ডাকপ্রিয়র_চিঠি
লেখিকাঃরিক্তাইসলাম মায়া
১৩
ফেব্রুয়ারি মাস। কুয়াশার চাদরে ঢাকা পৃথিবী। ভোরের সূর্যের আলো যেন কুয়াশার এই পুরু পর্দা ভেদ করে ধরণীকে ছুঁতে পারছে না। কনকনে ঠান্ডায় উষ্ণতার পরশ পেতে মানুষ মোটা কাপড়ে নিজেদের মুড়ে নিয়েছে। সকাল তখন ৭টা ১০। এমন এক সকালে রিফাতদের গাড়িটি এসে থামল বান্দরবান জেলা, থানচি গ্রামের বাজারে। রিফাত গাড়ির ভেতর থেকে বাইরে উঁকি মারল। বাজার তখনো পুরোপুরি জমে ওঠেনি। তবে মানুষজন ধীরে ধীরে বাজারে ভিড় জমাচ্ছিল। রিফাত রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা এক বয়স্ক লোককে ডেকে হাতের কাগজটা এগিয়ে দিতে দিতে বলল…
‘আঙ্কেল, এই ঠিকানাটা কোথায় বলতে পারবেন?
ভুড়িওয়ালা বয়স্ক লোকটা রিফাতের এগিয়ে দেওয়া কাগজটা নিজের হাতে নিয়ে তাতে চোখ বুলিয়ে থানচি গ্রামের ভাষায় বলল…
‘বাবা, আমি তো এসব লেখা পড়তে পারি না। কী আছে এতে?
লোকটার কথায় রিফাত কাগজটা পুনরায় নিজের হাতে নিতে নিতে বলল…
‘আঙ্কেল, এই এলাকায় হাসান মেম্বারের বাড়ি কোন দিকে বলতে পারবেন?
‘কার বাড়ি?
‘হাসান মেম্বারের বাড়ি, আঙ্কেল।
রিফাতের কথায় কেমন অদ্ভুত দৃষ্টিতে রিফাতের দিকে তাকাল বয়স্ক লোকটা। রিফাতের মুখে হাসান মেম্বারের নামটা শুনতে আশেপাশে লোকজনও নিজের কাজ ছেড়ে অদ্ভুত দৃষ্টিতে ঘুরে তাকাল রিফাতের দিকে। উপস্থিত সকলের অদ্ভুত দৃষ্টি দেখে রিফাতের খানিকটা অন্য রকম লাগল। তারপরও রিফাত পুনরায় একই ঠিকানা জানতে চেয়ে বয়স্ক লোকটাকে বলল…
‘কী হলো আঙ্কেল? বলতে পারবেন হাসান মেম্বারের বাড়িটা কোন দিকে?
বয়স্ক লোকটা রিফাতের কথায় কোনো উত্তর করল না। শুধু হাত তুলে সোজা রাস্তাটা দেখিয়ে দিল। রিফাত লোকটার সেই যান্ত্রিক হাতের দিকে তাকিয়ে বলল…
‘সোজা রাস্তা গিয়ে কোন দিকে যাব আঙ্কেল?
রিফাতের কথায় লোকটাকে আর উত্তর করতে দেখা গেল না। বরং বয়স্ক লোকটা রিফাতকে সোজা রাস্তা দেখিয়ে দিয়ে সে অন্য রাস্তা দিয়ে চলে যেতে রিফাত লোকটাকে পুনরায় পিছন ডেকে বলল…
‘ কী হলো আঙ্কেল আপনি কোথায় যাচ্ছেন? আমরা সোজা রাস্তা দিয়ে কোন দিকে যাব বলে তো যান। এই যে আঙ্কেল, শুনছেন? আঙ্কেল?
বয়স্ক লোকটাকে আর পিছন ফিরে তাকাতে না দেখে রিফাত আশেপাশে মানুষদের থেকে সাহায্য চাইতে গেলে সবাই একই ভাবে যার যার মতো করে তখনকার লোকটার মতো কাজে চলে গেল। যেন এই মুহূর্তে কেউ রিফাতের ডাক শুনতে পারছে না। সামান্য একটা ঠিকানার লোকেশন বলতে গ্রামের মানুষের এত কিসের দ্বিধা, সেটা বুঝল না রিফাত। অসন্তুষ্টিতে রিফাত গাড়ির কাচ তুলে সোজা হয়ে বসতে বসতে পিছনে বসা মারিদের উদ্দেশ্যে বলল..
‘গ্রামের লোকগুলো কেমন অদ্ভুত। সামান্য একটা ঠিকানা জানতে চেয়েছি, তাতে এমনভাবে তাকাচ্ছে যেন আমি ঠিকানা নয়, তাদের কিডনি চাচ্ছি। স্ট্রেঞ্জ!
গ্রামের মানুষের অদ্ভুত দৃষ্টি মারিদের নজরেও পড়েছে। মারিদ লক্ষ্য করেছে রিফাতকে গ্রামের মানুষের সঙ্গে কথা বলার সময়। কিন্তু আপাতত মারিদ এসবে মনোযোগী নয়। তার এই মুহূর্তে তানিয়ার দেওয়া ঠিকানাটার খোঁজ চাই। আর এতে যা হবে তা দেখা যাবে। মারিদ হাতের কাগজটায় চোখ বুলিয়ে ড্রাইভিং সিটে বসা হাসিবের উদ্দেশ্যে বলল…
‘গাড়ি নিয়ে সোজা রাস্তায় যা, হাসিব।
‘জি স্যার।
হাসিব সম্মতি দিলে রিফাত মারিদকে ফের বলল…
‘তোর কাছে লোকগুলোকে অদ্ভুত মনে হয়নি, মারিদ?
‘হয়েছে।
রিফাত ফের মারিদকে প্রশ্ন করে বলল…
‘আচ্ছা, তুই শিওর তো তানিয়া মেয়েটা তোকে অপরিচিতার অ্যাড্রেসই দিয়েছিল?
‘ সঠিক বলতে পারছি না।
‘ সঠিক বলতে পারিস না মানে? না জেনে ঢাকা থেকে এত দূরে থানচিতে চলে এলাম আমরা? বিষয়টা রিস্কি হয়ে গেল না, মারিদ?
রিফাতের কথায় মারিদ হাতের কাগজটা থেকে চোখ তুলে তাকাল রিফাতের দিকে। কপাল কুঁচকে পাল্টা প্রশ্ন করে বলল…
‘ভয় পাচ্ছিস?
‘ভয় পাওয়ার কথা নয় বল? কোনো সিকিউরিটি ছাড়া একা আমরা তিনজন ঢাকা থেকে এত দূরে চলে এলাম। তারপর আবার গ্রামের মানুষের অদ্ভুত আচরণ। একটা ঠিকানা জিজ্ঞাসা করাতে এমনভাবে তাকাচ্ছে যেন আমি তাদের কিডনি খুলে নিয়ে যাওয়ার কথা বলছি।
রিফাতের ভয়ের কারণ বুঝে মারিদ ফের হাতের কাগজটায় দৃষ্টি স্থির করে রিফাতকে আশ্বস্ত করে বলল…
‘আমি তোর ভয়ের কোনো কারণ দেখছি না। তারপরও তোর মানসিক শান্তির জন্য বলে রাখছি, আমাদের নিরাপত্তার জন্য আমাদের লোক পরিচয় গোপন করে এই গ্রামের জায়গায় জায়গায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে পরেছে এতক্ষণে, ওরা সার্বক্ষণিক আমাদের আশেপাশেই থাকবে। সিকিউরিটির জন্য সকলের কাছে একটা করে রিভলভার রয়েছে। তারপরও যদি তোর সন্দেহ থাকে, তাহলে গাড়ির কাচ নামিয়ে আশেপাশে দৃষ্টি ঘুরিয়ে দেখ, পরিচিত মানুষ দেখে পাবি তুই।
মারিদের কথায় রিফাত তৎক্ষণাৎ অবিশ্বাসের নেয় গাড়ির কাচ নামিয়ে বাইরে উঁকি মারল। আশেপাশে দৃষ্টি ঘুরিয়ে লক্ষ্য করে দেখল সত্যি সত্যি মারিদের লোকজন রয়েছে আশেপাশে সাধারণ মানুষের বেশে। রিফাত পুনরায় গাড়ির সিটে বসে অবিশ্বাসের নেয় মারিদকে শুধিয়ে বলল…
‘এত কিছু কখন ম্যানেজ করলি তুই?
‘ সবকিছু পূর্ব থেকেই সেট করা ছিল। তুই প্ল্যানের শেষে এড হয়েছিস।
মারিদের কথায় রিফাত স্বস্তির শ্বাস ফেলতে ফেলতে বলল…
‘ভাই, তুই আমারে শান্তি দিলি!
থানচি বাজারের গলি পেরিয়ে গ্রামের ফাঁকা রাস্তায় গাড়িটিকে দাঁড় করাতে বলল মারিদ। ফাঁকা রাস্তায় মারিদরা সকলেই নামল। ঘন কুয়াশায় আশপাশ ঘোলাটে। রিফাত কনকনে ঠান্ডায় হাতে হাত ঘষতে ঘষতে বলল…
‘এখানে গাড়ি থামাতে বললি কেন? কই যাবি? আশেপাশে তো কাউকেই দেখছি না।
রিফাতের কথায় মারিদ হাতের কাগজটায় আরও একবার চোখ বুলাল। সেখানে লেখা, বান্দরবান জেলা, থানচি গ্রাম, হাসান মেম্বারের বাড়ি, বাবা-হাসান মেম্বার, মেয়ে-অপরিচিতা। তানিয়ার দেওয়া এই ঠিকানাটুকু মারিদের কাছে স্পষ্ট নয়। খানিকটা ঘোলাটে। যেমন হাসান মেম্বারের কয় ছেলে-মেয়ে সেটা মারিদ জানে না। যদি হাসান মেম্বারের একাধিক মেয়ে থাকে, তাহলে কোন মেয়ে মারিদের সঙ্গে অপরিচিতা নামে কথা বলত, সেটা মারিদ চিহ্নিত করবে কিভাবে? মারিদ অবশ্য তানিয়াকে এই প্রশ্নগুলো করেছিল। উত্তরে তানিয়া বলেছিল, মারিদ এই ঠিকানায় খোঁজ করলেই বুঝতে পারবে কে অপরিচিতা। একটা ঘোলাটে আর অস্পষ্ট ঠিকানার জের ধরেই মারিদ সারারাত জার্নি করে সকালে ঢাকা থেকে বান্দরবান জেলার থানচি গ্রামে পৌঁছাল। এই পাহাড়ি এলাকায় এসে মারিদ যতটুকু বুঝতে পারছে, হাসান মেম্বারের বাড়ির পিছনেও কোনো রহস্য লুকিয়ে আছে, নয়তো গ্রামবাসীরা এইভাবে রিঅ্যাক্ট করত না রিফাতের ঠিকানা জানতে চাওয়ায়। পরিস্থিতি যেমনই হোক, মারিদ যে করেই হোক হাসান মেম্বারের বাড়িতে পৌঁছে অপরিচিতার খোঁজ করবে। মারিদ হাতের কাগজটা হুডির পকেটে গুঁজে সামনে হাঁটতে হাঁটতে রিফাতের কথার উত্তরে বলল…
‘এখান থেকে আমরা পায়ে হেঁটে সামনে যাব। গাড়িতে বসে থাকলে লোকেশন বের হবে না। আশেপাশে মানুষ থেকে হাসান মেম্বারের বাড়ির ঠিকানা জিজ্ঞাসা করে নিব আয়।
মারিদ, হাসিব, রিফাত তিনজনের গায়েই শীতে মোটা কাপড় জড়ানো। তবে মারিদের গায়ে সবসময়ের মতো একটা কালো হুডি জড়িয়ে নিজেকে আড়াল করে রেখেছে মুখে মাস্ক আর হুডির টুপি কপাল অবধি টেনে। তবে রিফাত আর হাসিব ব্রাউন কালারের মোটা জ্যাকেট জড়িয়ে মাথায় শীতে টুপি পরে। জনশূন্য রাস্তায় মানুষ নেই বললেই চলে। রিফাতরা কিছুদূর পায়ে হেঁটে এগোতে দেখা পেল একটা চায়ের দোকানের। শীতের সকাল হওয়ায় দোকানদার একাকী বসে দোকানে। চায়ের কেটলি হতে গরম চায়ের ধোঁয়া ছাড়াচ্ছে। সকলে দোকানে পৌঁছাতে রিফাত চায়ের দোকানের টুলে বসতে বসতে দোকানদারকে বলল…
‘চাচা, তিনটা রঙ চা দেন তো।
রিফাতের কথায় মারিদ আশপাশটা তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে পরখ করতে করতে বলল..
‘আমি খাব না।
‘আরে, একটা চা খা। দেখবি শরীর সতেজ লাগছে।
‘নো নিড।
মারিদ না করে দিতেই রিফাত আর জোর করল না। সারারাতের জার্নিতে শরীর ম্যাজম্যাজ করছে। গরম গরম একটা চা হলে আরাম পাবে। রিফাত ও হাসিব দুজনই দোকান থেকে রুটি-কলা নিয়ে চিবুতে লাগল। মারিদ আশপাশটা লক্ষ্য করে খুব কৌশল অবলম্বন করে দোকানদারকে বলল…
‘চাচা, আপনাদের এলাকার রাস্তাঘাট দেখলাম যা অবস্থা, বেশ একটা সুবিধা না। আপনাদের এলাকার মেম্বার-চেয়ারম্যান নেই? এসব দেখে না?
মারিদের কথায় রিফাত-হাসিব দুজন রুটি-কলা চিবুতে চিবুতে মারিদের দিকে তাকাল। মারিদ যে কৌশলে দোকানদার থেকে হাসান মেম্বারের বাড়ির লোকেশন জানতে চাইছে, সেটা ওরাও চট করে বুঝে গেল। দোকানদার রহিম মিয়া গরম চায়ের কেটলি হতে চায়ের কাপে চা ঢালতে ঢালতে মনের দুঃখে অভিযোগ তুলে নিজ এলাকার ভাষায় বলল…
‘এই গ্রামের মেম্বার-চেয়ারম্যান এসব দেখলেই বা কি হইব বাবা? কিছু হইব না। আমাদের গ্রামের চেয়ারম্যান যা কয়, তাই হয়। এখানে অন্য কারও জোর চলে না। হের মন চাইলে রাস্তা ঠিক হইব, না মন চাইলে ভাঙ্গা থাকব।
পাশ থেকে হাসিব কৌতুহল নিয়ে মারিদের কিছু বলার আগেই সে দোকানদারকে প্রশ্ন করে বলল…
‘কেন আপনারা গ্রামবাসী এই নিয়ে কিছু বলতে পারেন না?
‘কে কী কইব বাবা? যে কইব, হেই তো বিপদে পড়ব। এর থাইক্যা চুপ থাহন ভালা। অন্তত নিজের জীবনডা তো বাঁচব।
মারিদ বলল…
‘ আপনাদের গ্রামের চেয়ারম্যান যদি অনৈতিক কাজ করে তাহলে এই এলাকার মেম্বার এসব নিয়ে প্রতিবাদ করে না? নাকি তিনিও এমন?
মারিদের কথায় দোকানদার রহিম মিয়া তৎক্ষনাৎ মারিদকে শুধিয়ে আফসোস স্বরে বলল…
‘না বাবা, আমাদের গ্রামের মেম্বার অনেক ভালা মানুষ। তয় হেই নিজেই বিপদে আছে চেয়ারম্যানের লাইগা। চেয়ারম্যানের ভয়ংকর নজর আছে মেম্বারের পরিবারে। হেই কি আর আমাদের সাহায্য করব?
মেম্বার পরিবার কি বিপদে আছে সেটা মারিদ এই মূহুর্তে জানতে চাইল না। কারণ মারিদের মনে হলো এই মূহুর্তে দোকানদারকে এসব প্রশ্ন করা ঠিক হবে না। বরং মারিদ যার সন্ধানে এখানে এসেছে সেটা খোঁজায় উত্তম। তাই মারিদ দোকানদারকে সরাসরি হাসান মেম্বারের বাড়ির ঠিকানা জানতে চেয়ে বলল…
‘ আচ্ছা চাচা, হাসান মেম্বারের বাড়ি কোন দিকে বলতে পারবেন?
এতক্ষণ দোকানদার সেচ্ছায় মারিদকে সবকিছু জানাচ্ছিল। কিন্তু যেই মারিদ হাসান মেম্বারের বাড়ির ঠিকানা জানতে চাইল তক্ষুনি রহিম মিয়ে বাঁকা চোখে তাকাল মারিদের দিকে। সন্দেহে বলল…
‘তুমি মেম্বার বাড়ির ঠিকানা দিয়া কী করবা?
মারিদ দোকানদার রহিম মিয়ার বাঁকা দৃষ্টি বুঝে সে কৌশল অবলম্বন করে মিথ্যা বলে বলল…
‘ আসলে চাচা আমরা ঢাকা থেকে এসেছি একটা প্রজেক্টে। সরকার এই এলাকার উন্নয়নের জন্য একটা হাসপাতাল বানাতে চাই সেজন্য আমাদের পাঠিয়েছে তদারকি করতে। এই যে ওকে দেখছেন, ও হচ্ছে একজন ডাক্তার। তাই ওকে নিয়ে আমরা হাসান মেম্বারের সঙ্গে যোগাযোগ করতে চাচ্ছিলাম। আপনি যদি আমাদের ঠিকানাটা দিতেন, তাহলে উপকার হতো।
মারিদের কথায় উৎফুল্লতা দেখা গেল দোকানদার রহিম মিয়ার মাঝে। তিনি খুশিতে বললেন…
‘সত্যি বাবা, আমাদের এলাকায় হাসপাতাল বানাইবা তোমরা?
