, দুই মাস, তেরো দিন, পনেরো ঘণ্টা পর আমি তার কণ্ঠ শুনেছি। আমার অপরিচিতা সে। আমি আমার অপরিচিতার কণ্ঠ চিনতে ভুল করতে পারি না রাদিল। সেই-ই আমার অপরিচিতা ছিল।
মারিদের আত্মবিশ্বাসে রাদিল বলল…
‘ তাহলো এখন কী করবি?
‘যা করার তার সাথে বিয়ে করেই করব।
মারিদের কথায় খানিকটা চমকাল রাদিল। ভারি আশ্চর্য গলায় বলল…
‘মানে তুই বিয়ে করবি? কাকে? আশনূরকে?
‘আমার অপরিচিতার সাথে অনেক হিসাব-নিকাশ বাকি রাদিল। বিয়ে ছাড়া তার সাথে আমার সেই হিসাব চুকানো যাবে না।
মারিদের কথায় রাদিল ভ্রুর কুঁচকে বলল…
‘তুই রিভেঞ্জ নিতে বিয়ে করবি অপরিচিতাকে?
মারিদ উত্তর দিল না। প্রসঙ্গ পাল্টে বলল…
‘কাল থানচি যাচ্ছি। হসপিটালের প্রজেক্টের কাজের জন্য তোর বা রিফাতের সাহায্যের প্রয়োজন হতে পারে।
‘তোর সঙ্গে এবার আমি যাব। তবে থানচিতে তোর হসপিটাল বানানোর কোনো পরিকল্পনা ছিল না। তাহলে হঠাৎ থানচিতে এত টাকা খরচ করে হসপিটাল বানাতে চাইছিস কেন? অপরিচিতার জন্য?
মারিদ হঠাৎ গা ছেড়ে চেয়ারে বসল। রাদিলের দিকে তাকিয়ে ভারি গলায় বলল…
‘ভালোবাসায় সম্রাট শাহজাহান তাজমহল বানিয়েছিল, আমি না-হয় একটা হসপিটাল বানালাম। দোষ কী তাতে?
‘তাহলে তুই আশনূরকে বিয়ে করছিস এটা নিশ্চিত?
বিয়ের প্রস্তাব কাকে দিবি? হাসান মেম্বারকে, নাকি আশনূরকে?
চলিত…..
Share On:
TAGS: ডাকপ্রিয়র চিঠি, রিক্তা ইসলাম মায়া
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ১
-
ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ৩
-
ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ২২
-
ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ১২
-
ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ১০
-
ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ১৫
-
ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ৫
-
ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ৭
-
ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ১৬
-
ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ৮