Golpo romantic golpo জাহানারা

জাহানারা পর্ব ৭৯


জাহানারা

জান্নাত_মুন

পর্ব :৭৯
🚫ক’পি করা নিষিদ্ধ

🔞 সতর্কবার্তা:
এই গল্পে অ’কথ্য ভাষা এবং স”হিং’সতার উপাদান রয়েছে। ১৮ বছরের কম বয়সী বা সং’বে’দনশীল পাঠকদের জন্য উপযুক্ত নয়। পাঠক নিজ দায়িত্বে পড়বেন।

ভোর হতেই পূব আকাশে উদিত হয়েছে রক্তিম সূর্য। গত কয়েকদিনের তুলনায় আজকের আবহাওয়াটা বেশ মনোরম আর শীতল। বাইরে বইছে ফুরফুরে মৃদু বাতাস। মার্চের এই মাঝামাঝি সময়ে প্রকৃতি যেন নতুন যৌবন ফিরে পেয়েছে। গাছে গাছে গজিয়েছে নবীন কচি পাতা। সেই কোমল পাতাগুলো বাতাসের তালে মৃদুমন্দ দোল খাচ্ছে, যা দুচোখ জুড়ানো এক চমৎকার দৃশ্য।
চৌধুরী বাড়ির বিশাল বাগানটি বছরের এই ঋতুতে এক অপরূপ সাজে সেজে ওঠে। সবুজের সমারোহে ডালপালা ছেয়ে যাওয়ার পাশাপাশি ফুটেছে হরেক রকমের ফুল আর বাহারি ফল। দেশি-বিদেশি বৈচিত্র্যময় ফুলের সেই মিষ্টি ও মাতাল করা সুঘ্রাণ মিলেমিশে চারপাশকে মাতিয়ে রেখেছে। আর সেই সুবাসের সঙ্গে যখন প্রাকৃতিক হাওয়া এসে মিশছে, পুরো পরিবেশটাই তখন হয়ে উঠছে দারুণ রোমাঞ্চকর ও মুগ্ধতায় ভরা।

বেলকনির পাতলা পর্দাগুলো বাগান থেকে আসা শীতল হাওয়ায় আলতো করে উড়ছে। বিছানায় উপুড় হয়ে দু’হাতে গাল চেপে শুয়ে আছে ইতি। তার একাগ্র দৃষ্টি স্থির হয়ে আছে ফোনের স্ক্রিনে। ঠোঁটের কোণে লেগে থাকা লাজুক হাসি আর চঞ্চল পায়ের দোলা বলে দিচ্ছে তাঁর মনের গহীনে বইছে বসন্তের হাওয়া। ফোনের ওপাশে ভিডিও কলে জিতু ভাইয়া। কিচেনে রান্নায় ব্যস্ত থেকেও সে ইতির প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছে ধীরলয়ে।
হঠাৎ ইতি চুপ হয়ে গেল। তার গভীর চাহনি আটকে গেল ওপারের মানুষটার অবয়বে। জিতুর পরনে সাদা স্যান্ডো গেঞ্জি, যার ভেতর দিয়ে তার সুঠাম দেহের বলিষ্ঠ ভাঁজগুলো স্পষ্ট ফুটে উঠেছে। সবচেয়ে বেশি আকর্ষণীয় লাগছে তার বাহুর সুগঠিত পেশিগুলো। অবিন্যস্ত উষ্কখুষ্ক চুল আর গালের ছোট ছোট ছাঁটা দাড়ি, সব মিলিয়ে এক বন্য সৌন্দর্য। আগুনের তাপে তার ফর্সা চেহারায় যে ক্লান্তির আভা ফুটেছে, তাতে যেন পুরুষালি আভিজাত্য বেড়ে গিয়েছে দ্বিগুণ। এমন গভীরভাবে একজন পুরুষকে পর্যবেক্ষণ করতে করতে সপ্তদশী ইতির গাল লজ্জায় রক্তিম হয়ে উঠল, আর ঠোঁটের কোণের সেই লাজুক হাসিটা মুহূর্তেই আরও চওড়া হলো।

–“এত কি দেখছ আমার মধ্যে?”

জিতু ভাইয়ার কণ্ঠে সংবিত্তিতে ফিরল ইতি। তিনি আকষ্মিক তাকালেন ইতির পানে। ইতি তৎক্ষনাৎ ক্যামেরার সামনে থেকে সরে বিছানায় মুখ গুঁজে রইল। লজ্জা মেয়েটাকে ঝাপটে ধরেছে। সেই সাথে বুকের হৃদস্পন্দনও অনিয়ন্ত্রিত হয়ে পড়েছে। তেল পেটে যেন প্রজাপতিরা ডানা মেলে উড়তে আরম্ভ করেছে। মেয়েটা এমন অদ্ভুত অনুভূতিগুলো যখন সামাল দিতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল তক্ষুনি জিতুর কণ্ঠস্বর পুনরায় কর্ণপাত হল,
–“কি হলো? সরে গেলে কেন?”

ইতি পুনরায় ক্যামেরার সামনে ধরা দিল। জিতু ভাইয়া ইতির রাঙা চেহারা দেখে ভ্রু নাচিয়ে হেয়ালি কণ্ঠে শুধালো,
–“আবার লজ্জা পাচ্ছ?”

ইতি দু’হাত দিয়ে চেহারা আড়াল করলো। জিতু ভাইয়া ঠোঁট কামড়ে চাপা হেসে জিজ্ঞেস করল,“এত লজ্জা তোমার কোথা থেকে আসে বলতো লজ্জাবতী?”

ইতি পুনরায় ক্যামেরার সামনে থেকে আড়াল হয়ে গেল। জিতু ভাইয়া তপ্তশ্বাস ছেড়ে গ্যাসে আরেকটি পেন বসাল। রান্নার কাজ অব্যাহত রেখে বলতে লাগল,
–“তোমার লজ্জার কাছে লজ্জাবতী গাছও ফেল। যাইহোক, লজ্জা পেলে অবশ্য তোমাকে দারুণ লাগে। কিন্তু…!”

জিতু ভাইয়া এই পর্যায়ে থামল। ইতি ক্যামেরার সামনে এসে উৎসুক হয়ে শুধালো, “কিন্তু কি?”

–“এত লজ্জা পেলে তুমি সংসার করবে কি করে বল তো?”

–“কেন? আমি পারব তো। আমি এখন সব কাজ শিখছি।”

–“ও তাই? তো ম্যাম আপনি কি কাজ শিখেছেন?”

ইতি এবার বুক ফুলিয়ে শ্বাস নিয়ে বলে উঠলো, “আমি এখন অনেক কাজ পারি। আমি ফারিয়া আপুর থেকে শিখেছি ঘর ঝাঁট দেওয়া। আর দুটো আইটেম রান্না করাও শিখেছি।”

–“ওয়াও গ্রেট। তো কি কি আইটেম রান্না করতে পারেন।”

ইতি লাজুক হেসে বলল,“আমি গরম পানি রান্না করতে পারি, চা রান্না করতে পারি। আর আমি লেবু কাটাও শিখেছি হুম।”

–“এক্সিলেন্ট! এত কিছু শিখেছেন, আপনাকে নোবেল দেওয়া দরকার।”

গর্ভে ইতির বুকটা ফুলে উঠল। সে চুল কানে গুঁজে দিতে দিতে নিচু কন্ঠে বলল,“দেখবেন বিয়ের পর আপনাকে আর কষ্ট করে প্রতিদিন সকালে রাতে রান্না করতে হবে না। আমিই আপনার সব কাজ করে দিব।”

–“তুমি কেন সব কাজ করবে? আমি কি তোমায় বিয়ে করব কাজ করানোর জন্য?”

দুশ্চিন্তার ভাজ পড়ল ইতির কপালে। চিন্তিত কন্ঠে শুধালো, “তাহলে?”

জিতু ভাইয়া গ্যাসের চুলা বন্ধ করে ইতির দিকে মনযোগ দিল। কি নিষ্পাপ সরল চেহারাখানা সপ্তদশীর। এই চেহারার পানে তাকালে যে কারো হৃদয় হিমবাহের ন্যয় গলে যাবে।
জিতু ভাইয়ার থেকে উত্তর না পেয়ে ইতি পুনরায় শুধালো, “কি হলো বলুন না?”

জিতু ভাইয়া সহাস্যে প্রত্যুত্তর করল,
–“তোমাকে বিয়ে করব আমার ঘরে সাজিয়ে রাখার জন্য।”

–“কিহ্! আমাকে আপনি সাজিয়ে রাখবেন?”

–“হ্যা, সাজিয়ে রাখব। আমার আলমারিতে যত্ন করে সাজিয়ে রাখব।”

–“ইশশ কি সব বলছেন? আমার মতো এত বড় মেয়ে আলমারি দখল করলে জামাকাপড় কই রাখবেন?”

–“কই আর রাখব! তোমায় আলমারিতে সাজিয়ে রেখে জামাকাপড়গুলো না হয় আমার সাথেই বিছায় রাখব।”

ইতি ভাবুক চেহারায় মাথা নাড়িয়ে সমর্থন করল। জিতু ভাইয়ার ভীষণ হাসি পাচ্ছে। তিনি ঠোঁট কামড়ে হাসি চেপে প্লেটে খাবার তুলে রুমে চলে আসলেন। অতঃপর খেতে খেতে ইতির সাথে ফোনালাপ চালিয়ে গেলেন অফিসের জন্য বের হওয়ার আগ পর্যন্ত।


ট্রাফিক জ্যামের জন্য আমাদের ব্ল্যাক মার্সিডিজটি মাঝ রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছে গত পাঁচ মিনিট ধরে। আর আমি তখন থেকেই একা একা বকবক করে যাচ্ছি। ঘুম থেকে উঠার পর থেকেই প্রয়োজন ছাড়া ইফানের সাথে আগ বাড়িয়ে একটা কথাও বলছি না। এদিকে ইফানের চেহারায় চরম বিরক্তির রেশ। আমাকে একা একা বকবক করতে দেখে আমার দিকেও কপাল কুঁচকে তাকাচ্ছে। আমি মুখ মুচড়ে ঘুরে বসলাম। ইফান তপ্তশ্বাস ছেড়ে দৃষ্টি সরিয়ে নিল। বিড়বিড়িয়ে বাংলাদেশ আর দেশের চৌদ্দ গুষ্ঠিকে অ’শ্রাব্য ভাষায় গা’লিগা’লাজও করে নিল। কানে ব্লুটুথ গুঁজে গার্ডদের বলতে লাগল রাস্তা খালি করতে দ্রুত।

আমি রাস্তার দিকে চোখ ঘুরাতেই আচমকা আমার দৃষ্টি আটকায় রাস্তার ঐপাড়ে। একজন সবজি বিক্রেতা ডেউয়া ফল নিয়ে বসেছে। এত সুন্দর তাজা আর পাকা ফলগুলো দেখে জিহ্বায় পানি এসে গেল। সেই কোন জীবনে তন্নি তার মামার বাড়ি থেকে এনে খাইয়েছিল, তারপর আর খাওয়া হয়নি। আমি জিহ্বা দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে ঢোক গিললাম। আড় চোখে ইফানের দিকে তাকিয়ে দেখলাম সে ফোন টিপছে। আমি দৃষ্টি সরিয়ে নিলাম। ওর দিকে না তাকিয়ে শুকনো কেশে এক আঙুল দিয়ে ইফানের বাহুতে গুঁতো দিলাম। ফোনে ইফানের মনযোগে বিগ্ন ঘটল। সে ভ্রু কুঁচকে আমার দিকে তাকাল। আমি এখনো অন্যদিকে তাকিয়ে। ইফান শুধালো,
–“হোয়াট?”

আমি হাতের ইশারায় বাইরে দেখালাম। ইফান ইশারা অনুযায়ী বাইরে তাকাল। কিন্তু সে যথোপযুক্ত কিছু দেখতে পেল না। আমার দিকে তাকাতেই আমি হাতের ইশারায় মুখে দেখিয়ে বুঝালাম, খাব। এবার ইফানের কুঁচকানো ভ্রু সোজা হল। সরাসরি আমাকে জিজ্ঞেস করল,
–“কি খাবে বল এনে দিচ্ছি?”

আমি পুনরায় ইশারায় বাইরে দেখালাম। সেই দিকে ইফান তাকিয়ে বিরক্তি নিয়ে বলে উঠলো, “কি দেখাচ্ছ? আর মুখে কথা বলছ না কেন?

আমি শুকনো কেশে গলা পরিষ্কার করে বললাম,“আমার ঐ ফলটা খেতে ইচ্ছে হচ্ছে।”

–“কোন ফল?”

হাতের ইশারায় দেখিয়ে দিলাম। ইফান ব্লুটুথ অন করে গার্ডের উদ্দেশ্য বলতে লাগল ফলগুলো সব কিনে বাসায় পাঠিয়ে দিতে। বিস্ময়ে আমার চোখ বড় বড় হয়ে গেল। আমি তৎক্ষনাৎ বলে উঠলাম,
–“সবগুলো কিনে বাসায় পাঠিয়ে দিবে মানে কি? আমি কি বলেছি সবগুলো কিনতে?”

