জাহানারা
জান্নাত_মুন
পর্ব :৭৮
🚫ক’পি করা নিষিদ্ধ
🔞 সতর্কবার্তা:
এই গল্পে অ’কথ্য ভাষা এবং স”হিং’সতার উপাদান রয়েছে। ১৮ বছরের কম বয়সী বা সং’বে’দনশীল পাঠকদের জন্য উপযুক্ত নয়। পাঠক নিজ দায়িত্বে পড়বেন।
কারো ফুঁপিয়ে কান্নার আওয়াজটি এখন আরও কিছুটা স্পষ্ট হলো। বাগানের টিমটিমে হলদেটে আলোয় বেলকনিটি ঝাপসা দেখা যাচ্ছে। সেখানে কাউকে কিংবা কোনো অবয়ব নজরে আসল না। তন্নির হাত-পা ভয়ে কাঁপছে। মনে মনে আল্লাহর নাম জপতে আরম্ভ করেছে। এই মাঝরাতে কিছু না ভেবেই বেলকনিতে চলে আসলো। ইশ! কেন যে একবার ভেবে দেখলনা সে নিজ বাসায় নেই, মরা বাড়িতে এসেছে। এখন যদি তেনারা কিছু করে…..
ভয়ে তন্নি একটা শুকনো ঢোক গিলল। তার হাত-পা যেন অসার হয়ে যাচ্ছে। এই ফুঁপিয়ে কান্নার আওয়াজ শয়তান করছে না-তো! তন্নির এই বুঝি হার্ট ফেল হলো। কিন্তু এত তাড়াতাড়ি সে মরতে চায় না। তাই মনে মনে আল্লাহর নাম ডাকতে ডাকতে পিছনে ঘুরে, ছুট লাগাতে যাবে তক্ষুনি পুরুষালি গম্ভীর কণ্ঠ ভেসে আসে,
–“কে?”
ভয়ের চোটে তন্নির পা জমে যায়। কপাল বেয়ে ঘাম ঝারতে শুরু করে। সে অনুভব করে পিছনের অস্তিত্বটি এগিয়ে এসে রেলিঙ ঘেঁষে দাঁড়িয়েছে। তন্নির পরাণ যেন লাফাচ্ছে। এই বুঝি বেরিয়ে যাবে। অধিক ভয়ে জামা খামছে ধরে চোখ দুটো খিঁচে বন্ধ করে নিল। বিড়বিড়িয়ে একনাগাড়ে জপতে লাগল,
“লা ইলাহা ইল্লা আন্তা সুবহানাকা ইন্নি কুনতু মিনাজ জোয়ালিমিন।”
পিছন থেকে পুরুষালি গম্ভীর কণ্ঠস্বর ভেসে এলো,“এত রাতে তুমি এখানে কি করছ?”
তন্নির খুব কান্না আসছে। আজ বোধহয় পৃথিবীতে তার শেষ দিন। একটু চিৎকার করে সকলকে ডাকতে চায়ছে। কিন্তু ভয়ের চোটে গলা দিয়ে স্বর বের হচ্ছে না। হঠাৎ ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলো ভিতু মেয়েটা। কাঁপা কাঁপা গলায় বলে উঠলো,
–“দয়া করে আমায় মরবেন না। আআমি তো আপনাদের কোনো ক্ষতি করিনি। আল্লাহর দোহাই লাগি।”
ভ্রু কুঁচকে এলো ইনানের। সে একই স্বরে শুধালো,“স্ট্রেঞ্জ! আমি তোমায় মা’রতে যাব কেন?”
তন্নির কান্না হঠাৎ থেমে গেল। গলাটা তার খুব চেনা লাগছে। পিছনে তাকিয়ে কি একবার দেখবে কে? পরক্ষণেই তন্নি মনে মনে তিরস্কার করল। সে শুনেছে, শয়তানরা নাকি মানুষদের বেশ ধরতে পারে। তারপর পিছনে তাকালেই ঘাড় মটকে দেয়। ভয়ের চোটে সারা দেহের লোম দাঁড়িয়ে দেহ মৃদু ঝাঁকুনি দিয়ে উঠল। আজ বোধহয় সে রক্ষা পাবেনা।
তন্নির থেকে উত্তর না পেয়ে বেশ বিরক্ত হলো ইনান। সে চোয়াল শক্ত করে ফের শুধালো,“এই মেয়ে কি সমস্যা? আমি তো তোমায় কিছু জিজ্ঞেস করছি?”
“দয়া করে আমার ঘাড় মটকাবেন না।”
“কিহ্!”
বিষ্ময়কর স্বরে আওড়ালো ইনান। তন্নি এখনো ঘামছে। ইনান এবার চরম বিরক্তির স্বরে বলে উঠলো, “মাঝরাতে আমি ফান করার মুডে নেই। তুমি থাক আমি গেলাম, ডিজগাস্টিং!”
ইনান পিছনে ঘুরে যেতেই তন্নিও ঘুরে দাঁড়াল। আবছা আলোয় সশরীরে একজন মানুষকে দেখে ভয় কিছুটা কমল যেন। সে ডেকে উঠল,
–“আপনি কি ইনান?”
ইনান দাঁড়িয়ে পড়ল। তন্নির দিকে ফিরে ভ্রু কুঁচকে শুধালো,“তাহলে কাকে মনে হয়?”
তন্নি হাঁপ ছেড়ে সহাস্যে বলল,“ও আল্লাহ, আগে বলবেন না! একটুর জন্যেই তো মা’রা পড়ছিলাম।”
–“হোয়াট?”
–“আমি তো আপনাকে শয়তান ভেবেছিলাম।”
–“কিহ্?”
তন্নি এগিয়ে গিয়ে রেলিঙ ধরে দাঁড়িয়ে পড়ল। প্রত্যুত্তরে বলল,“হ্যা তো। ভেবেছিলাম এক্ষুনি বুঝি আপনি আমার ঘাড় মটকে দিবেন।”
ইনান দাঁতে দাঁত পিষল। তন্নি ইনানের শক্ত চোয়াল দেখে সন্দিহান কন্ঠে শুধালো,“এই আপনি সত্যিই মানুষ তো?”
–“না, শয়তান। এক্ষুনি তোমার ঘাড় মটকাবো। ডিজগাস্টিং!”
ইনান বিরক্তি নিয়ে কথাগুলো বলে চলে যেতে যাবে তক্ষুনি তন্নি ডেকে উঠল, “এই এই চলে যাচ্ছেন কেন?”
ইনান থামল। ঘাড় কাঁধ করে শুধালো, “তো কি করব? সারারাত কি এখানেই কাটাব নাকি?”
তন্নির কাছে ইনানের কথাটা যুক্তিসঙ্গত মনে হয়েছে। সে বললো,“তা ঠিক বললেন। এত রাতে এখানে আর কি করবেন।”
ইনান পুনরায় চলে যেতে যাবে তক্ষুনি তন্নি শুধালো,“কিন্তু আপনি কাঁদছিলেন কেন?”
আচমকা পা থমকে গেল ইনানের। তন্নি পুনরায় প্রশ্ন করলো,“আমি শুনেছি আপনি এখানে বসে কাঁদছিলেন। কি হয়েছে আপনার? আপনি ঠিক আছেন?”
তন্নির দিকে ফিরে তাকিয়ে গম্ভীর কন্ঠে ইনান বলল,“তোমার কানে সমস্যা। আমি কাঁদতে যাব কেন?”
–“কি বললেন? আমার কানে সমস্যা! আপনি বলতে চাইছেন আমি হাটকালা?”
–“হোয়াট? হোয়াট ইজ হাটকালা?”
তাঁর শব্দের ডিকশিনারির বাইরে নতুন শব্দ শুনে বোধগম্য হলোনা ইনানের। তন্নি কোমরে দু’হাত ধরে বলে উঠলো, “এমন ভাব করছেন যেন আমার কথার মানেই বুঝতে পারছেন না?”
–“ভাব ধরতে যাব কেন? সত্যিই এই শব্দটি ফাস্ট টাইম শুনেছি।”
–“বাঙালি হয়েও হাটকালার মানে জানেন না? আপনি কি এলিয়েন নাকি?”
মধ্যে রাতে তন্নির আজগুবি কথাবার্তায় বেশ বিরক্ত ইনান। সে কি করে জানবে হাটকালা শব্দের অর্থ কি? সে কি বাংলাদেশে বড় হয়েছে নাকি আশ্চর্য! ইনান বিরক্তি নিয়ে বলল,“মাঝ রাতে তোমার সাথে কথা বাড়াতে চাইছি না। আমি গেলাম।”
–“গেলাম মানে কি? আগে বলেন কাঁদছিলেন কেন? শরীর খারাপ?”
