জাহানারা
জান্নাত_মুন
পর্ব :৭৫
🚫ক’পি করা নিষিদ্ধ
🔞 সতর্কবার্তা:
এই গল্পে অ’কথ্য ভাষা এবং স”হিং’সতার উপাদান রয়েছে। ১৮ বছরের কম বয়সী বা সং’বে’দনশীল পাঠকদের জন্য উপযুক্ত নয়। পাঠক নিজ দায়িত্বে পড়বেন।
নিগূঢ় দৃষ্টিতে নিজের বুকে লেপ্টে থাকা রমণীকে অবলোকন করতে করতে কখন যে দীর্ঘ রজনী পেরিয়ে ভোরের আলো ফুটে উঠেছে, তার বিন্দুমাত্র খেয়াল নেই মাফিয়া বসের। ক্লান্তহীন তার ধূসর বাদামী অক্ষিযুগল কেবল তার নীলাঞ্জনার শরতের মেঘের মতো শুভ্র ও পেলব অবয়বেই নিবদ্ধ, যেন অনন্তকাল এই নিষ্পাপ মুখশ্রীর পানে তাকিয়ে থাকলেও তাকে দেখার সাধ মিটবে না।
ঘুমের মধ্যেই আমি নড়েচড়ে উঠলাম। ইফানকে জড়িয়ে রাখা বাহুডোর আরও নিবিড় করে আরও তার অস্তিত্বে বিলীন হতে চাইলাম। ইফান যত্ন করে আমার দেহের উপর চাদরটি আরেকটু টেনে আমাকে ডেকে দিল। আমার মুখের উপর অবিন্যস্ত হয়ে পড়ে থাকা অবাধ্য অলকগুচ্ছগুলো সযত্নে আমার কানে গুঁজে দিল। তারপর আবারো আমার চেহারার পানে তাকিয়ে রইল। সেভাবেই আমাকে দেখতে দেখতে হালকা ঠোঁট বাঁকিয়ে আনমনে হাসল। আজ প্রথমবার তাঁর স্ত্রী তাকে নিজ থেকে তাঁর বুকে মাথা রেখে জড়িয়ে ধরে সারারাত ঘুমিয়েছে। ইফান আমার কপালে ঠোঁট ছুঁইয়ে দিল। অতঃপর যত্ন করে আমাকে বালিশে শুইয়ে দিয়ে বিছানা ত্যাগ করল।
আমার ঘুম ভাঙলো আরও অনেক্ক্ষণ পর। বাহুডোরে ইফানকে না পেয়ে পিটপিট করে চোখ মেলে তাকালাম। চোখ ঘুরিয়ে দেখলাম বিছানায় আমার পাশে নেই সে। ঘুমঘুম চোখ দু’টো কচলাতে কচলাতে উঠে বসলাম। এত সকালে লোকটা কোথায় থাকতে পারে তা আমার ভালো করেই জানা। আমি ধীরেসুস্থে বিছানা ছেড়ে জিম রুমের দিকে এগিয়ে গেলাম।
আস্তে করে দরজা খুলে ভেতরে তাকালাম। ইফানকে প্রথমে নজরে না পড়লেও পরক্ষণেই লক্ষ্য করলাম সে মেঝেতে কার্পেটের উপর বুকডন ব্যায়াম করছে। আমি চুপচাপ দাঁড়িয়ে দেখতে লাগলাম। লোকটার বেশ শক্তপোক্ত চওড়া বলিষ্ঠ দেহ। ঘাড়সহ পেশিবহুল বাহু জোড়ায় হিবিজিবি ট্যাটু আঁকা। লোকটার শরীর ঘামে জবজবে হয়ে গেছে। যা ফর্সা দেহে চিকচিক করছে। দেখতেও বেশ চমৎকার লাগছে। আমি নিঃশব্দে উঁকি দিয়ে ইফানের বাহুতে আমার ট্যাটুটি দেখতে চাইলাম। তক্ষুনি আচমকা ভেসে এলো পুরুষালি হাস্কি স্বর,
–“ভেতরে আস।”
হঠাৎ ইফানের কণ্ঠ শুনে খানিকটা ভরকে গেলেও বাইরে থেকে নিজেকে স্বাভাবিক রাখলাম। অতঃপর ধীর পায়ে ইফানের দিকে এগিয়ে গিয়ে রিনরিন কণ্ঠে শুধালাম,
–“কি করে বুঝলে আমি দাঁড়িয়ে ছিলাম?”
ইফান নিজের এক্সারসাইজ কন্টিনিউ করতে করতেই হাস্কি স্বরে প্রত্যুত্তরে বলল,“উমম, ইউর বডি স্মেল, বুলবুলি।”
আমি আমার পরনের লিডিস অভার সাইজ সফেদা রঙের শার্টটির কলার ধরে নাকের কাছে এনে জোরে শ্বাস টেনে গন্ধ নিলাম। মূহুর্তেই নাক কুঁচকে এলো। কারণ এখন আমার শরীর থেকে ইফানের বডির তীব্র মিষ্টি ঝাঁঝালো স্মেল আসছে। তাহলে আমার গন্ধ কই পেল! আমি কয়েক মূহুর্ত ইফানের দিকে তাকিয়ে রইলাম একনাগাড়ে। অতঃপর বিনা বাক্যে চুপচাপ ইফানের উন্মুক্ত পিঠে উঠে তাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলাম। আমার এহেন কান্ডে এক মূহুর্তের জন্য থমকে গেল ইফান। আমি তাঁর পিঠে মাথা রেখে চোখ বন্ধ করে নিলাম৷ ইফান নরম কণ্ঠে হিসহিসিয়ে ডেকে উঠল,
–“জান।”
–“উম!”
–“বুকে ব্যথা লাগবে তো।”
ইফানের কথায় আমি ওকে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরে রিনরিন কণ্ঠে শুধালাম, “আমায় একা রেখে চলে আসলে কেন?”
–“তুমি ঘুমাচ্ছিলে তো, তাই।”
–“তাই তুমি কেন চলে আসবে! এরপর থেকে আর আমাকে একা রেখে উঠবে না।”
আমি মেকি রাগ নিয়ে বললাম। আমার হঠাৎ বাচ্চাদের মতো আচরণেও ইফানের মধ্যে কোনো রুপ ভাবান্তর দেখা গেল না। বরং সে ঠোঁট কামড়ে মৃদু হেসে হাস্কিস্বরে শুধালো,
–“কেন?”
ইফানের প্রশ্নটা আমার কাছে কৌতুক শুনাল। আমি তৎক্ষনাৎ উত্তর করলাম না। ইফান আমার থেকে কোন সাড়াশব্দ না পেয়ে পুনরায় ব্যায়াম করায় মনযোগ দিল। আমি দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে ক্লান্ত কণ্ঠে বললাম,
–“সব ফাঁকা ফাঁকা লাগে। নিজেকে খুব একা মনে হয়।”
–“আমি আছি তো তোমার সাথে।”
আমি আবারও নড়েচড়ে ইফানকে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরলাম। তক্ষুনি ইফান হিসহিসিয়ে বলে উঠল,
–“ডোন্ট মুভ বুলবুলি, নেগেটিভ ফিল আসছে তো বেইব।”
ইফানের বাক্যটা কর্ণপাত হতেই আমি ঠোঁটে ঠোঁট টিপে নিঃশব্দে হাসলাম। লোকটা যে আমার মাইন্ড ঘুরানোর জন্য বাক্যটা বলল তা ভালোই বুঝতে পারছি। আমি কিছুক্ষণ চুপ থেকে হেঁয়ালি কণ্ঠে ফিসফিস করে বলে উঠলাম,
–“গতকাল রাতে যে তুমি গুড বয়ের মতো
আমার সাথে কিছু করবে না তা আমি কখনোই
আশা করি নি!”
বাক্যটা কোনো মতে আওড়েই ঠোঁটে ঠোঁট টিপে নিজের হাসি সংবরণ করতে লাগলাম। আমার বাক্যে ইফানের মধ্যে কোনো প্রকার ভাবান্তর কাজ করল না। বরং স্বাভাবিক কণ্ঠে বলে উঠল,
–“আমিও আশা করি নি!”
ভ্রু কুঁচকে শুধালাম, “কি?”
এবার ইফান ঠোঁট কামড়ে হেসে হাস্কিস্বরে হিসহিসিয়ে বলল,“তুমি যে আমার ঘুমের সুযোগ নিয়ে লুকিয়ে কিস করবে।”
ইফানের বাক্যটা কানে আসতেই বরফের ন্যায় জমে গেলাম। আচমকা গালে এসে হানা দিল জাফরানি রং। কি আশ্চর্য! আমার এসব কি ধরনের অনুভূতি হচ্ছে! আমি আর এক মূহুর্তও ইফানের কাছে থাকতে পারলাম না। ধীরে ধীরে উঠে জিম রুমে রাখা অত্যধুনিক ফ্রিজটির কাছে চলে গেলাম। এই ফ্রিজে সাধারণত ইফান ওয়াইন জাতীয় নে’শার দ্রব্য দিয়ে ভরে রাখে। কিন্তু আমি আসার পর থেকে ফ্রিজে আমার খাবারও ঠায় পায়। আমি ফ্রিজ খুলতেই লক্ষ্য করলাম একপাশে ওয়াইনের বোতল গুলো সাজানো, আরেক পাশে গতকাল রাতে আমার জন্য আনা আইসক্রিম আর চকলেটগুলো রাখা। আমি কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে একটা কর্নেট আইসক্রিম নিয়ে নিলাম। কাগজ ছাড়িয়ে এক কামুড় দিয়ে পিছনে ফিরতে নিলেই শক্তপোক্ত কিছুর সাথে ধাক্কা খেলাম। চোখমুখ কুঁচকে তাকাতেই দেখলাম ইফান এসে দাঁড়িয়েছে। আমি আড় চোখে এক পলক তাকিয়ে চোখ পিটপিট করে আইসক্রিম খেতে লাগলাম। ইফান এক পা এগিয়ে আসতেই আমি চটপট এক পা পিছিয়ে পড়লাম। ফলে ফ্রিজে গিয়ে পিঠ ঠেকল। ইফান ফ্রিজে এক হাত ঠেকিয়ে আমার উপর ঝুঁকে পড়ল। আমি আড় চোখে তাঁর দিকে তাকাতেই দেখলাম ঠোঁট বাকিয়ে হাসছে, যার কারণে বাম গালে ছোট্ট একটি গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। আমি চোখ নামিয়ে উসখুস করতে করতে আইসক্রিমে ছোট্ট করে আরেকটা কামড় দিলাম। ইফান হাস্কিস্বরে হিসহিসিয়ে বলে উঠলো,
–“ফিল করছিলাম তো তোমায়। তাহলে এভাবে চলে আসলে কেন?”
ইশশ! আজ এত লজ্জা লাগছে কেন আমার! সারা দেহে কেমন যেন একটা শিহরণ বয়ে যাচ্ছে। তলপেটে অসভ্য প্রজাপতিগুলো পাখা মেলে উড়তে আরম্ভ করেছে। ইফান আরেকটু ঝুঁকে পড়ল আমার উপর। আমি শুকনো কেশে পিটপিট করে চোখের পাতা নাড়িয়ে বলে উঠলাম,
–“খাবে?”
–“কোনটা?”
–“অসভ্য লোক।”
ইফান ঠোঁট কামড়ে হাসল। আমি নাক ছিটকে ইফানের দিকে আইসক্রিম এগিয়ে ধরলাম। ইফান এক নজর সেদিকে তাকিয়ে আমার দিকে দৃষ্টি স্থির করল। আমি অপ্রস্তুত হেসে জিহ্বা দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে বললাম,
–“মজা, ভালো আছে খেতে।”
–“ওকে, আই ওয়ানা টেস্ট ইট।”
ইফান আমার দিকে তাকিয়ে থেকেই হাস্কি স্বরে বলল। আমি আইসক্রিম এগিয়ে ধরতেই ইফান আমার চোখের দিকে তাকিয়ে থেকে তর্জনী আঙুলের সাহায্য আইসক্রিম তুলে নিয়ে আচমকা আমার গালে লাগিয়ে দিল। আমি হতবুদ্ধ নয়নে ইফানের চোখে চোখ রাখতেই পর পর আমার অপর গাল, কপাল, নাক, ঠোঁট এমনকি থুতনিতেও আইসক্রিম লাগিয়ে দিল। আমি ভ্রু কুঁচকে শুধালাম,
–“কি হলো এটা?”
ইফান উত্তর করল না। বরং এবার আরও বেশি ঝুঁকে পড়ল আমার উপর। আমি কিছু বুঝে ওঠার আগেই আমার গালে লেগে থাকা আইসক্রিম জিহ্বা দিয়ে চেটে খেয়ে নিতে লাগল। তবে তা খুব ধীরে ধীরে। যার ফলে আমার ভেতরের অস্থিরতা বেড়ে বুক ধুকপুক আওয়াজ করতে শুরু করে দিয়েছে। শরীর কেমন যেন অসার হয়ে আসছে। আমি নিজের এই অদ্ভুত অনুভূতিগুলোকে সামাল দিতে না পেরে শরীর ইফানের উপর ছেড়ে দিলাম। ইতোমধ্যে ইফান আমার ঠোঁট ব্যতিত সব জায়গায় লেগে থাকা আইসক্রিম জিহ্বা দিয়ে চেটে খেয়ে নিয়েছে। ইফান এক হাতে আমার কোমর জড়িয়ে ধরে আমার কানের কাছে হাস্কি স্বরে হিসহিসিয়ে বলে উঠল,
–“উমম, ইটস রিয়েলি অ্যামেইজিং অ্যান্ড টেস্টি। লুক অ্যাট মি বেইব, আই ওয়ানা টেস্ট ইট এগেইন।”
আমি চোখ বন্ধ করে রইলাম। ইফান তার বুক থেকে আমার মাথা তুলে আমার ঠোঁটের দিকে তাকাল। আইসক্রিম লেগে থাকা গোলাপি ওষ্ঠ জোড়া থিরথির করে মৃদু কাঁপছে। ইফান বাঁকা হেসে আমার ঠোঁটে নিজের সিগারেটে পোড়া খসখসে ব্রাউন ঠোঁট জোড়া সঁপে দিল। তারপর সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে চুম্বন গাঢ় হতে লাগল। একই সাথে ইফানের হাতের স্পর্শগুলোও এলোমেলো হয়ে উঠল। আমি আজ কোনো প্রকার বাঁধা দিলাম না। বরং চোখ বন্ধ করে দু’হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরলাম ইফানের গলা। গাঢ় চুম্বন আরও গাঢ় হয়ে উঠল। আজ বহুদিন পর আমাকে কাছে পেয়ে হয়তো বেসামাল হয়ে উঠেছে লোকটা। ক্ষণে ক্ষণে গাঢ় চুম্বন আঁকতে আঁকতে ওষ্ঠভাজে দাঁত বসিয়ে দিতে লাগল। আমিও অনুভব করতে লাগলাম স্বামীর দেওয়া মিষ্টি যন্ত্রণাটুকু। ব্যথায় জর্জরিত হয়ে উঠল ওষ্ঠাজোড়া। তবুও আমি বাঁধা দিলাম না। ইফান হঠাৎ নিজ কাজে থেমে গেল তার গালে এক ফোটা তপ্ত নোনাজল পড়ায়। চোখ খুলে তাকাতেই দেখল আমার ঘন কালো চোখের পাপড়িগুলো ভেজা। আমি অনুভব করলাম ইফান থেমে গেছে। ধীরে ধীরে চোখ খুলতেই ইফানের ধূসর বাদামী নয়ন জোড়ার সাথে দৃষ্টি মিলন ঘটলো। ইফান আমাকে ছেড়ে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। জিহ্বা দিয়ে নিজের ঠোঁটের আশেপাশের ভেজা তরলটুকু মুখের ভেতর নিয়ে গম্ভীর কণ্ঠে বলল,
–“ফ্রেশ হয়ে নাও। মেডিসিন নেওয়ার সময় হয়ে গেছে।”
আমি ইফানের দিকে একনাগাড়ে তাকিয়ে থেকে আচমকা ওর গলা জড়িয়ে ধরলাম। পায়ের আঙুলে ভর দিয়ে ইফানের ঠোঁটে ঠোঁট ছুঁইয়ে চুমু দিলাম। আমার কাজে ইফান থ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। ইফানের থেকে সাঁই না পেয়ে নিজেই সরে যেতে চাইলে ইফান আচমকা আমার কোমর ধরে কোলে তুলে নিয়ে পুনরায় গাঢ় চুম্বনে মত্ত হল। আমি তাঁর সঙ্গ পেতেই চোখ বুজে তাঁকে সাঁই দিতে লাগলাম। ইফান আমার চোখের দিকে তাকিয়ে। তাঁকে আবার থেমে যেতে দেখে চোখ খুলতেই ইফানের এমন অদ্ভুত চাহনিতে আমার সারাদেহ আড়ষ্ট হয়ে গেল। নিজের কাজের কথা মনে পড়তেই লজ্জার পাল্লা আরও বেড়ে গেল কয়েকগুণ। আমি চোখমুখ কুঁচকে নিলাম। আমার এমন অবস্থা দেখে ইফান ঠোঁট কামড়ে কিছুটা আওয়াজ করে হেসে দিল। আমি বাচ্চাদের মতো ঠোঁট উল্টে মৃদু আওয়াজ করে কেঁদে এক হাতে ইফানের বুকে থাপ্পড় মারতে লাগলাম। ইফান ঠোঁট কামড়ে হাসি সংবরণ করে হাস্কিস্বরে বলে উঠলো,
–“ইউ আর টু মাচ লিলিপুট, সুইটহার্ট। উফস!”