‘জি চাচা।
মারিদের কথায় দোকানদার খুশি হয়ে দোকান থেকে বের হয়ে মারিদের পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আঙুল তুলে রাস্তার শেষ মাথায় দেখিয়ে বলল…
‘ঐযে রাস্তার শেষ মাথায় একখান বটগাছ দেখছো? ঐ বটগাছটার নিচে দাঁড়িয়ে, পশ্চিমে দেখবা একটা বড় বাড়ি দেখা যায়, ঐটাই আমাগো হাসান মেম্বারের বাড়ি।
‘ধন্যবাদ চাচা। অনেক বড় উপকার করলেন।
মারিদ দোকান থেকে বিদায় নিয়ে কুয়াশার মধ্যে সামনে এগোল। মারিদের পিছন পিছন রিফাত-হাসিবও দৌড়ে আসল বিল মিটিয়ে। মারিদ যত বটগাছটার কাছাকাছি যাচ্ছিল, ততই যেন মারিদের বুক কাঁপছিল অস্থির উত্তেজনায়। মারিদের হাঁটার মধ্যে হঠাৎ কারও চিৎকারের আর্তনাদ শোনে মারিদরা আশেপাশে তাকাল। দেখল রাস্তার পাশ ঘেঁষে একজন বৃদ্ধা মহিলা ব্যথায় ছটফট করছে। মারিদ সেদিকে দৌড়ে গেল। বৃদ্ধা মহিলার সম্মুখে বসতে বসতে বলল…
‘আপনি ঠিক আছেন দাদী? বেশি ব্যথা পেয়েছেন?
বয়স্ক মহিলাটি আহাজারি করতে করতে বলল..
‘ বাবা আমি বৃদ্ধ মানুষ, চোখে দেখি না। রাস্তায় হোঁচট খাইয়া পইড়া গেছি। আমার জিনিসগুলোও পইড়া গেছে। তোমরা কেউ তুইলা দিবা?
বৃদ্ধা মহিলার কথার মাঝেই হাসিব রাস্তা থেকে ছোট ছোট বড়ইগুলো কুড়াতে লাগল। এর মাঝে রিফাত মারিদের পাশাপাশি বৃদ্ধা মহিলার মুখোমুখি বসতে বসতে বলল..
‘কোথাও ব্যথা পেয়েছেন দাদী? পায়ে?
‘ হ বাবা! পা-ডা মনই মচকাই গেছে।
বৃদ্ধা মহিলার কথায় রিফাত মহিলাটির পা চেক করে দেখল তেমন ব্যথা পায়নি। মারিদ বৃদ্ধা মহিলাটিকে টেনে তুলতে তুলতে বলল…
‘আপনি কোথায় যাবেন দাদী? চলুন আপনাকে এগিয়ে দিয়ে আসি।
রিফাত রাস্তা থেকে একটা লাঠি কুড়িয়ে বৃদ্ধা মহিলার দিকে এগিয়ে দিতে মহিলাটি সেটি হাতে নিতে নিতে মারিদের কথায় উত্তরের বলল…
‘আমি হাসান মেম্বারের বাড়িতে যাব বাবা। তয় তোমরা কারা, এই গেরামে তো আগে দেখি নাই তোমাগো?
বৃদ্ধা মহিলার কথায় মারিদ-রিফাত একে অপরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করল। না চাইতেও যেন গন্তব্য এখন তাদের কাছে হেঁটে এসেছে। মারিদ-রিফাত বৃদ্ধা মহিলার দুপাশে দুজন ধরে দাঁড়াল। মারিদ কিছু বলবে, তার আগেই রিফাত চট করে বলে বসল…
‘আমরা ঢাকা থেকে এই গ্রামে বেড়াতে এসেছি দাদী। আমরা আপনার গ্রামের মেহমান। আচ্ছা দাদী, হাসান মেম্বার আপনার কী হয়? ছেলে?
‘ না বাবা। হাসান আমার সখীর ছেলে। হাসানের মা তারানূর আমার ছোটবেলার সখী। আমরা দুই সখীর একই গেরামে বিয়া হইছে বইল্যা আমি সবসময় সখীর বাড়িতে আওন-যাওন করি। আমার সন্তান নাই। তয় হাসান আমারে মা বইল্যাই ডাকে।
হাসান মেম্বারের পরিবার সম্পর্কে বৃদ্ধা মহিলার থেকে ইনফেকশন নেওয়া যাবে বিষয়টি মাথায় আসতেই মারিদ সরাসরি প্রশ্ন করল বৃদ্ধা মহিলাটিকে বলল…
‘ হাসান মেম্বারের ছেলে-মেয়ে নেই দাদী?
‘আছে বাবা। আমাদের হাসানের সোনার টুকরো পোলা-মাইয়া আছে। কী লক্ষ্মী ওরা মাশাল্লাহ।
বৃদ্ধা মহিলাটির প্রতিটি কথায় ছিল সহজ সরল সচ্ছ। অথচ মহিলাটির প্রতি কথায় মারিদের ভিতরকার উত্তেজনা ক্রমশই বাড়তে লাগল। মারিদ নিজের ভিতরকার ছটফট মহিলাটিকে বুঝতে না দিয়ে ফের প্রশ্ন করে বলল…
‘ হাসান মেম্বার পরিবারে কে কে আছে দাদী?
‘হাসানের ঘরে হোগলই আছে। হাসানের তিনটা পোলা, দুইডা মাইয়া। হাসানের বউ…
কাঙ্ক্ষিত উত্তর পেয়ে যেতেই মারিদ
বৃদ্ধা মহিলাটিকে নিজের কথা শেষ করতে দিল না। তার আগেই মারিদ অধৈর্যের নেয় বলল…
‘নাম কী ওনাদের?
‘ আশনূর, নূরজাহান।
উত্তেজনায় মারিদের বুক কাপছে। এই বুঝি মারিদ কাঙ্খিত মানুষের সন্ধান পেল বলে। আশেপাশে দাঁড়িয়ে থাকা রিফাত হাসিবের অবস্থায়ও তাই। কয়েক সেকেন্ডর জন্য মারিদ থমকে দাঁড়িয়ে ফের কম্পিত গলায় বৃদ্ধা মহিলাটিকে প্রশ্ন করে বলল…
‘ হাসান মেম্বারের কোনো মেয়ে কি মারা গেছে দাদী?
মারিদের কথাটা যেন পছন্দ হয়নি মহিলাটির। তিনি যেন শোনলেন মারিদ বলল, নূরজাহান মারা গেছে এমন বাক্য।
তিনি অসন্তুষ্ট নিয়ে মারিদকে শুধিয়ে বলল….
‘ আমাগো নূরজাহান মরব কেন? একটু আগেই তয় এইখানে দাঁড়াইয়া আছিল কতগুলা ছোটো পোলাপান ল্যাইয়া। দাঁড়াও দ্যাইখা লই আশেপাশে হইব আমাগো নূরজাহান।
কথাটা বলেই মহিলাটি লাঠি ভর করে আশেপাশে তাকিয়ে কারও খোঁজ করে হঠাৎ মারিদকে আঙুল তুলে কাউকে দেখিয়ে বলল…
‘ঐ যে দ্যাখো নূরজাহান দৌড়ায়তাছে। ঐটাই আমাগো হাসানের মাইয়া নূর…
বৃদ্ধা মহিলার কথা শেষ হওয়ার আগেই মারিদ প্রাণপণে দৌড়াল নূরজাহান মেয়েটির পিছন পিছন। রিফাত হাসিব তখনো হতভম্ব হয়ে বৃদ্ধা মহিলাকে নিয়ে দাঁড়িয়ে। মূলত রিফাতও মারিদের পিছনে যেতে চায়, কিন্তু বৃদ্ধা মহিলাকে রেখে যেতে পারছে না। রিফাত ব্যাকুল মনে তাকাল অদূরে কুয়াশাচ্ছন্ন রাস্তার দিকে। একটা মেয়ে দৌড়ে কোথাও একটা যাচ্ছে আর সেই মেয়ের পিছনে মারিদ দৌড়াচ্ছে তাকে ধরতে। দূর থেকে রিফাত যতটুকু বুঝল, মেয়েটির গায়ে হলদে থ্রি-পিস পড়া। আর তারউপর কালো চাদর জড়ানো। পিঠে একটা কলেজ ব্যাগ। পিছন থেকে মেয়েটিকে বোঝা দায়। তবে মেয়েটির চুল দেখে রিফাত হতভম্ব। এই যেন এক রুপানজেলা। দিগুণ চুলের সমাহার। লম্বায় যেন মেয়েটির সমানে সমান তার চুল। মেয়েটির দৌড়ানোর ফলে চুলগুলোও যেন দুলছে পায়ের কাছটায়। মারিদের অপরিচিতাকে দেখার ইচ্ছা দমাতে না পেরে এবার রিফাতও নিজেকে আটকে রাখতে পারল না। হাসিবের কাছে বৃদ্ধা মহিলাটিকে তুলে দিয়ে সেও অতিরিক্ত উত্তেজনা মারিদের পিছন পিছন দৌড়াল মারিদের অপরিচিতাকে দেখতে। লম্বা-চওড়া বলিষ্ঠবান মারিদ কয়েক মিনিটে দৌড়ে মেয়েটির নাগাল পেয়ে গেল। পিছন থেকে হাত বাড়িয়ে মেয়েটিকে টেনে ধরতে চাইলে মারিদের হাতের ধাক্কায় মেয়েটি তৎক্ষণাৎ মুখ থুবড়ে রাস্তায় পড়তেই মৃদু চিৎকার করে উঠল ব্যথায় ‘উফফফ’ শব্দে।
মারিদের হাতের ধাক্কায় মেয়েটি পড়ে গেলেও মেয়েটির গায়ের চাদর মারিদের হাতে রয়ে যেতেই মারিদ সেটি মুঠোয় চেপে নিজের দৌড় থামাল মেয়েটির পিছনে। বড় বড় শ্বাস ফেলে রাস্তায় পড়ে যাওয়া মেয়েটির দিকে তাকাতে তাকাতে হাঁটু গেড়ে বসল মেয়েটির বামপাশে। পিচঢালা রাস্তায় মেয়েটি পড়ে যেতেই দু’হাতে কনুইয়ের ব্যথা পেল। মেয়েটি রাস্তা থেকে উঠে বসল দু’হাতের কনুই ঘষতে ঘষতে ফুঁ দিয়ে। মেয়েটির আপাতত আশেপাশে মনোযোগ নেই। সে নিজের ব্যথা নিয়েই মনোযোগী। স্তব্ধ মারিদ মেয়েটির মুখ দেখতে চাইল। কিন্তু মেয়েটি নিচের দিকে ঝুকে তাকায় দিগুণ চুলের ঢেকে আছে মেয়েটির মুখ। মারিদ শুধু মেয়েটির ব্যথিত চোখের আংশিক অংশ দেখতে পেয়ে তার নিশ্বাস আটকে আসার যোগাড় হলো। স্তব্ধ মারিদ তারপরও নিজের কম্পিত হাত বাড়িয়ে মেয়েটির মুখে আসা চুলগুলো একপাশে সরিয়ে কানের পাশে দিতেই বেখেয়ালি মেয়েটি চোখ তুলে উপরে তাকাতে মূহুর্তে চোখাচোখি হলো দুজনের। ছিটকে সরার মতোন তৎক্ষনাৎ দূরে সরে গেল মেয়েটি। মারিদ তখনো নির্বাক, নিশ্চল দৃষ্টিতে মেয়েটির দিকে তাকিয়ে। অথচ আহত মেয়েটি মারিদকে দেখে কেমন অস্থির, উত্তেজিত হলো। পাশে থাকা কলেজ ব্যাগটা বুকে টেনে তৎক্ষনাৎ উঠে দাঁড়াল। আতঙ্কিত ভঙ্গিতে তাড়াহুড়ো করে ব্যাগ থেকে একটা ধারালো ছুরি বের করে মারিদের দিকে তাক করে আতঙ্কিত ভঙ্গিতে বলল…
‘ সরুন! দূরে যান। আমার থেকে দূরে যান বলছি। যান।
মেয়েটি দুহাতে ছুরি চেপে মারিদের দিকে তাক করে রেখেছে অথচ মারিদ তখনো অপলক স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে মেয়েটির দিকে উঠে দাঁড়াল। এই কন্ঠ মারিদের পরিচিত আবার
অপরিচিত ঠেকল। ফোনের কন্ঠটি মারিদ বাস্তবে চিনে উঠতে পারল না। মেয়েটির ছুরি নেওয়ার মধ্যে রিফাত ততক্ষণে দৌড়ে এসে মারিদের নিকট থামল। বড় বড় শ্বাস ফেলে মারিদকে কিছু বলবে তার আগেই দৃষ্টি গেল ছুরি হাতে মেয়েটির দিকে। মেয়েটিকে দেখেই রিফাত আপনাআপনি বলতে লাগল….
‘মাশাল্লাহ! মাশাল্লাহ! সুবহানাল্লাহ!
রিফাতের কথায় মেয়েটি পুনরায় রিফাতের দিকে ছুরিটি তাক করে বলল…
‘একদম আমার কাছে আসার চেষ্টা করবেন না। দূরে সরুন। যান বলছি। যান।
রিফাত বুঝল মেয়েটি তাদের ভয় পাচ্ছে। কিন্তু মেয়েটি যদি অপরিচিতা হয়, তাহলে মারিদকে তো মেয়েটির চেনার কথা। রিফাত তক্ষুনি মারিদের মুখের মাস্কটি টান দিয়ে গলার নিচে নামিয়ে দিয়ে মেয়েটির উদ্দেশ্যে বলল…
‘ভাবি আপনি মারিদকে চিনতে পারছেন না?
অপরিচিত একটা মেয়েকে রিফাত ‘ভাবি’ ডেকে বসে আছে। অথচ মেয়েটি মারিদের মুখ দেখেও তার মাঝে পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেল না। বরং আগের মতোই দুজনের দিকে ছুরি তাক করে বলল…
‘বললাম না, দূরে যান। যান বলছি। একদম এগোবেন না।
মারিদ মেয়েটির দিকে তখনো স্তব্ধ নেয় তাকিয়ে। এর মাঝে কোথা থেকে হুট করে একদল ছোট-বড় বাচ্চাকাচ্চা এসে মেয়েটিকে ঘিরে দাঁড়াল মারিদদের মারতে। সকলের হাতে লাঠি-সোঁটা, ইট-পাথর নিয়ে দাঁড়িয়ে। রিফাত সবগুলো বাচ্চার দিকে তাকাল। আট-দশটা বাচ্চা হবে। এর মাঝে একটা পাঁচ কি ছয় বছরের বাচ্চা দু’হাতে ইট চেপে দাঁড়িয়ে রিফাতদের মারতে। রিফাতের বাচ্চাদের দেখে হাসি পেল, কিন্তু সে এই মুহূর্তে সিরিয়াস থাকার চেষ্টা করল। এখানে সবচেয়ে বড় বাচ্চাটার বয়স হয়তো তেরো বছর হবে। সে একটা লাঠি নিয়ে মারিদের দিকে তাক করে মেয়েটির উদ্দেশ্যে বলল…
‘পরি বুবু, তুমি পালাও। আমরা আছি। আমরা এই পোলাগুলারে সামলামো। তুমি পালাও পরি বুবু। পালাও।
রিফাত বুঝল না তাদের এতো ভয় পাচ্ছে কেন সবাই? তাঁরা তো কিছুই করেনি। তাছাড়া নূরজাহান মেয়েটাও তাদের দেখে কেমন আতঙ্কে আছে। কিন্তু কেন? মেয়েটি কি মারিদকে চিনতে পারেনি? মারিদের অপরিচিতা হলে তো এতক্ষণে চিনার কথা। নাকি এই মেয়েটি মারিদের অপরিচিতা নয় কোনটা?
রিফাতে ভাবনার মাঝে মেয়েটি বলল…
‘ ছাগলের বাচ্চাটা বাঁচিয়েছিস? কুকুর কামড়ে ছিল?
তখনকার বাচ্চা উত্তর দিয়ে বলল…
‘ না বুবু কুকুর কামড়াতে পারে নাই এর আগেই আমরা ছাগলের বাচ্চাটারে বাঁচাই লইছি। এখন তুমি পালাও বুবু। যাও।
বাচ্চাদের কথায় রিফাত বুঝতে পারল তখন মেয়েটি ঐভাবে দৌড়ানোর কারণ হয়তো কোনো ছাগলের বাচ্চাকে কুকুরের থেকে বাঁচানো উদ্দেশ্য ছিল। কিন্তু এখন মেয়েটি সত্যি সত্যি বাচ্চাগুলোর কথায় আতঙ্কে নেয় দৌড়ে পালিয়ে যাচ্ছে। আর মারিদ পিছন থেকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে মেয়েটির দৌড়ে চলে যাওয়ার দিকে। পাশ থেকে রিফাত অপরিচিত মেয়েটির দৌড়ে চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে বলল…
‘ভাই, ব্যাপার কী? মেয়েটা তোকে চিনল না কেন? অপরিচিতা হলে তো এতক্ষণে নিশ্চয়ই চেনার কথা তাই না?
মারিদ অবিশ্বাসে উত্তর দিয়ে বলল..
‘ জানি না।
‘ কি বলিস?
মারিদ রিফাতের কথায় আর উত্তর করলো না শুধু তাকিয়ে রইল বসন্তের পাখির উড়ে চলে যাওয়ার দিকে। রিফাত মারিদের দৃষ্টি বুঝে সেও তাকাল মেয়েটির দিকে। মারিদকে বলল…
‘ ভাই, যাই বলিস। হাসান মেম্বার মেয়ে জন্ম দিছে এক পিস। নিয়ত খারাপ হওয়ার মতন রূপবতী, মায়াবতী দুটো। নামের সাথে গুণেরও মিল আছে। পরী যেন সাক্ষাত পরীই। মাশাল্লাহ।
[ গল্পটা নিয়ে রিভিউ অবশ্যই দিবেন। ধন্যবাদ সবাইকে ]
চলিত…
Share On:
TAGS: ডাকপ্রিয়র চিঠি, রিক্তা ইসলাম মায়া
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ১৬
-
ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ১৯
-
ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ১
-
ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ১২
-
ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ১৭
-
ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ২০
-
ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ৩
-
ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ৮
-
ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ২২
-
ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ১১