ডাকপ্রিয়র_চিঠি
লেখিকাঃরিক্তাইসলাম মায়া
১৬
সিকদার নিবাসের পশ্চিম পুকুর ঘাটে বসে মারিদ। হাতে যান্ত্রিক ফোন, ভিডিও কলে কথা বলছে রাদিলের সঙ্গে। রিফাত যেমন মারিদের ফুফাতো ভাই হয় ঠিক তেমনই রাদিলের সঙ্গেও সৈয়দ বংশের একটা আত্মীয় সম্পর্ক আছে। রাদিলের নানি কামরুন্নাহার মারিদের দাদা সৈয়দ শাহর আপন বোন ছিলেন। রাদিলের মা হীরা শেখ মারিদের বাবা মাহবুব আলমের আপন ফুফাতো বোন হওয়ার,সুবাধে রাদিল ছোট বেলা থেকেই মারিদের বাড়িতে আসা যাওয়া করত। সম্পর্কের বাইরে রিফাত, মারিদ, রাদিল তিনজন ঘনিষ্ঠ বন্ধু। রিফাত-রাদিল ঢাকা মেডিকেলে পড়লেও মারিদ ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। পড়াশোনার বাইরে তিনের ঘনিষ্ঠতা চোখে পড়ার মতোন। রাদিল ফোনে ওপাশ থেকে গমগমে গলায় বলল…
‘ অপরিচিতা মেয়েটিকে এখনো সনাক্ত করতে পারিস নি তোরা?
মারিদ উত্তর দেওয়ার আগেই পাশে বসা রিফাত হৈচৈ করে মারিদের থেকে ফোন টেনে বলল…
‘ হ ভাই কি মেয়ে সনাক্ত করব আমরা? আতঙ্কে জান শেষ। এই বাড়ির মানুষ কথা বলার আগেই দা-ছুরি নিয়ে দৌড়োয়। কাল থেকে কলিজা হাতে নিয়ে বসে আছি। কোন সময় জানি ভয়ে কলিজা আমার লাফিয়ে নিচে পড়ে যায় আল্লাহ জানে। ভাবছিলাম এবার থানচিতে এসে বিয়েটা সেরে ফেলব কিন্তু শ্বশুরবাড়ির দা-ছুরি দেখেই কুপোকাত হয়ে গেলাম। বিয়ের প্লানিংও ক্যান্সেল করতে হবে এদের জ্বালায়।
মারিদ-রাদিল দুজনই বিরক্ত রিফাতের আহাজারিতে। হাসিব দূরে দাঁড়িয়ে। সেও রিফাতের কথায় সহমত। রাদিল বিরক্ত গলায় বলল…
‘ তুই ডাক্তার হলি কিভাবে রিফাত এত ছোট কলিজা নিয়ে? রোজ অপারেশন, মানুষ কাটাকাটি করতে তোর ভয় হয়না, অথচ সামান্য কয়েকটা মানুষের দা-ছুরি দেখে জবুথবু হয়ে যাচ্ছিস।
রাদিলের কথায় রিফাত বিদ্রুপ করে বলল..
‘ আমার ডাক্তার হওয়ার সাথে বর্তমান পরিস্থিতি তোর এক মনে হলো? আমি কি অপারেশন থিয়েটারের মানুষ মারি যে ভয় পাবো? তখন আমার অঙ্গভঙ্গি থাকে ভিন্ন। আমি মানুষের জীবন বাঁচাতে তাকে কাটি, মানুষ মারতে নয়। তাছাড়া সেখানে আমার জানের রিস্ক থাকে না। আমি নিরাপদ কিন্তু এখানে কাহিনী ভিন্ন। তুই বুঝবি না ভাই, দূরে আছিস তো তাই নিরাপদ।
রাদিল শান্ত স্বরে রিফাতকে বুঝাতে চেয়ে বলল..
‘ রিফাত, তোর হৈচৈ-এ মারিদ কিন্তু ধরা পড়ে যাবে। প্লিজ আপাতত পরিবেশটা শান্ত রাখ। তাছাড়া হাসান মেম্বার বাড়ির লোক তোদের উপর তো আর আক্রমণ করছে না। তাঁরা নিশ্চয়ই কোনো বিপদে কিংবা সংঘাতে পড়ে তলোয়ার হাতে তুলে নিয়েছে। মানুষ যখন খুব বেশি বিপদে পড়ে যায়, তার জন্য যখন কোনো পথ খোলা থাকে না, একেবারে দেওয়ালে পিঠ ঠেকে যায়, তখন মানুষ অস্ত্র হাতে তুলে নেয়। হয় মরতে, নাহয় মারতে। আমারও মারিদের মতো মনে হচ্ছে এই বাড়ির মানুষ কোনো ভেড়া জালে আটকে। তুই হৈচৈ না করে পরিস্থিতি বুঝার চেষ্টা কর। মারিদকে ওর কাজ করতে দে। অপরিচিতা মেয়েটাকে চেনা দরকার। এত কষ্ট করে তীরে এসে নৌকা ডোবালে হবে না রিফাত। তোর হৈচৈ কিন্তু মারিদকে বিপদে ফেলবে, বুঝেছিস?
মারিদ, রাদিল, রিফাত তিনজনই অত্যন্ত মেধাবী আর কর্মমুখী ছেলে। মারিদ-রাদিল একটু সিরিয়াস ধরনের মানুষ হলেও রিফাত একটু ফান টাইপের মানুষ। রিফাত সবসময় হাসিঠাট্টায় সবকিছু উড়িয়ে দিলেও তাকে যখন কোনো কিছু নিয়ে বোঝানো হয়, তখন সে মারিদ-রাদিলের মতোই সিরিয়াল হয়ে যায়। এই যেমন এখন হলো। রিফাত সিরিয়াস হওয়া ভঙ্গিতে বলল…
‘ আচ্ছা ওকে, মারিদকে আমি বিপদে ফেলব না, চুপ থাকব। তবে যদি হাসান মেম্বারের ছোটো মেয়ে নূরজাহান মারিদের অপরিচিতা না হয়, তাহলে সে কিন্তু আমার ভাগে আসবে রাদিল। আমি আগেই বলে রাখছি। আমি কিন্তু নূরজাহানকেই বিয়ে করব।
‘ শালা, তোর কয়টা গার্লফ্রেন্ড লাগে?
রিফাত বেশ সিরিয়াস গলায় বলল…
‘ গার্লফ্রেন্ড চাইলে মানুষ অনেককেই বানাতে পারে, তবে বউ কিন্তু একটাই হয়।
‘ মারিদ তোর বকবক সহ্য করছে কারণ ও এখনো চিনতে পারছে না হাসান মেম্বারের কোন মেয়ে মারিদের অপরিচিতা হয়। একবার যদি মারিদ চিনতে পারে, আর কোনো ক্রমে যদি নূরজাহান মারিদের অপরিচিতা বের হয়, তাহলে তোর রক্ষা আমিও করতে পারব না রিফাত দেখিস। তুই ভাই হিসাব করে কথা বলিস।
রিফাত আড়চোখে মারিদের দিকে তাকাল। দেখল মারিদ অন্যমনস্ক হয়ে তাকিয়ে আছে অন্যদিকে। রিফাত মারিদের দৃষ্টি অনুসরণ করে দেখল অদূরে মাথায় ওড়না পেঁচিয়ে বাবার পায়ে তেল মালিশ করছে নূরজাহান। পাশেই তারানূর বেগম বসে পান চিবোচ্ছে। এখন দুপুর একটা। সকালের ঘটনায় হাসান মেম্বারের উপর গাড়ী পড়ায় তিনি কপালে ব্যথা পেয়েছিলেন, তাছাড়া তেমন কোনো ক্ষতি হয়নি কাদামাটির উপর পড়ায়। বাম-পাটা হয়তো মচকে গেছে যেটা এখন নূরজাহান তেল মালিশ করে দিচ্ছে সেটা। তবে মারিদের ধারণা মতে, তখন সবচেয়ে বেশি ব্যথা নূরজাহান মেয়েটি পেয়েছিল। গাড়ির পেছনের চাকা নূরজাহানের কোমর ও পায়ের উপর পরে ছিল, সেই সূত্রে বলা যায় নূরজাহান মেয়েটি ব্যথা পেয়েছিল সবার থেকে বেশি। অথচ অদ্ভুত বিষয় হচ্ছে এই বাড়ির কেউ নূরজাহান মেয়েটিকে নিয়ে চিন্তিত দেখাল না আর না ডাক্তার দেখানোর প্রয়োজন মনে করল। ডাক্তারি ফার্স্ট-এইড বক্স হাসান মেম্বারের বাড়িতে থাকায় রিফাত তাতে চিকিৎসা চালাল হাসান মেম্বার, আশনূর এমনকি অটোরিকশা চালক রশিদেরও। অথচ কেউ নূরজাহানের কথা বলল না হাসান মেম্বার ছাড়া। তিনি বারবার নূরজাহানকে জিজ্ঞেস করছিলেন কোথাও ব্যথা পেয়েছে কিনা। নূরজাহানের ঠোঁটের কোণায় শুকিয়ে যাওয়া কাটা দাগটা দেখে মারিদের মনে হয়েছে এটা দুর্ঘটনায় পাওয়া তাজা ব্যথা নয়। এটি অন্য সময় পাওয়া আঘাত ছিল। মারিদ বেশ করে চেয়েছিল নূরজাহান মেয়েটির চিকিৎসা চলুক কিন্তু সে আগ বাড়িয়ে কথা বলেনি এই নিয়ে, বিষয়টা দৃষ্টিকটুর দেখাবে বলে তাই।
রিফাত অন্যমনস্ক মারিদের বাহু ঝাঁকিয়ে বলল…
‘ এই মারিদ, ওখানে কি দেখিস?
মারিদ স্বাভাবিক হলো। চকিত হাতের ফোনটার দিকে তাকিয়ে বলল…
‘ হ্যাঁ বল।
মারিদের অন্যমনস্ক মনোভাব বুঝে রাদিল বলল…
‘ ঢাকা কবে ফিরবি?
‘ কাল।
‘ কাল চলে আসলে আজকের ভিতরে খুঁজে বের করতে পারবি কে অপরিচিতা? আশনূর নাকি নূরজাহান? তোর কি মনে হয় মারিদ আসলে কে অপরিচিতা? কারও কথায় তোর সন্দেহ হয়? কন্ঠ পরিচিত লাগে?
মারিদ বেশ স্বাভাবিক নেয় বলল…
‘ আমাদের ফোনে কথা হতো আরও বছর খানেক আগে। আমি ফোনের কণ্ঠের মেয়েটির সাথে বাস্তবের আশনূর নূরজাহান দুজনকেই গুলিয়ে ফেলছি। হাসান মেম্বারের দুই মেয়ের কন্ঠ আমার কাছে একই মনে হচ্ছে, সেজন্য সনাক্ত করা কঠিন লাগছে।
‘ আচ্ছা এমনও তো হতে পারে যে হাসান মেম্বারের কোনো মেয়েই তোর অপরিচিতা না। আর সেজন্য তুই আশনূর, নূরজাহান কাউকে চিনতে পারছিস না। তোর অপরিচিতা হলে তো মেয়েটিও তোকে চেনার কথা। যেহেতু তোকে কেউ চিনতে পারছে না, তাই ধরে নেওয়া যায় ওরা কেউ তোর অপরিচিতা না।
মারিদ সম্মতি দিয়ে দৃঢ় গলায় বলল…
‘ হতে পারে। তবে সেটাও আমি নিশ্চিত হতে চাই যে ওরা কেউ আমার অপরিচিতা নয়। তানিয়া মেয়েটা যেহেতু আমাকে এই ঠিকানায় পাঠিয়ে, তারমানে এখানে কিছু একটা আছে। হয় আমার অপরিচিতা, নয়তো অন্য কিছু। তবে এখান থেকে আমি খালি হাতে ফিরে যাব না, এতোটা দৃঢ় বিশ্বাসে বলতে পারি।
‘ যদি তানিয়া মেয়েটা তোকে মিথ্যা ঠিকানা দেয়, তাহলে?
‘ তাহলে আবার মুখোমুখি হবো তানিয়ার। আমি জানি তানিয়ার কাছেই আমার অপরিচিতার সন্ধান আছে।
মারিদের কথায় রাদিল খানিকটা চিন্তিত ভঙ্গিতে বলল…
‘ অপরিচিতাকে খুঁজে পেলে কি করবি, কিছু ভেবেছিস?
মারিদ নিশ্চুপ। সে অপরিচিতাকে খুঁজে পেলে কি করবে তা সে নিজেও জানে না। মারিদ শুধু জানে তাঁর অপরিচিতাকে দরকার। খুব দরকার।
~~
দুপুরের সময়। মারিদের খাওয়ার জন্য হাসান মেম্বারের কাজের ছেলে মান্না এসে ডেকে গেছে। রিফাত-হাসিব দুজন মান্নার সাথে গিয়েছে খেতে। মারিদ ‘আসছি’ বলেও পুকুর ঘাটে বসে। মাথায় এলোমেলো চিন্তারা দলা পাকাচ্ছে। মারিদ শান্ত, গভীর পুকুরটির দিকে তাকিয়ে এক দৃষ্টিতে। বিস্তর পুকুরের, চারটি ঘাট চার পাড়ে আছে। মারিদ, সিকদার বাড়ির দুপুর ঘাটে বসে। বাকি তিনটার একটা খালি। বাকি দুটোতে মানুষ দেখা যাচ্ছে, দুই একজন করে গোসল কিংবা থালাবাসন ধুচ্ছে।
তবে সকলের চাওনি এ ঘাটে মারিদের উপর। যবে থেকে মারিদ এই ঘাটে বসেছে, অপর ঘাটের মানুষগুলো বারবার মারিদের দিকে তাকাতে দেখেছে। কেউ বা আবার আঙুল তুলে মারিদকে দেখিয়ে সরাসরি কানাঘুষা করেছে। মারিদ বোঝে না সবার এত ভয়-কৌতূহল কেন এই ‘সিকদার নিবাসকে’ নিয়ে? কি এমন আছে এই হাসান মেম্বারের বাড়িতে যা সকলের জন্য আতঙ্কের কারণ? কই মারিদের তো একবারের জন্যেও মনে হয়নি এই বাড়ির মানুষগুলো বিপজ্জনক, ক্ষতিকর? বরং মনে হয়েছে এই বাড়ির মানুষগুলো অন্তত ভালো। নাকি মারিদ কোথাও ভুল করছে দেখতে? খালি চোখে মারিদ এই বাড়িকে যা দেখছে, সেসব কাগজের ফুলের মতোন মিথ্যে, বানোয়াট? চিন্তিত মারিদের মাথার শিরা দপদপ করল, কিলবিলিয়ে। সে জীবনে কখনো এত গোলকধাঁধায় ফাঁসেনি যতটা অপরিচিতা খোঁজে এসে আটকে যাচ্ছে। এই বাড়িতে যদি মারিদের অপরিচিতা সত্যি থাকে, তাহলে
মারিদকে চমকে দেওয়ার মতোন নিশ্চিয়ই কোনো কাহিনী আছে এই বাড়িকে ঘিরে। মারিদের সবচেয়ে বেশি যাকে অদ্ভুত লাগে সে হলো নূরজাহান। মেয়েটি সুন্দরের চেয়ে মায়াবতী বেশি। থমকে যাওয়ার মতোন অপরূপা। তেমনি অদ্ভুত। আশনূর শ্যামাকন্যা, সুন্দর। ফোনে অপরিচিতার বিবরণ দেওয়া অনুযায়ী আংশিক মিলে যায় আশনূরের সাথে।
কাল মারিদকে ঢাকা ফিরতে হবে। ব্যবসা ফেলে হঠাৎ এভাবে কোথাও থাকা যায় না। তাছাড়া হাসিব মারিদের সাথে রয়েছে, সেজন্য ঘণ্টায়-ঘণ্টায় কাজের সাইড থেকে কল আসছে। মারিদ কাল ঢাকা চলে গেলে মেয়ে দুটোর সনাক্তকরণের জন্য ওকে পুনরায় এই থানচিতে আসতে হবে। নতুন বাহানা বানানো যাবে না। পুরাতনটা দিয়ে কাজে লাগাতে হবে। তাছাড়া মারিদের এতটা অর্থসম্পদ আছে যে থানচিতে একটা কেন দশটা হাসপাতাল বানালেও তার টাকা ফুরাবে না। আপাতত অপরিচিতার খোঁজে বারবার তাকে এই গ্রামে আসতে গেলে অবশ্যই মারিদকে একটা হাসপাতালের প্রজেক্ট শুরু করতে হবে বাহানা হিসাবে। এই বিষয়টা নিয়ে সে সারারাত ভেবে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। হাসান মেম্বারকে কথা জানিয়ে সে এই বাড়িতে আসা যাওয়ার একটা রাস্তা করবে। মারিদের মনস্তাত্ত্বিক ভাবনায় হঠাৎ বিঘ্ন ঘটিয়ে ফের হাতে যান্ত্রিক ফোনটি বেজে ওঠাতে মারিদ ফোনের স্ক্রিনে তাকিয়ে দেখল ওদের বাড়ি থেকে ফোন। মারিদের মা সালমা সৈয়দ কল করেছে ভেবে মারিদ ফোনটি রিসিভ করতেই ভিডিও কলে ভাসল সুখের ক্লান্ত, ঘামমাখা মুখটা। বেশ অভুক্তিতে বলল সুখ….
