জাহানারা
জান্নাত_মুন
পর্ব :৬৩
🚫ক’পি করা নিষিদ্ধ
🔞 সতর্কবার্তা:
এই গল্পে অশ্রাব্য ভাষা, অশ্লীলতা এবং সহিংসতার উপাদান রয়েছে। ১৮ বছরের কম বয়সী বা সংবেদনশীল পাঠকদের জন্য উপযুক্ত নয়। পাঠক নিজ দায়িত্বে পড়বেন।
শীতের রাত যত বাড়ছে, কুয়াশার চাদর ততটাই পুরু হয়ে জড়িয়ে ধরছে চারপাশকে। দৃষ্টির সীমানায় কেবলই সাদা ধোঁয়াটে এক রহস্য। আজ আকাশের ললাটে চাঁদের টিপ নেই। অমাবস্যার ঘন কালো মেঘ যেন সুকৌশলে গিলে ফেলেছে নক্ষত্রপুঞ্জকে। চারদিকের নিস্তব্ধতা আর ঘনীভূত অন্ধকার মিলেমিশে একাকার হয়ে পৃথিবী যেন আজ এক অতল কালো মায়ায় হারিয়ে গেছে।
নিস্তব্ধ চারপাশে শুধু শোনা যাচ্ছে তন্নির মৃদু গোঙ্গানির আওয়াজ। দৈত্যের মতো লোকগুলো মেয়েটাকে টেনেহিঁচড়ে গাড়িতে তুলছে। হঠাৎই অন্ধকার ভেদ করে একগুচ্ছ স্বচ্ছ আলো চারপাশ আলোকিত করে তুলে। অন্ধকার আর কুয়াশার চাদরের আস্তর পেরিয়ে গাড়িটা এদিকটায় এগিয়ে আসতেই সামনের দৃশ্য দেখে সজরো ব্রেক কষে। লোকগুলো হঠাৎ কারো আগমণে খানিকটা ভরকে যায়। ভয় আর জড়তায় চুপসে যাওয়া তন্নির চেহারায় নিজেকে এই সর্বনাশী বিপদ থেকে বাঁচার এক আশার আলো ফুটে ওঠেছে। নিজের বিপদ আগন্তুককে জানান দিতে উচ্চ স্বরে গোঙ্গাতে লাগল। এতে দানবাকৃতির লোকগুলো আবারও সতর্কিত হয়ে পড়ে। অতএব ধাক্কা মেরে গাড়ির ব্যাক সিটে ছুড়ে মারে মেয়েটাকে।তারপর লোকগুলো দ্রুত গাড়িতে উঠে বসতে থাকে।
মাঝ রাস্তায় এ দৃশ্য দেখে গাড়ি থেকে তৎক্ষনাৎ নেমে পড়ে ইনান।এগিয়ে সামনের গাড়িটির কাছে আসবে তার আগেই লোকগুলো গাড়িতে উঠে বসে।তন্নির মুখ চেপে ধরে বসেছে একটা লোক।তন্নি ধস্তাধস্তি করে লোকটার হাতে কামড় বসিয়ে ঝটপট গাড়ির উইন্ডো দিয়ে মাথা বের করে এক হাত বাড়িয়ে দিয়ে কেঁদে বলতে লাগলো,
–“দয়া করে আমাকে বাঁচান। এই লোকগুলো আমার সর্বনাশ করতে চাইছে। দোহাই লাগি আমাকে…”
তন্নি আর কিছু বলতে পারল না,তার আগেই ভেতরের লোকটা টান মেরে তন্নিকে ভেতরে নিয়ে গাড়ির জানালার কাচ উঠিয়ে দেয়। ইনান হঠাৎই থমকে গেল। সে এটা কাকে দেখল? কাঁদতে কাঁদতে ভেজা চোখ মুখ করে তার কাছে সাহায্য চাওয়া মেয়েটা কি সত্যিই তন্নি? ইনান আর ভাবতে পারল না।কারণ ইতোমধ্যেই তার কানে এসেছে তীব্র থাপ্পড় মারার শব্দ। ইনান হাত মুষ্টিবদ্ধ করে চেচিয়ে উঠলো,
–“হেই স্টপ।”
ইনান গাড়ির কাছে যেতেই গাড়িটা ছুটে পালাতে লাগল।ইনান এক মূহুর্ত সময় ব্যয় না করে নিজের গাড়িতে উঠে বসল। অতঃপর সামনের গাড়িটাকে অনুসরণ করতে লাগল।
সামনের গাড়িটা ইনানের থেকে পালাতে পালাতে ফাঁকা একটা নির্জন রাস্তায় ছুটে এসেছে। পিচঢালা রাস্তা মেরিয়ে একটার পিছনে আরেকটা ছুটছে। ইনানের চোয়াল শক্ত হয়ে এসেছে। ইনান মানে মাফিয়া বসের বাম হাত। আর এই তিনটা বাস্টার্ড তার থেকে পালাতে চাইছে। ব্যাস অনেক হয়েছে। ইনান সামনে থেকে লোড করা রিভলবারটা তুলে নিল।অতঃপর ড্রাইভিং করতে করতে জানালা দিয়ে হাত বের করে অতি দক্ষতার সাথে সামনের গাড়ির পেছনের একটা চাকায় শুট করল। মূহুর্তেই গাড়িটি ব্যালেন্স হারিয়ে কিছু দূর গিয়ে গাছের সাথে ধাক্কা খেল।ইনান গাড়ি থেকে নেমে প্রায় ভাঙচুর গাড়িটার কাছে যেতেই গাড়ি থেকে দুটো লোক বেরিয়ে এসে ইনানের উপর ঝাপিয়ে পড়ে।
ইনান কয়েকটা লাথি ঘুষি দিতেই লোকগুলো নেতিয়ে পড়ে। গাড়ি থেকে আরেকটা লোকও এসে ইনানের সাথে মারপিট করতে থাকে। বেশ কয়েক মিনিটেও ইনানকে তিনজন কাবু করতে না পেরে নিজেদের জান বাঁচিয়ে পালায়।
এদিকে ছাড়া পেতেই গাড়ি থেকে নেমে পড়ে তন্নি।ধস্তাধস্তির ফলে শরীরে অনেক ব্যথা এসেছে।গাড়ি থেকে নামতেই ইনানকে দেখে আশ্চর্য হয়ে যায় মেয়েটা।তখন ইনান অন্ধকারে লাইটিং এর বিপরীতে দাঁড়িয়ে থাকায় চেহারা দেখতে পায়নি। নিজের বিপদে চেনা কাউকে পেয়ে তন্নি ছুটে গিয়ে ইনানের বুকে হামলে পড়ে হু হু করে কাঁদতে থাকে।
ইনান পালাতে থাকা লোকগুলোকে ধরতে যাওয়ার জন্য উদ্ধত হতেই আচমকা তার বুকে সরু মেয়েলি একটি দেহে লেপ্টে পড়ে। ইনানের বৃহৎ দেহ থমকায়। এই প্রথম কোনো নারী তাকে এভাবে স্পর্শ করেছে। পাপের দুনিয়ায় তার বিচার থাকলেও এই একটা পাপ তাকে স্পর্শ করতে পারে নি। নারী সঙ্গ নেওয়াকে সে ঘৃণা করে। অথচ ব্ল্যাক ভেনমের আন্ডারের প্রস্টিটিউট ক্লাবগুলোর দেখবারের দায়িত্ব তার কাঁধে।
ইনান শুকনো কেশে উঠল। তন্নি নিজের কৃতকাজ বুঝতে পেরে তাড়াতাড়ি দূরে সরে দাঁড়ায়। ইনান তাকায় সামনে দাঁড়িয়ে থাকা এলোমেলো মেয়েটার দিকে।কাঁদতে কাঁদতে চোখের পানি নাকের পানি একত্রে লেপ্টে বেহাল অবস্থা। ইনান প্যান্টের পকেট থেকে নিজের রুমাল বের করে তন্নির দিকে এগিয়ে দিল। তন্নি হেঁচকি তুলতে তুলতে চোখ তুলে তাকাতেই ইনান ইশারা করল নিতে। তন্নি নিয়ে চোখমুখ মুচে নাকে সর্দিও মুচলো। অতঃপর আবার সেই রুমাল ইনানের দিকে এগিয়ে দিল।
তন্নির এমন কাজে ইনান নাক ছিটকে অন্য পাশে ফিরে বলল,”নো নিড।”
–“আপনাকে অনেক অনেক ধন্যবাদ। আপনি না থাকলে আজ আমার কি হতো…”
কথা সম্পূর্ণ না করে আবার কেঁদে উঠলো মেয়েটা।ইনান দাঁতে দাঁত পিষে তন্নির দিকে ঘুরে তাকাল। অতঃপর চোয়াল শক্ত করে চিবিয়ে চিবিয়ে বলল,”আর ইয়্যু মেড। এত রাতে বাসার বাইরে কেন বের হলেন?এত রাতে কোনো ভদ্র ঘরের মেয়ে তো বাসা থেকে বের হয়।”
–“একটু দরকার ছিল তাই… “
ইনান তন্নির এক্সকিউজ না শুনেই নিজের গাড়ির দিকে এগিয়ে যেতে লাগল। মারামারি করতে গিয়ে হাত কেটে র’ক্ত টপটপ করে পড়ছে। এটা দেখে ইনানের চোয়াল আরও শক্ত হয়ে আসল। আজ তার একটা ইম্পর্ট্যান্ট কাজ ছিল এদিকটায়। কিন্তু তা আর হলো কই?
ইনানকে এভাবে চলে যেতে দেখে বোকার মত কয়েক মূহুর্ত একই জায়গায় দাঁড়িয়ে রইল তন্নি। দূর থেকে কুকুরের ডাক কানে আসতেই ইনানের দিকে দৌড়ে আসতে আসতে চেচিয়ে উঠলো,
–“কেমন মানুষ আপনি? বিপদ থেকে একটা মেয়েকে বাঁচিয়ে আবার মাঝ রাস্তায় ফেলে চলে যাচ্ছেন।”
ইনান দাঁড়িয়ে পড়ল। তন্নি ইনানের সামনে দাঁড়িয়ে হাঁপাতে লাগল।ইনান গম্ভীর চেহারা করে বলল,” ইউ হেব আ গুড লাক। বিকজ আজ আপনার জায়গায় অন্য কেউ থাকলে আমি কখনো বাঁচাতে যেতাম না। আপনি ভাবির বেস্ট ফ্রেন্ড তাই বিপদে এগিয়ে এসেছি। এবার মুখ বন্ধ করে গাড়িতে গিয়ে বসুন।আপনার জন্য আমার গুরুত্বপূর্ণ কাজ মিস গেছে। না জানি ভাই কত কথা শুনায়। ননসেন্স!!”
ইনান আবার গাড়ির দিকে এগিয়ে গেল। তন্নি হা করে তাকিয়ে, লোকটা কি বললো এটা? তন্নি গিয়ে আবার ইনানের সামনে দাঁড়াল। চোখ সরু করে বলল,”আমি না থাকলে অন্য কেউ থাকলে আপনি বাঁচাতে যেতেন না? আপনার লজ্জা করল না এ কথা বলতে? কোনো ভালো মানুষ এ কথা বলতে পারে না?”
তন্নির অবুঝ কথায় ঠোঁট বাঁকাল ইনান।বাঁকা হেসে বলল,”আমি যে ভালো মানুষ সেটা আপনাকে কে বলল?”
তন্নির চোখগুলো বড় বড় হয়ে গেছে। সে জানে ইফান কিংবা চৌধুরী বাড়ির মানুষ সুবিধার না।তাই বলে এভাবে সরাসরি নিজের গুনগান গাইবে?
ইনান গাড়িতে উঠে বসল।তন্নিও তাড়াতাড়ি পাশের সিটে বসল।ইনান এক হাতে মুঠো করে টিস্যু নিয়ে আঘাত প্রাপ্ত হাতটা মুছতে লাগলো।রক্ত এতটাই গড়াচ্ছে যে টিস্যু ভিজে যাচ্ছে তবুও রক্ত পড়া বন্ধ হচ্ছে না।
–“আল্লাহ আপনার হাত কতটা কেটে গেছে! “
তন্নি এতক্ষণ লক্ষ করে নি।গাড়িতে উঠে এই দৃশ্য দেখে এখন বড্ড মায়া হচ্ছে। তাকে বাঁচাতে গিয়ে লোকটা কতটা আহত হলো। তন্নিকে অবাক হতে দেখে ইনান তন্নির দিকে না তাকিয়েই বাঁকা হাসল। ভারিক্কি স্বরে বলল,”এটা তো কিছুই না।”
–“কিছু না বললেই হলো।আল্লাহ , দেখছেন কত ব্লাড বের হচ্ছে!”
রক্ত মুছতে গিয়ে সব টিস্যু ভিজে নষ্ট হয়ে গেছে। আজ গাড়িতে ফার্স্ট এইড বক্সও নেই। ইনান তপ্ত শ্বাস ছেড়ে গাড়ি স্টার্ট দেওয়ার জন্য উদ্ধত হতেই তন্নির নিষেধাজ্ঞা শুনা যায়।
–“এই কি করছেন? থামুন বলছি।”
ইনান চোখমুখ কুঁচকে তন্নির দিকে তাকাতেই চোখ দুটো প্রসারিত হয়ে গেল। মেয়েটা কি করছে এটা? ইনান বোকার মতো তাকিয়ে রইল।তন্নি দাঁত দিয়ে নিজের জরজেট ওড়নাটা ছেঁড়ার বৃথা চেষ্টা করছে। অনেক কামড়েও ছিঁড়তে না পেরে হতাশ কন্ঠে বলল,
–“এ বাবা ছিঁড়ছে না কেন? সিনেমায় তো দেখি নায়িকা এক টান মেরেই ছিঁড়ে ফেলে।আর আমি কামড়েও ছিঁড়তে পারছি না কেন?”
–“আপনি কি নিজেকে সিনেমার হিরোইন ভাবছেন?”
আচমকা ইনানের এহেন কথায় লজ্জায় তন্নির গাল দুটো টমেটোর মতো লাল বর্ণ ধারন করছে। কি লজ্জা জনক বিষয়। ইশশ ভুল কথা বলে ফেলল মেয়েটা। এসব ভেবেই চোখ খিচকে নিলো তন্নি।
তন্নির এমন অবস্থা দেখে ইনান ঠোঁট বাঁকাল।আবার গাড়ির স্টিয়ারিং এ হাত রাখল।গাড়িটা কিছুটা এগোতেই অনুভব করল তার আঘাত প্রাপ্ত হাতটা কেউ খুব যত্ন করে ধরেছে।ইনান আড় চোখে হাতের দিকে তাকাতেই দেখল তন্নি নিজের ওড়না দিয়ে খুব সুন্দর করে হাতটা পেঁচিয়ে দিচ্ছে। ইনান অনেক ব্যথা অনুভব করছে। তবে তার চেহারায় তা স্পষ্ট নয়।তন্নি হাতটা সুন্দর করে বেধে দিয়ে ইনানের উরুর উপর যত্ন করে রাখল।
–“আশা করি এখন রক্ত পড়া বন্ধ হবে। অনেকটা কেটে গেছ তো তাই ডাক্তার দেখানো দরকার। আপনি চাইলে এখন আমি আপনার সাথে হসপিটালে…”
–“নো নিড।”
আবার মাঝ পথে তন্নিকে থামিয়ে দিল। তন্নি কিছু বললো না।সে আড় চোখে শুধু ইনানকে দেখতে লাগল।লোকটা বেশ লম্বাচওড়া স্বাস্থ্যবান।তবে ইফানের থেকে একটু কম। ফর্সা গায়ের রং। মুখে খুঁচা খুঁচা দাড়ি। মাথার চুলগুলো ভালোই বড়। যা এলোমেলো হয়ে আছে। তন্নি ইনানকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে গিয়ে লক্ষ করল ইনানের কানে পিয়ার্সিং করা। ছোট্ট একটা কানের দুলও আছে। ইনান দেখতে বেশ সুদর্শ। তন্নির কাছে হঠাৎ কেমন যেন লাগছে ইনানকে।সে কারও সাথে মিল খুঁজে পাচ্ছে ইনানের।কিন্তু কার সাথে?
অনেকটা রাত হয়ে গেছে অথচ চোখে ঘুম আসছে না। ভেতরে কেমন এক অস্থিরতা কাজ করছে। ইফানও আমার পাশ থেকে সেই কখন উঠে গিয়ে সোফায় বসে আরামসে মদ গিলছে। আমি একবারও চোখ খুলে তার দিকে তাকাই নি।হঠাৎই আমার পায়ে কিছুর স্পর্শ পেতেই তরাগ গতিতে চোখ খুললাম। উঠে বসতেই দেখি ইফান আমার পায়ে নুপুর পরিয়ে দিচ্ছে। সাদা ছোট ছোট পাথরগুলো চকচক করছে।হয় তো ডায়মন্ডের হবে।
আমি পা টেনে কম্ফোর্টারের ভেতরে আনতে গেলে ইফান টেনে ধরে আমার দুধে আলতা পায়ে হাত বুলিয়ে দিতে থাকে।আমি ব্রু কুঁচকে বললাম,
–“পা ছাড় ঠান্ডা লাগছে।”
–“খুব সুন্দর।”
ইফানের মাদকীয় হাস্কি স্বর কানে আসল।ইফান আমার পায়ে ঠোঁট ছুঁইয়ে ছোট ছোট অনেক চুমু এঁকে দিচ্ছে। লোকটার চোখমুখ দেখে মনে হচ্ছে ভালোই নেশা করেছে।আর এখন নেশায় বোধ হয়ে আছে।এই শীতেও ঘামছে।পড়নে আবার গেঞ্জিটাও কখন খুলে ফেলেছে।উন্মুক্ত তার দেহ। আমি তপ্ত শ্বাস ছেড়ে বললাম,”অনেক রাত হয়েছে ঘুমাও আর আমাকেও ঘুমাতে দাও।”
–“আজ ঘুমানো যাবে না।”
–“ঘুমানো যাবে না কেন? ইফান তুমি ড্রাংক, তোমার ঘুম প্রয়োজন।”
–“নোপ, আই জাস্ট নিড ইউ সুইটহার্ট ।”
বলেই টান দিয়ে আমার উপর থেকে কম্ফর্টার সরিয়ে দিল। অতঃপর আমার পা থেকে আরও খানিকটা শাড়ি উপরে তুলে উন্মাদের মতো ঠোঁট ছুঁয়াতে লাগল। ওর সিগারেটে পোড়া কড়কড়ে ঠোঁটের স্পর্শ আর তপ্ত শ্বাস দেহে পড়তেই আমার নারী সত্তা কেঁপে উঠছে। আমি ঢোক গিলে বললাম,”এসব পাগলামি ছাড়,আমার শরীর ঠিক নেই। আমি এখন ঘুমাব।”
আমার কথা ইফানের কানে পৌঁছাতে পারল কি না বুঝতে পারছি না।ইফান আমার শাড়ি আরও কিছুটা উপরে উঠাতেই পায়ের হাঁটু দৃশ্যমান হলো। সে আমার উন্মুক্ত পায়ে ঠোঁট ছুঁয়াতে ব্যস্ত। ধীরে ধীরে তার ঠোঁটগুলো উপরের দিকে উঠে আসছে। আমার মধ্যে আবার সেই অস্থির অনুভূতিগুলো নাড়া দিয়ে উঠছে।আমি পায়ের সাথে পা ঘষে নিজের অস্থিরতা কমাতে চাইছি।তখনই ইফান আমার শাড়ি আরও উপরে উঠাতে নিলে আমি পা টান মেরে সরিয়ে চেচিয়ে উঠলাম,”অসভ্য বেয়াদব নি’র্ল’জ্জ ছিহ্।”
আমি তাড়াতাড়ি পা শাড়ি দিয়ে ঢেকে গুটিয়ে বসে পড়লাম।ইফান চোখ ছোট ছোট করে আমার দিকে তাকিয়ে হাস্কি স্বরে বলল,”কি সমস্যা এমন করছ কেন?”
–“লজ্জা লাগে না আবার জিজ্ঞেস করছ?”
–“এমন বিহেভ ধরছ যে এই প্র….”
ইফান নিজের বাক্য শেষ করার আগেই আমি ওর মুখে হাত চেপে ধরি। ইফান আমার চেহারার দিকে কয়েক মূহুর্ত তাকিয়ে থেকে হঠাৎই বাঁকা হাসল। আমি ইফানের চোখে হাসি দেখে তারাতাড়ি হাত সরিয়ে নিতে গেলেই ইফান আমার সরু কোমর জড়িয়ে ধরে তার সাথে মিশিয়ে নিল। আমার কাঁধ থেকে চুলগুলো সরিয়ে মুখ গুঁজে লম্বা শ্বাস টানলো।আমি কিছু বলব তার আগেই সে বলে উঠলো,
–“আমি যেকোনো সময় চলে যেতে পারি তাই এখন না করো না। এন্ড ইয়্যু নো দ্যাট, নাড়াচাড়া বিষয়টা তোমাকে কাছে পাওয়ার ক্রেইভ আরও তুলে দেয়। সো বি আ গুড গার্ল এন্ড ফিল মি।”
–“অসভ্য একটা। চলে যেতে পার মানে কোথায় যাবে?”
ইফান আমার নাকে নাক ঘষে হিসহিসিয়ে বলল,”লন্ডন।”
–“কেন?”
–“দরকার আছে।”
–“কি দরকার?”
ইফান আমার প্রশ্নের উত্তর দিল না।বরং আমার কোমরে রাখা হাতের নখ দিয়ে সেখানে আঁচড় কাটে। আমি মৃদু আর্তনাদ করে উঠলাম,”আহ্ লাগছে।”
–“লাগার জন্যই দিয়েছি।কতবার বলতে হয় বেশি প্রশ্ন করবে না।আমি পছন্দ করি না।”
ইফানের এমন গম্ভীর আচরণ আমার একদমই পছন্দ না।নেশার তোরে চোখদুটো তার বারবার বুজে আসছে। ইফান একহাতে আমার কাঁধ থেকে শাড়ির আচল নামিয়ে দিল।আমার ঠোঁটে ঠোঁট চেপে ধরতেই বন্য পশুর মতো আচরণ করতে শুরু করল। এক হাতে আমার মাথা তার ঠোঁটের সাথে ধরে গাঢ় চুম্বন এঁকে দিচ্ছে। আবার ওষ্ঠ ভাজে দাঁত বসিয়ে দিচ্ছে।যার কারণে ব্যথায় কুঁকড়ে ওঠছি। ইফানের লাগামহীন আরেক হাত এলোমেলো ভাবে আমার ব্লাউজের বোতাম খুলতে ব্যস্ত।
ইফানের মুখ থেকে অ্যালকোহলের গন্ধে আমার পেটের সব বেড়িয়ে আসার উপক্রম। আমি জোর করে ইফানের থেকে মুখ সরিয়ে, মুখে হাত চেপে ধরে বললাম,”ওয়াক ছিঃ কি বাজে গন্ধ, আমার বমি চলে আসছে। প্লিজ মুখ সরাও।”
ইফান শান্ত চোখে আমার চেহারায় দৃষ্টি বুলাল। আমার গোলাপি ঠোঁটের এক কোণে লাল হয়ে উঠেছে। আশেপাশটা তরলে ভেজা। ইফান বুড়ো আঙ্গুল দিয়ে আমার ঠোঁট মুছে দিতে দিতে মাদকীয় কন্ঠে শুধাল,”বুলবুলি আমার বুলবুলি কি হয়ে তোমার? শরীর খারাপ জান?”
–“কিছুটা।”
ইফান আমার কন্ঠ নালিতে ঠোঁট ছুঁইয়ে হিসহিসিয়ে বলল,”বাট আ’ম সরি। আমার তোমাকে আজ চাই। একটু কষ্ট করে টলরেট করে নাও তোমার অসভ্যটাকে।”
ইফান আলতো হাতে আমার কাঁধ থেকে ব্লাউজের একটা হাতা নামিয়ে চুমু দিচ্ছে। যখন ইফান আমার আরেকটু ক্লোজ হবে তখনই সে মৃদু আওয়াজ করে উঠলো,”আউচ।”
–“ককি হয়েছে?”
ইফান আমাকে তার এক পায়ের উরুর উপর বসিয়ে তার পায়ের দিকে দৃষ্টি বুলাল।আমিও তাকিয়ে দেখলাম নিম্মি ইফানের পা খামচে ধরে আছে। ইফান দাঁতে দাঁত পিষে বিরক্তি নিয়ে বলল,”ঐ মাদারী তর প্রবলেম কি? দেখছিস না বউয়ের সাথে হিংকি-পিংকি করছি।”
–“কুত্তা তুই আমার মেয়েকে গালি দিচ্ছিস কেন?”
ইফান ঝটপট আমার দিকে তাকাল।চোখ সরু করে বলল,”জান তোমার মেয়ে কোথা থেকে আসল? এটা তো একটা বিল্লি।”
–“একদম ওকে বিল্লি বলবে না।”
আমি দাঁত কটমট করে প্রতিত্তোর করলাম। ইফান এক ব্রু উঁচিয়ে নিম্মির দিকে তাকিয়ে ঠোঁট কামড়ে কিছুটা ভাবুক চিত্তে বলল,”এটা তোমার মেয়ে, তাহলে কি ছোট ভাই আমার সাথে বেইমানি করলো নাকি!!”
ইফান কিছু একটা বিরবির করে হাত বাড়িয়ে ফোনটা নিলো।অতঃপর ফোনে তার একটা ছবি বের করে নিম্মির মুখের পাশে ধরল। একবার নিম্মিকে আরেকবার ফোনে নিজের পিক দেখছে। আমি বোকার মতো ইফানের মাতলামি দেখছি। ইফান নিম্মির সাথে নিজের ছবি কিছুক্ষণ মিলেয়ে সন্দেহপ্রবন চাহনিতে আমার দিকে তাকিয়ে বলল,
–“কি ব্যাপার বউ তোমার মেয়ের সাথে দেখছি আমার চেহারার একটুও মিল নেই। তাহলে এই মালটাকে কোথা থেকে আনছ?”
ইফানের ফাইজলামি কথায় ঠাস করে ওর কাঁধে থাপ্পড় মেরে দাঁতে দাঁত পিষে বললাম,”আরেকটা ফালতু কথা বললে তোর খবর আছে।”
আমাকে চেতে যেতে দেখে ইফান হো হো করে হেসে ওঠে।আমি রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে কাঁধে আচল টেনে ওর উরু থেকে নেমে যেতে নিলে ইফান ওর বুকের সাথে মিশিয়ে বালিশে শুইয়ে দিল।আমার উপর ঝুঁকে কম্বল টেনে দু’জনকে ঢেকে দিল। এদিকে আমাকে ইফানের সাথে দেখে নিম্মি ইফানের হাতে খামচাতে শুরু করেছে। ইফান দাঁতে দাঁত পিষে কিছু বলতে গিয়েও বলতে পারলো না। নিজেকে সামলে নরম হাতে নিম্মির পশমে হাত বুলিয়ে আদর করে দিয়ে বলল,”মাম্মা পাপা এখন ইন্টিমেট হবে সো ডিস্টার্ব করে না বাবা।”
–“তোমার মুখে কি ভদ্র কথা বের হয় না অসভ্য লোক ।”
–“ভদ্র হয়ে কি করব সোনা, এখন তো অভদ্র কাজই করব। যাও বাবা তুমি এদিকে চুপচাপ ঘুমাও।”
ইফান নিম্মিকে আরেক পাশে রেখে কম্ফোর্টার দিয়ে ঢেকে দিল।উষ্ণতা পেয়ে নিম্মি মিয়াঁও মিয়াঁও কয়েকবার ডেকে ঝিমতে লাগল। ইফান আমার শাড়ির আঁচল বুক থেকে সরিয়ে উপরের দুটো বোতাম খুলে সেখানে মুখ ডুবিয়ে চুমু দিয়ে হাস্কি স্বরে বলল,”জান তোমার বুকের এই তিলটা আমার ভীষঅঅণ পছন্দ।”
আমার বুকের মধ্যেখানে কালো কুচকুচে তিলটায় দাঁত বসিয়ে আবার শব্দ করে চুমু দিল। আমি কোনো উত্তর করলাম না। ইফান আবারো মাতাল করা হাস্কি স্বরে বলল,”আর তোমার ঐখানেরটাও”
–“কোন খানেরটা?”
আমি চোখ বন্ধ করে ভাবলেশহীন ভাবে জিজ্ঞেস করলাম। ইফান মুখ তুলে আমার চেহারার দিকে তাকিয়ে ঠোঁট কামড়ে হাসল।অতঃপর ধীরে ধীরে ওর একটা হাত আমার উদর স্পর্শ করে পেটিকোটের ভেতর প্রবেশ করাতে করাতে হিসহিসিয়ে বলল,”এখা…”
ইফানের কথার মানে বুঝতে পেরে তরাগ গতিতে চোখ খুলে ওর বাকি কথা শেষ করতে না দিয়ে ওর মুখে হাত রাখলাম। ইফানের চোখে হাসি খেলছে। আমি ইতস্তত হয়ে জিহ্বা দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে ঢোক গিললাম। ছিহ্ লোকটা কিভাবে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। আমার ভেতরে কেমন যেন করছে।তলপেটের খাচ্চোর প্রজাতিগুলো উড়তে শুরু করেছে। ইচ্ছে তো করছে সবগুলোর ডানা কেটে দিতে। আজ কেন যেন ভীষণ অস্বস্তি হচ্ছে। আমি চোখ বন্ধ করে হিসহিসিয়ে বললাম,”লাইট অফ কর।”
–“উহু লাইট অফ করা যাবে না।আই ওয়ান্ট টু সি দ্য রোজি ব্লাশ অন ইয়োর চিক্স।”
–“তুমি লাইট অফ কর না হয় তো কাছে আসবে না।”
ইফান কয়েক মূহুর্ত ভেবে বাঁকা হেসে রুমের লাইট অফ করে ফোনের ফ্ল্যাশ অন করে দিল।
–“লুক, অফ করে দিয়েছি।”
আমি চোখ খুলে তাকাতেই আবার চোখ খিচকে বন্ধ করে নিলাম।আমার মাথার কাছে ফোনের ফ্ল্যাশ জ্বলছে।আমি দাঁত কটমট করলাম।কিছু একটা বলব তার আগেই লোকটা আমাদের মাঝে অবশিষ্ট দূরত্ব ঘোচাল।বালিশের নিচ থেকে দুটো সেন্টার ফ্রেশ মুখে পুরে নিল যাতে মুখের এলকোহলের গন্ধে আমার অসুবিধা না হয়।
এদিকে ঘনিষ্ঠ মূহুর্তে আমার পায়ের নুপুরের সাথে ইফানের পা বারবার ঘষা খেতেই ইফান বিরক্তিকর আওয়াজ বের করে বলল,
–“জান এখন এটা খুলে ফেল, পরে পড়বে।”
আমি ঠোঁট কামড়ে মনে মনে হাসলাম ইফানের এমন চেহারা দেখে। বললাম,”খুলব না। পড়িয়ে দিয়েছিলে কেন?”
ইফান বেশ কয়েকবার বলেও খুলাতে না পেরে বিরবির করে বলে উঠলো, “শালা একেই বলে নিজের পায়ে নিজে কুড়াল মারা।”
বেপরোয়া লোকটা আবারো আমার ঠোঁটে ঠোঁট মিলাল। আমার কাছে আসতেই লোকটা তার আগের রুপে ফিরে এসেছে। ওর বন্য স্পর্শগুলো বড্ড পীড়াদায়ক। লোকটার ক্লোনের নেশালো ঘ্রাণ আমার সর্বাঙ্গে মিশে যাচ্ছে।ইফান আমার কলার বোনে দাঁত বসাতেই আমি দু’হাতে ইফানের মাথার চুল খামচে ধরলাম। এটাও ইফানের সহ্য হলো না।ইফান আমার হাত নিজের দু’হাতের মধ্যে আটকে বেডের সাথে চেপে ধরল।আমি ঘনঘন শ্বাস টেনে হিসহিসিয়ে বললাম,
–“ইফান, প্লিজ কন্ট্রোল ইয়োরসেল্ফ আ বিট।ইট হার্টস।”
–“ইউ নো দ্যাট ইউ’ল ব্রেক আন্ডার মাই টাচ।”
ইফানের বাক্য শুনে ওর চোখের দিকে তাকালাম। ইফান আমার ক্লান্ত চেহারা দেখে শব্দ করে ঠোঁটে আরও দুটো চুমু দিল।আমার কানে ঠোঁট ছুঁইয়ে হাস্কি স্বরে হিসহিসিয়ে বলল,”স্টিল, আই’ম ট্রাইয়িং, বেইব।”
–“তুমি আসলে কি চাও বল?”
–“তুমি জান আমি কি চাই।”
–“না আমি সত্যি জানি না তুমি আসলে কি চাও।কেন আমার জন্য এত পাগলামি কর।তুমি কি আমায় ভালোবাস?”
আমার কথায় ইফান নিঃশব্দে হাসল। আমার কানের লতিতে দাঁত বসিয়ে আবার শব্দ করে আদুরে চুমু এঁকে হিসহিসিয়ে বললো,”লাভ ইজ ফাকিং হার্ড। এসব করে ভালোমানুষ, আর তুমি ভালো করে জান আমি ভালো মানুষ না।”
–“ইউ আর রাইট।”
আমি দীর্ঘ শ্বাস ছেড়ে অস্পষ্ট স্বরে বললাম। ইফান কয়েক মূহুর্ত আমার দিকে তাকিয়ে রইল। আমি চোখ বন্ধ করে ঘুমানোর চেষ্টা করছি।যদিও জানি এখন ইফান ঘুমাতে দিবে না। হঠাৎ ইফান কোমল স্বরে ডেকে উঠলো,
–“জারা।”
–“হু।”
আমি চোখ বন্ধ করেই ছোট্ট করে প্রতিত্তোর করলাম।ইফান আমার মাথায় আদুরে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে জিজ্ঞেস করল,
–“তুমি কি কিছু বলতে চাও আমায়?”
ইফানের এই প্রশ্নে আমি আচমকা ফুপিয়ে উঠলাম। আমার হঠাৎ এমন কাজে ইফান আশ্চর্য হল কিছুটা।আমি নিজের মুখ দু’হাতে আড়াল করে নিজেকে শান্ত করতে ব্যস্ত হয়ে উঠলাম।ইফান শুধু তাকিয়ে দেখছে আমাকে।তার চেহারা শান্ত।আমি নিজেকে সামলে নিতেই ইফান বলল,”আমার উপস্থিতিতে কি বেড ফিল হচ্ছে?”
–“না।”
–“তাহলে?”
আমি জবাব দিলাম না।চোখে হাত ধরেই রইলাম।ইফান আমার হাত সরিয়ে দিল।গালে হাত রেখে বলল,”লুক এট মি। তোমার কি হয়েছে আমাকে বল।”
–“ইফান।”
–“হু।”
–“আমি…”
আমি বলতে গিয়েও কিছু বলতে পারছি না। ইফান আমার সাথে আবার দূরত্ব ঘোচাল।আমার গলায় মুখ গুঁজে বলতে বলল।আমি ঢোক গিলে বললাম,”পরে বলব।”
–“কেন?”
–“সিক্রেট।”
ইফান কপাল কুঁচকে আমার দিকে তাকিয়ে আছে তার কথা তাকে ফিরিয়ে দেওয়ায়। আমি ইফানের এমন ফেইস দেখে উচ্চ স্বরে হেসে দিলাম। ইফান কিছুক্ষণ আমার দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল।এইটুকু কারণে এত হাসার মানে তার বোধগম্য হলো না।তবে আমাকে এমন হাসতে খুব কমই দেখে।এভাবে হাসার কারণে আমার গালে টোল পড়ছে, এটা ইফানের কাছে বেশ ভালো লাগছে।তারপর সেও আচমকা আমার সাথে হেসে দিল।অতঃপর পুনরায় আমাতে মত্ত হল।
এদিকে আমাদের কথোপকথন আর নাড়াচাড়ায় বিরক্ত হয়ে নিম্মি বেড থেকে নেমে পড়ল। দরজা খোলা পেয়ে রাজকীয় ভাবে হাঁটতে হাঁটতে নিঃশব্দে রুম থেকে বেরিয়ে যায়।
গাড়ি চলছে নিজ গতিতে। ইনান তন্নির দিকে একবারও তাকায় নি।কিন্তু তার সিক্স সেন্স জানান দিচ্ছে তন্নি একনাগাড়ে তার দিকে তাকিয়ে। বিরক্তিতে ইনানের চোখ মুখ কুঞ্চিত হচ্ছে। ইনান একবার নিজের আহত হাতের দিকে দৃষ্টি বুলাল। সত্যিই এখন রক্ত পড়া বন্ধ হয়েছে। তবে ব্যথায় ভীষণ টনটন করছে। ইনানের জীবনে ইফান চৌধুরী ছাড়া আর কেউ কখনো এত যত্ন করে তার আহত স্থানে বেন্ডেজ করে দেয় নি।দিবে কিভাবে তার কি ইফান ছাড়া আর কেউ আপন মানুষ আছে।
ইনান তপ্ত শ্বাস ছাড়ল। হঠাৎই পাশ থেকে তন্নি শুধালো, “আপনার বাড়ি কোথায়?”
তন্নির এমন প্রশ্নে কপালে কয়েকটা সুক্ষ্ম ভাজ সৃষ্টি হল ইনানের।সে ফ্রন্ট মিররে আড় চোখে কৌতুহলী তন্নির চেহারা দেখে বিরক্তিকর কন্ঠে উত্তর করল,”নেই।”
–“নেই মানে?”
–“নেই মানে নেই।”
ইনান দাঁত কটমট করল।তন্নি চোখ উল্টে বিরবির করল ইনানকে ব্যঙ্গ করে।অতঃপর ফের শুধালো, “আচ্ছা ঠিক আছে।তো বলছিলাম আপনার মা কোথায় থাকে? না মানে বাড়ি না থাকলে থাকবে কিভাবে?”
তন্নির এই কথাটা ক্ষত স্থানে মরিচ গুঁড়ো ঢালার মতো ইনানের গায়ে লাগলো।রাগে চোয়াল শক্ত হয়ে মৃদু কাঁপছে। চোখ দুটো অস্বাভাবিক ভাবে লালছে হতে শুরু করেছে।নিজের রাগ সংবরন করতে ইনান আহত হাত মুষ্টিবদ্ধ করতে চাইল।ফলে পুনরায় তাজা রক্তে টিয়া কালার জরজেট ওড়না পুনরায় ভিজে উঠলো।তন্নি খেয়াল করলো না।সে পুনরায় শুধালো,
–“কি হলো বলছেন না যে।আপনার মা কোথায় থা…”
–“নেই।”
খুব কসরত করে নিজেকে সামলে প্রতিত্তোর করল ইনান খন্দকার। চোখগুলো ভিজে উঠেও আবার নিমিষেই আগের মতো হয়ে গেছে। শুধু লাল হয়ে আছে অত্যাধিক মাত্রায়। তন্নি এটা খেয়াল করলো না।করবে কিভাবে, ইনান তো তার দিকে একবারও তাকালো না।
মা নেই কথাটা শুনে তন্নির বুকটা ভার হয়ে আসলো।না জানি কতটা হার্ট হয়েছে লোকটা। টপিকটা চেইঞ্জ করতে তন্নি আরেক প্রশ্ন করে বসল,
–“আপনার বাবা….”
–“স্টপ দ্য ননসেন্স।”
আচমকা গাড়ির ব্রেক চেপে চিৎকার করে বলে উঠলো ইনান। তন্নি ইনানের এমন আচরণে ভরকে গেল। টপটপ করে চোখ দিয়ে পানি পড়তে লাগলো। ইনান দু হাতে নিজের চুল খামচে ধরে নিজের রাগ কমাতে চাইছে।তন্নি ফুপিয়ে কেঁদে উঠে বলল,
–“এমন আচরণ করছেন কেন?আমি কি এমন জিজ্ঞেস করেছি।শুধু তো আপনার বাবা…”
এবার আর ইনান নিজেকে ধরে রাখতে পারলো না।আচমকা তন্নির চোয়াল চেপে ধরে গর্জে উঠে, “আর একটা শব্দ উচ্চারণ করলে এখানেই তোর লাশ ফেলে দিয়ে যাব। বুঝতে পেরেছিস তুই।”
ইনানের এই রুপ দেখে তন্নি ব্যথাতুর দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল।পৃথিবীর মানুষ কি অদ্ভুত ধরণের হতে পারে। মানুষ কিভাবে এক রুপ থেকে অনায়াসে আরেক রুপ ধারণ করতে পারে তা তন্নির সত্যিই জানা নেই। এতক্ষণের তৈরি হওয়া সকল অনুভূতি লোকটা হঠাৎই ভেঙে গুড়িয়ে দিল।
ইনান তন্নির এই চাহনি দেখে একটা ঢোক গিলে সরে নিজের সিটে বসল। চোখ বন্ধ করে মাথা ঠেকাল স্টিয়ারিং এ।
–“সরি।”
তন্নি ফুপিয়ে কেঁদে যাচ্ছে। হঠাৎই ইনানের গলার মৃদু স্বর ভেসে আসে। তন্নি ইনানের দিকে আর তাকালো না।উত্তরও করল না। বাকি পথটা এভাবেই দু’জনের মধ্যে পিনপতন নীরবতায় কাটে।
গাড়ি গলির মোরে এসে থামতেই দেখল অনেক মানুষ জড়ো হয়েছে। সকলেই চিল্লাচিল্লি করে কাউকে খুঁজছে।তাদের মধ্যে তন্নির চোখ আটকাল সুমাইয়া নাফিয়া এবং পাশের রুমের সিনিয়র আপুরা সহ পুরো বিল্ডিংয়ের মানুষ জড়ো হয়েছে তাকে খুঁজতে।তন্নি তাড়াহুড়ো করে গাড়ি থেকে নেমে পড়ে।
ইনান আর এক মূহুর্ত না দাঁড়িয়ে সেখান থেকে চলে যায়।এদিকে তন্নিকে দেখতে পেয়ে সুমাইয়া নাফিয়া ছুটে এসে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কাঁদতে আরম্ভ করে।
মধ্যে রাত, আর রাতের এই সময়টাতেই যত সব অপকর্ম সংঘটিত হয়। রাতের ক্লাবগুলোও লালনীল বাতিতে আলোকিত হয়। পুরুষরা নারী সঙ্গে মত্ত হয়। অল্প বয়সী ছেলেমেয়েরা মাতাল হয়ে নাচানাচি করে।এক পর্যায়ে নিজেদের সকল হুঁশ হারিয়ে মেতে উঠে পাপের লীলা খেলায়।উচ্চ স্বরে গান বাজছে। পঙ্কজ আজ ক্লাবের মেইন গেস্ট। তার জন্যই আজকে ক্লাবে আলাদা স্পেশাল আয়োজন করা হয়েছে। খুঁজে খুঁজে সুন্দরী রেডি করে রাখা।সন্ধ্যা থেকে পঙ্কজ এখানেই আছে। এখন তার পাশে দুজন সুন্দরী উলঙ্গ অবস্থায় পঙ্কজ কে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ধরে আছে।পঙ্কজের দেহে কাপড় বলতে একটা আন্ডার পেন্ট আছে। যার অবস্থানও ঠিকঠাক নেই। সাদা ফিতা দুটো ঝুলে আছে। একবার এই পাশের মেয়ের সাথে ঘনিষ্ঠ হচ্ছে তো আরেকবার আরেক পাশের মেয়ের সাথে।
কি আশ্চর্য জনক বিষয় মেয়ে দুটো খিলখিল হেসে আনন্দে আত্ম হারা।হঠাৎই দরজায় নক হয়। পঙ্কজ বিরক্তি নিয়ে বলে ভেতরে আসতে। দুজন গার্ড ভেতরে এসে দেখে পঙ্কজ আপত্তিকর অবস্থায়। তবে গার্ড দু’টোর মধ্যে কোনো ভাবান্তর হলো না।কারণ তারা এসব দেখেই অভস্ত্য।
গার্ড দু’টো কিছু বলতেই পঙ্কজ দাঁতে দাঁত পিষল।অতঃপর ক্রুর হেসে বলল ভেতরে নিয়ে আস।
গার্ডগুলো তৎক্ষনাৎ রুম থেকে বেরিয়ে তিনজন বিশাল দেহী লোকগুলো কে নিয়ে আসল যারা কিছুক্ষণ আগে তন্নিকে তুলতে গিয়েছিল।উহু তন্নিকে নয় শুধু। পঙ্কজ বলেছিল জাহানারার বান্ধবী একটাকে তুলে আনতে।সবগুলোই সুন্দর দেখতে।যে কোনো একটা হলেই তার হবে।
এই তিনজন লোক পঙ্কজের লোক।পঙ্কজ এদের দেখে হেসে বলল,”কি ব্রো ওয়্যার ইজ মাই বিচ?”
লোক তিনটা ভয়ে কাঁপতে লাগল।তাদের দেহের অবস্থাও বেশি ভালো না।ইনানের হাতে মার খেয়ে অনেক আহত। একজন ভয়ে ভয়ে বলল,”বস আসলে…”
–“আনতে পেরেছিস কি না?”
–“না বস।”
পঙ্কজ হো হো করে হেসে দিল।মেয়ে দুটোও হাসল পঙ্কজের সাথে। পঙ্কজ মেয়ে দুটোকে চুমু দিয়ে আবার গার্ডদের দিকে তাকিয়ে বাঁকা হাসলো।অতঃপর কোনো ইঙ্গিত না দিয়ে বালিশের নিচ থেকে বন্দুক বের করে মূহুর্তেই লোক তিনটার খুলি উড়িয়ে দিল।মেয়ে দুটো পঙ্কজের এমন নৃ’শংস’তা দেখে ভয়ে আতংকে উঠল।পঙ্কজ হেসে মেয়ে দু’টোর ঠোঁটে ঠোঁট ছুঁইয়ে বলল,”ডোন্ট অ্যফ্রেইড বিচ।লেট’স এনজয়।”
মেয়ে দু’টো তবুও স্বাভাবিক হতে পারল না।পঙ্কজ হাত নাড়াতেই গার্ড দু’টো ডেড বডিগুলো সরিয়ে নেয়।পঙ্কজ আবারও মেয়ে দু’টোতে মত্ত হল।
ঘুমের মাঝে হঠাৎই বমি বমি ফিল হতেই রেচিং করে ধরফরিয়ে উঠে বসলাম। রুম মৃদু অন্ধকারাচ্ছন্ন, শুধু ফেইরি কিছু লাইট জ্বলছে। আমি জোরে জোরে শ্বাস টেনে বুকে হাত বুলিয়ে দিতে থাকলাম। ইফান উপুড় হয়ে ঘুমচ্ছে।তার গরম লাগছিল বলে শরীর থেকে কম্ফোর্টার সরিয়ে ফেলেছে আরও অনেক আগে। এখন ওর উন্মুক্ত পিঠ দৃশ্যমান।আমারও এখন কেন জানি গরম লাগছে।চোখেমুখে একটু পানি দিলে হয় তো ভালো লাগবে। ফোনটা হাতে নিয়ে দেখলাম রাত প্রায় চারটা। আমি দেড়টার দিকে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। তবে ইফান কখন ঘুমিয়েছে বলতে পারব না।ঘুমানোর আগে বলেছিলাম মাথা ধরেছে।তাই ইফান আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছিল।
আমি ব্লাউজের বোতামগুলো লাগিয়ে কাঁধে শাড়ির আঁচল তুলতে যাব তখনই টান পড়ে। ইফান আঁচলের উপর শুয়ে আছে।আমি আস্তে আস্তে ওর শরীরের নিচ থেকে বের করলাম। বিছানা থেকে নেমে সোজা হয়ে দাঁড়াতেই তল পেটে অসহ্য যন্ত্রণা শুরু হয়। সারা শরীরেও চিমচিম করে ব্যথা করছে। আমি মুখ ফুলিয়ে শ্বাস নিলাম। তল পেটে হাত ধরে ওয়াশরুমের দিকে যাওয়ার জন্য এক পা এগোতেই কোথা থেকে নিম্মির চিৎকার ভেসে আসল।আমার বুকটা কেঁপে উঠেছে। আমি ঝটপট ইফানের আরেক পাশে তাকাতেই দেখি নিম্মি নেই। আবার নিম্মির চিৎকার কানে আসল।আমি নিজের শরীর ব্যথা ভুলে ছুটে বেলকনিতে গেলাম। পাগলের মতো অস্থির হয়ে আসেপাশে চোখ বুলাতেই নজরে পড়ল বাগানের এক কোথায় দাউদাউ করে আগুন জ্বলছে। আর সেই আগুনে পুড়ছে একটা খাঁচা যার ভিতর নিম্মি বাঁচার জন্য চেচিয়ে লাফাচ্ছেে।আমি আর কিছু না দেখে চিৎকার করে উঠলাম। আমার চিৎকার শুনে ইফান পাগলের মতো ছুটে আসে।
–“জান কি হয়েছে তোমার?”
আমি হাউমাউ করে কাঁদতে কাঁদতে বাগানের দিকে আঙ্গুল তাক করে দেখালাম।ইফান এক ঝলক দেখেই ছুটে রুম থেকে বেড়িয়ে গেল।আমিও চিৎকার করে আগুন আগুন নিম্মি বলতে বলতে ওর পিছনে বেরিয়ে গেলাম।
আমার রুম সাউন্ড প্রুফ হওয়ায় কেউ চিৎকার চেচামেচি শুনতে পায়নি। তবে রুম থেকে বের হয়ে চিৎকার করতেই সকলে বেরিয়ে আসল।ইফান দৌড়ে আগুনে জ্বলতে থাকা খাঁচাটায় থাবা মেরে আরেক দিকে ফেলে দিল। মাহিন আর ইমরান দৌড়ে পানি এনে ডালতেই আগুন নিবে।এদিকে নিম্মির সারা দেহ পুড়ে গেছে শুধু বুকটা উঠানামা করছে।ইফান খাঁচা থেকে বিধস্ত নিম্মিকে বের করতেই আমি ওকে নিজের কোলে নিয়ে নিলাম। দম ফুরিয়ে আসা আমার আদরের মেয়েটা শুধু শেষ একবার আমার কোলে মৃদু স্বরে মিয়াঁও বলে ডাকল।অতঃপর তার নিষ্পাপ প্রানপাখিটা দেহ ছেড়ে পালিয়ে গেল।
নিম্মির দম চলে যেতেই আমি গগন কাঁপিয়ে চিৎকার করে ঢেলে পড়লাম। মাটি স্পর্শ করার আগেই ইফান তার বুকের সাথে আমার নিস্তেজ দেহটা চেপে ধরে চোখ বন্ধ করে বিরবির করল,
–“আ’ম সরি, আ’ম সরি জান।আই কুডন্ট প্রটেক্ট হার।”
আমার কোলে থাকা পুড়ে দুর্গন্ধ বের হওয়া নিম্মির নিথর দেহে হাত বুলিয়ে ইফান পুনরায় বিরবির করল,”আ’ম সরি,পাপা কুডন্ট প্রটেক্ট ইয়্যু।”
অতঃপর নিম্মিকে মাহিন নিয়ে নিল আমার কোল থেকে। ইফান আমাকে কোলে করে রুমের উদ্দেশ্য হাঁটা ধরল। আজ চৌধুরী বাড়ির প্রতিটি সদস্য অবাক চোখে এই জ্ঞানহীন মেয়েটির দিকে তাকিয়ে। কারণ তারা কখনো আমাকে কাঁদতে দেখে নি।কখনো এভাবে দুর্বল হতে দেখে নি। ওরা তো জানে না আমার ভেতরটা আসলে কতটা দগ্ধ। খুব সখ করে জায়ান ভাইয়ের নীরব নামের প্রথম অক্ষর দিয়ে নিম্মির নাম রেখেছিলাম। সেও আমাকে জায়ান ভাইয়ের মতো একা করে পালিয়ে বেঁচে গেল।
বিশ্বাস কর, সেদিনের পর আবারো আমার জীবনের সবকিছু এলোমেলো হয়ে গিয়েছিল। আমি কখনো কল্পনাও করিনি চৌধুরী বাড়ির যাকে আমি সবচেয়ে বেশি বিশ্বাস করতাম, যার প্রতি আমার কখনো কোনো অভিযোগ ছিল না সেই মানুষটায় আমার সবচেয়ে বড় শত্রু।
চলবে,,,,,,
🚫এলার্টঃ কমেন্টে দেখি গল্প শেষ হওয়ার জন্য সকলে উতলা। হুম এখন প্রতিটি পর্ব যাবে আর আমরা একটু একটু করে গল্পের শেষ প্রান্তে এসে থামব।যাই হোক আগেও বলেছি এখনও বলছি জাহানারা গল্পের সমাপ্তি নিয়ে কিছু বলবো না। এটা একটা টুইস্ট ধরে নাও।আর সমাপ্তির আগেও গল্পে অনেক ভাঙা গড়া থাকে।অনেকেই দুর্বল চিত্তের পাঠিকা আছ।সবাই কে বলছি মানসিক ভাবে প্রস্তুত থেকো। আসছে কিছু সিন খুব স্পর্শকাতর হতে পারে।
(বানান ভুল থাকতে পারে কষ্ট করে বুঝে পড়ে নিও।অনেক বড় পর্ব দিয়েছি তাই কোনো অভিযোগ করতে পারবে না।হ্যাপি রিডিং 😗)
জাহানারা
জান্নাত_মুন
পর্ব :৬৪
🚫ক’পি করা নিষিদ্ধ
*
*
বাইরে কনকনে ঠান্ডা। দুদিন ধরে সূর্যের দেখা নেই। ফলে সারাদিনই কুয়াশায় ঢাকা পড়ে থাকে। আমি বেডে উপুড় হয়ে কম্ফোর্টারের নিচে শুয়ে একটা উপন্যাসের বই পড়ছি। গত এক সপ্তাহ ধরে একটু একটু পড়ে আজ শেষ করলাম। তবে কি পড়লাম নিজেই মনে করতে পারছি না।সবকিছুই বিরক্তিকর হয়ে উঠছে। সেই রাতে নিম্মিকে হারিয়ে আমি জ্ঞান হারাই, তারপর সকালে জ্ঞান ফিরে অনেক দেরীতে। আর জ্ঞান ফিরার পর থেকে ইফানকে খুঁজে পাই নি।মীরা বলে, ইফান কি একটা কাজে দেশের বাইরে চলে গেছে।
বইটা টেবিলে রেখে উঠে দাঁড়ালাম। শীতে শরীরের লোম দাঁড়িয়ে যাচ্ছে। কিন্তু এখন আমার তৈরি হতে হবে। এই এক সপ্তাহ ধরে চৌধুরী বাড়ির সকলের থেকে দূরত্ব বজায় রেখে চলছি।কাউকেই এখন বিশ্বাস হয় না।সবার সাথে কথাও কম বলি।সারাদিন বাড়িতে আমাকে কেউ পায় না। ভার্সিটির নাম করে যে নয়টার সময় বের হই, আরেকবার রাত আটটার আগে বাড়ি ফিরে আসি না।
ইফান চলে যাওয়ার আগে মীরাকে বলে গেছে আমার খেয়াল রাখতে। কোথায় যায়, কি করি, সব যেন মীরা দেখে। তাই মীরা সবসময় আমার সঙ্গে থাকার জন্য জোর করেছে, যার কারণে দুদিন আগে আমার সাথে কথা-কাটাকাটি হয়। আমি স্পষ্ট বলে দিয়েছি আমার থেকে দূরে থাকতে। আমার জীবনে আমি চাইনা কাউকে। আমার কথায় হয়তো সেদিন মীরা হার্ট হয়েছে। আমার সঙ্গে কথা খুব কম বলে। আমিও ওর কাছে সরি বলি নি। আপাতত সরি বলার মনমানসিকতাও আমার নেই। দেয়াল ঘড়ির কাটা আটটার ঘরে,আমি আর সময় অপচয় না করে ওয়াশরুমে চলে গেলাম।
মেসেজে একটুআধটু কথা বলতে বলতে এখন ইতি আর জিতু ভাইয়ার মাঝে সম্পর্কটা একটু গাঢ় হয়েছে। সারাদিন ওদের কথা হয় না।রাতে জিতু ভাইয়া অফিস শেষ করে বাসায় এসে ইতির সাথে বেশ অনেকটা রাত কথা বলে।জিতু ভাইয়া কখনো ইতিকে মেসেজ দেয় না।বরং ইতি নিজে থেকেই হাই হ্যালো বলে কথা বলা শুরু করে।অতঃপর সারাদিন কি কি করল সব বলতে থাকবে।
এদিকে মেয়েটার কথা শেষ হতে না দেখে জিতু ভাইয়া এত রাত অব্ধি ইতিকে জেগে থাকতে বারণ করে। কিন্তু লাজুক মেয়েটা ভালোই প্রেমে মজেছে। কোনো কারণে জিতু ভাইয়া ইতির মেসেজের রিপ্লাই দিতে একটু দেরী হলেই ইতির চোখে পানি চলে আসে।ওদের এখনো ফোন কলে কথা হয় নি। জিতু ভাইয়া ইচ্ছে করেই তাদের মধ্যে দূরত্ব রাখতে চায়। এতে অবশ্য ইতির সুবিধায় হয়েছে। মেসেজে কথা বললে তার লজ্জা লাগে না। কিন্তু কারো সাথে ফোনে কথা বললেই লজ্জায় সালাম দেওয়াটায় ভুলে যায়,বাকি কথা তো দূরের বিষয়।
অপরদিকে নোহা ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে স্বপ্নের দেশে পাড়ি দেয়। তার আবার কত রঙের স্বপ্ন। জিতু ভাইয়ার সাথে লং ড্রাইভে যায়,পার্টি করে আরও যা যা করে তা সব পরদিন বাড়ির সকলকে শুনাবে।বিশেষ করে ফারিয়ার সাথে তার বেশ ভাব, তাই তাকে সব শুনাবে। আগের নোহার সাথে এখনের নোহার বেশ পরিবর্তন লক্ষ করেছি। আগে যেমন কোনো ছেলে দেখলেই প্রপোজাল করে বসত, এখন আর এমন করে না। নাইট ক্লাব, ড্রিংক করে মাতলামি করার অভ্যাসও এখন নেই। বরং এই বয়সেও প্রতিদিন ইতির সাথে কলেজে যায়।সেখানে জুইদের সাথে সারাদিন কাটিয়ে দেয়। নোহা কলেজে আসে বলে জিতু ভাইয়াও আর আসে না। তার পরিবর্তে আবির এসে জুইয়ের খোঁজ খবর নিয়ে যায়।
*
ইতি ওয়াশরুমে গেছে কলেজে যাওয়ার জন্য রেডি হতে। তক্ষুনি নোহা রেডি হয়ে ইতির রুমে আসল। ঠান্ডা বেশি হওয়ার কারণে মোটা উষ্ণ হুডি গায়ে দিয়ে আছে। নোহা শীতে কাঁপতে কাঁপতে তাড়াতাড়ি ইতির বেডে ওঠে গায়ে কম্ফোর্টার টেনে নিল। হঠাৎই মেসেজের টুং শব্দ হতেই পাশে তাকিয়ে দেখল ইতির ফোন থেকে হয়েছে। নোহা ফোন হাতে নিতেই চোখে পড়ল মেসেঞ্জারের নোটিফিকেশন এসেছে,”আজ রাতে আমার মেসেজের জন্য অপেক্ষা করো না, আমি একটা মিশনে থাকব।”
নোহা বেশ শান্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল মেসেজটির দিকে। আরমান শেখ জিতু ইতিকে মেসেজ করেছে! তার মানে লিটিল গার্লের সাথে জিতু বেইবির কথা হয়।তাহলে আমাকে লিটিল গার্ল কেন একবারও বলল না? মনে মনে কয়েক মূহুর্ত এটা-সেটা ভেবে মেসেজ সিন করল। একটু একটু করে উপরের মেসেজগুলো পড়ল।নোহা এত ভালো বাংলা পড়তে পারে না,তার উচ্চারণ করতে সমস্যা হয়।তবুও ভেঙে ভেঙে পড়ল।নোহা নিষ্প্রভ ভাবে বেশ কিছুক্ষণ দেখল মেসেজ গুলো।
ফ্রেশ হয়ে ওয়াশরুম থেকে ইতি বেরিয়ে আসল। নোহাকে রেডি দেখে তাড়াহুড়ো করে বলল,
–“নোহাপি তুমি রেডি হয়ে চলে এসেছ, আচ্ছা একটু বস আমি দু মিনিটেই রেডি হয়ে যাব।”
নোহা ইতির দিকে তাকাল না, উত্তরও করল না। নোহাকে এভাবে চুপ থাকতে দেখে ইতির নজর পড়ল নোহার হাতে তার ফোন। মূহুর্তেই ইতির চেহারায় আতংক ফুটে উঠল। ইতি ভয়ে একটা ঢুক গিলে বলল,
–“তুমি কি করছ?”
–“তোমার সাথে জিতু বেইবির কথা হয়?”
নোহা পাল্টা শুধালো। ইতি ঢোক গিলে মাথা নিচু করে উশখুশ করতে লাগল। নোহা শান্ত চেহারায় গাল ফুলিয়ে অভিমানী স্বরে বলল,”তোমার কাছে বেবির আইডি ছিল, আবার কথা হয় আমাকে বল নি কেন?”
–“ঐ মনে ছিল না আরকি।”
–“তুমি এটা একদমই ঠিক করনি লিটিল গার্ল। আমাকে বললে আমিও কথা বলতাম।”
–“তুমি কেন কথা বলতে?”
ইতি উত্তর পাওয়ার জন্য নোহার দিকে তাকিয়ে। নোহা প্যান্টের পকেট থেকে নিজের ফোন বের করতে করতে বলল,”বড়দের অনেক কথা থাকে যা লিটিল গার্লদের শুনতে নেই।”
–“আমিও তো বড় হয়ে গেছি,আমাকে বল।”
–“উহু তুমি ছোট, বলা যাবে না।”
বলেই নোহা ইতির আইডি থেকে জিতু ভাইয়ার আইডির লিংক নিয়ে নিজের আইডি দিয়ে ফ্রেন্ড রিকুয়েষ্ট পাঠাল। ইতি রেডি হচ্ছে। নোহা ফোনের দিকে তাকিয়ে, এখনো তার রিকুয়েষ্ট একসেপ্ট হয় নি। নোহা নিজের আইডিও একবার ভিজিট করল, নাহ্ তার প্রোফাইল পিক অনেক সুন্দর। সেখানে নিজের সুন্দর একটা পিক দেওয়া। যে দেখবে তারই পছন্দ হয়ে যাব।মনে মনে নিজের প্রসংশা করতে গিয়ে উচ্চ স্বরে হো হো করে হেসে দিল। ইতি কি বুঝল কি বুঝলা না, সেও নোহার সাথে তাল মেলাল।
এদিকে নোহা জিতু ভাইয়ার আইডি ভিজিট করছে।জিতু ভাইয়ার প্রতিটি পোস্টের কমেন্ট বক্সে বিউটিফুল, ওয়ান্ডারফুল, হটি আরও যা যা প্রসংশা করা যায় তা লিখে সাথে হট ফেইসের ইমোজিও দিয়ে দিল তিন চারটা করে। হঠাৎই একটা পুরাতন পোস্টে নোহার চোখ আটকায়। বেশ জুম করে পিকটা দেখে টাস করে দাঁড়িয়ে চেচিয়ে উঠলো,
–“হু ইজ?”
ইতি ছুটে এসে ফোনে তাকিয়ে দেখল সেই পিকটা, যেখানে জিতু ভাইয়ার দিকে ডক্টর সুমি তাকিয়ে আছে ডেবডেব করে। ইতি নাক ফুলিয়ে বলল,
–“আরেকটা আছে এই দেখ।”
আরেকটা পিক বের করল।সেখানে জিতু ভাইয়া মাস্ক আর একটা ক্যাপ পড়ে থাকা মেয়ের দিকে তাকিয়ে হাসছে। নোহা আবার ধপ করে বিছানায় বসে মনযোগ দিয়ে ছবিটা দেখে ইতির দিকে তাকিয়ে গাল ফুলিয়ে বলল,
–“হু?”
–“জানি না। তবে দেখে ডাইনি মনে হচ্ছে।”
–“হোয়াট ইজ ডাইনি?”
নোহার প্রশ্নে বোকার মত তাকালো ইতি। চোখ পিটপিট করে অবিশ্বাস্য স্বরে বলল,”তুমি জান না।”
নোহা দু পাশে মাথা নাড়াল। ইতি একটু ভেবে আঙ্গুল দিয়ে পিকটার মেয়েটাকে দেখাল,”এই দেখ এই মেয়েটা কিভাবে জিতু বেইবি থুক্কু জিতু ভাইয়াকে নিজের দিকে আকৃষ্ট করেছে। আর এমন যারা করতে পারে তাদের ডাইনি বলে। দাদি বলেছে, ডাইনি একবার নজর দিলে ক্ষতি না করে ছাড়ে না।”
নোহা ভাবুক চেহারা করে বলল,”কি বলছ লিটিল গার্ল, এখন এই ডাইনির থেকে কিভাবে বেবিকে বাঁচাব? না না না কিছু একটা করতে হবে।এটা কে আগে আমাদের জানতে হবে।”
নোহার কথায় ইতি সায় জানাল। অতঃপর দু’জন সিঁড়ি দিয়ে লাফিয়ে লাফিয়ে ড্রয়িং রুমে হাজির হল। ওদের খুশি খুশি দেখে পলি শুধালো,
–“কি বিষয় এত খুশি কেন?”
ইতি ব্রেকফাস্ট করতে করতে বলল,”ছোট ভাবি আজ জান আমরা সব ফ্রেন্ডরা মিলে ফুচকা খেয়ে পার্কে ঘুরাঘুরি করব।”
–“ইশশশ তোমরা প্রতিদিন ফুচকা খাও ঘুরাঘুরি কর, আমারো তোমাদের সাথে ঘুরতে, ফুচকা খেতে মন চাই।”
–“তাহলে রেডি হয়ে চলে আস। আমরা সবাই এনজয় করব।”
নোহার কথায় পলি আসেপাশে আড় চোখে তাকিয়ে দেখল। সবাই ব্রেকফাস্ট করছে সাথে বিজনেস নিয়ে আলোচনা করছে। পলি নিচু কন্ঠে বলল,”না গো তোমরা যাও। আমি চলে গেল বাসায় কাকিয়াকে সাহায্য করবে কে?”
–“আমার কথা তোমাকে ভাবতে হবে না।তোমার যদি মন চায় তাহলে ওদের সাথে বাইরে থেকে একদিন ঘুরে আস।”
কাকিয়া সবাইকে খারার বেড়ে দিচ্ছে তখনই পলিদের কথা কানে আসে। কাকিয়ার কথায় সকলে এদিকে তাকাল। নুলক চৌধুরী আর নাবিলা চৌধুরী এক নজর তাকিয়ে চোখ সরিয়ে নিল। ইকবাল চৌধুরী হেসে বলল,”ছোট আম্মু তোমার মন চাইলে ঘুরে আস।”
বাড়ির কর্তার অনুমতি পেতেই পলির মন লাফিয়ে উঠল।সে যাবে বলে দৌড়ে রুমে চলে আসল ইমরানকে জানাতে। ইমরান নাকমুখ ঢেকে এখনো ঘুমচ্ছে। পলি ধপ করে ইমনকে উপর থেকে জড়িয়ে ধরে আহ্লাদি করে বলল,”এই শুনছ, শুন না আমি ইতিদের সঙ্গে ঘুরতে যাব।”
ইমরান ঘুমের মধ্যে কি বলল পলি বুঝল না। সে ইমরানের গা থেকে কম্বল সরাতেই ইমরান শীতে মুখ দিয়ে আওয়াজ করে বলল,”ওও ঠান্ডা জানু কি করছ?”
–“এদিকে তাকাও আমি ঘুরতে যাব।”
এবার পলির কথায় ইমরান ঘুমঘুম চোখে পলির দিকে তাকালো। পলি গাল ফুলিয়ে তার দিকে তাকিয়ে। ইমরান নিজের প্রেয়সীর লতানো কোমর জড়িয়ে ধরে নিজের কাছে মিশিয়ে নিল। পলি নিজেকে ছাড়াতে ছাড়াতে বলল,”ধুর কি করছ এসব! আমার জন্য তোমার বোনরা অপেক্ষা করছে।”
ইমরান টুপ করে পলির ঠোঁটে চুমু খেয়ে নিল।অতঃপর পলির গলায় মুখ ডুবিয়ে আদুরে স্পর্শ করতে ব্যস্থ হয়ে উঠলো।পলি জোর করে ইমরানের মুখে হাত ধরে বলল,”আমি যাব ছাড়।”
–“উমম বউজান এত সকালে উঠে চলে গিয়েছিলে কেন? কোথায় আমি ভাবলাম সকালে উঠে তোমার এলোমেলো আদুরে চেহারাটা দেখব কতটা গ্লো করছে রাতে আমার আদ…”
–“আর কথা বলবে না তুমি। অসভ্য লুচু লোক।”
রাতের কথা মনে পড়তেই পলির মুখ লজ্জায় লালনীল হয়ে যাচ্ছে। পলিকে লজ্জা পেতে দেখে ইমরান ঠোঁট কামড়ে হেসে আবার পলির ঠোঁটে শব্দ করে চুমু খেল।অতঃপর হাস্কি স্বরে বলল,”সাবধানে যাবে কেমন। কোনো প্রবলেম হলেই আমাকে কল করবে। আমি যদি পারি তাহলে তোমাদের গিয়ে নিয়ে আসব ওকে।”
–“আচ্ছা।”
কথা শেষ হওয়ার পরেও পলিকে ছাড়ার নাম নেই। বরং ওকে জড়িয়ে ধরেই আবার চোখ বন্ধ করে ফেলেছে।পলি মুচরামুচরি করেও নিজেকে ছাড়াতে না পেরে ইমরানের ঠোঁটে চুমু খেয়ে কামড়ে দিল। ইমরান ঝটপট পলিকে ছেড়ে নিজের ঠোঁট চেপে ধরতেই পলি দৌড় দিল। ইমরান ঠোঁটে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলল,
–” আমি কিন্তু ভুলব না। রাতে তোমার খবর আছে।”
পলি ইমরানের কথাকে পুনরাবৃত্তি করে ভেঙ্গচি কেটে বলল,” রাতে তোমার খবর আছে।”
–“তবে রে।”
বলেই ইমরান বিছানা থেকে নামার জন্য উদ্ধত হল।এটা দেখে পলি হাসতে হাসতে ছুটে ওয়াশরুমে ঢুকে পড়ল।বউয়ের এমন ছেলেমানুষী দেখে ইমরানের ঠোঁটেও হাসি ফুটে উঠেছে।অতঃপর সে আবার কম্বল মুড়ি দিয়ে শুয়ে পড়ল।
সিআইডি অফিস।।
ইদানীং সিআইডি অফিসারদের ব্যস্ততা আরও দ্বিগুণ বেড়েছে। দেশের অলিগলিতে একের পর এক লা’শ পাওয়া যাচ্ছে। আর প্রতিটি লা’শই বিধ’স্ত অবস্থায় দেখা যায়। আবার নারী প্রচার চক্রটিও আগের তুলনায় সক্রিয় হয়ে ওঠেছে। এ ঘটনাগুলো নিয়ে দেশে আতংক ছড়িয়ে পড়েছে। সাধারণ জনগণ দ্রুত বিচার চাইছে। ফলস্বরূপ উপর মহল থেকে সিআইডিদের উপর অনেক চাপ পড়ছে। জনগণ ভাবছে সরকারের অপারগতার কারণে এখনো ক্রিমিনালরা আটক হচ্ছে না। বর্তমান সরকারের বিরোধী দলগুলোও সুযোগ লুফে নিয়ে জনগণকে উষ্কে দিচ্ছে। তাই এবার যা করার তাড়াতাড়ি করতে হবে। না হলে দেশের সরকার ও আইন কারো প্রতিই সাধারণ জনগণের আস্থা থাকবে না।
সব অফিসাররা নিজেদের ডেস্কে বসে মনযোগ দিয়ে কাজ করছে। তারা ইতিমধ্যে চাঞ্চল্যকর তথ্য খুঁজে পেয়েছে। এই তথ্যগুলো এখনো সিআইডির ভেতরই আছে। অফিসে পিনপতন নীরবতা। হঠাৎ কারও আগমনে সকলের দৃষ্টি ঘুরে সেদিকে। আগমনকারীকে দেখা মাত্রই সকলে সিট ছেড়ে উঠে দাঁড়ায় এবং একসঙ্গে সালাম দেয়।
–“আসসালামু আলাইকুম ম্যাম।”
আগমনকারী হালকা মাথা নাড়িয়ে এগিয়ে গেল এসপির ডেস্কের দিকে। জিতু ভাইয়া খুব মনযোগ দিয়ে কম্পিউটারের কিবোর্ড চাপছে। তার ডেস্কের কাছে কারো উপস্থিতি উপলব্ধি করে হালকা চোখ ঘুরাল নিচের দিকে। পায়ে স্নিকার্স এবং লেগিংস পড়ে কেউ দাঁড়িয়ে আছে। চোখ উপরের দিকে উঠাতেই দেখল কালো হুডির পকেটে দু’হাত গুঁজে রাখা, মাথায় হুডির হুড তুলা।মুখে কালো মাস্ক এবং চোখে কালো রোদচশমা। জিতু ভাইয়া মুচকি হেসে তার পাশে বসার জন্য হাত দিয়ে ইশারা করল। বাকি অফিসাররাও জিতু ভাইয়ার ডেস্কের কাছে এসে দাঁড়াল। অফিসার কণা হাস্যজ্জল চেহারায় বলল,
–“ও মাই গড! জারা ম্যাম আপনি হঠাৎ !”
আমি মুখের মাস্ক আর সানগ্লাস খুলে সবার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসলাম। আমি সিআইডি আন্ডারকভার অফিসার জাহানারা শেখ। আজ থেকে প্রায় দেড় বছর আগে সিআইডি তে জয়েন করি। আমার সম্পর্কে জানে সিআইডি টিম আর উপর মহলের হাতেগোনা দু থেকে তিনজন। সাধারণত আন্ডারকভার অফিসারদের পরিচয় অতি গোপনে থাকে। তাদের একটা গোপন মিশনে পাঠানো হয় তথ্য সংগ্রহের জন্য। আমিও সেই একটি মিশনে আছি। আমার দক্ষতা এবং সাহসিকতার জন্য জিতু ভাইয়া নিজে নারী পাচার চক্র কেইসের তদন্তের দায়িত্ব আমাকে দেয়। অনেক তথ্য এবং সূত্র অনুযায়ী চৌধুরী বাড়ির উপর আমার নজর ছিল। আর মাঝখানে আমার অপ্রত্যাশিত বিয়েটা ছিল একটা নিছক দূর্ঘটনা।
আমি সিআইডি অফিসে এসেছি খুব কম,যতবার এসেছি ততবারই কোনো না কোনো ছদ্মবেশে। সবার সাথে আমার যোগাযোগ থাকে গোপনে। যেমন মাঝ রাস্তায় যখন মানুষে ভর্তি থাকে, কখনো অটোতে, তো আবার ভার্সিটিতে। কোনো সুনির্দিষ্ট স্থান নেই। একেক সময় একেক স্থানে। আজ জিতু ভাইয়া আমাকে নিজে সিআইডি অফিসে ডেকে পাঠিয়েছে। জিতু ভাইয়া কম্পিউটারে কিছু একটা বের করে বলল,
–“লুক, চিনতে পারছিস।”
আমি মনিটরের স্ক্রীনে তাকিয়ে রইলাম আশ্চর্য নয়নে। বাকি সিআইডি অফিসারররাও চরম অবাক। আমাদের আশ্চর্য হতে দেখে জিতু ভাইয়া ঠোঁট বাকিয়ে হাসল।
–“সি ইজ আ ডেঞ্জারাস। সে নিজেকে চতুর ভেবেছিল। কিন্তু সে জানে না বাপেরও বাপ থাকে।”
–“মীরা চৌধুরী!!”
আশ্চর্য হয়ে উচ্চারণ করল অফিসার আবির। জিতু ভাইয়া হেসে বললো,”ইয়েস মীরা চৌধুরী অর্থাৎ ইন্টারন্যাশনাল নাম্বার ওয়ান হ্যাকার।”
–“কিহ্!”
অফিসার কবির অবিশ্বাস্য স্বরে আওড়াল। “এটা কিভাবে হতে পারে? একটা মেয়ের এত ক্ষমতা কিভাবে সম্ভব?”
কবিরের কথার পরেই হিমন বড় বড় চোখ করে মিনিটরের দিকে তাকিয়ে থেকে বললো,”আমার বিশ্বাস হচ্ছে না কিছুতেই। এইটুকু একটা মেয়ে এত বড় একজন হ্যাকার। তার চেয়েও বড় কথা, কত বড় সাহস আরেক বিল্ডিং থেকে সিআইডি বিল্ডিং এ দড়ি বেয়ে চলে এলো। এলো তো এলো আমাদের সব ইনফরমেশন চুরি করে পালাল!!”
এতক্ষণ আমার চেহারায় কোনো ভাবান্তর হয় নি। কিন্তু এখন ওদের এমন সব হাস্যকর কথাবার্তা শুনে চুপ করে বসে থাকতে পারলাম না। আমি আচমকা চেয়ারে মাথা হেলিয়ে উচ্চস্বরে হেসে উঠলাম। আমাকে এভাবে হাসতে দেখে সকলে ভরকে গেল। সকলে উৎসুক দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে। আমি নিজেকে শান্ত করে জিহ্বা দিয়ে গাল ঠেলতে ঠেলতে ভারিক্কি স্বরে বলে উঠলাম,
–“মীরা চৌধুরী আই মিন চৌধুরী কন্যা, দ্য ডেঞ্জার। কি চেন তোমরা তাকে? নাউ আই’ল সে এবাউট হিম,
সি ইজ আ ক্যাপ্টেন ইন্টারন্যাশনাল ক্রিমিনাল মাফিয়া গ্যাং ব্ল্যাক ভেনম এর ক্যাপ্টেন। আন্ডারওয়ার্ল্ডের মোস্ট ওয়ান্টেড প্রভাবশালী মাফিয়া, আমার গুনধর স্বামী মাফিয়া বস ইফান চৌধুরীর নিউরন। আড়ালে সকল তদারকির দায়িত্ব তার কাঁধে। ইফান কিংবা তার গ্যাং কোনো মিশনে গেলে আগে মীরা সেখানকার সকল নেটওয়ার্ক নিজের আয়ত্তে আনে। এন্ড বড় বড় ব্যাংক জালিয়াতি করাও তার কাছে দুধ ভাত।”
–“হোয়াট, তুই মারী চৌধুরী সম্পর্কে আগে থেকেই এত কিছু জানিস, কই আমাকে তো জানালি না? তুই জানিস গত এক সপ্তাহ পাগলের মতো খুঁজেছি কে হতে পারে যে আমাদের অফিসে ঢোকার সাহস দেখায়। আসেপাশের সব সিসিটিভি চেক করেও কোনো উত্তর পাইনি। কারণ আগে থেকেই সকল নেটওয়ার্ক মীরা চৌধুরীর আন্ডারে ছিল। আমি আশে পাশের এরিয়ার বিগত কদিনের সকল ফুটেজ চেক করি।সারাদিন কে বা কারা আশেপাশে ঘুরঘুর করেছে সকলের গতিবিধি দেখি। অনেক খুঁজে সব ঘাঁটিয়ে হঠাৎ নজরে আসে একজন বাইকারকে। যে কিনা গত দুদিন ঐ এরিয়ায় এসেছিল। কিন্তু সেদিন আমাদের অফিসে আসে তার কোনো ফুটেজ ছিল না।তার মানে সে প্ল্যান করে দেশে ফিরেছে। আর সব প্ল্যান মাফিক কাজ করেছে। অনেক ঘেঁটে লেডি বাইকার নিয়ে রিচার্জ করতে গিয়ে জানতে পারলাম মীরা চৌধুরী একজন হ্যাকার।কিন্তু তোর কথা শোনার পর আমি বলার ভাষা খুঁজে পাচ্ছি না। একটা মেয়ে এত ডেঞ্জারাস!!”
জিতু ভাইয়ার কথাগুলো শুনে ঠোঁট বাঁকালাম। ডেস্ক থেকে কিউব নিয়ে খেলতে খেলতে বলতে শুরু করলাম,
–“চৌধুরীদের সম্পর্কে কিছুই জান না তোমরা। একটা বছর এমনি এমনি হতে চলেছে না। আমি ধীরে ধীরে গভীর সমুদ্রে ডুবে একটু একটু খবর বের করেছি। মীরার সাথে দেখা সেদিন। কিন্তু ওর সম্পর্কে খোঁজ খবর নিয়ে রেখেছি আরও ছ’মাস আগে। কাকিয়া বলেছিল পড়াশোনার কাজে তার ছেলেমেয়েরা দেশের বাইরে থাকে।
উমম, বিষয়টা আমার একদমই হজম হয় নি। তারপর থেকেই আমার টার্গেটে পড়ে ওরা দু ভাই বোন। মাহিন চৌধুরী চিনো নিশ্চয়ই। সে যেমন সহজ, তেমন কঠিন। ব্ল্যাক ভেনম গ্রুপের সেকেন্ড লিডার গ্যাংস্টার মাহিন চৌধুরী। ভালো মানুষের আড়ালে নামকরা ক্রিমিনাল। সে দেশে আসার পর থেকেই তার পিছনে আটার মতো লাগি।তার সম্পর্কে যখন জানলাম তখনই মীরা চৌধুরী কে নিয়ে সন্দেহ হয়। আর যা ভাবনা তাই হয়।
মজার বিষয় কি জান, নারী পাচার চক্রের বড় একটা টিম এদেশে ভালোমানুষের মুখোশ পড়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। মাহিন দেশে আসে আমার সাথে কিংবা তার পরিবারের সাথে দেখা করতে না। প্রশাসনের কঠোর পদক্ষেপে নারী পাচার চক্র শীতল হয়ে যায়। এদিকে মাফিয়াদের ক্যাসিনোতে এই মেয়েদের কিনে নিয়ে যাওয়া হয়। এবং সেখানকার নাইট বারের এক্সক্লুসিভ স্লাট বানানো হয়। মাহিন এসেছিল এটা দেখতে কেন তাদের কেনা মেয়েরা তাদের হাতে পৌঁছাচ্ছে না।
এবার আমায় প্রশ্ন কর, আমি এত এত কিছু জানলাম তাহলে নিশ্চয়ই দেশের নারী পাচার চক্র সম্পর্কেও জানবো,কে বা কারা বাংলাদেশের মতো স্বতন্ত্র দেশে এই চক্র চালানা করছে? এবং অবশ্যই আমার জানার কথা,যেহেতু সেই কেইসের দায়িত্ব সিআইডি আন্ডারকভার অফিসার জাহানারা শেখের হাতে।”
–“কে?”
জিতু ভাইয়া উদ্বীগ্ন হয়ে বলে উঠলো। আমি আড় চোখে সকলের দিকে একনজর দৃষ্টি বুলালাম।অতঃপর ক্রুর হেসে বললাম,
–“উমম জানতে চাও? তাহলে আজ সন্ধ্যা অব্ধি ওয়েট কর। অনেক বড় ধামাকা অপেক্ষা করছে।”
কথাটা শেষ হাতেই হাতের কিউবটা মিলানো শেষ হলো। আমার চেহারায় এক রহস্যময় হাসি। সকালে আশ্চর্য হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে। অতঃপর আমার কথার রেশ ধরে সকালে গভীর ভাবনায় ডুব দেয়।
অন্যদিন নোহা ইতিদের সাথে ক্লাসে বসে থাকে। তবে আজ সে পলির সাথে বাইরে ছিল। তাই পলিকে নিয়ে পুরো কলেজ ঘুরে ঘুরে দেখেছে। বিশাল বড় কলেজ এরিয়া, তাই ঘুরে দেখেই পুরো সময় চলে গেছে। এখন ওরা প্রিন্সিপাল ম্যামের অফিস রুমে বসে আছে। চৌধুরী বাড়ির সদস্য হওয়ায় ওদের যথাযথ সম্মান দেওয়া হচ্ছে। টুকটাক প্রিন্সিপাল ম্যামের সাথে কথাও হয়েছে পলির। ওদের সামনে চা নাস্তা দেওয়া। পলি এক কাপ চা খেয়েছে ভদ্রতা সূলভ। নোহা কিছু খায়নি, তার পুরো দম নিয়ত বাইরে বেরিয়ে জুইদের সাথে খাবে।
কিছুক্ষণের মধ্যে কলেজ ছুটি হয়। জুই তার বান্ধবীরা আর ইতি অফিসে এসে নোহাদের নিয়ে বের হয়। তাদের নিরাপত্তার দেওয়ার জন্য আজ আরেকজন গার্ড বেশি এসেছে। জুইকে দেখে পলির বেশ ভালো লেগেছে, একদম তার মতো ঠান্ডা আর চুপচাপ একটা মিষ্টি মেয়ে। সবাই ফুচকা খেয়ে হেঁটে গল্প করতে করতে একটা পার্কের কাছে আসল। কলেজ থেকে বেশি দূরে না। মূলত এদিকটায় অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হওয়ায় ছেলে মেয়েদের জন্য এই পার্কটি তৈরি করা।
পার্কে আগে থেকেই অনেক মানুষ। বেশিরভাগ ছাত্র ছাত্রীরা বন্ধুবান্ধবদের সাথে আড্ডা দিচ্ছে। জুইরা হেসে কথা বলতে বলতে ভেতরে গেল। ভেতরে আইসক্রিম, ঝালমুড়ি, হাওয়ায় মিঠাই আরও অনেক কিছু নিয়ে মামারা বসে আছে। আইসক্রিম দেখে নোহা লাফিয়ে উঠল। পলি আর জুই বারণ করল এই শীতে আইসক্রিম খেলে শরীর খারাপ হবে। কিন্তু নোহা মানতে নারাজ। নোহা বিরক্তি নিয়ে বলল,
–“ও এম জি কিছু হবে না, আমার কান্ট্রিতে ঠান্ডা থাকলেও আমরা অল ফ্রেন্ডস আইসক্রিম খেতাম। কিছু হবে না। আমি যাচ্ছি আইসক্রিম কিনতে।”
নোহা হাঁটা ধরল। জুই আর তার বান্ধবীরাও সেদিকে হাঁটা ধরল। পলি কাঁধে আচল তুলে ইতির সাথে কথা বলতে বলতে হেঁটে আরেকটু ভেতরে আসল। হটাৎই কানে আসে কেউ বা কারা গান গাইছে। পলি আর ইতি সেদিকে তাকাতেই দেখল, একদল ছেলে মেয়ে মাটিতে ঘাসের উপর গোল করে বসে আছে। একজন গিটারে সুর তুলে গান গাইছে, আর বাকিরা সুর মিলচ্ছে এবং কেউ কেউ কাজোনে আওয়াজ তুলছে।
❝ হৃদয়টার মাজারে রাখিলাম আদরে
কত যত্নে পুষিয়া…..
এভাবে আমাকে অবহেলা করে
কেনো গেলে চলিয়া
কে বুঝে আমাকে তুমি বিহনে
ভুলে গেছো কি সব সৃতি
বুঝি না কেনো যে রোজ রাতে স্বপ্নে
শুধু করো ডাকাডাকি………❞
পলি মন্ত্রমুগ্ধের মতো সেদিকে তাকিয়ে রইল। গানের তালে ইতিও লাইনগুলো বিরবির করে গাইছে।যে গাইছে সে খুব জোরালো কন্ঠে গাইছে। পার্কে উপস্থিত কিছু মানুষের মনযোগও সেদিকে।তারা গান শুনছেই না শুধু, অনুভবও করছে। অনেকেই আবার চোখ পিটপিট করছে, হয়তো খুব কষ্টে চোখের পানি আটকানোর পায়তারা করছে।
❝তুমি পূর্নিমারি আলো আমার সোনার ময়না পাখি
চোখ-খানি মোর বন্ধ করলে তোমায় শুধু দেখি
আমার ভাল্লাগে না কিছু তোমাকে ছাড়া
প্রতি টা সময় যেনো লাগে দিসে হারা……❞
–“জিয়াদ ভাই।”
হঠাৎ পরিচিত কন্ঠ ভেসে আসতেই গিটারে হাত থেমে যায় জিয়াদের। সে ঘাড় কাঁধ করতেই দেখল জুই ছুটে আসছে। আদরের ছোট বোনকে হটাৎ দেখতে পেয়ে জিয়াদের মুখে মৃদু হাসি ফুটে উঠল। উঠে দাঁড়াতেই জুই দৌড়ে এসে জড়িয়ে ধরে বলল,
–“তুমি এনে কি করতাস হুম। আমি যে পাশেই কলেজে পড়ি একবার দেখা করে আসতে পারলে না?”
ছোট বোনের মাথায় আদুরে হাত বুলিয়ে বলল,”দুদিন আগেও তো তোর সাথে দেখা…..”
বাক্য সম্পূর্ণ করার আগেই জিয়াদের নজর আটকে কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে থাকা চেরি ফুলের লাইট ম্যাজেন্টা কালার জামদানি শাড়ি পরহিত রমণীর পানে। মূহুর্তেই জিয়াদের তারুণ্য হৃদয় কেউ খামছে ধরল। চোখগুলোও ভিজে উঠেছে।
–“উনি জাহান আপুর ছোট জা।”
জুইয়ের বাক্যটা জিয়াদের বুকের বাম পাশে গিয়ে বিঁধল। সে নির্জীব দৃষ্টিতে পলির দিকে তাকিয়ে। তরণ্য হৃদয়ে এতক্ষণে আন্দোলন শুরু হয়েছে। পুরাতন ব্যথায় হৃদয়টা নীল হয়ে চোখ দুটো ঝলঝল করছে।
হঠাৎ এতগুলো দিন পর জিয়াদকে দেখে রমণীর পুরো অস্তিত্ব থমকে যায়। পালাবার পায়তারা করার আগেই আসামির ন্যয় ধরা পড়ে পূর্ব পরিচিত খুব কাছের একজন মানুষের কাছে। এখন কি করবে সে, কোথায় লুকাবে, এ জীবনে তার সাথে দেখা না হলে কি হতো না? নিজের মনকে প্রশ্নগুলো করে ভেতরে হু হু করে কেঁদে উঠল মেয়েটা।
পলি শাড়ির আচল খামচে ধরল। চোরের মতো হাঁপ-সাপ করছে, চোখ পিটপিট করে চোখের পানি আড়াল করতে চাইছে। আচ্ছা এখন যদি তাকে জিজ্ঞেস করে, কেন কথা দিয়ে সেই কথা রাখলে না, তাহলে কি উত্তর দিবে সে?
–“বউজান।”
ভাবনা গুলো যখন পলির শ্বাস রুদ করে দিচ্ছিল তখনই তার কাঁধে কেউ স্পর্শ করে আদুরে কন্ঠে ডাকে। অতিপরিচিত ডাক আর কন্ঠ কার হতে পারে তা আর বুঝতে বাকি নেই রমণীর। ভেতরের আটতে থাকা দম ফেলতেই ইমরান সামনে এসে দাঁড়াল। প্রেয়সীর চুপসে যাওয়া আদুরে চেহারা দেখে ব্যাকুল হয়ে উঠল তার হৃদয়। ইমরান দু’হাতে আগলে ধরল পলির দু’গাল। চিন্তিত কন্ঠে বলে উঠলো,
–“বউজান কি হয়েছে তোমার? শরীর ঠিক আছে, কেউ কিছু বলেছে?”
পলি চোরাই চোখ করে স্বামীর দিকে তাকাতেই দেখলো ইমরানের কপালে সাদা গজ দিয়ে ব্যান্ডেজ করা। গজটার উপরে ছোপ ছোপ লালছে হয়ে আছে। এবার নিজেকে ধরে রাখতে পারলো না, কেঁদে উঠলো। ইমরানের কপালের গজটায় আলতো হাত ছুঁইয়ে বলে উঠল,
–“কি হয়েছে তোমার? সকালে তো সব ঠিক দেখে এসেছি। এরই মধ্যে কি হয়ে গেল?”
–“বউজান বউজান শান্ত হও। আমার কিছ্যু হয় নি। আমি ঠিক আছি দেখ আমাকে দেখ।”
–“কিছু না হলে কপালে বেন্ডেজ কেন?”
পলি নাক টেনে কেঁদে ভাসাচ্ছে। ইমরান ফোঁস করে শ্বাস ফেলল। এই তো সকালে নাবিলা চৌধুরীর সাথে অফিসে গেছে। তারপর সব কাজ শেষ করে বউকে দেওয়া কথা রাখতে ইতির স্কুলের দিকে আসছিল। তারপর হঠাৎ কোথা থেকে একটা ট্রাক তার গাড়ির দিকে ধেয়ে আসে। ফ্রন্ট মিররে এই দৃশ্য দেখে ইমরান দ্রুত স্টিয়ারিং ঘুরায়। ফলে স্টিয়ারিং এ মাথা ঠুকে কপালে আঘাত পায়।
–“কি হলো কিছু বলছ না!”
ইমরান টুপ করে স্ত্রীর ঠোঁটে শব্দ করে চুমু খেয়ে বলল,”কিছু হয় নি জানু। আমি ঠিক আছি। এক মিনিট। “
কিছু একটা মনে পড়তেই ইমরান প্যান্টের পকেটে হাত রাখল। অতঃপর একটা বেলি ফুলের গাজরা পলির হাতে বেঁধে দিয়ে বলল,
–“আসার পথে একটা বাচ্চা মেয়ে বিক্রি করছিল। আমাকে একটা হাতে দিয়ে বলল মেডামকে এটা দিলে মেডাম অনেক বেশি খুশি হয়ে যাবে বাবু। তোমার কথা ভেবে আমি তোমার জন্য সব ফুল কিনে নিয়েছি, গাড়িতে আছে। এটা তোমার পছন্দ হয়েছে?”
–“হু।”
তাজা বেলি ফুলের তীব্র মিষ্টি সুভাষ ছড়িয়ে পড়েছে। কিন্তু এখন তা পলি কিছুতেই অনুভব করতে পারছে না। মনের ভেতর চলছে প্রবল বর্ষণ। পলি জিয়াদের দিকে আড় চোখে তাকাতেই পুনরায় অস্থির হয়ে উঠল। ব্যথাতুর ঝলঝল নয়নে তার দিকেই একনাগাড়ে তাকিয়ে আছে জিয়াদ।পলি তাকাতেই টুপ করে এক ফোটা জল গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ল। পলি দৃষ্টি সরিয়ে নিল। এই দৃষ্টির উত্তাপে মেয়েটার ভেতরে দহণ হচ্ছে। কিন্তু সেই দহণ কেউ দেখতে পারবে না, সে ছাড়া।
ইমরানের হঠাৎ নজর পড়ল কিছুটা সামনে দাঁড়িয়ে থাকা এক তাগড়া যুবকের দিকে। ক্রিম কালার প্যান্ট আর কালো শার্ট পড়ে আছে। সবগুলো বোতাম খুলা থাকায় ভেতরের আরেকটা গেঞ্জিও দৃশ্যমান। ছেলেটার সারা মুখে খোঁচা খোঁচা দাঁড়ি আর মাথার চুলগুলো এলোমেলো এবং হাতে একটা কালো ফিতার ঘড়ি।
জিয়াদকে এভাবে দেখছে বিষয়টা খেয়াল করে ইতি ভাইয়ার তর্জনী আঙ্গুল ধরে আহ্লাদি কন্ঠে বলল,
–“ভাইয়া এইটা আমাদের জাহান ভাবির ছোট ভাই। আস আস পরিচয় করিয়ে দেই।”
আমার ভাই জানতে পেরে ইমরানের কুঁচকানো কপাল ঠিক করে মৃদু হেসে উঠল। পলির কাঁধ জড়িয়ে ধরে জিয়াদের কাছে গিয়ে দাঁড়াল। এমন পরিস্থিতিতে পলি ঠিক কি করবে বুঝে উঠতে পারছে না,ফলে মাথা নিচু করে শাড়ির আচল শক্ত করে ধরে রাখল। কাঁধ থেকে ইমরানের হাত সরাতে চাইলেও পারল না,কারণ ইমরান স্ত্রীকে ছাড়তে চাইছে না।পলি এমন পরিস্থিতিতে জিহ্বা দিয়ে ঠোঁট ভেজাল। ইমরান জিয়াদের বাহু হালকা থাপড়ে হেসে বলল,
–“হেই ইয়ং ম্যান আ’ম ইমরান চৌধুরী। জাহানারা ভাবির একমাত্র দেবর। এন্ড সি ইজ মাই ওয়ান এন্ড ওয়ানলি ওয়াইফ অনামিকা পলি।”
এতক্ষণে জিয়াদ পলির থেকে দৃষ্টি সরিয়ে নিয়েছে।ইমরানের কথায় মৃদু হেসে ক্ষীণ কণ্ঠে বলল,”আমি নাইম শেখ জিয়াদ।”
পলি আড় চোখে জিয়াদের দিকে তাকাতেই আবার চোখাচোখি হল। আন্তরের তাড়নায় দম বন্ধ হয়ে আসছে মেয়েটার। কিন্তু এই মূহুর্তে কোনো উপায় খুঁজে পাচ্ছে না এখান থেকে পালানোর। ইমরান হঠাৎই জিয়াদের পাশে একটা মেয়েকে লক্ষ করে। সে একটু ভেবে হেসে বলল,”উমম ভুল না হলে তুমি ভাবির বোন রাইট।”
জুই মৃদু হেসে বলল,”জি আমি জাহানারা আপুর ছোট বোন হুমাইরা শেখ জুই। আর ওরা আমার বান্ধবী সোমা এবং মিনা।”
ইমরান সবার সাথে পরিচিত হয়ে যখন বলবে কিছু খাওয়ার কথা, তার আগেই পলি রিনরিন কন্ঠে বলে উঠলো,
–“আমার শরীর খারাপ করছে, এখনই বাসায় যেতে হবে।”
–“কি বলছ ডাক্ত….”
–“তেমন কিছু না, বাসায় গেলে ঠিক হয়ে যাব। আমার রেস্ট প্রয়োজন।”
ইমরানকে থামিয়ে পলি নিজের কথা বলে চলে যেতে লাগল। ইমরান সবার সাথে হেসে বিদায় নিয়ে বলল আরেকদিন ভালো করে কথাবার্তা হবে।
জিয়াদ পিছন থেকে পলকহীন তাকিয়ে রইল পলির দিকে। যখন তার দৃষ্টি থেকে আড়াল হল তখনই ব্যথাতুর হেসে উঠল।
–“এই জুইদের সাথে ওরা কারা?”
–“বোনের শ্বশুর বাড়ির মানুষ।”
জিয়াদ তার ফ্রেন্ড সুজির কথায় উত্তর করে আবার সবার সাথে বসল। উপস্থিত জিয়াদের আরেকজন ফ্রেন্ড হিমা বলে উঠলো,
–“বাদ দে দোস্ত। এখন তোর কথা বল, কে ছিল মেয়েটা আর কবে তোদের দেখা হয়?”
হিমার কথায় অদ্ভুত হাসলো জিয়াদ। অতঃপর কয়েক মূহুর্ত চুপ থেকে আনমনে বলে উঠলো,
❝কোনো এক শীতকালে অতিথি পাখির মতো সে দিয়েছিল এক চিলতে দেখা,
রেখে গেল মায়ার ঘোর, আর আমায় করল একা।❞
চলবে,,,,,,,,,
(সামনের পর্বগুলোতে অনেক টুইস্ট থাকবে আজকের পর্ব পরে নিশ্চয়ই বুঝতে পেরেছ। যাই হোক আমি লেখার জন্য অনেক বেশি এক্সাইটেড। তোমরা সবাই আগের পোস্টের মতো রিয়েক্ট তুলে দিলে আগামীকালও নতুন পর্ব পেয়ে যেতে পার।
আর নতুন বছরে তোমাদের অনেক অনেক শুভেচ্ছা।
সবশেষে একটা কথা বলেই ফেলি, দীর্ঘ সময় ধরে বেশ কিছু গল্প নিয়ে কাজ করছিলাম। সেই গল্প গুলোর সূত্র ধরেই আচমকা জাহানারা এবং তুমি শুধু আমার গল্পের উৎপত্তি। তো আপকামিং গল্পটা দীর্ঘ এক দুই বছরের প্রজেক্ট। ভালো নিউজ হচ্ছে গতকাল আপকামিং গল্পের 70% তথ্য সংগ্রহ করা শেষ। আশা করি সেই গল্পেও তোমাদের প্রচুর ভালোবাসা পাব। এই নিউজ টা জানালাম কেন জান, আসলে জাহানারা একটা একটা পর্ব যাচ্ছে আর আমি আরও তত বেশি অধৈর্য হয়ে পড়ছি। আমার রাতের ঘুম হারাম হয়ে যাচ্ছে।সকল ব্যস্থতার মাঝেও আমার কল্পশক্তি আমাকে বড্ড জ্বালাতন করছে কি যে করি…. 😫
যাই হোক আজকের পর্ব কেমন হয়েছে তা জানিও।হ্যাপি রিডিং 🥰)
Share On:
TAGS: জান্নাত মুন, জাহানারা
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
জাহানারা পর্ব ৫৩+৫৪
-
জাহানারা পর্ব ৪৭
-
জাহানারা পর্ব ৭
-
জাহানারা পর্ব ২৭+২৮
-
জাহানারা পর্ব ২৩+২৪
-
জাহানারা পর্ব ৩৯+৪০
-
জাহানারা পর্ব ৬৫+৬৬
-
জাহানারা পর্ব ৪৫+৪৬
-
জাহানারা পর্ব ৫৭+৫৮
-
জাহানারা পর্ব ৩৫+৩৬