ইফানের কথা শুনে রাগ হলো ভীষণ। মোটেও আমি লিলিপুট না। বরং ইফান নিজেই ছয় ফুট উচ্চতার এক খাম্বা। আমি ইফানের বুকে ধুম করে আরেক থাপ্পড় বসিয়ে গাল ফুলিয়ে বললাম,
–“আমি লিলিপুট হলে তুমি কি? তুমি একটা লম্বু। ততুমি একটা উমম তুমি একটা বত্রিশ বছরের দামড়া সুগার ডেডি।”
বলেই খিলখিল করে হেসে হাতের আইসক্রিম খেতে লাগলাম। এতক্ষণে ইফানের চোয়াল শক্ত হয়ে আসল। দাঁতে দাঁত পিষে গম্ভীর কণ্ঠে বলে উঠলো,
–“এই শব্দ আরেকবার উচ্চারণ করলে তোমার খবর আছে বুলবুলি।”
–“সুগার ডেডি, সুগার ডেডি।”
আমি ইফানকে ভেঙচি দিয়ে আবারও বলে উচ্চস্বরে হেসে দিলাম। ইফান রাগে চোয়াল শক্ত করে আমার দিকে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ। তারপর বাঁকা হেসে একহাতে কপালে, চোখে পড়ে থাকা ঘামে ভেজা চুলগুলো পিছনে ঠেলে দিতে দিতে জিহ্বার ডগা দিয়ে গাল ঠেলে বাঁকা হেসে বলে উঠলো,
–“আমি যদি সুগার ডেডি হই তাহলে তুমি কি? তুমি, তুমি হচ্ছ বেঁটে মটু সাইজের ঝাঁঝে ভরা নাগা মরিচ। আমার ঝাঁঝওয়ালি, উফস!”
ইফান উচ্চস্বরে হেসে দিল। এদিকে রাগে আমি ফুঁসতে ফুঁসতে আরও কিছু বলতে যাব তার আগেই আবার আমার ওষ্ঠপুটে ডুব দিয়ে ওয়াশরুমের দিকে যাওয়া ধরল। এতেই আমার সব রাগ গলে সারা অঙ্গে অদ্ভুত সব অনুভূতিগুলো মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে লাগল।
ইফান বাথটবের উপর বসে আমাকে টেনে তার উরুর উপর বসাল। এদিকে সারা ওয়াশরুমে চোখ বুলাতেই কপাল কুঁচকে গেল আমার। সব জিনিসপত্রগুলোই ভিন্ন মনে হচ্ছে। আমি বাসায় ছিলাম না তাতেই এতো পরিবর্তন! আমার কপালে ভাজ দেখে ইফান আমার নাকে তর্জনী আঙুল ঘষে বলল,
–“আগের সব চেইঞ্জ করে নতুন সবকিছু দিয়ে সাজিয়েছি। পছন্দ হয়নি তোমার?”
–“পছন্দ হবে না কেন! এখনের জিনিসগুলো ভিন্ন মডেলের দেখছি। সুন্দর আছে।”
আমার কথা শুনতে শুনতেই ইফান আমার শার্টের প্রতিটি বোতাম যত্ন করে খুলে দেহ থেকে আস্তরণ সরিয়ে দিল। আমি চুপচাপ ওর গলা জড়িয়ে ধরে বসে রইলাম। ইফান আলতো হাতে আমার বুকের বেন্ডেজ খুলতে লাগল। ক্ষ’তস্থানে টান পড়তেই চোখমুখ কুঁচকে নিলাম। ইফান থেমে আমার দিকে তাকিয়ে নরম গলায় শুধাল,
–“লাগছে?”
–“তেমন না।”
–“লাগার তো কথা না। এতদিনে ইনজুরি শুকিয়ে যাওয়ার কথা।”
ইফান আরও সতর্কতার সাথে টেপটি খুলে নিল। ক্ষ’তস্থান প্রায় শুকিয়ে গেছে। ইফান পুনরায় ড্রেসিং করে ক্ষ’তস্থানটি পরিষ্কার করে দিল। অতঃপর যত্ন করে আমায় গোসল করিয়ে দিত লাগল। আমি ইফানের উরু থেকে নেমে ওর কোলে উঠে বসে তাকে জড়িয়ে ধরে ঠোঁটে চুমু খেলাম। ইফান কিছু বলল না। আমি আবার স্বভাবত শাওয়ার নেওয়ার সময় তিড়িংতিড়িং না করে থাকতে পারি না। এই নিয়ে ইফানের কাছে বেশ কয়েকবার লজ্জার সম্মুখীনও হয়েছি। তবুও এই বদ অভ্যস যায় না। আমি এই মূহুর্তে উঠে তিড়িংবিড়িং করতে না পেরে ইফানকেই বিভিন্নভাবে বিরক্ত করতে লাগলাম। ইফান একপর্যায়ে আমার কোমর টেনে তার দেহের সাথে মিশিয়ে আমার কানে চুমু খেয়ে হিসহিসিয়ে বলে উঠল,
–“তোমাকে আমার ভয় করে।”
এমন একটা রোমান্টিক মূহুর্তে ইফানের এহেন বাক্যে ভ্রু কুঁচকে গেল। আমি তাকে তৎক্ষনাৎ শুধালাম, “কেন?”
ইফান নিঃশব্দে হেসে হিসহিসিয়ে বলল,“বিকজ ইউ আর আ গুড অ্যাক্ট্রেস।”
বাক্যটা বুকের কোথাও একটা গিয়ে খুব জোরালোভাবে লাগল। আচমকা চোখজোড়া জলে টইটম্বুর হয়ে উঠল। আমার খুব কান্না পাচ্ছে। আমি নিজেকে সামলাতে কান্না গিলে ঠোঁটে ঠোঁট চেপে বসে রইলাম চোখ নিচু করে। ইফান অনুভব করল আমার বুক অস্বাভাবিকভাবে উঠানামা করছে। সে মুখ তুলে আমার দিকে তাকাতেই থমকে গেল। তাঁর কথায় কি আমি আ’ঘাত পেলাম! ভাবতেই ইফান ঢোক গিলে আমার গালে একহাত রেখে বলে উঠলো,
–“জান আ..”
–“আআমি অভিনয় করছি না।”
ইফানকে বলতে না দিয়ে খুব কষ্টে বাক্যটা আওড়াতেই চোখ থেকে টুপটুপ করে কয়েক ফোটা তপ্ত নোনাজল ইফানের হাতে পড়ল। কান্নার তোড়ে সারা দেহ কম্পিত হচ্ছে। আমি নিজের আবেগ নিয়ন্ত্রণ করতে পারছি না বিধায় উঠে যেতে নিলে ইফান কোমর জড়িয়ে ধরল। আমি সত্যিই কেঁদে দিলাম। আমি জানি না এইটুকু বিষয়ে কেন এতটা ভেঙে পড়ছি! শুধু কান্না আসছে। আমিও নিঃশব্দে কাঁদতে লাগালম। ইফান সত্যিই বুঝতে পারছে না কি থেকে কি হয়ে গেল! এবার সত্যিই রাত থেকে আমার অস্বাভাবিক আচরণ করা তাকে ভাবিয়ে তুলল।
এদিকে আমি কিছুতেই নিজেকে সংযত করতে পারছি না। যেন আমার চোখ দিয়ে বারিবর্ষণ নামছে। টপটপ করে চোখ বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়ছে। ফর্সা মুখশ্রী লাল বর্ণ ধারণ করেছে। ইফান দু’হাতে আমার চোখের পানি মুছতে মুছতে উদগ্রীব হয়ে বলে উঠলো,
–“এই মেয়ে কি হয়েছে তোর? আমি তো জাস্ট…”
ইফানকে বলতে না দিয়ে কাঁপা কাঁপা গলায় বলে উঠলাম,“আমার কেন একটা সংসার হলো না ইফান? আমিও তো আর পাঁচটা মেয়ের মতো স্বপ্ন দেখেছিলাম– আমার একটা ঘর হবে, বর হবে। আমি তাকে খুব ভালোবাসব। তাহলে কেন আমার ছোট ছোট স্বপ্নগুলো এলোমেলো হয়ে শেষ হয়ে গেল? কেন আমার সব আবেগ আজ কান্নায় পরিণত হলো? আমি আমার ভালোবাসা হারিয়েছি, আমার দুটো সন্তান হারিয়েছি। সবই তো হারিয়ে ফেলেছি। নিজেকে খুব শূন্য লাগে। নিঃস্ব আমি। বছরের পর বছর নিজের কষ্টগুলো আড়াল করে স্ট্রং সাজার অনেক অভিনয় করেছি। সত্যি এবার আমি ক্লান্ত। ভেতর থেকে ভাংচুর। আমি আর অভিনয় করতে পারছি না। আমি একটা স্বার্থপর, বাজে মেয়ে। বিনাদোষে নিজের স্বামীকে প্রতিনিয়ত যন্ত্রণা দিয়ে যাচ্ছি। আমার কঠিন শাস্তি হওয়া দরকার। আআমি আর বাঁচতে চাই ন..”
ইফান আমাকে আর কিছু বলতে না দিয়ে নিজের বুকের সাথে মিশিয়ে নিলো। এবার আমি আশকারা পেয়ে ডুকরে কান্নায় ভেঙে পড়লাম। ইফান কিছু বললো না। সে শুধু আমাকে জড়িয়ে ধরে মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে লাগল। তার নিস্তব্ধতাই যেন অনেককিছু বলে দিচ্ছে। যা আমার বুকের ভেতরের ক্ষত আরও গভীর করে তুলছে। আমি ইফানকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে তার ঘাড়ে মুখ ডুবিয়ে ডুকরে কাঁদতে কাঁদতে বলে উঠলাম,
–“ইফান, অতীত ভুলার কি কোনো ঔষধ নেই? কোনো যন্ত্র নেই? কোনো কি উপায় নেই? থাকলে আমাকে বলে দাও। আমি একটু মুক্তি চাই। এইটুকুই তো জীবন, একটু বাঁচি। আর নাহলে মরে যাই। আমার অন্ধকার যন্ত্রণাদায়ক অতীত যে আমাকে প্রতি মূহুর্ত তাড়া করে বেড়ায়। আমার অন্তর খুব বাজেভাবে পুড়ে। আমি যে সহ্য করতে পারি না সেই দহন। দম বন্ধ হয়ে আসে। বিশ্বাস কর, সচল মস্তিষ্কে এ জীবনে তাকে ভুলা অসম্ভব। আর তাকে মনে রেখে সুস্থভাবে বাঁচাও অসম্ভব। আমি বোধহয় এবার সত্যিই পাগল হয়ে যাব। তুমিই বলে দাও এখন আমি কি করব?”
ইফান কিছুই বলল না। শুধু চোখ বন্ধ করে আমাকে জড়িয়ে ধরে রাখল। আমি শুনতে পারছি তার অনিয়ন্ত্রিত হৃৎস্পন্দনের ধুকপুক আওয়াজ। আমার মতো কি তাঁরও অন্তর্দহন হচ্ছে? আমার মতো কি সেও ভালো নেই? মনে কত-শত প্রশ্ন জাগছে। যা আমাকে আরও কষ্ট দিচ্ছে।
আমি অনেকক্ষণ ইফানকে জড়িয়ে ধরে কাঁদলাম। তারপর কাঁদতে কাঁদতে ক্লান্ত হয়ে চুপ হয়ে গেলাম। ইফান এখনো নিঃশব্দে আমার মাথায় আদুরে পরশ বুলিয়ে যাচ্ছে। অতঃপর আমার কান্না পুরোপুরি থেমে যেতে দেখে সে বিনাবাক্যে আমাকে কোলে নিয়ে ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে গেল।
লিভিং রুমে একে একে সকলে উপস্থিত হচ্ছে। নাবিলা চৌধুরী আজ একটু সকালেই ঘুম থেকে উঠে পড়েছে মেয়ের জন্য। ইতিকে ফ্রেশ করে লিভিং রুমে এসে এখন সোফায় মেয়ের পাশে পায়ের উপর পা তুলে বসে মনযোগ দিয়ে ফোন টিপতে ব্যস্ত। ইতি মায়ের পাশে বসে মনযোগ দিয়ে স্যান্ডউইচ খাচ্ছে। অপরদিকে ডাইনিং টেবিলে বসে স্যান্ডউইচ খেতে খেতে আড় চোখে নাবিলা চৌধুরীকে দেখছে জুই। মহিলাটা রাগী থাকলেও দেখতে বেশ চমৎকার। তিনটি বড় বড় ছেলেমেয়ের মা হয়েও এই বয়সে নিজের সৌন্দর্য কিভাবে ধরে রাখল জুইয়ের জানতে খুব ইচ্ছে হচ্ছে। জুইয়ের আবোলতাবোল ভাবনার মধ্যেই আচমকা নাবিলা চৌধুরী জুইয়ের দিকে তাকিয়ে পড়ল। চোখাচোখি হতেই জুইয়ের অন্তরাত্মা কেঁপে উঠল যেন। জুই দৃষ্টি সরিয়ে বিড়বিড় করল,
–“ও বাবা গো! কেমনে তাকায়!”
–“গুড মর্নিং ডিয়ার।”
মেয়েলি কণ্ঠ শুনতেই পাশ ফিরে তাকাল জুই। মীরা হেসে জুইয়ের পাশে বসল। জুইও ঠোঁটে হাসি ঝুলিয়ে বলল,
–“গুড মর্নিং আপু।”
মীরা কিছু বলতে যাবে তার আগেই তার কানে অদ্ভুত এক আওয়াজ এসে ধাক্কা খেল। মীরা কপাল কুঞ্চিত করে ড্রয়িং রুমে চোখ ঘুরাতেই লক্ষ্য করে– ইতির পাশের সোফায় পা উপরে তুলে মাথা নিচের দিকে দিয়ে বুকের উপর স্যান্ডউইচের প্লেট রেখে নাক ডেকে ঘুমচ্ছে নোহা। নোহার বাচ্চাদের মতো কাজে মীরা ঠোঁট টিপে হাসল। তক্ষুনি নুলক চৌধুরী উপস্থিত হয়। মীরা মৃদু হেসে বলল,
–“গুড মর্নিং পিপি।”
–“গুড মর্নিং বাচ্চা।”
বড় বোনের গলার আওয়াজ পেয়ে নাবিলা চৌধুরী নুলক চৌধুরীকে ডেকে নিজের পাশে বসিয়ে বিজনেস নিয়ে আলোচনা শুরু করে দিল। মীরা ফোন টিপতে টিপতে হাঁক ছেড়ে ডাকল,
–“মম এক কাপ কফি দিয়ে যাও।”
কিছুক্ষণের মধ্যেই পলি কফি নিয়ে হাজির হলো। মীরাকে কফি দিয়ে বলল,“কাকিয়া তো এখনো নিচে নামেনি। কাকিয়ার কি শরীর খারাপ?”
পলির কথায় মীরা ফোন থেকে দৃষ্টি সরিয়ে পলির দিকে সুক্ষ্ম নজরে তাকিয়ে বলল,“মম নিচে নামেনি মানে!”
–“হ্যা তো। সকাল থেকে আমিই রান্নাঘর সামলাচ্ছি। অন্যদিন আমার আগেই কাকিয়া আর লতা ঘুম থেকে উঠে রান্নাঘরে হাজির হয়। কিন্তু আজ কারোর দেখা নেই।”
মীরা আশ্চর্য হয়ে বলল,“কি বলছ! মমের শরীর ঠিক আছে তো? আমাকেও আজ মেসেজ দেয়নি!”
পলি আর মীরার কথাবার্তা শুনে পিছন থেকে নাবিলা চৌধুরী শুধালো, “কি হয়েছে মীরা?”
মীরা পিছন ফিরে নাবিলা চৌধুরীর দিকে তাকিয়ে বলল,“বড় আম্মু, মম নাকি এখনো নিচে নামে নি।”
–“মনির আবার কি হলো!”
মীরা ঠোঁট কামড়ে এক মূহুর্ত ভেবে উঠে দাঁড়াল। পলি বলে উঠল,“আমি ভেবেছিলাম কাকিয়ার বোধহয় ঘুম ভাঙেনি। তাই আমি কাকিয়াকে বিরক্ত না করে কাজ করতে গিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লাম। তারপর আর গিয়ে কাকিয়াকে ডেকে আনার কথা মাথা থেকে বেড়িয়ে যায়।”
–“ইটস ওকে। আমি গিয়ে দেখে আসছি।”
মীরা চলে যেতেই রোকেয়া বেগম উপস্থিত হলেন। কদিন ধরে রোকেয়া বেগমের শরীরটা ভালো যাচ্ছে না। তাই বেশিরভাগ সময় নিজ ঘরেই বসে তসবি জপেন। নুলক চৌধুরী বসা থেকে উঠে এসে রোকেয়া বেগমকে সোফায় নিয়ে বসালেন।
মীরা মনিরা বেগমের রুমের সামনে এসে দরজায় শব্দ করে ডাকতে লাগল,“মম ঘুমাচ্ছ?”
উত্তর আসলো না। মীরা আরও কয়েকবার ডেকে দরজায় ধাক্কা দিতেই দরজা খুলে যায়। মীরা রুমে ডুকতেই লক্ষ্য করল পুরো রুম অন্ধকার হয়ে আছে। রুমের বেলকনি সহ কোনো জানালা খোলা না থাকায় বাইরের আলোবাতাস রুমে আসার কোনো সুযোগ নেই। মীরা রুমের লাইটের সুইচ অন করতেই সারা রুম আলোকিত হয়ে উঠল। মীরা বিছানার দিকে তাকাতেই দেখল তার মা বিছানার ওপাশ ফিরে ঘুমিয়ে আছে। মীরা দ্রুত পায়ে বিছানায় তার মায়ের পাশে বসে আস্তে করে ডেকে উঠল,
–“মম ঘুমাচ্ছ? অনেক বেলা হয়ে গিয়েছে তো। তোমার কি শরীর খারাপ?”
মনিরা বেগমের মধ্যে কোনো নড়চড় না দেখে মীরা পুনরায় ডেকে উঠল, “মা উঠে কিছু খেয়ে তারপর ঘুমাও।”
এবারো কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে মীরা মায়ের বাহুতে হাত রেখে বলতে লাগল,“মা শুনছ..”
বলতে গিয়েও থমকে গেল মীরার কণ্ঠস্বর। মেয়েটির চোখমুখে বিষ্ময় আর আতংকের ছাপ ফুটে উঠেছে। মায়ের বাহুতে রাখা হাতটি অযাচিত ভয়ে কাঁপছে। মীরা বুঝতে পারছে না তার মায়ের যে দেহে স্পর্শ করলে উষ্ণতা অনুভব হতো সেই দেহ আজ কেন বরফের মতো শীতল! মীরা শুকনো ঢোক গিলে কাঁপা কাঁপা হাতটা মনিরা বেগমের মুখের দিকে এগিয়ে নিতে নিতে রুদ্ধ হয়ে আসা কাতর কণ্ঠে ডেকে উঠল,
–“মা…”
বিছানার উপর চুপচাপ বসে আছি। ইফান দাঁড়িয়ে হেয়ার ড্রায়ারের সাহায্যে আমার ভেজা চুলগুলো শুকিয়ে দিচ্ছে। আমায় মনমরা হয়ে বসে থাকতে দেখে আদুরে কণ্ঠে শুধাল,
–“জান, খুদা লেগেছে?”
–“একটু।”
–“আচ্ছা চুলগুলো আঁচড়ানো হয়ে গেলেই খাবার নিয়ে আসব। কি খাবে তুমি?”
–“জানি না।”
ইফান দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে হেয়ার ড্রায়ার রেখে চিরুনির সাহায্যে আমার মাথার চুল যত্ন করে আঁচড়ে দিতে দিতে বলল,
–“লিসেন সুইটহার্ট, তুমি প্রোপার সুস্থ হওয়ার আগ অব্ধি কান্না করা নট এলাউড। ওকে! গলা বসে গেছে তোমার। নিশ্চয়ই কষ্ট হচ্ছে খুব!”
আমি কোনো উত্তর করলাম না। মুখ ভার করে বসে রইলাম। আরও ঘুমাতে ইচ্ছে হচ্ছে। ইফান খুব কোমলভাবে আমার মাথায় চিরুনি চালিয়ে যাচ্ছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই মাথার চুল আঁচড়ানোর কাজ শেষ করে আমাকে তার দিকে ফিরাল। আমার চোখমুখের বেহাল দশা দেখে আমার সারা মুখে আদুরে পরশ বুলিয়ে দিয়ে নরম কন্ঠে বলল,
–“আ’ম সরি।”
–“কেন?”
ইফান প্রত্যুত্তর করল না। আমি ওকে জড়িয়ে ধরলাম। ইফান কিছুক্ষণ স্থির দাঁড়িয়ে থেকে মেঝেতে এক হাঁটু গেড়ে আমার সামনে বসল। আমার কোমর ধরে তার কাছে টেনে কপালে ঠোঁট ছুঁইয়ে শব্দ করে চুমু খেল। আমি মৃদু হাসলাম। অতঃপর ওকে কাছে টেনে ওর কপালে ঠোঁট ছুঁইয়ে দিলাম। পর মূহুর্তে দুজনের দৃষ্টি বিনিময় হলো। তারপর দু’জনের সম্মতিতে ঠোঁটের দূরত্ব ঘুচিয়ে একে অপরের বেশ অনেকটা কাছে আসলাম। কিন্তু বেশিক্ষণ স্থায়িত্ব পায়নি। বাইরে থেকে কারো চিৎকার কানে আসতেই সরে গেলাম। আমি কপাল কুঁচকে শুধালাম,
–“বাইরে কি হলো?”
–“বুঝতে পারছি না। ওয়েট দেখে আসছি।”
ইফান গায়ে টিশার্ট জড়িয়ে দ্রুত বেরিয়ে গেল। এদিকে চিৎকার চেঁচামেচির আওয়াজ বেড়েই চলেছে। আমার কেমন অস্থির লাগছে। আমি রুমে একা একা বসে থাকতে পারলাম না। তাই ইফানের পিছনে রুম থেকে বেড়িয়ে গেলাম।
চৌধুরী বাড়িতে আজ যেন বিষাদের কালো ছায়া নেমে এসেছে। ইফান মনিরা বেগমের রুমের দরজার কাছে এসেই থমকে দাঁড়াল। পিছন থেকে আমি এসে ওর পাশ কাটিয়ে ভেতরে পা রাখতেই দম বন্ধ হয়ে আসার উপক্রম। বাড়ির প্রতিটি সদস্য উপস্থিত হয়েছে এখানে। সারা রুম সকলের কান্নার আওয়াজে বড্ড ভারী হয়ে উঠেছে। মায়ের নিথর দেহ বুকে জড়িয়ে ধরে চিৎকার করে কাঁদছে মীরা। নাবিলা চৌধুরী টলমল নয়নে তাকিয়ে আছে। হাউমাউ করে পলি, দাদি, ইতি, নোহা এমনকি জুইও কাঁদছে। চোখের সামনে কি হচ্ছে এসব! কাকিয়া আর নেই! আমার মাথা চক্কর দিতেই পড়ে যেতে নিলে ইফান দ্রুত নিজের বুকের সাথে চেপে ধরল। আমি দুর্বল শরীর নিয়ে ডুকরে কেঁদে উঠলাম। শরীর অস্বাভাবিকভাবে কাঁপছে। কানে মীরার আর্তনাদ ভেসে আসছে,
–“মা ও মা মা। ওঠ না মা। কেন করছ এমন? ও মা আমার কষ্ট হচ্ছে খুব। এটা তো কথা ছিল না মা। তাহলে কেন হলো? তুমি আমাকে ছেড়ে চলে যেতে পার না! ছোট থেকে আমায় দূরে সরিয়ে দিয়ে তোমার স্নেহ থেকে বঞ্চিত করেছ। এখন একটু তোমাকে কাছে পেলাম আর তুমি চলে গেলে। বিধাতার এ কেমন বিচার? এই পৃথিবীতে যে দুজনকে নিজের থেকে বেশি ভালোবাসলাম, সেই দু’জনকেই পৃথিবী থেকে নিষ্ঠুরভাবে কেঁড়ে নিল!”
মীরার প্রতিটি বাক্য সকলের কলিজায় গিয়ে বিঁধছে। নাবিলা চৌধুরী মনিরা বেগমের একটা হাত নিজের হাতের মুঠোতে নিতেই টপটপ করে চোখের পানি গড়িয়ে পড়ল। তিনি ভাঙা কণ্ঠে বলতে লাগলেন,
–“এই মনি কি হয়েছে তোর? কেন এত তাড়াতাড়ি আমাদের ছেড়ে চলে গেলি? আমার উপর কি তোর অভিমান হয়েছে? তুই তো আমার একমাত্র সঙ্গী ছিলি যাকে কিছু না বললেও আমার সব কষ্ট যন্ত্রণা বুঝে যেত। আমি অবহেলা করলেও আমার পাশ থেকে কখনো তুই চলে যাস নি। তুই না থাকলে এখন কে আমাকে বুঝবে রে? এই মনি কে করলো তোর এই অবস্থা? কার এতো রাগ ছিল তোর উপর? তোকে এত কষ্ট কেন দিল?”
নাবিলা চৌধুরীর শেষ বাক্য কানে আসতেই আমি ছুটে কাকিয়ার পাশে এসে বসতেই নজরে পড়ল উনার মুখে এখনো ফেনা লেগে আছে। একজন সুস্থ মানুষ রাতারাতি কি নিজ থেকে মেরে যাবে নাকি আশ্চর্য! আমি আরও কান্নায় ভেঙে পড়লাম,
–“কাকিয়া তুমি তো আমার মায়ের মতোন ছিলে। আমায় সবসময় আগলে রাখতে। কেন এভাবে আমাদের ছেড়ে চলে গেলে? অনেক কষ্ট হয়েছে তোমার তাই না? কাল রাতেও তো তুমি ঠিক ছিলে। তাহলে কি হয়ে গেল এটা? কে করল তোমার এই অবস্থা?”
ইফান দরজার সামনে দাঁড়িয়ে কাতর চোখে মনিরা বেগমের নীল হয়ে যাওয়া চেহারার পানে তাকিয়ে আছে। সে তো পাষাণ পাপিষ্ঠ পুরুষ। নিজ হাতে কতশত মানুষকে মে’রে ফেলেছে। তাই তো এখন বুকের ভেতর কষ্ট হলেও তা প্রকাশ করতে পারছে না। প্রকাশ পেলে তা যে বড্ড বেমানান দেখাবে।
আমি কাঁদতে কাঁদতে বমি করে দিব অবস্থা। ইফান আমাকে এক প্রকার জোর করে এখান থেকে নিয়ে গেল।
মনিরা বেগমের লা’শ ড্রয়িং রুমে এনে সাদা কাফনের কাপড় দিয়ে ঢেকে রাখা হয়েছে। ইফান তখন ফোন দিয়ে বাড়ির পুরুষদের খবর দিয়েছিল। মাহিন বাদে বাকি সকলে এসে উপস্থিত হয়েছে। ইরহাম চৌধুরী মনিরা বেগমের লা’শের পাশে শরীর ছেড়ে বসে আছে। রোকেয়া বেগম ছেলের পাশে বসে বিলাপ করছেন। ইকবাল চৌধুরী ইরহাম চৌধুরীকে ধরে সামলে যাচ্ছেন। আরেক পাশে বসে ইমরান বাচ্চাদের মতো কেঁদে যাচ্ছে। ইতি জ্ঞান হারিয়েছে কিছুক্ষণ আগে। নাবিলা চৌধুরী মেয়েকে সামলাতে ব্যস্ত। পলি আর নোহা কাঁদতে কাঁদতে ইতির মাথায় পানি ঢেলে যাচ্ছে। নুলক চৌধুরী মীরাকে জড়িয়ে ধরে বসে আছেন। মীরা আর কাঁদছে না। পাথরের মতো একদম চুপ হয়ে আছে। রোকেয়া বেগম উঠে এসে মীরাকে জড়িয়ে ধরে বিলাপ জুড়লেন,
–“বোনরে তোর মা তো আর নেই রে। একটু কান তুই। কানলে তোর বুকের কষ্ট একটু কমবে।”
–“আমার বুকের কষ্ট তো তখন কমবে যখন আমার মায়ের খু’নিকে নিজ হাতে খু’ন করব।”
মীরার বলা হিমশীতল বাক্যটা শুনেই এক মূহুর্তের জন্য থমকে গেলেন রোকেয়া বেগম। আতর্কিত হয়ে আড় চোখে নুলক চৌধুরীর দিকে তাকাতেই দুজনের চোখাচোখি হল। নুলক চৌধুরীর মধ্যে কোনো প্রকার ভাবান্তর হল না। তিনি চোখের পলক ফেললেন। রোকেয়া বেগম পুনরায় বিলাপ জুড়েছেন।
আমাকে ইফান রুমে আনতেই গড়গড়িয়ে বেশ কয়েকবার বমি করেছি। দুর্বল দেহ এখন নিজে সামলাতে পারছি না। ইফান আমাকে বিছানায় শুইয়ে দিত চাইল। আমি তার কোনো কথা শুনলাম না। বাধ্য হয়ে আমাকে নিয়ে আবার নিচে নামল। আজ বহু বছর পর আবারও আপনজন হারানোর সুখ জেঁকে ধরেছে। আমাকে নিয়ে ইফান নিচে নামতে না নামতেই সদরদরজায় কলিং বেল বেজে উঠল। সোফায় চুপচাপ বসে ছিল পঙ্কজ। সে গিয়ে দরজা খুলতেই বেশ অবাক হল। দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে সিআইডি সকল অফিসার। পঙ্কজ অপ্রস্তুত হয়ে জিজ্ঞেস করল,
–“আপনারা কি করে খবর পেলেন?”
পঙ্কজের কথার পিছে অফিসার হিমন বলে উঠলো, “সে কি কথা বলছেন মিস্টার? পুরো বাংলাদেশ খবর পেয়ে গেলো আর আপনারা পাননি?”
পঙ্কজ কিছু বুঝলো না। জিতু ভাইয়া সহ সকল অফিসার পঙ্কজকে উপেক্ষা করে ভেতরে পা রাখতেই এক প্রকার থমকে দাঁড়ায়। জিতু ভাইয়া তৎক্ষনাৎ প্রশ্ন করল,
–“কি হয়েছে এখানে?”
–“খু’ন?”
আমি তৎক্ষনাৎ প্রত্যুত্তর করলাম। জিতু ভাইয়া আশ্চর্য হয়ে আওড়াল,“হোয়াট!”
সকল সিআইডি অফিসার মনিরা বেগমের লা’শের কাছে আসল। অফিসার অরনা আর কণা লা’শের মুখ থেকে কাপড় সরাতেই আশ্চর্য হয়ে উঠল। কারণ মনিরা বেগমের চেহারা নীলচে হয়ে আছে। জিতু ভাইয়া জিজ্ঞেসাবাদ শুরু করে দিল তৎক্ষনাৎ,
–“উনাকে চৌধুরী বাড়িতে কে খু’ন করতে পারে? আপনাদের কি মনে হয়?”
ইকবাল চৌধুরী নিচু কণ্ঠে বলে উঠলেন,“এসব কি বলছেন অফিসার? আমাদের বাড়িতে এই কয়জন লোক। তাও আবার সকলেই নিজের। তাহলে কে খু’ন করতে যাবে?”
অফিসার আবির প্রশ্ন করল,“তাহলে বলতে চাইছেন বাড়ির কেউ হতে পারে না? তাহলে কি বাইরের থেকে কেউ এসে খু’ন করল?”
ইমরান কান্না থামিয়ে ভেজা কন্ঠে বলে উঠলো, “এসব কি বলছেন অফিসার? কাকিয়া ঘরোয়া মহিলা মানুষ। বাড়ির সকলের সাথেই উনার সম্পর্ক সবসময় ভালো। বরং বাড়ির সকলের সাথে সকলের সম্পর্ক ভালো। আর কাকিয়ার বাইরের শত্রু কিভাবে আসবে? উনার তো বাইরের কারো সাথে পরিচিতিই নেই।”
জিতু ভাইয়া একটু ভেবে বলে উঠলো,“তাহলে বলতে চাইছেন সু’ইসাইড কেইস?”
–“অসম্ভব! আমার স্ত্রী নিজে থেকে মরতে যাবে কেন?”
অফিসার কবির ইরহাম চৌধুরীর উদ্দেশ্য প্রশ্ন করল,“তাহলে বলতে চাইছেন খু’ন?
–“আমি সত্যি বুঝতে পারছি না কি থেকে কি হলো! আমার স্ত্রীকে কে খু’ন করবে? মনি এমন একজন মেয়ে ছিল যে সকলের মন জয় করে চলত। ওর শত্রু কি করে হবে?”
জিতু ভাইয়া আরও প্রশ্ন করতে যাবে তক্ষুনি আচমকা নজর পড়ে নাবিলা চৌধুরীর কোলে অচেতন ইতিকে। পলি আর নোহা পানি ঢালতে ব্যস্ত। জিতু ভাইয়া চোখ সরিয়ে পুনরায় প্রশ্ন করল, “রাতে কারো সাথে কি উনার কথা হয়েছে?”
–“আমার সাথে হয়েছে। বেশ অনেকটা সময় কথা হয়েছে। তারপর কাকিয়া আমার রুম থেকে বেরিয়ে যায়। তখন তো তিনি সুস্থ স্বাভাবিক ছিলেন।”
জিতু ভাইয়া আমার কাছে এগিয়ে আসল। বহুদিন পর নিজের অসুস্থ বোনকে দেখেও নিজের জায়গায় অটুট থেকে অফিসিয়ালভাবে কথাবার্তা বলছে। তিনি ইফানের দিকে এক নজর তাকিয়ে দৃষ্টি সরিয়ে আমাকে পুনরায় জিজ্ঞেস করল,“তাহলে বলতে চাইছেন তিনি নিজ রুমে যাওয়ার আগে আপনার সাথে ছিল?”
–“সেটা জানি না। তবে তিনি বলেছিলেন খাওয়া দাওয়া করে ঘুমিয়ে পড়বেন।”
জিতু ভাইয়া সকলের উদ্দেশ্য প্রশ্ন করল,“কেউ কি মনিরা বেগমকে গতকাল রাতে খাওয়া দাওয়া করতে দেখেছেন? কিংবা উনি ঘুমাতে যাওয়ার আগে কারো সাথে কথাবার্তা বলেছেন?”
রোকেয়া বেগম পরনের হিজাব দিয়ে চোখ মুছে বললেন,“রাতে ছোট বউকে আমি খাবার খেতে দেখেছিলাম বাবা। ঘরে পানি ছিল না। পরে ড্রয়িং রুমে এসে দেখি বউ খাবার খাচ্ছে।”
জিতু ভাইয়া রোকেয়া বেগমের দিকে এগিয়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করল,“তারপর কি হয়েছিল?”
–“বউ খাচ্ছিল দেখে লতা রান্নাঘর থেকে এসে আমাকে পানি দিয়ে যায়। তারপর আমি রুমে চলে আসি। আর তো কিছু বলতে পারব না।”
–“লতা কে?”
–“আমাদের বাসার কাজের মেয়ে।”
আমার কথা শুনে এদিকে তাকিয়ে জিতু ভাইয়া জিজ্ঞেস করলো, “তাহলে লতা কোথায়?”
আমি একবার চারদিকে চোখ ঘুরিয়ে দেখলাম, লতা কোথাও নেই। পলি বলে উঠলো, “লতাকে সকাল থেকে বাসায় দেখতে পাচ্ছি না।”
অফিসার অরনা জিজ্ঞেস করলো, “কেন দেখতে পারছেন না? উনি কোথায় আছেন?”
–“সেটা তো আমি জানি না। আজ রান্নাঘরে এসে দেখি লতা আর কাকিয়া কেউ নেই। তারপর খবর হয় কাকিয়া..”
পলি কান্নায় ভেঙে পড়ল। জিতু ভাইয়া সকল অফিসারদের উদ্দেশ্য করে বলল, “সকলে পুরো বাড়ি সার্চ কর।”
সকল অফিসার ছড়িয়ে ছিটিয়ে কাজে লেগে গেল। অফিসার অরনা হাঁক ছেড়ে ডেকে উঠল, “স্যার এদিকে আসেন।”
জিতু ভাইয়া এগিয়ে গিয়ে লা’শের পাশে বসল। অফিসার অরনা লা’শের ঘাড় দেখিয়ে বলল,“আই থিংক এখানেই ইনজেকশন পুশ করা হয়েছে।”
জিতু ভাইয়া হাতের গ্লাভস পড়ে সেই জায়গা দেখে মাথা নাড়িয়ে বলল, “হতে পারে।” তারপর বলল,“লাশ ফরেনসিক ক্লাবে পাঠানোর ব্যবস্থা কর।”
–“জি স্যার।”
অরনা তৎক্ষনাৎ ফোন করে কথা বলতে লাগল। অপরদিকে অফিসার কবির হাঁক ছেড়ে ডেকে উঠল। সকলে সেদিকে তাকাতেই কবির একটা ইনজেকশন দেওয়ার ফাঁকা সিরিঞ্জ নিয়ে এসে বলল,“স্যার এটা এদিকের ছোট রুমটিতে খুঁজে পেয়েছি?”
জিতু ভাইয়া হাতে নিয়ে সিরিঞ্জটি পর্যবেক্ষণ করে সকলের উদ্দেশ্য প্রশ্ন করল, “ঐ রুমটি কার।”
–“ঐটা তো লতার রুম।”
আমি অবাক হয়ে বলে উঠলাম। নাবিলা চৌধুরী এতক্ষণ চুপ থাকলেও এখন আশ্চর্য হয়ে আওড়ালো, “লতা!”
নুলক চৌধুরীও আশ্চর্য হয়ে বলে উঠলেন,“তার মানে লতা এটা করেছে?”
সিআইডি সকল অফিসার নিজেদের দিকে তাকিয়ে চোখাচোখি করল একবার। অতঃপর অফিসার আবির বলে উঠলো, “আপনাদের একটা নিউজ দেওয়া হয়নি। আজ সকালে রাস্তায় ট্রাক দূর্ঘটনায় আপনাদের বাসার কাজের মহিলা লতা নিহত হয়েছে। আর আমরা সেই খবর দিতেই এখানে এসেছিলাম।”
সকলেই চরম আশ্চর্য হয়ে গেলাম। জিতু ভাইয়া আবার বলে উঠলো, “আমরা লা’শের সাথে কিছু জিনিস পেয়েছি। কণা সকলকে দেখাও।”
কনা দ্রুত এভিডেন্স ব্যাগ সকলের সামনে ধরল। সেখানে অনেকগুলো গুলো গোল্ড এবং ডায়মন্ডের ভারী গহনা। নাবিলা চৌধুরী তৎক্ষনাৎ কণার কাছে আসল। গহনাগুলো ভালো করে দেখে বলে উঠলো, “এগুলো তো মনির জুয়েলারি।”
ইরহাম চৌধুরী অসার হয়ে আসা দেহ নিয়ে উঠে দাঁড়ালেন। এভিডেন্স ব্যাগটা টান মেরে নিজের হাতে নিয়ে হাউমাউ করে কেঁদে উঠে বলতে লাগলেন, “এগুলো তো আমার মনির গহনা। আমি নিজে দেশ বিদেশ থেকে ওর জন্য পছন্দ করে এনেছিলাম। আমার মনি…”
বিলাপ করে কাঁদতে কাঁদতে ইরহাম চৌধুরী মেঝেতে ধপ করে বসে পড়লেন। ইকবাল চৌধুরী ভাইকে একটু শান্ত হতে বলছে। জিতু ভাইয়া ভাবনায় পড়ল। অফিসার হিমন বলে উঠলো, “স্যার লতা মেয়েটা আবার মনিরা বেগমকে খু’ন করলো না তো! সকাল থেকে বাড়িতে নেই। তার ঘর থেকে ইনজেকশন সিরিঞ্জ খুঁজে পেলাম। আবার মনিরা বেগমের গহনাও লতার কাছে ছিল।”
অফিসার অরনা বলে উঠলো, “তাহলে কি মনিরা বেগমকে লতা খু’ন করে দামি গহনাগুলো চুরি করে পালাচ্ছিল। আর পালিয়ে যাওয়ার সময় রাস্তায় গাড়ি দূ’র্ঘটনায় নি’হত হয়।”
জিতু ভাইয়া কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলে উঠলো, “এখনই কোনো কিছুই বলা যায় না। এটাও হতে পারে আবার অন্যকিছুও হতে পারে। কণা রান্নাঘরের সব কিছুর সেম্পল নিয়ে ফরেনসিক ক্লাবে পাঠানোর ব্যবস্থ কর।”
জিতু ভাইয়া সকলের উদ্দেশ্য বলে উঠলো, “আপনাদের কি মনে হয়? লতা কি এই কাজ করতে পারে?”
পলি বলে উঠলো, “কিছুই বুঝতে পারছি না তো। লতার সাথে তো কাকিয়ার সবচেয়ে বেশি মিল ছিল। লতা এটা কি করে করলো?”
নুলক চৌধুরী বলে উঠলো, “কিছুই বলতে পারছি না অফিসার। তবে লতা মেয়েটা বহু বছর ধরে এ বাড়িতে কাজ করছে। মেয়েটার মনে যে এটা ছিল তা তো কেউ আন্দাজ করে নি কখনো!”
মীরা এখনো পাথরের মতো নুলক চৌধুরীর বুকে পড়ে আছে। আশেপাশে যে এত কিছু হচ্ছে তার কোনো কিছু কি মেয়েটার কানে পৌঁছাতে পারছে কি না কে জানে?
ইতোমধ্যে দুজন লোক লা’শ নিতে এসেছে। তক্ষুনি ফোনে কথা বলতে বলতে বাড়িতে প্রবেশ করল মাহিন। হঠাৎ চৌধুরী বাড়িতে সিআইডি অফিসারদের দেখে কপাল কুঁচকে নিল। ফোন রেখে জিজ্ঞেস করলো,
–“আপনারা?”
কেউ কিছু বললো না। ইরহাম চৌধুরী আওয়াজ করে কেঁদে উঠলেন। ভাইয়ের কণ্ঠ শুনে মীরা তৎক্ষনাৎ মাথা তুলল। মাহিন কিছু বুঝতে পারছে না কি হয়েছে। হঠাৎ মাহিনের নজরে পড়ে মেঝেতে সাদা কাপড়ে মোড়ানো কারো দেহ। মাহিন সকলের দিক থেকে দৃষ্টি সরিয়ে সিঁড়ির কাছে দাঁড়িয়ে থাকা ইফানের দিকে তাকাল। ইফান কোনো উত্তর দিতে না পেরে চোখ নিচু করে নিল। মাহিন জিজ্ঞেস করলো,
–“কি হয়েছে বাড়িতে?”
মীরা ছুটে গিয়ে ভাইয়ের বুকে হামলে পড়ে চিৎকার করে কান্নায় ভেঙে পড়ল। মীরা কাঁদছে! তার বোনের মতো সাহসী আর স্ট্রং মেয়ে কাঁদছে! ধক করে উঠল মাহিনের বুক। মীরা কান্নারত অবস্থায় আওড়ালো,
–“ভাই মা। আআমার মা।”
–“মা!”
কঠিন হৃদয়ের লোকটা মূহুর্তেই যেন দূর্বল হয়ে পড়ল। মাহিন চারদিকে চোখ ঘুরাল। তখন নজরে পড়ল জলে টইটম্বুর জুইয়ের চোখও। জুই মাহিনের চোখের দিকে বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকতে না পেরে মাথা নিচু করে ফুপিয়ে কেঁদে উঠে। মাহিন দেখল, সকলেই উপস্থিত। কিন্তু তার মা? মাহিন শক্ত করে নিজের বোনকে আগলে ধরল। ধীরে ধীরে মেঝেতে পড়ে থাকা লা’শের পাশে গিয়ে এক হাঁটু গেড়ে বসল। কাঁপা কাঁপা হাতে সাদা কাপড় সরাতেই ধপ করে মেঝেতে সম্পূর্ণ শরীর ছেড়ে দিল মাহিন। ইমরান নিজেকে সামলে বড় ভাইয়ের কাছে আসল। মাহিন তার মায়ের ঘুমন্ত চেহারায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে গলার স্বর নিচু করে ডেকে উঠল,
–“মা তুমি এখানে এভাবে ঘুমাচ্ছ কেন? রুমে যাও। তোমার কি শরীর খারাপ করছে?”
–“বাপরে তোর মা আর চোখ খুলবে না। তোর মা আমাদের ছেড়ে চলে গেলোরে বাপ।”
ইরহাম চৌধুরী ছেলেমেয়েকে আগলে ধরে বিলাপ করছেন। ইকবাল চৌধুরী, ইমরান, পঙ্কজ ইহরাম চৌধুরীকে টেনে সরিয়ে শান্তনা দিতে লাগল। মাহিন যেন কারো কথা শুনতে পারছে না। সে তার মতো করেই মায়ের সাথে কথা বলতে লাগল,
–“মা কি হয়েছে তোমার? আমি কিন্তু জানি তুমি আমাকে জোর করে বিয়ে করানোর জন্য নাটক করছ। ওহ্ মম প্লিজ! এধরনের ড্রামা আমার সাথে করো না। আমি কিন্তু একদম এসব পছন্দ করি না। মম উঠ।”
জিতু ভাইয়া অফিসারদের ইশারা করল ওদের সরাতে। অরনা আর কণা চেষ্টা করল মীরাকে সরাতে, কিন্তু পারল না। মাহিন অনেকবার ডেকেও মায়ের থেকে সাড়া না পেয়ে বিরক্ত হয়ে বলে উঠলো,
–“এবার কিন্তু বাড়াবাড়ি হয়ে যাচ্ছে। তুমি এসব কি শুরু করেছ মম? আমি কিন্তু অনেক রেগে যাচ্ছি। এখন দেশ ছাড়লে কিন্তু হাজারবার কেঁদেও আমায় কাছে পাবে না। মা উঠো।”
শেষ বাক্যটা ভীষণ ভারী শুনাল। মাহিন ক্লান্ত স্বরে ডেকে উঠল, “আচ্ছা যাও তোমার কথায় সব হবে। আমি বিয়ে করে তোমাকে বউমা এনে দিব। তুমি যে মেয়েকেই পছন্দ করবে আমি তাকেই বউ বানাব। সে না চাইলেও তুলে নিয়ে এসে তোমার বউমা বানাব। এবার হ্যাপি তুমি?”
মায়ের থেকে কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে মনিরা বেগমের হাত নিজের মুঠোয় নিতে চাইল, কিন্তু পারল না। এতক্ষণে মনিরা বেগমের দেহ পাথরের মতো শক্ত হয়ে গেছে। মাহিনের বুক খুব দ্রুত উঠানামা করছে। সে মায়ের বরফের মতো শীতল ঘুমন্ত চেহারা দু’হাতে আগলে ধরে ক্লান্ত কন্ঠে বলল,
–“উঠানা প্লিজ। আর কখনো তোমার অবাধ্য হব না। কথা দিচ্ছি, এখন থেকে তোমায় আমার কাছে রাখব। আমার কলিজার টুকরা, এবার তো কথা বল।”
মাহিনের চোখ থেকে টপটপ করে কয়েক ফোটা তপ্ত নোনাজল মনিরা বেগমের মুখের উপর পড়ল। ইফান এতক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকলেও আর পারল না। তপ্তশ্বাস আড়াল করে আমাকে ছেড়ে মাহিনের কাছে আসল। মাহিনের বাহু ধরে তুলতে চাইলে মাহিন কাতর দৃষ্টিতে ইফানের দিকে তাকিয়ে বলল,
–“ভাই মা কথা বলছে না দেখ…”
ইফান মাহিনকে বুকে জড়িয়ে ধরে পিঠে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে নিচু স্বরে বলল,“ছোটমা আর নেই।”
পাথরের মতো জমে গেল মাহিন। মনিরা বেগমের লা’শ তুলে নিয়ে চলে যাচ্ছে দুজন লোক। মীরা আটকাতে চাইলো। আমি আর পলি গিয়ে ওকে জড়িয়ে ধরলাম। অবশেষে মেয়েটা জ্ঞান হারাল তৎক্ষণাৎ। মাহিন কাতর দৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখতে লাগল, তার মায়ের লা’শ চৌধুরী বাড়ি থেকে চিরকালের জন্য বেরিয়ে যাচ্ছে। আর কোনোদিন তার মা তাকে বাবা বলে ডাকবে না। তাকে সংসার করার জন্য জোর করবে না। আর কোনোদিন তার মা একটা বউমা আনার জন্য তার কাছে আবদার করবে না।
ইনান কোথা থেকে সবে ছুটে এসে চৌধুরী বাড়ির চৌকাঠ মাড়াতেই পা থমকে গেল। মনিরা বেগমের লা’শ তার চোখের সামনে দিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। ইনানের দেহ অচল হয়ে খেই হারিয়ে দরজার সাথে ঠেকল। সেভাবেই জলে থৈথৈ নয়নে বাইরের দিকে তাকিয়ে রইল একনাগাড়ে।
সিআইডি লোকেরা মনিরা বেগমের লা’শ নিয়ে বেরিয়ে যেতেই চৌধুরী বাড়িতে হন্তদন্ত হয়ে একজন বোরকা পরা মহিলা আরেকজন সাদা পাঞ্জাবি পরহিত যুবক প্রবেশ করল।
চলবে,,,,,,,,
Share On:
TAGS: জান্নাত মুন, জাহানারা
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
জাহানারা পর্ব ৩১+৩২
-
জাহানারা পর্ব ৫১+৫২
-
জাহানারা পর্ব ৪৮
-
জাহানারা পর্ব ২৫+২৬
-
জাহানারা পর্ব ৫৫+৫৬
-
জাহানারা পর্ব ৪৫+৪৬
-
জাহানারা পর্ব ৯
-
জাহানারা পর্ব ৭৩
-
জাহানারা পর্ব ৭০
-
জাহানারা পর্ব ১