জাহানারা
জান্নাত_মুন
পর্ব :৬১
🚫ক’পি করা নিষিদ্ধ
🔞 সতর্কবার্তা:
এই গল্পে অশ্রাব্য ভাষা, অশ্লীলতা এবং সহিংসতার উপাদান রয়েছে। ১৮ বছরের কম বয়সী বা সংবেদনশীল পাঠকদের জন্য উপযুক্ত নয়। পাঠক নিজ দায়িত্বে পড়বেন।
অল্পবয়সী মেয়েটা কল্পনাও করেনি কখনো যে এভাবে আচমকা বিয়ে হয়ে যাবে।পলি অযাচিত ভয় আর দ্বিধায় জড়সড় হয়ে বসে।আজ মেয়েটার সারাদিন ছোট্ট ইতি আর দাদির সাথে ভালোই কেটেছে। কিন্তু এখন ? অচেনা পুরুষ নামক লোকটার ঘরে সেজেগুজে বসিয়ে রাখা হয়েছে তাকে। ঘড়ির কাটা রাত সারে বারোটার ঘরে। পলি মাথায় ঘোমটা টেনে সাজানো গোছানো বিছানায় বসে।সারা ঘর তাজা ফুলের গন্ধে ম ম করছে। নাজুক মেয়েটা নিজের ভেতরকার অস্থিরতায় শাড়ি খামচে ধরছে বারবার।
কিছুক্ষণের মধ্যেই রুমে আসল ইমরান। ইমরান গলা খাঁকারি দিয়ে নিজের উপস্থিতি বুঝাল। লোকটার কন্ঠস্বর শুনে পলির ভেতরের অস্থিরতা আরো বেড়ে গেল।মেয়েটার দম বন্ধ হয়ে আসার উপক্রম। সে প্রতিবেশী ভাবীর কাছে শুনেছিল বাসর রাতে কি হয়।আচ্ছা এখন কি তার সাথেও হবে?এসব ভাবতেই পলির বুক ধুকপুক করতে লাগল।কিন্তু এমন কিছু হল না।ইমরান বেশ কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে রইল।তেসরা চোখে নিজের সদ্য বিবাহিত স্ত্রীকেও দেখে নিল।
ইমরান হয়তো কল্পনাও করেনি ফুলের মতো কোমল সুন্দর মেয়েটা তার বউ হয়ে যাবে। ইমরান আনমনে হাসল। কিন্তু এভাবে ওরা দুজন আর কতক্ষণ বসে থাকবে। ইমরান শুকনো কেশে বলল,”তোমার নাম কি?”
এতক্ষণের নিরবতা ভেদ করে ইমরানের পুরুষালি কণ্ঠস্বর পলির কানে যেতেই তার বুকটা কেঁপে উঠল।পরক্ষণেই ইমরানের কথাটা কানে বারি খেল। ইমরান আবার তার নাম জিজ্ঞেস করছে কেন? কাল কতবারই তো তার নাম শুনেছে। আর নিজের বউয়ের নামই জানে না!! পলির থেকে উত্তর না আসায় ইমরান বেশ লজ্জা পেল। সে বুঝতে পারছে বোকা প্রশ্ন করে বসেছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে আবারও শুকনো কাশল।কিছু বলবে তার আগেই পলির রিনরিন কণ্ঠস্বর ভেসে আসল,
–“আমার নাম অনামিকা পলি।”
ইমরানের কানে বারবার এই বাক্যটা আওয়াজ তুলছে। যেমন মিষ্টি মেয়ে তেমন মিষ্টি নাম। ইমরান মনে মনে মাআশাল্লাহ বলল।তারপর আবারও নিরবতা। খানিক সময় ইমরান ভাবল সদ্য বিবাহিত মেয়েটার সম্পর্কে আসলেই তো তার কিছু জানা হল না।আচ্ছা মেয়েটা কি এই বিয়েতে রাজি আছে? বিয়ের সময় তো কেউ তার মত জানতে চায় নি। মনের উশখুশ দূর করতে ইমরান জিজ্ঞেস করতে চাইল পলি বিয়েতে রাজি কিনা।কিন্তু সেটা না জিজ্ঞেস করে বলে উঠল,”আপনার কি কাউকে পছন্দ আছে?”
নতুন বরের মুখে এমন কথা শুনে পলির দমবন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম। ইমরান সাথে সাথে নিজের ভুল শুধরে নিয়ে বলল,”সরি সরি। অ্যাকচুয়ালি আমি সেভাবে বলতে চাইনি।আসলে আমি বলতে চাইছিলাম আপনি এই বিয়েতে হ্যাপি তো।আই নো এই বিয়েটা আর পাঁচটা বিয়ের মতো হয় নি।আমারই দোষ হয়তো।পারলে আমাকে ক্ষমা করে দিবেন।আমি আপনাকে কোনো কিছুর জন্য জোর করব না।আজকালকার ছেলেমেয়েদের তো নিজেদের একটা অপিনিয়ন থাকে।আপনার যদি কিছু বলার থাকে তাহলে বলতে পারেন।আপনার মতকেই সবচেয়ে বেশি প্রায়োরিটি দেওয়া হবে।আপনি কি কাউকে পছন্দ করেন?
ঘোমটার আড়ালে থাকা পলির চোখদুটো হঠাৎই জলে টইটম্বুর হয়ে উঠল। একই তো অচেনা লোক।তারউপর এসব কি ধরনের কথা বলছে।ইমরান কোনো উত্তর না পেয়ে পলির দিকে তাকাল।কি সুন্দর লাল টুকটুকে বউ সেজে মাথায় ঘোমটা টেনে বসে আছে। যদি ঘোমটা না থাকত তাহলে দেখতে পেত মেয়েটার ভেজা নয়ন জোড়া। পলি একটা ঢোক গিলল।কেন জানি এই মূহুর্তে তার গলা কেউ টিপে ধরেছে মনে হচ্ছে তার।চাইলেও কিছু বলতে পারছে না।অতঃপর নিজেকে ধাতস্থ করে কিছু বলতে যাবে তখনই ইমরান বেড থেকে বালিশ নিতে নিতে বলল,”আপনি অনেক ক্লান্ত ঘুমিয়ে পড়েন।”
ব্যস আর কি।কথাটা শুনে যেন পলির ভেতরে প্রাণ আসল।সে গুটিসুটি মেরে গুমিয়ে পড়ল।একবার যদি চোখ তুলে দেখত, তাহলে হয়ত ইমরানের ঘায়েল হওয়া দৃষ্টির উত্তাপে বশীভূত হত। ইমরান সোফায় শুয়ে ঘুমাবার আগ পর্যন্ত নিজের নব বধূর দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল।আসলেই কি সেই রাতে ইমরানের ঘুম হয়েছিল?নাকি বেডে শুয়ে থাকা রমনীকে দেখতে দেখতে রাত পেরিয়েছিল?
পলি তার বিয়ের ফাস্ট নাইটের কথা শেষ করতেই বেশ উদাস হয়ে গেল।ফারিয়া, নোহা আর ইতি খুব মনযোগ দিয়ে গল্পটা শুনছিল।হঠাৎ পলি থেমে যেতেই ওদের হুঁশ ফিরল।ফারিয়া দু’গালে হাত ধরে বলল,”তুমি কত বোকা গো পলি ভবি।বিয়ের প্রথম রাতেই জামাইয়ের আদর সোহাগ থেকে বঞ্চিত হলে।”
ফারিয়ার কথায় পলি ধ্যান থেকে বেরিয়ে এসে লাজুক হাসল। মুখে হাত ধরে লাজুকতার সাথে বলল,”প্রথম দিন পাইনি তো কি হয়েছে। এখন তো পাই।”
–“তারপর কি হয়েছিল?”
পলি ইতির দিকে তাকিয়ে ঠোঁট কামড়ে হাসল। সহজসরল মেয়েটার চোখেমুখে জানার কত আগ্রহ। পলির এহেন চাহনিতে ইতি লজ্জা পেয়ে মাথা নামিয়ে নিল।পলি লম্বা শ্বাস ছেড়ে বলল,”তারপর আর কি।পরদিন রাতেও তোমার ভাই সোফায় শুয়েছিল।ওর শুতে অসুবিধা হচ্ছে তাই ভদ্রতার খাতিরে বললাম পাশে এসে ঘুমাতে।আমি ভেবেছিলাম আসবে না।ওমা দেখি এসে আমার পাশে শুয়ে পড়েছে। তারপর আর কি। আমার সাথে এটা ওটা গল্প করতে থাকে।আর আমি তার কথার জালে ধরা দিই।তারপর যা হয় আরকি।কখন যে অচেনা লোকটা আমার এতটা কাছে এসে এতটা আপন হয়ে গেল আমি নিজেও জানি না।সেই রাতের পর থেকে লোকটাকে নিজের নিজের লাগে।”
ফারিয়া চোয়াল ঝুলিয়ে বলল,”তোমরা কত লাকি।আর আমাকে দেখ।জামাই তো দূর, আমার বপ্পেনই দুদিনের বেশি টিকে না।”
–“কেন টিকে না?”
ফারিয়া পলির কাঁধে মাথা রেখে বলল,”প্রথম দুদিন ঠিকই চলে।পরে যখন শপিং এ যেতে বলি তখনই হ্যালো হাই বাই বাই।”
ফারিয়ার কথা শুনে তিনজন উচ্চস্বরে হেসে দিল।ফারিয়া মুখ মুচড়ে বলল,”হয়েছে আর হাসার লাগবে না।জীবন টায় তেজ পাতা।ইশশ আমার জীবনেও যদি মেডামের মত একটা ভিলেন থাকত ।তাহলে নিশ্চয়ই আমার সব আবদার পূরণ করত।আর আমি তাকে এত্তো এত্তো ভালো…”
বলতে গিয়ে আচমকা থেমে পড়ল ফারিয়া। তার নজর আটকালো সিঁড়ির দিকে।ড্যাশিং লুকে পঙ্কজ সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামছে । ফারিয়া হা করে তাকিয়ে পঙ্কজ কে দেখতে লাগল।একদম দেখতে বিদেশিদের মতো ফর্সা আর সেই লম্বা।যদিও এই বাড়ির প্রতিটি ছেলে সুন্দর আর লম্বাচওড়া। তবে পঙ্কজের ক্ষেত্রে নোহার মতো বিদেশি একটা ভাইব আছে । ব্রাউন চুলগুলো জেল দিয়ে সেট করে রেখেছে। আবার বাম কানে স্টাড কালো পাথরের ইয়ার রিং। ফারিয়া হা করে পঙ্কজের দিকে তাকিয়েই রইল।পঙ্কজ নিচে তাকাতেই দেখল ফারিয়ার মুগ্ধ চাহনি। পঙ্কজ বাঁকা হেসে চোখ মারল।ফারিয়ার চোখের পলক পড়ল তৎক্ষনাৎ। আজ ওর জায়গায় অন্যকেউ হলে নিশ্চয়ই পঙ্কজ কে ভালো চোখে দেখত না।কিন্তু ফারিয়ার এই বিষয়টাও মনে ধরল।পঙ্কজ ফারিয়ার দিকে তাকিয়ে বাঁকা হেসে ঘাড়ে হাত বুলাতে বুলাতে বেড়িয়ে গেল।
সময়ের সাথে সাথে সন্ধ্যা প্রায় নেমে এলো। পশ্চিম আকাশে সূর্য প্রায় ডুবে যাচ্ছে। চারদিকে কি চমৎকার লাল আভা ছড়িয়ে পড়েছে। দৃশ্যটা ভীষণ অপূর্ব। আমি মাচার উপরে বসে এই দৃশ্যটা এনজয় করছি। দক্ষিণা হাওয়ায় শরীর কাপিয়ে দিচ্ছিল বলে ব্রেইঝারে আ’গু’ন জ্বা’লা’নো হয়েছে একটু আগে।এখন অবশ্য উষ্ণ অনুভব করছি।আমার কোলে একটা সাদা পার্সিয়ান বিড়াল। কি এক কান্ড! গতকাল ফোনে রিলস দেখছিলাম। তখনই একটা বিড়ালের ভিডিও আসে।আমি পেইজে ঢুকে কিছু ভিডিও দেখি।আর সেই খবর এই ইফান নামক লোকটা কিভাবে যেন জেনে গেল।এখন কিছুক্ষণ আগে একটা লোক বিড়ালটি আমায় দিয়ে গেছে। ইফান নাকি কিনে এনেছে।
আমার কোলের উষ্ণতা পেয়ে বিড়ালটা ঝিমচ্ছে।কি যে কিউট দেখতে!!সারা দেহ সাদা পশমে ভর্তি। আমি মেকি হেসে মাথায় হাত বুলিয়ে দিলাম।তৎক্ষনাৎ মিয়াঁও বলে ডেকে উঠলো।আমি খুশি হয়ে বিড়ালটাকে একটু চুমু দেওয়ার জন্য ঠোঁট এগোতেই ইফানের নিষেধাজ্ঞা কানে আসে, “উমম বেইস ডোন্ট ডু দিস।”
আমি ইফানের দিকে তাকাতেই দেখি আমার দিকে তাকিয়ে আছে। চোখমুখ স্বাভাবিক। আমি চোখ সরু করে শুধালাম,”কেন? কি সমস্যা?”
–“অনেক সমস্যা। তুমি এখনো আমাকে কিস কর নি।তাহলে এটাকে কেন করবে?”
কি অদ্ভুত কথাবার্তা! আমি নাক ছিটকালাম।আবার বিড়ালটার শরীরে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বিরবির করে ইফানকে এক দুটো গা’লিও দিয়ে দিলাম।হঠাৎই মনে পড়ল বিড়ালটার একটা নাম থাকলে ভালো হয়। আমি ইফানকে জিজ্ঞেস করলাম, “আচ্ছা ওর নাম কি?”
–“জানি না।”
–“জান না মানে কি?তুমি ওকে এনে দিয়েছ। আর তুমি জান না।”
ইফান মাথা নাড়িয়ে না বলল।আমি ফোঁস করে শ্বাস ফেলে বললাম,”ঠিক আছে। এখন ওর কি নাম রাখব?”
–“তোমার যা ইচ্ছে, জালু-মালু।”
–“ইফাআআন।”
আমি দাঁত কটমট করে চেচিয়ে উঠলাম। ইফান উচ্চ স্বরে হেসে দিয়ে বলল,”তোমার পছন্দ মতো একটা রেখে দাও সোনা।”
আমি বেশ কিছুক্ষণ ভাবলাম। অতঃপর বললাম,”নিম্মি টা কেমন?”
–“ভালো।”
ইফান ছোট্ট করে উত্তর দিল।আমি খুশি মনে নিম্মিকে আদর করতে করতে বলালম,”ঠিক আছে ওর নাম নিম্মি।”
এরই মাঝে সব জায়গায় লাইট জ্বলে উঠল।চারপাশে যেন আলোর খেলা। আহা কি সুন্দর এই দৃশ্য। চারপাশ কত খোলা-মেলা নীরব। কিছু একটা ভেবে আনমনেই বলে উঠলাম, “জায়গাটা অনেক সুন্দর তাই না?”
ইফান ফোনে কিছু একটা করছে সেই কখন থেকে।মনে হচ্ছে কারো সাথে চ্যাট করছে।আমি একবার খেয়াল করেও এড়িয়ে গেলাম।
–“আমার তো যেতেই ইচ্ছে হচ্ছে না।এখানে যদি একটা বাড়ি থাকত তাহলে এখানেই থেকে যেতাম।”
–“আচ্ছা।”
আমি ব্রু কুঁচকে ইফানের দিকে তাকালাম। ওর বেখেয়ালি ভাব আমার কেন যেন সহ্য হচ্ছে না।কি এমন আছে ফোনে যে আমাকে উপেক্ষা করছে!আমি চোয়াল শক্ত করে বললাম,”আচ্ছা আবার কি, হ্যাঁ?”
ইফান আমার দিকে তেসরা চোখে চেয়ে বলল,”বাড়ি করে দিব।”
আমি দাঁতে দাঁত পিষে বললাম,”করে দিবে মানে কি?এমন ভাব করছ জায়গাটা তোমারই।”
ইফান হালকা হেসে বলল,”আমার কেনা না বাট এখন আমারই।”
–“মানে?”
–“এখানের আসেপাশের সব আমার নানা ভাইয়ের জায়গা।আর তিনি আমার মমকে উনার সকল প্রোপার্টি লিখে দিতে চেয়েছিলেন। বাট মম নানা ভাইকে দিয়ে সব আমার নামে করিয়েছে।এন্ড নাও আ’ম দ্য লিগাল ওনার অফ দিস ল্যান্ড।”
নানা ভাই নামটা ইফানের মুখে শুনতেই খেয়াল আসল বিয়ের পর থেকে তো কখনো ইফানের নানা নানির কথা শুনি নি। শুনবই বা কিভাবে? না আমি কখনো জানতে চেয়েছি।আর না তো কেউ নিজে থেকে বলেছে। আমি গলার স্বর নিচু করে ইফানকে শুধালাম,”তোমার নানা কোথায়? কখনো তো তাদের সম্পর্কে শুনি নি।”
–“আমি জন্মের আগেই ওপরে টপকে গেছে।”
–“মা’র বাবার বাড়ির আর কেউ নেই। আমি বলতে চাইছি তোমার মামা…
–“মম আর মনি দুই বোন ছাড়া নানা ভাইয়ের আর কোনো সন্তান ছিল না।
আমার মনে হয় নানা ভাইয়ের নুনুর পাওয়ার কম ছিল।তাই আর একটা পিসও আসে নি।”
ইফান নিজের কথা শেষ করেই উচ্চ স্বরে হেসে দিল।আমি দাঁতে দাঁত পিষে বললাম, “অসভ্য একটা।”
পরক্ষণেই ইফানের কথায় হঠাৎই একটা প্রশ্ন মনে আসল।নানা ভাই সকল সম্পত্তি নাবিলা চৌধুরীকে দিয়ে দেয় মানে?মনের ভেতরের জেগে উঠা প্রশ্নের উত্তর পেতে ইফানকে জিজ্ঞেস করলাম,”তোমার নানার সব কিছুরই কি এখন মালিক তুমি?”
–“হুম।”
–“নুলক আন্টিকে কি কিছু দেয় নি নাকি?”
হঠাৎই ইফানের হাত ফোনে থেমে গেলো। সম্পূর্ণ মনযোগ দিয়ে আমার চোখের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল।আমি ওর এমন দৃষ্টিতে বেশ অস্বস্তি বোধ করতে লাগলাম।ইফান শীতল কন্ঠে বলল,”নট মেইবি।”
–“কেন?”
আমি তৎক্ষনাৎ পাল্টা প্রশ্ন করলাম।ইফান বাঁকা হেসে হেয়ালি কন্ঠে বলল,”সিআইডিদের মতো জেরা করছ দেখছি।”
আমি ওর এহেন কথয় বিব্রত হয়ে দৃষ্টি সরিয়ে শুকনো কাশলাম। ইফান আবার উচ্চ স্বরে হেসে বলল,”জানি না কেন।শা’লা তখন আমি পয়দা হইনি।নাহলে সব হিস্ট্রি জেনে তোমাকে বলতে পারতাম।”
–“তুমি তোমার নানাকে দেখনি?”
আমি সহসা প্রশ্ন করলাম।ইফান পকেটে ফোন ঢুকিয়ে নিজের উরুতে মৃদু থাপ্পড় দিয়ে মুখে হাত ধরে হায় তুলল।অতঃপর টেনে আমাকে তার পাশে বসিয়ে বলল,”বুঝলে বউ শালার নুনুর সাথে দমের পাওয়ারও কম ছিল।তাই তাড়াতাড়ি টপকে গেছে। আমিও দেখতে পারলাম না।”
–“যতসব অসভ্যতামি কথাবার্তা।”
ইফান আমার বাহু ধরে চেপে তার সাথে মিশিয়ে হেয়ালি করে হাস্কি স্বরে বলল,”বুঝলে বুলবুলি ওয়েদারটা ঠান্ডা ঠান্ডা। এখন করলে শরীরটা গরম হতো। ভালো লাগতো।”
আমি ইফানের দিকে চোখ গরম করে তাকিয়ে দাঁত কটমট করলাম।ইফান ঝটপট আমার ঠোঁটে শব্দ করে চুমু খেল।অতঃপর পকেট থেকে সিগারেট বের করে ঠোঁটে ধরাতে ধরাতে বলল,”বেশিক্ষণ থাকলে ঠান্ডা লাগবে।তার ওপর সুন্দরী জিনিস তুমি। হালার পুতাইনে নজর দিলে আবার সমস্যা। “
আমি নাকে ওড়না ধরে বসলাম।ইফান আমার অসুবিধা হচ্ছে বুঝতে পেরে উঠে আরেক পাশে গিয়ে পিঠ করে দাঁড়াল। আমি পিছন থেকে ঠান্ডা কন্ঠে বললাম, “একটা কথা বলবে?”
–“বল?”
–“আমি শুনেছিলাম মা’র বিয়ের আগে কিছু একটা হয়েছিল। ঠিক কি হয়েছিল আমায় বলবে?”
ইফান হঠাৎই থমকে দাঁড়াল। আমি পিছন থেকে দেখে আন্দাজ করলাম।হঠাৎ এমন কিছু বলব হয় তো আশা করে নি।আমি উত্তরের অপেক্ষায় বেশ কিছুক্ষণ ইফানের দিকে তাকিয়ে রইলাম। কিন্তু কোনো সারা শব্দ আসল না।আমি পুনরায় বললাম,”না মানে শুনেছিলাম কি একটা ঝামেলা হয়েছিল।তারপর নাকি বিয়ে,,,,,”
–“বড্ড বেশি কথা বলছ।আই ডোন্ট লাইক দিস।”
আমার কথার মাঝ পথে থামিয়ে ইফান ভারিক্কি কন্ঠে বলল।ওর স্বরটা বেশ কঠিন শুনাল।মনে হল আমার কথা বলা তার পছন্দ হচ্ছে না। কই মনে পড়ছে না তো সে আগে কখনো আমার সাথে এভাবে কথা বলেছে।আমি ওর সাথে কত রাগারাগি ঝগড়া করেছি। কখনো তো এত রুঢ় গলায় কথা বলেনি।হ্যাঁ সেই রাতে ও আমার সাথে ধস্তাধস্তি করেছিল।এমন কি আমার গায়ে প্রথমবার হাত তুলেছিল। তখনও তো ওর কন্ঠে এতটা জোর ছিল না।তবে এখন কেন এভবে আমার সাথে কথা বলল? আমার মস্তিষ্ক হঠাৎই যেন অযাচিত ক্রোধে ফেটে পড়ছে।যার ফলস্বরূপ টুপ করে চোখ দিয়ে এক ফোটা নোনাজল গড়িয়ে পড়েছে।আমি এক দৃষ্টিতে ইফানের দিকে তাকিয়ে।
বেশ কিছুক্ষণ পর কিছু একটা ভেবে ইফান আচমকা পিছনে ফিরে আমার দিকে তাকাল।আমি তাড়াতাড়ি অন্যদিকে ঘুরে উঠে দাঁড়ালাম।তাড়াতাড়ি নিম্মিকে নিয়ে মাচা থেকে নামার জন্য প্রথম সিঁড়িতে পা ফেলতে না ফেলতে পিছন থেকে আমার বাহুতে টান পড়ে।খেই হারিয়ে ইফানের প্রশস্ত শক্ত বুকে পড়ি।
নিজের অবস্থান বুঝতে পেরে তাড়াতাড়ি সরে যেতে নিলে ইফান আমার মাথা তার বুকের সাথে চেপে ধরে।অতঃপর আমার ঘাড়ে মুখ ডুবিয়ে উন্মাদের মতো বলতে লাগল,”সরি জান। আ’ম সরি।”
রাগে আমার শরীরে মৃদু কম্পন আরম্ভ হয়েছে।হঠাৎই আমি স্থির হয়ে যাই।আমার কানে খুব তীব্র ভাবে আসছে ইফানের হৃদ স্পন্দনের আওয়াজ। লোকটার বুকটা অস্বাভাবিক ভাবে উঠানামা করছে।
বেশ খানিকটা সময় অতিবাহিত হলেও ইফান তার বুক থেকে আমাকে সরাচ্ছে না।আমি নিজেই ওর বুকে মৃদু ধাক্কা দিয়ে সরে দাঁড়ালাম। ইফান আমাকে চোখ নিচু করে তাকিয়ে থাকতে দেখে আমার থুতনিতে ধরে হাস্কি স্বরে বলল,”লুক এট মি।”
আমি তাকালাম না।বরং শক্ত চোয়াল ঝুলিয়ে রাখলাম। ইফান আমার এমন চেহারা দেখে ঠোঁট কামড়ে হেসে মুখ উপরে তুলল।আমি ওর দিকে তাকাবো না বলে চোখ বন্ধ করে নিলাম।ইফান দেখল আমার চোখের ঘন পাপড়িগুলো ভেজা।তাই আমার দু’চোখের উপর চুমু খেল।কানের কাছ ঠোঁট এনে হিসহিসিয়ে বলল,”বাসায় চল। রাতে তোমার সব রাগ ভাঙাব।”
ইফান আবার আমার কানে শব্দ করে চুমু খেল।আমি তাড়াতাড়ি চোখ খুললাম ওকে কয়েকটা কথা শুনিয়ে দিব বলে।তার আগেই আচমকা আমার চোখে পড়ে ইফানের কানে স্টাড কালো পাথরের ইয়ার রিং।আমি খুব মনযোগ দিয়ে দেখতে লাগলাম।ব্ল্যাক ডায়মন্ড হবে হয় তো।
না ঠিক মনে করতে পারছি না ওকে আগেও পড়তে দেখেছি কিনা।আমি রিনরিন কন্ঠে বললাম,”তোমার কানের এটা!এটা তো আগে কখনো পড়তে দেখিনি।”
ইফান সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে আমার চোখে চোখ রাখল।আলতো হাতে আমার মাথার ওড়নাটা টেনে দিতে লাগল যাতে কানে বাতাস না লাগে।সেভাবেই বলল,”তুমি তো আমার দিকে কখনো তাকিয়েই দেখনি ভালো করে।দেখলে আরও অনেক কিছু আবিষ্কার করতে আমার মাঝে।তুমি তো শুধু ভালো করে চিনলে আমার ছোট ভাই কে।আহ্ দুক্কু।”
ইফানের কথা শেষ হতে না হতেই ওর বুকে থাপ্পড় মারলাম।চিবিয়ে চিবিয়ে বললাম,”অসভ্য একটা।”
ইফান আর আমি হাঁটতে হাঁটতে রাস্তায় উঠছি।ইফান বলল,”বেশ কয়েক বছর ধরে পড়া হয় না কানে।আমরা সব ভাই আর কিছু ফ্রেন্ড একসাথে ইয়ার পিয়ার্সিং করিয়েছিলাম।”
বলতে বলতে বাইকের কাছে এসে থামলাম। চোখ ঘুরাতেই চোখে পড়ল দূরে গার্ডরা গাড়ি নিয়ে এখনো দাঁড়িয়ে আছে।আমি তপ্ত শ্বাস ছাড়লাম। ইফান নিজে হেলমেট পড়ে আমার হাত থেকে নিম্মিকে নিয়ে বাইকের পিছন সিটে রাখা ক্যাট বাস্কেটে রাখল।তারপর আমাকেও হেলমেট পড়িয়ে দিল।কিন্তু আমি বসব কোথায়।টনক নড়তেই ইফানের দিকে তাকালাম, “আমি বসব কোথায়?”
–“এখানে।”
ইফান একটু সরে তার সামনে ইশারা করল।আমি দাঁত কটমট করে বললাম, “ফাইজলামি বন্ধ ক,,,”
আমার বাক্য শেষ হওয়ার আগেই লোকটা আমাকে টান মেরে তুলে নিয়ে তার সামনে বসিয়ে দিল।আমি কিছু বলতে যাব তার আগেই নিজের সাথে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে নিল।আমাদের দেহের মধ্যে বিন্দু মাত্রও ফাঁকা নেই।আমার পা দুটো তার কোমরে পেচিয়ে দিয়ে আমার মাথা তার এক কাঁধে রেখে নিমিষেই ঝড়ের বেগে বাইক চালাতে শুরু করল।আমার মুখে আসা কথা মুখেই রয়ে গেল।পড়ে যাব বলে আমি ঝটপট ওর গলা জড়িয়ে ধরলাম।
দু ঘন্টা আগে সিআইডি অফিসাররা নিজেদের কাজ শেষ করে অফিস অফ করে বেড়িয়ে গেছে।তাই অফিস ভবন এখন অন্ধকারে নিমজ্জিত। অফিসের পাশের আরেকটা ছাঁদে কেউ একজন দাঁড়িয়ে আছে। অন্ধকার থাকায় অশরীরির মতোই দেখাচ্ছে। আগুন্তক বেশ কিছুক্ষণ মনযোগ দিয়ে বিল্ডিংয়ের তিনতলা মনযোগ দিয়ে লক্ষ করলো।অতঃপর সব কিছু নিজের নিয়ন্ত্রণে দেখে ক্রর হাসল।অন্ধকারে যা দৃশ্যমান নয়।
আগুন্তক নিজের সরু কোমর হারনেসে আটকে পুলি ছাড়তেই জিপলাইনটা শিস কেটে তাকে সিআইডি ভবনের ছাদের দিকে টেনে নিল।অতঃপর অফিস ভবনের ছাঁদে গিয়ে নেমে অতি সতর্কতার সাথে মেইন অফিসের ভেতরে ঢুকে পড়ল।
অফিসের ভেতর ও বাহিরে কড়া সিকিউরিটি দেওয়া। অথচ আগুন্তক সব কিছু নিজের কন্ট্রোলে নিয়ে নিয়েছে।বর্তমানে অফিস ভবন সহ আসেপাশের সকল সিকিউরিটি তার নিয়ন্ত্রণে। মনে হয় খুব পরিকল্পিত এবং সুক্ষ্ম ভবে নিজের কাজ করছে। আগুন্তক যেন এই বিষয়ে ভীষণ দক্ষ।
আসেপাশে সব অন্ধকার। অশরীরির মতো ছায়াটা নিজের টর্চ লাইট জ্বালিয়ে সোজা এসপির কেবিনে ঢুকে পড়ল।শরীরে কালো হুডি জড়ানো। মাথা মুখ সব ঢাকা।তার একটিবারও এদিক সেদিক তাকানোর প্রয়োজন হল না।যেন পুরো অফিস তার হাতের মুঠোয়। আগুন্তক কেবিনে ডুকেই দেখতে পেল ডেস্কের উপর কম্পিউটার রাখা।সে তাড়াতাড়ি বসে কম্পিউটার চালু করল।কিন্তু পাসওয়ার্ড দেওয়া থাকায় আগুন্তকের কিবোর্ডে রাখা আঙ্গুল গুলো থামলো।মূহুর্তেই আগুন্তকের ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি উদয় হল।সে তাচ্ছিল্য করে ভারিক্কি মেয়েলী কন্ঠে বললো,
–“লাইক সিরিয়াসলি। জাস্ট আ পাসওয়ার্ড আমাকে দমাবে। ইয়্যু নো, দ্যা ফা/কিং ইডিয়ট এসপি এখানে কে বসে আছে?দ্যা ইন্টারন্যাশনাল হ্যাকার অ্যান্ড দ্যা মোস্ট পাওয়ারফুল টেরোরিস্ট গ্যাং’স ক্যাপ্টেন অফ ব্ল্যাক ভেনম।
অতি মাধুর্য মেশানো কন্ঠ স্বর। অথচ সেখানে মিশে আছে নিজের কনফিডেন্সে আর দম্ভ। কি শক্তই না তার বলা প্রতিটি শব্দ। আগুন্তক কিবোর্ডে কিছুক্ষণ চাপতেই পাসওয়ার্ড খুলে গেল।অতঃপর সে একটা ফাইল থেকে অনেক ইনফরমেশন নিজের পেন ড্রাইভে নিয়ে নিল।তার মধ্যে শেষ তথ্যগুলো ছিল জায়ান ভাইয়ের মা’র্ডা’র কেইস সম্পর্কিত। আগুন্তক শেষ তথ্য গুলো খুব মনযোগ আর সময় দিয়ে নিয়ে নিল।তারপর শেষে যখন ফাইল থেকে বেড়িয়ে আসবে তখন আরেকটা ফাইল তার নজরে পড়ে।সেখানে সিআইডি অফিসারদের ইনফরমেশন। আগুন্তক ফাইলে ঢুকে বেশ কিছুক্ষণ ঘাঁটতেই অবাক হয়ে গেল।অতঃপর আশ্চর্য স্বরে বলে উঠলো,
–“ও মাই গশ!আর ইয়্যু হিয়ার!”
আগুন্তক আরেকটু ঘাঁটতে যাবে তার আগেই সিআইডি অফিসের দরজা খুলে যায়।কারো উপস্থিতি টাহর করতে পেরে আগুন্তক উঠে ঝটপট ছাঁদের দিকে দৌড়াতে থাকে।জিতু ভাই আর আবির এই এরিয়ায় আসেপাশে ছিল একটা দরকারে।হঠাৎ ফোনে এলার্ট আসায় জিতু ভাইয়া বুঝে কেউ তার কম্পিউটার খোলার চেষ্টা করছে।তারা আর দেরি না করে ঝটপট ফিরে আসে।
সিঁড়ি দিয়ে আগুন্তক প্রাণপণে ছুটছে। জিতু ভাইয়া চিৎকার করে উঠলো,”হা’রা’মির বাচ্চা। ধরতে পারলে ফাঁ’শিতে ঝুলাব।”
অফিসার আবির বলল,”এই দাঁড়া বলছি।ধরতে পারলে খবর আছে।সারেন্ডার কর বলছি।আমি কিন্তু শুট করব।”
আগুন্তক দৌড়াতে দৌড়াতে বাঁকা হাসল।কারণ এই অন্ধকারে কেউ তার কিচ্ছু করতে পারবে না।আগুন্তক ছাঁদে ওটার জন্য দরজার প্রায় কাছে আসতেই জিতু ভাইয়া থাবা মেরে মাথার হুডিটা খুলতেই একগুচ্ছ মেয়েলি সিল্কি চুল পিঠে আঁচড়ে পড়ল।মেয়েটা তৎক্ষনাৎ দৌড়ে গিয়ে ছাঁদের দরজা অফ করে দিল।জিতু ভাইয়া ছুটে এসে একটা লাথি দিতেই দরজা ভেঙে যায়।কিন্তু ভেতরে এসেই দেখল মেয়েটা আরেক বিল্ডিং এর ছাঁদে ইতোমধ্যে পৌঁছে গিছে।জিতু ভাইয়া আর আবির এক দন্ড সময় ব্যয় করল না।তারা দৌড়ে নিচে নেমে এসে দেখে বেশ কিছুটা দূরে বাইকে বসে আছে আগুন্তক মেয়েটা।মেয়েটা আরও আগে নিচে নেমে বাইকে বসে সিআইডির জন্য অপেক্ষা করছে।কি অদ্ভুত আর সাহসী মেয়েটা! জিতু ভাইয়া এই নিয়ে বেশি ভাবার ফুসরত পেল না।
জিতু ভাইয়া আর আবির চেচিয়ে মেয়েটাকে দাঁড়াতে বলল।মেয়েটা বাঁকা হাসল।যা হেলমেটের জন্য দেখা যায় নি।তবে চোখে তা ভেসে উঠেছে। আগুন্তকের দিকে সিআইডি দুইজন ছুটে আসছে তা দেখে মেয়েটা ভারিক্কি স্বরে বিরবির করল,
–“আমাকে ধরতে চাও তোমরা?আমাকে,মীরা চৌধুরী কে!দ্যা ক্রেজি গাই!”
নিজের বাক্য শেষ হতেই চোখের উপর হেলমেটের গ্লাস ফেলে বাইক নিয়ে ছুটে চলে গেল।পিছন থেকে জিতু ভাইয়া আর আবির বেশ কয়েকবার গাড়িতে শুট করল। তবে গাড়ির আঁকাবাকা গতিবেগের জন্য সবকটা নিশানা ছ্যুত হল।
চলবে,,,,,,
জাহানারা
জান্নাত_মুন
পর্ব :৬২
🚫ক’পি করা নিষিদ্ধ
🔞 সতর্কবার্তা:
এই গল্পে অশ্রাব্য ভাষা, অশ্লীলতা এবং সহিংসতার উপাদান রয়েছে। ১৮ বছরের কম বয়সী বা সংবেদনশীল পাঠকদের জন্য উপযুক্ত নয়। পাঠক নিজ দায়িত্বে পড়বেন।
ইফান দেশে ফিরেছে আজ এক সপ্তাহ হল। দেশে আসার পর তিনদিন আমাকেই বেশি সময় দিয়েছে।তবে কদিন ধরে ওকে বাসায় খুব কম দেখা যায়।সারাদিন থাকে না।আবার রাতেও ফিরছে অনেক লেইট করে। ইফান আসার আগেই অবশ্য আমি ঘুমিয়ে পড়ি।তারপর ফজরের দিকে যখন উঠি তখন দেখি সে আমার কোমর জড়িয়ে ধরে ঘুমচ্ছে।আর আমাদের মাঝে নিজের স্বল্প জায়গা দখল করে রাখে নিম্মি।ইফান নিম্মির উপর বেশ চটে আছে।কদিন ধরে আমার কাছে আসতে পারছে না এক নিজের ব্যস্ততা।আর দুই নিম্মি।
আজ সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠে দেখি আমার পাশে নিম্মি নেই। পাগলের মতো সারা বাড়ি খুঁজেও আমার মেয়েটাকে কোথাও খোঁজে পাইনি।হ্যা,আজকাল এই ছোট্ট প্রাণীটাকে নিজের সন্তানের মতো আগলে রাখছি। ভার্সিটিতেও যাওয়া হচ্ছে না। তাই সারাদিন ওকে নিয়েই আমার সময় কাটছে।এই নিয়ে ইফান আর দাদি বড্ড বেজার।দাদির কথা পশুপাখি থাকবে বাড়ির বাইরে। ঘরে কেন? ঐদিন তো আবার নুলক চৌধুরীর বিছানাতেও প্রস্রাব করে দিয়েছিল।তা নিয়ে এই প্রথম নুলক চৌধুরী আমায় কয়েকটা কড়া কথা শুনিয়েছে।
নিম্মিকে খুঁজে না পেয়ে আমি বাড়ি মাথায় তুলি। ভোরের চেচামেচি অনেক জোরেই শোনা যায়।বাড়ির সকলে ছুটে আমার রুমে আসে।এসে দেখে আমার চোখমুখ ফ্যাকাসে হয়ে আছে।চোখদুটো লাল। মনে হয় আর একটু হলেই কেঁদে ফেলব।এদিকে ইফানের কানে যেন আমার চেচামেচি যাচ্ছে না।এমন ভাবেই বেঘোরে ঘুমাচ্ছে। তারপর আমি ওকে ডেকে তুলতেই ও বিরক্তি নিয়ে বলে,আমার সাথে মিশে শুয়ার জন্য নিম্মিকে সরাতে চাইলে নিম্মি ইফানের হাতে আঁচড় দেয়।সেই রাগে ইফান নিম্মির কান ধরে চৌধুরী ম্যানশনের বাইরে রেখে আসে।আমি দৌড়ে গিয়ে দেখি এই কুয়াশার মাঝে নিম্মি গেইটের সামনে বসে শীতের ঠান্ডায় কাঁপছে।আমাকে দেখা মাত্রই ছুটে আসে। আমি ওকে কোলে নিয়ে বাসার ভেতরে এসে ইফানের সাথে আচ্ছা মতো ঝগড়া লেগেছিলাম। আজ তাই চৌধুরী বাড়ির সকলেই তাড়াতাড়ি উঠে গেছে।
আমি রান্নাঘরে আমার জন্য লেবু দিয়ে এক কাপ চা বানাচ্ছি আলাদা ভাবে।ফারিয়া আর কাকিয়া বাগানে গেছে টাটকা কিছু সবজি তুলতে। পলি আরও আগেই বাকিদের চা দিয়ে দিয়েছে। রান্নাঘর থেকে দেখা যাচ্ছে ইফান, মাহিন আর মীরা বসে আছে। কি যেন বিষয় নিয়ে নিম্ন স্বরে কথা বলছে। আমি এখান থেকে শুনতে পারছি না।
–“কার জন্য এত যত্ন করে চা বানাচ্ছ?”
কারো কন্ঠ কানে যেতেই পাশ ফিরলাম। নাবিলা চৌধুরী বুকে দু’হাত গুঁজে দাঁড়িয়ে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। আমি ফান করে বললাম,”আপনার ছেলের জন্য।”
নাবিলা চৌধুরী ঠোঁট প্রসারিত করে হেসে বলল,”বাট আমার ছেলে চা খায় না জান না?”
–“আমি দিলে বি/ষও খাবে।”
নাবিলা চৌধুরী কফি তৈরি করার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। কিন্তু আমার কথায় চোখ ঘুরিয়ে তাকিয়ে শীতল কন্ঠে বললেন,”তাহলে বি/ষ খাইয়ে মারতে চাইছ?”
–“উহু।সেটা চাইলে আরও আগেই করতে পারতাম।”
নাবিলা চৌধুরী বাঁকা হেসে বলল,”হালিমার মতোই জেদি হয়েছ দেখছি।”
হঠাৎ নাবিলা চৌধুরীর এহেন কথায় আমি আশ্চর্য হয়ে বললাম,”আমার মা’র সম্পর্কে আপনি কি করে জানলেন?”
ফের হাসলো নাবিলা চৌধুরী। মজার ছলে বলল,”কেন তোমার মা কি বলে নি কিছু? আমি তো ভেবেছিলাম আমাকে জ্বালাতেই তোমার মা মেয়ে পাঠিয়েছে।”
আমি চেহারা কুঞ্চিত করে শুধালাম,”আম্মুকে কি করে চিনেন আপনি?”
ইফান ওয়াইনের গ্লাসে কিছুক্ষণ পর পর ছোট ছোট চুমুক দিচ্ছে। মীরা আর মাহিন চা খাচ্ছে। মীরা নিচু স্বরে বলল,”পেনড্রাইভ টা কি চেক করেছ?”
–“হু।”
ইফান ভাবলেশহীন ভাবে প্রতিত্তোর করলো।মীরা তপ্ত শ্বাস ছেড়ে বলল,”এসপি একটু বেশিই বারাবাড়ি করছে।ওরা জানে মাফিয়াদের সাথে পেরে উঠবে না।বাট স্টিল আমাদের কাজে বাঁধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। আমরা না হয় ছাড় দিব তাকে।বাট ফাদার?”
ইফান জবাব দিল না।শুধু মন দিয়ে সবার কথা শুনছে।মাহিন বলল,”গড ফাদার তোমার সাথে দেখা করতে চাইছে।আমাকে আর ইনান কে বেশ কয়েকবার ফোন দিয়ে বলেছে তোমার সাথে জরুরি কথা আছে।”
–“হুম।”
ফের ইফানের ভাবলেশহীন উত্তর। মীরা এবার অধৈর্য হয়ে বলল,”বুঝতে পারছ তুমি সিআইডি এগজ্যাক্টলি কার লেজে পা দিয়েছে?
ও মাই গুডনেস! সিআইডি নিজেও জানে না তারা কত বড় ভুল করছে। ওদের এই ভুলের জন্য না আবার…”
মীরা বাক্য সম্পূর্ণ করার আগেই ইফান ক্রুদ্ধ নয়নে চোখ তুলে তাকাল।হাতের ওয়ানের গ্লাসে বল প্রয়োগ করতে লাগল।চোয়াল শক্ত করে শীতল কন্ঠে আওড়াল,”আমার কলিজায় হাত দেওয়ার আগেই সেই হাত কে’টে দিব।সে যেই হোক না কেন।”
ইফানের ঠান্ডা কন্ঠের কঠোর নিষেধাজ্ঞা শুনে মীরা আর মাহিন চোখাচোখি করল।মাহিন কিছু একটা ভেবে বলল,”আমার মনে হয় ফাদারের সাথে তোমার একবার মিট করা প্রয়োজন।”
–“হুম আমারও অনেক বোঝাপড়া আছে।ভেরি সুন তার সাথে দেখা হচ্ছে।সব রেডি করে রাখিস।”
–“কবে যাচ্ছ?”
ইফান মীরার কথার উত্তর না দিয়ে ওয়াইনের গ্লাসে ছোট্ট করে একটা চুমুক দিতে দিতে কিচেনের দিকে ঘাড় ঘুরাল।আমি চা খাচ্ছি এবং নাবিলা চৌধুরীর সাথে কথা বলছি।ইফান আমার শান্ত চেহার দিকে এক ধ্যানে তাকিয়ে রইল।হয়তো আমার মাঝে অনেক পরিবর্তন দেখতে পারছে।আমি এখন আর আগের মতো চটপট করি না।রাগটাও অনেকটা নিভে গেছে।মাঝেমধ্যে ইফানের সাথে এমন আচরণ করি যে ইফানই কনফিউজড হয়ে যায় এটা আসলেই আমি কিনা।ইফান আমার দিকে তাকিয়ে থেকেই আনমনে বলে উঠলো,
–“আমার অবর্তমানে কিছু একটা তো হয়েছেই।ও তো এরকম ছিল না।কি হয়েছে ওর?আমার থেকে কি লুকাতে চাইছে?”
–“মাফিয়া বসের এত দুর্বল হওয়া শোভা পায় না।”
মাহিনের বাক্যটা ইফানের কানে যেতেই টনক নড়ল।ইফান মাহিনকে সুক্ষ্ম চোখে দেখে বাঁকা হাসল।অতঃপর শুধাল,
–“কে বলল আমি দুর্বল?”
–“যার দুর্বলতা আছে সে তো দুর্বলই।”
–“হুম দুর্বলতা আছে তো বটেই। তাই বলে আমাকে দুর্বল ভাবা নট ফেয়ার।”
মাহিন হাই তুলে কৌতুক মিশ্রিত কন্ঠে বলল,”এই জন্যই বলেছিলাম মহিলা চক্করে ফেঁসো না ব্রো।গেলে তো ফেঁসে। এবার ঠেলা সামলাও।”
–“বেশি লাফিও না চান্দু। পরে দেখবা তুমিও ফেঁসে গেছ।”
ইফানের কথায় মাহিন আর মীরা দু’জনেই উচ্চ স্বরে হেসে দিল।মাহিন চুল পিছনে ঠেলে দিতে দিতে ভাবসাব নিয়ে বলল,”আমাকে ফাঁসানোর মতো মেয়ে মানুষ এখনো পৃথিবীতে আসে নি। সো ফেঁসে গিয়ে নিজের দুর্বলতা তৈরি করার নো চান্স।”
ইফান জিহ্বার ডগা দিয়ে গাল ঠেলতে ঠেলতে আবারও কিচেনের দিকে দৃষ্টিপাত করে বিরবির করে বলল,”সে তো আমার টাও ছিল না।কিন্তু কি থেকে কি যেন হয়ে গেল। হঠাৎ সে এক প্রলয়ংকরী ঝড়ের মতো আমার অন্ধকার শহরে হানা দিল। সব মরীচিকা ভেদ করে এই পাপের শহরে শুভ্র কাশফুল হয়ে ফুটে শুভ্রতা ছড়াল। আমার নিথর, অনুভূতিহীন হৃদয়ে অনুভূতির এক প্রবল জোয়ার তুলে আমাকে ভাসিয়ে দিল অকূল দরিয়ায়। এখন আমি এক অনিবার্য পরিণতির দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে– যেখানে ফেরার পথ নেই, আছে শুধু অতল বিসর্জন।”
“শুন মেয়ে,মেয়ে মানুষদের বেশি উড়া ঠিক না।সব কিছুর একটা লিমিট থাকা প্রয়োজন। সবসময় নিজের জেদ ইগো ধরে রাখলে সমস্যার সমাধান হবে না। কখনো কখনো নিজের হারকেও মেনে নিতে হয়। ভতরে কষ্ট থাকলে সেটাও লুকিয়ে রাখতে হয়। না হলে কি হয় জান?”
–“কি?”
নাবিলা চৌধুরীর কথায় মৃদু স্বরে শুধালাম। নাবিলা চৌধুরী বাঁকা হেসে বলল,” কোনো কিছুই আর নিজের আয়ত্তে থাকে না। একা হয়ে পড়তে হয়। অনেক সময় আছে নিজের ভালো বুঝতে শিখ। হয় নিজের সংসারে মন দাও আর নয় তো..”
–“আর নয় তো?”
নাবিলা চৌধুরী আমার আরেকটু কাছে এসে দাঁড়াল। শীতল কন্ঠে বলল,”অনেক দূরে চলে যাও। নতুন করে নিজেকে নিয়ে ভাব।সংসার গড়। এই পরিবেশ তোমার মত ফুলদের জন্য নয়। সবে যৌবনে পা দিয়েছ।তোমার পুরো জীবন এখনো পড়ে আছে। আমি আমার ছেলেকে ম্যানেজ করে নিব,,,”
–“ম্যানেজ করে নিবেন! তাহলে আগে আটকালেন না কেন?কেন আমার জীবনে ও কালরাত্রি হয়ে নামল ? কেন আমার গোছানো জীবনটা ধমকা হাওয়ায় এলোমেলো করে দিল? যখন চঞ্চল চড়ুইয়ের মতো মুক্ত আকাশে ডানা ঝাপটানোর কথা ছিল তখন কেন আমার ডানা দুটো ভেঙে পায়ে শিখল পড়ানো হল? কি দোষ ছিল আমার?”
আমার একনাগাড়ে বলা বাক্যগুলো শুনে নাবিলা চৌধুরী কোনো কথা খুঁজে পেল না বোধহয়। তিনি আগের ন্যায় শীতল দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে। আমার বাক্যগুলো তার মধ্যে কোনো প্রভাব ফেলেছে? হয়-তো।
নাবিলা চৌধুরী আমার নির্লিপ্ত মুখাদল পড়ুক করে বলল,”দোষ তো আমারও ছিল না। কিন্তু আআআ…”
কিচেন কাউন্টারে রাখা গরম পানিতে উনার হাত পড়তেই কথা মাঝ পথে থামিয়ে আচমকা চেচিয়ে উঠলেন তিনি। এতক্ষণ আমার দিকে একনাগাড়ে তাকিয়ে থাকা ইফানের কানে তার মায়ের আর্তনাদ পৌঁছাতেই এক ছুটে এসে তাড়াতাড়ি নাবিলা চৌধুরীর হাতে ঠান্ডা পানি ঢালতে লাগল।উদ্বীগ্ন হয়ে বলতে লাগল,”ও মাই গড! মম আর ইয়্যু ওকে?”
–“ইয়াহ্ বেটা।”
উত্তর করতে করতে নাবিলা চৌধুরী আমার দিকে তাকিয়ে ঠোঁট প্রসারিত করল।উনি আমাকে কি বুঝাতে চাইছেন,ছেলে মা ভক্ত? এটা আমায় নতুন করে বুঝানোর কি আছে আশ্চর্য!!বিয়ের পর থেকেই তো জানি ইফান যদি কারো কথা শুনে তা একমাত্র নাবিল চৌধুরী’র।
–“হোয়াট দ্যা হেল? তোমাকে কিচেনে আসতে কে বলেছে? কার এত বড় সাহস?”
নাবিলা চৌধুরী হেসে কফির মগটা এগিয়ে দিয়ে বলল,”লুক বেটা। মম মেইড দিস ফর ইয়্যু।”
–“এটা তোমার জন্য।”
ইফান কফি মগের দিখে তাকাতে না তাকাতেই আমার আধ খাওয়া চায়ের কাপটা ইফানের সামনে ধরলাম। ইফান চা কাপে একবার দৃষ্টি বুলিয়ে আমাকে আশ্চর্য নয়নে দেখতে লাগল,আমি কি জেয়লাস? আমি শুকনো কেশে হাত ফিরত নিয়ে আসতে নিলেই ইফান কাপটা নিয়ে নেয়। এদিকে নাবিলা চৌধুরী রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে কফি মগ ইফানের থেকে সরাতে নিলে সেটাও ইফান নিয়ে নেয়। অতঃপর আড় চোখে আমাকে দেখতে দেখতে কিচেন থেকে বেড়িয়ে গেল।
ইফান আবার লিভিং রুমে মীরা আর মাহিনের সাথে গিয়ে বসল। ইতিমধ্যে চৌধুরী বাড়ির বাকি পুরুষরাও এসে গিয়েছে। ইফানের হাতে দুটো কাপ দেখে ইমরান একটা নিতে নিলে ইফান বাঁধা দেয়।অতঃপর তার ওয়াইনের গ্লাসে চা আর কফি ঢেলে তাতে একটা চুমুক দিয়ে বলে উঠলো,”উমমম কড়া জিনিস।”
মারী নাক ছিটকাল।ইফান আয়েশ ভঙ্গিমায় পায়ের উপর পা তুলে নাড়াতে নাড়াতে ইকবাল চৌধুরী কে জিজ্ঞেস করল,”তো কি খবর ডেড? কেমন চলছে দিনকাল?”
পলি এসে আবারও চা দিয়ে গেল।ইকবাল চৌধুরী চা খেতে খেতে বলল,”এই তো চলছে। শুধু বিরোধী দল একটু বেশি ঝামেলা করছে।”
–“কেন আবার কি করেছে হালার পোয়ারা?”
ইকবাল চৌধুরী তপ্ত শ্বাস ছাড়ল।তবে কিছু বলল না।ইরহাম চৌধুরী উত্তর করল,”আর বলিস না ভাইপো। আমাদের সাথে ক্ষমতায় কোনো ভাবে না পেরে এখন খালি ইমরানকে টার্গেট করছে।এই নিয়ে বেশ কয়েকবার ইমরানের উপর হামলা হয়েছে।”
–“কি বল!”
ইফান চোখমুখ শক্ত করে সোজা হয়ে বসল।ইমরানের দিকে প্রশ্নাত্মক দৃষ্টিতে তাকাতেই ইমরান ফোঁস করে শ্বাস ছাড়ে বলল,”কি আর বলি ব্রো। আমার পেছনে শালাগুলো জোকের মতো লেগে আছে।”
ইফান দাঁতে দাঁত পিষে বলল,”শালারা যে এত গরম হয়েছে আমাকে তো জানাস নি।”
–“কি আর জানাব বল।তুমি গ্যাংস্টার মানুষ।এমনিতেই তো তোমার ঝামেলার শেষ নেই। তারউপর এসব শুনলে নিশ্চয়ই র’ক্তার’ক্তির একটা কান্ড ঘটিয়ে বসবে। আর আমি চাইনা এসব ঝামেলা। এমনিতেই রাজনীতি বিষয়টার উপর অনিহা চলে আসছে।আব্বুর জন্যই এসবে না চাইতেও আমাকে আর কাকাইকে জড়াতে হচ্ছে। আর এখন একটার পর একটা হা’ম’লা। জানি না আমার পিছনে কেন এভাবে পড়ে আছে।কিন্তু হা’মলাকারীরা খুবই ধূর্ত। আমার প্রতিটি পদক্ষেপ তাদের নখদর্পনে। মাঝেমধ্যে তো মনে হয় আমার খুব পরিচিত কিংবা ঘনিষ্ঠ মানুষজনই পিছন থেকে কলকাঠি নাড়ছে। জানি না সামনে কি হয়।”
ইমরান নিজের বলা শেষ করেই গাল ফুলিয়ে দম ফেলল।ইফান রাগে ফুঁসে ওঠে চেচিয়ে উঠলো, “কি হবে মানে কি! একবার ধরতে পারলে সবকটার বডি ফেলে দিব।”
ইকবাল চৌধুরী হতাশ কন্ঠে বলে উঠল,”আমার জন্য তোদের কে এত ঝামেলা পোহাতে হচ্ছে। কি আর করি বল। মাঝেমধ্যে চিন্তা করি সামনের বার আর ইলেকশনে দাঁড়াব না।তারপর যখন ইলেকশনের সময় চলে আসে, আর আমার লক্ষ লক্ষ সমর্থনকারী দেখি তখন আর লোভ সামলাতে পারি না।রাজনীতি টা আমার নেশার মতো হয়ে গেছেরে বাপ। নিজের ক্ষমতা যতটুকু অশান্তির কারণ ততটাই শান্তি লাগে যখন সাধারণ জনগণের পাশে দাঁড়াতে পারি।”
ইকবাল চৌধুরী ইমোশনাল কথা শুনে ইফান হাতের কনিষ্ঠা আঙ্গুল দিয়ে কান চুলকাতে লাগল।চেহারায় বিরক্তি ভাব স্পষ্ট।এসব সেন্টিমেন্টাল কথা আবার তার পোষায় না। তার জীবনে কখনো কোনদিন কাউকে দয়া দেখিয়েছে কিনা সে মনে করতে পারছে না।
লিভিং রুমের উপস্থিত সকলে চেচামেচি শুনে সিঁড়ির দিকে তাকাল।ইতি আর নোহা নিম্মিকে ধরার জন্য ছুটছে। নিম্মি ছুটে এসে ইফানের পাশে রাজকীয় ভাব নিয়ে বসল।ইফান বিরক্তিতে দাঁত কটমট করল।এখন তার মনে হয় এই জিনিসটা বউকে গিফট করায় তার উচিত হয়নি।ছেলে বিড়াল বেশি ডলাডলি করবে বলে মেয়ে বিড়াল দিয়েছে।আর এখন এই শালিই তার শত্রুর মতো আচরণ করছে। ইফান মনে মনে কয়েকটা গালি দিয়ে নিম্মির কানে ধরল নামিয়ে দিবে বলে।তক্ষুনি কিচেনে আমার দিকে নজর পড়ে। আমি খুন্তি উল্টে পাল্টে দেখতে দেখতে আড় চোখে ইফানের দিকে তাকালাম। ইফান শুকনো কেশে সোজা হয়ে বসল। অতঃপর বিরবির করতে করতে নিম্মির দিকে তাকাল। নিম্মিকে দেখে মনে হচ্ছে সেও তেসরা চোখে ইফানের দিকে তাকিয়ে। হঠাৎই জিহ্বা বের করে মুখের আসেপাশে চেটে নিল।এটা দেখ ইফানের মস্তিষ্ক চিরবিলিয়ে উঠে। নিম্মির ঘাড়ে ধরতে যাবে তার আগেই কিচেন থেকে আমি ওর দিকে পাকা টমেটো ছুড়ে মারি। ইফান কোনোমতে ক্যাচ করে।তবে টমেটো গলে ওর পরিধেয় টাউজার প্যান্ট নোংরা হয়ে যায়।
ইফানের এমন অবস্থা দেখে উপস্থিত সকলে হাসিতে ফেটে পড়ল।কার হাসি কতটা জোরে শুনা যাচ্ছে বলতে পারব না।তবে নোহার গলা ছাড়া হাসির ঝংকার সারা ড্রয়িং রুম কাঁপিয়ে দিচ্ছে।
দোতলা দিয়ে নামতে নামতে নিজের মেয়ের এমন গর্ধপের মতো কান্ডকারখানা দেখে চোখ মুখ আরও শক্ত হয়ে আসল নুলক চৌধুরীর। তিনি আর এক মূহুর্ত এখানে না দাঁড়িয়ে ঝটপট চলে গেল নাবিলা চৌধুরীর রুমে।
নাবিলা চৌধুরী মিররের সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে প্রস্তুত করছেন অফিসের উদ্দেশ্য। নুলক চৌধুরীর উপস্থিতি ঠাহর করতে পেরে পিছন ফিরলেন।নুলক চৌধুরীর সেই আগের মতো অভিব্যক্তি।নাবিলা চৌধুরী নুলক চৌধুরীর গেটআপ দেখে বুঝতে পারলেন এখনো তিনি রেডি হয় নি।নাবিলা চৌধুরী মৃদু হেসে বলল,”কি ব্যপার এখনো রেডি হও নি যে? নাকি আজ অফিসে যাবে না?”
–“তোদের মানে চৌধুরীদের অফিসে আমি গিয়ে কি করব?”
নুলক চৌধুরীর হঠাৎ এমন রুক্ষ আচরণে নাবিলা চৌধুরী বেশ অবাক হলেন। বিষ্ময়কর কন্ঠে বলে উঠল,”দিভাই কি হয়েছে তোমার? হঠাৎ এমন করছ কেন?”
–“কেন করব না নবু বলতে পারিস? তুই আমাকে বলেছিলি তোর ছেলের বউ বানাবি আমার মেয়েকে।আমাদের প্রায় ভেঙে যাওয়া রিলেশনটাকে আরও মজবুত করবি।তা এখন কি করছিস? আমাকে লন্ডন থেকে আনিয়ে চৌধুরী বাড়িতে আশ্রিতদের মতো বসিয়ে রেখেছিস।”
-“দিভাই!!”
অস্পষ্টে আওড়াল নাবিলা চৌধুরী।নুলক চৌধুরীর প্রতিটি বাক্য আজ তাকে অবাক করছে। তার মনে পড়ছে না কবে এধরণের আচরণ করেছে নুলক চৌধুরী।
নুলক চৌধুরী তপ্ত শ্বাস ছেড়ে বুকে দু হাত গুঁজে শীতল কন্ঠে বলল,”দেখ নবু এভাবে দিনের পর দিন অন্যের বাড়িতে পড়ে থাকতে পারব না।আমার নিজের ঘর আছে।আই হোপ জানিস আমাকে কেমন রানীর মতো রাখা হয়। আমি খুব তাড়াতাড়ি লন্ডনে ব্যাক করব।”
–“এসব কি বলছ তুমি? বারবার কেন আমাদের দূরের মানুষ ভাবছ? এটা তো তোমারো বাড়ি।”
নাবিলা চৌধুরীর কথায় নুলক চৌধুরী অধিক উত্তেজিত হয়ে বলে উঠল,”উহু এটা তোর বাড়ি।তোর শ্বশুর বাড়ি আর তোর বাপের বাড়ি।আমি এ বাড়ির কেউ না।নো ওয়ান।
সেদিনই পর হয়ে গেছি যেদিন আব্বু তার সকল প্রোপার্টি তোর নামে করে দিয়েছিল।অবশ্য এসব প্রোপার্টির উপর লোভ আমার কোনো কালেই ছিল না। যাই হোক এবার তুই বল ঐ মেয়ের কি ব্যবস্থা করবি?”
নাবিলা চৌধুরী দীর্ঘ শ্বাস ছেড়ে বলল,”আমি আর কি করব।আমার ছেলে ভালোভাবেই ঐ মেয়ের প্রতি মজেছে। প্রথমে ইফানের বিহেভ দেখে মনে করেছিলাম জাহানারা মেয়েটা টিকবে না।এখন সম্পূর্ণ উল্টো ঘটনা। মেয়েটার জন্য রীতিমতো পাগলামি করে। এখন যদি ওর থেকে আমি সরাতে চাই তাহলে আমিই ছেলের কাছে খারাপ হয়ে যাব। তাই তারা এক সাথে থাকতে পারলে আমার আর কি করার আছে?”
–“তাহলে তো আমাকেই কিছু করতে হবে?”
–“মানে?”
–“কিছু না।তোকে এসব নিয়ে ভাবতে হবে না নবু।এবার সব আমার উপর ছেড়ে দে।”
–“কি করবে তুমি?”
নাবিলা চৌধুরীর ব্রু যুগল কুঞ্চিত হয়ে আসল।নুলক চৌধুরী ক্রুর হাসল।যা মূহুর্তেই অদৃশ্য হয়ে যায়।নাবিলা চৌধুরী উত্তরের আশায় তাকিয়ে আছে।নুলক চৌধুরী কিছু বলল না।তার হঠাৎ নজর আটকায় নাবিলা চৌধুরীর গলায় চকচক করতে থাকা সবুজ পাথরের নেকলেসটার উপর। বোনের এমন দৃষ্টি দেখে নাবিলা চৌধুরী নিজের গলার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল।
–“গতকাল তোমার ভাই আমার জন্য এনেছে।সুন্দর না?
–“হুমম খুওওব সুন্দর?”
উদাসী ভঙ্গিমায় উত্তর করল নুলক চৌধুরী। নাবিলা চৌধুরী পুনরায় মিররের সামনে দাঁড়িয়ে নিজের গলায় পড়ে থাকা সবুজ রত্নের দামি নেকলেসটা দেখতে লাগল। চোখে মুখে খুশির ঝিলিক দিচ্ছে তার।এদিকে পিছনে দাঁড়িয়ে থাকা নুলক চৌধুরীর হাত দু’টো মুষ্টিবদ্ধ হয়ে আসল।চোখেমুখে কঠোর কাঠিন্য। অযাচিত এক ক্রোধে নুলক চৌধুরীর মস্তিষ্ক চিরবির করছে। অতঃপর নিজের রাগকে নিয়ন্ত্রণ করতে রুম থেকে বেড়িয়ে গেল।
ভার্সিটিতে আসার পর থেকে আমার বেস্টিরা নিম্মিকে নিয়ে মেতে উঠেছে। বেশ কয়েকবার নিম্মিকে কোলে রাখা নিয়ে সুমাইয়া নাফিয়ার মধ্যে ঝগড়াও হয়ে গেছে। বর্তমানে নিম্মি তন্নির কোলে।তেসরা চোখে তন্নির দিকে তাকিয়ে আছে সুমাইয়া আর নাফিয়া।তন্নি ওদের পাত্তা দিচ্ছে না।
ভরদুপুর।শীতের এই দুপুরে সূর্যের আলোটা জম্পেশ আরাম দিচ্ছে গায়ে। ভার্সিটির লাইব্রেরি থেকে এখন হাকিম চত্বরে উপস্থিত হয়েছি। আমার সাথে ফারিয়াও এসেছে।আমরা টোলে বসে আছি।আমার আপাতত সম্পূর্ণ মনযোগ ফোনে।ফারিয়া গরম গরম ফুচকা অর্ডার দিতে গেছে। সুমাইয়া এবার গাল ফুলিয়ে বলে উঠলো,”জাহান তইন্না শালিকে বল নিম্মিকে দিতে।আল্লাহ কি কিউট বিল্লু।”
নাফিয়া দাঁত কটমট করে বলল,”তইন্না মা*গী তুই কি দিবি নাকি দিবি না?”
–“পারতাম না।আরও যুদ্ধ লাগ তরা।”
–“আহ্ তোরা থামবি।”
আমি ধমকে উঠলাম।তন্নির থেকে নিম্মিকে আমার কোলে নিয়ে বললাম,”আমার বাচ্চা আমার কাছে থাকবে। আর একটাও কথা না।”
সুমাইয়া নাফিয়া গাল ফুলাল।এরইমধ্যে ফারিয়া এসে বসল।কথায় কথায় তন্নি জিজ্ঞেস করল,”তুমি কোন ভার্সিটিতে পড়?”
–“ইডেনে পড়তাম।এখন আর পড়তে মন চায় না।এখন একটা বিয়ে করে জম্পেশ সংসার করব। পড়াশোনা করে আর কি হবে বল? সেই তো হাঁড়িপাতিল মাজতে হবে।”
–“একদম ঠিক বলছ। পড়াশোনা আবার মানুষে করে।”
নাফিয়ার কথার পিছে বললাম,”তাহলে কি তুই মানুষ প্রজাতির বাইরে নাকি।”
–“ধুর বাল। কথায় কথায় ভুল ধরবি না।”
নাফিয়া রেগে গেছে দেখে সকলেই হেসে উঠল।ফুচকা চলে আসতেই সকলে খেতে ব্যস্ত হয়ে উঠল।আমি একটার বেশি খেলাম না।”কিরে বসে আছিস কেন?”আমাকে বসে থাকতে দেখে তন্নি শুধালো।
–“এসব খেতে আমার ভালো লাগে না।”
–“তাহলে আপনার গুলোও আমি খেয়ে ফেলি।আমার অনেক পছন্দ।”
বলেই ফারিয়া আমার প্লেটের ফুচকাগুলো তুলতে যাবে তখনই বেখেয়ালি নজর আটকালো বেশ খানিকটা দূরে দাঁড়িয়ে থাকা একটা গাড়ির উপর ।আর সেই গাড়ি তে পঙ্কজকে দেখা যাচ্ছে। খুশিতে ফারিয়ার ঠোঁটে লাজুক হাসি উদয় হল। সে তাড়াতাড়ি নিজেকে গুছিয়ে নিল।তার প্লেটের ফুচকাগুলোও তন্নিদের দিয়ে দিল।
আমি হঠাৎ ফারিয়ার এমন আচরণের কারণ খুঁজে পেলাম না।আর খুঁজতেও চাইলাম না।
রাত আটটার পর চৌধুরী বাড়িতে ফিরলাম।সেই যে ভার্সিটি গেয়েছিলাম এর পর আর বাসায় ফেরা হয় নি।ফারিয়ার কাছে নিম্মিকে দিয়ে বাসায় পাঠিয়ে দিই।বাড়ির সবাই বেশ চিন্তা করছিল আমাকে নিয়ে। ইফান ফোন করে যখন জানল ফারিয়া বাসায় একা এসেছে। আমাকে নিয়ে আসে নি।তখন ফারিয়াকে ফোন কলে হুমকি-ধুমকিও দিয়েছে। কাঁদতে কাঁদতে ফারিয়ার অবস্থা খারাপ। আমি বাসায় ঢোকতেই এসব জানতে পারলাম।তবে কারও সাথে কোনো প্রকার বাক্য বিনিময় না করে নিজের রুমে চলে আসলাম।
আমি বেশ লম্বা সময় ধরে শাওয়ার নিয়েছি।একটু আগেও প্রচন্ড গরম লাগছিল।এখন শীত অনুভব করতে পারছি।ঠান্ডায় হাত পায়ে কাঁপন ধরে গেছে। গায়ে শাড়ি জড়িয়ে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে ভেজা চুলগুলো টাউয়াল দিয়ে মুছতে লাগলাম। হঠাৎই ঠাস করে দরজা খুলে রুমে প্রবেশ করল ইফান।কোনো পূর্বাভাস না দিয়ে বড় বড় পা ফেলে আমার কাছে এসে– আমার চোয়াল শক্ত করে ধরে দেয়ালের সাথে ঠাস করে চেপে ধরল।মাথায় আর পিঠে আঘাত লাগতেই ব্যথায় কুঁকড়ে মৃদু আর্তনাদ করে উঠলাম,
–“আহ্।”
ইফান সেসবে তোয়াক্কা না করে হাতে আরও চাপ প্রয়োগ করল।আরেক হাতে থাকা রিভলবারের নলটা আমার মুখে অত্যন্ত সন্নিকটে ধরে দাঁতে দাঁত পিষে হুংকার ছুড়ল,”দেই দেই সবগুলো বুলেট তোর ভিতরে ভরে দেই। বান্দির বাচ্চা আমাকে কি তোর কুত্তা মনে হয়।তোর যখন যা খুশি ইচ্ছে করবে তুই তাই করবি। আর আমাকে তর পিছনে কুত্তার মতো ছুটতে হবে। এই এই আমাকে কি তোর মানুষ মনে হয় না। কিরে কিছু বলছিস না কেন?”
আমি ইফানের হাত সরাতে চেষ্টা করছি।অস্পষ্ট স্বরে বললাম,”আহ্ আমার লালগছে।”
–“লাগুক আরও বেশি লাগুক। কোন সাহসে আমার চোখে ধুলো দিস। এই এত রাত অব্ধি বাড়ির বাইরে থাকার অনুমতি তোকে কে দিয়েছে?আমি ছিলাম না গার্ডদের চোখে ধুলো দিয়ে ডানা মেলে উড়েছিস।আর আমার উপস্থিতিতেও এত সাহস দেখাচ্ছিস।এই তর ডর ভয় নাই মনে।আমাকে কি ভালো মানুষ মনে করিস?”
ইফান আরও চেপে ধরল আমাকে।রাগে তার সারা শরীর কাঁপছে। চোখ দুটো অস্বাভাবিক ভাবে লাল বর্ণ ধারন করেছে।লোকটাকে ভীষণ এলোমেলো ঠেকছে।ঘন লম্বা চুলগুলো উষ্কখুষ্ক হয়ে কপালে পড়ে আছে।সারা শরীর কালোয় মুড়ানো।বুকের কাছে শার্টের তিনটি বোতাম খোলা। ফর্সা বুকে ঘাম চিকচিক করছে।চেহারায় আতংকের চাপ।দেখে ভালোই বুঝা যাচ্ছে আমাকে কি পরিমাণ হণ্যে হয়ে খুঁজেছে।
আমি কিছু বলতে পারছি না। ইফানের শক্ত হাতের থাবায় আমার সারা শরীর বিষিয়ে আসছে। ইফান আমার নির্লিপ্ত চেহারা দেখে চোখ বন্ধ করে পরপর ঢুক গিলল।হাতের থাবার জোরও আস্তে আস্তে শীতল হচ্ছে। ইফান দু’হাতে আমার গাল আঁকড়ে ধরল।অতঃপর আমার কপালের সাথে কপাল ঠেকিয়ে হিসহিসিয়ে বলে উঠল,,
–“কেন করিস এমন পাগলামি?এবার তুই নিজেও পাগল হবি আমাকেও পাগল বানিয়ে ছাড়বি।”
–“আমার ডিভোর্স চাই ইফান।”
আচমকা আমার একটা বাক্যে টললো মাফিয়া বস। মূহুর্তেই তার হৃৎস্পন্দন গতি হারাল।তার সমস্ত অস্তিত্ব যেন খেই হারাল আমার এই একটি বাক্যে।ইফান শুকনো ঢুক গিলে আমার চোখের দিকে তাকাল।কি নিষ্প্রভ আমার সেই চাহনি। সেই দৃষ্টিতে ইফান কাঠিন্য ছাড়া আর কোনো কিছু খুঁজে পেল না।আমার গালে থাকা ইফানের হাত দুটো শীতল হয়ে আসল।যা একটু আগেও গরম ছিল। ইফানের দৃষ্টিও শীতল হয়ে আসল।পুনরায় একটা ঢুক গিলে হাস্কি স্বরে হিসহিসিয়ে বলল,
–“কি চাই তোমার ?”
–“মুক্তি চাই। তোমার অশুভ ছায়া থেকে মুক্তি চাই।”
খুব সহজ আমার প্রতিত্তোর। ইফান নিষ্প্রভ দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে রইল নির্বিকারে।কোনো বাক্য ব্যয়হীন। বেশ কিছুটা সময় অতিক্রান্ত হওয়ার পর হঠাৎই ইফানের চোখে একটা হাসির ঢেউ খেলে গেল।মূহুর্তেই তার ঠোঁটে সেই চিরচেনা বাঁকা হাসিটা ভেসে উঠল।কিছুক্ষণ চুপ থেকে ইফান হিসহিসিয়ে বলল,”খুব ভালো করেই জান, আমি বেঁচে থাকতে আমার থেকে তোমার মুক্তি নেই।”
ইফান আরও কিছু একটা বলতে গিয়েও আর বলল না।হঠাৎই তার হাতের রিভলবারটা আমার হাতে ধরিয়ে দিল।আমার হাত চেপে ধরে তার বুকের বা পাশে বন্দুকের নল স্থির করল । এতক্ষণ আমি নির্লিপ্ত থাকলেও এখন আমার চোখমুখ কুঞ্চিত হল।কি করতে চাইছে এই লোক?
ইফান বাঁকা হেসে বলে উঠল,”নাও সুট মি বেইবস। অ্যান্ড ইউ’ল বি ফ্রি ফরএভার। ট্রাস্ট মি, ওয়ান্স আই ফ্রি ইয়্যু, আই’ল্ল নেভার কেজ ইউ এগেইন।”
ইফানের হিম শীতল বাক্যগুলো আমাকে ভাবালো না।আর না কোনো অনুভুতি তৈরি করে দিল।আমি ইফানকে এক পলক দেখে হাতের বন্দুকটাতে দৃষ্টি বুলালাম।খুব মন দিয়ে সেটা দেখতে দেখতে যন্ত্র মানবের মতো আওড়ালাম,
–“এমন একটা অস্ত্র আমাকে আরও একজন তুলে দিয়েছিল।অতঃপর সবকিছু ক্র্যাশে পরিণত হয়। আল্লাহ মালুম সেটা আর পুনরাবৃত্ত না হোক।”
রাতে আমি আর নিচে নামি নি।পলি আর মীরা এসে জোর করে পরোটার দু টুকরো খাইয়ে দিয়ে গেছে। আমি নিম্মিকে নিয়ে চোখ বন্ধ করে চুপচাপ শুয়ে আছি। দরজায় শব্দ হল শুনে বুঝতে পারলাম কেউ একজন রুমে ঢুকেছে। আর এই রুমে কে ঢুকতে পারে তা আমার খুব ভালো করেই জানা।ইফান ভেতরে আসল। আড় চোখে বেডের দিকে তাকাতেই দেখল কম্ফোর্টার মুড়ে আমি শুয়ে আছি।শুধু মাথাটা দেখা যাচ্ছে।
ইফান ঠোঁটে সিগারেট ধরিয়ে ঘাড়ে হাত বুলাতে বুলাতে ওয়াশরুমে ঢুকে পড়ল।আমার নাকে সিগারেটের গন্ধ যেতেই নাক ছিটকালাম।অতঃপর হালকা ঘাড় ঘুরিয়ে ওয়াশরুমের দিকে তাকিয়ে আবার চোখ বন্ধ করে শুয়ে পড়লাম।ইফান আধঘন্টা পর ফ্রেশ হয়ে বেড়িয়ে আসল।অতঃপর ওর সাইড থেকে কম্ফোর্টার সরিয়ে চুপচাপ চোখে হাত দিয়ে শুয়ে রইল।আমি মনে মনে ভাবতে লাগলাম,এই শীতেও কি লোকটার ঠান্ডা লাগে না আজীব!!
খানিকটা সময় বাদে আবার আমার দিকে তাকালো। আমি আরেক পাশ ফিরে শুয়ে আছি।ইফান কম্ফোর্টারের ভেতর ঢুকে আমার সাথে চেপে শুয়ে পড়ল।আমি নাড়াচাড়া বিহীন শক্ত হয়ে পড়ে রইলাম। ইফান আমার কোমর জড়িয়ে ধরে মাথা উঁচিয়ে আমার চেহারা দেখল।আমি চোখ বন্ধ করে। কিন্তু ঘুমাচ্ছি না সে খুব ভলো করে বুঝতে পারছে।ইফান শুকনো কেশে হাস্কি স্বরে হিসহিসিয়ে ডাকল,
–“জান।”
আমার থেকে কোনো উত্তর আসল না।ইফান আমার ঘাড়ে মুখ ডুবিয়ে বলল,”রাগ হয়েছে।আ’ম সরি।একবার এদিকে তাকাও।শরীর খারাপ করছে?”
এবারও আমার থেকে উত্তর আসল না।বরং নিম্মি ডেকে উঠল মিয়াঁও বলে।ইফান ঝটপট কম্ফোর্টার হালকা উঁচিয়ে দেখলো আমার বাহুডোরে আরামসে ঘুমাচ্ছে নিম্মি।ইফান বিরবির করল,”শালা এটা এখনো এখানে।”
ইফান হাত বাড়িয়ে ধরতে নিলেই আমি ওর হাতে থাপ্পড় মেরে ধমকে উঠলাম,”ওকে ধরবে তো খবর আছে।”
–“এহেম এহেম।”ইফান শুকনো কেশে হাত ফিরিয়ে নিল।আমি কোনো পাত্তা দিচ্ছি না ওকে।আবার চোখ বন্ধ করে শুয়ে পড়লাম।ইফান ঘাড় এদিক ওদিক মচকাল। আমার সাথে কথা বাড়ানোর জন্য আবারও ডাকল,”জান আমার কেমন যেন লাগছে।”
–“তো আমি কি করব!!’
আমি বিরক্তি প্রকাশ করলাম।ইফান আশকারা পেয়ে সহসা বলে উঠলো,”কাঁধ দুটো টিপে দাও তো বউ। শরীরটা খুব মেজমেজ করছে।”
আমি দাঁতে দাঁত পিষে আওড়ালাম,”আমি পারবো না।”
–“তাহলে আমি টিপে দেই?”
–“কিহ্?”
আমি ঝটপট ইফান দিকে তাকিয়ে চোখ সরু করে শুধালাম। ইফান আমার এমন চাহনি দেখে একটা ঢুক গিলে নিচু স্বরে বললো,”না মানে ঐ আরকি।”
ঢাকা ভার্সিটির খুব কাছেই আজিমপুর এলাকাতে তন্নিরা একই হোস্টেলের একটি রুম ভাড়া নিয়ে থাকে।রুমটা বেশ বড়।বিয়ের আগে সেখানে আমিও থাকতাম।আমি আর তন্নি একটা বেডে আর সুমাইয়া নাফিয়া একটা বেডে।বর্তমানে তন্নি একলাই বেডে ঘুমায়।রুমটায় দুটো বেড।দুটো পড়ার টেবিল। যা দুটো বেডের পাশাপাশি। আর সাথে ওয়াশরুম কিচেন।এক্সট্রা জায়গা নেই রুমে। সুমাইয়া ঘুমিয়েছে আরও আধঘন্টা আগে।নাফিয়া পড়া শেষ করে শুয়ে ফোন টিপছে।তন্নি ওয়াশরুম থেকে বেড়িয়ে এসে কি যেন খুঁজছে।বিষয়টা লক্ষ করে নাফিয়া জিজ্ঞেস করল,”কিরে কি খুঁজস?”
–“এ নাফি তর কাছে প্যাড আছে নি?”
–“নারে ঐদিন আমার হয়ে গেছে। তাই সবগুলো শেষ। আরেক প্যাকেট কিনে আনতে হবে।”
–“আরে বোইন আর কইস না পিরিয়ড হয়ে গেছে।সন্ধ্যায় সুমুর থেকে একটা প্যাড নিয়ে পড়েছিলাম।আমার এবার কিনে রাখতে মনে ছিল না। আমি তো ভাবছি সুমুর কাছে যেহেতু আছে তাই সকালে কিনে আনলেই হবে।আপাতত ওরগুলো দিয়ে চলবে।সন্ধ্যায় তাহলে বাসা থেকে আর বের হতে হবে না।এখন শালির কাছে যে একটায় ছিল তা আর বলে নি।এখন এই রাইতের বেলা কি করি বল তো?”
নাফিয়া সুপারি চিবাতে চিবাতে বলল,”পড়নেরটা দিয়েই আজ ম্যানেজ করে নে।”
–“আরে না বোইন হইতো না।পড়নের টা নষ্ট হয়ে গেছে। আমি রাইতে এটা পড়ে ঘুমাইতে পারব না।”
–“তাহলে এখন কি করবি? পাশের রুমের আপুর থেকে গতবার দুইটা ধার নিছস।পরে আপু আর নেয় নি তোর থেকে।এবারও চাইলে তোরে ছেছড়া মনে করব।”
তন্নি মুখ ফুলিয়ে শ্বাস ফেলে বেডে বসে পড়ল।পেটে হাত ধরে বলল,”হাইরে এখন পেটে ব্যথাও শুরু হইছে।কি যে করি।”
–“দোকান তে গিয়ে কিনে আনবি নাকি।”
তন্নি দেয়াল ঘড়ির দিকে তাকিয়ে ঠোঁট কামড়ে বলল,”রাইত বারোটা বাজে প্রায়।এত রাইতে বাসা থেকে তো কখনো বের হইনি।”
–“তর জরুরি প্রয়োজন হলে বের হবি।এটা শহর গ্রাম না তো।নাকি আমারও যাওন লাগবো।”
তন্নি বেলকনিতে গিয়ে দেখল গলিতে স্ট্রিট লাইটের হলদে আভা চারদিক আলোকিত করে রেখেছে। মানুষও আনাগোনা করছে।সে রুমে এসে বলল,”এ মানুষ আছে বাইরে যাওয়ায় যাবে। বাজার তো কাছেই।”
কম্ফোর্টারের ভেতর থেকে নাফিয়ার ভের হতে ইচ্ছে হচ্ছে না। তাই বলল,”কাল কিনলে হইতো না?”
তন্নি রাগে বলে উঠলো,”তুই যাইবি কি যাইতে না?”
–“যাওনেই লাগবো?”
নাফিয়ার আলসামো দেখে তন্নি রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে ওড়না জড়িয়ে সাইট ব্যাগ নিয়ে বাসা থেকে বেড়িয়ে পড়ল।
বাজারে বেশ মানুষ আছে।শীতকাল হওয়ায় আগের মতো এত মানুষ নেই। তবে ভালোই আছে।তন্নি মনে ভরসা পেল।গলিতে মানুষ দেখে বাসা থেকে বেড়িয়েছিল।কিন্তু অর্ধেক পথে এসে একটা মানুষও খুঁজে পায় নি।ভয়ে মেয়েটার হাত পা ঠান্ডা হয়ে আসছিল।এখন আসেপাশে মানুষ দেখে একটু স্বস্তি পেল।
তন্নি ফার্মেসী থেকে প্যাড আর পেট ব্যথার ঔষধ কিনে আবার বাসায় ফেরার জন্য রওনা হল।বাসা বেশি দূর না। এইতো দশমিনিটের মতো সময় লাগবে।তন্নি আসেপাশে চোখ ঘুরিয়ে দেখল তার বয়সী কিছু ছেলেমেয়েরাও আছে বাজারে।গাড়িঘোড়া তেমন একটা দেখা যাচ্ছে না। হয় তো সকল ড্রাইভাররা প্যাসেঞ্জার নিয়ে চলে গেছে।
তন্নি তপ্ত শ্বাস ছেড়ে আল্লাহ আল্লাহ যপতে যপতে আবার বাসায় যাওয়ার উদ্দেশ্য রওনা দিল।আরেকটু গেলেই হোস্টেলের গলির মোর। আর তারপর গলি দিয়ে কিছুটা হাঁটলেই বাসায় পৌঁছে যাবে।হঠাৎই তন্নির নজর পরে ওর থেকে কিছুটা দূরে একটা মেরুন রঙের মার্সিডিজ দাঁড়িয়ে। তন্নি আসার পথে দেখেছিল গলির মোরে দাঁড়িয়ে আছে একটা মেরুন রঙের মার্সিডিজটা।এখন এখানে কি করছে।অযাচিত কারণে ভিতু মেয়েটার বুকটা ধুকপুক করতে লাগলো। হঠাৎই তার স্মরণে আসলো আজ থেকে প্রায় চার বছর আগের সেই রাতের ঘটনা। কি বিভৎসময় রাত ছিল।আর সেদিনের পর থেকে চঞ্চল মেয়েটা চুপচাপ আর আরও ভিতু হয়ে যায়।
তন্নি তাড়াতাড়ি পা চালালো। মনে মনে নিজের ভাবনাগুলো কে গালিগালাজ করতে লাগল।হঠাৎ তন্নি তার পিছনে কারো পায়ের আওয়াজ শুনতে পেল।তার পিছনে কয়েকজন হয় তো আছে।মেয়েটার গলা শুকিয়ে আসল।কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমে উঠেছে। ভয়ের চোটে আর পা চলছে না।তন্নি দাঁড়িয়ে পড়ল।হালকা ঘাড় ঘুরাতেই তন্নির পায়ের তলার মাটি কেঁপে উঠল।তিনজন বিশালদেহী কালো কুচকুচে দেখতে লোক তিন্নির থেকে কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে আছে।তন্নি তাকাতেই বিদঘুটে হাসল।দাঁতগুলো সাদা চিকচিক করে উঠল। মেয়েটার আত্মা লাফিয়ে উঠেছে। একটু চিৎকার করবে কিংবা নিজের সবটুকু দিয়ে দৌড়ে পালাবে তার কোনো শক্তি নিজের দেহে পাচ্ছে না।
লোক তিনটা এক পা এক পা এগিয়ে আসছে।তন্নি নিজের সকল জড়তা ভেঙে হাতের শপিং গুলো ফেলে একটা চিৎকার দিয়ে ছুট লাগাল।আফসোস তার চিৎকার টা আসেপাশে কেউ শুনতে পেল না।গলির মোরে এত রাত অব্ধি মানুষ কেন কাকপক্ষীও থাকে না।তন্নি দৌড়ে গলির ভিতরে ঢুকতেই তাকে পিছন থেকে লোকগুলো ধরে ফেলল।মেয়েটার মুখ চেপে ধরায় গোঙ্গাতে লাগলো। তবে লোকগুলোর মধ্যে কোনো হেলদোল হল না।বরং তন্নিকে টেনেহিঁচড়ে গাড়িতে তুলতে লাগল।
চলবে,,,,,,,,,,,,
♻️খুব শীগ্রই গল্পের ক্লাইমেক্স চেইঞ্জ হয়ে যাবে।তারপর লালালা….🫠
(যাইহোক ৪০০০+ শব্দের পর্ব দিয়েছি।হ্যাপি রিডিং😚🫰)
Share On:
TAGS: জান্নাত মুন, জাহানারা
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
জাহানারা পর্ব ৩৯+৪০
-
জাহানারা পর্ব ৬৭+৬৮
-
জাহানারা পর্ব ৫
-
জাহানারা গল্পের লিংক
-
জাহানারা পর্ব ২১+২২
-
জাহানারা পর্ব ২৫+২৬
-
জাহানারা পর্ব ১
-
জাহানারা পর্ব ৯
-
জাহানারা পর্ব ৪৩+৪৪
-
জাহানারা পর্ব ২৯+৩০