Golpo romantic golpo জাহানারা

জাহানারা পর্ব ৪৮


জাহানারা [২য় খন্ড]

জান্নাত_মুন

পর্ব :৪৮
🚫ক’পি করা নিষিদ্ধ

ছয়মাস পর……..।।

ভার্সিটির সামনে অটো রিকশাটা এসে দাঁড়াল।মূহুর্তেই অটোরিকশার পিছনে দুটো কালো গাড়ি এসে থামলো।সেখান থেকে এক এক করে ত্রিশ পয়ত্রিশ জন কালো পোশাকধারী দানবাকৃতির লোক নেমে অটোরিকশাটাকে ঘিরে ধরলো।অরপদিকে আগে থেকেই ভার্সিটি গেইটের সামনে দাঁড়িয়ে ছিলো আলাল-দুলাল।আলালের হাতে একটা ছাতা।দুলালের এক হাতে পানির বোতল আর কাঁধে বড় একটি ব্যাগ।ব্যাগে যতসব শুকনো খাবার সবই আছে।

অটোরিকশাটাকে দেখা মাত্রই ওরা ছুটে এসে দুই পাশে দাঁড়াল।আমি কাঁধের ব্যাগটাকে ঠিক করতে করতে অটোরিকশা থেকে নামলাম।মূহুর্তেই আমার মাথার উপর ছাতা ধরলো আলাল।আমি আলালের দিকে চোখ রাঙাতেই আলাল নির্বোধের মতো দাঁত বের করে হেসে দিলো।আলালের থেকে চোখ সরিয়ে দাঁতে দাঁত পিষে দুলালের দিকে তাকালাম। দুলাল শুকনো একটা ঢুক গিলে সরে দাঁড়াল।

তারপর আমি সামনের গার্ডগুলোর দিকে তাকালাম। গার্ডগুলোও সামনে থেকে সরে দুই পাশে দাঁড়ালো। আসেপাশে সকলেই আমার দিকে তাকিয়ে।এটা প্রতিদিনই হয়ে আসছে।আমি চৌধুরী বাড়ি থেকে বের হলেই আমার পিছনে এই লোকগুলো লেগে থাকে।আমি না করলেও তারা আমার কথা কানে তুলে না। তাদের নাকি কড়া নির্দেশ দেওয়া আমাকে একবারের জন্যও চোখের আড়াল না করতে।

আমি অতি সাধারণ। চৌধুরীদের মতো এত বিলাসবহুল ভাবে জীবন কাটাতে চাই না।নিজের সাচ্ছন্দ্যের জন্য বাড়ির গাড়িতে চরি না।সেখানে ইফান আমাকে পার্সোনাল বিএমডব্লিউ কিনে দিয়েছে।হাস্যকর!!আমি প্রতিদিন অটোরিকশা করেই যাতায়াত করি।আর এই বিষয়টাতেই সকলের চোখ আটকায়।প্রতিদিন সকালে ভার্সিটিতে ছেলেমেয়েরা আমাকে দেখার জন্য দাঁড়িয়ে থাকে।আমি মন্ত্রী ইকবাল চৌধুরীর পুত্রবধূ আর গ্যাংস্টার ইফান চৌধুরীর বউ হওয়ায় তাদের কত উল্লাস!!বিরক্তিকর বিষয়!

আমি রিকশা ভাড়া মিটেয়ে দিলাম।তারপর সামনে তাকাতেই দেখলাম তন্নি আমার দিকে ছুটে আসছে।আমি মৃদু হাসলাম।এই একমাত্র বান্ধবী যে আমাকে প্রথম থেকে সব পরিস্থিতিতে মানসিক ভাবে সাপোর্ট দিয়ে আসছে।ভাবতেই বুক ছিঁড়ে দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে,দেখতে দেখতে কিভাবে আমার বিয়ের এগারো মাস পেরিয়ে গেলো!!আর কিছুদিন পরেই এক বছর পূর্ণ হবে।ভার হয়ে আসা বুকটাকে হালকা করতে দীর্ঘ শ্বাস ছাড়লাম।


ব্যস্ত নগরী।চারপাশে যানবাহনের শব্দ দূষণ।রাস্তার জ্যামের মধ্যে আটকা পড়ে আছে সারি সারি গাড়ি।এত জ্যাম দেখে জুইয়ের চোখমুখ কুঞ্চিত হলো।জুই মুখ দিয়ে চ বর্গীয় আওয়াজ বের করে অত্যন্ত বিরক্তি নিয়ে বললো,,,
“আর কতক্ষণ এভাবে বসে থাকবো?আমার তো ঠিক টাইমে কলেজে যেতে হবে নাকি!!”

জানালা দিয়ে মাথা বের করে বাইরেটা দেখছিলো অফিসার আবির।জুইয়ের কন্ঠ শুনে মাথা ভেতরে এনে হেসে বললো,”জ্যাম তো কমছেই না।এখন কি আর করার বল তো পিচ্চি?”
আবিরের কথা শুনে জুই ফুঁসে উঠলো,”একদম আমাকে পিচ্চি বলবেন না। আমি এখন কলেজে পড়ি,হুম।”
জুইকে রাগতে দেখে আবির ঠোঁট টিপে হেসে হেয়ালি করে বললো,”কিন্তু আইন অনুযায়ী তো আঠারো বছরের নিচে সবাই বাচ্চা।” জুই গাল ফুলিয়ে বললো,”আপনি কেন আমাকে দিতে আসছেন হুম?”
জুইয়ের কথা শুনে আবির অন্যদিকে তাকিয়ে শুকনো কাশলো।কারণ সে তো জুইকে মিস করছিলো।জুইকে দেখার জন্যই এসেছে।আর জিতু ভাইয়ার নাম ভাঙিয়ে কলেজে ড্রপ করতে যাচ্ছে।

জুই পড়াশোনার জন্য ঢাকা চলে এসেছে আজ প্রায় চারমাস হলো।সে এখানে হোস্টেলে থেকে পড়াশোনা করছে।জিতু ভাইয়া জুইয়ের জন্য একটা ট্যাক্সি ভাড়া করে রেখেছে।সেটা দিয়েই বাইরে যাতায়াত করে।আজ সে হোস্টেল থেকে বেড়িয়ে দেখে ট্যাক্সি আসে নি।তার জায়গায় আবির নিজের গাড়ি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

জুই হাত ঘড়িতে টাইম দেখে আবিরকে তাড়া দিয়ে বললো,”আমাকে আর অপেক্ষা করলে চলবে না।আমি বরং হেঁটেই চলে যায়।”
আবির বললো,”ঠিক আছে চল।” জুই চোখ সরু করে বললো,”চল মানে!” আবির গাড়ি থেকে নামতে নামতে বললো,”আমি তোমাকে এগিয়ে দিয়ে আসছি.”
জুই নাকচ করে বললো,”প্রয়োজন নেই।এই তো সামনেই কলেজ। আমি একাই যেতে পারবো।”
আবির আরও কিছু বলার আগেই জুই জুড়ে হেঁটে চলে যেতে লাগলো।আবির পকেটে দু’হাত গুঁজে ঠোঁট টিপে হাসতে হাসতে জুইয়ের যাওয়ার পথে চেয়ে রইলো।

জুই হাঁটতে হাঁটতে রাগে বিরবির করছে,”ঢং পেয়েছে আমার সাথে ঢং।আমি কি কিছুই বুঝিনা নাকি হ্যাঁ!!আমি নিশ্চিত আমার সাথে লাইন মারার ধান্দায় এই বালের বেডা।” জুই বিরবির করে আবিরের উপর রাগ ঝারতে ঝারতে মোড়ের দিকে ঘুরতে নিলেই আচমকা একটা গাড়ি তার সামনে ব্রেক কষলো।জুইয়ের মাথা গাড়িতে ঠুকলো।জুই ভয়ে চিৎকার করে উঠলো,

“আআআআ”

মাথায় ব্যথা লাগায় জুই আর মাথা তুলতে পারছে না।মার্সিডিজের ভেতরের লোকটা চরম বিরক্ত হলো।একেই তো যাত্রাপথে বাঁধা আরেক তো মেয়েটা গাড়ির সামনে থেকে সরছে না।লোকটা গাড়ি থেকে বেড়িয়ে আসলো।জুইকে কিছু বলার আগেই জুই মাথা তুলতে তুলতে চেচিয়ে উঠলো,

“এ কোন হেডা রে?”

জুই আর লোকটা চোখাচোখি হতেই দুজনেই একত্রে চেচিয়ে বলে উঠলো, “আপনি?”

মাহিন জুইকে দেখে তাজ্জব বনে গেছে।চোখের রোদ চশমা খুলে অবাক নয়নে জুইয়ের দিকে তাকিয়ে।জুই কপালে হাত ধরে রাগে রিরি করতে করতে মাহিনকে উপর নিচ পরক করলো।হোয়াইট শার্ট, ব্যাক ব্লেজার আর প্যান্টে দেখতে ভীষণ সুদর্শন লাগছে।গায়ের রংও উজ্জ্বল। দেখতে ছেলে হিসেবে একশো তে একশো।জুই ভালোভাবে দেখে মাহিনের মুখের দিকে তাকিয়ে নাক ছিটকে বললো,
“লেবাস দেখে তো ভদ্র ঘরের মানুষই মনে হচ্ছে।কে আর বুঝবে উপরে পুচপাচ ভেতরে সদরঘাট!!”

জুইয়ের কথা মাহিনের বোধগম্য হলো না।সে চোখ সরু করে বললো,”হোয়াট?”

“আল্লাহ যে দুইটা চোখ দিয়েছে সেগুলো কি পকেটে ভরে রাখার জন্য।চোখে যদি নাই দেখেন তাহলে কে বলেছে গাড়ি চালাতে?”

জুইয়ের কথায় মাহিন চোয়াল শক্ত করে দাঁতে দাঁত পিষলো।অতঃপর জুইকে সরু চোখে মাথা থেকে পা অব্দি পর্যবেক্ষণ করলো।জুই কলেজের সাদা ড্রেসের উপর সাদা অ্যাপ্রোন পড়ে আছে।পিঠ পর্যন্ত পড়া বিনুনিটা সামনে ফেলে রেখেছে। ডাগরডাগর আঁখি জোড়া।ঠোঁটে হালকা গোলাপি লিপস্টিক দেওয়া।জুইকে দেখে মাহিনের মনে হলো তার চেনা কারো সাথে মিল আছে।কিন্তু কার সাথে সেটা মনে পড়ছে না।মাহিন সেসব নিয়ে ভাবলো না।বরং উপহাস করে বললো,

–“ও মাই গুডনেস!!হাঁটু বয়সী মেয়ে হয়েও এত ঝগরুটে!!আমারই লাক খারাপ। নাহলে গতবার দেশে ফিরতেই আপনার মতো ঝগরুটে মহিলার সাথে দেখা।এবারও দেশে ফিরতেই আপনার সাথেই দেখা।”

জুই রীতিমতো রেগে আগুন। কতবড় সাহস তাকে কিনা ঝগরুটে বলছে!যে কিনা এত শান্ত একটা মেয়ে।রাগে জুইয়ের নাকের পাটা ফুলে উঠছে। জুই নিজের দিকে শাহাদাত আঙ্গুল তাক করে বললো,”আমি ঝগরুটে না!তাহলে আপনি কি?গায়ে পড়া লুচ্চা বেডা।যেই সুন্দরী ইয়াং মেয়ে দেখলেন অমনি বিরক্ত করা শুরু করেছেন।শিক্ষাদীক্ষা কিছুই নেই না?”

এইটুকু একটা মেয়ের কথা শুনে মাহিন আশ্চর্যের চূড়ায়।সে জিহ্বার ডগা দিয়ে গাল ঠেলতে ঠেলতে হেসে বললো,”লাইক সিরিয়াসলি!! আপনার মতো আধা পাগল ঝগরুটে বাচ্চা মেয়ের পিছে আমি ঘুরবে হাহাহা।”

মাহিন নিজের হাসি থামিয়ে চেহারায় গম্ভীর্য এনে জুইয়ের দিকে হালকা ঝুঁকে ঠোঁট বাকিয়ে বললো,”ইউ ক্রেজি গার্ল, ডু ইউ নো হো আই এম?”

মাহিনের কথায় জুই চোখ সরু করে মাহিনের দিকে তাকালো।মাহিন বাঁকা হাসলো।জুই কিছুক্ষণ চুপ থেকে হঠাৎই রাস্তার মানুষদের ডাকতে আরম্ভ করলো।মহূর্তের মধ্যেই জুই আর মাহিনকে পাবলিক ঘিরে ধরলো।জুইয়ের এমন কাজে মাহিন হতবিহ্বল হয়ে গেছে।রাস্তার পাবলিক মাহিনের দিকে রেগে চেয়ে জুইকে বলছে,”আপু কি হয়েছে? এই লোকটা কি আপনাকে বিরক্ত করছে?”

জুই কিছু বলার আগেই কয়েকজন যুবক শার্টের হাতা গোটাতে গোটাতে ক্ষোভে ফেটে পড়ছে,”শালা নষ্ট কোথাকার। বোনের সমান মেয়ের সাথে ইভটিজিং করছিস দেখাচ্ছি মজা….”

সকলের কথা শুনে মাহিন বাকহারা। ছেলেগুলো মাহিনের উপর হামলে পড়ার আগেই জুই বলে উঠলো,”আসলে আপনারা যা ভাবছেন তা না।এই লোকটা নিজের পরিচয় ভুলে গেছে।আমাকে জিগ্যেস করছে উনি কে বলতে? কিন্তু আমি তো উনাকে চিনি না।আপনারা কেউ যদি উনাকে চিনে থাকেন তাহলে দয়া করে উনাকে উনার বাড়িতে পৌঁছে দেন।”

রেগে যাওয়া পাবলিকগুলো মূহুর্তেই মাহিনের প্রতি সহানুভূতি দেখাতে শুরু করলো।কিছু সিনিয়র লোক দুঃখ প্রকাশ করে মাহিনের শরীরে হাত বুলাতে আরম্ভ করেছে।মাহিন হতবাক নয়নে জুইয়ের দিকে চেয়ে। জুই মাহিনকে কপি করে জিহ্বা দিয়ে গাল ঠেলতে ঠেলতে বাঁকা হাসলো।রাগে মাহিন হাত মুষ্টিবদ্ধ করে নিলো।ভীড়ের মধ্যে থেকে একজন লোক বলে উঠলো,

“আরে এই ছেলেটা আমাদের মন্ত্রী সাহেব ইকবাল চৌধুরীর ভাইপো না!!”

মূহুর্তেই আরেক সোরগোল শুরু হলো।যে যুবক গুলো কিছুক্ষণ আগে মাহিনের দিকে তেড়ে আসছিলো তারাই মাহিনের সাথে সেলফি নেওয়া শুরু করেছে।জুইয়ের ব্রু কুঁচকে গেলো ইকবাল চৌধুরীর নাম শুনে।জুই বেশি কিছু ভাবার আগেই ভুম ভুম গর্জন তুলে একটা বাইক এসে থামলো।সকলে সরে দাঁড়াল।তখনই গমগমে মিষ্টি মেয়েলি কন্ঠ ভেসে আসে,

“হোয়াটস রং?”

আগুন্তকঃ বাইক থেকে নেমে সোজা হয়ে দাঁড়াল।উক্ত ব্যক্তির পড়নে লেডি রাইডারদের ব্ল্যাক কালার পোষাক।পায়ে পাঁচ ছয় ইঞ্চির মতো হাই হিল।আগুন্তকঃ মাথার হেলমেট খুলেই জোরে মাথা ঝারলো।ফলে সিল্কি ব্রাউন কালার চুলগুলো পিঠে আচঁড়ে পড়লো।মেয়েটার ফেইস দৃশ্যমান হতেই সকলে হা হয়ে গেলো।অসম্ভব সুন্দর দেখতে মেয়েটা কে?উপস্থিত সকলের মনে প্রশ্ন উঠার আগেই মেয়েটা মুচকি হেসে বলে উঠলো,

“হেই গাইস আ’ম মীরা, মীরা চৌধুরী।ডটার অফ ইহরাম চৌধুরী। “

সকলের সাথে জুইয়ও মেয়েটাকে দেখে অবাক হলো।মেয়েটার চোখের উপর ডার্ক করে আইলাইনার দেওয়া।সবচেয়ে আকর্ষণ কারে থুতনির মাঝখানের কুচকুচে কালো তিলটায়।জুই মেয়েটাকে ভালো করে দেখতে দেখতেই সেখানে মিডিয়ার লোকজন চলে আসলো।তখনই মীরার পিছনে আসা গার্ডসগুলো রিপোর্টার্সদের মাহিন আর মীরার থেকে দূরে সরিয়ে দিলো।মীরা মাহিনের বাহুতে থাপড়ে বললো,

–“ব্রো হোয়াট হ্যাপেন্ড?”

মাহিন মীরাকে ইশারা দিয়ে জুইয়ের দিকে দেখালো।জুই চোখ উল্টে সেখান থেকে চলে যেতে লাগলো।মাহিন তাচ্ছিল্য করে চোখ উল্টিয়ে হেসে বললো,”টোটালি ক্রেজি!”

মীরা জুইয়ের যাওয়ার পানে চেয়ে ঠোঁট প্রসারিত করে হেসে বললো,”রিয়েলি!! বাট সি ইজ টু কিউট।” বোনের কথায় ঠোঁট বাকিয়ে জুইয়ের যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রইলো মাহিন।


ক্লাস শেষ আরও এক ঘন্টা আগে।আমি, তন্নি,সুমাইয়া আর নাফিয়া টিএসসি ক্যাফেটেরিয়ায় বসে গল্পগুজব করছি।তন্নি আর সুমাইয়া চিপস শেয়ার করে খাচ্ছে।নাফিয়া লেমন জুস খাচ্ছে।আমি খাচ্ছি কোণ আইসক্রিম।আমি আইসক্রিমের কাগজ সরিয়ে দ্বিতীয় একটা কামড় বসালাম।তন্নি চিপস মুখে পুরে বললো,

–কি রে তর জামাইয়ের কি খবর?

আমি আইসক্রিমে আরেকটা কামড় বসিয়ে মনযোগ দিয়ে খেতে খেতে উত্তর করলাম,

–কেন আমার জামাই দিয়ে তোর কি কাজ?

তন্নি হেয়ালি করে বললো,”ওমা আমার কাজ থাকবে কেন?কাজ তো তোর।আহারে তিন মাস ধরে জামাইয়ের আদর না খেতে খেতে আমার বান্ধুপীটা কত শুকিয়ে গেছে!!”

“চোন খাবা।”

আমার কথা শুনে সুমাইয়া আর নাফিয়া উচ্চ স্বরে হেসে দিলো।তন্নি নাক ছিটকে বললো,”বোইন তর মুখ এত খ্রাপ কেন?মাঝেমধ্যে তো একটু ভালো করেও কথা বলতে পারিস, নাকি!”

তন্নির কথা শুনে জিহ্বার ডগা দিয়ে গাল ঠেলতে ঠেলতে ওর দিকে তাকালাম।অতঃপর বাকা হেসে ডিপ ভয়েসে হিসহিসিয়ে বললাম,”কাছে আস।”

তন্নি ভাবুক চেহারা নিয়ে জিগ্যেস করলো,”কেন?”আমি চোখ মে’রে বললাম,”একটু হাত মারি।”

আমার বাক্যটা শেষ হতে না হতেই তন্নি ছিটকে আরেকটু দূরে সরে গেলো__বুকে আড়াআড়ি ভাবে দুহাত ধরে।সুমাইয়া নাফিয়া হাসতে হাসতে গড়াগড়ি খাচ্ছে।তন্নি নাকমুখ কুঁচকে বললো,”শালি ভালো হয়ে যাও।ভালো হতে টেকা লাগে না।”

আমি হাসলাম।তখন সুমাইয়া আমতা আমতা করে বললো,”তোর জামাই দেশে কবে আসবে রে?” আমি চোখ সরু করে সুমাইয়ার দিকে তাকিয়ে একটা ব্রু উঁচিয়ে বললাম,
— “আমার জামাই নিয়ে তোদের যতো প্যানিক; আমার জামাইয়ের সাথে টি-টোয়েন্টি ম্যাচ খেলার সময়ও এত প্যানিক ওঠে না!!”

আমার বাক্যটা শেষ হতে না হতেই তিনজনেরই কাশি উঠে গেলো।আমি ওদের এমন অবস্থা দেখে ঠোঁট কামড়ে হেসে বাকি আইসক্রিম টুকু আয়েশ করে খেতে লাগলাম।
কিছুক্ষণ চারজন যারযার মতো খেলাম।আমাদের মধ্যে নিরবতা ভাঙলাম আমি,
–কিরে নাপি তর না কার সাথে রিলেশন ছিলো?

আমার কন্ঠ নাফিয়ার কর্ণধার হতেই মুখের খাবার গিলতে গিয়ে গলায় আটকে যায়।তন্নি নাফিয়ার পিঠে হাত বুলিয়ে দিতে থাকে।আমি পিজ্জার পিসটা প্লেটে রেখে সুমাইয়ার দিকে চোখ সরু করে তাকিয়ে নাফিয়ার হাতে পানির গ্লাস তুলে দিতে দিতে বললাম,”কি সমস্যা!দেখেছিস একজনের গলায় খাবার আটকে গেছে। কই পানির গ্লাস দিব। তা না করে চোরের মতো মুখ লুকচ্ছিস!!”

সুমাইয়া আমতা আমতা করতে লাগলো,”ধু ধু ধুর কি যে বলছিস!!” আমি নাফিয়ার দিকে মনযোগ দিলাম,”তর কি খবর রে?কি আকাম-কুকাম করছস হুম?”

নাফিয়া হাতের উল্টা পিঠ দিয়ে কপাল-গলার ঘাম মুচতে মুচতে বললো,”তুই না জাহান বদলাবি না কোনোদিন!!হঠাৎ এমন এমন আজগুবি কথা ছাড়িস যে হার্ট অ্যাটাক হতে হতে বেঁচে যায়।”


এয়ারপোর্ট থেকে পরপর সাতানব্বইটি কালো মার্সিডিজ বেড়িয়ে গেলো।সকলেই এই দৃশ্য দেখে আশ্চর্যের চূড়ায়। সাংবাদিকরা ছুটে ছুটে নিউজ করছে।সাধারণ জনগণ নিজেদের মুঠো ফোনে বাংলাদেশে এই আশ্চর্যজনক দৃশ্য ক্যামেরা বন্দী করতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে।
মার্সিডিজগুলো একটার পর একটা সমান বেগে ছুটছে।প্রথম কালো মার্সিডিজটা সর্বোচ্চ বেগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্ট্রাল গেইট ক্রস করতেই বাকিগুলোও ক্রস করে পিছনে ছুটলো।

আমরা চার বান্ধবী খেতে খেতে কিছুক্ষণ আড্ডা দিয়ে ক্যাফেটেরিয়া থেকে বেড়িয়ে আসলাম।বাইরে ছেলেমেয়েরা গ্রুপ করে ফ্রেন্ড সার্কেলদের সাথে মাঠে বসে আড্ডা দিচ্ছে।কিছু ছেলেমেয়েরা একজন আরেকজনকে ধরার জন্য ছুটাছুটি করছে।আমরা যখন কথা বলতে বলতে মাঠের মাঝখানে পৌঁছালাম তখনই হঠাৎ ঝড়ের মতো এক এক করে সব মার্সিডিজ ক্যাম্পাসের লবিতে প্রবেশ করতে শুরু করল।তৎক্ষনাৎ মাঠের উপস্থিত সকলে এদিক ওদিক ছুটাছুটি শুরু করে মাঠ ত্যাগ করলো।
মার্সিডিজ গুলো না থেমে আমাকে ঘিরে মাঠের চারপাশে একটা রাউন্ড দিতে লাগলো।বাতাসে ধুলোবালি তে সব কিছু ঢাকা পড়ার অবস্থা।আমি নাকের কাছে হাত নাড়িয়ে শ্বাস টানতে লাগলাম।চোখ ধুলো ভর্তি হয়ে গেছে। আশেপাশে কিছুই দেখা যাচ্ছে না।শুধু এতএত গাড়ির শব্দই কানে আসছে।

প্রথম গাড়িটা আমাকে মাঠের মাঝখানে রেখে চারদিকে চক্কর দিয়ে আমার থেকে কিছুটা দূরে গিয়ে থামল।বাকি মার্সিডিজগুলো সারি বেঁধে ক্যাম্পাস লবীতে গিয়ে দাঁড়াল।আমি চোখ পিটপিট করে সেদিকে তাকাতেই দেখলাম পিছনের ছিয়ানব্বইটা গাড়ির ডোর এক সাথে খুলে স-অস্র হাতে কালো পোশাকধারী লোক দ্রুত বেড়িয়ে আসছে।শত শত গার্ডস মূহুর্তেই আসেপাশ ঘিরে ধরলো।প্রথম মার্সিডিজের ফ্রন্ট সিট থেকে বেড়িয়ে আসলো ইনান খন্দকার।সে নেক টাই টা নড়াচড়া করে বেক সিটের ডোর খুলে দিলো।তৎক্ষণাৎ সেখান থেকে এক পা জমিনে রেখে মার্সিডিজ থেকে বেড়িয়ে আসলো ইফান চৌধুরী। মূহুর্তেই আসেপাশে ছেলেমেয়েরা উল্লাসে ফেটে পড়লো।
ইফানের সারাদেহ কালোতে মোড়ানো।চোখে রোদ চশমা,মুখে কালো মাস্ক।সে গাড়ি থেকে নামতেই দু’জন গার্ড ওকে লং কোট পড়িয়ে দিলো।আরেকজন গার্ড তার হাতে লাল গোলাপের তোড়া তুলে দিলো।ইফান সেটা হাতে নিয়ে সামনে আমার দিকে তাকালো।

আমি শক্ত চেহারা নিয়ে মাঠের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছি।সূর্য ঠিক মাথার উপরে থাকায় গরমে আমার ফর্সা ত্বক লাল বর্ণ ধারন করেছে।আমার পড়নে ব্ল্যাক ফুল-স্লিভ হাতার ব্লাউজের সাথে অলিভ গ্রিন কালার শাড়ি।মাথার মাঝখানে সিঁতি তুলে সবগুলো চুল খোপা করে বাঁধা।কিছু বাবরি চুল সিঁতির দুপাশে পড়ে আছে।ঠোঁটে হালকা ডিপ রেড কালার লিপস্টিক।ইফান দূর থেকে আমাকে দেখে চোখের সানগ্লাসটা ছুড়ে মারলো।সাথে সাথে ইনান ক্যাচ ধরে নিলো।ইফানের চোখে হাসির ঝলক দেখা যাচ্ছে।ইফান হাতের বুকেট টা নাকের কাছে এনে শ্বাস টানল।অতঃপর আমার দিকে এগিয়ে এগিয়ে আসতে আসতে দু’হাত মেলে ধরে বিরবির করলো,

“আমার বুলবুলি…”

তারপর মুখের মাস্কটা খুলে ফেলে দিয়ে ঠোঁটে হাত লাগিয়ে ফ্লাই কিস দেখালো।

আমি অনুভূতিহীন তার দিকে তাকিয়ে।এদিকে ইফানকে দেখা মাত্রই নাফিয়া মুখে উড়না ধরে নিজেকে আড়াল করার চেষ্টায়।সুমাইয়া দৌড়ে পালাতে চাইলো কিন্তু তন্নি ওর হাত ধরে থাকায় তাও করতে পারছে না।
ইফান আমার কাছে এসেই বুকেট ধরে রাখা হাতটা আমার কোমড় জড়িয়ে ধরে।অপর হাতটা আমার ঘারে ধরে কোনো পূর্বাভাস না দিয়ে ওষ্ঠে হামলে পড়লো।আমি স্তব্ধ।পুরো ভার্সিটির কেন্দ্র বিন্দু আমি আর ইফান।আসেপাশের মানুষ মুখে হাত ধরে চিৎকার করতে করতে ইফানকে চিয়ারআপ করতে শুরু করেছে।এদিকে ইফানের ঠোঁটের প্রকোপে আমার দম বন্ধ হয়ে আসার উপক্রম। এতদিন ভার্সিটিতে নিজের যতটুকু ইমেজ ছিলো আজ ইফান তাও শেষ করে দিলো।
তিনমাস পর আমার সংস্পর্শ পেয়ে ইফান বন্য পশুর মতো আচর শুরু করেছে।ঠোঁটের ভাজে ভাজে গাঢ় চুম্বন আঁকতে আঁকতে দাঁত বসিয়ে দিচ্ছে।আমি এমতাবস্থায় নিজেকে ছাড়াতে দু’হাতে ইফানের কলার চেপে ধরলাম।কোনো মতে কয়েক ন্যানোমিটার সরিয়ে জোরে জোরে দম ফেলতে ফেলতে ছাড়লাম এক অশ্রাব্য গালি,

“গোলা*মের পুত সবাই দেখছে…”

আমার বাক্য শেষ হতে না হতেই ইফান আবারও ঠোঁটে ডুব দিলে।সেভাবেই এক হাত নাড়িয়ে ইশারা করতেই প্রায় আটশত গার্ড নিজেদের রাইফেল সকলের দিকে তাক করতেই সবাই চোখ নিচে নামিয়ে হইচই বন্ধ করে দিলো।পুরো ক্যাম্পাস নিরবতায় ছেয়ে গেছে।নাফিয়া তন্নির পিছনে ওড়না দিয়ে মুখ ঢেকে লুকিয়ে। সুমাইয়া চোখ খিচকে হাতের নখ কামড়ে যাচ্ছে। তন্নি লজ্জায় ঠোঁট কামড়ে নিচের দিকে তাকিয়ে আছে।
ইফান আমার ঠোঁটে সুধা আহরণ করতে করতে এক হাত আমার শাড়ির উন্মুক্ত উদরে ঢুকিয়ে বেলি বটামের নিচে স্পর্শ কাতর অংশে চাপ বসাতে লাগলো।প্রায় দশমিনিট হয়ে গেলো।আমি গোঙ্গাতে গোঙ্গাতে ইফানের বুকে কিল ঘুষি দিতে লাগলাম।নিজেকে ছাড়াতে ব্যর্থ হয়ে ওর পায়ে জোরে লাথি মারলাম।ইফান তৎক্ষনাৎ আমার ঠোঁট ছেড়ে ঠোঁটের আসপাশের লালা জিহ্বা দিয়ে আহরণ করে নিলো।অতঃপর হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে মুছতে মুছতে বিরক্তি নিয়ে বললো,,,,

“বান্দির বাচ্চা,তিনমাস আমি না থাকায় পাঙ্খা গজিয়েছে না?”

আমি ইফানের কথায় কান না দিয়ে রাগে রিরি করতে করতে আসেপাশে তাকিয়ে দেখলাম। না, কেউ আমাদের দিকে তাকিয়ে নেই। সকলে নিচের দিকে তাকিয়ে আছে।আমি ইফানের দিকে ঘুরে তাকাতেই দেখলো আমার ঠোঁটের আসেপাশে লিপস্টিক ঘটে একাকার।গরমে ক্লান্ত মুখস্থি আলাদা সৌন্দর্য তুলে ধরছে।বাবরি চুলগুলো ঘামে ভিজে চোখে মুখে লেপ্টে গেছে। ইফান ঢোক গিলে বুড়ো আঙুল দিয়ে আমার ঠোঁটের আসেপাশের লেপ্টে থাকা লিপস্টিক মুছতে মুছতে হাস্কি স্বরে আওড়ালো,
–“বুলবুলি আজ রাতে তোমায় আরও এলোমেলো করে দিব জান নিজেকে আমার থেকে আড়াল করে,আমাকে জ্বালিয়েছ না!!আজ তার শাস্তি ভালোভাবেই পাবে।”

এত এত মানুষের মাঝে কথা বাড়াতে চাইলাম না।তাই ইফানকে সাইট কাটিয়ে চলে যেতে নিলেই ইফান আমার হাতে টান মেরে নিজের শক্তপোক্ত বক্ষে এনে ফললো।আমি শান্ত চেহারা নিয়ে শক্ত কন্ঠে বললাম,”নাটক ভালোই হয়েছে। তবে এসব আমার সাথে দেখিয়ে লাভ নাই।ছাড় আমাকে।”
আমার কথায় ইফান বিরক্তি নিয়ে চ বর্গীয় শব্দ উচ্চারণ করে বললো,”ধরার আগেই ছাড় ছাড় করার অভ্যাসটা কবে যাবে বউ?”
আমি উত্তর করার আগেই ইফান কোমল কন্ঠে বলে উঠলো, “বাদ দাও জান।এই দেখ,,,”
আমি ইফানের ইশারা অনুযায়ী সেদিকে তাকালাম।ইফান লাল গোলাপের বোকেটটা আমার সামনে ধরে বললো,”This is for you, babe.”
বুকেটটা এক নজর দেখে ইফানের দিকে চোখ সরু করে তাকালাম।ইফান ঠোঁট বাকিয়ে হেসে আমার গালে শব্দ করে চুমু খেয়ে বললো,”আজ আমাদের বিয়ের ৩৪১ দিন পূর্ণ হলো।৩৪১ দিনের এনিভার্সারি উপলক্ষে তোমার জন্য ৩৪১ টি রেড রোজ বেইবি।”

ইফানের কথায় বেশ মজা পেলাম।তাই নিচের ঠোঁট উল্টে চাপা হাসলাম।অতঃপর একটা ফুলে এক আঙ্গুল টাচ করে উপহাস করে বললাম,”বেশ ভালো।তবে রোজ গুলো কালো হলে আরও ভালো হতো।বিকজ আমার জীবনে আপনি আসার পর সব রং হারিয়ে গেছে।”
ইফান আমার থুতনি উপরে তুলে হিসহিসিয়ে বললো,”তার মানে তুমি সত্যিই আমার হয়েছো।”

“হাহাহা তাই নাকি।আচ্ছা ভালো।এবার সামনে থেকে সরে দাঁড়ান।”

ইফান আমাকে কিছু বলতে যাবে তখনই বেখেয়ালি চোখ আটকায় সুমাইয়ার উপর।সুমাইয়া আড় চোখে এদিকে তাকাতেই ইফানের সাথে চোখাচোখি হয়। ইফান একটা ব্রু উঁচিয়ে বাঁকা হেসে বলতে লাগলো,

❝সুমাইয়ারে সুমাইয়া,রাইতে থাকে ঘুমাইয়া
দিনে থাকে চাইয়া মেম্বরের মাইয়া…..❞

সুমাইয়া ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে ভয়াতুর ঢোক গিললো।ইফান আমার উপর ঝুঁকে হেয়ালি করে বললো,
–“এটা মেম্বরের ছোট মাইয়াটা না বউ?শালি লুচ্চির সাথে তোমার কি!!”
আমি ইফানের কথায় কান না দিয়ে সুমাইয়ার দিকে তাকালাম। সুমাইয়া কাঁদো কাঁদো চেহারা দেখিয়ে বুঝাতে চাইলো সে কিছু জানে না।রাগে আমার শরীর রিরি করছে।সুমাইয়া আমাকে কিছু বুঝাতে না পেরে নাফিয়ার দিকে তাকালো।নাফিয়া ওড়না দিয়ে মুখ ঢেকে রেখেছে।চোখে সুমাইয়াকে ইশারা করছে তার দিকে না তাকাতে।ইফান সুমাইয়ার দৃষ্টি অনুযায়ী সেদিকে তাকাতেই হেসে দিয়ে ছন্দ আকারে বললো,

❝আরে এই তো দেখা যায় নাফিয়া
মুখ রেখেছে ঢাকিয়া
চোখ দুইটা খোলা,রাস্তায় দেখে পোলা
শইল্লো নাই শরম, সাউ*য়া ভরা গরম…❞

ছ্যা বউ, শেষে কিনা এই শালিগুলোরে নিজের ফ্রেন্ড বানিয়েছ।দুটোই সস্তা জিনিস।

আমি আর পারছি না।ইফান এসব কি বলছে!!আমি ঠোঁট ভিজিয়ে নাফিয়ার দিকে তাকালাম। নাফিয়া বাচ্চাদের মতো চেহারা করে ফেলেছে। চোখ দু’টোতে পানি ঝলঝল করছে।এই বুঝি গড়িয়ে পড়লো।নাফিয়া মাথা নাড়িয়ে বুঝাচ্ছে, “তুই যা ভাবছিস তেমন কিছু না।”
নাফিয়া আর সুমাইয়ার কথা আমি শুনতেও চাইলাম না।বুঝতেও চাইলাম না।মনটা ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেলো।শেষে কিনা আমার বান্ধবীর সাথে আমার স্বামী……..
আমি আচমকা বলে উঠলাম,”ছিহ্‌!!”
ইফান আমাকে ধরতে নিলেই দূরে সরে দাঁড়ালাম।ইফান উতলা হয়ে বলে উঠলো,
–“সুইটহার্ট লিসেন টু মি।”

আমি ঘৃণা নিয়ে ইফানের থেকে মুখ ফিরিয়ে বলে উঠলাম,”ডোন্ট টক টু মি।আই জাস্ট হেইট ইউ।” তখনই সুমাইয়া নাফিয়া হাউমাউ করে বাচ্চাদের মতো কেঁদে দিয়ে বলতে লাগলো,”জাহান তুই যা ভাবছিস তা না……..”
আমি বাকি কথা শুনলাম না।বরং ঘৃণিত চাহনিতে তাকিয়ে শক্ত কন্ঠে বললাম,”আমার সাথে তোরা আর কোনোদিন কথা বলবি না।তোদের সাথে আমার সম্পর্ক এখানেই শেষ। “
সুমাইয়া নাফিয়া আমার কাছে ছুটে আসতে নিলেই আমি মুখ ফিরিয়ে চলে যেতে লাগলাম।ওরা দুজনকে তন্নি ধরে নিয়ে অন্যদিকে চলে গেলো।এদিকে ইফান জিহ্বা দিয়ে গাল ঠেলতে ঠেলতে বাঁকা হেসে বললো,

–“উফফ, আমার ঝাঁঝওয়ালি এতক্ষণে নিজের ফর্মে এসেছে।”


আমি ভার্সিটি থেকে বেড়িয়ে আসতেই আলাল দুলাল আমার পিছু নিলো।আমি পিছনে ফিরে কোমরে হাত ধরে তাকাতেই আলাল নিজের কাতলা কাতলা দাঁতগুলো বের করে দিলো।দুলাল ঠোঁট ভিজিয়ে হাতের বোতলটা সামনে ধরে বুঝালো,”ভাবি পানি খাবেন।”
আমি কিছুক্ষণ সরু চোখে ওদের দেখে পায়ের জুতা টা খুলে ছুড়ে মারলাম ওদের দিকে।আলাল দুলাল সাথে সাথে দুই পাশে সরে যেতেই পিছনে আসতে থাকা ইফানের মুখে পড়তে নিলেই ইফান ক্যাচ ধরে ফেললো।
ইফান চোখ সরু করে জুতাটাকে দেখে আমার দিকে তাকিয়ে হাসলো।অতঃপর আমার কাছে এসে মাঝ রাস্তায় হাঁটু ভেঙে বসে পড়লো।আমি কিছু বুঝার আগেই আমার পায়ে জুতাটা পড়িয়ে দিলো।আমি ইফানের থেকে নিজের পা সরিয়ে রাস্তায় হাঁটা ধরলাম।ইফানও নিঃশব্দে আমার পিছু নিলো।আমি কিছুটা রাস্তা হেঁটে আচমকা দাঁড়িয়ে পড়লাম। তারপর পিছনে তাকিয়ে দেখলাম ইফান পকেটে দু’হাতে গুঁজে দাঁড়িয়ে আছে।ওর পিছনে তাকাতেই দেখলাম অস্র হাতে কয়েকজন গার্ড দাঁড়িয়ে।আমি তপ্ত শ্বাস ছেড়ে বললাম,

–“আমাকে ফলো করবেন না।”

–“গো আহেড।”

ইফানের থেকে নির্লিপ্ত উত্তর ভেসে আসলো।আমি আর কিছু না বলে রাস্তা ক্রস করে ঐপাড়ে চলে গেলাম।অনুভব করতে পারছি ইফান আমার পিছনেই।আমি আর কথা না বাড়িয়ে অটোরিকশা নিয়ে নিলাম।অটোরিকশা স্টার্ট দেওয়ার আগেই আচমকা আমার পাশে ইফান এসে বসে পড়লো।আমি চেচিয়ে উঠলাম,
–এটা আমি ভাড়া নিয়েছি। আমি একাই যাব। আপনাকে নিব না।

ইফান ঠোঁট কামড়ে হাসলো।ইফানকে দেখা মাত্রই ড্রাইভার ভয়ে শুকনো ঢুক গিললো।অটোরিকশার পিছনে ইফানের গার্ডদের তিনটা গাড়ি দাঁড়িয়ে।ড্রাইভার কিছু না বলেই গাড়ি স্টার্ট দিলো।আমি ইফানের থেকে দৃষ্টি সরিয়ে ড্রাইভারকে ধমকে উঠলাম,
–“কি আশ্চর্য হ্যাঁ!!দেখছেন ঝামেলা হচ্ছে তাহলে গাড়ি স্টার্ট দিলেন কেন?”

–“রিলাক্স জান।”

ইফানের শান্ত কন্ঠ শুনে আমি ওর দিকে খ্যাপা চোখে তাকিয়ে ড্রাইভার কে আবারও ধমকে উঠলাম,”আমি আপনার গাড়ি দিয়ে যাব না।গাড়ি থামান।”

ড্রাইভার পড়েছে মহা বিপদে।ইফানের দিকে তাকাতেই ইফান ইশারা করলো আমার কথা শুনতে।ড্রাইভার গাড়ি থামাতেই আমি ধপ করে নেমে অন্য অটোতে উঠে পড়লাম।ইফান আসার আগে তাড়া দিয়ে বললাম,
–“ভাইয়া তাড়াতাড়ি গাড়ি ছাড়েন।আমি উত্তরায় যাব।”

ড্রাইভার গাড়ি ছাড়লো না।বরং চুপচাপ বসে রইলো। আমি রেগে বলালম,
–“আপনি কি যাবেন নাকি আমি নেমে যাব?”

আমার কথা শেষ হওয়ার আগেই ইফান এসে আমার পাশে বসল।আমি গাড়ি থেকে নেমে যাওয়ার জন্য উদ্ধত হলেই অটোরিকশা আচমকা ছেড়ে দিলো।আমি তাল সামলাতে না পেরে পড়ে যেতে নিলে ইফান ধরে নিজের সাথে মিশিয়ে নেয়।আমি ওকে ছাড়িয়ে দূরে সরে বসলাম।অতঃপর রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে ড্রাইভারের উপর চেচিয়ে উঠলাম,
–“গাড়ি থামান।”

ড্রাইভার গাড়ি থামালো না।বরং আগের ড্রাইভারের মতো ভয়ে জড়সড় হয়ে আছে।আমি পুনরায় চেঁচিয়ে উঠার আগেই ড্রাইভার বলে উঠলো,
–“ম্যাডাম আপনার জন্য অটো স্টেশনের সব অটোরিকশাই স্যারের ভাড়া করা।বাইরে তাকায়া দেহেন হগ্গলে আমার অটোরিকশার দিকে চায়া আসে।আপনি যতক্ষণ পর্যন্ত এইখান থাইকা না যাইবেন ততক্ষণ পর্যন্ত ওরা ওদের গাড়িতে প্যাসেন্জার তুলবো না।”

আমি ইফানের দিকে চোখ রাঙিয়ে তাকাতেই ইফান ঠোঁট গোল করে চুম্মা দেখালো।আমি বুঝলাম ওর সাথে এভাবে পেরে উঠবো না।তাই কথা না বাড়িয়ে আরেক পাশে তাকিয়ে রইলাম।


পনেরো মিনিট ধরে অটোরিকশা সমান্তরাল রাস্তা দিয়ে ছুটছে।এখন আর গরম লাগছে না।প্রকৃতির ঠান্ডা হাওয়ায় চোখ জুড়িয়ে আসছে।তবুও ভিষণ অস্বস্তি হচ্ছে। কারণ সেই পনেরো মিনিট ধরে ইফান আমার দিকে পলকহীন তাকিয়ে। আমি ওর দিকে এক বারো তাকাইনি। তবে বেশ ভালো অনুভব করতে পারছি।গাড়ির বেগের সাথে বাতাসের বেগেও বাড়ছে। আমার বাবরি চুলগুলো চোখে মুখে আঁচড়ে পরছে।আমি এতে বেশ বিরক্ত।কতবার কানে গুঁজে দিয়েছি তবুও অবাধ্যের মতো বিরক্ত করছে।আমার কুঁচকে যাওয়া মুখ দেখে ইফান ঠোঁট কামড়ে হাসলো।তারপর দুই আঙ্গুল আমার কপালে আল্ত ছুঁতেই আমি আঁতকে উঠলাম।
ইফান আবারো হাসলো।সে আল্ত হাতে আমার অবাধ্য চুলগুলো কে কানে গুঁজে দিলো।আমি ওর থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে রাস্তার দিকে তাকিয়ে রইলাম।ফ্রন্ট মিররে চোখ পড়তেই দেখলাম, এখনো আমাদের পিছনে ইফানের গার্ডদের দু’টো গাড়ি আসছে।আমি চোখ বন্ধ করে তপ্ত শ্বাস ছাড়তেই অনুভব করলাম আমার ঘারে কারো তপ্ত শ্বাস আঁচড়ে পড়ছে।আমার বুঝার বাকি নেই এটা কে?আমি শাড়ির আচল খামছে ধরলাম।ইফান আমার কানে ঠোঁট ছুঁইয়ে হাস্কি সরে হিসহিসিয়ে বললো,
–“তোমার নিরবতা আমাকে বারবার ভাবায়।”

আমি কোনো প্রতিত্তর করলাম না।

ইফান আগের মতো করে হিসহিসিয়ে বললো,”তুমি খুব ঠান্ডা মাথার কিলারি, ডিয়ার।”

আমি চোখ খুলে নিজের হাতের দিকে তাকিয়ে শান্ত কন্ঠে বললাম,”আপনি তো এখনো জীবিত। তাহলে আর কাকে মারলাম?”

ইফান হাসলো।অতঃপর নাক টেনে আমার চুলের ঘ্রাণ নিয়ে হিসহিসিয়ে বললো,”শুধু দেহেরই খুন হয় না,আত্মারও হয়।”

ইফানের মতো আমিও হাসলাম।শাড়ির আঁচল নিয়ে খেলতে খেলতেই ফিসফিস করে বললাম,”তাহলে তো আমার আত্মার খুন বহু আগেই হয়ে গেছে। শীগ্রই দেহেরটাও হবে।আপনার স্পর্শে আপাতত ক্ষতবিক্ষত।”

ইফান ঢোক গিললো।অতঃপর আমার থেকে সরে বসলো।খানিকটা সময় নিরবতা বিরাজ করলো।তা ভেঙে ইফান বললো,
–“একবারও তো খবর নাও নি!”

–“নেওয়ার কথা ছিলো?”

ইফান সিটে গা ছেড়ে দিয়ে হেসে বললো,”হয় তো না।”
আমাদের কথার মাঝে হটাৎই আমার নজর পড়লো রাস্তায়।এটা তো আমাদের বাসার রাস্তা না!আমি তৎক্ষনাৎ ড্রাইভার কে বলে উঠলাম,
–“আপনি গাড়ি নিয়ে কোন দিকে যাচ্ছেন।এটা,,,, “

বাকি কথা সম্পন্ন করার আগেই ড্রাইভার বলে উঠলো, “ম্যাডাম স্যার বলছে এদিকে যেতে।” আমি ইফানের দিকে রেগে তাকিয়ে প্রশ্ন করলাম,
–“কোথায় নিয়ে যাচ্ছ আমায়?”

ইফান চোখ বন্ধ করে গা ছাড়া ভাব নিয়ে প্রতিত্তর করলো,”আজ তোমাকে নিয়ে হারাতে ইচ্ছে করছে।”

চলবে,,,,,,,,,,

(পড়ে গঠনমূলক মন্তব্য করো।তোমাদের প্রতিটি কমেন্ট আমাকে লিখতে উৎসাহ দেয়।হ্যাপি রিডিং 🥹💞)

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply