জাহানারা
জান্নাত_মুন
পর্ব :৬৯
🚫ক’পি করা নিষিদ্ধ
🔞 সতর্কবার্তা:
এই গল্পে অ’কথ্য ভাষা এবং স”হিং’সতার উপাদান রয়েছে। ১৮ বছরের কম বয়সী বা সং’বে’দনশীল পাঠকদের জন্য উপযুক্ত নয়। পাঠক নিজ দায়িত্বে পড়বেন।
প্যারিস শহরের মধ্যে অবস্থিত আইফেল টাওয়ার। এটি সুউচ্চতা বিশিষ্ট হওয়ায় শহরের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ। আজ সারাদিন ধরে প্যারিসে অনেক তুষারপাত হচ্ছে। তুলোর মতো শুভ্র সাদা বরফ কণাগুলো বিছিয়ে পড়ছে রাস্তাঘাট সহ সব জায়গায়। ফলে শহরের সৌন্দর্য আরও বাড়িয়ে তুলেছে।
হোস্টেল রুমের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে জায়ান। কাঁধে একটা কলেজ ব্যাগ। হাতে ধরে আছে লাগেজ। জায়ানের সামনে দাঁড়িয়ে আছে দুজন ছেলে। ছেলে দু’টো জায়ানের সাথে এই হোস্টেলে একই রুমে থাকত। তবে আজ হঠাৎ করে জায়ানকে তার সকল জিনিস ধরিয়ে দিয়ে রুম থেকে বের করে দিয়েছে। জায়ান সেই তখন থেকে রিকুয়েষ্ট করছে তাকে এখানে থাকতে দিতে। কিন্তু ছেলে দুটো কোনো কথায় শুনতে চায়ছে না। তাদের চেহারায় স্পষ্ট ভয়ের ছাপ। জায়ান শেষ বার অনুনয় করে বললো,
–“দেখ ভাই আজকের রাতটুকু আমাকে থাকতে দাও, আগামীকাল আমি এখান থেকে চলে যাব। আমার তো এখানে কোনো চেনাজানাও নেই। তাই এখন বের করে দিলে আমি কোথায় যাব?”
–“সরি ব্রো, আমাদের কিছু করার নেই। এখন তোমাকে বের না করে দিলে আমাদের বের করে দিবে। তারপর কপালেও শনি আছে। নিজের ক্ষতি জেনেশুনে কে করতে চায় ব্রো ? প্লিজ তুমি আসো।”
জায়ানের মুখের উপর ঠাস করে দরজা আটকে দিল। জায়ান তপ্ত শ্বাস ছাড়ল। সে ভালোই বুঝতে পারছে এগুলো কার কাজ। সেদিন ভার্সিটিতে তাকে মা’রতে পারে নি বলে এখন এভাবে বদলা নিচ্ছে। জায়ান উদাস চেহারা নিয়ে হোস্টেল থেকে বেরিয়ে পড়ল। তার জানা নেই এখন সে কোথায় যাবে। কার কাছে আশ্রয় নিবে।
প্রায় সন্ধ্যা হয়ে আসবে এমন সময় জায়ানকে বের করে দেওয়া হয়েছে। বাইরে প্রচুর তুষার পড়ছে। প্যারিসের প্রতিটি নিউজ চ্যানেলে বারবার সতর্ক বার্তা দেওয়া হচ্ছে বাসার বাইরে বের না হওয়ার। সকলে যেন নিরাপদ আশ্রয়ে অবস্থান করে।
অজানা পথে হাঁটতে হাঁটতে অনেকটা রাত হয়ে গেছে। সাথে ক্লান্ত হয়ে এসেছে জায়ানের দেহ। তুষারপাত আরও বেড়েছে। মনে হচ্ছে যেন বারিবর্ষণ হচ্ছে। জায়ান রাস্তার পাশেই বসে পড়ল। শ্যামলা স্নিগ্ধ সহজ সরল মুখাদল হয়ে উঠেছে ফ্যাকাসে। সাথে আরও গাঢ় হলো সরলতার ছাপ। ঠান্ডায় জমে যাওয়ার মতো অবস্থা তার। পরনের আস্তনটুকু কিছুতেই উষ্ণতা ছড়াতে পারছে না। বরং প্রায় ভিজে উঠেছে। হতাশা ক্লান্তি সব আজ জেঁকে ধরেছে জায়ানকে। জায়ান বুক পকেট থেকে একটা ছোট্ট ছবি বের করে আনল। ছবিতে একটা সাত বছরের বাচ্চা মেয়ে। টকটকে পিংক কালার গাউন পড়া। গোলাপি ওষ্ঠ জুড়ে এক বিস্তৃত হাসি। ফলে দু’গালে দুটো ক্ষুদ্র গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। যাকে টোল পড়া বলে। জায়ান ছবিতে আলতো হাত বুলিয়ে দিতে দিতে অস্ফুটস্বরে আওড়ালো,
–“জারা, আমার জানপাখি।”
মূহুর্তেই জায়ানের ঠোঁটে হাসির রেশ উদয় হলো। ফ্যাকাসে চেহারায় বড্ড করুন দেখালো সেই হাসি। এই হাসি কেউ দেখলে নিশ্চিত মায়ায় পড়তো ছেলেটার। ফ্রান্স আসার পর থেকে একবারও দেশে কারো সাথে কথা হয় নি। এমনকি অভিমানে বাড়ির কারো কল ধরছে না। জিতু কলে জায়ানকে না পেয়ে টেক্সট করতে থাকে। জায়ান একটা রিপ্লাই দিয়েছিলো,
— “আমার পাখি কেমন আছে ?”
জিতু রিপ্লাই করেছিলো, “তোমার জন্য অনেক কাঁদে।”
এই টেক্সট দেখার পর আর কোনো মেসেজ সিন করে নি। জায়ান ছবিটার দিখে বেশ কয়েক মূহুর্ত তাকিয়ে থাকে। অতঃপর দীর্ঘ শ্বাস ছাড়ে। বিরবির করে আওড়ায়,
–“তোর জান ভাইয়ের কিছু হয়ে গেলে তোর কি খুব কষ্ট হবে পাখি?”
ছবি থেকে কোনো উত্তর আসে না। জায়ান আলতো হাতে ছবির উপর থেকে তুষার কণাগুলো মুছে দিলো। অতঃপর যত্ন করে আবারো সংগোপনে ছবিটা বুক পকেটে রেখে দিল।
অতি তুষারপাত হওয়ায় বরফ দিয়ে রাস্তা ঢাকা পড়েছে। ফলে বেশ কিছু গাড়ি রাস্তায় আটকে আছে অনেক্ক্ষণ ধরে। রাস্তার একপাশে একটি কালো মার্সিডিজ দাঁড়িয়ে আছে। গাড়িটির উপর ভালোই তুষারের আস্তর পড়েছে। দু’জন কালো পোশাকধারী গার্ড দ্রুত হাতে গাড়ি থেকে তুষার কণাগুলো সরাতে ব্যস্ত। তখনই গাড়ির ভেতর থেকে গমগমে পুরুষালি গম্ভীর কন্ঠ ভেসে আসে,
–“আর কতক্ষণ অপেক্ষা করতে হবে গাধার দল?”
একটা গার্ড দৌড়ে এসে গাড়ির জানালার গ্লাসের সামনে দাঁড়িয়ে বলল, “জি বস হয়ে গেছে।”
আস্তে আস্তে গ্লাস নেমে যেতেই স্ট্রিট লাইটের আলোয় দৃশ্যমান হয় ইফান চৌধুরীর শক্ত চেহারা। গার্ডটি বুঝতে পারলো বস কতটুকু পরিমাণ রেগে আছে। তাই ইফান কিছু বলার আগেই সহসা বলে উঠলো,
–“বস হয়ে গেছে। আপনি এক্ষুনি যেতে পারবেন।”
ইফান দাঁতে দাঁত পিষে বললো, “আমাকে যেন এবার নামতে না হয়। না হলে..”
–“এমন কিছু হবে না বস।”
ইফানকে বাক্য সম্পন্ন করতে না দিয়ে তৎক্ষনাৎ গার্ডটি বলে উঠলো। ইফান বিরবির করে অশ্রা’ব্য ভাষায় গা’লিগালাজ করতে করতে মুখ ফিরিয়ে নিল। অতঃপর হাতে ধরে রাখা সিগারেটের শলাকাটি ব্রাউন ঠোঁটের ফাঁক ধরে সুখটান দিল। তারপর মুখ ভর্তি ধোঁয়া কুন্ডলী ছেড়ে দিল।
–“বস হয়ে গেছে।”
গার্ড কথাটা বলতেই ইফান জানালার গ্লাস তুলতে নিলে হঠাৎই নজর আটকায় রাস্তার ঠিক বিপরীত পাশে। রাস্তার পাশে কেউ একজন হাঁটুতে দু’হাত ঠেকিয়ে মাথা নিচু করে বসে আছে। তুলোর মতো শুভ্র তুষার কথাগুলো অবেলায় লোকটার দেহে পড়ে আবার গলে যাচ্ছে। আথচ লোকটার কোন ভ্রুক্ষেপ নেই। কি অদ্ভুত বিষয়! ইফান ধরে নিল লোকটা প্রেমে ছ্যাঁকা খেয়ে এখন দেবদাস সেজেছে। কথাটা ভেবেই ব্যঙ্গাত্মক ঠোঁট বাঁকালো ইফান। অতঃপর তাচ্ছিল্য করে অশ্রা’ব্য ভাষায় লোকটাকে গা’লি দিল,
–“দ্য কাউয়ার্ড, ফা’কিং ইডিয়ট ?”
সিগারেটে টান দিতে দিতে হাসলো ইফান। ইতোমধ্যে ড্রাইভার গাড়ি স্টার্ট দিল। তক্ষুনি ইফানের চোখে ভাসলো করুন ফ্যাকাসে হয়ে যাওয়া অতি সরল মুখ। জায়ান মাথা তুলে জুড়ে জুড়ে শ্বাস টানছে। এতো ঠান্ডা পরিবেশে দীর্ঘ সময় বসে থাকায় শ্বাসকষ্ট শুরু হয়েছে। ইফান লক্ষ করে জায়ান এতো জুড়ে জুড়ে শ্বাস টানছে যে কুয়াশার মতো মুখ দিয়ে ধোঁয়া নির্গত হচ্ছে।
–“স্টপ দ্য কার, ইডিয়ট।”
বসের আদেশ শুনতে পেয়েই তৎক্ষনাৎ ব্রেক কষলো ড্রাইভার। ইফান হাতে একটা ছাতা নিয়ে নেমে পড়লো গাড়ি থেকে। তারপর জায়ানের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। জায়ান নিচের দিকে তাকিয়ে বুকে হাত ধরে শ্বাস টানছে। তক্ষুনি চোখের সামনে উদয় হলো এক জোড়া কালো কুচকুচে চামড়ার বুট পরে থাকা দুটো পা। জায়ান চমকে উঠলাম। উপরের দিকে তাকাতেই লক্ষ করলো এক বিশালদেহী ইয়াং ম্যান দাঁড়িয়ে আছে মাথার উপর ছাতা ধরে। দেহে লং কোট জড়ানো। মুখে কালো মাস্ক। লম্বা কালো কুচকুচে কিছু চুল কপাল, চোখে পড়ে আছে অবেলায়। অতি সুদর্শন লোকটা। সম্পূর্ণ চেহারা না জানি কত সুন্দর! জায়ানের মনে একটা ওয়ার্ডই আসলো “আলফা ম্যান”। লোকটার ধূসর বাদামী অক্ষিযোগলের পানে তাকাতেই জায়ান তৎক্ষনাৎ চিনে ফেললো কে হতে পারে।
–“আপনি এখানে?”
জায়ানের প্রশ্নে বিরক্তবোধ করলো ইফান। ফলে কপালে সুক্ষ্ম কয়টা ভাজের সৃষ্টি হয়। ইফান ভারিক্কি কন্ঠে পাল্টা প্রশ্ন করে,
–“আর য়্যু ম্যাড?”
–“মানে?”
–“তোমার কোনো সেন্স নেই, এই স্নো ফলের মধ্যে মাঝ রাস্তায় বসে আছ ?”
উত্তর করলো না জায়ান। অবজ্ঞা করলো ইফানকে? ভাবতেই ইফানের মস্তিষ্ক ক্রোধে ফেটে পড়লো। কত বড় স্পর্ধা হলে মাফিয়া বস ইফান চৌধুরীকে ইগনোর করে। ইফান এক হাত মুষ্টিবদ্ধ করে দাঁতে দাঁত পিষে। অতঃপর নিজের রাগকে দমন করে পুনরায় শুধায়,
–“বাসা কোথায় তোমার?”
ফের উত্তর করলো না জায়ান। মাথা নিচু করে আগের ন্যায় বসে রইল। এবার নিজের রাগ দমন করতে পারলো না ইফান। তৎক্ষনাৎ জায়ানকে অশ্রা’ব্য ভাষায় ধমকে উঠলো,
–“য়্যু বা’স্টার্ড, শোইং মি ফা’কিং অ্যাটিটিউড?”
ইফানের অকথ্য ভাষা শুনে নাক ছিটকে মুখ উপরে তুললো জায়ান। বিরক্তি প্রকাশ করে বলে উঠলো,
–“অভদ্রের মতো সবসময় গা’লিগালাজ করেন কেন?”
জায়ানের বোকা প্রশ্ন শুনে মাস্কের আড়ালে ঠোঁট বাঁকালো ইফান। হাতের সাহায্যে সামনের চুলগুলো পিছনে ঠেলে দিতে দিতে হাস্কি স্বরে বলে উঠলো,
–“আ’ম আ জেন্টলম্যান, হু টোল্ড ইউ দ্যাট ?”
ইফানের বাক্যটা জায়ানের কাছে কৌতুক শুনাল। কি উত্তর করবে বুঝতে না পেরে ইফানের দিকে বোকা চেহারা করে তাকিয়ে রইল। ইফান জায়ানের এমন চাহনি দেখে পুনরায় নিজ চিত্তে ফিরে এসে গম্ভীর কণ্ঠে ফের শুধালো,
–“কোথায় থাক তুমি?”
ইফানের প্রশ্ন কানে যেতেই জায়ানের হুঁশ ফিরলো। সে পুনরায় মাথা নিচু করে নিলো। ইফান চোয়াল দ্বিগুণ শক্ত করে আওড়ালো,
–“ইডিয়ট টেল মি, আই’ল গেট য়্যু হোম।”
–“নেই।”
–“হোয়াট!”
জায়ানের কথায় আশ্চর্য হলো ইফান। মূহুর্তেই রাগে দাঁতে দাঁত পিষলো। সেভাবেই চাপা স্বরে হিসহিসিয়ে বললো,
–“আর য়্যু কিডিং মি বা’স্টার্ড? বাট আই ডোন্ট লাইক ইট।”
জায়ান মুখ তুলে তাকালো এবার। জিহ্বা দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে বলল,”আমি আপনাকে চিনি না। তবে যতদূর ধারণা করতে পারি তাতে মনে হচ্ছে আপনি একজন আলফা ম্যান। বাট আমি অতি সাধারণ। দেশ থেকে যা টাকাপয়সা নিয়ে এসেছিলাম সব আপাতত শেষ। বাসায় যোগাযোগ না থাকায় টাকাও হাতে পাচ্ছি না। তাই বাসা থেকে বেরিয়ে আসার পর নতুন বাসা ম্যানেজ করতে পারি নি। আমাকে সাহায্য করতে চাওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ। আপনি যেতে পারেন।”
জায়ানের কথায় প্রথমে নমনীয় হলেও শেষ বাক্যটা ইফানের পছন্দ হলো না। সহসা বিরক্তি প্রকাশ করে বলল,
–“ফা’ক অফ দিস।”
জায়ানের এবার রাগ হলো ইফানের প্রতি। এই লোক এত অ’শ্লীল ভাষায় সবসময় গা’লিগালাজ করে কেন? প্রতিটি বাক্যেই একটা না একটা অ’শ্লীল শব্দ থাকেই। জায়ানের ভাবনার মাঝেই ইফান বলে উঠলো,
–“গাড়িতে উঠো।”
–“মানে?”
–“ইডিয়ট গাড়িতে উঠতে বলছি।”
জায়ান ইফানের ভাষা যেন বুঝতে পারছে না। কোন গাড়িতে উঠবে সে? কেনই বা গাড়িতে উঠবে? ইফান আর বাক্য বিনিময় করলো না। জায়ানের বাহু ধরে গাড়িতে উঠিয়ে দিলো। জায়ান ইফানের কাজে কিছুটা ঘাবড়ে গেল। অতঃপর গাড়ি চলতে শুরু করে। জায়ান কৃতজ্ঞতা জানাতে বলে উঠে,
–“থ্যাংক ইউ।”
ইফান ভ্রু নাচিয়ে শুধালো,”হুয়াই?”
–“আজকে আমাকে সাহায্য করার জন্য।”
জায়ানের কথায় ইফান বাঁকা হাসলো। অতঃপর জিহ্বার ডগা দিয়ে গাল ঠেলে হিসহিসিয়ে বললো,”ইফান চৌধুরী বিনিময় ছাড়া কিছু করে না। একদিন না একদিন আমার পাওনা ঠিকই আদায় করে নিব।”
ইফান সচরাচর তার পেন্ট হাউজে থাকে তার গ্যাং মেম্বারদের সাথে। তবে পরিস্থিতি শীতল থাকলে একা একা তার পার্সোনাল ব্ল্যাক হাউজে সময় কাঁটায়। সেদিন জায়ানকে ইফান তার পার্সোনাল ব্ল্যাক হাউজে নিয়ে যায়। রাতে জায়ানের শরীর অনেক খারাপ করে। জ্বরে গা পুড়ে যাচ্ছিল। জায়ানের শ্বাসকষ্টও দেখা দিয়েছিল। ইফানের পার্সোনাল ডক্টর জায়ানকে দেখে যাওয়ার পর সারারাত ইফান জায়ানের সেবা করে। সেদিন ইফান নিজের উপর বড্ড আশ্চর্য হয়। সে একজন অচেনা লোকের জন্য এত দয়া দেখাচ্ছে কেন? সে তো ভালো মানুষ না। বরং সে জা’নো’য়ারের মতোই নি’কৃষ্ট। দয়ামায়া তার ডিকশনারিতে নেই । তাহলে কিসের এত দায় যে অচেনা লোকটাকে তার সেবা করতে হবে?
লোকে বলে,”জীবনের প্রথম কারো থেকে একটু সহানুভূতি কিংবা যত্ন পেলে জানোয়ারেরও অনুভূতি তৈরি হয় ।” আর সেখান থেকে ইফান তো একজন র’ক্তে মাংসে গড়া মানুষ। তার জীবনটাই তো গেলো অবহেলা আর অবজ্ঞায়। তার যতদূর স্মৃতিচারণ ঘটে সবটাতেই সে দেখতে পায় ফেলে আসা বীভৎস অতীত। অন্ধকার আর হাহাকারে বিভীষিকাময় জীবন। কেউ তাকে এক বিন্দু সহানুভূতি দেখায় নি। কেউ একটু মিষ্টি করে কথা বলে নি। তার জীবনে তিক্ততা ছাড়া কিছুইতো ছিল না।
সেদিন রাত পেরোলে জায়ান কিছুটা সুস্থ অনুভব করে। তবে নিউজে যা দেখে তাতে তার অসুস্থতা আবারও বেড়ে যায়। নিউজের হেডলাইন ছিল,”ভার্সিটি পড়ুয়া পাঁচজন যুবককে মে’রে বিধ্ব’স্ত ম’রদেহ সকলের নিজ বাসায় পাঠিয়ে দিয়েছি দু’র্বৃত্তরা।”
জায়ানের গলা সেদিন শুকিয়ে আসছিল। কারণ পাঁচজন ছেলের মধ্যে দুইজনই ছিলো তার রুমমেট। আর তিনজন ছিল তাকে ভার্সিটিতে বিরক্ত করা প্রভাবশালী তিনজন ছেলে।
সারাদিন পর বিকেলে ইফান বাসায় আসে। ঘুম থেকে উঠার পর জায়ান ইফানকে দেখতে পায় নি। ইফান এসে জায়ানকে আড় চোখে একবার দেখে বিছানায় গা ছেড়ে দেয়। জায়ান নাক ছিটকায় ইফানের এমন কাজে। ইফান বাসার বাহির থেকে এসে ফ্রেশ না হয়েই জুতো সহ বেডে শরীর ছেড়ে দিয়েছে। জায়ান গলা খাঁকারি দিয়ে বলল,
–“কোথায় ছিলেন আপনি?”
আচমকা চোখ খুলে জায়ানের দিকে খড়া চোখে তাকালো ইফান। জায়ান ভরকে গিয়ে সহাস্যে বলে উঠলো,
–“না মানে সকাল থেকে আপনাকে দেখি নি তো তাই।”
ইফান বাঁকা হেসে হাই তুলতে তুলতে বললো,”ইম্পরট্যান্ট কাজ ছিলো বুঝেছ। বাই দ্য ওয়ে, নাউ আ’ম টায়ার্ড। সো আমার রেস্টের প্রয়োজন।”
–“কুক করা আছে। নিয়ে আসব?”
–“নোপ। ম’রা বাড়ি থেকে কঠিন ভূরিভোজ করে এসেছি।”
জায়ান বোকার মতো ইফানের দিকে তাকিয়ে রইল। ইফান জায়ানের অবুঝ চেহারা দেখে ক্রোর হাসল। শেষ রাতে জায়ানের জ্বর কমলে ইফান বেড়িয়ে যায়। অতঃপর জায়ানের দুজন রুমমেট আর ভার্সিটির তিনজন ছেলেকে মে’রে সকলের বাসায় লা’শগুলো কফিনে করে পাঠিয়ে দেয়। তারপর সকলের বাসায় ফুলের তোড়া নিয়ে গিয়ে ক্লাসমেটদের জন্য সকলের সাথে সেও দুঃখ প্রকাশ করে। অতঃপর অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার কাজ সম্পূর্ণ হলে ভূরিভোজন করে।
–“আমাকে বিপদের সময় আশ্রয় দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ। আজ তাহলে আসছি। আমার থেকে কোনো প্রয়োজন হলে জানাবেন। আমি আপনাকে যথাসাধ্য সাহায্য করতে চেষ্টা করবো।”
সেদিন ইফান জায়ানকে যেতে দিলে হয়তো গল্পটা অন্য রকম হতো। কিন্তু সেদিন ইফান যেতে দেয় নি। বরং নিজের একাকিত্বে সঙ্গী হিসিবে রাখার জন্য জায়ানকে এটা ওটা বুঝিয়ে তার কাছে রেখে দেয়। দিন যায়, রাত যায়। মায়া, টান অনুভূতি বাড়তেই থাকে। ইফানের জীবনে প্রথম বন্ধু হয়। জায়ান শুধু বন্ধুই ছিল না। যেন তার কলিজা। জায়ানও ঠিক ততটাই ইফানকে ভালোবাসতো। কদিন ঠিক থাকলেও ধীরে ধীরে জায়ান লক্ষ করে ইফান যা দেখায় তা না। তার চলাফেরা, দিনের পর দিন বাসায় না ফেরা; আবার হঠাৎ করে রাতে রুমে ইফানকে খুঁজে না পেয়ে জায়ানের কৌতুহল বাড়তেই থাকে। তাছাড়া কেউ জায়ানের সাথে ক্লোজ হতে চাইলে কিংবা বন্ধুত্ব করতে চাইলে পরদিন লা’শ পাওয়া যেতো। এমন আরও অদ্ভুত সব ঘটনা ঘটতে থাকে দিনের পর দিন।
একবার জায়ানকে ভার্সিটির একটা মেয়ে সরাসরি সবার সামনে প্রপোজ করে বসে। আর সেদিনই ঘটে অঘটন। জায়ান নিজের চোখে দেখে ইফান মেয়েটার মাথায় পরপর গুলি চালিয়ে হ’ত্যা করে। জায়ানের পায়ের তলার মাটি যেন সরে যায় তখন। তারপর জানতে পারে ইফান অনেক বড় মোস্ট ওয়ান্টেড ক্রিমিনাল। আমেরিকার মতো শক্তিশালী দেশও ইফানকে ধরতে পারে না। সে অতি দুর্ধর্ষ এবং ধূর্ত। জায়ান ছিল ন্যায় আদর্শে বড় হওয়া সাধারণ মানুষ। আর ইফান উগ্র, পাপিষ্ঠ পুরুষ। সরে আসতে চায় জায়ান। কিন্তু ইফানের বন্ধুত্ব তার সৎ আদর্শের কাছে বড্ড ফিঁকে ছিলো। বরং সময়ের সাথে ইফানের প্রতি মায়ার টান বাড়তেই থাকে। জায়ান ইফানকে পলক কাইসারের মতো আদর করে ভি নামে ডাকে। ইফান কখনোই সহ্য করতে পারতো না জায়ানকে অন্য কারো সাথে। জায়ান বুঝতে পারে ইফানের নিঃসঙ্গ জীবনে তার ভূমিকা। সেও ইফানের যে বিষয় ভালো লাগে না তা এড়িয়ে চলে।
তারপর একদিনের কথা– জায়ান ভার্সিটিতে চলে যায়। সেদিন ইফান বাড়িতেই ছিল। একা সময় কাটাচ্ছিল ওয়াইন আর ড্রা’গস নিয়ে। হঠাৎ রুম কাঁপিয়ে ফোন বেজে উঠে। ইফান বড্ড বিরক্ত হয়। ঘাড় ঘুরিয়ে দেখে বালিশের পাশে জায়ানের ফোন বাজছে। ইফান বিরবির করে অ’শ্লীল কয়েকটা গা’লি ছুড়ে। অতঃপর ফোন বেজে কেটে যায়। ইফান মনের সুখে আবারো ড্রিংক করতে থাকে। কিছুক্ষণের মধ্যে আবার ফোন বেজে উঠে। এবার নেশায় বোধ হয়ে থাকা ইফানের মস্তিষ্ক রাগে টগবগ করে ফুটতে থাকে। হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে নাকে ঘষে হেলেদুলে বেডের কাছে যায়। ফোন তুলে চোখের সামনে ধরতেই রাগের পাল্লা আকাশচুম্বী রুপ নেয়। ফোনে সেইভ করে রাখা “জারাপাখি” নামটা দেখে ইফানের হাত থরথর করে কাঁপতে লাগল। তারমানে জায়ান কোনো মেয়ের সাথে রিলেশন করে। জায়ান তার সাথে বেইমানি করছে। ইফান আর ভাবতে পারলো না। রাগে ফোন শক্ত করে চেপে ধরে দাঁতে দাঁত পিষে আওড়ায়,
–“ইউ বা’স্টার্ড, লায়ার।”
পরক্ষণেই ক্রুদ্ধ নয়নে ফোনের স্ক্রিনে তাকালো। কত বড় সাহস জায়ানকে ভিডিও কল করছে। ইফান চোয়াল শক্ত করে ফোন রিসিভ করল। তক্ষুনিই ইফানের ধূসর বাদামী ক্রুদ্ধ নয়ন খনিকের জন্য থমকালো। একটা সাত কি আট বছরের বাচ্চা মেয়ে লাল টুকটুকে শাড়ি গয়না পড়ে বউ সেজে। গোলাপি ওষ্ঠ জুড়ে প্রসস্থ হাসি। ফলে দু গালে টোল পড়েছে। মেয়েটা কিছু বলছে না, শুধু খিলখিল করে হাসছে।
–“আমি জানতাম, আমি তোমার দেওয়া শাড়ি গহনা পড়লে তুমি ঠিক কল ধরবে। দেখেছ আমার কথা মিলে গেছে।”
ফোনের মেয়েটা বকবক করতে লাগলো। আচমকা ইফানের মস্তিষ্ক সজাগ হয়। আবারো চোয়াল শক্ত হয়ে আসে। তবে কেন জানি সে রাগ দেখাতে পারছে না। তাই আবারও ইফানের চেহারা শীতল হয়ে যায়। অনেক্ক্ষণ মেয়েটা বকবক করলো। অপর প্রান্তের ব্যক্তি যে কিছু বলছে না, তা নিয়ে মেয়েটার কোনো মাথা ব্যথা নেই। ইফান যেন একটা ঘোরের মধ্যে ছিল। সে শুধু মেয়েটার কথাগুলো শুনলো, অপলক দৃষ্টিতে মেয়েটাকে দেখেই গেল। আজ এই প্রথম ইফান অনুভব করলো তার বুকের বাম পাশে ডিপডিপ আওয়াজ হচ্ছে। হৃৎস্পন্দন অনিয়ন্ত্রিত হয়ে তাকে বেসামাল করে তুলছে। শুরু হয় এক অজানা ভালো লাগার অনুভূতি। নে’শার ঘোরে মস্তিষ্ক ঘুমাবার আগ পর্যন্ত জপে গেছে– জারা, জারা, জারা।
সেদিন ইফান জায়ানকে রাগ দেখিয়ে জারা মেয়েটার কথা জিজ্ঞেস করে। জায়ান খুব সহজ উত্তর দেয়, “তার বোন”। আর কি? তৈরি হয় ইফানের মধ্যে এক ভুল ধারণা। জারা জায়ানের বোন।
দিনে দিনে বাড়তে থাকে তার অজানা অনুভূতিগুলো। এক দুই করে বছর ফুরিয়ে আসে। ইফানের সর্বোচ্চ নে’শার নাম হয়ে উঠে সেই মেয়েটা। প্রতিদিন মেয়েটা জায়ানকে কল দিত। কিন্তু জায়ান কখনো কল ধরতো না। জায়ানের অবর্তমানে মাঝেমধ্যে ইফান কল রিসিভ করতো। ফোনের ওপাড়ে মেয়েটা একাই বকবক করতো। আর ইফান নিঃশব্দে শুধু শুনতো। আর মেয়েটাকে অনুভব করতো। প্রতিদিন নিয়ম করে বিভিন্ন নাম্বার থেকে মেয়েটাকে কল দিতো। শুধু একটিবার মেয়েটার কন্ঠস্বর শুনার জন্য।
যখন ইফান নে’শায় বোধ হয়ে থাকতো তখনও তার মস্তিষ্কে ঘুরপাক করতো সেই জারা মেয়েটার কথা। ইফানের কানে বাজতো খিলখিল হাসির ঝংকার। ইফান নিজের অজান্তেই হাসতো। মস্তিষ্ক যখন ঘুমিয়ে পড়বে তার আগ মূহুর্ত পর্যন্ত ইফানের ভাবনায় কত নতুন নতুন কল্পনার বাসা বাঁধত। ছন্নছাড়া, নিঃসঙ্গ ইফানের আপন কেউ হবে। হ্যাঁ, এই মেয়েটা হবে। ইফান বাসায় আসার আগ পর্যন্ত তার জন্য অপেক্ষা করবে। খুব দেরী হলে চিন্তা করে অস্থির হয়ে উঠবে। আর ইফান আহত হয়ে বাড়ি ফিরলে তাকে শাসন করবে। তারপর ইফানকে আহত দেখে কেঁদে ভাসাবে। ইফানের যত্ন নিবে। ইফানের মাথায় তো কেউ হাত বুলিয়ে দেয় নি কখনো। সে দিবে। ইফানকে বুকে জড়িয়ে ধরে ঘুমাবে। এই প্রথম ইফানকে কেউ ভালোবাসবে। খুব ভালোবাসবে। ইফানের বেঁচে থাকার কারণ হবে। অতঃপর ঠোঁটের কোণে অজানা সিন্ধ হাসি ঝুলিয়ে রেখেই ঘুমের রাজ্যে পাড়ি জমায় ইফান ।
কথায় আছে ঝড় কখনো বলে কয়ে আসে না। ঠিক তেমনই হয়েছিলো সেদিন। জায়ান আবারও ফোন ভুলে বাসায় ফেলে ভার্সিটি চলে গেছে। আজ প্রায় এক সপ্তাহ পর ইফান তার ব্ল্যাক হাউজে এসেছে। প্রতিদিনের মতোই আজও কালো কুচকুচে অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে আছে বাড়িটি। জায়ান আসার আগে কখনোই এ বাড়িতে লাইট জ্বালানো হতো না ইফান থাকাকালীন। কেন জানি অন্ধকার ইফানের বড় পছন্দ। জায়ান আসার পর থেকে অল্প কিছু সময় পুরো বাড়িতে লাইট জ্বালানো হয়। আর না হলে বেশিরভাগ সময় জায়ান টেবিল ল্যাম্প জ্বালিয়েই পড়াশোনা করে। জায়ানকে এত পড়তে দেখে মাঝেমধ্যে ইফান বড্ড অবাক হয়। দিনরাত্রি জেগে কেউ এত্তো পড়ে! ইফান তো মাঝেমধ্যে জায়ানকে লোডিং আইনস্টাইন বলেও ডাকতো। এই ডাক শুনে জায়ান খুব হাসতো।
ইফান ফ্রেশ না হয়েই সবসময়ের মতো আজও ক্লান্ত দেহ বিছানায় ছেড়ে দিয়েছে। ইফান চোখের উপর হাত রেখে ভাবতে লাগলো সেই হাসিওয়ালির কথা। ও হ্যাঁ, ইফান জারা মেয়েটার আরেকটা নাম দিয়েছে হাসিওয়ালি। এই নামটা বিরবির করে উচ্চারণ করতেই ঠোঁট কামড়ে আনমনে হাসলো ইফান। হঠাৎই ফোন বেজে উঠল। ইফান আচমকা উঠে বসল। আসেপাশে চোখ ঘুরাতেই বিছায় জায়ানের ফোনটা দেখতে পেল। আজও জারাপাখি কল করেছে। মূহুর্তেই যেন ইফানের সকল ক্লান্তি দূর হয়ে গেছে। সে কল রিসিভ করতেই ভেসে উঠল সেই হাসি মাখা মায়াবী মুখ। এই মুখটাই তো হার্টলেস মাফিয়া বসের অনিয়ন্ত্রিত হৃৎস্পন্দনের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ফোন রিসিভ হতেই মেয়েটা আপন মনে বকবক করতে থাকে। ইফান আজও শুনছে, আর মেয়েটাকে পলকহীন তাকিয়ে দেখছে। আজকাল স্বপ্নেও মেয়েটা বড্ড পীড়া দেয় ইফানকে। যখনতখন নাড়া দিয়ে উঠে নিষিদ্ধ বাসনারা।
ইফান ঢোক গিললো। পরপরই মাথা ঝেড়ে ভাবনাগুলোকে সরিয়ে দিল। অতঃপর আবারো ফোনের স্ক্রিনে মেয়েটির দিকে তাকিয়ে রইলো। ইফান দিন গুনছে কবে মেয়েটা একটু বড় হবে। বেশি বড় লাগবে না। তাকে সামলানোর মতো চৌদ্দ–পনেরো হলেই ইফান জারাকে নিজের কাছে নিয়ে আসবে। তারপর মন ভরে যখন খুশি তখন দেখবে, আদর করবে। ভাবতে ভাবতেই ইফান ফোনের কাছে মুখ নামিয়ে ফোনে নাক ঘষে জুড়ে শ্বাস টানলো। মনে হলো সে মেয়েটার দেহের ঘ্রাণ নিজের ভেতর টেনে নিলো। ইফান অস্পষ্টে আওড়ালো,
–“বুলবুলি।”
–“কি করছিস তুই?”
ইফান খনিকের জন্য একটা ঘোরের মধ্যে চলে গিয়েছিল। আচমকা জায়ানের কন্ঠ কানে আসতেই হুঁশ ফিরে। জায়ান ইফানের থেকে দৃষ্টি সরাতেই নজর আটকে যায় ফোনে। ফোনের স্ক্রিনে ঝলঝল করছে তার জারা পাখির হাস্যোজ্জ্বল চেহারা। জায়ান টান মেরে ইফানের থেকে ফোন নিয়ে কল কেটে দেয়। ইফানের দিকে চোখ চোখ ছোট ছোট করে তাকিয়ে সন্দিহান কন্ঠে শুধায়,
–“জারা কি কথা বলছিল তোর সাথে ভি?”
–“আই লাইক হিম।”
ইফানের সহজ স্বীকারোক্তি। ইফানের সহজ কথাটা যেন জায়ান বুঝতে পারছে না। ফলস্বরূপ কন্ঠ খাদে নামিয়ে ফের শুধালো,
–“কি বললি?”
–“তোর বোনকে আমি পছন্দ করি। আই লাইক হিম ভেরি মাচ এন্ড আই ওয়ান্ট হিম। আমার বিশাল সাম্রাজ্যের রাণী বানাবো ওকে।”
জায়ান চোখ বন্ধ করে তপ্ত শ্বাস ছেড়ে অন্য দিকে ঘুরে দাঁড়াল। এমন কিছুই জায়ান অনেকদিন ধরে আন্দাজ করছিলো। জায়ান ভেবেছিল, সে জারাকে নিয়ে বেশি সিরিয়াস বলে আবোলতাবোল ভাবনা মনে আসে। কিন্তু সত্যি এমন কিছু হবে ভাবে নি কখনো। জায়ান বলে উঠলো,
–“ভুলে যা ওকে। ও পবিত্র, আর তুই অপবিত্র। আমি কখনো ওকে তোকে দিতে পারব না। আর সে নিজেই তোর পাপের রাজ্যের রাণী হতে চাইবে না। আমার পরিবারের মানুষের দিকে নজর দিস না ভি। তুই পাপী জেনেও আমি তোকে ভালোবাসলেও আর সবাই তোকে ঘৃণা করবে।”
–“আমি ওকে লাইক করি। এই মন মস্তিষ্ক ওর কাছেই পড়ে থাকে সবসময়। আমি ওকে খুব ভালো রাখব ট্রাস্ট মি। কখনো আ’ঘাত পেতে দিব না। আমি কোনোদিন ওর চোখ থেকে একফোঁটা জল গড়াতে দিব না। বিলিভ মি দোস্ত।”
খুব করুন শুনালো ইফানের কন্ঠটা। জায়ানের বুকে চিনচিন ব্যথা শুরু হলো। কিন্তু সে যে জারাকে দুনিয়ার কারো সাথে ভাগ করবে না। জারার জন্য যদি পৃথিবীর সকলের কাছে স্বার্থপর হতে হয়, তাহলে সে হবে। জায়ানের সাহস হলো না ইফানের চোখের দিকে তাকাতে। যদি তাকাতো তাহলে দেখতে পেতো কতটা কাতর চাহনিতে তার দিকে তাকিয়ে আছে দুর্ধর্ষ মাফিয়া বস। জায়ান ঠোঁট ভিজিয়ে শুকনো ঢোক গিলে বলে উঠলো,
–“তুই যা বলছিস সব অবাস্তব ভি। বাস্তবতা এটাই মাফিয়াদের কখনো ঘর সংসার হয় না। তুই চাইলেও জারাকে সংসার দিতে পারবি না। ওকে তুই কোনোদিন ভালো রাখতে পারবি না। আর না দিতে পারবি ওর সুরক্ষা। তোর নিজেরই তো সুরক্ষা নেই। এখানে ওখানে আ’হত হয়ে পড়ে থাকিস। আর না আছে বাস্তবতা । তোর সবটা জুড়েই মরিচীকা। প্রতি মূহুর্তে তোকে পালিয়ে পালিয়ে বাঁচতে হয়। তুই ইন্টারন্যাশনাল মোস্ট ওয়ান্টেড ক্রিমিনাল। বুঝতে পারছিস? তুই যে কোনো সময় ক্রস ফায়ারে নিহত হতে পারিস। তোর জীবনের কোনো নিশ্চিয়তা নেই। তখন কি হবে বল? কে দেখবে জারাকে? তুই বুঝতে পারছিস ভি, মাফিয়াদের কখনো ঘর সংসার হয় না। হয় তো তোর আজ জারাকে ভালো লাগছে। কিন্তু দেখবি কদিন পর ওকে তোর আর ভালো লাগবে না। তুই ড্রাগ এডিক্টেড। তাই হয়তো জারার প্রতি…”
–“আই ট্রুলি লাভ হিম।”
ইফানের কন্ঠটা এবার বড্ড বেশি ভার শুনালো। তবে এসব খেয়াল করলো না জায়ান। ইফানের এই বাক্যটা এবার তার বুকে গিয়ে বিঁধল। তার মানে ইফান সত্যি? না, এটা কি করে হতে পারে। জায়ান ঢোক গিললো। অতঃপর বুক ফুলিয়ে শ্বাস ছেড়ে শক্ত কন্ঠে বলতে লাগলো,
–“জারাকে ভুলে যা। আর যদি না করিস তাহলে আমাদের বন্ধুত্ব চিরকালের জন্য শে…”
শেষ বাক্যটা সম্পন্ন করতে পারলো না জায়ান। তার আগেই পিছন ঘুরে দেখে ইফান নেই। এই তো এখানেই এতক্ষণ ছিলো। তাহলে কোথায় চলে গেল? জায়ান ব্যথাতুর নয়নে খোলা দরজার দিকে তাকিয়ে রইলো। সে যদি আরেকটু আগে পিছনে ফিরে তাকাতো, তাহলে হয়তো দেখতে পেতো ইফানের জলে থৈথৈ করা অক্ষিযোগল। জায়ান জানতেই পারলো না আজ তার কথাগুলো মাফিয়া বসের ঠিক কোথায় গিয়ে লেগেছে। আর পৃথিবীর সকলের অগোচরে তার গাল বেয়ে এক ফোটা তপ্ত জল গড়িয়ে পড়েছে। কিন্তু পাথরের মতো হৃদয়হীন নিষ্ঠুর দুর্ধর্ষ মাফিয়া বসের কাঁদা যে মানায় না। তাই তো নিজের দুর্বলতা আড়াল করতে পালিয়ে গেছে।
ঠিকই তো বলেছে জায়ান। তার একটা বাক্যও তো ভুল নয়। সে যে সত্যিই কঠিন পাপী। তার জীবনে পাপ ছাড়া কিই বা আছে। তার জীবনে যে কোনো আলোর দিশা নেই। সবটাই ঘুটঘুটে অন্ধকার মরীচিকার মতো। সে কি সত্যিই জারাকে সংসার দিতে পারতো? পারতো কি নিরাপত্তা দিতে?
ভালোই তো ছিল হৃদয়হীন নিষ্ঠুর মাফিয়া হিসেবে। কিন্তু এখন বেইমান হৃদয়টা তাকে বড্ড পীড়া দেয়। যখন তখন বুকের বাম পাশে ব্যথা শুরু হয়। এর কোনো চিকিৎসা খুঁজে পায় না মাফিয়া বস। পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্ত ছুটে পালাচ্ছে অন্তরের তারানায়। বয়সই বা কত তার? এই অল্প বয়সেই যে তৈরি হয়েছে যন্ত্রণার পাহাড়। একটা মেয়েকে না পাওয়ার ব্যথা আজকাল তার জীবনের সকল পাপের চেয়েও ভারী মনে হয়। একটা নারীকে ভুলতে কত কি অবলম্বন করলো? সারাদিন ড্রাগস নিয়ে নেশায় বোধ হয়ে থাকে। তবুও ঐ মেয়ে মস্তিষ্ক থেকে বের হয় না। ইফানের মাঝেমধ্যেই ইচ্ছে হয় মস্তিষ্ক ফাটিয়ে ফেলতে। কখনো কখনো তা করতেও উদ্ধত হয়। ওকে ধরে বেঁধে আটকায়। ফলস্বরূপ পৃথিবী থেকে দৈনিক এক দুজনকে বিদায় নিতে হচ্ছে। ছ’মাস হতে চললো। অথচ মস্তিষ্ক থেকে মেয়েটা বের হচ্ছে না। এক দুদিনের নয় দীর্ঘ দুটো বছরের তিলে তিলে গড়া অনুভূতি কি আর এত সহজে মুছে দেওয়া যায়?
এভাবেই চলতে থাকে ইফানের জীবন। যখন-তখন মস্তিষ্ক রাগে ফেটে পড়ে। পরে যাকে সামনে পায় তাকেই শুট করে দেয়। মদ, হি’রোইন এর মতো কত রকমের নে’শায় না করে সে। দিনরাত ক্যাসিনোতে পড়ে থাকে। হঠাৎ একদিন ঘটে অনাঙ্ক্ষিত দূর্ঘটনা। নে’শায় বোধ ইফান। মস্তিষ্ক শুধু একটা কথায় বলে, ওকে ভুলতে হবে। ওর জীবনে তার পাপের ছায়া ফেলবে না। এসব ভাবতে গিয়ে তার মস্তিষ্ক আর কাজ করে না। সেই সুযোগ লুফে নেয় ক্লাবে পার্টি করতে আসা প্রভাবশালী ঘরের রমণী। সেই ভুলের মাশুল হিসেবে পরদিন সকলে ঘুম থেকে উঠে পৃথিবীর আলো দেখার আগেই প্রাণ দিতে হয়।
ইফান কোনো একটা কারণে নারীদের প্রচন্ড ঘৃণা করতো। শুধু জারা মেয়েটাকেই সে ঘৃণা করতে পারেনি। কিন্তু সেই রাতের পর থেকে আবার নতুন ইফানের জন্ম। তার মধ্যে যে পবিত্রতাটুকু ছিল তাও কলুষিত হয়। ইফান হয়ে উঠে আরও হিংস্র। না চাইতেও জারাকে মস্তিষ্ক থেকে বের করে। সত্যিই কি পেরেছিলো, কি জানি?
এদিকে মাসের পর মাস পেরিয়ে যায়। ইফান আর জায়ানের সাথে মুখোমুখি হয় নি । জায়ান পাগলের মতো রাস্তায়, অলিগলিতে খুঁজে বেড়ায় এক পাপিষ্ঠ বন্ধুকে। খুঁজে না পেয়ে পুরুষ হয়েও আড়ালে গুমরে গুমরে কাঁদে। এইসব কারণেই জায়ান জারার সাথে যোগাযোগ করতো না। বরং সাময়িক দূরত্ব তৈরি করেছিল।
হঠাৎ একদিন ইফান আসে। জায়ান তো খুশিতে অস্থির হয়ে উঠে ইফানকে জড়িয়ে ধরে খুব কাঁদে। ইফান জায়ানের সাথে এমন আচরণ করেছে যেন তাদের মধ্যে কখনো কিছু হয় নি। কিন্তু জায়ান লক্ষ করে, ইফান আর ইফান নেই। তার চরিত্রে বিশাল পরিবর্তন এসেছে। আর ইফান জায়ানকে এই বিষয়টা আরও বেশি করে দেখাতে চাইতো। জায়ান আড়ালে দীর্ঘশ্বাস ছাড়তো।
তারপর অনাকাঙ্ক্ষিত ভাবে আবারো দেশে ফিরে প্রথমেই ইফানের সাথে জারার সাক্ষাৎ হয় গলিতে। মেয়েটাকে দেখে ইফান চরম আশ্চর্য হয়। ফোনে মেয়েটাকে যত সুন্দর দেখেছিলো বাস্তবে আরও দশ গুন সুন্দর। জারা পালিয়ে যায়। কিন্তু পিছন থেকে ইফান মেয়েটাকে অপলক দেখতেই থাকে।
তারপর আবারো দেখা নদীর পাড়ে। কাশবনে নীল শাড়ি পড়ে নেচে বেড়াতে থাকা একটা পরী। না, ইফান আর নিজের মন মস্তিষ্ককে নিজের কাছে আটকে রাখতে পারে নি। ইফান এবার প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়, সে জারাকে নিজের করবেই। জায়ান হয়তো প্রথমে অমত করবে। কিন্তু পরে সব ঠিক হয়ে যাবে।
তারপর জায়ান ইফান আবারো মুখোমুখি হয়। সেদিনও জায়ান স্বীকার করেনি সে জারাকে ভালোবাসে। বরং ইফানের জানাটা আটকে থাকে তারা ভাই বোন।
কিন্তু যখন সত্যিটা জনলো তখন বড্ড দেরী হয়ে গেছে। তখন জারা মেয়েটা ইফান চৌধুরীর বৈধ স্ত্রী। সেদিন পঙ্কজ আর তার পার্টনার জারাকে তুলে নিয়ে যায়। যদি ইফান ঠিক টাইমে না পৌঁছাত, তাহলে জারার অনেক বড় ক্ষতি হয়ে যেত। ইফান সেদিন জারাকে উদ্ধার করে নিয়ে যায় এবং জারার অজান্তেই রেজিস্ট্রি পেপারে জারার টিপ সই নিয়ে বিয়ে করে। সেদিন জারার অজান্তেই ইফান জারার অনেকটা কাছে এসেছিলো। সে এখন কিভাবে নিজের স্ত্রীর অধিকার ছেড়ে দিবে?
জায়ান পারতো ইফানকে আগেই সাবধান করতে। ইফান কি এতটাই নিকৃষ্ট ছিলো যে বন্ধুর ভালবাসাকে কেঁড়ে নিবে? তাহলে জায়ান কেন তাকে শুরু থেকে একবারো বললো না– জারা ওর বোন নয়। বরং তার ভালোবাসা?
এই একটা জায়গার ভুল বুঝাবুঝি থেকে জল এত দূর গড়ায়। তারপর কি হলো? ধ্বংসের শেষ প্রান্তে দুজন প্রেমিক। তাদের দু’জনেরই ভালোবাসা চাই। সবকিছুর পরও সেদিন একটা মিমাংসা ঠিকই হতো। হয় জারা মেয়েটাকে ইফান পেতো, আর না হয় জায়ান। কিন্তু….?
চলবে,,,,,,
অনেক বড় পর্ব দিয়েছি। পর্বটা আরও বড় হতো। কিন্তু লিখে উঠা সম্ভব হয় নি। সবাই বেশি করে রেসস্পন্স করো কেমন। হ্যাপি রিডিং🥹🫶
Share On:
TAGS: জান্নাত মুন, জাহানারা
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
জাহানারা পর্ব ২
-
জাহানারা পর্ব ৫৯+৬০
-
জাহানারা পর্ব ৩৩+৩৪
-
জাহানারা পর্ব ১৩+১৪
-
জাহানারা পর্ব ৪৫+৪৬
-
জাহানারা পর্ব ২১+২২
-
জাহানারা পর্ব ৬
-
জাহানারা গল্পের লিংক
-
জাহানারা পর্ব ২৯+৩০
-
জাহানারা পর্ব ৩