–“তোমাকে কি আমি বলেছি কাঁদছিলাম? কাঁদলেও তোমার কি?”
–“আমার কিছু না। কিন্তু কেউ কাঁদলে আমার কষ্ট লাগে।”
–“আসছে এক মানবতার ফেরিওয়ালা!”
–“কিহ্?”
–“নাথিং। আমি যাচ্ছি।”
–“আরে আগে বলেন তো আপনার কি হয়েছে? আমি দেখেছি আজ আপনার মন অনেক খারাপ। আন্টির জন্য আপনারও খুব খারাপ লাগছে তাই না? আমাদের সবারই খুব খারাপ লাগছে। আন্টি অনেক ভালো ছিলেন। ভালো মানুষদের সাথেই যে কেন সবসময় এমন হয়!”
ইনান দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। তন্নি নরম কন্ঠে বলে উঠলো, “আপনার অনেক মন খারাপ তাই না? আমার সাথে শেয়ার করতে পারেন। তাহলে দেখবেন মন খারাপ ভালো হয়ে যাবে।”
–“তুমি একটু বেশিই বুঝ। বাই দ্য ওয়ে আমি রুমে যাচ্ছি।”
ইনান আবারো চলে যাওয়ার জন্য উদ্যত হতেই তন্নি বলে উঠলো, “ও বুঝতে পারছি?”
–“কি?”
–“শেয়ার করার বোধহয় অনেক মানুষ আছে আপনার।”
ইনান উত্তর দেওয়ার প্রয়োজন মনে করলো না। কিন্তু তন্নির ফ্যাকাসে চেহারা দেখে না চাইতেও বলে উঠলো,
–“গড ফাদার আর ইফান ভাই ছাড়া আমার আর কেউ নেই।”
নড়েচড়ে উঠলো তন্নি। কৌতুহলী হয়ে শুধালো,“কেন নেই কেউ?”
ইনান রেলিঙ ধরে বাইরে আকাশের পানে তাকালো। আকাশে এক ফালি চাঁদ ভাসছে। আবার কিছুক্ষণ পরপর মেঘ এসে তাকে আড়াল করে দিচ্ছে। ইনান আনমনে বলে উঠলো, “সবারই বুঝি সব থাকে নাকি?”
–“তা ঠিক। সবারই সব থাকে না। আপনার কি কি নেই?”
ইনান তন্নির পানে চেয়ে ভ্রু উঁচিয়ে শুধালো,“তোমাকে কেন বলল?”
–“উ না মানে বললে আপনার মন হালকা হবে।”
ইনান দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। বাতাসের সাথে ভেসে অনেক দূর পর্যন্ত সেই আওয়াজ ভেসে গেল। তন্নি তাকিয়ে আছে ইনানের দিকে। ইনান উত্তর করছেনা কোনো। চুপচাপ দাঁড়িয়ে আকাশের পানে তাকিয়ে। তন্নির মন খারাপ হলো। সে হঠাৎ বলে উঠলো,
–“আমরা ফ্রেন্ড হতে পারি?”
ইনানের হাসি পেল। সে ঠোঁট কামড়ে হাসি থামিয়ে বলল,“তুমি জান আমি তোমার ঠিক কত বছরের সিনিয়র?”
তন্নি মাথা নাড়িয়ে বলল,“জানি না। তবে মনে হয় আপনার বয়স চব্বিশ-পঁচিশ এর মতো হবে!”
ইনানের ঠোঁট টিপে রাখা হাসি আরও প্রশস্থ হলো। তন্নি লজ্জা পেল তা দেখে। সে গলা খাঁকারি দিয়ে বলে উঠলো, “আমার বয়স একুশ। সো এক দু বছর বড় ছোট হলেও ফ্রেন্ডশিপে কোনো সমস্যা হয়না।”
–“ইফান ভাইয়ের বয়স কত জান?”
এবার খুশিতে তন্নির মন নেচে উঠল। সে সহাস্যে বলল,“আমি প্রথম ভাইয়ার বয়স ভাবতাম চব্বিশ পঁচিশের মতো। দেখতে এতো ড্যাশিং আর স্মার্ট যে কচিই লাগে। কিন্তু যখন জাহানের কাছে বয়স শুনলাম তখন হাসতে হাসতে শেষ। জাহানকে এখন তার জামাইয়ের বয়স নিয়ে খুঁচাতে সেই লাগে। হাহাহা।”
–“আমি ইফান ভাইয়ের নয় দিনের ছোট।”
ইনানের বাক্য তন্নির কানে পোঁছাতেই মেয়েটার কাশি উঠে গেল। এভাবে খুকখুক করে কাশতে দেখে ইনান হাত বাড়িয়ে তন্নির মাথায় কয়েকটা থাপ্পড় দিল। তন্নি হতবিহ্বল হয়ে ইনানের পানে তাকিয়ে রইল। এতক্ষণ এত সিনিয়র একজনের সাথে এভাবে ফ্রীলি কথা বলছিল তাও উপদেশের স্বরে এটা ভাবতেই খানিকটা লজ্জাও লাগছে তার। তন্নি গলা খাঁকারি দিয়ে বলে উঠলো,
–“ফ্রেন্ডশিপে বয়স মানে না। যোয়ান বুড়ো সবাই একে অপরের সাথে ফ্রেন্ডশিপ করতে পারে।”
চোয়াল শক্ত করে ফেলল ইনান। গম্ভীর কণ্ঠে শুধালো, “আনফরচুনেটলি বুড়ো কি আমায় মিন করে বললে?”
তন্নি দাঁত দিয়ে জিহ্ব কেটে তৎক্ষনাৎ সহাস্যে বলে উঠলো, “আরে না না। আপনি বুড়ো হতে যাবেন কেন? আপনি দেখতে অনেক হেন্ডসাম।”
–“মাঝ রাতে তোমার বকবক শুনতে সিরিয়াসলি আর ভালো লাগছেনা। বাই।”
–“আরে না, যাবেন না প্লিজ। আগে তো ফ্রেন্ডশিপ করি।”
–“আমি আর তুমি আর ফ্রেন্ডশিপ?”
–“কে..কেন?”
–“তুমি জান আমি কে?”
–“হুম জানি। আপনি ইফান ভাইয়ার পিএ।”
–“আর তোমার ইফান ভাইয়া কে?”
–“ঐ আরকি বড়সড় ক্রি’মিনাল না মানে মাফিয়া টাফিয়া আরকি।”
–“তাহলে নিশ্চয়ই আমিও ভালো মানুষ না। আমার মতো ক্রি’মিনালের সাথে এত রাতে একা একা কথা বলতে তোমার ভয় করছেনা?”
–“এভাবে ভয় দেখাচ্ছেন কেন?”
–“ভয় দেখাইনি। জাস্ট সীমারেখা দেখিয়ে দিলাম। খারাপ মানুষের থেকে দূরত্ব বজায় রাখা বুদ্ধিমানের কাজ।”
–“এভাবে বলছেন কেন?”
–“যা সত্যি তাই বললাম। এবার কি আমি যেতে পারি?”
তন্নির মনটা ভীষণ খারাপ হয়ে গেল। চুপ করে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল। অতঃপর চুপসে যাওয়া চেহারায় বলে উঠলো, “লাইফে একজন ফ্রেন্ড থাকা অনেক ভালো। সময়ে অসময়ে মনের কথাগুলো বলা যায়। মন হালকা হয়। কষ্ট কমে। আপনিও আমাকে ফ্রেন্ড মনে করে মনের কথাগুলো শেয়ার করতে পারেন। যা আপনি কখনো কাউকে চাইলেও করতে পারেন নি। দেখবেন মনটা হালকা হবে। কষ্ট কমবে। আমি কখনো কাউকে বলবো না। সব আমাদের মধ্যেই থাকবে। এইটুকু বিশ্বাস করতে পারেন আমায়।”
ইনান সামনের সরল মেয়েটির দিকে তাকিয়ে রইল। তন্নি মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে। হাস্যোজ্জ্বল চেহারাটা অন্ধকার হয়ে আছে। ইনান দৃষ্টি সরিয়ে পুনরায় আকাশের পানে তাকালো। আজ কেন যেন বত্রিশ বছরের নিজের মধ্যে জমিয়ে রাখা কথাগুলো কাউকে বলতে ইচ্ছে হচ্ছে। ইনান ঢোক গিলল। মস্তিষ্ক না চাইলেও মন খুব জোরাজোরি করছে বলার জন্য। অবশেষে মস্তিষ্ক আর মনের বাক দ্বন্দ্বিতার মধ্যে অধর যুগল নড়তে শুরু করল….
যৌবনে ইরহাম চৌধুরীর নারী আসক্তি ছিল। একবার কোনো মেয়ের উপর নজর আঁটকে গেলে মেয়েটার সর্বনাশ করেই ছাড়ত। সারারাত ক্লাবে মেয়ে, নেশা এসব অপকর্ম নিয়ে পড়ে থাকত। তখন ইকবাল চৌধুরী রাজনীতিতে নিজের জায়গা করছে। ছোট ভাই হিসেবে ইরহাম চৌধুরী সব সময় বড় ভাইয়ের সঙ্গ দিত রাজনৈতিক কাজে। তখনকার সময় ঢাকার এমপি মানিক শাহ্’র সাথে ইকবাল চৌধুরীর সম্পর্ক ছিল সাপে নেউলে। ইকবাল চৌধুরীর অর্থের ক্ষমতা বেশি থাকলেও মানিক শাহ্’র ছিল রাজনৈতিক ক্ষমতা। ইকবাল চৌধুরী কিছুতেই মানিক শাহ্’র সাথে রাজনৈতিক খেলায় পেরে উঠছিলেন না। তাই প্ল্যান করে এমন একজনকে টার্গেট করবে যে মানিক শাহ্’র বড় বেশি আপন। যার জন্য মানিক শাহ্ সব করতে রাজি।
মানিক শাহ্’র পাঁচ ছেলে সন্তানের পর একমাত্র আদরের ছোট মেয়ে মনিরা বেগম। ইকবাল চৌধুরীর টার্গেট ছিল মনিরাকে তুলে এনে মানিক শাহ্কে ভয় দেখানো। সেই দায়িত্ব পায় ইরহাম চৌধুরী। তিনি মনিরাকে তুলে আনতে গিয়ে পছন্দ করে বসেন। সতেরো বছর বয়সী মনিরা তখন কেবল কৈশোর পেরিয়ে যৌবনের আঙিনায় দাঁড়িয়ে, সারা অঙ্গে তার রূপের স্নিগ্ধ আভা। সেই রুপে আটকে পড়ে ইরহাম চৌধুরী৷ তিনি মনিরাকে তুলে না এনে বড় ভাইয়ের কাছে আবদার করে বসে মনিরাকে বিয়ে করতে চায় বলে। ইকবাল চৌধুরী আদরের একমাত্র ছোট ভাইয়ের কোনো আবদার আজ পর্যন্ত ফেলেননি। তাই শাহ্ বাড়িতে বিয়ের প্রস্তাব পাঠানো হয়। মানিক শাহ্ প্রত্যাখ্যান করেন। ইকবাল চৌধুরী প্রথমে রিকুয়েষ্ট করে। কিন্তু এমন চরিত্রহীন ছেলের সাথে মানিক শাহ্ বিয়ে দিতে নারাজ। ইকবাল চৌধুরী তারপর হু’মকি দেয়, তাঁর ভাইয়ের হাতে মেয়ে নিজ ইচ্ছায় তুলে না দিলে তাঁরা মেয়েকে তুলে এনে বিয়ে দিবে।
মানিক শাহ্ মেয়ের সুরক্ষা দেওয়ার জন্য তখন লুকিয়ে তৎকালীন দেশের সেনাপ্রধান জেনারেল ইসমাঈল খন্দকারের সাথে বিয়ে দিয়ে দেন। ইসমাঈল খন্দকার ছিলেন মনিরার আপন মামাতো ভাই। তাই মনিরা তাঁর কাছেই সুরক্ষিত ছিল।
ইরহাম চৌধুরী যখন এই খবর জানতে পারে তখন থেকে পাগলামি শুরু করে। এক প্রকার প্রকাশ্যে ক্রা’ইম করা আরম্ভ করে। ভাইয়ের এমন বোকামি আর পাগলামি দেখে ইকবাল চৌধুরী কথা দেয় যে করে হোক ঐ মেয়েকে তুলে এনে দিবে।
এভাবেই মাসের পর মাস গড়াতে থাকে। চৌধুরীরাও আড়ালে ছক কষতে থাকে। বিয়ের তিনমাসের মধ্যেই মনিরা অন্তঃসত্ত্বা হন। এই খবর প্রথম চারমাস নিজেদের মধ্যেই সকলে চেপে যায়। কারণ চৌধুরীরা তখনও উৎপাত করছিল অনেক। তাঁরা শুধু একটা সুযোগের অপেক্ষায় ছিল। তাই এই খুশির খবরও শাহ্ বাড়ি আর খন্দকার বাড়ি থেকে বের করতে চায়নি কেউ। কিন্তু কোনো কিছুই তো আর চাপা থাকেনা। বাতাসে বাতাসে খবর ঠিক পৌঁছে যায় ইহরাম চৌধুরীর কাছে। তারপরই তাঁর মধ্যে জেগে উঠে এক হিংস্র সত্তা।
মনিরা তখন সাত মাসের অন্তঃসত্ত্বা। ইসমাঈল খন্দকার তার যৌথ বাহিনীদের নিয়ে দেশের জঙ্গি গোষ্ঠী নিবারণে মিশনে চলে যান। সেখানেই জঙ্গি গোষ্ঠীর হাতে নিহত হন। আর এই সুযোগে সারে সাত মাসের অন্তঃসত্ত্বা মনিরাকে তুলে নিয়ে যায় ইরহাম চৌধুরী।
তিনি মনিরার পেটের সাড়ে সাত মাসের বাচ্চাকে মা’রতেও চেয়েছিলেন। তখন অল্প বয়সী সদ্য স্বামী হারানো অন্তঃসত্ত্বা মনিরা হাতে পায়ে ধরে নিজের পেটের অনাগত সন্তানের জান ভিক্ষা চান। বিনিময়ে তিনি কথা দেন ইরহাম চৌধুরীকে বিয়ে করবে, সংসার করবে। ইরহাম চৌধুরী রাজি হন। মনের রানীকে পাওয়ার জন্য মনিরার পেটের সন্তানকে বাঁচিয়ে রাখে।
মানিক শাহ্ তাঁর মেয়েকে বাঁচানোর অনেক চেষ্টা করেছেন। কিন্তু বিনিময়ে তাঁকেও গু’লিবিদ্ধ হয়ে প্রাণ হারাতে হয়। বাবা আর বোনের প্রতিশোধ নিতে মনিরার ভাই যখন চৌধুরীদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নেমেছিল তখন মনিরার বড় ভাইকেও চৌধুরীদের হাতে ম’রতে হয়।
তারপর ইফান জন্ম নেওয়ার নয়দিন পর একই হাসপাতালে জন্ম হয় মনিরা আর ইসমাঈল খন্দকারের একমাত্র সন্তান ইনান খন্দকারের। সেই সন্তানকে মনিরার বুক থেকে কেঁড়ে নেওয়া হয় সেদিনই। ইরহাম চৌধুরী বাচ্চাটিকে তুলে দেয় পলক কাইসারের হাতে। ছোট থেকে পলক কাইসারের অন্ধকার দুনিয়ায় বেড়ে ওঠে সেই হতভাগা এতিম শিশু ইনান খন্দকার। ইফান পলক কাইসারের কাছে যাওয়ার পর ইফানের একমাত্র সঙ্গী হয় ইনান।
যত সময় যাচ্ছিল চৌধুরী আর শাহ্দের মধ্যে দ্বন্দ্ব আরও বেড়ে চলছিল। তারপর প্রাণ হারায় মনিরার ছোট ভাই। মনিরা মেনে নেয় তার দূর্ভাগ্যকে। ভাইদের অনুরোধ করে এবার থামতে। সে আর কোনো ভাইয়ের মৃত্যুর সংবাদ মেনে নিতে পারবে না। সকলে সাময়িক সময়ের জন্য থামলেও ভেতরে ভেতরে চলছে সেই প্রতিহিংসা। তাই তো আজ উনত্রিশ বছর পরও সেই লড়াই চলে আসছে। আজও রাজনৈতিক মাঠে চৌধুরীদের এক নাম্বার প্রতিদ্বন্দ্বী শাহ্’রা।
আর কয়েকমাস আগে সাবেক মন্ত্রী আব্দুল হোসাইনকে চৌধুরীরাই খু’ন করেছে। কারণ তিনি ছিলেন শাহ্দের ডান হাত। সে যাইহোক,
মনিরা নিজ ইচ্ছের বিরুদ্ধে আরও দুই সন্তান জন্ম দেয়। কিন্তু প্রথম সন্তানকে হারানোর সুখ কাটিয়ে উঠতে পারেনা। তাই অনেক অল্প বয়সেই মাহিন আর মীরাকে সুস্থ একটা জীবন দানের জন্য দেশের বাইরে পাঠায় তার চাচার কাছে। যাতে মানুষ হয় আর স্বাভাবিক একটা জীবন পায়। কিন্তু কে জানতো ছেলে-মেয়েরা হবে একেকজন আগুনের ফুলকির মতো!
ছোট্ট বাচ্চা দুটোকে মনিরার চাচা অতীত জানিয়ে ছোট থেকেই চৌধুরীদের প্রতি তাদের মনে ঘৃণা জাগিয়েছে। মা ছাড়া চৌধুরী বাড়ির কারো সাথে সম্পর্ক তাদের কখনোই ভালো না। এমনকি জন্মদাতাকেও দুই ভাই-বোন চরম ঘৃণা করে। তবে তা প্রকাশ করেনা বাইরে।
বড় হয়ে মাহিনই বড় ভাইকে খুঁজে মায়ের সাথে কথা বলিয়ে দেয়। তারপর তিন ভাই-বোন ইফানের শক্তি হয়। মনিরার জীবনে হাজার দুঃখ থাকলেও তার মন এইটুকু ভেবে আনন্দ পেত তাঁর তিন সন্তান একে অপরের শক্তি…..
বলতে বলতে এক দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে এই পর্যায়ে এসে থামে ইনান। পুনরায় সেই দীর্ঘশ্বাসের শব্দ অনেকটা দূর পর্যন্ত ভেসে যায়। তন্নি ভেজা চোখে অপলক তাকিয়ে থাকে পাশে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটার পানে।
*
*
*
রাত এগারোটার নাগাদ। গাজীপুরের কালিয়াকৈর এলাকা। এই এরিয়াটা বেশ নিরব। এলাকাটা খুব একটা নিরাপদ নয়। কদিন পরপর এই এলাকা সহ আশেপাশের এলাকাগুলোতে ছি’নতাই ও ডা’কাতির মতো ঘটনা ঘটে থাকে। এই নিয়ে থানায় অনেক কেইস জমা পরে আছে। সে যাইহোক। আজ অন্য কারণে এই এলাকায় আসা।
এদিকের সবটাতে কনস্ট্রাকশনের কাজ চলছে। সিআইডি সকল অফিসাররা চারদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়েছে। সামনে ইলেকশন। এইজন্য চৌধুরীদের বিরোধী দলের উপর আজ দিনের বেলা হা’মলা হয়েছিল। খবর পেয়েছি হামলাকারীদের একজন এই এরিয়াতে গা ঢাকা দিয়েছে। তাই সিআইডি টিম চারপাশ ঘিরে ফেলেছে।
আমি আর কণা রিভলবার হাতে ধীর পায়ে নিঃশব্দে সিঁড়ি বেয়ে থার্ড ফ্লোরের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি। কণা গলার স্বর নিচু করে বলে উঠলো,
–“ম্যাম আপনার আসাটা ঠিক হয়নি। আরও কিছুদিন রেস্ট নেওয়ার প্রয়োজন ছিল।”
–“আমি ঠিক আছি। এবার আরও ঠিক হয়ে যাব। সামনে নির্বাচন। খেলা জমবে। পুরো দেশের সামনে চৌধুরীদের মুখোশ খোলব।”
–“সে আর বলতে। এখনই ইকবাল চৌধুরীর উপর সাধারণ জনগণ যেভাবে খ্যাপে আছে! তার সকল অপকর্মের প্রমাণ ফাঁস হলে…”
এইটুকু বলেই কণা চাপা হাসল। এরই মধ্যে আমরা থার্ড ফ্লোরে চলে আসলাম। চারপাশে বিদঘুটে অন্ধকার। কোথায় কোন বিপদ ওতপেতে আছে জানা নেই। আমরা আরও ধীর পায়ে কোণার দিকে এগিয়ে যেতে লাগলাম। অন্ধকারে হঠাৎ কিছু একটার সাথে হোটচ খেল কণা। ফলে মৃদু আওয়াজ হলো। উপস্থিত অপরাধীরা তৎক্ষনাৎ অন্ধকারে গু’লি চালাল। আমি সতর্কতার সাথে কণাকে টেনে পিলারের আড়ালে নিয়ে গেলাম। অতঃপর অন্ধকারে নিশানা করে শুট করতেই একজন চিৎকার করে উঠল। তারপর দুপক্ষের পরপর গু’লাগু’লি শুরু হলো। সেই শব্দ শুনে সিআইডি অফিসাররা এদিকে আসতে লাগল। চারপাশে টর্চ লাইটের আলোর খেলা চলছে।
উপস্থিত অপরাধীদের মধ্যে ছোটাছুটি শুরু হয়েছে। গু’লাগু’লির মধ্যে দুজন আহত হয়ে মেঝেতে লুটিয়ে পড়েছে। আরও তিনজন একেক দিকে পালাচ্ছে। কণা আর আমি ভাগ হয়ে পিছু নিলাম। একজন থার্ড ফ্লোর থেকে যখন ফোর্থ ফ্লোরে পালাচ্ছিল তখন ছুটে আমিও পিছু নিলাম।
কয়েক সিঁড়ি পেরোলেই ফোর্থ ফ্লোর তখনই আমি লোকটাকে ধরে ফেলাম। মা’রামা’রির সময় দুজনের হাতের রিভলবার সহ আমার হাতের টর্চটিও পড়ে যায়। তারপরও আমি থেমে থাকিনি। হাতাহাতি মধ্যে হঠাৎ আমার মাথাটা কেমন যেন ঘুরে উঠলো, তক্ষুনি লোকটা আচমকা আমাকে ধাক্কা মা’রল। এদিকে কাঁচা সিঁড়ি, রেলিঙ নেই। তাই এখান থেকে পড়লে নিচ ফ্লোরে পড়ার সম্ভাবনাই একশোভাগ। তারপর বেঁচে ফিরা ভাগ্যের উপর।
আমি খেই হারিয়ে পড়ে যেতে নিলে চিৎকার করে উঠলাম। তৎক্ষনাৎ একটা হাত আমাকে ছোঁ মেরে নিজের বক্ষে এনে ফেলল। কিন্তু আমার মনে হয়েছে এটা বুক নয় বরং শক্তপোক্ত কিছু একটা।
“ঠাস, ঠাস, ঠাস..”
তৎক্ষনাৎ পরপর গু’লির শব্দে পুরো বিল্ডিং কেঁপে উঠলো। কোথা থেকে যেন জিতু ভাইয়া আর বাকি অফিসারদের চিৎকার কানে আসল। সকলেই আমার নাম ধরে ডেকে উঠেছে।
জিতু ভাইয়া সহ সকলে থার্ড ফ্লোরে উপস্থিত হলো। টর্চ লাইটের আলো পড়তেই আচমকা একজোড়া ধূসর বাদামী ক্রোধিত অক্ষিযুগলের সাথে চোখাচোখি হলো। কালো মাস্কের আড়ালে কে হতে পারে চোখ দেখেই বুঝে গেছি। তৎক্ষনাৎ ভেসে আসলো হিসহিসিয়ে বলা পুরুষালি ক্রোধিত চাপা স্বর,
–“এ জীবনে আমায় শান্তি দিবেনা না?”
–“ততুমি?”
ইফানের শক্ত চোয়াল আর শক্ত হলো। কিছু বলতে গিয়েও থমকে গেল। কিছু একটা আঁচ করে নিচে তাকাতেই দেখল সকল সিআইডি অফিসাররা রিভলবার তাঁর দিকে তাক করে আছে। জিতু ভাইয়া তৎক্ষনাৎ বলে উঠলো,
–“আজ হাতেনাতে ধরা পড়লেন মিস্টার মাফিয়া বস। প্রকাশ্যে খু’ন করার অপরাধে আপনাকে সিআইডি এরেস্ট করলো।”
ইফান ভ্রু কুঁচকালো। হালকা ঘাড় কাথ করে সিঁড়িতে তাকাল। আমিও তার দৃষ্টি অনুসরণ করতেই দেখি সেই লোকটা গু’লিবিদ্ধ হয়ে সিঁড়িতে পড়ে আছে। ইফান পুনরায় জিতু ভাইয়ার দিকে দৃষ্টি ঘুরাল। জিতু ভাইয়া বাঁকা হেসে বলল,
–“আজ আপনাকে আমাদের হাতে সারেন্ডার করতেই হবে।”
ইফান ভ্রু উঁচালো। অতঃপর জিতু ভাইয়ার চোখ থেকে দৃষ্টি সরিয়ে আরেক দিকে তাকাল। সিআইডি অফিসাররা ইফানের মধ্যে কোনো রুপ ভাবান্তর দেখতে না পেয়ে ইফানের দৃষ্টি অনুসরণ করে সেদিকে তাকাতেই চমকে উঠল। চারপাশ শতাধিক অস্ত্রধারী গার্ড ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে। সকলের ব’ন্দুকের নিশানায় সিআইডিরা।
সকল অফিসারদের চেহারা চুপসে গেল। জিতু ভাইয়া রাগে চোয়াল শক্ত করে রিভলবার নামিয়ে নিতেই বাকিরাও নামিয়ে নিল। ইফানের চোখে বাঁকা হাসির রেশ খেলে গেলো। জিতু ভাইয়া রাগে দাঁতে দাঁত পিষল। এসব দৃশ্য দেখে তপ্ত শ্বাস ছেড়ে ইফানের চোখের দিকে তাকালাম। কিছু বলতে যাব তার আগেই লোকটা আমাকে পাঁজাকোলা তুলে নিয়ে হাঁটা ধরল।
ইফান আমাকে গাড়িতে বসিয়ে ডোর বন্ধ করে দিল। যখন নিজের সিটের দিকে আসছে তখনই আমার নজর আটকায় তাঁর পায়ে। লোকটা এভাবে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটছে কেন?
ইফান ড্রাইভিং সিটে এসে বসতেই আমি উতলা হয়ে শুধালাম,
–“এই তোমার পায়ে কি হয়েছে?”
ইফান উত্তর করলো না। বরং উত্তর করার প্রয়োজন মনে করল না। আমি ওর পায়ে হাত দিয়ে দেখতে যাব তখনই আমাকে সিটে সোজা করে বসিয়ে সিট বেল্ট লাগিয়ে দিল। ইফানের আচরণ দেখে মনে হচ্ছে আমার উপর বেশ রেগে আছে। কিন্তু আমি কি করেছি? বরং রাগ করার কথা আমার। আজ প্রায় দু সপ্তাহ পর তার দেখা মিলল। কই ছিলো এতদিন, কি করছিলো আমায় কিচ্ছু জানায় নি।
ইফান আমার থেকে সরে যেতে যাবে তক্ষুনি আমি তাঁর গলা জড়িয়ে ধরে ওর মুখের মাস্ক খুলে ঠোঁটে শব্দ করে চুমু খেলাম। ইফান অদ্ভুত নজরে আমার দিকে তাকাল। আমি তার রাগের তোয়াক্কা না করে পুনরায় কয়েকটা চুমু খেলাম। অভিমানী কণ্ঠে শুধালাম,
–“কই ছিলা এতদিন?”
–“জেনে তুমি কি করবে? দিব্যি তো ভালোই ছিলে। স্বাধীনভাবে ডানা মেলে উড়ে বেড়িয়েছ।”
আমি ইফানের গলা আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বললাম,“তুমি বদলে গেছ। আমাকে আর আগের মতো ভালোবাস না।”
–“কে বললো আগেও তোমায় ভালোবাসতাম?”
ইফান নিজ সিটে বসল। আমি মুখ তুলে লোকটার রাগী চেহারার পানে খানিকটা সময় তাকিয়ে রইলাম। তারপর পুনরায় গলা জড়িয়ে ধরে বললাম, “আমি তোমায় অনেক মনে করেছিলাম। আমায় একলা রেখে চলে গেলে। ভাবলে না একবার আমার কথা। স্বার্থপর লোক।”
ইফান তাচ্ছিল্য করে স্মিথ হাসল। ড্রাইভিং করতে করতে আমাকে গম্ভীর কণ্ঠে বলে উঠলো,“সত্যিই আমি ভীষণ স্বার্থপর। আমি নিজের লাভের কথা ছাড়া কারো কথা ভাবি না। সেই জন্যই বলছি আজ থেকে বাড়ির বাইরে বের হওয়া তোমার নিষেধ। আর ঐ সা’উয়ার জবও।”
–“সব ছাড়তে পারি কিন্তু এই জব না। এটা আমার খুব সখের কাজ।”
–“আমি ম’রলে সব সখ পূরণ করো। তখন আমি আর কোনো কিছুতেই বাঁধা দিবনা।”
–“ইফান…”
ক্লান্ত স্বরে আওড়ালাম। আমার দিকে তাকানোর প্রয়োজনও মনে করল না লোকটা। আমি আবার ওর গলা জড়িয়ে ধরে বললাম,“আমার ড্রেস চেইঞ্জ করতে হবে।”
–“কেন?”
–“প্যান্ট-শার্ট পরে বাড়ি ফিরলে তো দাদি…”
বাক্য সম্পূর্ণ করতে গিয়েও থেমে গেলাম। জিহ্বা দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে বললাম,“বাড়িতে না থাকলেও নিশ্চয়ই শুনেছ তোমার দাদি নিখোঁজ।…..থেমে আবার বললাম, ঐ মহিলার জন্য আমি আমার সন্তা…”
আমাকে মাঝ পথে থামিয়ে দিয়ে বলে উঠলো,“আপাতত ঐ বাড়ি ফিরছিনা। এখানে আমার ফ্ল্যাট আছে। আজ রাত সেখানেই থাকব।”
–“তারমানে এতদিন দেশে ছিলে অথচ আমার সাথে ইচ্ছে করে যোগাযোগ রাখনি।”
–“গতকাল রাতে দেশে ফিরেছি।”
–“তুমি এমন করছ কেন? আমার দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে কষ্ট দিচ্ছ?”
–“এটা নতুন কি?”
–“ইফান…”
নতুন ফ্ল্যাটে উঠতেই ইফানকে ধরে বেডে বসালাম। জোর করে পা দেখতে চাইলাম। কিন্তু দেখাল না। বলল তেমন কিছু না, কদিন আগে সামান্য চোট পেয়েছে। একটা বুলেট পা ছুঁইয়ে বেরিয়ে গেছে।
এটা নাকি সামান্য চোট! কান্না আটকে আসছে গলায়। আগে ইফানের কোনো কিছুই গায়ে লাগত না। এখন সহ্য হয় না। তাঁর সব কষ্ট আমার শরীরে যেন লাগে।
আমি আর একটা কথাও বললাম না। মুখ ভার করে আরেক পাশে ফিরে বসে রইলাম। ইফান আমাকে একবার কাছেও টানল না। কু’ত্তা, বান্দর একটা।
–“নাও ফ্রেশ হয়ে আস।”
আড় চোখে ইফানের বাড়িয়ে দেওয়া হাতের দিকে তাকালাম। ইফান বলে উঠলো, “আপাতত আমার গেঞ্জিই পড়ে নাও। আই হোপ এটা তোমাকে ভালোভাবে কভার করে দিবে। আর কিছুক্ষণের মধ্যেই খাবার আর ড্রেস পেয়ে যাবে।”
আমি মুখ ফিরিয়ে নিলাম। ইফান দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল,
–“আচ্ছা পরো না। তোমার মধ্যে অদেখা তো আবার কিছু নেই।”
রাগে দুঃখে ঠাস করে উঠে দাঁড়ালাম। টান মেরে ওর হাতের কাপড়গুলো নিয়ে ওয়াশরুমে চলে গেলাম।
*
সময় নিয়ে শাওয়ার সেরে ওর গেঞ্জি গায়ে জড়িয়ে বেরিয়ে আসলাম। এসে দেখি উরুতে ল্যাপটপ নিয়ে বসে মনযোগ দিয়ে কাজ করছে৷ পরনের কালো পোষাক পাল্টে গায়ে সাদা একটা শার্ট জড়িয়েছে। বুকের দু’টো বোতাম খোলা। ফলে ফর্সা পেশীবহুল বুকের কিছুটা অংশ দেখা যাচ্ছে। তাতে আমার কি? আমি জোরে মুখ মুচড়ে আরেক দিকে ঘুরে দাঁড়ালাম। তখন চুলের পানি ছিটকে গিয়ে ইফানের চোখেমুখে পড়ল। আচমকা পানির ছিটাফোঁটা পড়ায় চোখ দুটো খিঁচে বন্ধ করে নিল। অতঃপর আড় চোখে আমার দিকে তাকাতেই দৃষ্টি আঁটকে গেল। তাঁর টিশার্টটি আমার হাঁটু পর্যন্ত নেমেছে। দুধের মতো ফর্সা পা জোড়ায় বিন্দু বিন্দু পানি কণা মুক্তোর মতো চকচক করছে। কোমর ছাড়ানো দীর্ঘ কালো ভেজা কেশগুলো চুইয়ে চুইয়ে পানি ঝরছে। আমি টাউয়াল দিয়ে মুছতে ব্যস্ত। ইফান ঢোক গিলল। পরপরই মাথা ঝেড়ে দৃষ্টি সংযত করল। কিবোর্ডে হাত চালাতে চালাতে বলল,
–“কাউচে তোমার ড্রেস আছে গিয়ে পরে নাও। পরে খাবারটুকুও খেয়ে নাও।”
আমি আড় চোখে ইফানকে দেখে কাউচে দৃষ্টি ঘুরালাম। অনেকগুলো শপিং ব্যাগ রাখা। টি-টেবিলে খাবার সাজানো। আমি চুলে টাউয়াল পেঁচিয়ে খেতে বসে পড়লাম। খাবারে মনযোগ রেখে গলা খাঁকারি দিয়ে বলে উঠলাম,
–“স্যার কি খাবেন নাকি আমিই সব খেয়ে ফেলবো?”
–“স্যার খাবে না। ম্যাডাম খেলেই খুশি হবে।”
আমি আড় চোখে বিছানার উপর বসে থাকা ব্যতিব্যস্ত মানুষটিকে দেখে মুখ ভেঙচি কাটলাম।
*
খাওয়াদাওয়া শেষ করে সবকিছু গুছিয়ে নিলাম। ইফান এমন ভাব করছে যেন আমার দিকে সে তাকাবেই না পণ করে রেখেছে। কিন্তু এটা আমি কিছুতেই মেনে নিতে পারছিনা। কেন তাকাবে না আমার দিকে? এতদিন পর আমার কাছে আসল অথচ একটু…
এটা আমি কিছুতেই মেনে নিব না। কি জানি আমার কি হলো! আজ স্বামীর কাছে নিজেকে সেচ্ছায় ধরা দিতে ইচ্ছে করছে। আমি কাঁধ থেকে অভার সাইজ টিশার্টটি সরিয়ে কাঁধ উন্মুক্ত করে দিলাম। ভীষণ আবেদনময়ী রুপে নিজেকে তুলে ধরলাম। কিন্তু বালডা আমার দিকে একবারো তাকাচ্ছেও না।
এবার আর সহ্য করতে না পেরে ইফানের খুব কাছে গিয়ে কোমরে এক হাত ধরে স্টাইল করে দাঁড়ালাম। ল্যাপটপে ইফানের হাত এক মূহুর্তের জন্য থমকে গেল। আড় চোখে আমার দিকে তাকিয়ে দৃষ্টি সরিয়ে নিল। গম্ভীর কণ্ঠে বলল,
–“এখানে শুয়ে পড়। সকালে বাসায় যাব।”
–“সা’উয়াডা।”
আমি দাঁতে দাঁত পিষে অশ্রাব্য গা’লি দিয়ে আচমকা ইফানের হাত থেকে ল্যাপটপ নিয়ে নিলাম। ইফান ভ্রু কুঁচকে আমার দিকে তাকিয়ে শুধালো,
–“কি সমস্যা, এমন করছ কেন?”
আমি ল্যাপটপ টেবিলে রেখে ইফানের বুকের উপর উঠে বসলাম। মনযোগ দিয়ে তার শর্টের বোতল খুলতে লাগলাম। একটা খুলে আরেকটা খুলতে যাব তক্ষুনি ইফান আমার হাত চেপে ধরল। আমি বিরক্তি নিয়ে তার দিকে তাকালাম। ইফান কেশে বলে উঠলো,
–“রাত হয়েছে অনেক ঘুমিয়ে পড়।”
নাক ছিটকে ইফানের শার্টের ভেতর হাত ঢুকিয়ে উন্মুক্ত বুকে হাত বুলাতে বুলাতে বললাম,“অনেকদিন ঘুমিয়েছি আজ ঘুমাব না।”
–“কেন?”
আমি ইফানের গলা জড়িয়ে ধরে গালে চুমু খেয়ে আহ্লাদি স্বরে বললাম,“বুঝ না কেন?”
ইফান হাত বাড়িয়ে পুনরায় ল্যাপটপে কাজ করতে করতে প্রত্যুত্তরে বলল,“তোমার শরীর ঠিক নেই। যাও ঘুমিয়ে পড়।”
আমি আরও আষ্টেপৃষ্টে তাঁর দেহের সাথে লেপ্টে গেলাম। বললাম,“আমি ঠিক আছি। আমি পুরোপুরি সুস্থ।”
–“উহু, তুমি এখনো অসুস্থ। আমার মতো বি’স্টকে সহ্য করতে পারবেনা।”
–“তুমি বেশি বুঝ! আমি বললাম তো ঠিক আছি। তোমাকে সহ্য করা অভ্যাসে আছে।”
ইফান উত্তর করলো না। আমি ওর কানে চুমু খেয়ে ফিসফিস করে আদুরে কণ্ঠে ডেকে উঠলাম,“হাবি…।”
কিবোর্ডে ইফানের হাত পুনরায় থমকে গেল। আড় চোখে আমার দিকে তাকাতেই আমি ওর ঠোঁটে শব্দ করে চুমু দিলাম। ইফান দৃষ্টি সরিয়ে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল,
–“বুলবুলি আ’ম টায়ার্ড। আজ না, অ…”
ইফানকে আর একটা ওয়ার্ড উচ্চারণ করার সুযোগ না দিয়ে রাগে দুঃখে ফুঁসতে ফুঁসতে ওর থেকে সরে গেলাম। আমাদের দু’জনের মধ্যে বিশাল গ্যাপ রেখে আমি আরেকদিকে মুখ ঘুরিয়ে শুইয়ে পড়লাম। ইফান হতাশার শ্বাস ছেড়ে লাইট অফ করে দিল।
*
সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে রাত আরও কিছুটা গভীর হলো। ইফান কাজ শেষ করে ল্যাপটপ রেখে দিল। অতঃপর শার্ট খুলে ধীরে ধীরে আমার কাছে এসে গা ঘেঁষে শুইয়ে পড়ল। আমি সরে গেলাম। ইফান আমার কোমরে হাত রাখতেই আমি ঝটকা মেরে সরিয়ে দিলাম। অতঃপর আরেকটু সরে গেলাম। ইফান আমার কোমর জড়িয়ে ধরে টান মেরে নিজের বলিষ্ঠ বিশালাকার দেহের সাথে মিশিয়ে নিল। আমি মোচড়ামুচড়ি করে নিজেকে ছাড়াতে চাইছি। ইফান দু’হাতে ঝাপটে ধরে আমার ঘাড়ে মুখ গুঁজে রইল। আমি অনেক মোচড়ামুচড়ি করেও নিজেকে ছাড়াতে না পেরে একদম চুপ হয়ে গোলম।
কিছুটা সময় সারা রুমে নৈঃশব্দ্য। অতঃপর সব নিরবতা ভঙ্গ করে রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে একদম ফিসফিস করে বললাম,
–“সকালে রেডি থেকো। তোমাকে নিয়ে কারিগরের কাছে যেতে হবে।”
আমাকে নকল করে ইফানও ফিসফিস কণ্ঠে শুধালো,“কেনো?”
–“কেন আবার কি? আমাকে তো জানতে হবে নয়া বাইকের তেল এত তাড়াতাড়ি শেষ হলো কিভাবে! নাকি ছোট ভাই আমাকে না জানিয়ে অন্য রাস্তায় ড্রাইভিং করে সব তেল খুইয়েছে।”
আমার মুখে এহেন কথা শুনে তৎক্ষনাৎ ইফান বিস্মিত কণ্ঠে “হোয়াট” আওড়ে শরীর দুলিয়ে ফিক করে হেসে উঠল।
গভীর রাত। শহরও ঝিমিয়ে পড়েছে। রুমের ভেতর নিস্তব্ধতা। শুধু সিলিং ফ্যান ঘুরার আওয়াজ চার দেয়ালে আঘাত পেয়ে গুমোট করে রেখেছে রুমের পরিবেশটা। সবে গরম পড়া শুরু হয়েছে। এই সময়কালটা বড্ড বিরক্তিকর। এই যেমন ফ্যান ছাড়লে শীত লাগে। আর না ছাড়লে গরম লাগে। সেই জন্যই সুবিধাবাদী পাবলিকগুলো কাঁথা গায়ে মুড়িয়ে ফ্যান ছেড়ে আরামসে ঘুম দেয়।
হঠাৎই রুম কাঁপিয়ে বেজে উঠে ফোন। সেই কর্কশ আওয়াজে তৎক্ষনাৎ নড়েচড়ে উঠে একই বিছানায় গায়ে গা মিশিয়ে কাঁথা দিয়ে শরীর ঢেকে গভীর ঘুমে থাকা তিন কিশোরী। একনাগাড়ে ফোন বাজার শব্দে চোখ না খুলেই হাতরে বালিশের কাছ থেকে ফোনটি তুলে নিল সোমা। কোনো মতে কল রিসিভ করে কানে ধরে কর্কশ গলায় ধমকে উঠল,
–“হেলু কোন হালারে? মাঝ রাইতে কি সা’উয়াত কোনো তাল পাও না?”
পরপরই ফোন থেকে ভেসে আসল রাম ধমক, “জাস্ট শাট আপ ইডিয়ট।”
এক ধমকেই সোমার ঘুম উবে গেল। ফোন চোখের সামনে ধরতেই আধবোজা চোখে দেখল ফোনের স্ক্রিনে অচেনা নাম্বার ভেসছে। সোমার বুঝতে এক মূহুর্ত দেরি হলো না এ কে হতে পারে। কাঁচা ঘুম ভাঙায় রাগে দুঃখে মনে মনে কয়েকটা খাপছাড়া গা’লিও দিল। অতঃপর ফোন ধরে পাশে বেঘোরে ঘুমতে থাকা জুইকে ডেকে উঠল,
–“এ ভাই তর ডিচকো জামাই কল দিছে উঠ।”
ঘুমন্ত জুইয়ের কান অব্ধি তা পৌঁছাল না। সোমার এবার রাগে দুঃখে কাঁদতে মন চাইছে। সে আচমকা জুইয়ের পাছায় একটা থাপ্পড় বসিয়ে চেঁচিয়ে উঠলো,
–“এ হা’উয়াডা। সা’উয়াদে বাতাস ঢুকতাসে না?”
পাছায় এত জোরে আঘাত পেয়ে ঘুম থেকে লাফিয়ে উঠে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল জুই। সেই সাথে পাশে ঘুমাতে থাকা মিনারও ঘুম উবে গেল। সোমা জুইয়ের দিকে ফোন বাড়িয়ে দিয়ে ফিসফিস করে বলে উঠলো,
–“তোর পাগলা প্রেমিকে কল দিসে।”
ঘুমের রেশ কাটেনি এখনো। তাই জুই ফুঁপিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলে উঠলো, “আমি প্রেম করলে তো প্রেমিক আইব। এ্যাঁ এ্যাঁ…”
–“আরে ভাই লাইনে আছে ধর প্লিজ।”
সোমা জোর করে ফোন জুইয়ের হাতে ধরিয়ে দিল। এখন হুঁশ ফিরল মেয়েটার। ফোনের দিকে তাকাতেই দেখল অচেনা নাম্বার। জুই রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে সোমার দিকে তাকাল। সোমা মাথা নাড়াল। জুই যা বুঝার বুঝে গেছে। রাগে দুঃখে নিজের মাথাট চুল ছিঁড়তে ইচ্ছে হচ্ছে তার।
গত এক সপ্তাহ ধরে মাঝরাতে ভুলভাল নাম্বারে কল আসে। প্রথম দুদিন বিরক্ত হয়ে পরদিন ফোন অফ করে ঘুমিয়েছিল অপরাধে বাসার মালিক এসে দরজা থাপ্পড়ে তাদের ঘুম থেকে তুলে ফোন ধরিয়ে দিয়ে চলে যায়। মানে রীতিমতো তাদের উপর অ’ত্যাচার হচ্ছে। আজ এর একটা বিহিত করবে সে। জুই ফোন শক্ত করে চেপে কানের কাছে ধরল। রাগী কণ্ঠে বলে উঠলো,
–“আপনার সমস্যা কি? মাঝ রাতে আমাকে এভাবে বিরক্ত করেন কেন? কি চাই আপনার বলুন তো?”
–“তোমাকে।”
ফোনের অপর প্রান্ত থেকে শান্ত কন্ঠে মাহিন জবাব দিল। দ্বিগুণ রাগে চিড়বিড়িয়ে উঠলো জুইয়ের মস্তিষ্ক। দাঁত কটমট করে বলে উঠলো, –“ভালো হচ্ছেনা কিন্তু। এবার কিন্তু আমি আপনার নামে ভাইয়ার কাছে কমপ্লেইন করব।”
–“হুম কর।”
–“আরে আপনার ভয় করছে না? আপনি জানেন না ভাইয়া জানতে পারলে আপনাকে জেলে ঢুকাবে!”
–“গ্যাংস্টার মাহিন চৌধুরীকে জেলে রাখার মতো জেল বাংলাদেশে এখনো একটাও তৈরি হয়নি।”
জুই রাগে নাকের পাঠা ফুলিয়ে বলল,“ভালো হচ্ছে না কিন্তু। আমি কিন্তু আপনার নামে আপু আর ইফান ভাইয়ার কাছেও নালিশ করব। তখন আপনার রাত বিরেতে মেয়েদের সাথে ভন্ডামি বের করবে বলে দিলাম হুম।”
–“আচ্ছা দেখা যাবে। এখন বেলকনিতে আস।”
জুই মুখ বাকিয়ে বলল,“এ্যাঁ বেলকনিতে আস! বললেই আমি চলে যাব?”
–“না হলে আমি আসব।”
–“আপনি আসবেন মানে? কই আসবেন আপনি?”
–“তোমার কাছে।”
বিস্ময়ে জুইয়ের চোখ দুটো বড় হয়ে গেল। জুই সোমা আর মিনার পানে তাকিয়ে দেখল দুটো ঝিমচ্ছে। আবার দু’হাতে চোখের পাতা খুলে ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে আছে তার দিকে। জুই জেদি গলায় বলল,“আমি পারব না। আমি এখন ঘুমাব।”
–“আমি তোমাকে আসতে বলেছি?”
–“আমি এত রাতে বেলকনিতে যাব কোন দুঃখে শুনি?”
–“তোমাকে দেখতে ইচ্ছে হয়েছে তাই।”
জুই মুখ ভেঙচি দিয়ে বলে উঠলো, “তোমাকে দেখতে ইচ্ছে হয়েছে! আমাকে দেখে আপনি কি করবেন?”
–“বউ বানাব।”
–“হ্যা বললেই আমাকে আমার বাপ মা আপনার হাতে তুলে দিবে!”
–“আমিই তুলে আনতে জানি। বেলকনিতে আস। আমি নিচে দাঁড়িয়ে।”
–“কিহ্! আপনি এত রাতে আমার বাসার নিচে দাঁড়িয়ে!”
জুই এবার লাফিয়ে বিছানা থেকে নেমে বেলকনিতে এসে দাঁড়াল। নিচে চোখ রাখতেই লক্ষ করল একজন হুডি পরা লোক বাইকের সাথে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে। ঠোঁটের ফাঁকে সিগারেট ধরা। জুই আর মাহিনের চোখাচোখি হলো। জুই ভয়ে ঢোক গিলে বিড়বিড়ালো,“নিশ্চয়ই এই লোক সাইকোটাইকো।”
জুই কেশে বলে উঠলো, “আপনার মাথা ঠিক আছে? মধ্যে রাতে কেউ অন্যের বাসার সামনে রাস্তায় এভাবে দাঁড়িয়ে থাকে?”
মাহিন কোনো প্রকার উত্তর দিলনা। এক ধ্যানে বেলকনিতে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটাকে দেখতে লাগলো। স্ট্রিট লাইটের আলোয় আবছা সেই কিশোরীর চেহারা। বাতাসে খোলা চুলগুলো উড়ছে। জুই একা একাই কিছুক্ষণ বকবক করল। এত বকাঝকার পরও যখন দেখল মাহিন উত্তর করছে না, তখন মেয়েটা মাহিনের দৃষ্টি অনুযায়ী লক্ষ করে নিজের দিকে তাকাল। হঠাৎ জুইয়ের চোখ দু’টো কপালে উঠে গেল বুকে ওড়না জড়ানো না দেখে। মেয়েটা এক দৌড়ে রুমে ঢুকে পড়ল। মাহিনের ঘোর কাটে। সংবিত্তি ফিরে পেতেই চোয়াল শক্ত হয়ে আসে। ফোনের অপর পাশের জুইকে শুধালো,
–“চলে গেলে কেন?”
জুই বুকে ওড়না জড়াতে জড়াতে বিড়বিড় করে মাহিনকে কয়েকটা গা’লি দিল। অতঃপর পুনরায় বেলকনিতে এসে দাঁড়িয়ে বলে উঠলো,
–“এখানে এসেছেন কেন?”
–“তোমাকে দেখতে?”
জুই ভেঙচি দিয়ে চোখ উল্টে বলল,“আমি কি বোকা নাকি হুম! মাঝরাতে উত্তরা থেকে এখানে এসেছেন আমাকে দেখতে খালি বললেই হলো! কেন এসেছেন সত্যি কথা বলুন?”
মাহিন চুলে ব্যাক ব্রাশ করতে করতে বললো,“একটা কাজ ছিল। তারপর ভাবলাম তোমাকে একবার দেখে যাই।”
কৌতুহল বসত জুই শুধালো,“এত রাতে কি এমন কাজ ছিল?”
এতক্ষণে মাহিনের ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি উদয় হলো। সে জিহ্বার ডগা দিয়ে গাল ঠেলে বলল,“খুব দরকারি কাজ। কদিন ধরে ভাবছিলাম করবো। আজ আর না করে থাকতে পারিনি।”
–“তাই এত রাতে? কি এমন কাজ?”
–“শুনলে ভয় পাবে।”
এবার জুই কিছুটা ভাবসাব নিয়ে বলল,“আমি এসপি আরমান শেখ জিতুর বোন। আমি অনেক সাহসী। আমি ভয়টয় পাইনা।”
–“আচ্ছা তাই?”
–“হুম। আপনি বলুন শুনি।”
–“একটা বা’স্টার্ডকে এই মাত্র নিজ হাতে খু’ন করে এসেছি।”
মাহিনের সহাস্যে বলা বাক্যটা জুইয়ের কর্ণপাত হতেই মেয়েটা চমকে উঠল। হাত থেকে ফোনটি পড়ে যেতে নিলে কোনোমতে ধরে নিল। জুই ভয়ে ঢোক গিলল। তার বুকের ভেতর কেমন যেন করছে। জুই আমতা আমতা করে বলল,“দে..দেখুন মজা করবেন না বলে দিলাম।”
–“মজা করতে যাব কেন?”
–“কা..কাকে খু..খু”ন করেছেন আপনি?”
মাহিন দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে জিজ্ঞেস করল,“তোমার কলেজের ঐ ছেলেটা কি যেন নাম! ও হ্যা তামিম…”
–“তামিম! আপনি কি আমাদের কলেজের ক্যাপ্টেন তামিম ভাইয়ার কথা বলছেন? আপনি কি করে উনাকে চিনলেন?
–“যবে থেকে তোমার পিছু পিছু ঘরতে শুরু করলো।”
এক মূহুর্তের জন্য জুই ভাবনায় পড়ে গেল। গত দুই মাস ধরে তামিম ছেলেটা জুইকে অনুসরণ করতো। আজ তো জুইকে প্রপোজই করে বসেছিল। কিন্তু এই বিষয়টা এই লোক জানলো কি করে? জুইয়ের মনে প্রশ্নটি উঁকি দিতেই ভাবনা থেকে বেরিয়ে আসল। জুই সন্ধিহান কন্ঠে শুধালো,
–“এএটা আপনি কি করে জানলেন?”
উত্তর করলো না মাহিন। জুই পুনরায় শুধালো,“কি হলো বলছেন না কেন?”
–“মে’রে দিয়েছি।”
জুইয়ের পায়ের তলার মাটি যেন কেঁপে উঠলো। এই লোক কি বলছে! মে’রে দিয়েছে মানে কি! জুইয়ের চোখেমুখে আতংকের ছাপ ভেসে উঠল। হাত-পা কেমন যেন থরথর করে কাঁপছে। জুইয়ের গলা দিয়ে কথা বের হচ্ছে না। তবুও শুকনো ঢোক গিলে আমতা আমতা করে বলে উঠলো,
–“কি..কি বলছেন? মে..মে’রেছেন মানে!”
–“হুম, উপরওয়ালার কাছে পাঠিয়ে দিয়েছি। আর ট্রলারেট করতে পারছিলাম না। এই সাত মাসে যারা তোমার দিকে চোখ তুলে তাকিয়েছে তাদের সব কটাকে সরিয়ে দিয়েছি, সেইখানে তো এই বা’স্টার্ড তোমার হাত ধরার সাহস দেখিয়েছে!”
–“কি সব বলছেন? সাত মাস, সরিয়ে দিয়েছেন?”
–“হুম সরিয়ে দিয়েছি। আর আর একটাকে বাঁচিয়ে রেখেছি। জানিনা কখন কি করে বসি। দূরে থাকবে ওর থেকে। আমি ওকে জাস্ট নিতে পারিনা। দেখলেই মস্তিষ্ক বিগড়ে যায়।”
–“কি বলছেন কার কথা বলেন? সত্যি বলছি আমার মাথায় কিছু ঢুকছে না….জুই থেমে বিড়বিড়িয়ে বলে উঠলো, হায় খোদা আবির ভাই ঠিকই বলেছিল মাফিয়ারা সব পারে…”
জুইয়ের বিড়বিড়িয়ে বলা কথাগুলোও মাহিনের কানে পৌঁছে যায়। মূহুর্তে ক্রোধে চেহারার রং পাল্টে গেল। মাহিন চাপা হুমকির স্বরে বলে উঠলো,
–“আমি কি বললাম তোমার কানে যায়নি? ঐ বা’স্টার্ডটার নাম নিবে না। দূরে থাকবে ওর থেকে। নাহলে ওকেও…”
–“এএসব কি বলছেন? আমি কেন আপনার কথায় চলব?”
–“কজ ইয়্যু আর মাই ওয়ান অফ দ্য ফা”কিং ইনোসেনশিয়া। মাই ওন ইনোগার্ল। লিসেন কেয়ারফুলি, আই ডোন্ট লাইক সিইং ইউ হ্যাং আউট উইথ এনিওয়ান এলস। সো ইউ উইল ডু হোয়াটএভার আই সে। ডু ইউ আন্ডারস্ট্যান্ড?”
মাহিনের এই অচেনা রুপ দেখে ভয়ে কপাল বেয়ে ঘাম ছুটছে জুইয়ের। এত সাং’ঘাতিক এক মানুষের সামনে দাঁড়িয়ে সে যে এতক্ষণ কথা বলছিল ভাবতেই গায়ে কাটা দিয়ে উঠছে। জুইয়ের ভয়ার্ত চেহারা দৃষ্টি এড়ালো না মাহিনের। সে স্বাভাবিক হয়ে নরম কন্ঠে বলে উঠলো,
–“ইনোগার্ল।”
–“হু..”
–“ডোন্ট বি অ্যাফ্রেইড।”
জুই ভয়ে জড়সড় হয়ে ঢোক গিলল। মাহিন একই স্বরে বলল,“ওয়েট ফর মি আফটার কলেজ টুমরো।”
–“কে..কেন?”
–“বিকজ আই সেড সো।”
জুই কিছু বলার আর সাহস পেল না। মাহিন ভয়ে জড়সড় হয়ে থাকা মেয়েটাকে এক পলক পরখ করে বলল,“যাও গিয়ে ঘুমিয়ে পড়। ওহ্, কিপ ইন মাইন্ড হোয়াট আই সেড, অলরাইট?”
জুই মাথা নাড়িয়ে হ্যা বলল। মাহিন ঠোঁট কামড়ে হাসি আঁটকে হাস্কি স্বরে বলে উঠলো, “গুড নাইট।”
জুই আর এক মূহুর্ত দাঁড়ালো না। এক দৌড়ে বিছায় উঠে দুই বান্ধবীর মাঝখানে কাঁথা টেনে নাকমুখ ঢেকে শুয়ে পড়ল। সোমা আর মিনা একত্রে শুধালো,“কি বলেছে রে আজ?”
ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে জুই বলল,“এ আমি কই ফেঁসে গেলাম? কেমনে গেলাম? আমি কিছু করিনি। এবার আমাকে এই সাং’ঘাতিক সা’ইকো লোকের থেকে কে বাঁচাবে?”
চলবে,,,,,
সাড়ে পাঁচ হাজার প্লাস শব্দের পর্ব দিয়েছি। প্রায় তিন পর্বের সমান। ইদানীং সব পর্বগুলোই এত্তো বড় করে দিচ্ছি 😐
পিলিজ সবাই রিয়েক্ট আর বেশি বেশি করে কমেন্ট করবেন। হ্যাপি রিডিং 🥹🫶
Share On:
TAGS: জান্নাত মুন, জাহানারা
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
জাহানারা পর্ব ৮
-
জাহানারা পর্ব ২৫+২৬
-
জাহানারা পর্ব ৩৩+৩৪
-
জাহানারা পর্ব ১০
-
জাহানারা পর্ব ৩৭+৩৮
-
জাহানারা পর্ব ৫৭+৫৮
-
জাহানারা পর্ব ৩
-
জাহানারা পর্ব ২৩+২৪
-
জাহানারা পর্ব ৪
-
জাহানারা পর্ব ২