Golpo romantic golpo জাহানারা

জাহানারা পর্ব ১৭+১৮


জাহানারা

জান্নাত_মুন

পর্ব : ১৭
🚫ক’পি করা নিষিদ্ধ

🔞 সতর্কবার্তা:
এই গল্পে অ’কথ্য ভাষা এবং স”হিং’সতার উপাদান রয়েছে। ১৮ বছরের কম বয়সী বা সং’বে’দনশীল পাঠকদের জন্য উপযুক্ত নয়। পাঠক নিজ দায়িত্বে পড়বেন।

অধীর অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে আকাশের জমে থাকা কালো মেঘগুলো প্রকৃতির ডাকে সাই দিয়েছে। আজ মাগরিবের পর থেকেই ভারী বর্ষণ শুরু হয়েছে। আমি সেই বিকেলবেলা থেকেই দাদির কাছে বসে আছি। নাবিলা চৌধুরী আর নুলক চৌধুরী আমি আসার পর রুমে চলে যায়। কাকিয়া কাজের মহিলা লতাকে নিয়ে রান্নাঘর সামলাচ্ছে। ইতির কিছুদিন পর মাধ্যমিক পরীক্ষা শুরু হবে। তাই মেয়েটা আজকাল পড়াশোনায় মনোযোগ দিয়েছে।এদিকে পলি একবার রান্না ঘরে আরেকবার আমাদের কাছে, তো আবার মেইন ডোরের দিকে উঁকি ঝুঁকি দিচ্ছে। সকাল থেকেই মেয়েটার মুখটা কেমন মলিন হয়ে ছিলো। দাদি তছবি জপছে খতম দিবে বলে। আমি আর পলিও দাদির পাশে বসে তছবি হাতে নিয়ে গুনছি। ওর চিন্তিত মুখ দেখে জিজ্ঞেস করলাম,
–“কিছু কি হয়েছে পলি? সকাল থেকে এমন মনমরা হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছ।”

–“না ভাবি তেমন কিছু না। আসলে তোমার দেবর কাল রাত থেকে বাসায় আসে নি। বলে গিয়েছিল দুপুরে চলে আসবে। আর এখন সন্ধ্যা হয়ে গেছে অথচ এলো না।”

–“ওমা, ইমরান কাল রাত থেকে বাসায় নেই কেন? আমাকে তো কিছু বললে না।”

আমার কথা শুনে তছবি জপা থামিয়ে দাদি বললো,
–“বড় নাত বউ, ও তেমন কোনো বিষয় না। তুমি তো জানই আমার বড় ছেলেটার রাজনৈতিক কাজে ইফানের চেয়ে বেশি ইমরান সাহায্য করে। ঐ কারণেই কয়েকদিন পর পর এই জায়গা ঐ জায়গা যেতে হয়।”

দাদির কথার পিছে পলিও বলে উঠলো ,
–“ও টায় তো আমার ভীষণ ভয় করে। আজকাল ভালো মানুষ কে খা’রাপ মানুষ পেয়ে বসে। মানুষ টা তো আর ইফান ভাইয়ের মতো এত সাহসী না। এক মিনিট দেরী করে কল ধরলেই আমার অন্তর আত্মা শুকিয়ে যায়। আর মানুষটা রাত থেকে কল ধরছে না।দুপুরে খবরে দেখলাম, বিরোধী দলের সাথে আমাদের দলের কিছু লোকদের মধ্যে মা’রামারি হয়েছে। আমার তো ভীষণ ভয় করছে।”

আমি পলির মনের অবস্থা বুঝতে পেরে সান্ত্বনা দিলাম,
–“এত চিন্তা করো না। ইফানও সকালে বেরিয়েছে। বের হওয়ার আগে ভীষণ রে’গে ছিলো। এখন মনে হচ্ছে হয়তো এসব কারণেই। আমার মনে হয় দুই ভাই এক সাথে আছে।”

আমার কথা শুনে পলি আমার মুখের দিকে তাকিয়ে বেশ কিছুক্ষণ ভেবে বললো,
–“কিন্তু ভাবি সকালে তো ভাইয়া কে নোহাকে নিয়ে বের হতে দেখলাম। এখনো তো নোহা বাসায় ফেরে নি। হয়তো ভাইয়ার সাথেই আছে।”

পলির কথা শুনে আমি আশ্চর্য হয়ে গেলাম। কিছুক্ষণ পলির দিকে তাকিয়ে থেকে দাদির দিকে তাকালাম। দাদি আমার দিকেই তাকিয়ে ছিলো। আমি তাকাতেই কেমন অপ্রস্তুত হয়ে চোখ সরিয়ে তজবি জপায় মন দিলো। নোহা মেয়েটা আমার স্বামীর সাথে আছে কথাটা শুনেই রা’গে শরীর কাঁপতে শুরু করলো। নিজেকে কোনো মতে সামলে বললাম,
–“ঐ মেয়েটা সকাল থেকে এখনো আমার স্বামীর সাথে আছে। এই কথাটা কি আমার জানার অধিকার ছিলো না? নাকি জানানোর প্রয়োজন মনে করনি?”

আমার কথা শুনে পলির মনটা আরো খা’রাপ হয়ে গেলো। সে আমার একহাত তার দু হাতের মুঠোয় নিয়ে অপরাধী ন্যায় বলে,
–“আমি ভেবেছিলাম তুমি হয়তো জান। পরে যখন দাদি বললো তোমাকে কিছু না বলতে। এটা শুনে যদি তুমি কষ্ট পাও। আমিও পরে ভাবলাম দাদির কথায় ঠিক। এমনিতেই তোমার মন ভালো থাকে না। তার উপর এটা শুনে যদি আরও কষ্ট পাও।”

আমি আর কিছু বললাম না। সময় হোক ইফান চৌধুরীর থেকে সকল হিসাব সুদে আসলে তুলবো। এর পরপরই ইমরান কাক ভেজা হয়ে বাসায় ফিরে।তাই পলিও তখন ইমরানের কাছে চলে যায়।


সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে বৃষ্টির বেগ বেড়েই চলছে। ক্ষণে ক্ষণে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। এমন ঝর বৃষ্টির রাতে কাচা মাটির সেঁতসেঁতে সরু রাস্তা দিয়ে প্রাণপণে দৌড়াচ্ছে একটা লোক। চারিদিকে ঘুটঘুটে অন্ধকার তার মধ্যে বেশ দূরের একটা ল্যাম্পোস্টের ক্ষীণ হলদে আলো আর বিদ্যুৎ চকমকানোর ফলে কয়েক সেকেন্ডের জন্য দৃশ্যমান হচ্ছে লোকটার সম্পূর্ণ দেহাবয়ব। সাদা রঙের শার্টটি র’ক্তে বারংবার রঞ্জিত হলেও বৃষ্টির পানি ধুয়ে শরীর থেকে গড়িয়ে পড়ছে।দৌড়ানোর মাঝে মাঝে বাম পা টা আচমকা ব্যালেন্স হারিয়ে ফেলছে। তবে লোকটা থামছে না। গু’লিবিদ্ধ পা টা কে নিয়েই স্বজোরে দৌড়াচ্ছে। লোকটার মুখে আ’তঙ্কের কালো ছায়া নেমে এসেছে। থামলেই বুঝি আজ তার জীবনের কাহিনি শেষ।

অনেকক্ষণ দৌড়ে হাঁপিয়ে পড়ে লোকটা। দু হাঁটুতে ভর দিয়ে হাঁপাতে থাকে। এক দু মিনিটের মাথায় পিছন দিক থেকে তেরে আসে আরো তিনটা লোক।প্রত্যেকের হাতেই অ’স্ত্র। আ’ক্রমণকারীর আওয়াজ কানে আসতেই পেছনে তাকায় লোকটা। ভয়ে লোকটার অন্তর আত্মা শুকিয়ে কাঠ। কয়েক মিটার পেরোলেই ধরে ফেলবে। এই মূহুর্তে শরীরে এক ফোটা শক্তি অবশিষ্ট নেই। তাই মৃত্যু কে বরণ করার জন্য চোখ দুটো বন্ধ করবে ঠিক তেমন সময়ে একটা কালো প্রাইভেট কার আ’ক্রমণকারী পথ আটকে চলে যায়। গাড়িটা চলে যেতেই তাদের চোখ পড়ে বিদ্ধস্ত লোকটা উধাও। তার মানে কালো গাড়িটা করে লোকটাকে তুলে নিয়ে গেছে। আ’ক্রমণকারীরা আতঙ্কিত হয়ে একে অপরের দিকে তাকালো। তখনই একজনের ফোন বেজে উঠে। কাঁপা কাঁপা হাতে ফোনটা রিসিভ করে। ওপাশ থেকে কি বললো তা শুনা গেলো না। তবে লোকটা একটা শুকনো ঢুক গিলে বলে,
–“বস আমরা ওকে ধরেই ফেলেছিলাম তখনই একটা গাড়ি,, “

লোকটা বাক্য সম্পূর্ণ করতে পারলো না। ওপাশের লোকের কথা শুনে লোকটার হাত পায়ের কাঁপন ধরে গেল।

অন্যদিকে গাড়িতে উঠে লোকটা হাঁপাতে লাগলো।আজ যমের দুয়ার থেকে ফিরে আসায় চোখ দিয়ে পানি গড়াতে লাগলো। আহত লোকটা পাশে তাকিয়ে মাস্ক পড়া লোকটা কে বললো,
–“স্যার আজ আপনি ঠিক সময়ে না আসলে আমি হয়তো,, “

মাঝ পথে লোকটাকে থামিয়ে দিলো মাস্ক পরিহিত লোকটা। অতঃপর গম্ভীরমুখে উত্তর দিলে,
–“ইটস মাই ডিউটি। তুমি তোমার কাজ করতে পেরেছ?”

লোকটার শেষ বাক্য টা শুনে এতক্ষণ পর আহত লোকটার মুখে হাসি ফুটলো। শরীরের সকল যন্ত্রণা ভুলে হাসিমুখে বললো,
–“আপনি কোনো কাজ দিয়েছেন আর আমি কখনো করি নি এটা কি কখনো হয়েছে স্যার?”

আহত লোকটার কথা শুনে মাস্ক পড়া লোকটা হয়তো মুচকি হাসলো। যা চোখ দেখে আহত লোকটা টাহর করতে পারলো। আর কোনো শব্দ ব্যয় না করে একটা পেন ড্রাইভ এগিয়ে দিলো মাস্ক পড়া লোকটার দিকে। লোকটা পেন ড্রাইভ টা হাতে নিয়ে বেশ কিছু সময় অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলো। অতঃপর ক্রুর হেসে অস্পষ্ট স্বরে বিরবিরালো,
–“মিস্টার চৌধুরী ইউ উইল বি ডেস্ট্রয়েড ভেরি সুন।”


রাত বারোটা বেজে পয়তাল্লিশ। আমি বেলকনিতে দাড়িয়ে আছি। বৃষ্টি কমেছে এই কিছুক্ষণ হলো। তবে হাওয়ার বেগ তীব্র থেকে তীব্র । যার কারণে সাই সাই আওয়াজ হচ্ছে । বেলকনি থেকে ব্যস্ত শহরে দাড়িয়ে থাকা উঁচু উঁচু দালান গুলো দেখা যায়। এখানে আসলেই সেদিকে তাকিয়ে থাকি। দেখতে ভালোই লাগে। দশটার সময় দাদির রুম থেকে বের হয়ে ডিনার সেরে রুমে চলে এসেছি। যতক্ষণ দাদির কাছে ছিলাম ততক্ষণ তিনি আমাকে বুঝিয়েছেন।

–“শুন নাত বউ তুমি তো জেনেই বিয়ে করেছ আমার বড় নাতি কে। সে যে সংসার করার ছেলে নয় আমরা আগেই তোমাকে বুঝিয়েছি। এখন এই সব নিয়ে একদম মন খা’রাপ করবে না। নিজেকে শক্ত রাখ, মাথা ঠান্ডা রেখে স্বামীর মন পাওয়ার চেষ্টা কর।”

দাদি আমাকে অনেক সুন্দর করে বুঝেয়েছে। আমিও মনযোগ দিয়ে শুনলাম। কোনো উত্তর দিলাম না। আমাকে কি মনে করে ইফান চৌধুরী? দিনে বাইরের মেয়ে নিয়ে থাকবে আর রাত হলে আমার ধারে আসবে। আমাকে কি বোকাচো* পেয়েছে? এসব ভাবতে গেলেই মনে হয় শরীরে কেউ আ’গুন লাগিয়ে দিয়েছে। রাগে শরীর কিরমির করে উঠে।

ভেজা রেলিং এ হাত রেখে আকাশের দিকে তাকিয়ে চোখ বন্ধ করে জোরে জোরে নিশ্বাস নিতে লাগলাম। প্রকৃতির ভাবসাব দেখে মনে হচ্ছে রাতে আবার ঝড় হবে। তীব্র বাতাসে আমার খোলা চুলগুলো উড়ে চোখেমুখে আঁচড়ে পড়ছে। আমিও আর চুলগুলো কে সরালাম না। যেখানে নিজের মনটাই অবাধ্য সেখানে চুলগুলোও না হয় একটু অবাধ্যতা করুক। বাতাসের সাথে ঝিরিঝিরি বৃষ্টি কণা সারা উম্মুক্ত হাত মুখ গলা স্পর্শ করছে। ফলে শরীরের লোমগুলে দাঁড়িয়ে কাঁপন ধরিয়ে দিচ্ছে।

যখন এই নিস্তব্ধ প্রকৃতি তে নিজের ক্লান্তিগুলোকে সঁপে দিয়েছি, এমন সময় গাড়ির শব্দে মনযোগ ক্ষুন্ন হয়। ঘাড়টা হালকা বাকিয়ে নিচের দিকে তাকাতেই দেখতে পেলাম ইফান চৌধুরীর গাড়ি এসেছে। তৎক্ষনাৎ গাড়ি থেকে বের হয় ইফান আর নোহা। ইফান গাড়ির ডোরটা লাগিয়ে এদিকে ফিরতেই নোহা ওর গলা জড়িয়ে ধরে। সহসা বলে উঠলো,
–“বেইবি আই ফিল সো হট। কিস মি,,”

ঠিক করে দাঁড়াতেও পারছে না নোহা। দেখে মনে হচ্ছে মাতাল হয়ে আছে। নোহার এহেন কাজে বিরক্তিতে চোয়াল শক্ত করে দাঁতে দাঁত পিষে ইফান বলে উঠলো,
–“What the f*. এই মাত্রই তো পাঠা দেখিয়ে আনলাম। এরই মাঝে আবার গরম হয়ে গেলে।whatever, You are very drunk. You need to sleep now.”

–“উমম নো..”
নোহা আরো শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো ইফানের গলা। মাতাল থাকার কারণে বারবার হেলেদুলে পড়ে যেতে থাকে। ইফান নোহার কোমর জড়িয়ে ধরে ওকে সোজা করে বাড়ির ভেতর নিয়ে যাবে। তখনই নোহা ইফানের দিকে ঠোঁট বাড়িয়ে দেয় কিস করার জন্য। ইফান বিরক্তিতে দাঁত কটমট করে কিছু বলতে গিয়েও হঠাৎ থেমে গেল। অতঃপর নোহার কাজে সাঁই দেয়। ইফান আমাকে পিঠ করে দাঁড়িয়ে । আমি বেলকনিতে দাঁড়িয়ে থেকে দেখতে পারছি ওরা দুজন অতি সন্নিকটে।

প্রায় কয়েক মিনিট পর তাদের বে’লাল্লাপনা থামে। ইফান নিজের ঠোঁট আঙ্গুলের সাহায্যে মুচতে মুচতে বেখেয়ালি নজর পরে বেলকনিতে আমার দিকে। আমার রুমে ডিম লাইট জ্বলছে। এদিকে পার্কিং এরিয়া থেকে আসা মৃদু আলোয় আমার অবয়ব দেখলেও পুরোপুরি আমাকে দেখতে পায়নি। আমার দিকে তাকাতেই আমি সরে যাই। ইফানের এতক্ষণে বুঝতে দেরী হয়নি এটা কে হতে পারে? অতঃপর আগের ন্যায় তার ঠোঁটের কোণে চিরচেনা ক্রুর হাসিটা ফুটে উঠলো। আর এটা আমার চোখে খুবই জঘন্যতম হাসি। ইফান আমার সাথে সাথে প্রস্থান বুঝতে পেরে অস্পষ্ট ভাবে হাস্কি স্বরে বিরবির করে আওড়ালো,

–“বুলবুলি।”

চলবে,,,,

জাহানারা

জান্নাত_মুন

পর্ব : ১৭
🚫ক’পি করা নিষিদ্ধ

🔞 সতর্কবার্তা:
এই গল্পে অ’কথ্য ভাষা এবং স”হিং’সতার উপাদান রয়েছে। ১৮ বছরের কম বয়সী বা সং’বে’দনশীল পাঠকদের জন্য উপযুক্ত নয়। পাঠক নিজ দায়িত্বে পড়বেন।

অধীর অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে আকাশের জমে থাকা কালো মেঘগুলো প্রকৃতির ডাকে সাই দিয়েছে। আজ মাগরিবের পর থেকেই ভারী বর্ষণ শুরু হয়েছে। আমি সেই বিকেলবেলা থেকেই দাদির কাছে বসে আছি। নাবিলা চৌধুরী আর নুলক চৌধুরী আমি আসার পর রুমে চলে যায়। কাকিয়া কাজের মহিলা লতাকে নিয়ে রান্নাঘর সামলাচ্ছে। ইতির কিছুদিন পর মাধ্যমিক পরীক্ষা শুরু হবে। তাই মেয়েটা আজকাল পড়াশোনায় মনোযোগ দিয়েছে।এদিকে পলি একবার রান্না ঘরে আরেকবার আমাদের কাছে, তো আবার মেইন ডোরের দিকে উঁকি ঝুঁকি দিচ্ছে। সকাল থেকেই মেয়েটার মুখটা কেমন মলিন হয়ে ছিলো। দাদি তছবি জপছে খতম দিবে বলে। আমি আর পলিও দাদির পাশে বসে তছবি হাতে নিয়ে গুনছি। ওর চিন্তিত মুখ দেখে জিজ্ঞেস করলাম,
–“কিছু কি হয়েছে পলি? সকাল থেকে এমন মনমরা হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছ।”

–“না ভাবি তেমন কিছু না। আসলে তোমার দেবর কাল রাত থেকে বাসায় আসে নি। বলে গিয়েছিল দুপুরে চলে আসবে। আর এখন সন্ধ্যা হয়ে গেছে অথচ এলো না।”

–“ওমা, ইমরান কাল রাত থেকে বাসায় নেই কেন? আমাকে তো কিছু বললে না।”

আমার কথা শুনে তছবি জপা থামিয়ে দাদি বললো,
–“বড় নাত বউ, ও তেমন কোনো বিষয় না। তুমি তো জানই আমার বড় ছেলেটার রাজনৈতিক কাজে ইফানের চেয়ে বেশি ইমরান সাহায্য করে। ঐ কারণেই কয়েকদিন পর পর এই জায়গা ঐ জায়গা যেতে হয়।”

দাদির কথার পিছে পলিও বলে উঠলো ,
–“ও টায় তো আমার ভীষণ ভয় করে। আজকাল ভালো মানুষ কে খা’রাপ মানুষ পেয়ে বসে। মানুষ টা তো আর ইফান ভাইয়ের মতো এত সাহসী না। এক মিনিট দেরী করে কল ধরলেই আমার অন্তর আত্মা শুকিয়ে যায়। আর মানুষটা রাত থেকে কল ধরছে না।দুপুরে খবরে দেখলাম, বিরোধী দলের সাথে আমাদের দলের কিছু লোকদের মধ্যে মা’রামারি হয়েছে। আমার তো ভীষণ ভয় করছে।”

আমি পলির মনের অবস্থা বুঝতে পেরে সান্ত্বনা দিলাম,
–“এত চিন্তা করো না। ইফানও সকালে বেরিয়েছে। বের হওয়ার আগে ভীষণ রে’গে ছিলো। এখন মনে হচ্ছে হয়তো এসব কারণেই। আমার মনে হয় দুই ভাই এক সাথে আছে।”

আমার কথা শুনে পলি আমার মুখের দিকে তাকিয়ে বেশ কিছুক্ষণ ভেবে বললো,
–“কিন্তু ভাবি সকালে তো ভাইয়া কে নোহাকে নিয়ে বের হতে দেখলাম। এখনো তো নোহা বাসায় ফেরে নি। হয়তো ভাইয়ার সাথেই আছে।”

পলির কথা শুনে আমি আশ্চর্য হয়ে গেলাম। কিছুক্ষণ পলির দিকে তাকিয়ে থেকে দাদির দিকে তাকালাম। দাদি আমার দিকেই তাকিয়ে ছিলো। আমি তাকাতেই কেমন অপ্রস্তুত হয়ে চোখ সরিয়ে তজবি জপায় মন দিলো। নোহা মেয়েটা আমার স্বামীর সাথে আছে কথাটা শুনেই রা’গে শরীর কাঁপতে শুরু করলো। নিজেকে কোনো মতে সামলে বললাম,
–“ঐ মেয়েটা সকাল থেকে এখনো আমার স্বামীর সাথে আছে। এই কথাটা কি আমার জানার অধিকার ছিলো না? নাকি জানানোর প্রয়োজন মনে করনি?”

আমার কথা শুনে পলির মনটা আরো খা’রাপ হয়ে গেলো। সে আমার একহাত তার দু হাতের মুঠোয় নিয়ে অপরাধী ন্যায় বলে,
–“আমি ভেবেছিলাম তুমি হয়তো জান। পরে যখন দাদি বললো তোমাকে কিছু না বলতে। এটা শুনে যদি তুমি কষ্ট পাও। আমিও পরে ভাবলাম দাদির কথায় ঠিক। এমনিতেই তোমার মন ভালো থাকে না। তার উপর এটা শুনে যদি আরও কষ্ট পাও।”

আমি আর কিছু বললাম না। সময় হোক ইফান চৌধুরীর থেকে সকল হিসাব সুদে আসলে তুলবো। এর পরপরই ইমরান কাক ভেজা হয়ে বাসায় ফিরে।তাই পলিও তখন ইমরানের কাছে চলে যায়।


সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে বৃষ্টির বেগ বেড়েই চলছে। ক্ষণে ক্ষণে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। এমন ঝর বৃষ্টির রাতে কাচা মাটির সেঁতসেঁতে সরু রাস্তা দিয়ে প্রাণপণে দৌড়াচ্ছে একটা লোক। চারিদিকে ঘুটঘুটে অন্ধকার তার মধ্যে বেশ দূরের একটা ল্যাম্পোস্টের ক্ষীণ হলদে আলো আর বিদ্যুৎ চকমকানোর ফলে কয়েক সেকেন্ডের জন্য দৃশ্যমান হচ্ছে লোকটার সম্পূর্ণ দেহাবয়ব। সাদা রঙের শার্টটি র’ক্তে বারংবার রঞ্জিত হলেও বৃষ্টির পানি ধুয়ে শরীর থেকে গড়িয়ে পড়ছে।দৌড়ানোর মাঝে মাঝে বাম পা টা আচমকা ব্যালেন্স হারিয়ে ফেলছে। তবে লোকটা থামছে না। গু’লিবিদ্ধ পা টা কে নিয়েই স্বজোরে দৌড়াচ্ছে। লোকটার মুখে আ’তঙ্কের কালো ছায়া নেমে এসেছে। থামলেই বুঝি আজ তার জীবনের কাহিনি শেষ।

অনেকক্ষণ দৌড়ে হাঁপিয়ে পড়ে লোকটা। দু হাঁটুতে ভর দিয়ে হাঁপাতে থাকে। এক দু মিনিটের মাথায় পিছন দিক থেকে তেরে আসে আরো তিনটা লোক।প্রত্যেকের হাতেই অ’স্ত্র। আ’ক্রমণকারীর আওয়াজ কানে আসতেই পেছনে তাকায় লোকটা। ভয়ে লোকটার অন্তর আত্মা শুকিয়ে কাঠ। কয়েক মিটার পেরোলেই ধরে ফেলবে। এই মূহুর্তে শরীরে এক ফোটা শক্তি অবশিষ্ট নেই। তাই মৃত্যু কে বরণ করার জন্য চোখ দুটো বন্ধ করবে ঠিক তেমন সময়ে একটা কালো প্রাইভেট কার আ’ক্রমণকারী পথ আটকে চলে যায়। গাড়িটা চলে যেতেই তাদের চোখ পড়ে বিদ্ধস্ত লোকটা উধাও। তার মানে কালো গাড়িটা করে লোকটাকে তুলে নিয়ে গেছে। আ’ক্রমণকারীরা আতঙ্কিত হয়ে একে অপরের দিকে তাকালো। তখনই একজনের ফোন বেজে উঠে। কাঁপা কাঁপা হাতে ফোনটা রিসিভ করে। ওপাশ থেকে কি বললো তা শুনা গেলো না। তবে লোকটা একটা শুকনো ঢুক গিলে বলে,
–“বস আমরা ওকে ধরেই ফেলেছিলাম তখনই একটা গাড়ি,, “

লোকটা বাক্য সম্পূর্ণ করতে পারলো না। ওপাশের লোকের কথা শুনে লোকটার হাত পায়ের কাঁপন ধরে গেল।

অন্যদিকে গাড়িতে উঠে লোকটা হাঁপাতে লাগলো।আজ যমের দুয়ার থেকে ফিরে আসায় চোখ দিয়ে পানি গড়াতে লাগলো। আহত লোকটা পাশে তাকিয়ে মাস্ক পড়া লোকটা কে বললো,
–“স্যার আজ আপনি ঠিক সময়ে না আসলে আমি হয়তো,, “

মাঝ পথে লোকটাকে থামিয়ে দিলো মাস্ক পরিহিত লোকটা। অতঃপর গম্ভীরমুখে উত্তর দিলে,
–“ইটস মাই ডিউটি। তুমি তোমার কাজ করতে পেরেছ?”

লোকটার শেষ বাক্য টা শুনে এতক্ষণ পর আহত লোকটার মুখে হাসি ফুটলো। শরীরের সকল যন্ত্রণা ভুলে হাসিমুখে বললো,
–“আপনি কোনো কাজ দিয়েছেন আর আমি কখনো করি নি এটা কি কখনো হয়েছে স্যার?”

আহত লোকটার কথা শুনে মাস্ক পড়া লোকটা হয়তো মুচকি হাসলো। যা চোখ দেখে আহত লোকটা টাহর করতে পারলো। আর কোনো শব্দ ব্যয় না করে একটা পেন ড্রাইভ এগিয়ে দিলো মাস্ক পড়া লোকটার দিকে। লোকটা পেন ড্রাইভ টা হাতে নিয়ে বেশ কিছু সময় অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলো। অতঃপর ক্রুর হেসে অস্পষ্ট স্বরে বিরবিরালো,
–“মিস্টার চৌধুরী ইউ উইল বি ডেস্ট্রয়েড ভেরি সুন।”


রাত বারোটা বেজে পয়তাল্লিশ। আমি বেলকনিতে দাড়িয়ে আছি। বৃষ্টি কমেছে এই কিছুক্ষণ হলো। তবে হাওয়ার বেগ তীব্র থেকে তীব্র । যার কারণে সাই সাই আওয়াজ হচ্ছে । বেলকনি থেকে ব্যস্ত শহরে দাড়িয়ে থাকা উঁচু উঁচু দালান গুলো দেখা যায়। এখানে আসলেই সেদিকে তাকিয়ে থাকি। দেখতে ভালোই লাগে। দশটার সময় দাদির রুম থেকে বের হয়ে ডিনার সেরে রুমে চলে এসেছি। যতক্ষণ দাদির কাছে ছিলাম ততক্ষণ তিনি আমাকে বুঝিয়েছেন।

–“শুন নাত বউ তুমি তো জেনেই বিয়ে করেছ আমার বড় নাতি কে। সে যে সংসার করার ছেলে নয় আমরা আগেই তোমাকে বুঝিয়েছি। এখন এই সব নিয়ে একদম মন খা’রাপ করবে না। নিজেকে শক্ত রাখ, মাথা ঠান্ডা রেখে স্বামীর মন পাওয়ার চেষ্টা কর।”

দাদি আমাকে অনেক সুন্দর করে বুঝেয়েছে। আমিও মনযোগ দিয়ে শুনলাম। কোনো উত্তর দিলাম না। আমাকে কি মনে করে ইফান চৌধুরী? দিনে বাইরের মেয়ে নিয়ে থাকবে আর রাত হলে আমার ধারে আসবে। আমাকে কি বোকাচো* পেয়েছে? এসব ভাবতে গেলেই মনে হয় শরীরে কেউ আ’গুন লাগিয়ে দিয়েছে। রাগে শরীর কিরমির করে উঠে।

ভেজা রেলিং এ হাত রেখে আকাশের দিকে তাকিয়ে চোখ বন্ধ করে জোরে জোরে নিশ্বাস নিতে লাগলাম। প্রকৃতির ভাবসাব দেখে মনে হচ্ছে রাতে আবার ঝড় হবে। তীব্র বাতাসে আমার খোলা চুলগুলো উড়ে চোখেমুখে আঁচড়ে পড়ছে। আমিও আর চুলগুলো কে সরালাম না। যেখানে নিজের মনটাই অবাধ্য সেখানে চুলগুলোও না হয় একটু অবাধ্যতা করুক। বাতাসের সাথে ঝিরিঝিরি বৃষ্টি কণা সারা উম্মুক্ত হাত মুখ গলা স্পর্শ করছে। ফলে শরীরের লোমগুলে দাঁড়িয়ে কাঁপন ধরিয়ে দিচ্ছে।

যখন এই নিস্তব্ধ প্রকৃতি তে নিজের ক্লান্তিগুলোকে সঁপে দিয়েছি, এমন সময় গাড়ির শব্দে মনযোগ ক্ষুন্ন হয়। ঘাড়টা হালকা বাকিয়ে নিচের দিকে তাকাতেই দেখতে পেলাম ইফান চৌধুরীর গাড়ি এসেছে। তৎক্ষনাৎ গাড়ি থেকে বের হয় ইফান আর নোহা। ইফান গাড়ির ডোরটা লাগিয়ে এদিকে ফিরতেই নোহা ওর গলা জড়িয়ে ধরে। সহসা বলে উঠলো,
–“বেইবি আই ফিল সো হট। কিস মি,,”

ঠিক করে দাঁড়াতেও পারছে না নোহা। দেখে মনে হচ্ছে মাতাল হয়ে আছে। নোহার এহেন কাজে বিরক্তিতে চোয়াল শক্ত করে দাঁতে দাঁত পিষে ইফান বলে উঠলো,
–“What the f*. এই মাত্রই তো পাঠা দেখিয়ে আনলাম। এরই মাঝে আবার গরম হয়ে গেলে।whatever, You are very drunk. You need to sleep now.”

–“উমম নো..”
নোহা আরো শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো ইফানের গলা। মাতাল থাকার কারণে বারবার হেলেদুলে পড়ে যেতে থাকে। ইফান নোহার কোমর জড়িয়ে ধরে ওকে সোজা করে বাড়ির ভেতর নিয়ে যাবে। তখনই নোহা ইফানের দিকে ঠোঁট বাড়িয়ে দেয় কিস করার জন্য। ইফান বিরক্তিতে দাঁত কটমট করে কিছু বলতে গিয়েও হঠাৎ থেমে গেল। অতঃপর নোহার কাজে সাঁই দেয়। ইফান আমাকে পিঠ করে দাঁড়িয়ে । আমি বেলকনিতে দাঁড়িয়ে থেকে দেখতে পারছি ওরা দুজন অতি সন্নিকটে।

প্রায় কয়েক মিনিট পর তাদের বে’লাল্লাপনা থামে। ইফান নিজের ঠোঁট আঙ্গুলের সাহায্যে মুচতে মুচতে বেখেয়ালি নজর পরে বেলকনিতে আমার দিকে। আমার রুমে ডিম লাইট জ্বলছে। এদিকে পার্কিং এরিয়া থেকে আসা মৃদু আলোয় আমার অবয়ব দেখলেও পুরোপুরি আমাকে দেখতে পায়নি। আমার দিকে তাকাতেই আমি সরে যাই। ইফানের এতক্ষণে বুঝতে দেরী হয়নি এটা কে হতে পারে? অতঃপর আগের ন্যায় তার ঠোঁটের কোণে চিরচেনা ক্রুর হাসিটা ফুটে উঠলো। আর এটা আমার চোখে খুবই জঘন্যতম হাসি। ইফান আমার সাথে সাথে প্রস্থান বুঝতে পেরে অস্পষ্ট ভাবে হাস্কি স্বরে বিরবির করে আওড়ালো,

–“বুলবুলি।”

চলবে,,,,

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply