জাহানারা
জান্নাত_মুন
পর্ব :৭৬
🚫ক’পি করা নিষিদ্ধ
🔞 সতর্কবার্তা:
এই গল্পে অ’কথ্য ভাষা এবং স”হিং’সতার উপাদান রয়েছে। ১৮ বছরের কম বয়সী বা সং’বে’দনশীল পাঠকদের জন্য উপযুক্ত নয়। পাঠক নিজ দায়িত্বে পড়বেন।
সিআইডি মনিরা বেগমের লা’শ নিয়ে গেছে ঘণ্টাখানেক হলো। এরপর থেকেই চৌধুরী বাড়িতে এক বিষাদময় নিস্তব্ধতা নেমে এসেছে। অতি আপন একজনকে হারিয়ে বাড়ির সবাই যেন পাথরের মতো নিথর হয়ে গেছে। কেউ আর উচ্চস্বরে কাঁদছে না, সবার কান্না এখন বুকফাটা গুমরে মরা আহাজারিতে রূপ নিয়েছে। বাড়িতে মৃত্যুশোক, অথচ চৌধুরী বাড়িতে বাইরের মানুষের ভিড় নেই বললেই চলে। আমার বিয়ের পর থেকে আজ পর্যন্ত এই বাড়িতে কোনো আত্মীয়স্বজনের আসা-যাওয়া দেখিনি। আমার মনে হয়, চৌধুরীদের সাথে তেমন কারো আত্মীয়তার সম্পর্কই নেই। আজ বাড়িতে বাইরের মানুষ বলতে কিছুক্ষণ আগে আসা পলির মা খাদিজা বেগম আর তার একমাত্র বড় ভাই পলাশ।
*
খাদিজা বেগম পলির পাশে বসে ভেজা কণ্ঠে নিজের মেয়ে সহ বাকিদের সান্ত্বনা দিয়ে যাচ্ছেন। পলাশ ইমরানের সাথে কথাবার্তা বলে কয়েকটি মাদরাসায় যোগাযোগ করছে। যাতে মাদরাসা থেকে কিছু ছাত্র পাঠানো হয় চৌধুরী বাড়িতে কুরআন খতম দেওয়ার জন্য। পলাশ কথাবার্তা শেষ করে ফোন রাখল। অতঃপর আড়চোখে ইমরানের দিকে তাকিয়ে দেখল ইমরান ফোনে কথাবার্তা বলছে। হয়তো মনিরা বেগমের মৃত্যু সংবাদ নিকট আত্মীয়দের জানাচ্ছে। পলাশ ইমরানকে কয়েক মূহুর্ত এক দৃষ্টিতে দেখে আচমকা হাত দু’টো মুষ্টিবদ্ধ করে নিল। মূহুর্তেই ছেলেটার সরল মুখশ্রীতে ফুটে উঠলো অযাচিত এক হিংস্রতার প্রতিচ্ছবি। পলাশ চোয়াল শক্ত করে দাঁতে দাঁত পিষল। তক্ষুনি ইমরান এদিকে দৃষ্টি রাখতেই লক্ষ করল পলাশের অদ্ভুত দৃষ্টি।
পলাশ ইমরানের থেকে বয়সে অনেক ছোট। অল্প বয়সেই ছেলেটা অনেক বুঝদার। পলির বাবা মারা যাওয়ার পর থেকেই সংসারের হাল ধরেছে। ইমরান বয়সে বড় হওয়ায় সবসময় বোন জামাইকে খুব মেনে চলে। তাই চোখে চোখ রেখে কথাও খুব একটা বলে না। তাই হঠাৎ এহেন দৃষ্টিতে ইমরান এক মূহুর্তের জন্য ফোনে কথাবার্তা বন্ধ করে পলাশকে সুক্ষ্ম নজরে পরখ করে। অতঃপর কান থেকে ফোন সরিয়ে শুধালো,
–“কিছু বলবে ভায়া?”
ইমরানের কণ্ঠস্বর কর্ণপাত হতেই যেন সংবিত্তি ফিরে পেল। শুকনো কেশে ঠোঁটে মৃদু হাসি ঝুলিয়ে রেখে প্রত্যুত্তরে বলল,
–“মাদরাসা থেকে বললো কিছুক্ষণের মধ্যেই কিছু ছাত্র পাঠিয়ে দিবে।”
ইমরান এগিয়ে এসে পলাশের কাঁধে হাত রেখে বলল,
–“আচ্ছা তুমি এবার রেস্ট নাও। আমায় সিআইডি অফিসে যেতে হবে। আর হ্যা, দেখতেই তো পাচ্ছ ভায়া, বাড়ির সবার অবস্থা ভালো না। একটু খেয়াল রেখো।”
–“জি ভাইয়া আপনি চিন্তা করবেন না। আপনি নিশ্চিন্তে যান। এদিকটা আমি সামলে নিব।”
ইমরান হালকা ঠোঁট প্রসারিত করে পঙ্কজকে নিয়ে সদর দরজা দিয়ে বেরিয়ে যায়। পিছন থেকে পলাশ পুনরায় চেহারায় কাঠিন্যে এনে এক দৃষ্টিতে সেই দিকে তাকিয়ে থেকে কিছু একটা বিড়বিড় করে আওড়ায়। তারপর দৃষ্টি সরিয়ে নিলে আচমকা নজরে পড়ে পলির তীক্ষ্ণ চাহনি। পলি চোখের পলক ফেলে ভাইকে বুঝাল,
–“শান্ত হও।”
মীরা কেমন পাথরের মতো হয়ে গেছে। কারো সাথে কথা বলছে না। তার চোখে নেই কোনো অনুভূতির রেশ। আমি তাকে তাঁর রুমে দিয়ে আসলাম। ওকে ফ্রেশ করে ভালো জামাকাপড় পরিয়ে আমিও একটা নতুন সাদামাটা সেলোয়ার-কামিজ পরেছি, যেহেতু বাইরে থেকে লোকজন আসবে।
মীরাকে একলা ছাড়তে চাইনি তাই জুই আর ফারিয়াকে মীরার রুমে রেখে এসেছি।
ড্রয়িং রুমে এসে দেখি রোকেয়া বেগম বিলাপ করছেন। খাদিজা বেগম রোকেয়া বেগমকে এখনো সান্ত্বনা দিয়ে যাচ্ছেন।
আমার কথায় পলিও সাদামাটা নতুন কাপড় পরে নিয়েছে। এখন বাসার কাজের লোকদের কাজ বুঝিয়ে দিচ্ছে। আমি একবার গিয়ে ইতিকেও দেখে এসেছি। নোহা ইতির কাছে বসে। হঠাৎ কাকিয়ার অপঘাতে মৃত্যুতে মেয়েটা অনেক ভয় পেয়ে আরও ভেঙে পড়েছে। আমি তপ্তশ্বাস ছাড়লাম। আজ বুঝতে পারছি বাড়ির বড় বউদের কত দায়িত্ব!
দুপুর একটা বেজে পনেরো। চৌধুরী বাড়িতে মানুষের আনাগোনা শুরু হয়েছে। এখনো মনিরা বেগমের লা’শ নিয়ে আসেনি। বাড়ির মানুষের কথায় ইফান ব্যবস্থা করেছে যাতে লা’শের পোস্টমর্টেম না হয়। আত্মীয়তার খাতিরে জিতু ভাইয়াই কিছুটা সাহায্য করছে। ইমরান খবর দিয়েছে সব ফর্মালিটি পূরণ করে লা’শ নিয়ে বাড়ি ফিরবে। এদিকে আমার বাপের বাড়িতে খবর দেওয়া হয়েছে। এতক্ষণে চলে আসার কথা। আমি সদর দরজা দিয়ে বাইরে একবার উঁকি দিলাম। না! এখনো আসেনি। আমি আবার ভেতরে চলে আসতে যাব তখনই পুরুষালি কণ্ঠ কানে ভেসে আসে,
–“আম্মাজান।”
এতদিন পর অতি পরিচিত কাণ্ঠ শুনতে পেয়ে তড়িৎ বেগে পিছনে ফিরলাম। সাদা পাঞ্জাবি পরহিত আব্বু আর বড় আব্বু দাঁড়িয়ে। পাশেই কালো বোরকা পরহিত আম্মু আর বড় আম্মু। বড় আব্বু হেসে পুনরায় আদুরে কণ্ঠে ডেকে উঠল,
–“আম্মাজান, কেমন আছেন?”
আপন মানুষগুলোকে এতদিন পর দেখে চোখ দুটো ঝলঝল করে উঠল। আমি বড় আব্বুকে জড়িয়ে ধরে ভেজা কণ্ঠে বললাম,
–“তুমি কেমন আছ? শরীর ঠিক আছে?”
বড় আব্বু মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে ঠোঁট প্রসারিত করে বললেন,“আলহামদুলিল্লাহ। আপনাকে দেখে আরও সুস্থ হয়ে গেলাম।”
একে একে আব্বু সহ সকলের সাথে কথা বলে তাদের ভেতরে নিয়ে আসলাম। এই প্রথমবার আমার বাপের বাড়ির লোক এসেছে তাই ইকবাল চৌধুরী বাকি কাজ ফেলে আমার বাপের বাড়ির লোকদের সাথে কুশল বিনিময় করে আবার কাজে চলে গেছেন। চৌধুরী বাড়ির বাগানের পিছনের দিকে যে পাশে চৌধুরীদের কবরস্থান আছে সেখানেই মনিরা বেগমের কবর খুঁড়ার কাজ চলছে। আপাতত সেদিকটাই সামলে যাচ্ছেন। ইকবাল চৌধুরীর সাথে কথাবার্তা বলার পর আব্বু আর বড় আব্বু ইরহাম চৌধুরীর কাছে গেছেন। এদিকে রোকেয়া বেগম আম্মু আর বড় আম্মুর কাছে মনিরা বেগমের কথা বলতে গিয়ে পুনরায় বিলাপ জুড়লেন।
আমার বাড়ির লোক এসেছে জানতে পেরে নাবিলা চৌধুরী রুম থেকে বেরিয়ে আসলেন। কারো নজরে আসার আগেই আম্মুর নজরে পড়ল। তৎক্ষনাৎ দু’জনের চোখাচোখি হল। দীর্ঘ এত বছর পর পুনরায় দুই বান্ধবীর সাক্ষাৎ। নাবিলা চৌধুরী আর আম্মু একে-অপরের দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়েই রইল। দুজনের চাহনিই তীক্ষ্ণ। আমি বিষয়টা কিছুক্ষণ লক্ষ করে বলে উঠলাম,
–“মা, আমার আম্মু।”
আমার কণ্ঠ শুনে নাবিলা চৌধুরীর ধ্যানভঙ্গ হল। তিনি এক পলক আমার দিকে তাকিয়ে পুনরায় আম্মুর দিকে দৃষ্টি রাখলেন। আম্মু বসা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে ঠোঁট প্রসারিত করে বলে উঠলো,
–“আসসালামু আলাইকুম আপা। কেমন আছেন?”
কি আশ্চর্য বিষয়! আমি ভেবেছিলাম আমার বাড়ির লোকজন দেখে নাবিলা চৌধুরী নাক ছিটকাবে। কিন্তু আমার ধারণা তিনি ভুল প্রমাণ করে ঠোঁট প্রসারিত করে মৃদু হেসে এগিয়ে আসতে আসতে বললেন,
–“ওয়ালাইকুম আসসালাম। আপনারা কেমন আছেন?”
বড় আম্মু প্রত্যুত্তরে বললেন,“আলহামদুলিল্লাহ ভালো আছি বোন। এতদিন পর বাড়ির মেয়েকে দেখে আরও ভালো হয়ে গেছি।”
নাবিলা চৌধুরী কিছু বললেন না। তিনি হালকা হেসে সামনের সোফায় পায়ের উপর পা তুলে বসে পড়েন। বড় আম্মু রোকেয়া বেগম আর খাদিজা বেগমের সাথে কথাবার্তায় মন দিয়েছে। আম্মু এগিয়ে এসে নাবিলা চৌধুরীর পাশে বসে পড়ল। আমি শুধু আশ্চর্য হলাম নাবিলা চৌধুরী কোনো প্রকার বিরক্তি প্রকাশ করছেনা দেখে। বরং মেঝের দিকে তাকিয়ে থেকে ঠোঁট বাকিয়ে হাসলেন। আমি যতটুকু জানি তিনি বাইরের মানুষের সাথে একদম মিশতে পারেন না। এমনকি পলির মার সাথেও তেমন একটা কথাবার্তা বলেননি। বরং চোখমুখ সবসময়ের মতো গম্ভীর করে রেখেছিলেন। তাহলে হঠাৎ তিনি অন্যরকম আচরণ করছেন কেন?
আম্মু কিছুক্ষণ নাবিলা চৌধুরীর পাশে চুপচাপ বসে থেকে নিচু কন্ঠে বলে উঠলো, “এখনো দেখছি আগের মতোই আছিস!”
–“যমন?”
মেঝের দিকে দৃষ্টি স্থির রেখেই প্রত্যুত্তর করলেন নাবিলা চৌধুরী। আম্মু নিঃশব্দে হাসল। অতঃপর বললো,“বললি না তো কেমন আছিস?”
নাবিলা চৌধুরী আম্মুর দিকে তাকিয়ে হেসে বলল,“খারাপ থাকার তো কোনো কারণ নেই? আফটারঅল বড়লোক বাড়ির মেয়ে, বড়লোক বাড়ির বউ, তার চেয়েও বড় কথা দু দুটো ছেলের বউ আছে বাড়িতে। আর কি লাগে ভালো থাকার জন্য!”
–“তা ঠিক। তুই তো এটাই চেয়েছিলি, আমার মেয়ে হলে তোর ছেলের বউ বানাবি। দেখলি আল্লাহ তোর মনের আশা পূরণ করেছে! তো আমার মেয়ে ছেলের বউ হিসেবে কেমন?”
এবার নাবিলা চৌধুরী ঠোঁট আরও প্রসারিত করল। ঘাড় ঘুরিয়ে আমাকে এক নজর দেখে চাপা স্বরে বলে উঠলেন,
–“এমন বউমা পাওয়া সাত রাজার ভাগ্য! আমি উঠতে বললে উঠে, বসতে বললে বসে। আমি ছাড়া কিছুই বুঝে না।”
শেষ কথাটা চিবিয়ে চিবিয়ে বলে চোয়াল শক্ত করে নিলেন। হঠাৎ এহেন কথা শুনে আম্মুর মুখটা চুপসে গেল। তিনি আমার দিকে চোখ সরু করে তাকালেন। আমি ইশারায় বুঝালাম, “কি হয়েছে?” আম্মু উত্তর না দিয়ে দৃষ্টি সরিয়ে নাবিলা চৌধুরীকে বললো, “ছোট মানুষ তো, তাই বুঝে কম।”
নাবিলা চৌধুরী চোয়াল শক্ত করে না চাইতেও চেহারায় হাসি টেনে চিবিয়ে চিবিয়ে বলল,“তোর মেয়ে বুঝে কম না, বরং বুঝে বেশি। আমার ছেলের এতো এতো টাকাপয়সা দেখে ভালোই ফন্দি এঁটে মেয়েকে ঠিক আমার ছেলের গলায় ঝুলিয়ে দিলি। তোদের থেকে এর চাইতে আর কি আশা করা যায়!”
নাবিলা চৌধুরীর কথায় এবার আম্মুর চেহারা শক্ত হয়ে গেল। কিন্তু রাগ আর বিরক্তি বাইরে প্রকাশ করলো না। আম্মু উঠে এসে আমাকে জিজ্ঞেস করলো,
–“জামাই বাবাকে দেখছি না তো।”
আমি দোতলার দিকে চোখ ঘুরিয়ে একবার দেখলাম। অতঃপর চিন্তিত চেহারায় বললাম, “তার ভাই মাহিনকে নিয়ে উপরে গিয়েছিল আর নিচে নামেনি।”
–“ও আচ্ছা। তুই গিয়ে একবার দেখি আসিস।”
–“সে না-হয় গিয়ে দেখে আসব। কিন্তু তোমরা সবাই এলে ভাই কই?”
বলতে বলতে সদরদরজায় চোখ বুলালাম। আম্মু বলল,“জিয়াদ কিছু কেনাকাটা করছে।”
আম্মুর বলার মধ্যেই সদরদরজা দিয়ে জিয়াদ প্রবেশ করল। আমি এগিয়ে তার কাছে যেতেই আমাকে জিজ্ঞেস করলো, “কেমন আছ আপু?”
–“আমি ভালো আছি ভাই। তুই ভালো আছিস?”
–“আমিও ভাল…”
বলার মধ্যে আচমকা নজর পড়ে দূরে দাঁড়িয়ে থাকা পলির উপর। যে তার দিকেই তাকিয়ে আছে। পলির সাথে চোখাচোখি হতেই জিয়াদ দৃষ্টি সরিয়ে নিল। অতঃপর অধরে হাসি টেনে বলল,
–“আমিও অনেক ভালো আছি। এগুলো নাও।”
জিয়াদ হাতের শপিং ব্যাগগুলো আমার দিকে এগিয়ে দিল। আমি সেগুলোকে পরখ করে শুধালাম,
–“কি আনছিস আবার?”
–“তোমার শ্বশুরবাড়ির সকলের জন্য টুকটাক জিনিস আরকি।”
আমি পলিকে ডেকে বললাম জিনিসগুলে নিয়ে যেতে। তারপর আমি কাজের জন্য অন্যদিকে চলে গেলাম। পলি জিয়াদের কাছে এসে কিছুটা ইতস্ততভাবে শুধালো,
–“কেমন আছ?”
জিয়াদ তাকালো না। বরং দৃষ্টি নত করে ঠোঁটের হাসি আরও প্রসস্থ করে প্রত্যুত্তরে বলল,“আলহামদুলিল্লাহ। আপনি?”
পলি উত্তর করতে পারছেনা। কেন জানি তার গলা ধরে এসেছে। চোখ দুটো আচমকা জ্বালা করা শুরু করেছে। পলির থেকে উত্তর না পেয়ে জিয়াদ নিঃশব্দে হেসে বলল,“আমিও না কিসব জিজ্ঞেস করছি! নিশ্চয়ই আপনি ভীষণ ভালো আছেন। এত বড় বাড়ির বউ। অবশ্যই ভালো আছেন।”
পলি উত্তর করতে পারছে না। জিয়াদ চোখ তুলে তাকাল পলির পানে। মেয়েটা কাতর দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। জিয়াদ হাতের ব্যাগগুলো এগিয়ে দিল। কিন্তু পলির সেসবে খেয়াল নেই। সে এখনো একইভাবে তাকিয়ে আছে। জিয়াদ শুকনো কেশে উঠল,
–“প্লিজ এগুলো ধরেন।”
পলি সংবিত্তিতে ফিরে পেয়ে দ্রুত দৃষ্টি নত করে নিল। অতঃপর জিয়াদের হাত থেকে ব্যাগগুলো নিতে গেলে হাতে স্পর্শ লাগে। জিয়াদ দ্রুত হাত সরিয়ে পলির পাশ কাটিয়ে চলে গেল। পলি পিছন ফিরে পুনরায় জিয়াদের পানে তাকাল।
অপরদিকে সবে লা’শ নিয়ে চৌধুরী ম্যানশনে ফিরেছে ইমরান। সদরদরজা অব্ধি আসতেই এই দৃশ্য দেখে চুপচাপ দাঁড়িয়ে দু’হাত মুষ্টিবদ্ধ করে ক্রুদ্ধ নয়নে পলি আর জিয়াদকে দেখছিল। আমার নজর হঠাৎ সেদিকে পড়তেই বলে উঠলাম,
–“আরে ইমরান তোমরা চলে এসেছ?”
আমার ডাকে মূহুর্তেই স্বাভাবিক হয়ে উঠল ইমরান। একটু আগে যে তার চেহারায় কাঠিন্যে ছিল তা উধাও হয়ে গেল নিমিষেই। ইমরান ভেতরে এসে পলির পাশে দাঁড়িয়ে বলল,
–“কাকিয়ার লা’শ নিয়ে মাত্র ফিরলাম ভাবি।”
কাকিয়ার লা’শ কথাটা শুনতেই বুকটা ধক করে উঠল। কেউ যেন শ্বাসনালি চেপে ধরেছে। একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে শুধালাম,
–“জানাজা কখন?”
–“আসরের নামাজ পড়ে জানাজা পড়া হবে। তারপরই..!”
বাক্য সম্পূর্ণ করল না ইমরান। যা বুঝার বুঝে গেলাম। আমি আর কথা না বাড়িয়ে স্থান ত্যাগ করলাম। ইমরান এবার পলির দিকে পূর্ণদৃষ্টি দিল। পলির হাতের ব্যাগগুলোকে এক নজর দেখে স্বাভাবিক কণ্ঠে বলল,
–“এখন বাইরের মানুষের আনাগোনা শুরু হবে। একটু ভেতর দিকে থেকো।”
পলি মাথা নাড়িয়ে হ্যাঁ বলল। ইমরান আর কিছু না বলে পাশ কাটিয়ে চলে যেতে লাগল। পলি ঘাড় কাথ করে ইমরানের যাওয়ার পানে তাকিয়ে রইল এক দৃষ্টিতে। যখনই ইমরান চোখের আড়াল হলো তখনই মেয়েটার চেহারার রং পাল্টে গেল। সে হালকা অধর বাঁকাল। যা ভীষণ অদ্ভুত আর রহস্যময় ঠেকল।
জিয়াদ বাড়ির সকল পুরুষদের জন্য পাঞ্জাবি পায়জামা এনেছে। আমি ইফানের জন্য আনা সাদা পাঞ্জাবি নিয়ে রুমের দিকে যাচ্ছি। ভালোই করেছে পাঞ্জাবি এনে। আজ জানাজায় পরে যেতে পারবে। লোকটার তো আবার একটাও পাঞ্জাবি নেই। কোনোদিন পরেছে নাকি কে জানে!
রুমে এসে দেখি ইফান কোথাও নেই। কপাল কুঁচকে গেল আমার। পরক্ষণেই নাকে এসে লাগে সিগারেটের ভ্যাপসা গন্ধ। আমি নাক ছিটকে বেলকনির দিকে চোখ স্থির করলাম। অতঃপর হাতের কাপড়গুলে বিছানায় রেখে সেদিকে এগিয়ে গেলাম।
যা ভেবেছিলাম ঠিক তাই। খালি রুম পেয়ে ঠোঁটে একটার পর একটা সিগারেট ধরিয়েছে। আমি ওড়না নাকে চেপে ধরলাম। আমার উপস্থিতি ঠাহর করতে পেরে চটজলদি আমার দিকে দৃষ্টি ঘুরাল। আমি বিরক্তি নিয়ে শুধালাম,
–“শরীরে কি কোন তাল পাওনা না?”
ইফান সিগারেট ফেলে পায়ের নিচে পিষে আমার কাছে এসে দাঁড়াল। আমার কথার মানে বোধগম্য না হওয়ায় শুধালো,“মানে?”
–“বাড়িতে একজন মা’রা গেছে আর তুমি রুমে বসে এসব করছ? বাইরে গিয়ে দেখ তোমার ভাই দৌড়াদৌড়ি করে একা হাতে সব সামলাচ্ছে। আর এখন জানাজার সময় হয়ে গেছে। তুমি এখনো রুমে বসে আছ!”
ইফান হাতের উল্টো পিঠ নাক ঘষতেই আমি খেঁকিয়ে উঠলাম,“তুমি আবার ড্রা’গস নিয়েছ? ল’জ্জা করলো না এমন একটা দিনেও নে’শা করতে?”
ইফান আমার দিকে পূর্ণ দৃষ্টি দিল। রাগে আমার নাকের পাঠা ফুলে উঠছে। আমার গলার অবস্থা ভালো না। গতকাল থেকে কাঁদতে কাঁদতে ভেঙে গেছে। তাই জোরেও কথা বলতে পারছি না। ইফান তপ্তশ্বাস ছেড়ে আমার বাহুতে হাত রেখে শুধালো,
–“মিডিসিন নিয়েছ?”
আমি দাঁতে দাঁত পিষে বললাম,“নিলে নিই, না নিলে না নিই, তাতে তোমার কি?”
ইফান আমাকে টেনে তার আরও সন্নিকটে আনল। তারপর নরম কণ্ঠে বলে উঠলো,“এত রাগ করছ কেন?”
–“রাগ না করার একটা কারণ বল! বাড়িতে একটা মানুষ মা’রা গেছে। আর তুমি! তুমি কি করছ?”
ইফান আমার রাগের পাল্লা বুঝতে পেরে চুপচাপ আমার কোমর জড়িয়ে ধরে ঘাড়ে মুখ ডুবালো। আমি তপ্তশ্বাস ছেড়ে বললাম,
–“এসব কবে ছাড়বে?”
–“ম’রার পর।”
আমার চোয়াল শক্ত হয়ে আসল। কোনো মতে নিজেকে সামলে বলে উঠলাম,“আমার কিন্তু এবার সহ্য হচ্ছে না। এসব এখন থেকে বন্ধ দাও।”
–“অসম্ভব।”
–“কি অসম্ভব?”
ইফান ভারি নিশ্বাস ছেড়ে হাস্কিস্বরে হিসহিসিয়ে বলে উঠলো,
–“ড্রা’গ না নিলে মাথা কাজ করে না জান। খুব যন্ত্রণা হয়। মনে হয় মাথা ফেটে যাচ্ছে। আমি পাগল হয়ে যাই। তখন ইচ্ছে করে সব ধ্বংস করে দেই। রাইট সেন্সে নিজেকে একদমই ধরে রাখতে পারিনা।”
আমি দীর্ঘশ্বাস আড়াল করে ইফানের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে নরম কণ্ঠে বললাম,“এখন থেকে এসব ছেড়ে দেওয়ার চেষ্টা কর।”
–“এতে কোন লাভ হবে না।”
–“কে বলেছ তোমায় লাভ হবে না? চেষ্টা করলে সব সম্ভব।”
–“ভুল। চেষ্টা করলেই সব সম্ভব না। তোমাকেও তো ভুলার চেষ্টা করেছি। পেরেছি কি?”
ইফানের কথার পিছে কিছু বলতে পারলাম না। কিছুক্ষণ চুপ থেকে ইফানের থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিলাম। অতঃপর ওকে রুমে নিয়ে এসে বললাম,
–“জানাজার সময় হয়ে গেছে। তাড়াতাড়ি রেডি হয়ে নাও।”
–“আমি গিয়ে কি করব?”
ভ্রু কুঁচকে এলো আমার। বিরক্তি নিয়ে বললাম,“সবাই জানাজায় গিয়ে যা করে তুমিও তা করবে।”
ইফান বিছানায় বসে প্রত্যুত্তরে বলল,“আমার গিয়ে কোনো কাজ নেই। অনেক মানুষ আছে তাঁরাই ঝামেলা মিটিয়ে নিবে।”
ইফানের কথা শুনে আমার রাগ হলো। আমিও তার পাশে গিয়ে বসে শক্ত কণ্ঠে বললাম,“তাড়াতাড়ি গিয়ে রেডি হয়ে জানাজায় যাও।”
–“এসব আমার পছন্দ না।”
এবার চেঁচিয়ে উঠলাম আমি,“পছন্দ না মানে কি? জানাজার কাজ কি তোমার পছন্দ অপছন্দের উপর বসে থাকবে?”
ইফান আমার রাগী চেহারায় কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে নিচু কণ্ঠে বলে উঠলো,“সবার দ্বারা সব কাজ মানায় না। এসব ঝা’মেলায় কখনো যায়নি। তাই শুধু শুধু জোর করো না।”
আমার শরীরে যেন আর সহ্য হচ্ছে না। রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে এদিক ওদিক তাকিয়ে নিজেকে শান্ত করে বললাম,“বেশ আজ না-হয় গেলে না। তারপর কি করবে? একদিন না একদিন তো নিজের মা…আমি থেমে গেলাম। তপ্তশ্বাস ছেড়ে ওর কাঁধে হাত রেখে শান্ত কণ্ঠে বললাম,“আজই তো শেষ। আর তো কোনোদিন নিজের দ্বিতীয় মাকে পাবে না। আর জেদ ধরো না। রেডি হয়ে নিচে যাও।”
–“এসব পবিত্র কাজে আমি গেলে পাপ হবে।”
–“ফেরেশতা এসে তো তোমাকে বলে গেছে পাপ হবে!”
বিরক্তি নিয়ে আওড়ালাম। ইফান শান্ত চোখে আমার দিকে তাকিয়ে রইল। আমি আর কথা না বাড়িয়ে ওকে ওয়াশরুমে ঠেলে পাঠিয়ে দিয়ে বললাম,
–“দ্রুত অযু করে আস যাও।”
ইফান এক চুলও নড়ল না৷ বরং আমার দিকে তাকিয়ে রইল। আমি কোমরে দু’হাত ধরে ক্লান্ত কন্ঠ বললাম,“যাও না।”
ইফান শুকনো কেশে কিছু বলতে চেয়েও বলতে পারছে না। তাঁর কাছে “পারি না” কথাটা ভীষণ অস্বস্তিকর। আমি চোখের ইশারায় আবার বললাম, যাও। ইফান জিহ্বা দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে রিনরিন কণ্ঠে বলল,
–“প্রথমে জানি কোথায় পানি দেয়?”
আমি হা করে ইফানের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলাম। ইফান শুকনো কেশে আমতা আমতা করে বলে উঠলো, “অঅনেক দিন আগে তোমায় করতে দেখেছিলাম তো তাই আরকি?”
–“অযুু করতে পাড়না?”
ইফান কপালে দুই আঙুল দিয়ে ঘষতে ঘষতে বলল,“পাড়ি না মানে পাড়ি। তোমাকে করতে দেখে একটু জানি আরকি। কিন্তু এখন মনে পড়ছে না আগে নাকে নাকি মুখে পানি দে…”
ইফানকে আর কিছু বলতে না দিয়ে ওর হাত ধরে ওয়াশরুমের ভেতর টেনে নিয়ে গেলাম। তারপর অযু করা দেখিয়ে দিতে দিতে বললাম,
–“যা বুঝলাম জীবনেও নামাজ-কালাম কিছু করনি! জীবনে ভালো কাজ করেছটা কি?”
ইফান এক মূহুর্ত থামলো আমার কথায়। হঠাৎ মনে পড়ে গেল সেই রাত্রির কথা। যেদিন জীবনের প্রথমবার নামাজ পড়েছিল। ইফান গলার স্বর খাদে নামিয়ে উদাস ভঙ্গিমায় বলে উঠলো,
–“কিছুই না। আমি মানেই পাপ। পাপ মানেই আমি। এই অস্তিত্ব যেখানে মরিচীকাচ্ছন্ন, সেখানে ভালোর প্রত্যাশা করা নেহাত বোকামি ছাড়া আর কিছুই নয়।”
আর কিছু বলতে পারলাম না। ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে এসে ওর চোখের সামনে পাঞ্জাবি ধরে বললাম,“পরে নাও।”
ইফান এক ভ্রু উঁচিয়ে একবার আমার হাতের সাদা পাঞ্জাবিটা দেখে আবার আমার দিকে তাকিয়ে বলে উঠলো, “এটা আমি পরব?”
–“কেন কি হয়েছে?”
–“এসব কখনো পরিনি। আর পরবও না।”
বলতে বলতে কাভার্ড থেকে একটা সফেদা রঙের শার্ট বের করে গায়ে জরাতে লাগল। আমি রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে টান মেরে ওর থেকে শার্ট নিয়ে তিরিক্ষি মেজাজে বলে উঠলাম,
–“একদিনের জন্য হলেও একটু মানুষ হও।”
বলেই জোর করিয়ে ওকে পাঞ্জাবি পরিয়ে দিতে লাগলাম। প্রথমে বাঁধা দিতে থাকলেও আমার কাছে হার মানে। আমি ওকে পাঞ্জাবি পরিয়ে কলার ঠিক করে পাঞ্জাবির বোতামগুলো লাগিয়ে দিতে লাগলাম। ইফান পলকহীন আমার দিকে তাকিয়ে দেখতে লাগল। দুধের মতো ফর্সা গায়ের রং। চোখ দুটো কিছুটা ফোলে লালচে হয়ে আছে। গোলাপের পাপড়ির মতো কোমল অধর। মাথায় শাড়ির আঁচলের মতো খানিকটা ওড়না টানা। মাথার মাঝখানে সিঁথি কাটা। একদম সাধারণ, গায়ে কোনো প্রকার অলংকার নেই। গায়ে হালকা যা অলংকার ছিল তা এক্সিডেন্টের সময় হাসপাতালে নেওয়ার পর খুলা হয়েছিল, আর পরা হয়নি। তারপরও নতুন বউদের মতো অন্যরকম দারুণ লাগছে।
পাঞ্জাবির বোতাম লাগানো শেষ করে ইফানের থেকে সরে গেলাম। তাতেও যেন তাঁর ঘোর যেন কাটল না। সে তখনও মনযোগ দিয়ে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে আমাকে দেখতে লাগল। আমি একটা সাদা টুপি ওর মাথায় পরিয়ে দিয়ে ওর দেহে সুগন্ধি আতর মেখে দিলাম। ইফানকে সম্পূর্ণ রেডি করে ওর বুকে দুহাত রেখে ক্লান্তির শ্বাস ছেড়ে বললাম,
–“হয়ে গেছে। এবার নিচে যাও তাড়াতাড়ি।”
বলা শেষ করে একবার ওর বুকে হাত বুলিয়ে দিলাম। তারপর হাত সরিয়ে নিতে যাব তক্ষুনি আমার দু’হাত বুকে চেপে ধরল। আমি ইফানের দিকে তাকিয়ে শুধালাম,
–“কিছু বলবে?”
–“হুম?”
আমি ভ্রু কুঁচকে নিতেই ইফান যেন ঘোর থেকে বেরিয়ে আসল। শুকনো কেশে বলল,“হয়ে গেছে?”
–“হ্যাঁ, এবার নিচে যাও।”
ইফান নিজেকে দেখার জন্য আয়নার দিকে তাকাতেই চোখ কপালে। তৎক্ষনাৎ ঝটকা মেরে মাথা থেকে টুপি খুলে বিছানায় ছুড়ে মেরে আওড়ালো,
–“এইত!”
তারপর হাতের সাহায্য চুলগুলো এলোমেলো করে দিল। লোকটার এহেন কাজে আমার কপালে ভাঁজ পড়লো। আমি শুধালাম,
–“এটা কি হলো? টুপি এভাবে ফেলে দিলে কেন?”
ইফান নাক ছিটকে বলল,“কেমন দেখতে লাগছিল দেখেছ!”
–“কেমন লাগছিল মানে? ভালোই তো লাগছিল!”
–“সিরিয়াসলি! হাউ ফানি!”
আমি দাঁতে দাঁত পিষে বললাম,“ভালো জিনিস তোমার ভালো লাগবে কেন?”
বলতে বলতে বিছানা থেকে টুপি এনে টুপ করে আবার ওর মাথায় পরিয়ে দিতেই ইফান টান মেরে খুলে বিরক্তি নিয়ে আওড়ালো,
–“হোপ বেডি!”
আমি আবার টান মেরে ওর হাত থেকে নিয়ে জোর জবরদস্তি করতে লাগলাম,“পর বলছি।”
–“যাহ্।”
ইফান সরে গেলো। আমি তো আর থেমে থাকার মানুষ নই। জোর করে ধরে পরিয়ে দিতেই ইফান বিরক্তি নিয়ে খুলতে খুলতে আওড়ালো,
–“এই, জারা, উফফ! ছাড়।”
–“খুললে খবর আছে।”
–“এই মেয়ে, ধুর বাল!”
আমার কথা না শুনে টেনে খুলেই ফেলল। বড্ড রাগ হচ্ছে আমার। অনেক জোরে শ্বাস টানছি। ফলে বুক অস্বাভাবিকভাবে উঠানামা করছে। আমি ক্রুদ্ধ নয়নে ইফানের দিকে তাকিয়ে। ইফান নিজের চুল পিছন দিকে ঠেলে আমার দিকে তাকাল। আমার অধিক রেগে যাওয়া লক্ষ করতেই আমার বাহু টেনে নিজের কাছে নিয়ে নরম কণ্ঠে বলল,
–“রিলাক্স পাগলি। এত হাইপার হচ্ছো কেন?”
–“তুমি কি টুপি মাথায় দিবে নাকি দিবে না?”
দাঁতে দাঁত পিষে শুধালাম। ইফান বললো, “এটা আমার মাথায় একদম বেমানান। দেখনি কেমন ফানি লাগছিল! এখন এটা পরে বাইরে গেল কেউ যদি মজা নেয় কিংবা তেসরা চোখে তাকিয়ে থাকে তাহলে কিন্তু ঐখানেই ওটাকে খতম করে দিব। বুঝতে পারছ বিষয়টা!”
আমি ইফানের থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে দাঁতে কটমট আওয়াজ করে বললাম,“মানুষের তো খায়া কাম নেই তোমার মতো মানুষের পিছে লাগবে। ভালোই ভালোই মাথায় দিয়ে নিচে যাও। সবাই অপেক্ষা করছে।”
–“জারা..”
কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেল আমার কঠোর দৃষ্টির তোপে পড়ে। ইফান কোমরে হাত ধরে মাথা ঠান্ডা করে বলল,“আচ্ছা দাও।”
আমি ওর হাতে দিলাম। সে খুব যত্ন করে পাঞ্জাবির পকেটে ঢুকিয়ে নিল। আমি চোখ সরু করতেই নরম গলায় বলল,“গিয়ে পড়ে নিব।”
আমি এখনো কঠোর চোখে তাকিয়ে আছি দেখে আমার গাল হালকা থাপ্পড়ে বলল,
–“সত্যিরে বাবা।”
–“মনে থাকে যেন। তাড়াতাড়ি নিচে যাও।”
রুম থেকে দু’জনেই বেরিয়ে পড়লাম। ইফান আমার পাশে হাঁটতে হাঁটতে বিড়বিড় করে আওড়ালো, “বুড়া বেডা মানুষের মতো গন্ধ বের হচ্ছে ইয়াক!”
আমার কানে আসতেই দাঁতে দাঁত পিষে বললাম,“ভালো জিনিস ভালো লাগবে কেন? দামরা লোক একটা!”
শেষ কথাটা বিড়বিড়িয়ে বললেও ইফানের কান অব্ধি পৌঁছে যায়, যার ফলে ইফান তৎক্ষনাৎ দাঁড়িয়ে পড়ে। অদ্ভুত দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকাতেই আমি ভাই ভাই করে কেটে পড়ি। আমার প্রস্থান দেখে ইফান নিজ দেহে দৃষ্টি বুলালো। এই প্রথমবার পাঞ্জাবি পরে তাঁকে দেখবে একদম ভিন্ন রকম লাগছে। সাদা পাঞ্জাবি বলিষ্ঠ দেহে একদম লেগে আছে বিধায় দেহের ভাঁজগুলো বুঝা যাচ্ছে। সত্যিই তো জোস লাগছে! তাহলে দামরা কেন বললো? ইফান চুলগুলোতে ব্যাক ব্রাশ করতে করতে বিড়বিড় করে আওড়ালো,
–“পাগল মহিলা!”
এখন চৌধুরী বাড়িতে মোটামুটি অনেক মানুষ। ফারিয়ার পরিবারের লোকও এসেছে। আম্মু আর ফারিয়ার আম্মু, সাথে আরও কয়েকজন মিলে মনিরা বেগমের গোসল দিয়েছে। অতঃপর পুরুষেরা খাটিয়ায় করে লা’শ নিয়ে গেছে চৌধুরী বাড়ির পাশেই বড় মাঠটিতে জানাজা পড়ার জন্য। জানাজায় নাকি প্রচুর মানুষ হয়েছে। এসব নিয়ে বেশি ভাবতে পারছি না, দম বন্ধ হয়ে আসছে। একটা মানুষ কিভাবে চলে গেল! কদিন সবাই মন খারাপ করে থাকবে। তারপর ঠিকই এই শোক কাটিয়ে স্বাভাবিক হয়ে যাবে। পরিবারে যে একজন সদস্য কম তখন বোধহয় আর মনেই হবে না। আবার হঠাৎ কখনো খুব করে মনে পড়লে বুক ছিঁড়ে কান্না আসবে।
–“জাহান, কি ভাবছিস আম্মা?”
পাশ ফিরে তাকাতেই দেখি বড় আম্মু। আমি দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললাম,“ভাবনার কি আর শেষ আছে!”
–“হয়ছে আম্মা, আর মন খারাপ করিস না। মেয়েটার কাছে না নিয়ে যাবি বললি? চল যাই।”
হঠাৎই মনে পড়ে গেল বড় আম্মুকে তখন বলেছিলাম মীরা একটু স্বাভাবিক হলে তাঁর কাছে নিয়ে যাব। এখন পর্যন্ত কাউকেই মীরার কাছে যেতে দেওয়া হয়নি। আমার তিন বান্ধবী এসেছে, তাদেরকেই মীরার কাছে থাকতে বলেছি। মীরার অবস্থা এখনও ভালো না। বিছানায় শরীর ছেড়ে চোখ বন্ধ করে পড়ে আছে। পলি, আমার এবং ফারিয়ার বাড়ি থেকে খাবার এসেছে। কিন্তু মীরাকে এখন পর্যন্ত কিচ্ছুটি খাওয়াতে পারিনি। বাড়ির সকলেরই অবশ্য একই অবস্থা।
বড় আম্মুকে নিয়ে মীরার রুমে ঢুকেই দেখি মীরা আগের মতোই শুইয়ে আছে। পাশে তন্নি, সুমাইয়া, নাফিয়া, জুই, ইতি আর নোহা বসে। ইতির শরীরটা আগের থেকে একটু শক্ত হতেই নোহাকে নিয়ে এ ঘরে এসেছে কিছুক্ষণ আগে। বড় আম্মু গিয়ে মীরার মাথার কাছে বসল। মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে ডাকলো,
–“মায়া এভাবে চুপচাপ শুয়ে থেকো না। একটু কান্না কর। কানলে মনটা হালকা হবে। ভাইঙ্গা পড়লে কি চলবে মা? পৃথিবীর নিয়মই তো এটা। একদিন না একদিন সবাইরেই মরণ লাগবে। কেউ আগে মরবে। আর কেউ পরে।”
বলতে বলতে বড় আম্মুর চোখ দুটো ভিজে এলো। তিনি শাড়ির আঁচল দিয়ে চোখ দুটো মুছে নিলেন। তবুও যেন কান্না আটকে রাখতে পারছেন না। তিনি এবার কেঁদে বলতে লাগলেন,
–“আপন মানুষ হারানোর যন্ত্রণা আমি বুঝিরে মা। আমি যে মা হয়া আমার দুইটা সন্তান হারাইছি। এই দুই হাতে ফাইল্লা বড় করছি আর এই দু’হাতেই সন্তানের লা’শ হাতাইছি। কষ্টে যে আমার বুকটা ফাইট্টা যায়। কারে বুঝায়াম আমার কষ্ট। কেউ তো আমার কষ্ট বুঝতো না। আমি যে মা, আমিই খালি আমার দুই সন্তান হারানোর কষ্ট বুঝি।”
বড় আম্মুর কথাগুলো শুনে আমি আর ঠিক থাকতে পারছি না। বিছানার এক কোণায় বসে চোখের জল ফেলতে লাগলাম। মীরা এতক্ষণে একটু নড়েচড়ে উঠলো। ক্লান্ত চোখ দুটো হালকা খুলতেই তার চোখের সামনে ভেসে উঠল বড় আম্মুর চেহারা। মীরা এবার সম্পূর্ণ দৃষ্টি রাখলো পাশে বসে থাকা ভদ্রমহিলার পানে। খুব মনযোগ দিয়ে দেখতে লাগল। যেন সে এই মুখখানা বহু আগে থেকেই চেনে। বড় আম্মু মীরার এমন কোমল চেহারা দেখে আরও কান্নায় ভেঙে পড়ে বিলাপ জুড়লেন,
–“হায়রে খোদা কি নিষ্পাপ মুখ৷ কেন এতিম বানাইলা?”
মীরার চেহারায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলতে লাগলো, “আমার কবিতাটাও তো এরম নিষ্পাপ আছিন। কি মায়া ভর মুখ গো। একটু কান্দো, মা একটু কান্দো। কষ্ট একটু কমবো।”
আচমকা মীরা বাচ্চাদের মতো ঠোঁট ভেঙে কেঁদে বড় আম্মুকে জড়িয়ে ধরল। তারপর তাদের সাথে হাউমাউ করে ইতি, জুই, নোহাও কাঁদতে লাগল। তন্নিরা ওদেরকে সামলানোর চেষ্টা করছে। বড় আম্মু বাচ্চাগুলোর কান্না দেখে শাড়ির আঁচল দিয়ে পুনরায় চোখ মুছে নিলেন। মীররা মাথায় স্নেহের পরশ দিতে দিতে বললেন,
–“এমনে দুর্বল হইও না মা। তোমার মার ডাক পড়ছিন তাই চলে গেছে। সবারই তো যাওয়া লাগব। এখন আমরা আছি তো।”
মীরা বড় আম্মুকে জড়িয়ে ধরেই ভাঙা কণ্ঠে বলল,“সবাই আছে কিন্তু আমার পৃথিবী তো শূন্য। আমার যে আর কেউ নাই। আমি কাকে আর মা ডাকব? কে আমাকে আর শাসন করবে? আমার শেষ আশ্রয়স্থলটুকুও যে আর রইলো না।”
–“আমরা আছি তো সোনা। তুমি আমারে মা বইলা ডাইকো। আমার কবিতাও যে আমারে মা বইলা ডাকতো। আজকে থেকে তুমিই না-হয় আমার আরেক কবিতা।”
মীরা আরও কান্নায় ভেঙে পড়ে। সেভাবেই আওড়ালো,“মা।”
আমি সুমাইয়া নাফিয়াকে বললাম জুই, ইতি আর নোহাকে নিয়ে এই রুম থেকে বেরিয়ে যেতে। এখানে থাকলে মেয়েগুলো কেঁদেকুটে আরও শরীর খারাপ করবে। অতঃপর মীরার রুমের বেলকনিতে দাঁড়াতেই দেখলাম মনিরা বেগমের দাফন করা শেষ হয়েছে। এক এক করে সকলে চলে যাচ্ছে।
–“শক্ত মানুষগুলোকে এভাবে ভেঙে যেতে দেখে খুব কষ্ট হচ্ছে।”
তন্নির কথায় দীর্ঘশ্বাস ছাড়লাম। নিচে মাহিনকে ইমরান আর পঙ্কজ জোর করে কবরস্থান থেকে নিয়ে যাচ্ছে। অতঃপর ধীরে ধীরে কবরস্থান ফাঁকা হয়ে গেল। শুধু দাঁড়িয়ে রইল ইনান। ইফান চলে যেতে গিয়েও ফিরে এলো। পিছন থেকে ইনানের কাঁধে হাত রাখল। তক্ষুনি ইনানের বলিষ্ঠ দেহখানি সামান্য কেঁপে উঠলো। ইফান ইনানের বাহু টেনে নিজ দিকে ফিরিয়ে ছেলেটাকে জড়িয়ে ধরে। আশ্রয়স্থল পেয়ে ইনান ঢুকরে কেঁদে উঠল। ইফান ইনানের মাথায়,পিঠে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে কিছু বলে শান্তনা দিচ্ছে।
পাশ থেকে কারো ফুঁপিয়ে কান্নার আওয়াজ শুনে সেদিকে তাকালাম। তন্নি কাঁদতে কাঁদতে বললো,
–“আমি বাইরের মানুষ হয়েও আন্টির মৃত্যু মেনে নিতে পারছিনা। কষ্টে বুকটা ফেটে যাচ্ছরে। না জানি তোদের বাড়ির মানুষের কি অবস্থা।”
তন্নির কথা শুনে পিছনে মীরার দিকে তাকালাম। মেয়েটা বাচ্চাদের মতো ঘাপটি মেরে চুপচাপ বড় আম্মুর কোলে শুয়ে আছে। আজ সারাদিন কেমন চুপচাপ ছিল! আমি আবারো কাকিয়ায় কবরের পানে তাকালাম। ঝলঝল করছে নয়া কবরখানা। কবরের উপর তাজা খেজুর পাতার ছাউনি। হঠাৎ আমার শরীরটা কেমন যেন কেঁপে উঠলো। অযাচিত ভয়ে দেহের লোমগুলো দাঁড়িয়ে পড়েছে। তন্নির চোখ এড়িয়ে গেল না বিষয়টা। সে আমার বাহু ধরতেই আমি সংবিত্তি ফিরে পাই। তিন্নির চোখের দিকে তাকাতেই সে শুধালো,
–“কিরে শরীর খারাপ করছে?”
আমি আবার নিচের দিকে চোখ ঘুরালাম। ইফান ইনানকে বুঝিয়ে বাহু ধরে কবরস্থান থেকে নিয়ে যাচ্ছে। এবার আশেপাশে কেউ নেই। একদম শূন্য। কালও যে মানুষটা সারা বাড়িতে রাজ করেছে আজ তাঁর ঠাঁই হলো মাটির নিচে। জনমানবহীন বাগানের এক কোণায়। কত সহজে জলজ্যান্ত মানুষটা সবার মাঝ থেকে হারিয়ে গেল। কিন্তু… কিন্তু এত সহজে মায়ের মৃত্যু মেনে নিবে মনিরা বেগমের দুই বীজ। বিশেষ করে মীরা চৌধুরী কি মেনে নিতে পারবে মায়ের এমন করুন মৃত্যু! তাহলে মীরা আজ এত শান্ত কেন? নাকি তার চুপ থাকা প্রলয়ঙ্কারী ঝড় উঠার পূর্বাভাস!
হঠাৎ আমাকে অন্যমনুষ্ক হয়ে যেতে দেখে তন্নি ডেকে উঠল,
–“কিরে, কি হয়েছে তোর? শরীর খারাপ করছে নাকি বলছিসও না!”
–“আমার মনটা না কেমন কু গাইছে রে?”
–“কিহ্!”
আমি চোখ বন্ধ করে কয়েকবার জোরে জোরে শ্বাস নিলাম। কমেন যেন অস্থির অস্থির লাগছে। মনে হচ্ছে বুকে কিছু একটা চেপে বসেছে। শেষ বাক্যটা মুখ ফস্কে বেরিয়ে আসতেই তন্নি শুধালো,
–“কি চেপে বসেছে?”
–“ভয়?”
–“কি বলছিস? বুঝতে পারছি না কিছু!”
আমি নিজেকে স্বাভাবিক করে বললাম,“কিছু না।” অতঃপর পুনরায় মীরার পানে তাকালাম। এখনো মেয়েটা বড় আম্মুর কোলে অবিকল এক শিশুর মতো গুটিসুটি মেরে শুয়ে আছে।
চলবে,,,,,,,,,
লেখালেখিটা আসে মন থেকে। এত চাপের মধ্যে কিছুতেই লিখতে ইচ্ছে হচ্ছিল না। তবুও সকলের কথা ভেবে একদম মনের বিরুদ্ধে গিয়ে লিখলাম। এই পর্বটা আরও বড় ছিল। কিন্তু আর লিখে উঠতে পারিনি। তাই আসল সিনটাই বাদ পড়ে গেছে। কি আর করার! নেক্সট পর্বে এড হবে।
আর সবাই রিয়েক্ট আর গঠনমূলক মন্তব্য করবেন কিন্তু। ভুল ত্রুটি হলে অবশ্যই ধরিয়ে দিবেন। আমি সংশোধন করার চেষ্টা করবো। হ্যাপি রিডিং।🫶
Share On:
TAGS: জান্নাত মুন, জাহানারা
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
জাহানারা পর্ব ১৯+২০
-
জাহানারা পর্ব ৪৮
-
জাহানারা পর্ব ২৩+২৪
-
জাহানারা পর্ব ৬১+৬২
-
জাহানারা পর্ব ৫১+৫২
-
জাহানারা পর্ব ৭১
-
জাহানারা পর্ব ৪
-
জাহানারা পর্ব ১
-
জাহানারা পর্ব ২৭+২৮
-
জাহানারা পর্ব ৪১+৪২