‘ রাদিল ভাই আমাকে খুব ডিস্টার্ব করে ভাই। আমার পরীক্ষা কেন্দ্রের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকে বখাটে ছেলেদের মতোন। আমাকে উত্ত্যক্ত করে। উনার বাইকের পিছনেও আমাকে উঠাতে চায়। তুমি এর একটা বিচার করো ভাই। রাদিল ভাই কেন আমাকে বারবার ডিস্টার্ব করবে বলো?
বেশ রাগ নিয়েই কথাগুলো বলে সুখ। মারিদ কপাল কুঁচকে সুখের মুখের দিকে তাকায়। মাত্র পরীক্ষা দিয়ে হল থেকে বাসায় ফিরে হয়তো মারিদকে বিচার দিতে ফোন নিয়ে বসে গেছে। গায়ে সাদা ড্রেসটাও পরিবর্তন করেনি। তবে রাদিলের বিরুদ্ধে কথাগুলো মারিদের বিশ্বাস হয়েছে কিনা কে জানে? মারিদ তক্ষুনি ছোট উত্তরে বলল…
‘ আচ্ছা বিচার করব নে।
মারিদের সম্মতিতে সুখ হৈ হৈ করে বলল..
‘ শুধু বিচার না ভাই, ভালো মতোন বিচার করবে বুঝেছ? এমন বখাটে ডাক্তার কেন হলো সেটা জিজ্ঞেস করবে আগে। উনার ঘরে বোন নেই বলে অন্যের বোনকে ডিস্টার্ব করবে সেটা তো অন্যায়। এমন হলে রাদিল ভাই বিয়ে করে নিলেই তো হয়।
মারিদ তীক্ষ্ণ চোখে সুখের দিকে তাকিয়ে সন্দিহান গলায় বলল…
‘ কাকে বিয়ে করবে, তোকে?
মারিদের কথায় সুখ লজ্জা কিংবা থতমত খাওয়ার কথা ছিল কিন্তু চঞ্চল সুখের মাঝে তার কিছুই দেখা গেল না। উল্টো মারিদের কথায় ঘুরিয়ে প্যাঁচিয়ে তাল দিয়ে বলল সুখ..
‘ যদিও আমি আমার বিয়ের কথা বলিনি, তবে তোমরা যখন চাচ্ছো, তখন আমার কোনো আপত্তি নেই বিয়েতে। এমন বখাটে ডাক্তারকে নাহয় কষ্ট-মষ্ট করে তোমাদের মুখের দিকে তাকিয়ে মানিয়ে নিব। কিন্তু তারপরও তুমি বলে দিও তোমার বখাটে ডাক্তার বন্ধুকে যেন আমি বড় না হওয়া অবধি অন্য কোথাও মুখ না মারে।
কথাটা বলেই ফট করে কল কেটে দিল সুখ। সুখের রাদিলের প্রতি অন্য রকম দৃষ্টি ভঙ্গি ব্যাপারটা সে রাদিলের দেশে ফিরার পর থেকে লক্ষ্য করছিল। সুখ একটা খোলা বইয়ের মতো চাইলেই পড়া যায়, কিন্তু রাদিলের মনে কি চলে বোঝা মুশকিল। রাদিল সুখের এসব বিষয়ে যে আগ্রহী, তেমনটাও নয়। বরং রাদিলের আচরণে স্পষ্ট সে সুখকে পছন্দ করে না। এখন রাদিল কাকে পছন্দ করে সেটাও মারিদ কখনো জিজ্ঞেস করেনি আর না রাদিল কখনো নিজ থেকে বলেছে এসব।
‘ এই ছেমড়া, বাড়ি কোনখানে তোমার? এই বাড়িতে কার আত্মীয় লাগো তুমি?
কান থেকে ফোন নামাতে একটা ভারী গলা শুনল। মারিদ পাশে তাকাতে দেখল কিছুদূরে দাঁড়িয়ে একজন মধ্যবয়স্ক মহিলা। মুখভঙ্গি তীক্ষ্ণ। মারিদ সাবলীল গলায় উত্তর দিয়ে বলল…
‘ আমি এই বাড়ির কারও আত্মীয় নয় চাচী। হাসান মেম্বারের বাড়িতে আমরা একটা প্রজেক্টের কাজে উঠেছি।
মারিদের কথায় মহিলাটির মাঝে একটা বিচলিত ভাব দেখা গেল, যেন তিনি খুব লুকায়িত কিছু মারিদকে বলতে চান। মহিলাটি আশেপাশে তাকিয়ে ক্ষীণ স্বরে বলল…
‘ শোনো ছেঁমড়া, যে কামেই এই বাইত্তে আইয়া থাহো তাড়াতাড়ি পালাইয়া যাও। তুমি এহনও জানো না এই বাড়ি হইলো অভিশপ্ত বাড়ি। গেরামের মানুস এই বাড়িরে রাক্ষসী বাড়িও কয়। এহনও সময় আছে পোলা, জান লইয়া তাড়াতাড়ি পালাও। নইলে এই বাড়ি তোমাগোরেও গিল্লা খাইব।
মারিদের দৃষ্টি তীক্ষ্ণ। কপাল কুঁচকে তাকাল মধ্যবয়স্ক মহিলাটির দিকে। এখানে আসার পর থেকে মারিদ দুই দলের সাক্ষাৎ পেয়েছে এই বাড়িকে ঘিরে। একদল হাসান মেম্বারের বাড়িকে ভালো বলছে আবার অন্যদল প্রচন্ড খারাপ। মারিদ বুঝতে পারছে না কোনদল সঠিক? আসলেই হাসান মেম্বারের পরিবার ভালো নাকি খারাপ?
‘ কি হইলো পোলা, কি ভাবতাছো? আমার কথা হোনো ভালাই থাকতে পালাই যাও। এই বাড়ির মানুসের রহস্য তুমি জানো? এই বাড়িতে লাশ…
কথা বলতে বলতে হঠাৎ থেমে যায় মধ্যবয়স্ক মহিলাটি। মারিদ মহিলাটিকে চলে যেতে দেখে গলা উঁচিয়ে পিছন ডাকল ‘ চাচী কোথায় যাচ্ছেন। কথাটা তো শেষ করে যান। চাচী?
মহিলাটি মারিদের ডাক উপেক্ষা করে দ্রুত পদে হেঁটে পালিয়ে গেল। কিন্তু পাশ থেকে শোনা গেল আশনূরের ডাক, বলল…
‘ আপনি কাকে ডাকছেন? কে কথা শেষ করে যাবে?
মারিদ আশনূরকে দেখতে পেয়ে মনে হলো তখনকার মধ্যবয়স্ক মহিলাটি হয়তো আশনূরের আগমনে ঐভাবে কথার মাঝে পালিয়ে গেছে। কিন্তু মহিলাটি মারিদকে তখন কি বলতে চেয়েছিল, সেটা শোনার জন্য মারিদের মনে খানিকটা কৌতূহল জাগলেও দমে গিয়ে আশনূরকে বলল…
‘ একজন বয়স্ক মহিলা এসেছিল আবার চলেও গেল।
আশনূর মহিলাটির পিছনে তাকিয়ে চেনার চেষ্টা করে বলল…
‘ চলে গেল কেন?
‘ হয়তো আপনাকে দেখে।
আশনূর বেশ অবাক চোখে মারিদের দিকে তাকিয়ে বলল…
‘ আমাকে দেখে?
‘ আমার তো তাই মনে হলো।
আশনূর হঠাৎ প্রসঙ্গ পাল্টে বলল…
‘ আচ্ছা চলুন খাবেন।
মারিদ জায়গা ছেড়ে উঠলো না, বরং আশনূরের সাথে কথা চালিয়ে বলল…
‘ আচ্ছা আপনি একবার শুদ্ধ ভাষা, অন্যবার আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলেন কেন?
আশনূর সুন্দর হেঁসে জবাব দিয়ে বলল…
‘ আমরা মানুষ ভেদে শুদ্ধ-অশুদ্ধ কথা বলি। পরিবারের মানুষ ছাড়া বাহিরের কারও সাথে আমরা আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলি না। সেজন্য আপনাদের সাথে সবসময় শুদ্ধ ভাষায় কথা বলা হয়।
‘ আপনারা কি সবাই শুদ্ধ ভাষায় কথা বলেন?
‘ উহুঁ। দাদী আর আব্বা বাদে বলতে পারেন আমরা সবাই কমবেশি শুদ্ধ ভাষায় কথা বলি। আমাদের ঘরে যে দুটো ছেলে মেয়ে দেখেছেন নুহাশ আর তুতুল? ওরা আমার বড় ভাইয়ের সন্তান। আমরা সবাই ওদের সাথেও শুদ্ধ ভাষায় কথা বলার চেষ্টা করি কারণ আমরা যা বলব ওরা তাই শিখবে সেজন্য।
মারিদ ফের আরেকটা প্রশ্ন করে বলল..
‘ আচ্ছা আপনার বাবা বাদে আপনার কোনো ভাইদের বাড়িতে দেখলাম না, সেটা কেন?
আশনূর মাথার কাপড়টা টেনে বলল…
‘ আমার বড়ো দুই ভাই মাস্টার্স কমপ্লিট করে ব্যবসা করে। সেজন্য উনাদের তেমন একটা বাড়িতে পাওয়া যায় না। বড় ভাইয়ের বউ-বাচ্চা আছে বলে উনি সাপ্তাহে শুক্রবার আসার চেষ্টা করেন কিন্তু মেজো ভাই তিনমাস অন্তর অন্তর আসে। ছোট ভাই আহাদ? সে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে পড়াশোনা করছে। আমি আর আহাদ যমজ। আমি থানচি সদরের একটা কলেজ অনার্স করছি ৪র্থ বর্ষে আছি।
এতটুকু বলে আশনূর থেমে যেতে মারিদ ফট করে নূরজাহানের প্রসঙ্গ টেনে বলল..
‘ আর আপনার ছোট বোন নূরজাহান সে কিসে পড়ে?
মারিদের প্রশ্নে আশনূর ম্লান হেঁসে উত্তর দিল…
‘ নূরজাহান এই বছর ইন্টার ফার্স্ট ইয়ারের ফাইনাল পরীক্ষা দিবে। আসলে ওর মাঝে কয়েক বছর পড়াশোনা গ্যাপ যাওয়ায় ও পড়াশোনায় আমাদের থেকে পিছনে পড়েছে। তবে ও ছাত্রী হিসাবে কিন্তু চমৎকার। অত্যন্ত মেধাবী আর বুদ্ধিমতী। ওর সাথে কখনো কথা হলে বুঝতে পারবেন।
আজ সকালেই মারিদ আশনূরকে দেখেছিল নূরজাহানের সঙ্গে খারাপ আচরণ করতে কিন্তু এখন আশনূরকে নূরজাহানের প্রশংসা করতে দেখে মারিদ খানিকটা কপাল কুঁচকাল। তখন মারিদের মনে হয়েছিল হয়তো কোনো কারণে আশনূর নূরজাহানকে পছন্দ করে না, কিন্তু এখন মনে হচ্ছে ব্যাপারটা অন্য কিছু। আশনূরের এমন দুমুখো আচরণ কেন? মারিদ অন্য প্রসঙ্গে বলল…
‘ আপনাদের বাড়িটা সুন্দর, গ্রামটাও সুন্দর কিন্তু ঘুরা হলো না।
‘ আপনি চাইলে কাল ঘুরতে যেতে পারেন।
‘ কাল আমরা ঢাকায় ফিরে যাব।
‘ কেন?
‘ কাজ ফেলে এসেছি, যাওয়া জরুরি। তবে আবার আসব।
‘ ওহ আচ্ছা।
তারপর কয়েক সেকেন্ড নিরবতা। মারিদ আশনূরের মাঝে অপরিচিতা খোঁজ করল। মারিদের সাথে ফোনে কথা বলা অপরিচিতার সাথে কি আশনূরের কন্ঠের মিল আছে? আশনূর নিরবতা ভেঙে বলল…
‘ আব্বাকে বলে দিব আজ বিকালে যেন আপনাদের নিয়ে আমাদের গ্রামের পথে ঘুরতে বের হয়।
‘ আঙ্কেল তো অসুস্থ।
‘ তাহলে মান্নাকে বলে দিব আপনাদের নিয়ে যেতে।
‘ আচ্ছা।
‘ এখন চলুন।
‘ কোথায়?
‘ খাবেন না?
‘ জি চলুন।
~~
দুপুরে খাওয়ার টেবিলে মারিদ, রিফাত, হাসিব, হাসান সিকদার, তারানূর বেগম, একত্রে গোল করে বসে। আশনূর পাঁচ বছরের নুহাশকে হাতে তুলে খাইয়ে দিচ্ছে তারানূর বেগমের পাশাপাশি চেয়ারে বসে। হাসান সিকদারের স্ত্রী কিংবা ছেলের বউকে মারিদ এখনো দেখেনি। মহিলা গুলো যে নিজ থেকে সামনে আসছে না সেটা মারিদ বুঝতে পারছে। তবে ভিতর ঘর হতে তাদের উপস্থিতির শব্দ শোনা যায়। মান্না ডাইনিংয়ের পাশে দাঁড়িয়ে সবাইকে হাতে হাতে এটা সেটা বেড়ে দিচ্ছে। এরমাঝে মারিদ বলল….
‘ আঙ্কেল আমরা কাল ঢাকায় ফিরে যেতে চাই।
মারিদের কথায় হাসান সিকদার আপত্তি জানিয়ে বলল…
‘ কি কও বাজান, তুমি না কইলা কয়দিন থাকবা আমাগো লগে। তোমারে হাসপাতালের লাইগা জমি-জমা তো কিছুই দেইখাতে পারি নাই। এত তাড়াতাড়ি আবার চইলা যাইবা ক্যান?
মারিদ শান্ত নিরন্তর কন্ঠে বলল…
‘ আমরা আবার আসব আঙ্কেল। আপনি হাসপাতালের জন্য ভালো কয়েকটা জমি দেখে রাখবেন। আমি নাহয় সেখান থেকে একটা বাছাই করে তার উপরই হাসপাতাল বানাব।
‘ হের পরেও বাজান তুমি থাকলে ভালা হইতো।
‘ খুব জরুরি না হলে যেতাম না আঙ্কেল। আপনার সঙ্গে আরও দুটো দিন থেকে জমি সিলেক্ট করে যেতাম কিন্তু হঠাৎ কাজে চাপ পড়ায় থাকতে পারছি না। তবে আমি বিশ্বাস করি এই গ্রামের ভালোটাই আপনি চাইবেন। আমরা আপনার পছন্দের জায়গায় হাসপাতালের কাজ শুরু করব। পরবর্তী সময়ে আমি যখন আবার আসব তখন আমার সাথে একজন ইঞ্জিনিয়ারকেও নিয়ে আসব আঙ্কেল।
তারানূর বেগম পাশ থেকে খাওয়া রেখে বলল….
‘ বাংলাদেশে এত গেরাম থাকতে তোমরা আমাগো গেরামে ক্যান হাসপাতাল বানাইবা?
তারানূর বেগমের সন্দেহ ভেঙে মারিদ চট করে মিথ্যা বলে বলল…
‘ এটা সরকারি প্রজেক্ট দাদী। সরকার চায় আমরা আপনাদের গ্রামসহ যতগুলো গ্রাম দুর্গম ও সুবিধাবঞ্চিত আছে তাদের সুবিধার্থে যেন একটা করে হাসপাতাল বানাই। অন্যান্য গ্রামের জমি সিলেক্ট করে হাসপাতালের কাজও শুরু হয়ে গেছে শুধু আপনাদের গ্রামের কাজটা পিছিয়ে আছে দাদী।
মিথ্যাগুলো মারিদ আগ থেকেই মনে মনে গুছিয়ে রেখেছিল, বিদায় বলতে তার এখন মুখে বাধল না। তারানূর বেগমও বিশ্বাস করে বলল…
‘ তাইলে তোমরা সরকারি মানুস?
‘ জি দাদী।
পাশ থেকে হাসান সিকদার বলল…
‘ তুমি আবার কবে আসবা বাজান?
‘ দশ-পনেরো দিনের মতো সময় লাগবে ফিরতে আঙ্কেল।
হাসান সিকদার ঝটপট কথায় বলল…
‘ তুমি হেরপর থেইক্কা যখোন এই গেরামে আওন-যাওন করবা, তখোন আমার বাড়িতে উঠবা বাজান। তোমাগো লাইগা আমার বাড়ির দরজা হোগল সময়ই খোলা আছে।
‘ আপনি আমাকে লজ্জা দিছেন আঙ্কেল। আমরা হোটেলে রুম ম্যানেজ করে নিব। আপনারা চিন্তিত হবেন না।
হাসান সিকদারের কিছু বলার আগে তারানূর বেগম মুখে টানটান ভাব নিয়ে বলল…
‘ হোনো ভাই, তোমার মতোন আমার তিনখানা নাতি আছে। ওরা সামনের সপ্তাহে আসবে বাইত্তে। তুমি আমার তিনটা নাতির মতোন হও। কোনো দিন শরমাইবা না এই বাইত্তে আসতে। আমি তোমারে আদেশ করতাছি এক্কেবারে নিজের বাড়ির লাহান আওন-যাওন করবা হোগল সময়। তুমি আমাগো গেরামে ভালা করতে আইছো হাসপাতাল বানাইয়া। তোমারে হাসান সবকিছুতে উপকার করব, বুঝলা?
‘ জি দাদী।
~~
মাগরিবের আযান পড়বে পড়বে ভাব। সূর্য পশ্চিম আকাশে লাল অগ্নি শিখার মতোন জ্বলে। শীতে উষ্ণ কুয়াশা চারপাশে চাদরের মতোন জড়িয়েছে। এই অসময়ে মারিদ ঘর থেকে বেরুলো। থানচি গ্রামে এসে মারিদ নেটওয়ার্কের বেশ সমস্যায় পড়েছে। কিছুতে নেটওয়ার্কের নাগাল পাওয়া মুশকিল। এক সেকেন্ডে নেটওয়ার্ক আসলে, পর সেকেন্ড পাওয়া দুষ্কর। মারিদ ঘর থেকে বেরিয়ে প্রথম উঠোনে, তারপর টিনের গেইট পেরিয়ে মাটির রাস্তায় দাঁড়াল হাতের ফোনটা উঁচিয়ে নেটওয়ার্কের আশায়। হাসান মেম্বারের বাড়ির গেইটের পেরিয়ে কিছুদূর লাঠিয়াল লোকগুলোর থাকার ঘর আছে আলাদা। সেখানে খাওয়াদাওয়া, বসবাসরত প্রয়োজনীয় সবকিছুই আছে তাদের জন্য। মারিদ কাল এই বাড়িতে আসার সময় এই ঘরটা লক্ষ্য করেনি। আজ সকালেই হাসান সিকদারের সঙ্গে হাঁটতে বেরিয়ে নজরে পড়েছিল তাঁর। মারিদ নেটওয়ার্কের খোঁজে বিশ কদমের মাটির রাস্তা পেরিয়ে গিয়ে দাঁড়াল বিশাল বিস্তৃত বটগাছের নিচে। বিশাল বটগাছে বড় বড় লম্বা ঝুরি গুলো ডাল বেয়ে মাথার উপর ঝুলছে। এই গ্রামের মানুষের বিশ্বাস বটগাছটি একটা রাক্ষসী, দোষী গাছ। এই গাছে বছরের পর বছর ধরে বসবাস করে খারাপ জ্বিনের দল। ওরা মানুষ মারে। ছোট বাচ্চা পেলে তাদের চোখ, কিডনি, কলিজা খুলে খায়। কয়েকদিন পরপর এই গাছের নিচে মরা মানুষের লাশও পাওয়া যায়। গ্রামবাসীর অনেকে চেয়েছিল এই অভিশপ্ত বটগাছটা কেটে দিতে কিন্তু দুষ্টু জিনের উৎপাতে কাটার মতোন সাহস কারও হয়নি। একবার তো এক মসজিদের হুজুর গ্রামের লোকজন নিয়ে দলবেঁধে এই বটগাছটা কাটতে চেয়েছিল কিন্তু হঠাৎ করেই ঐ মসজিদের হুজুরকেই বদজিনে ভর করল। তারপর সেকি তাণ্ডব হলো। মানুষকে বলতে শোনা যায় মসজিদের হুজুর বিগত একমাস তিনি কেবল প্যারালাইজড রোগীদের মতোন কাতর হয়ে বিছানায় পড়ে ছিলেন। হুজুরের দুর্দশা দেখে এরপর আর কেউ এই বটগাছটা কাটার দুঃসাহস দেখায়নি। এসব তো শোনা কথা। শহুরে ছেলে মারিদ এসব শুনলে নিশ্চয়ই বিশ্বাস করবে না। তবে এই মুহূর্তে যদি কেউ মারিদকে বটগাছের নিচে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখতো তাহলে অবশ্যই হুশিয়ার করতো। দ্রুত বাড়ি ফেরার জন্য সতর্কও করতো।
মারিদ নেটওয়ার্কের আশায় তখনো ফোন মুখের উপর উঁচিয়ে দাঁড়িয়ে। বিকাল করে হাসিব, রিফাত মান্নার সঙ্গে বেড়িয়েছিল গ্রাম ঘুরতে, মারিদ যায়নি, তার প্রয়োজনীয় কাজ ছিল বলে। কিন্তু সেই কাজটাই করা হচ্ছে না নেটওয়ার্কের সমস্যা থাকায়। মারিদ ফের ফোন ঝাঁকাল, বিরক্তিতে চোখ মুখ কুঁচকে এলো। তক্ষুনি একটা পুরু ভারী কন্ঠ ভেসে এলো কানে…
‘ এই গেরামে কিসের লাইগা আইছোত মরতে?
মারিদ চমকে পিছনে তাকাল, দেখল একটা খুব বয়স্ক বৃদ্ধা মহিলা দাঁড়িয়ে বটগাছের নিচে। হাতে মোটা গাছের শিকর চেপে দাঁড়িয়ে। চুলগুলো সব সাদা ধবধবে, গালের চামড়া ঝুলে আছে বয়সের বাড়ে। মারিদ তীক্ষ্ণ গলায় বলল..
‘ জি আমাকে বলছেন আপনি?
মহিলাটি ফের গমগমে ভারী আওয়াজে একই কথা বলে বলল…
‘ তোর এই গেরামে আসা ঠিক হয়নাই পোলা। তোর জীবনের মোড় ঘুইর্যা গেছে এইহানে আইসা। তোর খারাপ নসিবের টানছে তোরে এহানে, জীবনে অল্পকিছু পাইবি আবার অনেক কিছুই হারাইবি। মাইয়াটার খেয়াল রাখিস। যে যুদ্ধে নামছে হে সব ধ্বংস হইয়া খাস্ত হইবো। ভবিষ্যৎ বড়ই ভয়ানক। এইহান থেইকা ফিরা যা, আর আয়িস না এই গেরাম, তাইলে তোর ভালো হইবো। নইলে যে মায়া জ্বালের পিছনে ছুটতাছোত, হের লাইগা সর্বস্ব হারাইবি। চইলা যা এইহান থেইকা, ফিরা যা ঘরে পোলা ঘরে। এখনো সময় আছে নইলে সব শেষ হইয়া যাইবো। সব শেষ।
মারিদ বিষণ্ণ ঘোরে চলে গেল। মারিদের মনে হলো এই অদ্ভুত মহিলাটি মারিদের সম্পর্কে সবকিছু জানে। মারিদ বিষণ্ণ স্বরে বলল…
‘ আপনি আমাকে চিনেন? জানেন আমি এখানে কিসের জন্য এসেছি?
মহিলাটি ফের অদ্ভুত বাক্যে বলল…
‘ বাহানা দিইয়া কি আর সত্য লুকান যাই?
‘ বাহানা, কিসের বাহানার কথা বলছেন আপনি?
‘ হোনো পোলা, আমি সব জানি। তোর মনের খবরও জানি, আমি তাঁর খবরও জানি যার খোঁজে তুই এই গেরামে আইছিস। হোন, এখনো সময় আছে, ফিরে যা ঘরে। এই মায়ার ফাঁসাদে পড়িস না। সে অন্ধকার জগৎতে তলাইয়া গেছে, তার রক্ষা নাই। তুই নিজর জীবন বাঁচা।
বৃদ্ধা মহিলা কার কথা কি বলল কিছুই মারিদের মাথায় ঢুকল না। সবকিছু যেন মারিদের মাথার উপর দিয়ে গেল। মারিদ খানিকটা অস্থির, বিচলিত গলায় বলল…
‘ কিসের মায়া? কিসের ফাঁসাদের কথা বলছেন আপনি? কার রক্ষা নেই?
‘ এই মারিদ? এই! ঐখানে কি করিস তুই? একা একা কার সাথে কথা বলছিস?
রিফাতের হাঁক-ছাড়া কন্ঠের ডাকে মারিদ মুহূর্তে পিছনে ঘুরে তাকাল। দেখল মারিদের থেকে কিছু দূরে হাসিব, রিফাত, মান্না হেঁটে আসছে মারিদকে লক্ষ্য করে। মারিদ প্রচন্ড বিরক্ত হলো অসময়ে তাকে ডাকায়। মারিদ তৎক্ষণাৎ ঘাড় ঘুরিয়ে বিচলিত ভঙ্গিতে বৃদ্ধা মহিলাটির সঙ্গে কথা বলতে চেয়ে ‘ আপনি.. ‘ বলতে দেখল গাছের নিচে কেউ নেই। তক্ষুনি মাগরিবের আযানের ধ্বনি ভেসে এলো কানে ‘ আল্লাহু আকবার ‘ বলে। মারিদ কয়েক কদম হেঁটে গাছের নিচে তখনকার বৃদ্ধা মহিলাটির খোঁজ করে পরপর ডাকল….
‘ এই যে শুনছেন? কোথায় গেলেন আপনি? আমার আপনার সাথে কথা শেষ হয়নি। এই যে শুনছেন?
এই যে?
হাসিব, রিফাত, মান্না ততক্ষণে এগিয়ে এসেছে, মারিদকে ঘিরে দাঁড়িয়ে রিফাত বলল…
‘ এই অসময়ে এই গাছের নিচে কাকে খুঁজছিস তুই?
মারিদ চিন্তিত ভঙ্গিতে বলল…
‘ এখানে কিছুক্ষণ আগে একটা বৃদ্ধা মহিলা দাঁড়িয়ে আমার সাথে কথা বলছিল। কিন্তু হঠাৎ উনি কোথায় যেন চলে গেলেন। খোঁজে পাচ্ছি না।
মারিদের কথায় হাসিব অবাক হওয়া সুরে বলল…
‘ কি বলেন স্যার? আমরা সবাই তো দূর থেকেই দেখলাম আপনি একাই এই গাছের নিচে দাঁড়িয়ে একা একা কথা বলছেন। আমরা আপনার আশেপাশে আর কাউকে দেখিনি কথা বলতে। আপনার কথা বলা দেখে প্রথমে আমরা মনে করেছিলাম আপনি হয়তো ফোনে কথা বলছেন। সেজন্য রিফাত স্যার আপনাকে এতবার করে ডাকার পরও আপনি শুনছিলেন না।
হাসিবের কথায় রিফাত-মান্নাও সম্মতি দিল। রিফাত বলল…
‘ হ্যাঁ আমরা সবাই দেখেছি তুই একা দাঁড়িয়ে ছিলি এখানে। তোর সাথে আর কেউ ছিল না মারিদ।
মারিদ চিন্তিতের কপাল কুঁচকে বলল…
‘ তোরা আমার সাথে তখন বৃদ্ধা মহিলাটিকে দেখিস নি?
‘ না।
রিফাত-হাসিবের কথোপকথনে মান্না ভয়ে জড়সড় গলায় বলল…
‘ ভাইজানেরা তাড়াতাড়ি বাইত্তে চলেন। এইখানে আর থাকা যাইব না। এই ভাইজানের উপর বদজিনের নজর পরছে। এইখানে থাকলে আমাগোরে উপর ভর করব। তাড়াতাড়ি বাড়িতে চলেন। আয়েন। আয়েন।
মান্নার কথা রিফাত, মারিদ তেমন বিশ্বাস না করলেও হাসিব ঠিকই করল। সে গ্রামের ছেলে। তার গ্রামেও এসব দুষ্টু জিনের উপদ্রুত শোনা যায়।
চলিত
[ #ডাকপ্রিয়র_চিঠি গল্পের রিভিউ দিবেন অবশ্যই ]
[ বানান ভুল ম্যানশন করবেন কমেন্টে]
আমার আইডির লিংক..
Share On:
TAGS: ডাকপ্রিয়র চিঠি, রিক্তা ইসলাম মায়া
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ১৫
-
ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ১৩
-
ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ১১
-
ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ৩
-
ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ৫
-
ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ২২
-
ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ২০
-
ডাকপ্রিয়র চিঠি গল্পের লিংক
-
ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ৭
-
ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ১৮(প্রথমাংশ+শেষাংশ)