জাহানারা
জান্নাত_মুন
পর্ব :৭৭
🚫ক’পি করা নিষিদ্ধ
🔞 সতর্কবার্তা:
এই গল্পে অ’কথ্য ভাষা এবং স”হিং’সতার উপাদান রয়েছে। ১৮ বছরের কম বয়সী বা সং’বে’দনশীল পাঠকদের জন্য উপযুক্ত নয়। পাঠক নিজ দায়িত্বে পড়বেন।
ড্রয়িংরুমে পাশাপাশি সোফায় বসে আছে ইতি আর নোহা। কাঁদতে কাঁদতে দু’জনের চোখমুখের বেহাল দশা। আপাতত কেউ কারো সাথে কথা বলছে না। নিজেদের মতো চুপচাপ বসে নিরবতা পালন করছে। হঠাৎ সদর দরজায় কড়া নাড়ার শব্দে দুজনের ধ্যান ভাঙল। তারা আড়চোখে একে অপরের দিকে তাকাল, তারপর একবার পুরো ড্রয়িংরুমটা দেখে নিল। আশেপাশে কেউ নেই, তার মানে তাদের দুজনের মধ্যেই কাউকে উঠতে হবে। ইতি যেন আজ বড্ড ক্লান্ত; সে দরজা খুলতে অনীহা জানিয়ে চোখ বুজে সোফায় কুঁকড়ে শুয়ে পড়ল। নোহা দুর্বল ইতিকে কিছু বললনা। যতই হোক সে সিনিয়র। সে নিজে উঠে গিয়ে দরজা খুলে দিল।
দরজা খুলতেই সামনে জিতু ভাইয়াকে দেখে নোহার ম্লান চেহারায় এক চিলতে হাসির রেখা ফুটে উঠল। সে কোনো কিছু না ভেবে চট করে জিতু ভাইয়াকে জড়িয়ে ধরল। আকষ্মিক ঘটনায় জিতু ভাইয়া কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে পড়ল। আসলে তিনি তখন নিজের পাঞ্জাবির হাতা গুটিয়ে নিতে ব্যস্ত ছিলেন, তাই সামনে কে দাঁড়িয়ে আছে তা খেয়ালই করেননি। সম্বিৎ ফিরতেই তিনি আলতো করে নোহাকে বুক থেকে সরিয়ে দিল। নোহা এতে কিছু মনে করল না। বরং গাল ফুলিয়ে বলে উঠলো,
–“তুমি কখন এলে? আমি তো তোমাকে সকালের পর আর দেখতেই পাইনি।”
জিতু ভাইয়া এক পলক তাকালো নোহার দিকে। পরক্ষণেই দৃষ্টি সরিয়ে নিল৷ আজ নোহার পরনে ইতির মতো একটা গাউন, ওড়নাটা পরিপাটি করে বুকে জড়ানো। এর আগেও একবার তাকে এমন পোশাকে দেখেছিলেন তিনি। সাধারণত মেয়েটিকে সবসময় ওয়েস্টার্ন পোশাকেই দেখা যায়। সে যাইহোক! নোহার কোনোকিছু জিতু ভাইয়াকে এক বিন্দুও ভাবালো না। বরং তিনি এগিয়ে যেতে যেতে নিচু কণ্ঠে উত্তর করলেন,
–“জানাজা পড়তে এসেছিলাম। তাই ভাবলাম সকলের কি অবস্থা একবার দেখে যাই।”
ভেতরে কয়েক পা এগিয়ে আসতেই আচানক নজর আটকায় সোফায় ইতিকে শুয়ে থাকতে দেখে। ইতির মাথায় একটা বড়সড় হিজাব। তাই কাচুমাচু হয়ে শুয়ে সেই হিজাব টেনে সারা দেহ ঢেকে ফেলেছে। জিতু ভাইয়ার চোখে পিচ্চি ইতিকে আরও পিচ্চি একদম কবুতরের বাচ্চার মতো দেখতে লাগছে।
জিতু ভাইয়া নির্লিপ্তভাবে দৃষ্টি সরিয়ে সামনের সোফায় গিয়ে বসলো। ওদিকে ইতি আধবোজা চোখে সামনের অস্পষ্ট অবয়বটা দেখে চমকে উঠল। ধড়ফড় করে চোখ মেলে জিতু ভাইয়াকে সামনে বসে থাকতে দেখে সে এতটাই অপ্রস্তুত হয়ে পড়ল যে, তাড়াহুড়ো করে উঠতে গিয়ে হিজাবে পা আটকে সোফা থেকে মেঝেতে পড়ে গেল। নোহা আতঙ্কে চিৎকার করে দৌড়ে আসতে লাগলো,
–“লিটিল গার্ল…”
নোহার চিৎকারে জিতু হকচকিয়ে সামনে তাকিয়ে দেখেন, ইতি মেঝেতে মুখ থুবড়ে পড়ে আছে। তিনি তৎক্ষণাৎ উঠে গিয়ে ইতিকে ধরে সোফায় বসিয়ে উদবিগ্ন কণ্ঠে শুধালো,
–“এই তুমি ঠিক আছ? লাগেনি তো?”
ইতির বেশ ভালোই চোট লেগেছে, কিন্তু সামনে জিতু ভাইয়াকে দেখে সে যন্ত্রণার চেয়ে লজ্জাতেই বেশি কুঁকড়ে যাচ্ছে। নোহা তড়িঘড়ি করে ইতির হাত-পা চেক করতে করতে অস্থির হয়ে উঠল,
–“ইশশ, ব্যথা লেগেছে বেবিগার্ল? কোথায় পেইন হচ্ছে দেখি?”
ইতি আড়চোখে একবার জিতু ভাইয়ার দিকে তাকাতেই দুজনের চোখাচোখি হয়ে গেল। সে দ্রুত দৃষ্টি সরিয়ে নিয়ে ধরা গলায় নিচু স্বরে বলল,
–“ব্যথা লাগেনি তো।”
জিতু ভাইয়া এক দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে ধীর পায়ে ইতির পাশে এসে বসল। সত্যি বলতে, ইতির প্রতি এক অদ্ভুত টান তিনি শুরু থেকেই অনুভব করেন। যতবারই এই মেয়েটির থেকে দূরত্ব বজায় রাখতে চান, ততবারই তার ওই মায়াবী সরল মুখশ্রীর কাছে হেরে যায়; কিছুতেই যেন নিজেকে সরিয়ে নিতে পারে না।
জিতু ভাইয়া যেই ইতির পায়ের দিকে হাত বাড়াল, মেয়েটি অমনি আঁতকে উঠে পা সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করল। কিন্তু জিতু ভাইয়া বেশ শক্ত করেই তার পা চেপে ধরলেন। তার চোখেমুখে কিছুটা শাসন মিশ্রিত রাগী ভাব দেখে ইতি ভয়ে নুইয়ে পড়ল, দৃষ্টি সরিয়ে নিল ঝটপট। জিতু ভাইয়া আলতো করে ইতির পায়ের কাপড়ের ভাঁজ তুলতেই দেখলেন, চামড়াটা লালচে হয়ে আছে। গতকাল গরম পানি পড়ে পা’টা পুড়ে গিয়েছিল, যা এখনো পুরোপুরি সারেনি; তার ওপর আজ আবার নতুন করে চোট পেল। জিতু ভাইয়া কিছু বলার আগেই নোহা উদ্বীগ্ন হয়ে বলে উঠলো,
–“ও গড! লিটিলগার্ল তুমি তো ওষুধই খাওনি। খুব পেইন হচ্ছে? হোয়াটএভার! আমি এক্ষুনি গিয়ে তোমার মেডিসিনগুলো নিয়ে আসছি।”
নোহা ছুটে চলে গেল। জিতু ভাইয়া ভ্রু কুঁচকে গম্ভীর স্বরে শুধালেন,“ঔষধ খাওনি?”
ইতি নিঃশব্দে মাথা নেড়ে না জানাল। জিতু ভাইয়া ওর দ’গ্ধ ক্ষ’তের ওপর আলতো করে হাত রেখে পুনরায় জিজ্ঞেস করলেন, “জ্বালা করছে খুব?”
ইতি পুনরায় মাথা নাড়িয়ে না জানাল। পরক্ষণেই বাচ্চাদের মতো ঠোঁট ভেঙে দিল। ঠোঁট টিপে কান্না আটকানোর চেষ্টা করতে লাগল। জিতু ভাইয়া ইতির চেহারায় ভালো করে দৃষ্টি বুলিয়ে নিল। ভালোই বুঝতে পারছে কি পরিমাণ কান্নাকাটি করেছে। কান্নাকাটি করাই স্বাভাবিক। জিতু ভাইয়া মেয়েটার ছোট্ট হাতটায় আলতো ছুঁয়ে ভরসা দিল। বলল,
–“সব ঠিক হয়ে যাবে।”
–“আমার কাকিয়াকে মে’রে ফেলেছে..”
বলেই ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে ফুঁপিয়ে উঠল ইতি। জিতু ভাইয়া একবার চারপাশটা দেখে নিলেন; ড্রয়িংরুমে ওরা দুজন ছাড়া আর কেউ নেই। তিনি নিজের বৃদ্ধাঙ্গুলি দিয়ে ইতির গাল বেয়ে পড়া অশ্রু মুছে দিয়ে বললেন,
–“আর কাঁদে না। এবার কিন্তু শরীর খারাপ করবে।”
জিতু ভাইয়ার কথায় মেয়েটা কান্না থামালেও কেমন যেন গুটিয়ে গেছে। জিতু ভাইয়া ইতির হাতের উপর হাত রেখে শুধালো,
–“কি হয়েছে?”
–“আ…আমার খুব ভয় করছে।”
জিতু ভাইয়ার ভ্রু কুঁচকে এলো। তিনি শুধালেন,“ভয়! কেন ভয় করছে তোমার?”
–“আমাদের বাড়িতে এসে কাকিয়াকে মে’রে দিয়েছে। যদি আমাকেও…”
ইতি মুখের কথা সম্পূর্ণ করতে পারল না। তার আগেই জিতু ভাইয়া ইতির মুখে হাত ধরে কথা থামিয়ে দেয়। অতঃপর আদুরে কণ্ঠে বলে উঠলো,
–“আমি আছিতো, কিচ্ছু হবে না তোমার। একদম ভয় পাবেনা, কেমন?”
ইতি বাধ্য মেয়ের মতো মাথা নাড়ায়। অতঃপর কোনো পুর্ববাস না দিয়ে জিতু ভাইয়ার বাহু জড়িয়ে ধরে কাঁদু কাঁদু কন্ঠে বলে উঠে,
–“আমি আপনার সাথে থাকবো। আমাকে আপনার সাথে রাখবেন? আমার এই বাড়িতে আর ভালো লাগছে না। ভয় করছে।”
জিতু ভাইয়া নিজের বাহু জড়িয়ে ধরে রাখা মেয়েটার পানে দৃষ্টি রেখে বলে উঠলো,“আচ্ছা, খুব তাড়াতাড়ি তোমাকে আমার কাছে নিয়ে যাব।”
–“নোহা!”
আমার ডাকে নোহা নড়েচড়ে উঠলো। আমি জিজ্ঞেস করলাম,“কি হয়েছে? এখানে দাঁড়িয়ে…”
বলতে বলতেই নজর আটকালো সোফার দিকে। জিতু ভাইয়াকে দেখে নোহার সাথে কথা না বাড়িয়ে এগিয়ে গেলাম।
–“ভাইয়া কখন এলে?”
–“এই তো। আম্মুরা কোথায়? যাবে না?”
–“ভেতরে আছে। আজকে থাকুকনা এই বাড়িতে।”
জিতু ভাইয়া উঠে দাঁড়িয়ে বলল,“আমি কি বলব! তাঁরা যা ভালো বুঝে তা করুক। আমি তাহলে আসি।”
–“আসছ মানে? তুমিও… “
আমাকে কথার মাঝ পথে থামিয়ে বলল,“আমার কাজ আছে এক্ষুনি যেতে হবে।”
জিতু ভাইয়া এক পলক ইতির দিকে দৃষ্টি বুলিয়ে আমাকে বলে উঠলো,“আসছি আমি।”
–“একটু বসে…”
আমি বলতে গিয়েও থেমে গেলাম। জিতু ভাইয়া বেরিয়ে গেল। নোহা এগিয়ে এসে ইতিকে মেডিসিন খাইয়ে দিল।
বারবার অনুরোধ করা সত্ত্বেও শেখ বাড়ির কেউ আর থাকতে চাইল না; কিছুক্ষণ আগেই তারা বিদায় নিয়েছে। তবে আমার বান্ধবীদের জোর করে রেখে দিয়েছি, আজ রাতটা ওরা চৌধুরী বাড়িতেই কাটাবে। এখন ডাইনিং টেবিলে সবাই খেতে বসেছে। আজ সারাদিন কারও পেটেই দানাপানি পড়েনি। আমি ইফানের জন্য প্লেটে খাবার বেড়ে নিতে নিতে পলিকে বললাম,
–“ইমরানের খাবারটাও রুমে দিয়ে আস।”
পলি বলল,“তন্নি আপুদের খাওয়া দাওয়া শেষ হোক। তারপর.. “
পলিকে থামিয়ে খাদিজা বেগম বললেন,“তুই গিয়ে জামাই বাবাকে খাবার দিয়ে আয়। এখানে আমি আছি।”
খেতে খেতে সুমাইয়া বলল,“আন্টি ঠিক বলেছেন। তুমি যাও। আমাদের সমস্যা হবেনা।”
পলি আর কিছু বললনা। খাদিজা বেগম ইমরানের খাবার বেড়ে দিতেই সেগুলো নিয়ে পলি চলে গেল। আমি জুইকে বললাম,
–“বনু খাবারের ট্রেটা নিয়ে আমার সাথে রুমে আয় তো। আমার শরীর দুর্বল এত ভারি রুম অব্ধি নিয়ে যেতে পারবনা।”
*
রুমে ঢুকে দেখি ইফান বিছানায় উপুড় হয়ে শুয়ে আছে। পরনে কালো ট্রাউজার আর স্যান্ডো গেঞ্জি। জুই টেবিলের ওপর খাবারের ট্রে-টা নামিয়ে রেখে নিচু স্বরে শুধাল,
–“আরও কিছু লাগবে?”
–“না।”
–“তাহলে আমি আসি?”
–“হুম।”
জুই বেরিয়ে যেতেই আমি ধীরপায়ে গিয়ে ঘরের দরজাটা আটকে দিলাম। তারপর বিছানায় ইফানের পাশে বসে ওর বাহুতে হাত রাখলাম। ও কি সত্যিই ঘুমিয়ে পড়েছে নাকি জেগে আছে, ঠিক বুঝতে পারছি না। আমি আলতো করে ওকে ডাকলাম,
–“এই শুনছ?”
–“হুম বল।”
তৎক্ষনাৎ ইফানের প্রত্যুত্তর ভেসে আসল। আমি ইফানের দিকে একটু ঝুঁকে বাহুতে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বললাম,
–“সারাদিন কিছু খাওনি তো। আমি খাবার এনেছি খেয়ে নাও।”
–“পরে।”
–“পরে কখন? একটু পরেই তো সন্ধ্যা হয়ে যাবে। তারপর রাতের খাবার খাবে নাকি!”
–“মাথায় যন্ত্রণা করছে।”
আমি বিছানায় উঠে বসলাম। বুকের ওড়নাটা সরিয়ে পাশে রেখে দিলাম। মাথাটা ভার হয়ে আসছিল বলে শক্ত করে খোঁপা করা চুলগুলোও আলগা করে ছেড়ে দিলাম। অতঃপর ইফানের ঘন কালো চুলের ভাঁজে আঙুল চালিয়ে বিলি কেটে দিতে দিতে বললাম,
–“সারাদিন কিছু খাওনি তো তাই এখন একটু খেয়ে মেডিসিন খাও, দেখবে কমে যাবে।”
আচমকা ইফান আমার কোলে মাথা রেখে উদরে মুখ ডুবিয়ে শুয়ে পড়ল। অতঃপর হাস্কি স্বরে হিসহিসিয়ে বলল,“উহু কিছুতেই কমবেনা। চল আমরা এখন থেকে দূরে চলে যাই।”
হঠাৎ ইফানের এহেন কথায় চুপ হয়ে গেলাম। অতঃপর শুধালাম, “দূরে চলে যাবে মানে?”
–“আমি এসবে অভ্যস্ত নই জারা। জাস্ট তোমার জন্য একটা বছর বিডিতে বিশেষ করে এই বাড়িতে নিজেকে এডজাস্ট করেছি। আমার কাছে ফ্যামেলি মানেই ফা”কিং প্যারা। এত মানুষ আমি জাস্ট নিতে পারিনা।”
আমি ইফানের দিকে তাকিয়ে রইলাম। কি বলব আসলে বুঝতে পারছিনা। ইফান আমার কোমর আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরে সেখানেই মুখ গুঁজে রইল। তাঁর তপ্তশ্বাস আমার উদরে আঁচড়ে পড়ছে তা অনুভব করতে পারছি। ইফান কয়েক মূহুর্ত চুপ থেকে পুনরায় বলে উঠলো,
–“আমি খুব খারাপ মানুষ। এ জীবনে কত শত খু’ন করেছি তার হিসাব নেই! একের পর এক লা’শ গুম করেছি। বাট কখনো কোনো লা’শ ভারি ফিল হয়নি। কিন্তু আজ…এই প্রথমবার কোনো লা’শকে এত ভারী মনে হয়েছে।”
ইফান শেষ কথাগুলো একদম নিচু স্বরে বিড়বিড়িয়ে বলে চুপ হয়ে গেল। আমি এক দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললাম,
–“এমনই হয়। আপন কারো লা’শ বহন করা এত সহজ নয়। সেটার ওজন বড্ড ভারিই লাগে।”
আমি আরও কিছু বলতে যাব তবে পারলাম না। হঠাৎ ইফান নিজের ওষ্ঠজোড়া আমার উদরে ছুঁইয়ে দিল। ইফানের মাথায় বিলি কাটতে থাকা আমার হাতটাও এক মূহুর্তের জন্য থমকে গেল। ইফান পুনরায় হাস্কিস্বরে হিসহিসিয়ে বলে উঠলো,
–“আমি এতো মানুষের মধ্যে কম্ফোর্ট ফিল করিনা জান। ভীষণ ইরিটেশন হয়। ইউ আন্ডারস্ট্যান্ড, হোয়াট আইম ট্রাইং টু সে? সিরিয়াসলি, সবার সাথে থাকা আমার পক্ষে ইম্পসিবল। আমি অ্যাজ সুন অ্যাজ প্যারিস ব্যাক করবো। চলনা আমার সাথে।”
আমার মুখটা মলিন হয়ে এলো। গলার স্বর খাদে নামিয়ে বললাম,
–“কিন্তু আমার যে পরিবারের সবার সাথে থাকতে ভালো লাগে।”
–“আর আমাকে?”
হঠাৎ এমন একটা প্রশ্নে আমি অপ্রস্তুত হয়ে পড়লাম। কি উত্তর করব এখন বুঝতে পারছিনা। আমার উত্তর না পেয়ে ইফান বলে উঠলো,
–“ঘৃণা কর আমায় তাইনা?”
–“হঠাৎ এসব কথা..”
আমি বাক্যটি সম্পূর্ণ করতে পারলাম না। তার আগেই ইফানের কণ্ঠস্বর কানে আসে,
–“ঠিক কবে তুমি আমার হবে বল তো? নিশ্চয়ই এ জীবনে তোমাকে পাবনা! পর জনমে কি আমার হবে?”
–“এসব কি…”
–“তার মানে পর জনমেও তুমি আমার হবে না!”
এবার আমি তপ্তশ্বাস ছেড়ে বললাম,“পর জনম বলতে কিছু হয়না ইফান। পরকাল আছে। হাদিসে আছে, মানুষ পরকালে তারই সাথী হবে, যাকে সে দুনিয়াতে ভালোবাসে। অর্থাৎ, আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য কেউ যদি কাউকে ভালোবাসে, তবে জান্নাতে তারা একসাথেই থাকবে।
–“আমি তো জাহান্নামী। আর দুনিয়ায় তো তুমি আমায় কখনো ভালোবাসনি। তাহলে কি কোন জনমেই তোমাকে আমার আর পাওয়া হবেনা?”
আমি বাকরুদ্ধ হয়ে স্থির ইফানের দিকে তাকিয়ে রইলাম। হঠাৎ কি শুরু করলো লোকটা! তাঁর কন্ঠস্বর স্বাভাবিক ঠেকছেনা। আমি ঢোক গিললাম। খুব বাজে অনুভব করছি। কিসের জন্য করছি আমি জানি না। তবে খুব কষ্ট হচ্ছে বুকের ভেতর। পুনরায় ঢোক গিললাম। কিছু বলতে যাব তার আগেই দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে ইফান আমার কোল থেকে সরে উঠে দাঁড়াল। সে কোনদিক না তাকিয়ে কাভার্ড থেকে কাপড় নিয়ে ওয়াশরুমে চলে গেল। মূহুর্তটা এতটা তাড়াতাড়ি চলে গেল যে আমার বোধগম্য হলোনা কিছু।
আমি মাথা থেকে এসব বাঝে ভাবনা সরিয়ে খাবারগুলো টেবিলে সাজিয়ে রাখলাম। কিছুক্ষণের মধ্যেই ইফান রেডি হয়ে বেরিয়ে আসল। আমার দিকে একবারও তাকাল না। হাতে ঘড়ি পড়ে বেড সাইট থেকে ফোনটি নিয়ে আমাকে কিছু না বলেই বেরিয়ে যেতে লাগল। আমি পিছন থেকে ডেকে উঠলাম,
–“কই যাচ্ছ তুমি এখন? আমি তোমার জন্য খাবার এনেছি একটু খেয়ে যাও।”
ইফান দাঁড়িয়ে পড়ল। আমার দিকে না তাকিয়েই ছোট্ট করে উত্তর করল, “সময় নেই।”
আমি তাড়াতাড়ি ইফানের দিকে এগিয়ে যেতে যেতে বললাম, “একটু খেয়ে যাও। আমি খাইয়ে দেই?”
ইফান আমার দিকে ফিরল। আমার গালে হাত রেখে হিসহিসিয়ে বলল,“আই থিংক আই ফরগট।”
আমি ভ্রু কুঁচকে ভাবুক চেহারায় শুধালাম, “কি ভুলে গিয়েছিলে?”
ইফানের ওষ্ঠপুটে ভেসে উঠল সেই চিরচেনা বাঁকা হাসির রেশ। সে রহস্যময় বাঁকা হেসে হিসহিসিয়ে বলল, “সিক্রেট।”
অতঃপর আর এক মূহুর্ত দাঁড়ালনা। আমি পিছন থেকে অনেক বার ডাকলাম। শুনলোনা আমার ডাক। আমার খুব কান্না পাচ্ছে। আমি ইফানের ইনগোর একদম সহ্য করতে পারিনা। দম বন্ধ হয়ে আসে। আমি বিছানায় বসে ডুকরে কেঁদে উঠলাম। ঠিক কতক্ষণ যে কাঁদলাম নিজেই জানিনা।
জুই আমার রুম থেকে বেরিয়ে করিডর দিয়ে যাচ্ছিল। হঠাৎ কিছু ভাঙার শব্দে থমকে দাঁড়াল। আশেপাশে দৃষ্টি ঘুরিয়ে উৎসের খুঁজ করল। জুইয়ের চোখ গিয়ে আটকায় বন্ধ দরজার পানে। কিন্তু এই রুম তো মাহিনের। তাহলে ভিতরে কিসের শব্দ হলো? মনের প্রশ্নকে সাইডে রেখে বিড়বিড়ালো,“উনি মনে হয় রুমে।”
জুই পুনরায় হাঁটা ধরল। কিন্তু দু’পা এগোতেই আবারো জোরে কিছু ভাঙার শব্দ তার কানে পৌঁছাতেই থমকে দাঁড়াল। জুইয়ের ধারণা ভুল না হলে কাচ ভাঙার শব্দ আসছে। কিন্তু কিসের কাচ ভাঙছে? ভাবতেই জুইয়ের চোখদুটো প্রসারিত হয়ে গেল আতংকে। সে ভাবল একবার উঁকি দিয়ে দেখবে। কিন্তু পরক্ষণেই পিছিয়ে গেল। কারো রুমে উঁকি দেওয়া ঠিক হবেনা। আর লোকটা যদি মাহিন চৌধুরী হয় তবে তো নয়ই।
জুই পিছু ফিরতে নিলে আবারও কাচ ভাঙার শব্দ কানে আসতেই মেয়েটা আঁতকে উঠল। আসেপাশে একবার উঁকি দিয়ে দেখল কেউ নেই। ভয়ে ভয়ে দরজা ফাঁক করে ভেতরে দৃষ্টি বুলালো। কিন্তু ঘরে কাউকে দেখতে পেলনা।
জুই দৃষ্টি মেঝের দিকে নিতেই পুনরায় আঁতকে উঠল। সারা রুমের মেঝেতে ওয়াইনের বোতল সহ নামিদামি এটা-ওটা ভেঙে কাচ ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। ভয়ে জুইয়ের বুক ধুকপুক ধুকপুক আওয়াজ করছে। দরজা পুনরায় ভেজিয়ে দিবে তার আগেই নজর আঁটকে বিছানার পাশে মেঝে লাল র’ক্ত দিয়ে মেখে একাকার। এবার দ্বিগুণ ভয় পেল মেয়েটা। মাহিন চৌধুরী আবার মায়ের মৃ’ত্যু সহ্য করতে না পেরে কিছু করে বসেনি তো?
মনে প্রশ্ন উঁকি দিতেই আর এক মূহুর্ত দেরি করলো না সে। দ্রুত পায়ে ভেতরে ঢুকে কাচ পেরিয়ে ধীরে ধীরে বিছানার কাছে যেতেই দেখে মাহিন বিছানায় হেলান দিয়ে মাথা নিচু করে বসে আছে। দৃষ্টি তার র’ক্তাক্ত হতে। সাদা শার্টও র’ক্তে ভিজে উঠেছে। জুই আর এক মূহুর্ত সময় নষ্ট না করে দৌড়ে মাহিনের সামনে গিয়ে বসে আতংক ভরা কণ্ঠে বলতে লাগল,
–“আ…আপনার হাত থেকে র’ক্ত বের হচ্ছে!”
জুইয়ের মনে কোথা থেকে যেন এক বুক সাহস চলে আসল। সে কাঁপা কাঁপা হাতে মাহিনের র’ক্তাক্ত হাত ধরে বললো,
–“এ…একি এখনো তো হাতে কাচ গেঁথে আছে! দাঁড়ান আ…আমি সবাইকে গিয়ে ডেকে আনছি…”
জুই বাক্য সম্পূর্ণ করার আগেই মাহিন র’ক্তাভ চোখে তাকাল। জুইয়ের গলায় তার মায়ের চেইনটি ঝুলে থাকতে দেখে সেই রাগ মূহুর্তেই ঝরে পড়ল। চোখ দুটো একদম শীতল হয়ে গেল। জুই উঠে চলে যাবে তক্ষুনি মাহিন জুইয়ের হাতে ধরে হেঁচকা টানে জুইকে তার বুকে এনে ফেলল। অতঃপর শক্ত করে জড়িয়ে ধরে জুইয়ের ঘাড়ে মুখ গুঁজে ডুকরে কেঁদে উঠল। জুই পাথরের মতো জমে গেল। কখনো কোনো পুরুষদের সংস্পর্শে যায়নি সে। হঠাৎ একজন পুরুষের স্পর্শ তাকে অস্থির করে তুলল। তবুও সে বাইরে প্রকাশ করতে পারছেনা। মাহিন জুইকে খুব সংবে’দনশীল ভাবে জড়িয়ে ধরে ভাঙা কণ্ঠে বলে উঠলো,
–““হোয়াই, ইনোগার্ল… হোয়াই ডিড ইউ কাম ইনটু আওয়ার লাইভস?
আমার মায়ের শেষ ইচ্ছে যে অপূর্ণ রয়ে গেল। আমি যে তোমায় বউ বানিয়ে তাঁর শেষ ইচ্ছে পূরণ করতে পারলাম না!
এই না পারার আফসোস আমাকে সারাজীবন খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে শেষ করে দেবে।”
মাহিনের কথায় এবার জুই আরও স্তব্ধ হয়ে জমে গেল। মনে পড়ল সত্যিই তো গতকাল রাতে মনিরা বেগম তাকে বউমা বানাবে এসব বলছিল। তারমানে এসব মজা করা ছিলনা! জুইয়ের কান্না আসছে এবার। কিন্তু তার ঘাড়ে মাহিনের তপ্তশ্বাস আঁচড়ে পড়ছে। যা তাকে অদ্ভুত অনুভূতি দিচ্ছে। সে সরে যেতে চাইছে। কিন্তু তার দেহ কেমন নিস্তেজ হয়ে আসছে। সত্যিই তাই হলো। ভয় জড়তা-সংকোচ সব মিলিয়ে তার নিশ্বাস আটকে গেছে। হঠাৎ জুইকে শরীর ছেড়ে দিতে দেখে মাহিনের যেন হুঁশ ফিরল। তৎক্ষনাৎ জুইকে দূরে ঠেলে দিল। কিন্তু এতক্ষণে জুইয়ের দেহ নেতিয়ে পড়েছে বিধায় দেহের তাল সামলাতে না পেরে পড়ে যেতে যাবে তক্ষুনি মাহিন ধরে ফেলল। এদিকে ভয়ের চোটে জুই জ্ঞান হারিয়ে মাহিনের বুকে লুটিয়ে পড়ল। মাহিন স্তব্ধ হয়ে গেল। নিজের উপর চরম বিরক্তি নিয়ে বিড়বিড়ালো,
–“ওহ্ শীট!”
অতঃপর জুইয়ের গালে হালকা থাপড়ে ডেকে উঠল, “হেই, ইনোগার্ল, হোয়াট হ্যাপেন্ড?”
কিন্তু জুইয়ের পক্ষ থেকে কোনো সাড়াশব্দ মিলল না। মাহিন এক তপ্ত দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজের হাতে গেঁথে থাকা কাঁচের টুকরোটি টেনে বের করে ছুড়ে ফেলে দিল। তারপর জুইকে দুহাতে সযত্নে আগলে নিয়ে পাঁজাকোলে তুলে দাঁড়াল। ওকে ঘরে নিয়ে যাওয়ার জন্য উদ্যত হতেই মাহিনের দৃষ্টি আটকে গেল জুইয়ের স্নিগ্ধ মুখশ্রীর ওপর। ওর ফর্সা গালে র’ক্তের প্রলেপ লেগে আছে, আর কিছু অবাধ্য ছোট চুল এলোমেলো হয়ে মুখে লুটোপুটি খাচ্ছে।
মাহিন আলতো করে ফুঁ দিয়ে চুলগুলো সরিয়ে দিল। জুইয়ের সেই শান্ত চেহারার দিকে পলকহীন তাকিয়ে থেকে বিড়বিড়িয়ে আওড়ালো,
–“হাউ ইনোসেন্ট!”
ইমরান খাচ্ছে আর পলি পাশে বসে দেখছে। ইমরান খেতে খেতে শুধালো,“তুমি খেয়েছ?”
–“হুম খেয়েছি।”
–“চলে গেছে নাকি?”
কপালে ভাঁজ পড়ল পলির। বোধগম্য হয়নি বিধায় পাল্টা শুধালো, “কার কথা বলছ?”
ইমরান আচমকা পলির দিকে তীক্ষ্ণ চোখে তাকিয়ে পড়ল৷ পলি ঘাবড়ে গেল কিছুটা। ইমরান পর মূহুর্তেই মৃদু হেসে বলল,
–“ভাবির বাড়ির লোকদের কথা বলছিলাম।”
পলি এবার স্বাভাবিক ভাবে প্রত্যুত্তর করল,“হুম সবাই চলে গেছে।”
–“তাই মন খারাপ?”
–“কিহ্?”
ইমরানের অদ্ভুত কথায় তৎক্ষনাৎ আওড়ালো পলি। ইমরান মৃদু হেসে বললো,“শাশুড়ি মা আর পলাশও কি চলে গেল নাকি?”
–“না-তো। কেন?”
–“ভাবলাম উনারা বোধহয় চলে গেছে। তাই হয়তো তোমার মন আরও ভার হয়ে গেছে।”
–“ওহ্।”
পলি কথা আর বাড়ালো না। ইমরানকে খাওয়াতে মনযোগ দিল। পলি চুপচাপ বসে স্বামীর খাওয়া দেখতে লাগল। মাঝেমধ্যে চেহারায় অযাচিত এক ক্রোধের আভাও ভেসে উঠছে। ইমরান তাকাতেই আবার চেহারা স্বাভাবিক করে ফেলছে।
ইমরানের খাওয়া শেষ হলে এঁটো জিনিসগুলো নিয়ে রুম থেকে বেরিয়ে পড়ল। করিডর দিয়ে এগোতেই আচমকা পলাশ পলির সামনে এসে দাঁড়াল। বোনের হাতে এঁটো প্লেটগুলো দেখে তাচ্ছিল্য করে হেসে বলল,
–“জা’নোয়ারটাকে গিলিয়ে এলি নাকি?”
–“হুম।”
পাংশুটে চেহারায় পলি জবাব দিল। অতঃপর চোয়াল শক্ত করে চিবিয়ে চিবিয়ে বলল,“ইচ্ছে তো করে মাঝে মধ্যে বি’ষ মিশিয়ে দেই খাবারে। আর সহ্য হয় না। বুঝলে দাদাভাই, জা’নোয়ারটার কই মাছের প্রাণ।”
পলাশ দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললো, “সে আর বলতে! কতবার মা’রার চেষ্টা করলাম, কিন্তু বারবার বেঁচে যায়। একবার তো সফলই হয়ে গিয়েছিলাম। কিন্তু দুর্ভাগ্যবসত সেদিন গাড়িতে ইমরান চৌধুরী নয় ইফান চৌধুরী ছিল। আর এক্সিডেন্টটি উনার হয়।”
পলাশ এইটুকু বলে দাঁতে দাঁত পিষে পলির দিকে তাকিয়ে বললো, “আরেকদিনও তো প্রায় গাড়িচাপা দিয়েই দিচ্ছিলাম। বাট মাঝখানে তুই চলে আসলি!”
পলাশ একটু থেমে পলির দিকে চোখ সরু করে বলে উঠলো, “তুই কোনোভাবে ইমরান চৌধুরীর প্রতি দুর্বল…”
পলি তৎক্ষনাৎ ভাইকে থামিয়ে ঘৃণা ভরা চেহারা নিয়ে বললো,“ছিঃ ঐ ইমরান চৌধুরীর উপর আমি দুর্বল! আমি এখনো ভুলিনি ঐ লোকটা আমার আব্বুর খু’নি। আমাদের দোকান থেকে তাদের দলের লোকরা বিনা পয়সায় জিনিস নিয়ে যেত। চাঁদাবাজি করতো। আব্বু প্রতিবাদ করেছিল বলে বিনা দোষে তাঁকে খু’ন করেছে। আর আমাকে…”
পলি চোখ খিচকে বন্ধ করে নিল। রাগে মেয়েটার হাত-পা কাঁপতে লাগল। পলাশ বোনের কাঁধে মৃদু থাপড়ে দিল। পলি তপ্তশ্বাস ছেড়ে বলল,“সেইদিন তাকে বাঁচানো ছাড়া কিছু করার ছিলনা। কোথা থেকে জাহানারা ভাবি সহ মাহিন চৌধুরীও মাঝে চলে আসল। তখন যদি ইমরানকে না বাঁচাতাম তাহলে তোমার বিপদ হতে পারতো। কিন্তু কোনো ব্যপার না। কতদিন বাঁচবে আমার হাত থেকে। আর…”
পলি চুপ করে গেল। পলাশ শুধালো,“আর কি?”
পলি বাঁকা হেসে বলল,“জাহানারা ভাবিও কিন্তু ওকে ছাড়বেনা। তিনি যেভাবে উঠেপড়ে লেগেছে চৌধুরীদের পিছনে!”
পলাশ আশ্চর্য হয়ে বলল,“কি বলছিস? ভাবির সাথে কি সম্পর্ক?”
–“চোর পুলিশের খেলা চলছে দাদাভাই। আমি শুরু থেকে ভাবির উপর নজর রাখতাম। শুধু ভাবি নয়, এই বাড়ির প্রতিটি মানুষের উপর। একটা বিষয় কি জান? আমি যখন লুকিয়ে ভাবি কিংবা অন্যকারো উপর নজর রাখতাম তখন দেখতাম কাকিয়াও সবার উপর নজর রাখতো। কাকিয়া না রাখলে কাকিয়ার বদলে লতা রাখতো। কাকিয়ার ডান হাত ছিল লতা মেয়েটা। কিন্তু কাকিয়ার খু’নি লতা এটা আমি বিশ্বাস করতে পারছি না কিছুতেই!”
পলাশ এই মূহুর্তে ভাবনায় তলিয়ে গেল। চোখেমুখে ফুটে উঠলো চিন্তার ছাপ। পলি ভাইকে অন্যমনষ্ক দেখে শুধালো, “কি হয়েছে দাদাভাই?”
ভাবনা থেকে ছিটকে বেরিয়ে আসলো পলাশ। চিন্তিত কন্ঠে বলে উঠলো, “তুই একটু সাবধানে থাকিস বোন। আমি কথা দিচ্ছি খুব শীগ্রই এই খেলা শেষ করব ইমরান চৌধুরীকে মে’রে। ততদিন তুই সাবধানে থাকিস।”
–“আমায় নিয়ে একদম চিন্তা করোনা। আমি নিজের রক্ষা করতে পারব। তুমি সাবধানে থাকবে। যা করার খুব সতর্ক হয়ে করবে। ও কিন্তু ইদানীং অনেক এলার্ট হয়ে গেছে। জানিনা মনে মনে কি প্ল্যান করছে তোমাকে ধরার জন্য।”
–“তোর আর আম্মার ভবিষ্যৎ নিশ্চিত না করে আমি কিছুতেই নিজের কিছু হতে দিব না। আল্লাহ ভরসা।”
–“ইনশাআল্লাহ।”
নিজের কথাবার্তার এখানেই বিরতি টানলো দুই ভাই বোন। অতঃপর একসাথে নিচে নিমে গেল।
সন্ধ্যার পর থেকেই অদ্ভুত এক নিস্তব্ধতা চৌধুরী বাড়িকে গ্রাস করেছে। তারপর রাত বাড়ার সাথে সাথে সেই নিস্তব্ধতার পাল্লা আরও বেড়ে গেল। ঘড়ির কাটা টিকটিক করে রাত একটার ঘরে এসে থামল। সারা রুম জুড়ে ফেইরী লাইটের বহর। বিছানার উপর দুই হাঁটুতে থুঁতনি রেখে বসে আছি আমি। চোখের দীর্ঘ পাতাগুলো শুকানোর নামই নিচ্ছে না। বারবার ভিজে আসছে। আমার ক্লান্ত চোখজোড়া বিছানার উপর ফোনে নিবদ্ধ। ফোনের স্ক্রিনে ইফান আর আমার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যাটলিস্ট ভেসে আছে। কতগুলো মেসেজ দিলাম কিন্তু রিপ্লাই তো দূর সিনও করলোনা। মেসেজ দেওয়ার আগে কতবার তাঁর নাম্বারে কল করলাম কিন্তু ধরলো না। প্রথমে রিং হলেও এখন বন্ধ দেখাচ্ছে। আমি আবারও একটা মেসেজ লিখলাম,
–“আমার সাথে তুমি কথা বলছনা কেন? কি করেছি আমি? এমন করছ কেন আমার সাথে?”
“ইফান প্লিজ বাসায় আস। আমি তোমার জন্য অপেক্ষা করছি।”
পরপর দুটো মেসেজ পাঠিয়ে আবারও কিছুক্ষণ অপেক্ষা করলাম। কিন্তু কোনো লাভ হলোনা। গলায় কান্না দলা আঁটকে আসছে। আমি নাক টেনে খুব কষ্টে শুকনো ঢোক গিলে ভয়েস দিলাম,
–“আমার খুব কষ্ট হচ্ছে ইফান। আমি আর সহ্য করতে পারছিনা। প্লিজ বাসায় ফিরে আস আমার কাছে”… থেমে কাঁদতে কাঁদতে পুনরায় বলতে লাগলাম,“ তুমি তো জান আমি কতটা দুর্বল হয়ে গিয়েছি। প্লিজ তুমি এমন করোনা লক্ষীটি। আচ্ছা রাগ হলে বাসায় এসোনা আজ। শুধু এইটুকু বল কোথায় আছ এখন?”
টপটপ করে চোখের পানি ফোনের স্ক্রিনে পড়ল। ইফান এবারো মেসেজ সিন করলনা। আর বোধহয় করবেও না। যতদূর জানি ইফান বাইরে বের হলে ডিভাইস কম ইউজ করে। কিন্তু মানুষটা যতবার এভাবে আমাকে না জানিয়ে বাড়ি থেকে হুটহাট বেরিয়েছে ততবার কোনো না কোনো বিপদে পড়েছে। চিন্তায় আমার মাথা ফেটে যাচ্ছে। আমি উপায়ন্তর না পেয়ে ইন্দুর সেইভ করে রাখা নাম্বারে কল করলাম। রিং হওয়ার কিছুক্ষণ পর ইনান কল রিসিভ করতেই আমি বলে উঠলাম,
–“ইনান কোথায় আছ তুমি?”
–“আজ তো আমি চৌধুরী বাড়িতেই। কেন ভাবি? কিছু হয়েছে?”
–“তুমি কি জানো তোমার ভাই কই আছে?”
–“আমাকে তো কিছু বলেনি? কিছু হয়েছে কি?”
–“উওও কিছুনা। আসলে ও বাসায় এখনো আসেনি। আচ্ছা আমি রাখছি। তোমাকে কিছু জানালে আমাকে জানিও।”
ইনানকে কিছু বলতে না দিয়ে ফোন কেটে দিলাম। ভালো লাগছেনা কিচ্ছু। শুধু কান্না আসছে। আমি আর স্থির হয়ে বসে থাকতে পারছিনা। তাই রুম থেকে বেড়িয়ে পড়লাম। নিচে গিয়ে কিছুক্ষণ ওর জন্য অপেক্ষা করবো। যদি আসে।
চৌধুরী বাড়ির সকলের আড়ালে লুকিয়ে থাকা সেই ভয়ংকর দেখতে কক্ষটিতে আজও শতশত মোমবাতি জ্বলছে। সেখানে কেউ একজন অশরীরীর মতো ধ্যানমগ্ন হয়ে বসে আছে। যার মাথায় একদলা জটলা চুল। হাতে তছবি’র ছড়ার পুতি গুলো এক এক করে গুনছে কিসব বিড়বিড় করে। অতঃপর ধ্যান থেকে উক্ত ব্যক্তি উঠে দাঁড়াল।
রুমের দেয়ালের আড়ালে লুকিয়ে থাকা দরজা খুলে রুমে প্রবেশ করল রোকেয়া বেগম। অতঃপর পিছনে ফিরে তাকাতে না তাকাতেই ভয়ে ছিটকে দেয়ালের সাথে চেপে গেলে।
ধমকা এক অশুভ হাওয়ায় মুখের উপর থেকে সরে গেল ব্রাউন উষ্কখুষ্ক চুলগুলো। দৃশ্যমান হলো চিরচেনা সেই চোখ দুটো। যেখানে ডার্ক কালো আইলাইনার টানা মোটা করে। মীরার সেই অশুভরঙা নয়ন জোড়া তার হাতে নিবদ্ধ। যেখানে আছে ধারালো এক ছু’রি। মীরা সেটা উল্টে পাল্টে দেখতে বড্ড ব্যস্ত। আশেপাশে কে আছে তা নিয়ে কোনো মাথা ব্যথা নেই তার। সে খুব শান্ত ভঙ্গিমায় পায়ের উপর পা তুলে বিছানায় বসে। দেহ তার কালো কুচকুচে পোশাকে মোড়ানো।
নিজ রুমে মীরাকে এমন ভয়ংকর রুপে দেখে ভয়ে জড়সড় হয়ে গেল রোকেয়া বেগম। নিজেকে ধাতস্থ করে সরল চেহারা বানিয়ে বলে উঠলো,
–“মীরা দিদিভাই তু…”
বাক্য সম্পূর্ণ করতে পারলেন না রোকেয়া বেগম, তার আগেই মীরার তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে জমে গেলেন তিনি। ভীষণ অদ্ভুত ঠেকছে মীরার চাহনি। মনে হচ্ছে এই চোখ জোড়া দিয়ে যে কাউকে ভস্ম করে দিতে পারবে। রোকেয়া বেগম ঘামতে লাগলেন। মীরা মৃদু হাসল। অতঃপর হিমশীতল কন্ঠে শুধালো,
–“মাঝরাতে কোথায় গিয়েছিলে তুমি?”
–“আ…আমি কো…কোথায় যাব? না মানে নামাজ পড়ছিলাম নফল। তুমি হঠাৎ?”
মীরা হাসল। অতঃপর উঠে ছু’রিটি দেখতে দেখতে রোকেয়া বেগমের কাছে এগিয়ে আসল। রোকেয়া বেগম পিছতে চাইল। কিন্তু পারলোনা। পিঠ দেয়ালের সাথে ঠেকেছে। মীরা রোকেয়া বেগমের নিকট গিয়ে দাঁড়িয়ে হেসে বলল,
–“নামাজ পড়তে গিয়েছিলে?”
রোকেয়া বেগম হ্যা বোধক মাথা নাড়াল। মীরা আবার বাঁকা হাসল। অতঃপর আচমকা হাতের ছু’রিটি দিয়ে রোকেয়া বেগমের মাথার হিজাবটি সরিয়ে দিল। উন্মুক্ত হলো এক গুচ্ছ জটলা চুল। রোকেয়া বেগম আঁতকে উঠল। মীরা ছু’রি দিয়ে সেই জটলা চুলে ছুঁইয়ে দিতে দিতে হেসে বলল,
–“কে মে’রেছে মাকে?”
রোকেয়া বেগমের ঘাম ছুটছে কপাল বেয়ে। তিনি ভয়ে ঢোক গিলে প্রত্যুত্তরে বললেন,“আমি কি করে জানব দিদিভাই?”
মীরা হাসল। অতঃপর বলে উঠলো, “আমার মা তো সবই জানতো।”
–“মা…মানে?”
মীরার চোয়াল শক্ত হয়ে গেল। সে চেহারায় কাঠিন্যে এনে বলতে শুরু করল,“আমার সাথে নাটক কম করো। আমার মা কিন্তু আমায় সব বলতো এই বাড়ির কে ঠিক কেমন। এই যে তুমি আস্তো এক শয়তান। আর তোমার বান্ধবীর একমাত্র মেয়ে আই মিন নুলক চৌধুরী, সেও তো একটা শয়তান।”
–“এসব কি বলছিস?”
মীরা আচমকা রোকেয়া বেগমের চোয়াল চেপে ধরে দাঁতে দাঁত পিষে চাপা স্বরে গর্জে উঠলো, “বুঝতে পারছিসনা? আমার মা তো জানতো নুলক চৌধুরী নাবিলা চৌধুরীর আপন বোন না। নুলক চৌধুরীর মা তোর বান্ধবী ছিল। সে মা’রা যাওয়ার পর যবে থেকে নাবিলা চৌধুরীর মাকে তার বাবা বিয়ে করে আনে তবে থেকেই তুই সহ্য করতে পারতিনা। এমনকি তোর এইসব কুফরি কাজ দিয়ে সবসময় অসুস্থ করে রাখতি। একসময় সেই ব্ল্যাক ম্যাজিকের প্রভাবে ম’রেই গেল। এরপর থেকে নাবিলা চৌধুরী তোর চোখের বিষ হয়ে গেল। কারণ কি! তাকে নাওয়ান চৌধুরী একটু বেশি স্নেহ করতেন ছোট দেখে। আর তুই এটা মানতে পারতিনা। তাই নুলক চৌধুরীর মনে বি’ষ ঢালতি। তারপর যখন তোর ছেলের সাথে নুলক চৌধুরীর বিয়ে ভেঙে নাবিলা চৌধুরীর বিয়ে দিলো নাওয়ান চৌধুরী, তবে থেকে তোদের চোখের কাল হলো তিনি। তাই তার উপর তোর এই ব্ল্যাক ম্যাজিক করলি। ধীরে ধীরে তুই উনাকেও অসুস্থ করে দিলি। আর তোর সাথে ছিল নুলক চৌধুরী। এই কথা যখন নাওয়ান চৌধুরী জানতে পারল তখন তার সব সম্পত্তি নাবিলা চৌধুরীর নামে লিখে দিল। সেটা সহ্য করতে পারিসনি তোরা। তাই নিজের বাবাকেও মা’রতে একবার দ্বিধা করলো না নুলক চৌধুরী।
তুই এতটুকু করেও থামিসনি। নিজের ছেলের আবদার রাখতে জেসমিন শেখের উপরও ব্ল্যাক ম্যাজিক করলি, যাতে তোর ছেলেকে ভালোবাসে। কিন্তু কথাটা লুকিয়ে ছিলি নুলক চৌধুরীর থেকে। নুলক চৌধুরী যখন জানতে পারলো তখন কি করলো! জেসমিন শেখের ডেলিভারির দিন তাকে হাসপাতালে মে’রে ফেললো। তুই আর তোর বান্ধবীর মেয়ের কীর্তিকলাপ তো এখানেও শেষ হয়নি। তারপর তোদের চোখের কাটা হলো জাহানারা। যখন দেখলি মেয়েটা কাউকে পরোয়া করেনা। রীতিমতো তোদের ধ্বংসের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তখন মেয়েটার উপর এসব কালো জাদু করা শুরু করলি। সফলও তো হলি। মেয়েটা পা’গলামি করতে লাগল। সেই জের ধরেই নিজের পেটের সন্তানকে ন’ষ্ট করে দিল। বাচ্চা মেয়ে নিজের সেই ভুলে এখনো জ্বলে পুড়ে শেষ হয়ে যাচ্ছে।
তুই এতোটা নিকৃষ্ট যে বিড়ালটিকেও ছাড়লিনা। মেয়েটা যখন সন্তান হারানোর সুখে একটা বিড়াল নিয়ে সন্তানকে ভুলার চেষ্টা করছিল তখন নিম্মিটাকেও আগুনে পু’ড়িয়ে দিলি।”
রোকেয়া বেগম এতোক্ষণে মুখ খুললেন,“মিথ্যা অপবাদ দিচ্ছিস কেন বোইন? আমি কিছু করিনি।”
মীরার মস্তিষ্ক রাগে খেই হারালো। সে আচমকা রোকেয়া বেগমের মাথা দেয়ালের সাথে সজোরে আ’ঘাত করে। রোকেয়া বেগম মৃদু আর্তনাদ করে উঠে। মীরা ক্রোধে হিসহিসিয়ে বলে উঠলো, “একদম নাটক করবিনা। আমি নিজ চোখে দেখেছিলাম তুই নিম্মির খাঁচায় আগুন দিয়েছিলি। তবে তখন অনেকটা দেরি হয়ে যায়। আমরা পৌঁছাতে পৌঁছাতে….আর সেই কথা আমিই কিন্তু ইফান ভাইকে বলেছিলাম।”
–“তুই বলেছিলি!”
রোকেয়া বেগম অস্পষ্টে আওড়ে ভাবনায় তলিয়ে গেল। সেই রাতে ইফান রোকেয়া বেগমের কাছে এসেছিল। এমনকি রিভলবার দেখিয়ে মারার হুমকিও দিয়ে গিয়েছিল। রোকেয়া বেগম তখন হাতেপায়ে ধরে বলে, আর কোনোদিন তার বউয়ের দিকে তাকাবেও না। লাস্ট একটা চান্স দিয়েছিল ইফান।
রোকেয়া বেগম ভাবনা থেকে বেরিয়ে এসে মীরার চোখে চোখ রেখে বলে উঠলো, “তার মানে সত্যিই তুই সব জানিস?”
মীরা সেই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার প্রয়োজন মনে করলোনা। সে উল্টো রোকেয়া বেগমকে শুধালো,“কে মে’রেছে আমার মাকে? মিথ্যা একদম বলবিনা।”
রোকেয়া বেগম পুনরায় ভাবনায় তলিয়ে গেল। আসলে পুরোনো সব ঘটনা ইরহাম চৌধুরীই স্ত্রীর সাথে এটা ওটা নিয়ে গল্প করতে করতে বলে দেয়। রোকেয়া বেগম যখন জানতে পারে তখন মনিরাকেও মা’রতে চায়। কিন্তু আদরের ছেলের কথায় মনিরার দিকে চোখ তুলে তাকানোর সাহস পেতোনা। কিন্তু গতকাল রাতে আমাকে বলে দিচ্ছিল সেটা নুলক চৌধুরী জানতে পেরে মনিরাকে রুমে নিয়ে যায়। সেখানে রোকেয়া বেগমও ছিল। নুলক চৌধুরী রাগের বশে বি’ষ পুশ করে দেয় মনিরা বেগমের শরীরে। তারপর সাথে সাথেই তিনি মা’রা যান।
–“তোরা কার সাথে কি করলি দ্যাটস নন অফ মাই বিজনেস। বাট আমার মাকে…কে মে’রেছে আমার মাকে?”
মীরার ক্রুদ্ধ কন্ঠে ঘোর থেকে বেরিয়ে আসে রোকেয়া বেগম। তিনি ভালো বুঝতে পারছেন সামনে কে দাঁড়িয়ে আছে। স্বয়ং আজরাইল। মীরা পুনরায় রোকেয়া বেগমের গলা থাবা মেরে ধরে জিজ্ঞেস করলো, “কে মে’রেছে আমার মাকে? তুই নাকি তোর নুলক?”
এবারো উত্তর করলো না রোকেয়া বেগম। ভয়ে ঘামছে খুব। মীরা কিছু একটা ভেবে বাঁকা হেসে রোকেয়া বেগমের থেকে সরে দাঁড়াল। অতঃপর বিনা বাক্যকে চলে যেতে নিলে রোকেয়া বেগম বলে উঠে,
–“কোথায় যাচ্ছিস?”
–“আমার মায়ের মৃ’ত্যুর হিসাব নিতে। নুলক চৌধুরী নিজের রুমে তাইনা?”
ভয়ে আঁতকে উঠল রোকেয়া বেগম। মনে পড়ে গেল তার সইকে দেওয়া কথা। তিনি বেঁচে থাকতে আগলে রাখবে নুলককে। এতোদিন তাই করেছে। কিন্তু আজ? আজ কি করে নুলককে বাঁচাবে? তিনি হঠাৎ বলে উঠলেন,
–“নুলক কিছু জানেনা। আআমি মে’রেছি তোর মাকে। কারণ আমার বিষয়ে বড় বউকে সব বলতে চেয়েছিল।”
মীরা হিমশীতল চোখে তাকাল রোকেয়া বেগমের দিকে। তবে সেই দৃষ্টির উত্তাপে কেঁপে উঠলো রোকেয়া বেগমের প্রাণ। মীরা শীতল কন্ঠে শুধালো,
–“তার মানে আমার মাকে..”
–“আমি মে’রেছি বি’ষ দিয়ে।”
–“ভেবে বলছ?”
রোকেয়া বেগম ঢোক গিলে হ্যা বোধক মাথা নাড়াল। অতঃপর সারারুমে নেমে এল এক নিস্তব্ধতা। দুজন মানবী যে ভেতরে আছে তার কোনো সারা শব্দই নেই। ঘড়ির কাটা টিকটিক করে চলছে। সব নিস্তব্ধতা বেদ করে বেশ কিছুক্ষণ পর রোকেয়া বেগমের ঘরের দরজা খুলে গেল। অশরীরির মতো অন্ধকারের মধ্যে বেড়িয়ে এলো মীরা চৌধুরী। তবে একা নয়। তার হাতে একটি বস্তা। যার ভেতর থেকে কিছু একটা মৃদু নাড়াচাড়া করছে। মিরা ঘর থেকে বেরিয়ে কয়েক পা এগোতেই হঠাৎ থেমে গেল। ধীরে ধীরে পিছনে তাকাতেই অন্ধকারে আমার সাথে দৃষ্টির মিলন ঘটে। আমি দেয়ালের সাথে হেলান দিয়ে নির্লিপ্তভাবে মীরার দিকে তাকিয়ে। মীরা আর আমার মধ্যে কোনো বাক্য বিনিময় হলো না। মীরা পুনরায় নিজদমে বস্তা টেনে নিয়ে চৌধুরী বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল।
মীরার বাইকটি একটি ফার্ম হাউজে এসে থামল। জায়গাটা বেশ থমথমে। মনে হচ্ছে জঙ্গলের মধ্যে একলা একটা বাড়ি দাঁড়িয়ে। মীরা বাইক থেকে নেমে বস্তাটা টেনে নিয়ে ভেতরে গেল।
বিশাল বাড়ির ভেতর ফ্লোরের নিচে একটি গুপ্ত ইনডোর সুইমিং পুলের সামনে এসে থামল। সুইমিংপুলটি বিশাল বড়। মানুষের আওয়াজ পেতেই জল থেকে একে একে অনেকগুলো কুমির মুখ বের করলো। অতঃপর সবগুলো গোল করে ঘুরতে লাগল। হয়তো বুঝতে পারছে আজ অনেকদিন পর তাদের ভুড়িভোজ হবে। মীরা কুমিরগুলোর অস্থিরতা দেখে রহস্যময় হাসল। অতঃপর বস্তা থেকে রোকেয়া বেগমকে বের করলো। বয়স্ক মহিলা এখন নেতিয়ে পড়েছে। ম’রবে বোধহয় এবার। নিস্তেজ চোখ দুটো আলতো খোলে মীরার দিকে আকুতি ভরা নয়নে তাকালো। কিন্তু এতে মীরার মধ্যে কোনো প্রকার ভাবান্তর হলো না। সে আচমকা লা’থি মেরে রোকেয়া বেগমকে নিচে ফেলে দিল। অনেক উপর থেকে পানিতে পড়ায় ভীষণ জোরে আওয়াজ হলো। চারদেয়ালে আঘাত পেয়ে শব্দা বারবার প্রতিধ্বনিত হলো।
কুমিরগুলো ঘিরে ধরলো রোকেয়া বেগমকে। মূহুর্তেই পুল সম্পূর্ণ র’ক্তে রঞ্জিত হলো। মীরা নির্লিপ্ত চোখে তাকিয়ে দেখলো সবটা দৃশ্য। বেশ আনন্দ হচ্ছে তার। খুব আনন্দ। অতঃপর উচ্চ স্বরে হেসে উঠল। চার দেয়ালে আ’ঘাত পেয়ে হাসির শব্দ প্রখর হলো। সে বসে পড়ল হাঁটু গেড়ে। পর মূহুর্তে গুমরে গুমরে কেঁদে উঠল। খুব একা অনুভব করছে সে। খুব একা। ব্যথাতুর কন্ঠে আওড়ালো,
–“পৃথিবীতে সত্যিই আমার আর কেউ নেই মা। আমি একা। খুব একা।”
কাঁধে কারো হাতের স্পর্শ অনুভব করতেই চুপ হয়ে যায় মীরা। সে এই হাতের স্পর্শ চেনে। খুব ভালো করে চেনে। মাহিন মীরার মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়। আদুরে কণ্ঠে ছোট্ট বোনটাকে সান্ত্বনা দিয়ে বলে,
–“আমি আছিতো। মা নাহয় উপর থেকে আমাদের খেয়াল রাখবে। আর আমরা দুই ভাইবোন…”
মীরা তৎক্ষনাৎ মাহিনকে থামিয়ে ভুল শুধরে দিয়ে বলে উঠলো, “দুজন নয়, তিনজন।”
*
অচেনা জায়গায় নিজেকে সহজে মানিয়ে নিতে পারেনা তন্নি। তাই হঠাৎ করে বারবার ঘুম ভেঙে যাচ্ছে। বলতে গেলে ঘুমই হচ্ছেনা তার। তাই বিরক্ত হয়ে উঠে বসল। হাঁটতে হাঁটতে বেলকনিতে গিয়ে দাঁড়াল। বাগন থেকে খুব সুন্দর ফুলের ঘ্রাণ ভেসে আসছে। সাথে ফুরফুরে শীতল হাওয়া। মন জুড়িয়ে আসছে তার। হঠাৎই তন্নির কান দুটো খাড়া হয়ে গেল। কোথা থেকে কারো ফুঁপিয়ে কান্নার আওয়াজ ভেসে আসছে। তন্নি উৎস খুঁজতে গিয়ে লক্ষ করে পাশের বেলকনিটি। হ্যা, ঐখান থেকেই কারো কান্নার আওয়াজ আসছে। তন্নি ধীর পায়ে সেইদিকে উঁকি দেয়।
চলবে,,,,,,
ব্যস্ততা কাটিয়ে অবশেষে নতুন পর্ব লিখলাম, পাঁচ হাজার শব্দের। ইনশাআল্লাহ এবার থেকে রেগুলার হব। সবাই রিয়েক্ট আর গঠনমূলক মন্তব্য করবেন। হ্যাপি রিডিং 🫶
Share On:
TAGS: জান্নাত মুন, জাহানারা
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
জাহানারা পর্ব ২৭+২৮
-
জাহানারা পর্ব ১৯+২০
-
জাহানারা পর্ব ৫৫+৫৬
-
জাহানারা পর্ব ৩৯+৪০
-
জাহানারা পর্ব ৪১+৪২
-
জাহানারা পর্ব ৫১+৫২
-
জাহানারা পর্ব ৪৮
-
জাহানারা পর্ব ২৫+২৬
-
জাহানারা পর্ব ৬১+৬২
-
জাহানারা পর্ব ১১+১২