ইফান ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে। আমি গলার স্বর খাদে নামিয়ে বললাম,“এখন খাব আরকি, একটা দিলেই এনাফ।”

ইফান আমার দিকে কিছুক্ষণ সুক্ষ্ম নজরে তাকিয়ে থেকে গার্ডদের বলল কয়েকটা এনে দিতে। মিনিটের মধ্যেই পেয়েও গেলাম। এদিকে রাস্তাও খালি হয়েছে। ইফান পুনরায় ড্রাইভিং করতে লাগল। আমি গাড়িতে হেলান দিয়ে পা দুটো ইফানের কোলে তুলে আরামসে খাচ্ছি। ইফান এক হাতে স্টিয়ারিং ধরে, আরেক হাতে আমার পা দু’টোতে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। হঠাৎই আমার পায়ে নজর পড়তেই তৎক্ষনাৎ ইফানকে শুধালাম,
–“এই আমার নূপুর আর আঙুলের রিং কোথায়?”

–“রুমে।”

ইফান গম্ভীর কণ্ঠে ছোট্ট করে প্রত্যুত্তর করল। আমি পুনরায় শুধালাম,“রুমে কই? আমি তো কোথাও খুঁজে পাইনি।”

–“আচ্ছা, বাসায় গিয়ে বের করে দিব।”

ব্যস! আবারও মুখে কুলুপ আঁটল। লোকটার যে কি হলো বুঝতে পারছি না! কেমন গম্ভীর আর চুপচাপ হয়ে আছে। এরকম তাকে কোনোদিন দেখিনি। আমি ইফানের মুখের সামনে একটা দানা ধরলাম। ইফান ভ্রু কুঁচকে বলে উঠলো,
–“তুমি খাও।”

কথা মতো নিজের মুখেই পুরে নিলাম। খেতে খেতে শুধালাম,“কি হয়েছে গো?”

–“কি হবে?”

–“শরীর খারাপ লাগছে? ওহ্ পায়ে কি খুব যন্ত্রণা হচ্ছে? আমি তোমাকে বলেছিলাম তো ড্রাইভারকে ড্রাইভিং করতে দিতে। শুনলে না আমার একটা কথাও।”

–“আ’ম ফাইন।”

–“বললেই হলো নাকি! কি হয়েছে সত্যি করে বল।”

–“নাথিং।”

হঠাৎ কিছু একটা মনে পড়তেই আমিও এক মূহুর্তের জন্য চুপ হয়ে গেলাম। অতঃপর নিচু কন্ঠে বললাম,
–“ঐ নিউজ তো জান নিশ্চয়ই!”

–“কোন নিউজ?”

–“তোমার বাবার বিরুদ্ধে অ্যারেস্ট ওয়ারেন্ট জারি হয়েছে!”

–“আমি জেনে কি করব!”

–“শুনেছি রাজনৈতিক মাঠে উনার অবস্থা খুবই খারাপ পর্যায়ে। এইবার জনগণ যেভাবে খ্যাপেছে বোধহয় পদত্যাগ করিয়ে ছাড়বে।”

–“তো!”

–“না মানে এইজন্যই কি টেন…”

ইফান আমাকে থামিয়ে বলে উঠলো, “তুমি ভালো করেই জান এইসব ছোটখাটো বিষয়ে আমি ইনভলভ নেই। আর কার কি হলো না হলো আমার জানার বিষয় না। টেনশন মাই ফুট!”

আমি একটু চুপ থেকে সোজা হয়ে বসতে চাইলাম। কিন্তু ইফান পা ধরে থামিয়ে দিল। আমি এভাবেই বসে থেকে শুধালাম,
–“কি হয়েছে তোমার আমায় বল প্লিজ?”

–“অহেতুক টেনশন বাদ দাও।”

–“আমি অহেতুক টেনশন করছি না। আমি জানি কিছু একটা হয়েছে। তুমি কি লুকচ্ছ আমার থেকে?”

–“কি লুকাতে যাব?”

আমি চুপ হয়ে গেলাম। জোর করে পা নামিয়ে মুখ ঘুরিয়ে বসলাম। ইফান ফ্রন্ট মিররে আমার মিইয়ে যাওয়া অভিমানী চেহারায় দৃষ্টি বুলিয়ে আদুরে কণ্ঠে ডেকে উঠল, “বুলবুলি।”

আমি তাকালাম না। ইফান হাত বাড়িয়ে তার কাছে টানতে চাইল, কিন্তু আমার মধ্যে এক বিন্দুও নড়চড় দেখল না। ইফান মাঝ রাস্তায় গাড়িতে ব্রেক কষলো। আমার মধ্যে তাতেও কোনো হেলদোল হল না। সে আমাকে টেনে নিজের বাহুবন্ধনে আবদ্ধ করল। তাঁর বুকের সাথে আমাকে লেপ্টে নিল। আমার মাথায় চুমু খেয়ে হাস্কি স্বরে হিসহিসিয়ে বলে উঠলো,
–“বললাম তো আমার কিছু হয়নি, তবুও এত প্যানিক করছ কেন? আ’ম অলরাইট।”

আমি সাড়াশব্দ করলাম না। ইফান তাঁর বুক থেকে আমার মাথা তুলে দু’গাল আঁকড়ে ধরে আমার ঠোঁটে গাঢ় চুম্বন এঁকে দিল। তারপর সারা মুখে শব্দ করে চুমু খেয়ে আমার নাকে নাক ঘষে হিসহিসিয়ে বলল,
–“অলওয়েজ স্টে হ্যাপি। আই ডোন্ট লাইক টু সি ইউ স্যাড। এন্ড হ্যাভ ইউ ফরগটেন হু ইউ আর টু মি?”

আমি চোখ তুলে ইফানের দিকে তাকালাম। ইফান পুনরায় আমার ওষ্ঠপুটে শব্দ করে চুমু খেল। সহাস্যে বলল,“ইয়্যু আর মাই ফা*কিং ঝাঁঝওয়ালি।”

আমি ঠোঁট প্রসারিত করলাম। ইফানও তা দেখে হাসল। অতঃপর আমাকে আরও শক্ত করে ঝাপটে ধরে আমার গালে শব্দ করে চুমু খেতে খেতে বলে উঠলো,“তুমি চুপচাপ থাকলে আমার ভালো লাগে না। সবসময় ঝগড়া করবে আমার সাথে, ওকে।”

বলেই ইফান আমার গালে দাঁত বসাল। আমি ঠোঁট টিপে হাসি সংবরণ করে বলে উঠলাম,
–“তারপর দু’জনে ঝগড়া করতে গিয়ে খাট ভেঙে ফেলব।”

অতঃপর দু’জনেই উচ্চস্বরে হেসে দিলাম। হাসতে হাসতে আমার পেট ব্যথা হয়ে গেল। ইফান আমাকে প্রাণ খুলে হাসতে দেখে মুগ্ধ নয়নে তাকিয়ে রইল। কি চমৎকার আমার দু’গালে ক্ষুদ্র গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। ইফান আমার গালের গর্ত দুটো দু আঙুল দিয়ে চেপে ধরে আমার ঠোঁটে ঠোঁট ছুঁইয়ে হাস্কি স্বরে বলল,
–“সব সময় এভাবে হাসবে।”

আমি ওর গলা জড়িয়ে ধরে বললাম, “তাহলে তুমিও আগের ইফান চৌধুরী হয়ে যাও। আমার সামনে একদম মাফিয়া বসের মতো বিহেভিয়ার করবে না। ওকে?”

ইফান আমার কোমর জড়িয়ে ধরে আমার কানে ঠোঁট ছুঁইয়ে বলল,“বুঝ না সবসময় তো আর মনমেজাজ ঠিক থাকে না।”

–“কেন ঠিক থাকে না?”

–“বউ যদি অবাধ্য হয় তাহলে কিভাবে ঠিক থাকবে?”

–“এ্যাঁ! আমি কি করেছি হুম? আমি তো এখন তোমার সব কথায় শুনি।”

–“ও তাই! তাহলে গতকাল বাসা থেকে কে বের হয়েছিল? আর আমি যতবারই বাসায় না থাকি ঠিক তুমি ডানা মেলে উড়াউড়ি কর।”

–“মুটেও না। আমি শুধু আমার ডিউটি পালন করি। এর বাইরে আমি কখনোই কিছু করি না।”

–“কে বলেছে তোমাকে ডিউটি পালন করতে? আর যেন এমন না হয়। করতে হবে না কোনো জব। ঘরে বসে যা ইচ্ছে তাই কর।”

আমি ইফানের থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিলাম। প্রথমে মুখ ভার হয়ে আসলেও পরক্ষণেই কিছু একটা ভেবে ইফানকে জড়িয়ে ধরে ওর বুকে মাথা রেখে বললাম,
–“আচ্ছা তোমার সব কথা শুনব। আগে আমাকে একটা বেবি দাও। প্রমিজ সব কিছু ছেড়ে তোমার সংসারে মন দিব। আর কোনো পাগলামি করবো না। তোমার অবাধ্যও হব না।”

ইফান হঠাৎ চুপ হয়ে গেল। চেহারার হাসিটাও মিলিয়ে গেল। আমি মুখ তুলে ওর দিকে তাকিয়ে তরল গলায় বললাম,
–“আমি সত্যি বলছি। আমি সব ছেড়ে দিব। আমি আমার নৈতিকতা, আদর্শ বিসর্জন দিয়ে যদি তোমার মতো পাপীষ্ঠকে স্বামী হিসেবে মেনে নিতে পারি, তাহলে বাকি সব কিছুও তোমার জন্য ছেড়ে দিত পারব। আমি সত্যি একটু ভালো থাকতে চাই। তোমাকে নিয়েই ভালো থাকতে চাই। হোক পৃথিবীর সকল বাস্তবতার উর্ধে গিয়ে। একটা বেবি দাও না আমায়।”

ইফান দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। বদ্ধ গাড়ির ভেতর তা বেশ জোরে শুনাল। আমি ইফানের মুখের পানে চেয়ে। ইফান বোধহয় বারবার আমার একই আবদারে হতাশ। আমি আচমকা তাঁর দু’গাল টেনে আহ্লাদি স্বরে বলে উঠলাম,
–“ইফুওও, হাবিইই, দাও না প্লিজ।”

ইফান সুক্ষ্ম নজরে আমাকে দেখে ঠোঁট বাকিয়ে বলে উঠলো, “এই মাঝ রাস্তায় আমি তোমায় কিভাবে বেবি দিব?”

ইফানের কথায় থতমত খেয়ে গেলাম। ইফান আমার নাক টেনে পুনরায় ড্রাইভিং করতে লাগল।


বাড়িতে ফিরে ফ্রেশ হয়ে সকালের খাওয়াদাওয়া করে নিলাম। ইফান ফ্রেশ হয়েই বিছানায় গা এলিয়ে দিয়েছে। আমিও তাঁর পাশে রেস্ট নেওয়ার জন্য একটু শুয়েছিলাম। কখন যে চোখ লেগে যায় বুঝতেই পারিনি। ঘন্টাখানিক পর চোখ খুলতেই দেখি ইফানের বাহুডোরে আমি। নিজেকে ছাড়িয়ে বুকে ভালোভাবে শাড়ির আঁচল টেনে উঠে দাঁড়ালাম। ঘড়ির কাটা বারোটার ঘরে। মাথার ভেজা গামছা খুলে চুল ঝারতে ঝারতে রুম থেকে বেরিয়ে গেলাম।
নিচে এসে দেখি কেউ নেই। বাড়িটা কেমন ফাঁকা লাগছে। লাগবেই না কেন! বাড়ির দুজন সদস্য চিরকালের জন্য হারিয়ে গেছে। আর মীরা বাসায় নেই প্রায় দু সপ্তাহের কাছাকাছি হবে। মাহিন বলেছিল দেশের বাইরে আছে এখন। রান্নাঘর থেকে কারো আওয়াজ শুনে ভাবনা থেকে বেরিয়ে আসলাম। এগিয়ে যেতেই দেখি ফারিয়া, পলি, ইতি এবং নোহা মেঝেতে বসে আছে। ফারিয়া আর পলি মিলে আম মাখা করছে। আমার উপস্থিতি ফারিয়ার নজরে পড়তেই চেঁচিয়ে উঠল,
–“মেডাম এই দেখেন বাগান থেকে কাঁচা আমের কড়ি কুড়িয়ে এনেছি।”

পলি বলে উঠলো, “ভাবি বসেন, মাখা শেষ।”

আমিও গিয়ে শাড়ি গুটিয়ে মেঝেতে বসে পড়লাম। বেশ লোভনীয় লাগছে আম মাখা। এই সিজনে আজই প্রথমবার খাব। সকলে গামলা থেকে আম মাখা তুলে স্বাদ করে খেতে লাগলাম। নোহা খেতে খেতে বলতে লাগল,
–“ও এম জি! এই খাবারটা ইয়াম্মি। আমি আজ ফাস্ট টাইম টেস্ট করছি। জাস্ট ওয়াও ওয়াও।”

আমি বলে উঠলাম,“সত্যি খুব ভালো খেতে হয়েছে। আরও ঝাল হলে ভালো হতো।”

–“না না না আর ঝাল না। এটাই ঠিক আছে।”

ইতির কথায় তাঁর দিকে তাকাতেই দেখি ঝালের কারণে মেয়েটার চোখমুখ লাল হয়ে গেছে। শুধু ইতিই না, নোহারও একই অবস্থা। এক দিকে খাচ্ছে, আরেকদিকে নাক মুছতে ব্যস্ত। আমি ইতিকে শুধালাম,
–“আজ কলেজ ছিল না?”

–“ছিল তো। কিন্তু আমি যাইনি।”

–“কেন?”

ইতিকে বলতে না দিয়ে নোহা ফিসফিস করে বলে উঠলো, “প্রিটি গার্ল, লিটিল গার্লের পি হয়েছে।”

–“কি হয়েছে?”

–“পি, পি।”

নোহার কথার মানে বুঝতে পারলাম না। এদিকে লজ্জায় ইতির কান দিয়ে ধোঁয়া বের হতে শুরু করেছে। মেয়েটা মুচড়তে মুচড়তে কাউন্টারের আড়ালে মুখ লুকাল। পলি হেসে বলল, “ঐটা হইসে বুঝছেন ভাবি।”

–“পিরিয়ড হইছে?”

–“আরে প্রিটি গার্ল আস্তে বল। কেউ শুনে নিবে তো।”

নোহাকে সুক্ষ্ম নজরে পরখ করে সহাস্যে বলে উঠলাম,“বাববাহ্! আপনি এত বুঝদার মানুষ কবে থেকে হলেন?”

পলি আর ফারিয়া উচ্চস্বরে হেসে দিল। পলি খেতে খেতে বলল,“একটু আগে আমরা ক্লাস নিয়েছি তাই।”

সবাই হাসিঠাট্টা করে খাচ্ছি। এদিকে আম মাখা প্রায় শেষের দিকে। নোহা এত ঝাল খেতে পারছে না। তারপরও গপগপ করে মুখে পুরে নিচ্ছে। এক পর্যায়ে আমরা কিছু বুঝে ওঠার আগে গামলা নিয়ে উরাধুরা ছুট লাগাল। আমরা সবাই হতবিহ্বল। এদিকে ফারিয়া চেচিয়ে উঠল, ধর ওকে। আর কি? আমরা সকলেই নোহার পিছনে ছুট লাগালাম। নোহা বেশি দূর পালাতে পারল না। তার আগেই আমরা সকলে ধরে ফেললাম। অতঃপর ড্রয়িং রুমের মেঝেতে এক জনের উপর আরেকজন পড়ে কাড়াকাড়ি করে গামলা চেটেপুটে খেতে লাগলাম।
হঠাৎ আমার নজর আটকায় সিঁড়ির দিকে। সেখানে টাউজারের পকেটে দু’হাত গুঁজে দাঁড়িয়ে আছে স্বয়ং আমার জামাই। তাঁর বিস্ময় ভরা অদ্ভুত দৃষ্টি আমাতেই নিবদ্ধ।
ইফান আমার দিক থেকে দৃষ্টি সরিয়ে ঠোঁট কামড়ে কিচেনের দিকে হাঁটা ধরল। আমি পিছন থেকে স্পষ্ট দেখতে পারছি ইফানের বলিষ্ঠ দেহের চওড়া কাঁধ দু’টো কম্পিত হচ্ছে। আমি নখ কামড়াতে আরম্ভ করলাম। ইফান চাপা হাসছে। তার মানে সব দেখেছে। লজ্জায় আমার মাথা কাটা যাচ্ছে। মাটির নিচে লুকাতে ইচ্ছে হচ্ছে। আমি আর কোন দিক না তাকিয়ে এক ছুটে ড্রয়িং রুম ছাড়লাম। আগামী চব্বিশ ঘন্টার মধ্যে ওর সামনে আসব না। কি লজ্জা! কি লজ্জা!


দুপুরে বাড়ি ফিরেছে দুই বোন। নাবিলা চৌধুরী আগের চেয়ে আরও বেশি গম্ভীর হয়ে গেছেন। তবে আগের মতো ইদানীং দাপটে বেড়ান না। কদিন ধরে ইকবাল চৌধুরী গা ঢাকা দিয়ে আছে। বাড়ির কারো সাথে যোগাযোগ নেই। ইরহাম চৌধুরীও খুব একটা বাড়িতে আসেন না। ইফানও ছিল না এতদিন। বাড়িতে পুরুষ বলতে ইমরান আর পঙ্কজেরই আসা যাওয়া চলে।

নুলক চৌধুরী বলেছেন খাবার ঘরে খাবেন। তাই ফারিয়া খাবার নিয়ে গেছে। পলি ডাইনিং টেবিলে নাবিলা চৌধুরীর খাবার বেড়ে নিয়ে বসে আছে। কিন্তু মহিলা আসছেন না। আমি আর অপেক্ষা করলাম না। নাবিলা চৌধুরীর রুমের সামনে এসে দাঁড়ালাম। কয়েকবার নক হওয়ার পর ভেতর থেকে উনি বললেন,
–“দরজা খোলা আছে।”

আমি ভেতরে ঢুকে দেখি নাবিল চৌধুরী কাউচে বসে আছেন চোখের উপর হাত ধরে। এখনো ফ্রেশ হন নি। আমি বললাম,“মা খাবার?”

–“এখন ইচ্ছে করছে না।”

–“ঘরে নিয়ে আসব?”

–“প্রয়োজন নেই। যখন ইচ্ছে হবে গিয়ে খেয়ে আসব। তুমি আসতে পার।”

আমি ঠাঁই দাঁড়িয়ে রইলাম। অতঃপর ধীর কন্ঠে বললাম,“ও এসেছে।”

–“ইফান এসেছে?”

–“হ্যাঁ।”

–“ওও।”

নাবিলা চৌধুরীর মধ্যে কোনো আগ্রহ দেখতে পেলাম না। আমি চুপচাপ গিয়ে ড্রেসিং টেবিল থেকে তেলের বোতল নিয়ে উনার পিছনে দাঁড়ালাম। অতঃপর উনার মাথায় তেল দিয়ে দিতে লাগলাম। নাবিলা চৌধুরী বিস্মিত হয়ে চোখ মেললেন। শুধালেন,
–“কে?”

–“আমি।”

নাবিলা চৌধুরী ঘাড় কাঁধ করে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, “কি করছ তুমি?”

–“আপনার বোধহয় মাথায় যন্ত্রণা হচ্ছে! তাই ভাবলাম তেল দিয়ে দেই।”

–“এটা তোমাকে কে বলল?”

–“মনে হলো। আগে তো কাকিয়া প্রতি সপ্তাহে দিয়ে দিত। না হলে তো শুনেছি আপনার মাথা ব্যথা করে।”

নাবিলা চৌধুরী কিছু বললেন না। কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলে উঠলেন,“কই গিয়েছিল জান?”

–“দেশের বাইরেই নাকি ছিল।”

–“ওও।”

আমি উনার মাথায় তেল দেওয়া শেষ করে বললাম, “আপনি রেস্ট নেন। আমি ইফানকে গিয়ে বলছি।”

–“প্রয়োজন নেই।”

–“প্রয়োজন আছে। আপনার ছেলেও আসছে থেকে কিছু খায়নি। আমি গিয়ে ওকে বলে তারপর আপনাদের দু’জনের খাবার রুমেই দিয়ে যাব।”

কথা শেষ করে আমি রুম থেকে বেরিয়ে যাওয়ার জন্য উদ্যুত হলেই পিছন থেকে নাবিলা চৌধুরীর কন্ঠ শুনে থেমে গেলাম।

–“তোমাকে একটা কথা বলব।”

আমি পিছনে ফিরে তাকিয়ে শুধালাম, “কি কথা?”

–“সময় হোক।”

নাবিলা চৌধুরী পুনরায় কাউচে মাথা এলিয়ে চোখ বন্ধ করে নিলেন। আমি কিছুক্ষণ উনার দিকে তাকিয়ে থেকে রুম হতে বেরিয়ে গেলাম।
**
খাওয়াদাওয়া করে সকলেই নিজেদের রুমে চলে এসেছি। ড্রয়িং রুমে এখন শুধু পঙ্কজ আর ফারিয়া। সে পঙ্কজকে খাওয়াচ্ছে। পঙ্কজ খেতে খেতে বলল,
–“তোমার ঐটা নিয়ে এসেছি। গাড়ির ডিকিতে আছে। আমি ভেতরে আনলে প্রবলেম হত। ইফানের বউতো আবার সাংঘাতিক মহিলা।”

ফারিয়া বুঝল না। সে বেখেয়ালি শুধালো, “কিসের কথা বলছেন?”

–“ঐ যে ঐটা। কি যেন নাম! পিরিয়ডের সময় পড়ে যে।”

–“ওহ্ প্যাডের কথা বলছেন?”

–“ইয়াহ্।”

ফারিয়া কিছুটা অন্যমনষ্ক হয়ে গেল। পঙ্কজ খাওয়া শেষ করে হাত মুছে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। ফারিয়া দু’হাতে ওড়না খামচে ধরে ভেতরের অস্থিরতা দমাতে চাইছে। পঙ্কজ বলল,
–“আমি এখন বেরিয়ে যাব গাড়ি থেকে নিয়ে আস যাও।”

পঙ্কজ পাশ কাটিয়ে চলে যেতে নিলেই পিছন থেকে ফারিয়া ডেকে উঠল,“আসলে একটা কথা ছিল।”

পঙ্কজ দাঁড়াল। ফারিয়া কিছু বলছে না দেখে পঙ্কজের চেহারায় বিরক্তির রেশ ভেসে উঠল। পঙ্কজ শুধালো,
–“আই ডোন্ট হ্যাভ দ্যাট মাচ টাইম। সে হোয়াট ইউ নিড টু সে কুইকলি।”

–“ঐ আসলে..”

ফারিয়া কিছু বলতে গিয়েও বলতে পারছে না। পঙ্কজের চেহারার রং ধীরে ধীরে পাল্টে যাচ্ছে। সে তাড়া দিয়ে বলল,
–“আমার দেরী হচ্ছে ইডিয়ট। যা বলার তাড়াতাড়ি বল।”

ফারিয়া আশেপাশে নজর বুলিয়ে নিচু স্বরে বলে উঠলো,“আপনি আমায় বিয়ে করবেন কবে?”

ভ্রু কুঁচকাল পঙ্কজ। এমন সময় এই ধরনের কথা সে আশা করে নি। ফারিয়া পঙ্কজের ভাবমূর্তি লক্ষ করে বলে উঠলো,“আসলে এতদিন মেডাম ছিল না। কিন্তু এখন মেডাম এই বাড়িতে। আমি উনাকে খুব ভালো করে চিনি। উনার চোখ বাজপাখির মতো তীক্ষ্ণ। যদি আমাদের সম্পর্কের কথা জানতে পারে!”

–“হু আর ইউ টকিং অ্যাবাউট?”

–“জাহানারা মেডাম।”

ফারিয়ার কথা শুনে পঙ্কজের চেহারার বিরক্তি ভাব সরে গেল। হঠাৎ ঠোঁট বাকিয়ে অদ্ভুত ভবে হাসল। ফারিয়া কিছু বুঝল না এভাবে হাসার কারণ। পঙ্কজ এগিয়ে এসে ফারিয়ার ঠোঁটের কিনারে হাত দিয়ে আলতো করে স্লাইড করতে করতে হিসহিসিয়ে বলল,
–“দ্যাটস হোয়াই আই লাভ ইয়োর ম্যাডাম সো মাচ।”

–“কিহ্।”

ফারিয়া বিস্ময় নিয়ে আওড়ালো। পঙ্কজ হেসে বলল,“ডোন্ট ওয়ারি। আ’ম হিয়ার।”

–“কিন্তু বিয়ের বি..”

–“উইল সি লেটার।”

ফারিয়াকে থামিয়ে পঙ্কজ বলে চলে যেতে লাগলো। সিঁড়ি অব্ধি গিয়ে পুনরায় পা থামাল। ঘাড় কাঁধ করে বলল,“ওহ্ ব্রিং দ্যাট ফ্রম দ্য কার।”

পঙ্কজ চলে গেল। ফারিয়া বেশ উদাস হয়ে গেল। সেভাবেই ভাবতে ভাবতে পার্কিং লটে এল। পঙ্কজের গাড়ির ডিকি খুলতেই দেখতে পেল বেশ কিছু শপিং। ফারিয়ার কপাল কুঁচকে এল। সে একটা শপিং ব্যাগ হাতে নিতেই দেখে তার ভেতর অনেকগুলো চকলেট। খুশিতে লাফিয়ে উঠল ফারিয়ার মন। তাড়াহুড়ো কর এক এক করে শপিং গুলো নিতে লাগল। একটা শপিং টেনে আনতে পারছে না। সে ডিকির ভেতর অনেকটা ঝুঁকে শপিং ব্যাগ নিতে গিয়ে বেখেয়ালি ডিকি খুলে পড়ল মাথায়। আচমকা এত জোরে আঘাত সহ্য করতে না পেরে জ্ঞান হারিয়ে ডিকির ভেতরই আঁটকে গেল।
পঙ্কজ রেডি হয়ে এসে গাড়ির কাছে এল। ডিকিটি আলতো খোলা দেখে সে বুঝল ফারিয়া তাঁর জিনিসপত্র নিয়েছে। সে ভালো করে ডিকি লাগিয়ে গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে গেল।


আজ কলেজে আসতে চাইনি জুই। কিন্তু পরীক্ষার সাজেশন দিবে তাই বাধ্য হয়ে এসেছে। আসার পর থেকেই ভয়ে ভয়ে আছে। না জানি কখন মাহিন চৌধুরী নামক সাইকো লোকটার সাথে দেখা হয়ে যায়। এদিকে কলেজ ছুটি দেওয়ার আগেই মাহিন কলেজের সামনে এসে হাজির। বাইক থেকে নেমে হেলমেট খুলতেই উষ্কখুষ্ক বড় বড় চুলগুলো এলোমেলো হয়ে পড়ল। মাহিন বাইকের ফ্রন্ট মিররের দিকে তাকিয়ে চুলে ব্যাক ব্রাশ করল। অতঃপর সানগ্লাসটা চোখে পরে নিল।
অতঃপর কলেজের গেইটের দিকে তাকিয়ে বাইকে হেলান দিয়ে দাঁড়াল। হোয়াইট শার্টের দু’টো বোতাম খোলা হওয়ায় বুকের কিছু অংশ উন্মুক্ত। ফর্সা ক্লিন ফেইস হওয়ায় দারুণ সুদর্শন লাগে। মাহিন পিয়ার্সিং করা কানের স্টাড’টি নাড়াচাড়া করতে করতে ডানে দৃষ্টি ঘুরাতেই চোয়াল শক্ত হয়ে গেল।

গাড়ির সামনে পা ভাঁজ করে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে আবির। দেহ তাঁর কালোই মোড়ানো। তাঁর মনযোগ হাতের ফোনের দিকে। কিন্তু মাহিনের চোখ আবিরের দিকে পড়তেই বেখেয়ালি আবিরের চোখ মাহিনের উপর আটকায়। দু’জনেই এক সাথে চোখের রোদ চশমা খুলে একে অপরের দিকে তীক্ষ্ণ নজরে তাকায়। মাহিন ভেতরের ক্রোধ সংযত করে নিল তৎক্ষনাৎ। পুনরায় চোখে সানগ্লাস লাগিয়ে দৃষ্টি ঘুরিয়ে অ্যাটটিউড দেখাল। যেন আশেপাশের মানুষদেরকে সে পরোয়া করে না।

আবিরও কোনো অংশে কম যায় না। হতে পারে গায়ের রং শ্যামলা। মাহিন চৌধুরীর মতো বিলেতি গায়ের রং নেই। সে খাঁটি দেশীয় ছেলে। আবির মাহিনের থেকে দৃষ্টি সরিয়ে চোখে সানগ্লাস লাগিয়ে নিল। দুজন এক বারের জন্যও একে অপরের দিকে তাকানোর প্রয়োজন মনে করল না।

কলেজ ছুটি হতেই শিক্ষার্থীরা দল বেঁধে বের হতে লাগল। গেইট থেকে বের হতেই ইয়াং মেয়েদের দৃষ্টি আটকাল দু’জন সুদর্শন পুরুষের দিকে। একবার ডান দিকে তাকায়, তো একবার বাম দিকে তাকায়। হায়! কাকে ছেড়ে কাকে দেখবে!

তিন বান্ধবী গেইটে উঁকি দিল৷ আবিরকে দেখে এই প্রথম জুইয়ের আনন্দ হলো। কিন্তু পরক্ষণেই নজর আটকালো মাহিনের দিকে। ভয়ে জমে গেল সে। সোমা আর মিনা বই দিয়ে নিজেদের মুখ আড়াল করল, আর পিছনে জুইকে আড়াল করে গেইট থেকে বের হয়ে ভীড়ের মধ্যে মিশে গেল। তিনজন হাত মিলিয়ে মনে মনে বিজয়ের হাসি হাসল। কিন্তু পরক্ষণেই তাদের কানে আসল পুরুষালি কর্কশ কণ্ঠস্বর,
–“হেই ইডিয়ট’স! হোয়্যার ইজ মাই ইনো গার্ল?”

সোমা আর মিনা চোখাচোখি করল৷ এত লুকোচুরি করেও ধরা পড়ে গেল! দুজন দাঁত বের করে হেসে বলল,
–“জুই তো আজ আসে নি ভাইয়া।”

আবিরের কর্ণপাত হতেই তৎক্ষনাৎ বলে উঠল,“আসেনি মানে কি? স্যারকে তো জুই নিজেই বলেছে সে স্কুলে আছে। তাই তো আমি…”

আবির নিজের কথা শেষ করতে পারল না, তার আগেই জুই সোমা আর মিনার আড়াল থেকে বেরিয়ে চেচিয়ে উঠল,
–“এই জন্য আবির ভাই, এই জন্যই আপনাকে দেখলে আমার এত রাগ হয়। দিলেন তো ফাঁসিয়ে।”

বলতে বলতে জুইয়ের নজর আটকালো মাহিনের তীক্ষ্ণ দৃষ্টির উপর। ভয়ে জুই ঢোক গিলল। আবির হতবিহ্বল হয়ে গেল জুইয়ের কথা শুনে। সে এগিয়ে এসে শুধালো,
–“জুইফুল আমি কি করলাম?”

–“কি করেন নি আ…।”

জুই বলতে গিয়েও বললো না। তার দৃষ্টি আটকাল মাহিনের রাগী চেহারার পানে। গতরাতের মাহিনের কথাগুলোও মনে পড়ে গেল। মাহিন তো স্পষ্ট বলেছিল আবিরের থেকে দূরে থাকতে। না হলে ক্ষতি করে দিবে। জুই কথা না বাড়িয়ে বান্ধবীদের নিয়ে হাঁটা ধরল। পিছন থেকে আবির ডেকে উঠল,
–“আরে কোথায় যাচ্চ পিচ্চি?”

জুই তৎক্ষনাৎ দাঁড়িয়ে পড়ল। রাগী কণ্ঠে বলল,“একদম পিচ্চি ডাকবেন না আবির ভাই। আর আমরা একা একাই যেতে পারব।”

–“কিন্তু আমি..!”

জুই আর এক মূহুর্ত দাঁড়াল না। এদিকে আবির বোকার মতো তাকিয়ে রইল। মাহিন রাগে দু’হাত মুষ্টিবদ্ধ করে দাঁতে দাঁত পিষে বাইক নিয়ে চলে গেল। আবির কিছু একটা আঁচ করে সেও গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে গেল।


কাঁচা বাজারে টাটকা সবজি কিনছে জুইরা। হঠাৎ জুই তাঁর পাশে কাউকে অনুভব করে চোখ উপরে তুলতেই মাহিনের রাগী চোয়াল ভেসে উঠল। চোখে সানগ্লাস থাকায় মাহিনের ক্রোধিত নয়নের তোড়ে পড়ার হাত থেকে খানিকটা রেহাই পেল। জুই ধীরে ধীরে পাশ কাটিয়ে আলুর দোকানে চলে গেল। আড় চোখে মাহিনকে আসতে দেখে গলার স্বর খাদে নামিয়ে বিক্রেতাকে বলল এক কেজি আলু দিতে। বাজারের এত কোলাহলের মধ্যে বিক্রেতা শুনতে পেল না। তক্ষুনি আবির এসে হাজির হলো। জুই উঁকিঝুঁকি মেরে মাহিনকে দেখতে ব্যস্ত তখনই আবিরের কণ্ঠ ভেসে আসল,
–“চাচা এক কিলো আলু দেন।”

আবিরের কণ্ঠ শুনতে পেয়ে জুই তৎক্ষনাৎ সেই দিকে তাকাল। না করার পরও আবির কে দেখে খ্যাপে গেল জুই। কিছু বলবে তার আগেই কানে ভেসে আসল মাহিনের কণ্ঠ,
–“আঙ্কেল দু কিলো আলু দেন।”

বিক্রেতা এক কেজি মাপতে গিয়ে আবার দু কেজির মতো আলু মাপার জন্য আলু তুলে নিল। আবিরের কপাল কুঁচকে এলো। হঠাৎ মাহিন জুইয়ের পিছনে পড়েছে কেন বুঝতে পারছে না। আবির পুনরায় বললো,
–“চাচা আপনি তিন কিলো আলু দেন।”

মাহিন দাঁতে দাঁত পিষে বলল,“আঙ্কেল চার কিলো দেন।”

–“পাঁচ কিলো দেন।”

–“ছয় কিলো দেন..”

জুইরা সহ উপস্থিত সকলে একবার মাহিনের দিকে তাকায় আরেকবার আবিরের দিকে তাকায়। মাহিন আর আবির তর্কাতর্কি করতে করতে ত্রিশ কেজিতে পৌঁছাল। মাহিন এবার রাগে বলে উঠলো,
–“দোকানের সব আলু আমি নিব।”

আবির কিছু বলতে যাবে তার আগেই বিক্রেতা পেকেট করা সব আলু আগের জায়গায় ঢেলে চেঁচিয়ে উঠল,
–“এ যান তো আপনারা, এখান থেকে অন্য কোথাও যান। দুনিয়ায় এত দোকান থাকতে আমার দোকানই পেল। ধুর ধুর।”

মাহিন আর আবির থতমত খেয়ে গেল। দু’জনেরই আত্মসম্মানে লাগল। আড় চোখে জুইদের দিকে চোখ ঘুরাতেই চোখ কপালে। জুইরা এখানে নেই। মাহিন আর আবার দৃষ্টি ঘুরাতেই লক্ষ করল জুইরা অটোতে, আর এতক্ষণে অটোও ছেড়ে দিয়েছে।

আবিরও আর এক মূহুর্ত দাঁড়াল না। মাহিন রাগ আর ধরে রাখতে পারছে না। চোখের সানগ্লাস খুলে আবিরকে দেখে ফুঁসতে ফুঁসতে স্থান ত্যাগ করল। আজ সব কাজ ফেলে এসেছিল জুইকে নিয়ে বাইক রাইডিং এ যাবে তাই। কিন্তু আবিরের জন্য সব ব্যস্তে গেল। মাহিন যেতে যেতে বিড়বিড়িয়ে আওড়ালো,
–“বাস্টার্ড তোকে দেখে নিব আমি।”


কাকিয়ায় মৃত্যুর পর চৌধুরী বাড়ির নিরাপত্তা দ্বিগুণ করা হয়েছে। তবে বাড়ির ভেতরে কাজের লোক রাখতে সকলে ভরসা পাচ্ছে না। আপাতত রান্নার জন্য আলাদা কাজের লোক রাখা হয়নি। আগের স্টাফদের মধ্যেই কয়েকজন অন্দরমহলের কাজ করে। তবে বাড়ির কেউ না কেউকে থাকতে হয় দেখাশোনার জন্য। প্রতিদিন পলি আর ফারিয়া এদিক দেখে। কিন্তু আজ হঠাৎ ফারিয়া কোথায় চলে গেল না বলে বুঝতে পারছি না। ফোনও বাড়িতে ফেলে গেছে। মেয়েটার জন্য অবশ্য টেনশনও হচ্ছে।

আমি দু’কাপ কপি বানিয়ে রুমে এলাম। এসে দেখি ইফান এখনো উরুতে ল্যাপটপ নিয়ে বসে কাজ করছে। দেয়াল ঘড়িতে সন্ধ্যা সাতটা বাজে। সেই বিকেল থেকে কি এমন কাজ করছে লোকটা!
আমি কফির কাপটা সামনে ধরতেই ইফান আমার দিকে তাকাল। ভ্রু কুঁচকে কাপ হাতে নিয়ে জিজ্ঞেস করলো,
–“কোথায় ছিলে?”

আমি ইফানের পাশে বসতে বসতে প্রত্যুত্তরে বললাম,“নিচে ছিলাম।”

–“কে বলেছিল তোমায় নিচে যেতে?”

আমি কাপে চুমুক দিতে গিয়েও থেমে গেলাম। ইফান এখনো তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে। আমি বুঝতে পারছি না আবার কি হলো। ইফান বলে উঠলো,
–“কাজের মানুষ থাকার সত্ত্বেও তোমার এত কিসের কাজ থাকে হ্যা? তোমায় পার্সোনাল এসিস্ট্যান্টও তো এনে দিলাম!”

–“তো কি হয়েছে? আমি কি কিছু করব না?”

–“না করবে না। আর ঐ ফাঁকিবাজটা কই?”

–“উফফ! ওকে ফাঁকিবাজ বলো না তো। যথেষ্ট কাজ করে মেয়েটা। আমার সব কাজ করে বাড়ির বাকি কাজেও সাহায্য করে।”

ইফান দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে আমার কোমর ধরে তার কাছে টেনে নিল। শান্ত গলায় বলল,“আমি তোমাকে নিয়ে ভীষণ টেনশনে থাকি জান।”

আমি ওর কাঁধে মাথা রেখে বললাম,“হুম জানি। কিন্তু তুমি এত চিন্তা করো না। আমি নিজেকে..।”

বাক্য সম্পূর্ণ করতে পারলাম না। তার আগেই আমার ফোনটা বেজে উঠল। ইফান হাত বাড়িয়ে ফোনটা তুলে আমার হাতে দিল। ফোনের স্ক্রিনে জুইয়ের নাম সেইভ করা। আমি ঝটপট ফোন রিসিভ করতেই ফোনের ওপাশ থেকে সোমা আর মিনার ক্রন্দনরত আওয়াজ ভেসে আসল। কপালে ভাঁজ পড়ল আমার। আমি তৎক্ষনাৎ জিজ্ঞেস করলাম,
–“কিরে কাঁদছিস কেন তোরা?”

সোমা ফুঁপিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলল,“জাহান আপি জুই..।”

–“জুই কি করেছে? আবার ঝগড়া করলি নাকি তোরা?”

–“আপু সন্ধ্যায় নাস্তার জন্য ঘরে নুডলস ছিল না। জুই আমাদের বাসার সামনের দোকান থেকে নুডলস আনতে গিয়েছিল। কিন্তু এখনো আসছে না।”

–“কিহ্!”

হঠাৎ মাথাটা ঘুরে উঠল। হাত থেকে কফির কাপ পড়ে গেল। ইফান ধরে আমাকে সামলাতে সামলাতে উদ্বীগ্ন হয়ে জিজ্ঞেস করলো,
–“কি হয়েছে জারা?”

–“আআমার বোন…”

চলবে,,,,,,,,,,,

যারা পড়েছেন সকলে রেসপন্স করবেন। ভুল ত্রুটি হলে ধরিয়ে দিবেন, পরে এডিট করে দিব। হ্যাপি রিডিং 💗

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply