Golpo romantic golpo জাহানারা

জাহানারা পর্ব ৫৯+৬০


জাহানারা

জান্নাত_মুন

পর্ব :৫৯
🚫ক’পি করা নিষিদ্ধ

আমি শাওয়ার নিয়ে ফ্রেশ হয়ে আসলাম। শরীরে বেগুনি রঙা ব্লাউজ আর পেটিকোট। কাঁধে সাদা টাউয়াল পেচিয়ে ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে আসলাম। ভেজা চুলগুলো কোমরে পড়ে আছে।সেখান থেকে টপটপ করে বিন্দু বিন্দু পানি কণা পড়ছে।ড্রেসিং টেবিলের বড় মিররটার সামনে দাঁড়িয়ে কাঁধ থেকে টাউয়ালটা খুলে চুলে পেচিয়ে নিলাম।তারপর পার্পল কালার সুন্দর একটা শাড়ি পড়তে লাগলাম।কাঁধে আঁচল তোলার সময় আচমকা নজরে পড়ল ইফানকে।সে বেডে উপুড় হয়ে শুয়ে আছে।একটু আগে বাইরে থেকে আসার পর ফ্রেশ না হয়ে শুয়ে পড়েছে।
আমি লোকটার থেকে চোখ সরিয়ে নিতে চাইলেও পারলাম না।ইফানের পেশিবহুল দেহ আকর্ষন কেঁড়ে নিচ্ছে আমার। হঠাৎ শরীরে হিজিবিজি কি সব টেটু আঁকার ফলে আলাদা রকম লাগছে। দেখতে খারাপ নয় বরং তার জিম করা দেহে বড্ড মানানসই লাগছে। আমি আড় চোখে ইফানকে দেখতে দেখতে শাড়ি পড়া কমপ্লিট করে ফেললাম।অতঃপর চুল মুছতে মুছতে আবারও ইফানের দিকে তাকালান। লোকটা এখনো নড়চড় বিহীন শুয়ে আছে।ঘুমাচ্ছে নাকি?
মনে প্রশ্ন টা উঁকি দিতেই আমি বেডের দিকে এগিয়ে গেলাম।উঁকি দিয়ে দেখলাম লোকটার মুখ বালিশে গুঁজে রাখা। তাই বুঝা যাচ্ছে না।হয়তো ঘুমাচ্ছেই।আমি চলে আসতে নিলেই চোখ পড়লো লোকটার বাহুতে। সেখানে এত হিবিজিবি টেটুর মাঝেও আমার স্কেচটা আলাদা ফুটে উঠেছে। আমি নিঃশব্দে ঝুঁকে নিজের স্কেচটাকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে লাগলাম। আচমকা ঘুম জড়িত পুরুষালি হাস্কি স্বর কানে আসলো,
–“উমম, বেইবস চুরি করে দেখার কিছু নেই। সবই তো তোমার।”

ইফানের কন্ঠ শুনেই চোর ধরা পড়ে যাওয়ার মতো আঁতকে উঠলাম।তাড়াতাড়ি চলে যেতে পা বাড়াতেই পিছন থেকে আমার হাতে টান পড়তেই হুমড়ি খেয়ে ইফানের উন্মুক্ত বুকে পড়লাম। আমি মৃদু আর্তনাদ করে উঠলাম,
–“আহ্।”

ইফান মৃদু হেসে আমাকে ঝাপটে ধরে তার বুকের সাথে মিশিয়ে নিলো।আমি মাথা তুলে তার দিকে কটমট করে তাকালাম। ইফান আমার কপালে চুমু খেয়ে ঘুম জড়িত হাস্কি স্বরে হিসহিসিয়ে বললো,
–“নাও এখন ইচ্ছে মতো দেখ।”

আমি চোখ উল্টে বললাম,”হাহ্ তোমাকে দেখতে তো আমার বয়েই গেছে।”

ইফান চোখ বন্ধ করতে নিঃশব্দে হাসতে হাসতে আমার গলায় মুখ ডুবালো।আমি কপালে সুক্ষ্ম ভাজ ফেলে শুধালাম,”কি সমস্যা তোমার?বাইরে থেকে এসেই সটাং হয়ে শুয়ে পড়েছ। যদি না-ই ঘুমাও তাহলে ফ্রেশ হতে যাচ্ছ না কেন?”

–“ঘুম আসবে না এখন।”

ইফানের কথায় চোখদুটো আরও ছোট হয়ে আসল।আমি ইফানের চেহারার দিকে তাকালাম। ইফানও আমার চোখের দিকে তাকাল।লোকটার ফর্সা মুখ ভর্তি খুঁচা খুঁচা দাড়ি।সিগারেটে পোড়া ব্রাউন ঠোঁট। চেহারায় তো সৌন্দর্যের কোনো কমতি নেই। বরং বেটাছেলে হয়েও অত্যাধিক সুদর্শন। আর তার সব সৌন্দর্য যেন লুকিয়ে আছে তার রহস্যময় ধূসর বাদামি চোখের মণি জোড়ায়। কিন্তু সেই চোখ জোড়ায় ক্লান্তির ছাপ স্পষ্ট। আমি ইফানকে ভালো করে দেখে প্রশ্ন করলাম,
–“দেখে তো মনে হচ্ছে সারারাত ঘুমাওনি।কিন্তু কেন?”

–“ড্রা’গ’স নিয়েছি তাই।”

ইফানের সহজ স্বীকারোক্তি। কিন্তু আমার এতক্ষণের নমনীয় চেহারা শক্ত হয়ে আসলো।আমি ইফানের বুকে দু’হাতের ভর রেখে উঠে বসলাম। ক্ষ্যাপাটে স্বরে শুধালাম, “ল’জ্জা করলো না এটা বলতে?”

–“উহু।”

ইফান মাথার নিচে হাত রেখে পুনরায় প্রতিত্তোর করলো। বিষয়টা আমার একটুও ভালো লাগলো না।আমি রাগের বশে বিছানায় জোরে থাপ্পড় বসালাম। দাঁতে দাঁত পিষে বললাম,”কোথায় ছিলে রাতে?ওও আমাকে পোষাচ্ছিল না বুঝি।তাই ক্লাবে লাং ধরতে গিয়েছিলে?”

আমার বাক্যটা ইফানের কানে যেতেই লোকটার এতক্ষণ শীতল থাকা চোখজোড়া ক্রোধে লাল বর্ণ ধারণ করেছে।নিজেকে সংবরন করতে দু’হাত মুষ্টিবদ্ধ করে ফেলেছে। কিন্তু ইফানের চুপ থাকাটা আমি মেনে নিতে পারলাম না। আমি ইফানের উপর ঝুঁকে পড়লাম। রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে আওরালাম এক অশ্রাব্য ভাষা,”আমার থেকে বেটার সার্ভিস দিয়েছে তাই না?”

ইফান তৎক্ষনাৎ চোখ বন্ধ করে নিলো।তার চোয়াল অত্যাধিক শক্ত হয়ে এসেছে। মুষ্টিবদ্ধ হাতও আরও শক্ত হয়ে গেছে। কিন্তু আমি থামলাম না।ওর থেকে উত্তর পাওয়ার জন্য মরিয়া হয়ে উঠলাম। তাই আবারও শুধালাম,”কি হলো উত্তর করছ না কেন?নাকি উ,,,,”

–“আমি তোমার গায়ে হাত তুলতে চাইছি না জাহান।রাগিয়ে দিও না আমাকে।”

আমার কথা মাঝ পথেই থেমে যায় ইফানের ভারিক্কি কন্ঠ স্বর শুনে। আমি আজ লক্ষ্য করলাম– লোকটা যখন বেশি মাত্রায় রেগে থাকে তখন আমার নাম ধরে ডাকে।এদিকে ইফানের কথায় অযাচিত রাগে আমার সারা শরীর রিরি করছে। আমি ক্রোধিত নয়নে ইফানের দিকে তাকিয়ে। আমার গনগন শ্বাস-প্রশ্বাস ইফানের কানে বারি খাচ্ছে। আমার থেকে কোনো সারা শব্দ না পেয়ে ইফান চোখ খুললো।আমি বড় বড় চোখ করে তার দিকে তাকিয়ে। রাগে নাকের পাঠা ফুলে উঠছে ক্ষণে ক্ষণে। ঘনঘন শ্বাস নেওয়ার ফলে বুক উঠানামা করছে।ইফানের ক্রোধিত নয়ন জোড়া মূহুর্তেই শীতল হয়ে আসল।ইফান হাত বাড়িয়ে হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে আমার গালে আলতো হাত বুলাতে বুলাতে হাস্কি স্বরে বললো,
–“আমি রাতে যেখানে যার সাথেই থাকি না কেন তাতে তোমার কি?”

–“কারণ তুমি আমার স্বা…”

ইফানের কথাটা কানে আসতেই কোনো দিক বিবেচনা না করেই মুখ ফসকে বলতে গিয়েও থেমে পড়লাম। ইফান সুক্ষ্ম চোখে আমার দিকে তাকিয়ে হিসহিসিয়ে শুধালো, “আমি তোমার?”

–“রেপিস্ট,জাস্ট আ রেপিস্ট।”

আমার কথা শুনে ইফান তাচ্ছিল্য করে নিঃশব্দে হেসে বললো,”রাইট, ইউর অ্যাবসলিউটলি রাইট।আ’ম রে’পি’স্ট,জাস্ট ইউর রে’পি’স্ট।”

ইফানের কথাটা আমার কেন জানি সহ্য হচ্ছে না।কেন জানি এই মূহুর্তে গলায় কান্না আঁটকে আসছে।তাই এই জ’ঘ’ন্য লোকটার সামনে আর এক মূহুর্ত দাঁড়ালাম না।ইফান অনুভূতিহীন নয়নে আমার যাওয়ার পানে তাকিয়ে রইল কয়েক মূহুর্ত।অতঃপর আবার বাঁকা হাসলো।তার এই হাসিতে কোনো প্রাণ নেই। ইফান নিজ চোখ দু’টোর উপর হাত রাখলো।অতঃপর বিরবির করতে লাগলো,,

      ❝তুমি জানতে পারোনি
  কত গল্প পুড়ে যায়
 তুমি চিনতে পারোনি
      আমাকে হায়....❞

ভেজা টাউয়াল দিয়ে ভালোভাবে চুলগুলো পেচিয়ে খোপা করে নিলাম।ভীষণ রাগ হচ্ছে, সাথে শরীর জ্বলছে অজানা ক্রোধে। কেন আমি এই জানোয়ার লোকটার থেকে কৈফিয়ত চাইতে গেলাম?কিই বা দরকার আমার এতসব জেনে?জাহান্নামে যাক তাতে আমার কি!!রাগে গজগজ করতে করতে সিঁড়ি কাছে আসতেই কানে একটা অচেনা মেয়েলি কন্ঠ স্বর আসলো।

–“আন্টি বাসা ঝাঁট দিব?দিই হ্যাঁ দিই।”

কাকিয়া বলছে,”না না তুমি কেন দিবে বাসায় কাজের মেয়ে আছে।”

মেয়েটা বলছে,”তাহলে আন্টি কি কি রান্না করতে হবে প্লিজ আমাকে বলুন না।আমি কোনো কাজ করছি না জানলে স্যার আমাকে আজ মেরেই ফেলবে।কত কষ্ট করে হাতে পায়ে ধরে লাস্ট চান্স পেয়েছি প্লিজ কেউ আমাকে কাজ দাও….”

মেয়েটা হাউমাউ করে কেঁদে সকলের কাছে কাজ চাচ্ছে। আমি অবাক নয়নে তাকিয়ে রইলাম মেয়েটার দিকে।মেয়েটা আমাকে পিছন ফিরে দাঁড়িয়ে আছে তাই ফেইস দেখা যাচ্ছে না।তবে পড়নের থ্রিপিস দেখে মনে হতো হচ্ছে বেশ দামি।মেয়েটার তাহলে ভালোই টাকা পয়সা আছে।তবে এখানে এভাবে কাজ চায়ছে কেন?
আমি মেয়েটির দিকে চেয়ে এসব ভাবছি তখনই কাকিয়ার নজরে পড়ি।কাকিয়া আমাকে দেখেই বলে উঠলো, “বউমা তোমার কাছে কোনো কাজ থাকলে ব,,,”

কাকিয়া বাকি কথা সম্পূর্ণ করতে পারলো না।তার আগেই মেয়েটা পিছনে তাকিয়ে আমাকে দেখতে পেয়ে চেচিয়ে উঠলো, “ম্যাডাআআআম।”

মেয়েটা ঝড়ের বেগে দৌড়ে সিঁড়ির কাছে এসে আমার পা জড়িয়ে ধরলো।কাঁদতে কাঁদতে বলতে লাগলো,”ম্যাডাম আমার ভুল হয়ে গেছে। আমি আপনাকে সেদিন চিনতে পারি নি।আমি জানতাম না আপনার শাড়িটি অনেক পছন্দ হয়েছিল….”

আমি আশ্চর্য হলাম এই মেয়েটাকে দেখে।এই মেয়ে এখানে কি করছে?এসব ভাবনা সাইডে রেখে মেয়েটাকে টেনে আমার সামনে দাঁড় করালাম। আমি মেয়েটার এমন নাজেহাল চেহারা দেখে অবাক স্বরে জিজ্ঞেস করলাম,”ও মাই গড!তোমার গালে কিসের দাগ?এমন লাল টকটকে হয়ে ফুলে আছে কেন?”

মেয়েটা বাচ্চাদের মতো কেঁদে উঠলো হাউমাউ করে।নাক দিয়ে সর্দি বের হয়ে যাচ্ছে। আমি নাক ছিটকে অন্যদিলে তাকিয়ে বললাম,”ছিহ্ নাক পরিষ্কার কর?”
মেয়েটা গায়ে জড়িয়ে রাখা ওড়না টা দিয়ে নাক মুছে কাঁদতে কাঁদতে বললো,”আপনার থেকে দশ হাজার টাকা দামের শাড়িটি বারো হাজার দিয়ে আমি কিনে নেওয়ায় স্যার আমাকে বারোটা থাপ্পড় মেরেছে গো।এ্যাঁ এ্যাঁ এ্যাঁ,,,,”

–“হোয়াট!!”

আমি অবাক হয়ে উচ্চারণ করলাম।বাড়ির বাকিরাও অবাক হলো।নাবিলা চৌধুরী বেশ বিরক্ত হচ্ছে। সবে অফিসের উদ্দেশ্য বের হবে তখনই ইফান এই উটকো ঝামেলাটাকে নিয়ে হাজির।নুলক চৌধুরী নাবিলা চৌধুরী কে ইশারা করলো তিনি আর এখানে দাঁড়িয়ে থাকতে পারছে না।নাবিলা চৌধুরীও ইশারায় বললো,” চল।” অতঃপর তারা বাড়ি থেকে বেড়িয়ে পড়লো।
আমি সোফায় এসে মাথায় হাত দিয়ে বসলাম। ইদানীং ইফানের এসব আজাইরা কান্ড-কারখানায় অতিষ্ঠ আমি। মেয়েটাকে দেখে বড় ঘরের মনে হচ্ছে।মীরা মেয়েটার কান্নায় বিরক্ত হয়ে বললো,”ওহ্ ডিয়ার স্টপ দ্যা ক্রায়িং।”

মেয়েটা চোখমুখ মুছে আমার পায়ের কাছে বসলো।আমি বিরক্তিতে “চ” বর্গীয় আওয়াজ বের করে বললাম,”নিচে বসছো কেন?সোফায় বস।”

–“না ম্যাম স্যার বলছে এখন থেকে আপনার পায়ের কাছে থাকতে।”

–“ইফান।”

আমি চাপা স্বরে বলে দাঁত কটমট করলাম।তপ্ত শ্বাস ছেড়ে বললাম,”অনেক হয়েছে এবার নিজ বাসায় যাও।”
আমার কথা শেষ হতে না হতেই মেয়েটা আমার পা শক্ত করে পেচিয়ে ধরে কেঁদে বলে উঠলো, “ম্যাম আমাকে তাড়িয়ে দিবেন না।এক তো স্যার আমাকে মেরেই ফেলবে দ্বিতীয়ত আব্বু নিজের পদ হারাবে।আমি যে আপনার সাথে এমন করেছি শুনার পর তিনিও আমার গালে তেরো নাম্বার থাপ্পড় বসায়।এ্যাঁ এ্যাঁ।”

মেয়েটার কথায় ব্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করলাম,”তোমার বাবা পদ হারাবে মানে?কে তুমি?”

–“আমার বাবা চেয়ারম্যান আসাদুজ্জামান। আমি ফারিয়া তাবাস্সুম। আমার মায়ের নাম লাকি ইসলাম। আমার বোনের নাম তানিয়া। আমার ভাইয়ের নাম আবু তাহা।আামর দাদির নাম,,,,,।”

মেয়েটা একদমে নিজের চৌদ্দ গোষ্ঠীর পরিচয় দিতে লাগলো।ফারিয়াকে থামাতে আমি চেচিয়ে উঠলাম,”চুপ।এক দম চুপ।আমি তোমার হিস্ট্রি জানতে চাই নি।”

আমি মাথায় হাত চাপড়ালাম।বিরবির করতে লাগলাম,”এই লোকটা আমাকে জ্বালিয়ে মারবে।”


দুপুর বারোটা বাজে।ঘন্টা বাজতেই ছাত্রছাত্রীরা ক্লাস রুম থেকে হৈ-হুল্লোড় করে বেড়িয়ে আসতে লাগলো।জুই ও তার দুই বান্ধবী সহ ইতি আর নোহাও একসাথে বেড়িয়ে আসছে।কলেজের সকলে নোহার দিকে তাকিয়ে। একই তো মেয়েটা সেই লেভেলের সুন্দরী তার উপর ড্রেসআপ স্টাইল।নোহাকে কেউ কেউ হাত নাড়িয়ে হায় দেখাচ্ছে । নোহাও মিষ্টি হেসে হাত নাড়িয়ে বলছে,”হায় লিটিল গার্লস।”

জুইয়ের কাছে সব সাধারণ লাগছে।কারণ এর আগেও নোহার সাথে তার দেখাসাক্ষাৎ হয়েছে।কিন্তু সোমা আর মিনা বাঁকা চোখে নোহাকে দেখছে।যদিও তাদেরও নোহাকে বেশ মনে ধরেছে।নোহার আচরণ একেবারে মন খোলা।
সবাই গেইটের সামনে এসে দাঁড়াল। আজ ক্লাসে বসে বসে সবাই প্ল্যান করেছে কি কি খাবে।নোহা ফুচকা খায়নি কখনো।তাই আজ আগে ফুচকা খাবে।সবাই একজন আরেকজনের হাত ধরে কয়েক কদম এগোতেই জিতু ভাইয়ার গাড়ি এসে থামল গেইটের কাছে।জুই গাড়ি দেখেই বুঝে গেছে কে এসেছে।জুই তাড়াতাড়ি গাড়ির কাছে গেলো।গাড়ি থেকে জিতু ভাইয়া না নেমে নামলো অফিসার আবির।জুই নাক ছিটকালো।অফিসার আবির সবে হায় দিতে যাচ্ছিল কিন্তু জুইয়ের রিয়াকশন দেখে বাড়াতে চাওয়া হাতটা দিয়ে মাথা চুলকে মিহি হাসলো।সোমা আর মিনা ঠোঁট টিপে হাসছে।জুই ফিরে আসবে তক্ষুনি জিতু ভাইয়া গাড়ি থেকে নামলো।জুইয়ের ঠোঁটে হাসি ফুটে উঠেছে। জুই কিছু বলবে তার আগেই নোহার চিৎকার ভেসে আসলো,
–“বেইবি তুমি এখানে!!ইয়েএএএ।”

নোহা দু’হাত মেলে ধরে পাগলা ঘোড়ার বেগে ছুটে আসছে।জিতু ভাইয়ার পা থেমে যায়।চোখ থেকে রোদচশমা সরিয়ে আশ্চর্য চেহারায় বিরবির করে,”ও মাই গড! এখানে এই আজীব প্রাণীটা কি করছে?”

জিতু ভাইয়া এসব ভাবতে ভাবতেই নোহা ছুটে এসে জড়িয়ে ধরবে তার আগেই জিতু ভাইয়া সরে দাঁড়ায়। বেচারা নোহা রাস্তায় মুখ থুবড়ে পড়ে। জিতু ভাইয়া তৎক্ষনাৎ চোখ খিচকে বিরবির করে,”হালা খাইসেরে।”
এদিকে বাকি সবার মুখে হাত।নোহা মুখ থুবড়ে পড়ে যেতেই মৃদু আর্তনাদ করে উঠলো,”আহ্।”
ইতির চোখ ভিজে উঠলো।সে নাক টেনে ডেকে উঠলো, “নোহাপু তুমি ব্যথা পেয়েছ?”
ইতি দৌড়ে নোহার কাছে গেলো।এতক্ষণে ইতিকে চোখে পড়লে জিতু ভাইয়ার। সে অবাক দৃষ্টিতে লাজুক মেয়েটার দিকে তাকিয়ে রইলো।নোহা পড়ে গিয়ে হাতের ছাল উঠে গেছে। এটা দেখে ইতি ঠোঁট ভেঙে বাচ্চাদের মতো ফুপিয়ে কেঁদে দিয়েছে।জুইরা সবাই মিলে নোহাকে তুলে দাঁড় করালো।জিতু ভাইয়ারও খারাপ লাগলো নোহাকে ব্যথা পেতে দেখে।এখন সে-ই বা কি করবে যদি তাকে বারবার বিরক্ত করে!!জিতু ভাইয়া কোমরে হাত ধরে নোহাদের দিকে তাকিয়ে রইলো।নোহা মাথা তুলে তাকাতেই দেখলো জিতু ভাইয়া তার দিকে তাকিয়ে আছে।মেয়েটা নিজের ব্যথা ভুলে দাঁত কেলিয়ে মন ভুলানো হাসি দিয়ে বাচ্চাদের মতো নেকামি কন্ঠে বলে উঠলো,
–“ওহ্ হোলি আমি পড়ে গেয়েছিলাম।”

নোহার এহেন কথা শুনে জিতু ভাইয়ার মাথা একটা চক্কর মারলো।এটা কেমন মেয়ে ব্যথা পেয়েও হেসে এভাবে বলছে।এটার মাথায় কি বুদ্ধি সুদ্ধি নেই কিছু?
জিতু ভাইয়া মনে মনে এসব ভাবছে তখনই একজন পুরুষের গলার আওয়াজ শুনতে পায়।

–“হোয়াটস রং?”

সকলে পিছনে তাকাতেই দেখতে পেল মাহিন নিজ গাড়ির কাছে দাঁড়িয়ে। মাহিনের প্রথমই নজর পড়ে জুইয়ের দিকে।জুই মাহিনকে না দেখার মত অ্যাটিটিউড দেখিয়ে চোখ সরিয়ে নেয়।মাহিন জুইয়ের অ্যাটিটিউড দেখে জিহ্বা দিয়ে গাল ঠেলে তাচ্ছিল্য করে হাসে।তারপর মাহিনও চোখ সরিয়ে নেয় জুইয়ের থেকে।তখনই চোখে পড়ে নোহাকে।মাহিন শুকনো কেশে বিরবির করতে লাগলো, “উপরওয়ালা এই অ্যাটিটিউড গার্লের সামনে আমার ইজ্জত রক্ষা করো।”
মাহিন এসব ভাবছে তক্ষুনি নোহা ডেকে উঠে,”ব্রো আমি পড়ে গিয়েছিলাম।”
মাহিন যেন আকাশ থেকে পড়লো।যে মেয়ে মাহিন বেবি ছাড়া কোনোদিন ডাকে নি। সেই মেয়ে কিনা আজ ভাই ডাকছে!!মাহিন আশ্চর্য হলো তবুও প্রকাশ করলো না।সে স্বাভাবিক ভাবে নোহাদের কাছে গেলো।ইতিকে বললো মনিরা বেগম তাকে বলেছে আসার পথে মেয়ে দুটোকে পারলে নিয়ে আসতে।তাই মাহিন বাড়ি ফেরার পথে ওদের নিতে এসেছে।
ইতি আর নোহা দুজনেই না করলো এখন যাবে না।তাদের এখনও ফুচকা খাওয়া বাকি।
মাহিন ওদের কথা শুনে বললো,”ফাইন,তোমরা তাহলে পরে যেও।গার্ড তো আছেই দেখছি।”

মাহিন পিছনে তাকিয়ে দেখলো ইতির তিন জন বডিগার্ড দাঁড়িয়ে আছে।জিতু ভাইয়া আর মাহিনের চোখাচোখি হতেই দুজন ভদ্রতাসূচক হাসলো।হাই হ্যালো করে মাহিন চলে যেতে নিলেই জিতু ভাইয়া বলে উঠলো, “ভীষণ ব্যস্ত মানুষ দেখছি আপনি?”

মাহিন চোখের সানগ্লাস খুলে হেসে বললো,”ঐ আরকি।”

জিতু ভাইয়া হাতের সানগ্লাসটা ঘুরাতে ঘুরাতে হেসে বললো,”তো এই এরিয়ায় কি করছেন?ভুল না হলে তো উত্তরায় থাকেন।”

মাহিন মৃদু হাসলো।খানিকটা ভেবে বললো,”একটু কাজ ছিল।”

–“কি কাজ?”

পাশ থেকে আবির বললো।মাহিন চোখ ঘুরিয়ে আবিরকে উপর নিচ একবার পরখ করে বললো,”স্কিউজ মি।”

আবির আবারও কিছু বলতে যাবে তখনই জিতু ভাইয়া ইশারায় না করলো।আবির আর কিছু বললো না।অতঃপর জুইদের কে জিতু ভাইয়া একটা ক্যাফে তে নিয়ে আসলো। জুইরা তো বায়না ধরেছিলো রাস্তায় দাঁড়িয়ে ফুচকাওয়ালা মামার থেকে খাবে।কিন্তু মাহিন স্টেইটলি ইতিদের বলে দিয়েছে বাইরের খাবার না খেতে।পরে জিতু ভাইয়া সবাইকে ম্যানেজ করে ক্যাফে তে নিয়ে আসে।

জুইরা একটা টেবিলে আর মাহিন, জিতু ভাইয়া আর আবির একটা টেবিলে।মাহিন আর জুই সোজাসুজি বসায় দু’জনের মধ্যে স্নায়ু যোদ্ধ চলছে কিছুক্ষণ পর পর।জিতু ভাইয়া তাদের তিন জনের জন্য কফি আর মেয়েদের জন্য এক প্লেট করে ফুচকা অর্ডার করেছে।
জুইরা সবাই ফুচকা খেতে ব্যস্ত।ইতি লজ্জায় খেতে পারছে না।তার খালি মনে হচ্ছে জিতু ভাইয়া তার খাওয়ার দিকে তাকিয়ে। কিন্তু জিতু ভাইয়া একবারও ইতির দিকে তাকাচ্ছে না। বরং কফি খেতে ব্যস্ত।
জিতু ভাইয়া বেশ কিছুক্ষণ পর ইতির দিকে আড় চোখে তাকালো।মেয়েটা একটু একটু করে ফুচকায় কামড় দিচ্ছে।
জিতু ভাইয়া দৃষ্টি সরিয়ে নিলো।কদিন ধরেই ‘অচেনা বালিকা’ আইডি থেকে জিতু ভাইয়ার প্রতিটি পোস্টে কেয়ার রিয়েক্ট আসতো।আবার কিছু পোস্টে কমেন্ট আসতো এ মাস্ক পড়া মেয়েটা কে?জিতু ভাই প্রথমে পাত্তা না দিলেও পরে কি যেন ভেবে আইডিটা ঘাঁটিয়ে দেখলো– মেয়েটা জুইয়ের লিস্টে আছে।তারপর জুইকে জিজ্ঞেস করতেই জানতে পারল এটা ইতির আইডি।এরপর যখন রাতে ফোন টিপছিল তখনই ইতির ফ্রেন্ড রিকুয়েষ্ট আসে।জিতু ভাইয়া তৎক্ষনাৎ এক্সেপ্ট করে।
কথাগুলো ভাবতেই জিতু ভাইয়ার ঠোঁটে একটু হাসি ফুটে উঠলো।সেকেন্ডের মধ্যেই তা আবার মিলিয়ে গেছে।মাহিন কফিতে চুমুক দিতে দিতে আচমকা চোখ পড়ল জুইয়ের দিকে।জুই পুরো আস্ত আস্ত ফুচকা মুখে পুরে নিচ্ছে। মাহিন চরম আশ্চর্যজনক ভাবে আওড়াল, “হাউ স্ট্রেঞ্জ!”

এদিকে আয়েশ ভঙ্গিমায় খেতে খেতে বেখেয়ালি মাহিনের দিকে নজর পড়লো জুইয়ের। মাহিন কে নিজের দিকে ডেবডেব করে তাকিয়ে থাকতে দেখে জুই তৎক্ষনাৎ মুখের সামনে হাত ধরে নিজেকে আড়াল করে নিলো।আরেকটা ফুচকা মুখে পুরে বিরবির করতে লাগলো,”ধুর ধুর ধুর আজ নিশ্চয়ই পেট খারাপ হইব।”

পিছন থেকে আবির জুইকে ডেকে উঠলো, “এই যে ম্যাঠাম আরেক প্লেট অর্ডার দিব।”

জুই ক্ষ্যাপাটে নজরে আবিরের দিকে তাকালো। আবির ঠোঁট কামড়ে হাসি আটকানোর চেষ্টা করছে।জুই রাগকে সাইডে রেখে মাথা নাড়াল।মানে সে খাবে। আবির হেয়ালি করে বললো,”পরে পেট খারাপ হলে কিন্তু আমার কোনো দোষ নাই।”
জুই জিহ্বা দেখিয়ে ভেঙচি কাটলো। জিতু ভাইয়া আর আবির দুজনেই আওয়াজ করে হেসে দিল।মাহিন জুই আর আবিরের আধিক্যেতা দেখে বিরক্তিতে বিরবির করে আওড়ালো,
–“ডিজগাস্টিং!”


বিকাল চারটা বাজে।রান্নাঘরে কাকিয়া রাতে কি রান্না হবে তা ঠিক করছে।পলি আর ফারিয়া মেয়েটা সবার জন্য মুড়ি মাখছে।ড্রয়িং রুম থেকে ইতি আর নোহার কন্ঠ ভেসে আসছে।তারা দু’জন আজ কলেজে কি কি করেছে সব গল্প দাদি আর মীরাকে শুনাচ্ছে। আমি আসলাম কড়া করে এক কাপ চা বানিয়ে খাওয়ার জন্য। আজ সারাদিন মাথাটা কেমন যেন ঝিমঝিম করছে।
কাকিয়া আমার পাশে ঘেঁষে দাঁড়াল। আমি তাকাতেই তিনি সবজি কাটতে কাটতে ফিসফিস করে বললো,”আমার কথা হয়েছে।বলেছে আজকালের মধ্যে কাউকে দিয়ে পাঠিয়ে দিবে।”
আমি চা কাপে চা ঢালতে ঢালতে বললাম, “আচ্ছা ঠিক আছে।”

–“এ বিষয়ে কাউকে কিছু বলার দরকার নেই। “

–“আচ্ছা।”

আমার কথা শুনে কাকিয়া চলে যেতে নিচ্ছিল তখন পাশ থেকে আমি পুনরায় ডেকে উঠলাম,”উমম কাকিয়া তোমাকে একটা কথা বলার ছিলো।”

কাকিয়া আস্তে করে বললো,”হুম বল।”

আমি চায়ে সামান্য চিনি দিয়ে চামুচের সাহায্যে নাড়াচাড়া করতে করতে বললাম,”এই বাড়িতে আমি তোমাকে সবচেয়ে ভরসা করতে পারি কাকিয়া?”

আমার কথা শুনে কাকিয়া মৃদু হাসলো,”একবার করে দেখতে পার।”
কাকিয়ার কথা শুনে খুশি হলাম।বললাম, “জানো এই বাড়িতে আসার পর থেকে তুমি যেভাবে আমাকে ভালোবেসেছ, ভুল হলে তা ধরিয়ে দিয়েছ তাতে তোমাকে আমার মায়ের মতো মনে হয়।মনে হয় তুমি আমার আরেক মা।”

–“কেন মা হতে পারি না বুঝি?”

আমি মৃদু হাসলাম।কাকিমার কাঁধে চুমু খেয়ে বললাম,”আলবাত তুমি আমার আরেক মা।”

–“হয়েছে থাক। কি যেন বলবে বলেছিলে বল?”

আমি তপ্ত শ্বাস ছেড়ে ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করলাম, “তুমি কি জেসমিন কে চেন?”

আমার কথাটা কাকিয়ার কান অব্ধি পৌঁছাতেই ওনার সবজিতে নাইফ চালানো হাতটা থেমে থরথর করে কাঁপতে লাগলো।আমি আড় চোখে ওনার হাত আর চেহারা লক্ষ করলাম।কাকিয়া ঘামছে। চোখে মুখে অযাচিত এক আতংকের ছাপ।আমি কাকিমার কাঁধে হাত রেখে শুধালাম,”তুমি ঠিক আছ?”

কাকিয়া কিছু বললো না।বরং রান্নাঘর থেকে বেড়িয়ে যাওয়ার আগে ফিসফিস করে দ্রুত বললো,”জাহান তুমি একটু সাবধানে থেকো সোনা।মনে রেখো– তুমি যাকে অন্ধের মতো বিশ্বাস করবে সেই তোমার পিঠে ছু’রি বসাবে।”

কাকিয়া রান্নাঘর থেকে বেড়িয়ে গেল।আমার কাছে এখনো কাকিয়ার সব কথা বোধগম্য হচ্ছে না। কাকিয়া ঠিক কাকে ইঙ্গিত করে কথাটা বললো?আমার সন্দেহে তো সবসময় নাবিলা চৌধুরী, নুলক চৌধুরী আর লতা মেয়েটা।যারা আমার খারাপ চায় হয়-তো।
কিন্তু আমার ভাবনার বাইরে আর কে থাকতে পারে?কে-ই বা আমার পূর্ব পরিচিত শত্রু ।ভাবতে ভাবতে আচমকা রান্নাঘরের মুড়ি মাখাতে থাকা পলির উপর নজর পড়লো।মেয়েটা ফারিয়ার সাথে হাসিমুখে কথা বলতে বলতে নিজের কাজ করছে।অল্প সময়েই কেমন সকলের সাথে মিশে যায় পলি।আমি পলির থেকে চোখ সরিয়ে ফারিয়ার দিকে তাকালাম।মেয়েটা সকলের সাথে বাইরে থেকে দম্ভ দেখালেও একবার কারও সাথে মিশলে পেটের সব কথা উগড়ে ফেলে।এই কয়েক ঘন্টা পরিচয়েই বিষয়টি পরিষ্কার আমার কাছে।না এই মেয়ে কিভাবে হবে!!
আমি চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে ড্রয়িং রুমের দিকে তাকালাম। আমার নজরে প্রথমেই আসলো মীরা। কি সুন্দর হেসে হেসে সকলের সাথে কথা বলছে।কে বলবে মেয়েটা দেশের বাইরে বড় হয়েছে!আর তার ব্যবহার তার চেয়েও মিষ্টি। আমি নোহার দিকে তাকালাম। এই মেয়ে তো আরও সহজ সরল। বয়স আমার মতো হলে কি হবে– বুদ্ধি দশ বছরের বাচ্চাদের থেকেও কম।
আমি শেষ ইতির দিকে তাকালাম। এ তো বাচ্চা মেয়ে। লজ্জা পাওয়া ছাড়া কিছুই বুঝে না।আমার মাথা কাজ করছে না আর।কাকিয়া কি কাউকে ইঙ্গিত দিয়ে কিছু বললো নাকি কথায় কথা?

আর ভাবতে পারলাম না।উপর থেকে ইফানের কন্ঠ ভেসে আসছে,”জাহান ফাস্ট দেখে যাও।”

আমি তপ্ত শ্বাস ছেড়ে চা খেতে খেতে উপরে চলে গেলাম।


রুমে এসেই দেখি ইফান বাইকারদের মতো সাজে তৈরি হয়ে আছে।পড়নে ব্ল্যাক লেদার জ্যাকেট,হাতে হ্যান্ড গ্লাভস।আমি ইফানের দিকে প্রশ্নবিদ্ধ নয়নে তাকিয়ে। কেন সে আমাকে ডাকল?
ইফান তার লম্বা ঘন কালো চুলগুলো হাত দিয়ে পিছনে ঠেলতে ঠেলতে বললো,”রেডি হয়ে যাও ঝাঁঝওয়ালি।”

–“রেডি হয়ে যাও মানে?”

ইফান ব্রু কুঁচকালো, “হোপ বেটি এত প্রশ্ন করিস কেন?”

–“আমি এখন কোথাও যেতে পারবো না।মাথা ঝিম ঝিম করছে।”

আমার কথার পিছেই ইফান বলে উঠলো, “সেই মাঝ রাতে একটু ডোজ দিয়েছিলাম। এখনো কাটে নি নাকি!”
আমি অবাক হয়ে শুধালাম, “ডোজ দিয়েছিলে মানে?”

–“রাতে জ্বরের কারণে অস্থির হয়ে ছিলে।ভালো ঘুম হওয়ার জন্য একটু ঘুমের ডোজ দিয়েছিলাম।”

আমি রাগে রিরি করতে করতে ইফানের দিকে তাকিয়ে রইলাম।কি সুন্দর নিজের গুনগান স্বীকারও করছে । ইফান কথা না বাড়িয়ে কাভার্ড থেকে একটা ফরেস্ট গ্রিন কালার থ্রিপিস বের করে আমার কাঁধে ঝুলিয়ে দিলো।আমাকে বলার সুযোগ না দিয়ে ওয়াশরুমে ঠেলে ঢুকিয়ে দিলো।আমি না পারতেও রাগে গজগজ করতে করতে ড্রেস চেইঞ্জ করে বেরিয়ে আসলাম।আমাকে দেখে ইফান হা হয়ে গেছে। ফর্সা দেহে ফরেস্ট গ্রিন কালার অনেক সুন্দর করে ফুটে উঠেছে। দেখতে অসম্ভব সুন্দর লাগছে নিজের কাছেই। আমাকে আবার সব রং এই দারুণ লাগে।ইফান এগিয়ে এসে আমাকে সম্পূর্ণ স্কেন করে বললো,”ওয়াও জোস।”
আমি ইফানের বুকে ধাক্কা মেরে মিররের সামনে দাঁড়িয়ে চুলে চিরুনি চালালাম।একা এত বড় চুল সামলাতে হিমশিম খাচ্ছি। ইফান পিছন থেকে এসে আমার হাত থেকে চিরুনি কেড়ে নিয়ে সে আলতো করে আঁচড়ে দিতে লাগলো।আমি কোমরে দু’হাত ধরে আয়নায় ইফানের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলাম,
–“এই বিকালে কোথায় নিয়ে যাবে হুম।খেয়ে দেয়ে কি কোনো কাজ কাম নেই নাকি তোমার ?”

ইফান গা দুলিয়ে হেসে চেচিয়ে গান ধরলো,,
❝তোকে নিয়ে ঘুরতে যাবো একশো বৃন্দাবন
আমি আর অন্য কিছুর মুড-এ নেই এখন❞

ইফান এটা ওটা বলে আমার চুল আঁচড়ে দিচ্ছে খুব যত্নসহকারে।সে এমন আলতো ভাবে চুল আঁচড়ে দিচ্ছে যে একটা চুলও ছিঁড়ছে না।আমি হলে এতক্ষণে চিরুনি ভরে যেতো চুল দিয়ে। আমি লোকটাকে খুঁটিয়ে দেখতে লাগলাম।না সবসময় হাসে। আর লোকটা হাসলে তার চোখ দুটোও যেন হাসে। ইফান আমার এমন মুগ্ধ চাহনি দেখে ঠোঁট কামড়ে হাসলো।আমি ইফানকে দেখতে দেখতে আনমনে বলে উঠলাম,
–“আমি তোমাকে আজও চিনতে পারলাম না।”

ইফান মিররে আমাকে এক পলক দেখে ঠোঁট বাকিয়ে বললো,”কখনো চিনতেও পারবে না।”

–“হাহাহা তাই নাকি?তাহলে তো একবার চেনার চেষ্টা করতে হচ্ছে।”

ইফান আবার বাঁকা হাসলো। মাদকীয় হাস্কি স্বরে বললো,”উমম চেষ্টা করা মন্দ নয়।তবে লাভ হবে না।”

আমি একটা ব্রু উঁচিয়ে শুধালাম,”কেন?”

ইফানের ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসিটাও উধাও হয়ে গেলো।হঠাৎই বেশ গম্ভীর হয়ে নিচু স্বরে বলে উঠলো,”কারণ আমি অন্ধকার। আমার শুরু থেকে শেষ সবটায় কালোয় ঘেরা।আমার এই নিষিদ্ধ অন্ধকার বিস্তৃত পাপের শহরে বিধ্বংসী মাফিয়া বস ইফান চৌধুরী গড়ে উঠার গল্প ছাড়া ভালো কিছুই খুঁজে পাবে না।আর আমাকে চিনতে গিয়ে তুমি অচিরেই ভেঙে পড়বে।”

চলবে,,,,,,,,,,,

( ভুল ত্রুটি থাকতে পারে।গল্প সম্পূর্ণ শেষ হলে সব ভুল ত্রুটি সংশোধন করবো।আর হ্যাঁ গল্প ধারাবাহিক ভাবে এগোচ্ছে। শুধু ধৈর্য ধরে পাশে থাকার কথায় বলবো। নেক্সট পর্ব তাড়াতাড়ি দিয়ে দিব।হ্যাপি রিডিং 🫶)

জাহানারা

জান্নাত_মুন

পর্ব :৬০
🚫ক’পি করা নিষিদ্ধ

    🔞 সতর্কবার্তা:

এই গল্পে অশ্রাব্য ভাষা, অশ্লীলতা এবং সহিংসতার উপাদান রয়েছে। ১৮ বছরের কম বয়সী বা সংবেদনশীল পাঠকদের জন্য উপযুক্ত নয়। পাঠক নিজ দায়িত্বে পড়বেন।

ইফান আমার হাত ধরে বাইরে নিয়ে আসলো।আমাকে দাঁড় করিয়ে গাড়ি বের করতে গেছে।আমি সুইমিংপুলের পাশে দাঁড়িয়ে।বিকাল তাই তেমন ঠান্ডা পড়নে নি এখনো।তবে সন্ধ্যা নামলেই আজকাল বেশ কনকনে ঠান্ডা পড়ে।কি জানি বাড়িতে কখন ফিরবো?তাই আগেই ঠান্ডা না লাগার জন্য আমি মাথায় ওড়না টেনে গলায় পেচিয়ে নিয়েছি।সাথে কাঁধে একটা কাশ্মীরি পশমিনা উলের শালও জড়িয়ে নিয়েছি। শালটা দেখতে বেশ সুন্দর। গায়ে জড়াতেই শরীরকে ভালোই উষ্ণ রেখেছে।বাইরে বের হচ্ছি তাই পা’কেও শীতের কবল থেকে রক্ষা করতে স্নিকার্স পড়ে নিয়েছি।এই পরিপাটি সাজসজ্জায় নিজেকে বেশ মানিয়েছে। নিজের অবয়বে এক ঝলক দৃষ্টি বুলিয়ে, অজান্তেই আমার অধরে এক চিলতে মৃদু হাসি ফুটে উঠল।

আমি আসেপাশে চোখ ঘুরিয়ে দেখতে লাগলাম। চৌধুরী বাড়িটি অসম্ভব সুন্দর এবং এর অন্তরীণ যা আছে সবই ব্যয়বহুল। প্রথমেই তো হোয়াইট চকচকে চৌধুরী ম্যানশন যে কারো নজর কেড়ে নিবে। তারপর বাড়ির সামনে ফোয়ারা টা আরও আকর্ষণ কাড়ে।রাতে বাইরে থেকে পুরো চৌধুরী ম্যানশনে আর ফোয়ারায় লাইট জ্বলে উঠে তখন মনে হয় এ যেন কোনো এক রাজপ্রাসাদ।হা হা হা আমি রাজ বাড়ির বউ।কথাটা ভাবতেই বেশ মজা পেলাম। তবে একটা বিষয়– আমার বিয়ের একটা বছর প্রায় হলো বলে।কিন্তু আজও এই বাড়ি এবং বাড়ির চারদিক সম্পূর্ণ ঘুরে দেখা হয় নি। হবেই বা কিভাবে? এত বড় বাড়ি, এক কোণা ঘুরতেই হাঁপিয়ে ওঠি। আর মজার বিষয় আমার ননদী ইতি এই বাড়ির মেয়ে হয়েও পুরো চৌধুরী ম্যানশন এখনো ঘুরে দেখে নি।বেচারির অবস্থা আমার আর পলির থেকেও খারাপ।একটুতেই ক্লান্ত হয়ে শরীর ছেড়ে দেয়।
দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে ভাবনা থেকে বেরিয়ে আসলাম। মাথা ঘুরিয়ে পার্কিং লটের দিকে তাকালাম। লোকটা আমাকে একা দাঁড় করিয়ে সেই যে গেছে খবর নেই। আমি হাতের ফোনটা চোখের সামনে ধরে সময় দেখলাম।পুরো পাঁচ মিনিট হলো এখনো আসার নাম নেই। নাকি আমাকে যে দাঁড়া করিয়ে গেছে সেটাই ভুলে গেছে। আজীব..!!

আমি বিরবির করছি তখনই নজর পরলো গার্ডেনের দিকে।ইশশশ কত সুন্দর সুন্দর ফুল গাছ।ফুল দিয়ে সবগুলো গাছ পূর্ণ। দেশীয় এমন কোনো ফুল মনে হয় বাদ নেই যা আমাদের বাগানে নেই। বরং আমার না জানা বহুত দেশি বিদেশি ফুল গাছ দিয়ে পূর্ণ চৌধুরীদের এই বাগান।না না চৌধুরী বাগান বললে ভুল হবে।এটা আমার দ’জ্জা’ল শাশুড়ী নাবিলা চৌধুরীর খুব শখের বাগান। এই যে চারজন মালি দেখা যাচ্ছে, এরা সকাল বিকাল এই বাগানেই কাজ করতে থাকে অনবরত। একটা গাছের পাতা পড়লে তৎক্ষনাৎ সেটা তাদের পরিষ্কার করতে হয়।প্রতিদিন ভোরে কিংবা সকালে নাবিলা চৌধুরী বাগানে আসে।একটু উনিশ বিশ দেখলেই মালিদের চাকরি নিয়ে টানাটানি পড়ে। নাবিলা চৌধুরী আর নুলক চৌধুরীর একটা বিষয় আমার বেশ মনে ধরেছে। দু’জনেই অহেতুক কথা বলে না।বেশ গম্ভীর আর দাপটে ধাঁচের।

–“ধাপ্পা!”

আচমকা পিছন থেকে কেউ উচ্চ স্বরে বলে উঠলো।আমি ধরফরিয়ে উঠলাম। তৎক্ষনাৎ পিছনে ঘুরে তাকাতেই দেখলাম ফারিয়া মেয়েটা।আমি বুকে হাত দিয়ে জোরে শ্বাস ফেলে ধমকে উঠলাম, “কি ধরনের আচরণ এটা?”

আমার ধমকে মেয়েটার মধ্যে কোনো ভাবান্তর হলো না।বরং হাসিখুশি মুখে বলে উঠলো, “মেডাম কখন যাবেন? স্যার কই? নেই এখানে?”
মেয়েটাকে সুক্ষ্ম চোখে পরখ করে বললাম,”স্যার দিয়ে তোমার কি কাজ?”
ফারিয়া মাথার চুলে হাত বুলাতে বুলাতে হেসে দিলো।বলল,”ইয়ে মানে মেডাম আমি একটু শপিং করতে যেতাম।না মানে এখানে তো কিছু নিয়ে আসি নি।এত বড় বাড়িতে ভালো কাপড় না পড়লে কেমন দেখাবে না?”

আমি ব্রু কুঁচকে শুধালাম, “তোমাকে কি আটকে রেখেছি নাকি?”

–“না তো। কিন্তু স্যার,,”

ফারিয়ার মুখের কথা কেড়ে নিয়ে বললাম, “তুমি তোমার বাড়িতে চলে যেত পার।কেউ কিছু বলবে না।”
মেয়েটা আমার কথা শুনা মাত্রই লাফিয়ে উঠলো,”এটা আপনি কি বলছেন মেডাম?আয়হায় রে!!এত বড় চাকরি আমি ছেড়ে দিব!আমি কি বোকা?”

–“মানে?”

–“মানে স্যার আমাকে আপনার এসিস্ট্যান্ট মানে পার্সোনাল পিএ বানিয়েছে।ভাবতে পারছেন আমার পজিশন টা এখন কোথায়?আমি সবাই কে এখন তুরি বাজিয়ে বলবো,হেই আমাকে তোমরা চেন?আমি হচ্ছি মাফিয়া বস ইফান চৌধুরীর বউয়ের, মন্ত্রীর সাহেবের পুত্র বধূর পার্সোনাল, পা পা পা পার্সোনাল এসিস্ট্যান্ট।
সবাই আমাকে কতটা সম্মান করবে ভাবতে পারছেন মেডাম।তার উপর এত ভালো সেলারি পাবো ভাবতে পারছেন আপনি!সেই টাকা দিয়ে আমি এত্তো এত্তো শপিং করবো।পড়ালেখা আর করতে হবে না।তারউপর কম পরিশ্রমে এতো বেশি টাকা কামিয়ে বড়লোক হয়ে যাব।আব্বু র কাছে আর হাত পাত্তে হবে না।আব্বু আমাকে আর খোটা দিতে পারবে না,তুই একটা গাধা । তোকে খাইয়ে দাইয়ে হুদাই টাকা ফেলছি।”

আমি ফারিয়া মেয়েটার দিকে হা করে তাকিয়ে রইলাম। মেয়েটা একদমে বকেই যাচ্ছে অনবরত। একটা মেয়ে এত বাচাল!!

–“মেডাম আমি যাই?”

আমি শুধু মেয়েটার দিকে তাকিয়ে রইলাম। ফারিয়া আমার চেহারা দেখে নিজেই বলে উঠলো, “তাহলে আমি যাচ্ছি টাটা।”

আমার উত্তরের অপেক্ষা না করে মেয়েটা লাফিয়ে লাফিয়ে চলে গেল।আমি খানিক সে দিকে তাকিয়ে ফোঁস করে শ্বাস ছাড়লাম।
তক্ষুনি ভুমভুম আওয়াজ তুলে একটা বাইক আমার সামনে দাঁড়াতেই আমি মাথা উপরে তুললাম। ইফান একটা হেলমেট এগিয়ে দিয়ে বলে, পড়।
আমি অবাক চোখে ইফানকে আর তার বাইককে দেখতে ব্যস্ত হয়ে পড়লাম।আমার নড়াচড়া না দেখে ইফান হাত বাড়িয়ে আমাকে তার কাছে টেনে হেলমেট পড়িয়ে দিলো।আমি চোখ সরু করে শুধালাম,
–“এই বাইক কার।”

ইফান নাক ছিটকে বললো,”তোমার নানার।”

আমি দাঁত কটমট করলাম,”একদমই ফাইজলামি কথাবার্তা আমার সাথে বলবা না।”

–“শা’লি বুঝনা কেন তোমার জামাইয়ের পয়সা আছে কিনে আনছে।”

আমি চোখ উল্টালাম।হাতের ফোনটা কাঁধে ঝুলিয়ে রাখা ব্যাগটায় রাখতেই ইফানও নিজের ফোন ঢুকিয়ে দিল।আমি ইফানের পিছনে উঠে বসতে বসতে বললাম,”আমি তো ভাবছিলাম চু’রি করে আনছ।”

আমার কথা শুনে ইফান চোয়াল শক্ত করে দাঁতে দাঁত পিষে বললো,”তর সা’উ’য়া থেকে আনছি।শা’লি আমার।”

আমি ইফানের পিঠে দুটো কিল মেরে বললাম,”শা’লা খা’চ্ছর,,,,”

কথা শেষ করতে না করতেই ইফান বাইক স্টার্ট দিয়ে দিলো।আমি আচমকা হেলে ইফানের পিঠে পড়তেই তাড়াতাড়ি ওর কোমর জড়িয়ে ধরে বসলাম।ইফানের চোখে হাসি খেলে উঠলো।ফ্রন্ট মিররে সেটা আমার চোখে পড়তেই ওর পিঠে থাপ্পড় মারলাম। ইফান আওয়াজ করে হেসে দিলো।মূহুর্তেই বাইকটা মূল ফটক দিয়ে বেড়িয়ে গেল।


দোতলায় নিজের রুমের বেলকনিতে দাঁড়িয়ে এতক্ষণ আমাকে দেখতে থাকা পঙ্কজ একটা ঢোক গিলে জিহ্বা দিয়ে ঠোঁট ভিজাল।অতঃপর হাতের উল্টো পিঠ নাকে ঘষে জোরে জোরে শ্বাস টেনে নিয়ে রুমের ভেতর আসল।টি-টেবিলে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে আছে সাদা পাউডার জাতীয় কিছু। ড্রা’গ’স হবে হয় তো।পঙ্কজ গা ছেড়ে সিঙ্গেল কাউচটায় বসে হাতে ওয়াইনের গ্লাস তুলে নিলো।কয়েক চুমুক খেয়ে পকেট থেকে ফোন বের করে চোখের সামনে ধরল। এক হাতে ওয়াইনের গ্লাস। আরেক হাতে ফোন।সে ফোনের একটা ফাইল বের করল।অতঃপর পাসওয়ার্ড দিয়ে ওপেন করতেই তিন হাজার প্লাস ছবি শো করল।প্রতিটি ছবিই আমার।সবচেয়ে আশ্চর্যজনক বিষয় হলেও সত্যি যে ছবিগুলো একটাও স্বাভাবিক ভাবে তোলা না।মানে লুকিয়ে তুললে যেমন হয়।কোনোটা একপাশ থেকে তোলা কোনোটা পিছন থেকে।
পঙ্কজ ছবিগুলো স্ক্রোল করতে করতে নিচে নামতে লাগল।পঙ্কজের ফোনের ছবিগুলো একদিনের নয়।বরং সে যত স্ক্রোল করছে ততই যেন একটা একটা দিন বছর পিছিয়ে যাচ্ছে। পঙ্কজ স্ক্রোল করতে করতে শেষ পিকটাই এসে থামলো।ছবিতে আমি অচেতন অবস্থায় পড়ে আছি।আমার পরনে কলেজের ড্রেস। ছবিটা দেখে পঙ্কজ বাঁকা হাসলো।ফোনটা নাকের কাছে এনে জোরে শ্বাস টেনে নিলো।তার চেহারা দেখে মনে হচ্ছে তো সে ছবি থেকেই আমার বডি স্মেল শুকতে পেরেছে।পঙ্কজ ঢোক গিলল।তার চোখেমুখে লালসা। হঠাৎই তার ফোন বেজে উঠায় চেহারার রং বদলে গেল।তবে মূহুর্তেই আবার চোখেমুখে হাসির ঝলক ভেসে উঠলো।পঙ্কজ কানে ব্লুটুথ কানেক্ট করে গম্ভীর ভাবে বললো,
–“হুম কি চাই?”

বিপরীত প্রান্ত থেকে কিছু বলতেই পঙ্কজ ফোঁস করে উঠলো,” ডোন্ট গিভ মি বুলশিট। লিসেন কেয়ারফুলি– আমি এই সে’ক্সিটাকে এক রাতের জন্য হলেও চাই।”

অপর প্রান্ত থেকে গমগমা পুরুষালী কন্ঠে ভেসে আসলো,”হাউ ইজ দিস পসিবল?”

রাগে ফেটে পড়ার মতো উপক্রম হলো পঙ্কজের। অত্যাধিক ক্রোধ সামলাতে না পেরে হাতের ওয়াইনের গ্লাসটা ছুড়ে মারলো ফ্লোরে। কাচ ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে চতুর্দিকে ছিটকে পড়ল। পঙ্কজ দাঁতে দাঁত পিষে আওরালো,”যেকোনো ভাবে মেয়েটাকে আমার চাই।ওকে আমার বেডে আনবোই।এই পঙ্কজ কাইসারের বেডে।তারপর হায়ার রেইটে ওকে আমার প্রস্টে’টি’উট ক্লাবের স্ল’ল্ট বানাবো।ইউ গট ইট?”

অপর প্রান্তের লোকটা তপ্ত শ্বাস ছেড়ে বলল,”বাট..”
পঙ্কজ কথা সম্পূর্ণ করতে না দিয়ে ধমকে উঠলো, “জাস্ট শাট ইয়োর ফা’কিং মাউথ।সব নষ্টের মূল জাস্ট ইউ।সেদিন যদি আমার কথা মতো আমাকে মেয়েটাকে চো** তে দিতে তাহলে সেদিনই ক্রুজ শীপে সব খেলা সেখানেই খতম হয়ে যেত।বাট তুমি কি করলে? আমাকে ওয়েট ওয়েট বলে থামিয়ে রাখলে।পরে রেজাল্ট কি হল? আমাদের শিকার আমাদের নাকের ডগা থেকে ইফান এসে নিয়ে গেল।”

অপর প্রান্তের ব্যক্তি পঙ্কজের কথায় রেগে বলল,”হোয়াই ডু ইউ অলওয়েজ পুট অল দ্য ব্লেইম অন মি?সেদিন না হয় একটু কাঁচা কাজ করে ফেলেছিলাম ফোন অফ না করে।বাট পরের প্ল্যানগুলোও,,,,”

–“ইফান ইফান ইফান দ্যা ব্লাডি মনস্টার। সবসময় আমাদের এক ধাপ উপরে চলতে চায়।সেদিনের পর আরও কতশত প্ল্যান ওর জন্য ভেস্তে গেলো।কত ক্লাইন্ডকে কথা দিয়েও রাখতে পারি নি।তারপর কষ্ট করে রয়ে সয়ে জাহানারা বিচটাকে তুলে আনার প্ল্যান করলাম।কিন্তু কি হলো?শেষে আমাদের থাবা থেকে ছোঁ মেরে আমাদের শিকার ছিনিয়ে নিয়ে পুরো দেশকে জানিয়ে ঘটা করে বিয়ে করে নিল। হা হা হা এখন আমাদের শিকার তার খাঁচায় বন্দী।”

পঙ্কজ রাগে রিরি করতে করতে হাসছে।ফোনের অপর প্রান্তের ব্যক্তিও রাগে ফুঁসছে।তবে নিজের রাগ সামলে শীতল কন্ঠে বলল,”সরিয়ে দাও।”

–“মানে?” পঙ্কজ থমকালো খানিকটা।

লোকটা রহস্যময় হাসল বোধহয়। তবে আগের ন্যয় বললো,”ইফান চৌধুরী কে সরিয়ে দাও।আর নয় তো জাহানারা শেখ কে পাবার আশা ছেড়ে দাও।ডু ইউ গেট হোয়াট আই’ম ট্রাইং টু সে?”

পঙ্কজ কিছুক্ষণ ভাবলো।অতঃপর ক্রুর হাসল।হাতের উল্টো পিঠ আবারও নাকে ঘষে নিল।উল্লাসী স্বরে বলল,”ওই বা’স্টা’র্ড কে তো সরতে হবেই।সেই তো সব চিন্তার কারণ । এত ধৈর্য তো তার জন্যই ধরছি।তারপর ওর সুইটহার্ট আমার আর দ্য ব্ল্যাক ভেনম ইট’স ইয়োর্স।”
পঙ্কজ কথা শেষ করতেই দু’জনেই হেসে উঠলো।ফোন কলের লোকটা ক্রোর হেসে বিরবির করলো,”ইফান চৌধুরী, ইউ উইল বি ডেস্ট্রয়ড ভেরি সুন।অ্যান্ড আই উইল বি দ্য কিং অব ইয়োর এম্পায়ার।ব্ল্যাক ভেনমকে জাস্ট আমি লিড দিব।আন্ডারওয়ার্ল্ডে সবচেয়ে পাওয়ারফুল মাফিয়া ইফান চৌধুরীর পরিবর্তে আমার নাম বসাব।জাস্ট ওয়েট…”

লোকটা বিরবির করে আরও কিছু হয় তো বললো।পঙ্কজ ওয়াইনের বোতল থেকে ঢকঢক করে কয়েক ঢোক ওয়াইন খেয়ে নিল।তারপর অপর লোকটা কে শুধানো, “হোয়ার আর ইউ?”

লোকটা কিছু বললো।পঙ্কজ ঠোঁট কামড়ে হেসে বললো, “এনজয় ডিয়ার, আই’ম এনজয়িং মাই সুইটহার্ট টু।”
পঙ্কজ আর লোকটা উভয়ই হো হো করে হেসে দিল।পঙ্কজ কল কেটে দিয়ে মনযোগ সহকারে আমার ছবিগুলো দেখতে লাগল।


ইফানের বাইকটা ঝড়ের বেগে মেইন রোড দিয়ে ছুটতে ছুটতে হঠাৎ সরু আরেকটি পথে চলতে লাগলো।জায়গাটা উত্তরার আসেপাশেই ভেতরের দিকে।গাড়ির গতির কারণে শরীরে তীব্র শীতল বাতাস অনুভব করতে পারছি।কানে বাতাসের শাঁই শাঁই আওয়াজ আসছে।হাত দু’টো বরফের মতো ঠান্ডা হয়ে গেছে ।হেলমেট পড়ে থাকায় মুখে সম্পূর্ণ বাতাস না লাগলেও চোখ দুটো বুজে আসছে।এমতাবস্থায় ইফানের ফাইজলামি কথা কানে আসলো,
–“ধুর বা’ল এত দূর বসে আছ কেন সোনা?তোমার ঐ জিনিস দুইটা তো ঠিকঠাক ফিল করতে পারছি না।”

আমি ঠাস করে ইফানের পিঠে একটা থাপ্পড় মেরে চেচিয়ে উঠলাম,, “গো’লা’মের পুত তুই গাড়ি থামা। আজ জনগনের সামনে তোকে জুতা খুলে মারবো।”

ইফান হঠাৎই বাইককে এপাশ ওপাশ হেলিয়ে দিচ্ছে। আমার মাথা চক্কর দিয়ে উঠলো।আমি আরও শক্ত করে ওর কোমর পেচিয়ে ধরলাম।ইফান স্থির হয়ে আবারও আগের মতো তীব্র গতিতে বাইক চালাতে লাগলো।হাস্কি স্বরে হিসহিসিয়ে বললো,
–“এবার ফিল আসছে বুলবুলি। এভাবেই শক্ত করে ধরে বস।নাহলে,,,,”

–“নাহলে কি?”

আমি ইফানের মুখের কথা কেড়ে নিলাম। ইফান বাঁকা হেসে পুনরায় বাইক হেলিয়ে দিলো।আমি ইফানকে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরে চিৎকার করে উঠলাম,
–“ইফাইন্নার বাচ্চা,,,,”

ইফান উচ্চ স্বরে হেসে উঠলো।কিছুক্ষণের মধ্যেই বাইকটা শহরের অনেক ভেতরে চলে আসলো।এই এরিয়াটা অনেকটা গ্রাম টাইপের।রাস্তার দুপাশে কিছু বাড়িঘর, চায়ের দোকান আর বেশ কিছু ফসলের জমি।জায়গাটা বেশ মনে ধরেছে।শান্ত আর চারদিকে ভিষণ খোলা মেলা। গাড়িঘোড়ার তেমন চলাচল নেই। চলবেই বা কিভাবে?এই রাস্তা দিয়ে অটো,রিকশা আর বাইক ছাড়া বড় গাড়ি যাওয়ার মতো নয়।হঠাৎ আমার চোখে পরল বেশ কিছুটা দূরে হলুদ জমি দেখা যাচ্ছে। হ্যাঁ সরিষা ক্ষেত হয়তো।
ইফানের বাইকটা ক্ষেতের সামনে এসে থামলো।আমার নজরে আসলো দুটো জিপ আরও কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে আছে।

–“নেমে পড় জান।”

আমার কান অব্ধি পৌঁছাল না।ইফান মাথার হেলমেট খুলে তার ঘন চুলগুলো এলোমেলো করে দিলো।আমার থেকে উত্তর না পেয়ে পিছনে তাকাতেই দেখল আমি ক্রুদ্ধ নয়নে আরেকদিকে তাকিয়ে। ইফান সেদিকে তাকিয়ে তপ্ত শ্বাস ছেড়ে বলল,”এটা তোমার সেইফটির জন্য।”

আমি ইফানের দিকে তাকিয়ে কর্কশ কন্ঠে শুধালাম, “আমি কি বলেছি তোমায় আমার সেইফটির জন্য সবসময় গার্ড নিয়ে ঘুরতে?”

–“কেন বারবার ভুলে যাও তুমি কার ওয়াইফ।”

–“তাই বলে আমাদের প্রাইভেট মোমেন্টেও?”

আমি আর কথা না বাড়িয়ে ফুঁসতে ফুঁসতে নেমে পড়লাম।বুকে হাত গুঁজে আরেক পাশে ফিরে দাঁড়িয়ে রইলাম।ইফান নেমে এসে আমার সামনে দাঁড়াল। অতঃপর যত্ন সহকারে আমার মাথা থেকে হেলমেট খুলতে লাগলো।আমি আড় চোখে লোকটার দিকে তাকাতেই লক্ষ করলাম ইফান ঠোঁট টিপে মিটিমিটি হাসছে।কিন্তু হাসছে কেন?মনের মধ্যে যখন প্রশ্নটা আসল তখনই ইফান আমার চোখের দিকে তাকাল।সত্যিই ইফান ঠোঁট টিপে হাসছে।আমি দাঁতে দাঁত কটমট করে জিজ্ঞেস করালাম,
–“এভাবে হাসছ কেন?”

ইফান বাইকে হেলমেট রেখে আমার কোমরে টান মেরে তার সাথে মিশিয়ে নিল।আমার থুতনি উপরে তুলে কেজুয়ালি ডেকে উঠলো, “জান।”

–“হুম।”

আমি তৎক্ষনাৎ প্রতিত্তোর করলাম।ইফান ঠোঁট কামড়ে হাসলো।আমি একটা জিনিস লক্ষ করলাম ইফান হাসলে ওর গালে টোল পড়ে। বেশ লাগে দেখতে।সচরাচর মেয়েদের ক্ষেত্রে এটা হয়।এই যে আমারই তো টোল পড়ে গালে।তবে আমি তো তেমন হাসিই না। আমি ইফানের ঠোঁটের হাসিটা মনযোগ দিয়ে দেখছি।ফর্সা চেহারা তাতে কোনো স্পট নেই। ইফান কথা বলার সময় ঘনকালো ব্রুযোগল যেন কথার ধরন অনুযায়ী নৃত্য করে।বিষয়টা আমার আরও আগে থেকেই চমৎকার লাগতো।আর তার ফর্সা ফেইসে ব্রাউন ঠোঁটগুলো খুব মানানসই ।কোনো সাধারণ ছেলের এমন ঠোঁট হলে নিশ্চয়ই বলতাম গা’ঞ্জা’খুর।
মনে মনে কথাটা ভাবতেই আমার ঠোঁটে মুচকি হাসি ফুটে উঠল।আমি ঠোঁট কামড়ে ধরলাম। তক্ষুনি আমার কানের কাছে ইফানের মাদকীয় কন্ঠে রসিকতার স্বর ভেসে আসল,
–“তুমি আজকাল মেয়েদের মতো অভিমান করতে শিখে গেছ জান।”

আমি থমকে গেলাম।ঠোঁটের কোণে জাগ্রত হওয়া হাসিটা মিলিয়ে গেল।আমার মনে হল এতক্ষণ আমি একটা ঘোরের মধ্যে ছিলাম। তাই কি সব ভাবছি বলছি নিজেই জানি না।আমি তাড়াতাড়ি ইফানের থেকে দূরে সরে দাঁড়ালাম।হঠাৎই গরম লাগছে।আমি গলায় পেচিয়ে রাখা ওড়নাটা ঢিলে করে দিলাম।যদিও আগে ঢিলেই ছিল।ইফান আমাকে দেখে হাসল।আমি বিব্রত বোধ করছি নিজের এমন আচরণে। হঠাৎ করে এটা কি হয়ে গেল?আমি আজকাল কেমন যেন বিহেভ করছি!

ইফান পিছন থেকে আমার হাত ধরে ক্ষেতের দিকে এগিয়ে গেল।এই তো দেখা যাচ্ছে একটা উঁচু মাচা।যার উপরে ছনের ছাঁদ দেওয়া। আমরা ছাড়া আসেপাশে আর কোনো কাকপক্ষীরও দেখা নেই। কেমন যেন শুনশান। আসার সময় লোকালয় তো বেশ জমজমাট ছিল।

–“এই জায়গাটা ভিষণ নিরব। এতএত ক্ষেত–ফসল একটা কৃষকও নাই আশ্চর্য!

আমি অবাক হয়ে বললাম। ইফান আমার হাত ধরে সিঁড়ি বেয়ে মাচায় উঠতে উঠতে প্রতিত্তোর করল,”সরিয়ে দিয়েছি।”
আমি দাঁড়িয়ে পড়লাম।সরু চোখ করে শুধালাম,
–“সরিয়ে দিয়েছ মানে কি?”

–“প্রাইভেসি প্লাস প্রটেকশন দুটোই ইম্পরট্যান্ট।”

আমি চোখ উল্টালাম।মাচার উপরে খুব সুন্দর করে একটা টেবিল আর দুটো চেয়ার পাতা।টেবিল অনেক গোছানো। সুন্দর করে খাবার-দাবার সাজিয়ে রাখা।ইফান আমার জন্য চেয়ার টেনে নিজেও বসলো।আমি বসলাম না।মাচাটা বেশ উঁচু হওয়ায় এখান থেকে সব কিছুই স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে।চিলের চোখের মতো আমার চোখের সমনেও সব কিছু দেখা যাচ্ছে। আশেপাশের সবুজ প্রকৃতিটা কি অপরুপ সুন্দরই না লাগছে।যতদূর চোখ যাচ্ছে খালি হলুদ আর হলুদ ।আমি একটু এগিয়ে গিয়ে দাঁড়ালাম। এখন আরও সুন্দর করে সম্পূর্ণ ক্ষেতটা দেখা যাচ্ছে। আমি ভালো করে নজর বুলাতেই থমকে গেলাম।আমার চোখ দুটো কিছুতেই যেন বিশ্বাস করতে চায়ছে না।আমি কয়েকবার চোখ পিটপিট করলাম। নাহ্ আমি ঠিকই দেখছি।আমি মুখে হাত ধরে চিৎকার করে উঠলাম,
–“এএটা আমি তাই না?ইফান এটা আমি তাই না?”

ক্ষেতের মাঝ বরাবর হলুদ সরিষা ফুল, হাইব্রিড জাতীয় লাল শাক আর সবুজ ডাটা শাকের সমন্বয়ে আমার একটি অবয়ব আর্ট করা হয়েছে। শাড়িটা হলুদ, চুলগুলো লাল আর বাকি কিছু অংশে সবুজ। চিত্রটা দেখে মনে হচ্ছে আমার কানে তিনটা গোলাপ গুজে রাখা।লম্বা চুলগুলো উড়ছে। আল্লাহ একটা ফসলের আর্ট এতটা নিখুঁত কিভাবে হয়? এমন আশ্চর্য জিনিস দেখে খুশিতে লাফাতে ইচ্ছে হচ্ছে। ইফান সবে ইসপ্রেসোতে একটা চুমুক দিয়েছিল।আমার ডাক শুনে উঠে এসে আমার পিছনে দাঁড়িয়ে ক্ষেতে এক নজর তাকাল। আমি অনুভব করতে পারছি তার উপস্থিতি।তবে এখন ইফানকে দেখার সময় নেই আমার।আমি অনামিকা আঙ্গুল ক্ষেতের দিকে তাক করে খুশিতে গদগদ করতে করতে বললাম,
–“ইফান এটা আমি তাই না।”

–“হুম।”

ইফান বুকে দুহাত গুঁজে খুঁটির সাথে হেলান দিয়ে নিস্প্রভ আমার দিকে তাকিয়ে ছোট্ট করে প্রতিত্তোর করল।আমি আবারো শুধালাম,
–“এটা তুমি আমার জন্য করিয়েছ তাই না?”

–“হু।”

–“আচ্ছা এটা কি প্রথমে মাটিতে এঁকে পরে বীজ বুনেছে তাই না?”

–“হু।”

–“তাহলে তো চারাগুলো ছোট ছিল তখনও আমার ছবি বুঝা গেছে তাই না?”

–“হু।”

–“তখনও দেখতে অনেক সুন্দর লাগছিল তাই না?”

–“হু।”

–“এখনও তো সুন্দর লাগছে তাই না?”

–“হু।”

আমি খুশিতে উত্তেজিত হয়ে একটার পর একটা প্রশ্ন করেই যাচ্ছি। ইফান শীতল কণ্ঠে শুধু হু হু করছে।ইফান আর একবারও ক্ষেতের দিকে তাকালো না। তার নিগূঢ় দৃষ্টি আমার হাসি মুখেই। লোকটা খুব মনযোগ দিয়ে আমাকে দেখতে ব্যস্ত।আমি হাসলে দুগালে খুব সুন্দর করে টোল পড়ে।তবে সব সময় না।যখন আমি মন খুলে হাসি তখনই। আমার এই বিষয়টা ইফানের বেশ পছন্দ ।এদিকে এখন আর আমার প্রশ্নের উত্তরে ইফান হু ও বলছে না।আমি বেশ কিছুক্ষণ বকবক করার পর অনুভব করলাম ইফান কিছু বলছে না।আমি পিছন ফিরতে নিলেই ইফানে বুকে ধাক্কা লেগে পড়ে যেতে নিলেই ইফান আমার বাহুতে টান মেরে তার শক্তপোক্ত বুকে এনে ফেললো।ইফানের এমন দৃষ্টি দেখে বিব্রত হলাম।সাথে এতক্ষণ নিজের কৃতকাজ সরণ করে ইতস্তত বোধ করতে লাগলাম।দৃষ্টি নত করতেই অনুভব করলাম আমি ইফানের পায়ের উপর ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে আছি।আমি ঝটপট নিজেকে সামলে চলে যেতে নিলে ইফান আমার কমোরে হাত রেখে আটকে দেয়।এই অস্বস্তিকর পরিস্থিতিকে সামলাতে বললাম,
–“ছাড়।”

–“হোয়াই?”

আমি আঙ্গুল দিয়ে ক্ষেত দেখালাম। ইফান বুঝলো না মানে।আমি জিহ্বা দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে বললাম,”ছবি তুলব।”

–“আচ্ছা।”

ইফানের উত্তর শুনে ব্রু কুঁচকে গেল।ব্যাগ থেকে ফোন না বের করলে পিক তুলবো কিভাবে আশ্চর্য!! আমি শক্ত চেহারা করে বললাম,”ব্যাগ থেকে ফোন নিতে হবে।”

–“নো নিড।”

এবার দাঁত দাঁত পিষে চেচিয়ে উঠলাম, “কি আশ্চর্য!! আমি ফোন বে,,,”

আমার বাক্য সম্পূর্ণ হওয়ার আগেই ইফান আমাকে ঘুরিয়ে দিলো।আমি রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে তার দিকে তাকাতেই ইশারা করলো সামনের দিকে।কই কিছু তো নেই। তখনই ইফান হাস্কি স্বরে বলল,
–“উপরে দেখ।”

আমি সেই অনুযায়ী তাকাতেই দেখলাম দুটো ছোট ড্রোন উড়ছে।আমি বেশ অবাক হয়ে ইফানের দিকে তাকাতেই সে টুপ করে আমার ঠোঁটে শব্দ করে চুমু খেল।তারপর বুড়ো আঙুল দিয়ে ঠোঁটের এক কোণায় ঘষে বললো,”এবার সামনে থাকাও।”
ইফান নিজেই আমাকে ঘুরিয়ে দিল।আমি শালটা রেখে সুন্দর করে দাঁড়ালাম। ঠোঁটে হালকা হাসি রাখার চেষ্টাও করলাম।ইশশ কি সুন্দর শীতল হওয়া বইছে।শরীর জুড়িয়ে আসছে।বেশ ঠান্ডা লাগছে।আমি চোখ বন্ধ করে মূহুর্তটাকে অনুভব করতে দু’হাত মেলে ধরলাম।ইফান তাকিয়ে আমাকে দেখছে।হঠাৎই টান মেরে আমার ওড়নাটা নিজের হাতে পেচিয়ে নিল।সঙ্গে সঙ্গে আমার কোমর ছাড়িয়ে পড়া চুলগুলো আঁচড়ে পড়ল।আমি কপাল কুঞ্চিত করে ইফানের দিকে তাকাতেই সে বললো,
–“নাউ পারফেক্ট।”

আমার চোখদুটো শীতল হয়ে আসলো।আসলেই খোলা চুলে আমাকে যা সুন্দর লাগে!ইফান ইশারা করলো সামনে তাকাতে।আমি তাকিয়ে আবার হাত দুটো মেলে ধরে চোখ বুজলাম। বন্য হাওয়ায় আমার চুলগুলো উড়ছে।ইফান প্যান্টের পকেটে এক হাত ঢুকিয়ে খুঁটির সাথে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে। তার একহাতে আমার গলার ওড়না পেচিয়ে ধরা।যার কিছু অংশ মাচাতে স্পর্শ করে আছে।ইফান মুগ্ধ নয়নে আমাকে দেখছে। আমার চুল উড়ে ওর চোখে মুখে আঁচড়ে পড়ছে। কিন্তু সে একবারও তা সরানোর প্রয়োজন বোধ করল না। তার দৃষ্টি দেখে মনে হয় সে এক তৃষ্ণার্ত চাতক পাখি আমার থেকে কিছু একটা শুনার জন্য অধীর অপেক্ষায় প্রহর গুনছে।
আমাকে অপলক দেখতে দেখতে হঠাৎই ইফান আমার কানে ঠোঁট ছুঁইয়ে হাস্কি স্বরে হিসহিসিয়ে বললো,
–“হিমবাহ গলে গেলে কি হয় জান?”

আচমকা আমি চোখ খুললাম। হঠাৎ এটা কি ধরনের প্রশ্ন? আমি ইফানের দিকে ব্রু কুঁচকে তাকালাম। ইফান খুব শান্ত নজরে আমার দিকে তাকিয়ে। আমি না চাইতেও মৃদু স্বরে বললাম,
–“এটা না জানার কি আছে?পৃথিবী তলিয়ে যাবে।”

–“আর তুমি গলে গেলে?”

তৎক্ষনাৎ ইফান পাল্টা আরেকটা আজগুবি প্রশ্ন করে বসলো।আমি বিরবির করে ভাবতে লাগলাম কথাটা,
–“আমি গলে গেলে!..”

–“আমি তলিয়ে যাব।হা হা হা।”

আমার ভাবনার মাঝেই ইফান নিজেই চটজলদি বলে উঠলো।খুব দ্রুত কথাটা বলেই গা দুলিয়ে হেসে চেয়ারে গিয়ে বসে পড়ল।ঠান্ডা জল হয়ে যাওয়া তিক্ত স্বাদের ইসপ্রেসোই খুব তৃপ্তি করেই খেতে লাগল।আমি তার দিকে তাকিয়ে রইলাম।আমার কাছে তার কথা আর হাসি বড়ই অদ্ভুত লাগলো।এই লোকটা আসলে চায় টা কি?


ড্রয়িং রুমে বসে আড্ডা দিচ্ছে নোহা, ইতি, ফারিয়া আর মীরা। মীরা অবশ্য ফোনেই বেশি মনযোগী। হঠাৎ টুকটাক উত্তর দিচ্ছে। ফারিয়া নিজের জন্য দামি কয়েকটা সেলোয়ার-কামিজ এনেছে।সাথে বাড়ির যাদের সাথে তার ভাব জমেছে তাদের জন্যও এটা ওটা এনেছে।ইতি আর নোহাকে চকলেট এনে দিয়েছে। ওরা বসে বসে খাচ্ছে আর গল্প করছে।ইতি আর নোহার বেশ মনে ধরেছে ফারিয়াকে।নোহার একটু বেশিই মনে ধরেছে।কারণ ফারিয়া আমার আর নোহার বয়সীই।আর ফারিয়া মেয়েটা কাউকে পরোয়া করে কথা বলে না।তার মনে যা আসে তাই উগড়ে দেয়।ফারিয়া পলির জন্য মাথার ব্যান্ড এনেছে। কিন্তু আসার পর থেকে পলিকে কোথাও দেখতে পাচ্ছে না।ফারিয়া ইতিকে জিজ্ঞেস করল,
–“এই পলি ভবি কোথায় গো?”

ইতি কিছু বলতে যাবে তার আগেই চকলেট খেতে খেতে নোহা ছাড়ল এক লাগামহীন বাক্য ,”ইমরান ব্রোর সাথে রুমে সে’ক্স করছে।”
ফারিয়া হো হো করে হেসে দিলে।ইতি সে’ক্স শব্দ টা জানে।তবে মানে তার সরল মস্তিষ্ক জানে না।তাই ফারিয়ার সাথে হি হি করে হাসিতে ফেটে পড়লো।নোহা কেন হাসবে না?ওদের হাসতে দেখে নোহা বাড়ি কাঁপিয়ে হাসিতে ফেটে পড়ল।কি অদ্ভুত সেই হাসির আওয়াজ।এদিকে ম্যাচিউর মীরা হতবাক নয়নে তিন পাগলের দিকে তাকিয়ে আছে। সে আসলেই এই হাসির কারণ বুঝে উঠতে পারছে না।এইটুকু বিষয়ে এভাবে হাসার কি আছে।স্ট্রেঞ্জ!! মীরা আর ওদের নিয়ে ভাবলো না।সে খুব মনযোগ দিয়ে ফোন টিপতে লাগল।

এদিকে সবে নিচে নামছিল পলি।অর্ধেক সিঁড়ি নামতেই নোহার লাগামহীন কথা কানে আসলো।মেয়েটার পদযুগল তক্ষুনি থেমে যায়।এই মূহুর্তে ল’জ্জা’য় পলির মাটির নিচে লুকিয়ে যেতে ইচ্ছে হচ্ছে। পলি না পারছে নিচে নামতে আর না পারছে উপরে নিজের রুমে চলে যেতে।তাই বোকার মতো আঁচল দিয়ে মুখ লুকানোর চেষ্টা করছে।হঠাৎই ফারিয়া হাসতে হাসতে সিঁড়ির দিকে তাকায়।আর দেখে পলি উপরে চলে যাওয়ার জন্য ঘুরে দাঁড়াচ্ছে। ফারিয়া পলির দিকে আঙ্গুল তাক করে হাসিতে ফেটে পরল।বাকি দুইটাও পলিকে দেখে হাসিতে ফেটে পড়ল।পলির লজ্জায় মাথা কাটা যাচ্ছে ।ফারিয়া বলে উঠলো,
–“ভাবি তোমার চুল ভিজে। তার মানে সত্যিই তুমি ভাইয়ার সাথে আঠারো প্লাস কামকাজ করেছে।তাও আবার ভরসন্ধ্যায়।”

আবারো তিন বাদর হাসিতে ফেটে পড়ল।পলি নিজের লাজলজ্জা ভুলে দৌড়ে ফারিয়ার মুখে হাত ধরে বলল,”আরে বোইন আমারে পঁচাও কিন্তু যা বলবা আস্তে বল। রান্নাঘরে কাকিয়া আছে শরম।”
পলির কথা শুনে মীরা হেয়ালি করে বললো,”তোমরা করবা শরম নেই ওরা বললেই শরম!”

–“মীরা আপু।”

পলি লজ্জা মিশ্রিত কন্ঠে বলল।মীরা হেসে ফোনে আবার ডুব দিল।ফারিয়া পলির কাঁধে হাত রেখে বলল,”আজ কেউ নেই বলে করতে পারি না।”
ফারিয়ার কথা নোহা আর ইতি মাথা নাড়িয়ে বলল,”ঠিক ঠিক।”
পলি চোখ ছোট করে ইতিকে জিজ্ঞেস করল,”কি ঠিক ঠিক?”

–“করতে পারি না আরকি।”

–“কি করতে পার না?”

পলির প্রশ্নে ইতি ভাবনায় পরল।আসলেই তো সে কি পারে না?ইতি মাথা নিচু করে বলে উঠল,”ঐ আরকি।”

–“কি আরকি?”

–“জানি না।”

ইতির কথায় এবার পলি হাসিতে ফেটে পরল।কারণ সে জানতো এই মেয়ে হুদাই কিছু না বুঝে হাসছে।পলিকে হাসতে দেখে ফারিয়া আর নোহাও উদ্ভট হাসিতে ফেটে পরছে। ইতি লজ্জায় মরি মরি অবস্থা। বড়লোক বাবা-মায়ের একমাত্র আদরের কন্যা ইতি।ছোট থেকেই বড় হয়েছে এই বাড়ির চার দেওয়ালের ভিতর। তাই বুদ্ধিসুদ্ধি তেমন নেই।সারাদিন এরওর পিছনে পিছনে ঘুরে গল্প করার জন্য। কেউ না থাকলে রুমে বসে ফোনে কার্টুন দেখে।সে আবার মোটুর সেই বড় ভক্ত। তার ক্রাশের মধ্যে নাকি রৌদ্রাও আছে।কার্টুন ব্যতিত সে ভুলেও অন্যকিছু দেখবে না।আর ড্রয়িং রুমে থাকলে পলি আর দাদির সাথে সাদামাটা সিরিয়াল দেখে।আর বাকি রইল বইয়ের কথা।হাহাহা সেটা আরও মজার বিষয়। পড়ালেখা তে ইতি একেবারে ডাল।পরীক্ষার আগের দিন কেঁদেকুটে ভাসায় কিছু পাড়ে না বলে।তারপর আর কি? মন্ত্রী সাহেব লজ্জার মাথা খেয়ে স্কুল কলেজে জানিয়ে দেয় মেয়ে খাতায় না লেখলেও যেন অনুগ্রহ করে পাস করিয়ে দেয়।আর বাসায় টিচার্স পড়াতে আসলে উল্টো সে টিচার্স দের পড়িয়ে দেয় কার্টুন সম্পর্কে।
পলি ইতির এমন চেহারা দেখে কাঁধ জড়িয়ে ধরল,
–“সোনা রাগ করছ?আহাগো সরমিন্দা। এত লজ্জা পেলে জামাই আদর করবো কিভাবে? “

ইতির লজ্জার আরেক ধাপ বাড়ল পলির কথায়।ইতিকে লজ্জা পেতে দেখে সবাই হাসল।ফারিয়া পলির কাঁধে মাথা রেখে বলল,”ভাবি একটা কথা বলি?”

–“হুম বল।”

ফারিয়া দুষ্ট হেসে শুধাল,”তোমার ফাস্ট নাইট কেমন কেটেছিল?ভাইয়া রুমে ঢুকেই প্রথমে কি বলেছিল?আর তোমার অনুভূতি কেমন ছিল?”

–“ছিহ্ এসব কি বল?”

পলি মুখে আঁচল ধরে হাসছে।আবার লজ্জায় গালে রক্তিম আভা দেখা যাচ্ছে। ফারিয়ার সাথে এবার নোহাও পলিকে চেপে ধরল। ইতিরও পলিকে বলতে ইচ্ছে করছে তাদের গল্প টা শুনাতে।কিন্তু ইতি কেন জানি বেশ লজ্জা পাচ্ছে। পলি লাজুক হেসে বলল,”প্রথম রাতে আমাদের মধ্যে তেমন কিছু হয়নি।”

–“কিহ্!”

ফারিয়া আশ্চর্য হয়ে বলে উঠলো। পলি নখ কামড়ে মাথা নাড়িয়ে বলল সত্যি। ফারিয়া পলিকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বলল,”প্লিজ ভাবি বল না তোমাদের ফাস্ট নাইট স্টোরি।”
পলির বেশ বলতে ইচ্ছে হচ্ছে। কারণ মেয়েরা এটা শেয়ার করতে পছন্দ করে স্বামী তাদের কেমন ভালোবাসে।এখানে তো পলির জীবনে ইমরান এক রাজপুত্র। বাপের বাড়িতে থাকতে বাপহারা এতিম মেয়েটার জীবনে কত কষ্টই না ছিল।কিন্তু ইমরানের সাথে বিয়ে হওয়ার পর কষ্ট কি সেটাই ভুলে গেছে। মুখ ফুটে কিছু বলার আগেই তার স্বামী সব কিছু হাজির করে।এই সুখগুলো সব মেয়েই শেয়ার করতে চায়।
নোহা কোমরে হাত ধরে রাগী চেহারা দেখিয়ে বলল,”এই তুমি বল কি হয়েছিল।”
নোহাকে রাগী ভং ধরতে দেখে পলির বেশ হাসি পেল।কারণ আমি আসার পর থেকে নোহা পলিকে আর হার্ট করে কথা বলে না।বরং পলির সাথে ভাব জমিয়েছে।
পলি আড় চোখে মীরার দিকে তাকাল।ইশশ এত সিনিয়র মানুষের সামনে ঐসব কথা কিভাবে বলবে?পলির লজ্জা লাগছে।মীরা আচমকা উঠে দাঁড়াল।হাঁক ছেড়ে ডেকে উঠল,”মম আমার একটু দরকার আছে আর্জেন্ট বের হতে হচ্ছে। তুমি আমার জন্য টেনশন করো না।আমি কাজ শেষ করে চলে আসব।ওকে ।”
রান্নাঘর থেকে কাকিয়ার কন্ঠ ভেসে আসল,”সাবধানে থাকিস।আর বেশি রাত করিস না কেমন।”

–“ওকে বাই বাই।”

মীরা চলে যাওয়ার আগে পলিকে চোখ মেরে বলল,”তুমি কন্টিনিউ কর বেইব।”
পলি লজ্জায় ঘুরে দাঁড়াল। অতঃপর মীরা বেড়িয়ে যেতেই দীর্ঘ শ্বাস ছেড়ে লাজুক চেহারা করে বলতে লাগল তার প্রথম রাতের গল্প…..

চলবে,,,,,,

(অনেক বড় পর্ব দিয়েছি। হ্যাপি রিডিং 🥳)

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply