জাহানারা
জান্নাত_মুন
পর্ব :১৫
🚫ক’পি করা নিষিদ্ধ
🔞 সতর্কবার্তা:
এই গল্পে অ’কথ্য ভাষা এবং স”হিং’সতার উপাদান রয়েছে। ১৮ বছরের কম বয়সী বা সং’বে’দনশীল পাঠকদের জন্য উপযুক্ত নয়। পাঠক নিজ দায়িত্বে পড়বেন।
কাজের মেয়ে লতা গিয়ে দরজা খুলতেই প্রবেশ করে একজন মহিলা আর একটা ইয়াং মেয়ে ও ছেলে।সকলের হাতে ট্রলি বেগ আর চোখে কালো রোদ চশমা। মহিলাটা দেখতে অনেকটায় নাবিলা চৌধুরীর মতো। পরনে মেরুন কালার জামদানি শাড়ি। আর উনার পেছনে দাড়িয়ে থাকা মেয়েটা একটা জিন্সের হাফপ্যান্ট আর উপরে ব্রা পড়ে আছে। দেখতে বিদেশি মনে হলেও দেশিই হবে হয়তো। ছ্যা ছ্যা ছ্যা! কত বড় নি’র্লজ্জ হলে এসব পড়ে ঘুরাঘুরি করে তাও বিডিতে? মেয়েটাকে দেখা শেষ হতে না হতেই চোখ পড়লো ছেলেটার দিকে। সারা প্যান্ট ছেঁড়া ছেঁড়া, দেখে মনে হচ্ছে ব্লেড দিয়ে একেক জায়গায় কেটে কেটে দিয়েছে। হাতে কেমন গুন্ডা দের মতো বেসলেট গলায় মোটা গোল্ডেন চেইন।
সে যাই হোক আমার মাথায় তো শুধু এটাই ঘুরছে প্যান্টের সামনে যা অবস্থা পিছনে কি একই অবস্থা? একটাবার দেখলে মনের কৌতুহল মিঠতো। তবে আর বেশি ভাবতে পারলাম না। কিছু একটা পরে যাওয়ার শব্দ কানে আসতেই নাবিলা চৌধুরীর দিকে তাকালাম। উনার চোখমুখ খুশিতে চকচক করছে।ঠাস করে হাতের চায়ের কাপটা টি-টেবিলে রেখে ছুট লাগায়। অন্যদিকে শাহরুখ খানের মতো দু হাত মেলে ধরে মহিলাটি। আমি ছাড়া সকলেই হাসি মুখে এই সিনেমা দেখছে। মহিলাটিকে প্রায় জড়িয়ে ধরবে ঠিক সে সময়ই ঘটে বিপত্তি। শাড়িতে পা বেজে মুখ থুবড়ে পড়ে নাবিলা চৌধুরী। উনি পড়ে যেতেই সকলের মুখে হাত চলে যায়। এদিকে উনি পড়তে দেরি হয়েছে কিন্তু আমি হো হা করে উচ্চ স্বরে হাসি আরম্ভ করতে দেরি করিনি। আমার হাসির আওয়াজ শুনে সকলে ভয়াতুর দৃষ্টি আমার দিকে তাক করে। পলি আমার পাশেই ছিলো সে আমার হাতে একটা চিমটি কাটে যাতে আমি হাসি থামাই। কিন্তু আমি তো খেক খেক করে হেসেই চলেছি। আমি বুঝতে পারছি না এত ফানি মোমেন্টেও কেউ না হেসে কিভাবে আছে?
আমার হাসির আওয়াজে উক্ত মহিলাটি অদ্ভুত দৃষ্টিতে একবার আমার দিকে তাকিয়ে তারপর নাবিলা চৌধুরী কে তুলে দাঁড় করায়। নাবিলা চৌধুরী উঠে দাড়িয়েই ঘাড় বাকিয়ে আমার দিকে কটমট করে তাকালেন। তবে বেশিক্ষণ রাগ প্রকাশ করতে পারল না তার আগেই মহিলাটি আদুরে বাক্য উনার কানে পৌঁছায়,
–“Are you ok? তোর লাগে নি তো নাবু?”
মহিলাটির কথা শুনে সকলেই আমার দিক থেকে দৃষ্টি সরিয়ে উনাদের দিকে রাখল। তবে আমার আড়ালে দু জোড়া নিষ্পলক চোখ তখনও আমারই দিকে তাক করা ছিলো। নাবিলা চৌধুরী মহিলাটির কথা শুনে কেমন আহ্লাদি হয়ে গেল। অতঃপর বলে উঠলো,
–“না দিভাই তেমন লাগে নি। লাগলে তো খুশি হওয়ার মানুষের অভাব ছিলো না।”
শেষ কথা আমার দিকে তাকিয়ে চিবিয়ে চিবিয়ে বলে। আমি ডোন্ট কেয়ার ভাব নিয়ে অন্যদিকে তাকাতেই চোখ পড়ে সেই ছিঁড়া প্যান্ট পড়া ছেলেটার দিকে। কেমন অদ্ভুত ভাবে আমার দিকে তাকিয়ে। আমার সাথে দৃষ্টি মিলতেই কেমন হালকা ঠোঁট প্রসারিত করলো। অদ্ভুত এই নতুন পাবলিক গুলো।
–“বিডি তে আসলে কবে? আমাকে একবার জানালেও না।”
নাবিলা চৌধুরী কথার উত্তর মহিলাটি দেওয়ার আগেই হাফপ্যান্ট পড়া মেয়েটি ঝড়ের বেগে এসে নাবিলা চৌধুরীর গলা জড়িয়ে ধরে বলে উঠলো,
–“তোমাকে সারপ্রাইজ দিবো বলেই মমকে জানাতে বারণ করেছিলাম।”
মেয়েটির নেকামির সাথে ছেলেটাও জয়েন হয়। এসব নেকামি আবার আমার সহ্য হয় না। আমি পলির কাছে ঘেষে দাড়ালাম। পলি আমার চেয়ে হাইটে একটু খাটো হওয়ায় হালকা মাথাটা নিচু করলাম।তারপর মেয়েটার কানের কাছে ফিসফিস করে শুধালাম ,
–“তুমি কি এই কাউওয়া গুলোরে চেন ?”
আমার বলা বাক্যটা পলির কানে পৌঁছাতেই সে একবার ঐদিকে তাকায়। তারপর গলা খাদে নামিয়ে বলেতে লাগল,
–“এসব কি বলছ ভাবি ? ঐ যে মহিলাটাকে দেখছ– ঐটা মা’র বড় বোন নুলক চৌধুরী। আর ঐ যে ছেলে মেয়ে দুটো– তারা আমাদের খালা শাশুড়ির ছেলে পঙ্কজ আর নোহা। আমাদের শাশুড়ীর চেয়েও সাংঘাতিক এই মহিলা। কাকিয়া বলেছে উনারা লন্ডন থাকেন তবে প্রতি বছরই কয়েকবার দেশে আসেন।আর এই বাড়িতে কয়েকদিন থেকে শাশুড়ি মাকে ভালো ট্রেনিং দিয়ে যায়। নুলক আন্টির সেই কি তেজ তুমিও বুঝতে পারবে। আর জানো না তো– নোহা এখানে আসলে আমাকে কিভাবে যে খাটায় মনে হয় আমি এ বাড়ির কাজের মেয়ে। আমার বিয়ের এক সপ্তাহ পরেই এখানে তারা আসে।তার পর সবাই মিলে আমাকে কত কথা শুনিয়েছে।আমি ছোটলোক তাদের বড় ঘরের ছেলেকে ফাঁ’সিয়েছি আরও কত কি।
–“তার মানে আমার কাজটা এত ইজি হবে না।”
আমি অস্পষ্ট ভাবে বললেও পলির কান পর্যন্ত পৌঁছায়। সহসা সে শুধায়,
–“কোন কাজের কথা বলছ ভাবি?”
–“নাথিং।”
এদিকে নুলক চৌধুরী ইকবাল চৌধুরী কে গিয়ে হালকা জড়িয়ে ধরে জিজ্ঞেস করে ,
–“কেমন আছ বড় ভাইয়া?”
ইকবাল চৌধুরী নুলক চৌধুরীর মাথায় হাত বুলিয়ে বলেন,
–“আলহামদুলিল্লাহ ভালো আছি। তুমি কেমন আছ?”
–“আলহামদুলিল্লাহ তোমাদের সকলের দোয়ায় ভালো আছি।”
তারপর ইরহাম চৌধুরী আর মনিরা বেগমের সাথে কিছুক্ষণ কথা বলে। মনিরা বেগম কিচেনে আর ইতি দৌড় লাগায় দাদির ঘরের দিকে। তারা চলে যেতেই নাবিলা চৌধুরী উনাদের সোফায় বসতে বলেন।এদিকে আমি আর পলি আগে থেকেই সেখানে দাঁড়িয়ে। উনারা এদিকে আসছেন যে সোফাটায় বসবে সেখানেই তাড়াতাড়ি নিজের জায়গা নিয়ে পায়ের উপর পা তুলে বসে পড়ি। আমার এমন কান্ডে সকলেই ক্ষিপ্ত হলেও আমি চিল মুডে। আমার কাজেই তো তাদের জ্বা’লানো। ওনারা এদিকে আসতেই পলি তাদেরকে জিজ্ঞেস করলে নুলক চৌধুরী মৃদু হাসলেন, তবে কথা বলার প্রয়োজন মনে করলো না। তিনি আমার সামনের সোফাটায় বসলেন ঠিক আমার মতো করে পায়ের উপর পা তুলে। আমার দিকে এমন ভাবে তাকিয়ে আছে মনে হচ্ছে আমি ওনার প্রতিদ্বন্দ্বী। তখনই পঙ্কজ নামক ছেলেটা আমার পাশে সোফায় বসে।এমন ভাবে বসেছে যে আরেকটু হলে আমার শরীরের সাথে লেগে যাবে। আমি চোখ গরম করে সেদিকে তাকাতেই দেখলাম এমন ভাবে সোফায় শরীর হেলিয়ে বসে আছে যেন পাশের মানুষটাকে দেখতেই পাচ্ছে না।
–“হোয়াট দ্যা হ্যাল?”
আমি আচমকা দাড়িয়ে চোয়াল শক্ত করে বাক্যটা বললাম। লোকটা আমার দিকে তাকিয়ে ঠোঁট প্রসারিত করে বললো,
–“নাইস।”
আমি লোকটার দিকে আঙ্গুল তুললাম, কয়েকটি অ’শ্রাব্য কথা শুনানোর জন্য মুখটা ফিসফাস করছে। কিছু বলতে যাব তার আগেই নোহা মেয়েটা আমার সামনে এসে দাঁড়ায়। চোখের সানগ্লাসটি নাকের ডগায় এনে দু হাত বুকে ভাজ করে আমাকে উপর থেকে নিচ একবার পরখ করে । তারপর চোখের সানগ্লাসটা চোখ থেকে খুলে সোফায় ছুড়ে ফেলে দেয়। বিদঘুটে হেসে নাবিলা চৌধুরীর দিকে তাকিয়ে বলে,
–“মিমি সি ইজ জা হা না রা?”
নাবিলা চৌধুরী কিছু বললেন না তিনি তার বড় বোনের দিকে তাকালেন। অতঃপর তারা দৃষ্টি বিনিময় করে নিঃশব্দে হাসল। আমি সব কিছু লক্ষ করছি।নাবিলা চৌধুরীর সাথে দৃষ্টি মিলতেই চোখ উল্টে অন্য দিকে তাকালো। আমি মনে মনে ভাবতে লাগলাম, আমাকে দেওয়া ইনফরমেশনই ঠিক। নাবিলা চৌধুরীর দলটা একটু বড়ই। হোয়াট এভার সব জায়গায় দল দিয়ে কিছু হয় না। মগজটাও একটু খাটাতে হয়। এরই মাঝে নোহা সকালের মাঝ থেকে দৌড় লাগায়। অনেকক্ষণ ধরে উপর থেকে এসব নাটক দেখছিলো ইফান চৌধুরী। ফরমাল ড্রেসে মনে হচ্ছে কোথাও বের হচ্ছিল সবে। নিচে নামতেই নোহা তাকে দেখে দৌড়ে গিয়ে জড়িয়ে ধরে।
–“বেইবি, আই ক্যান্ট বিলিভ উইয়ার মিটিং আফটার সো লং!”
নোহা ইফানের বুকে হুমড়ি খেয়ে পড়ে বলতে থাকে।আমি অনুভূতিহীন ভাবে সেদিকেই তাকিয়ে। ইফানও আমার দিকে তাকিয়ে আছে। তার ঠোঁটের কোণে সেই ক্রুর হাসি। ইফান কোনো উত্তর করলো না বরং নোহায় আবার তাকে ছেড়ে সোজা হয়ে দাঁড়ায়। অভিমানী সুরে বলে,
–“ডু ইউ নো, বেইব– হাউ মাচ আই ওয়াজ মিসিং ইউ? উই হ্যাভেন্ট মেট ফর দ্য লাস্ট থ্রি মান্থস। এভরিথিং ফেল্ট বোরিং উইদাউট ইউ।”
নোহার কথা শুনে ইফান আমার দিক থেকে চোখ সরিয়ে নোহার কানের কাছে ফিসফিস করে বলে উঠলো ,
–“আই নো বেইবি, হাউ মাচ ইউ মিসড মি। সেই জন্যই তো এভরি ডে বারে গিয়ে ছেলেদের সাথে রুম ডেট করতে।”
ইফানের কথায় মেয়েটা হেসে উড়িয়ে দিলো।মেয়েটাও তার কানের কাছে ফিসফিস করে বলে উঠলো ,
–“বাট নো ওয়ান কুড গিভ সার্ভিস লাইক ইউ, ডার্লিং।”
অতঃপর দুজনেই হো হো করে হেসে দিলো। তাদের হসার কারণ আমরা কেউ বুঝিনি। ইফান নোহার থেকে দৃষ্টি সরিয়ে আমার দিকে তাকালো। তখনও আমি নিস্প্রভ ভাবে তার দিকে তাকিয়ে। সে আমাকে চোখ মে’রে ঠোঁট গোল করে চুম্মা দেখালো। আমি আর এখানে দাঁড়িয়ে থাকতে পারছি না এসব লু’চ্চামি দেখার জন্য। তাই চলে যেতে নিলাম। সিঁড়ি দিয়ে যাওয়ার সময় কাঁধ দিয়ে নোহাকে ধাক্কা মা’রলাম। কারণ পুরো সিড়ি তাঁরাই দখল করে ছিল।তাদের কে যখন ক্রস করে গেলাম তখনই হাতে টান অনুভব করি। ঘাড় কাঁধ করে পিছনে তাকাতেই দেখলাম ইফান আমার হাত ধরে রেখেছে। এদিকে নোহা চোখ সরু করে আমার দিকে তাকিয়ে আছে যেন ইফান থাকায় কিছু বলতে যেয়েও পারছে না। অযাচিত কারণে রাগে সারা শরীর জ্ব’লছে। চোয়াল শক্ত করেই রেগে ইফানের দিকে তাকালাম। ইফান হালকা হেসে আমাকে আবার সবার মাঝখানে নিয়ে দাঁড় করালো। নুলক চৌধুরীর কাছে যেতেই তিনি হালকা হেসে জিজ্ঞেস করলো,
–“হাউ আর ইউ বেটা? কয়েকমাস ধরে তো তোমাকে খুঁজেই পাওয়া যাচ্ছিলো না। এন্ড সো, আমার মেয়েটা অস্থির হয়ে থাকতো অলটাইম।”
–“রিয়েলি আন্টি! তাই বুঝি মেয়েকে স্থির করতে ক্লাবে পাঠাতেন?”
ইফান হেসে হেসে কথাটা বললেও নুলক চৌধুরীর মুখটা চুপসে যায়। ইসস চেহারাটা দেখার মতো ছিল। আমি ঠোঁট চেপে হাসতে গিয়েও গলা দিয়ে আওয়াজ বেরিয়ে আসে, তখনই আবার উনার সাথে চোখাচোখি হয়। অদ্ভুত মহিলা, চোখে কিছু একটা তো আছেই যা ভিষণ অস্বস্তিকর, তবে প্রকাশ করলাম না। ইফানের আরেকটি হাত ধরে আছে নোহা। অতঃপর নোহা আর তার মাকে দেখিয়ে বলে,
–“বাই দ্যা ওয়ে, লুক সি ইজ মাই ঝাঁঝওয়ালি থুরি ঘরওয়ালি জাহানারা শেখ। আমার দশটা না পাঁচটা না একটা মাত্র তেজি টুশটুশে বউ।”
তারপর আমায় নোহাকে দেখিয়ে বললো,
–“এই হচ্ছে আমার মিমি নুলক চৌধুরীর মেয়ে, মানে তোমার না হওয়া সতিন।”
তারপর আমার কানের কাছে এসে ফিসফিস করে বলে উঠলো,
–“ননদিনী ভেবে একদম ভুল করো না জান। ঐ শালি তোমার পেয়ারের স্বামীর খাওয়া জিনিস।”
চলবে,,
♻️ইফান একজন রহস্যময় চরিত্র। তাই ওর সম্পর্কে আরও অনেক পরে জানতে পারবে।
(জাহানারা গল্পের প্রতিটি চরিত্রের ভিতরেই রহস্য আছে।অনেকে বলতে পারেন জাহানারা অতিরিক্ত খা’রাপ ব্যবহার করে তাদের বলবো এর পেছনেও কারণ আছে।)
জাহানারা
জান্নাত_মুন
পর্ব :১৬
🚫ক’পি করা নিষিদ্ধ
🔞 সতর্কবার্তা:
এই গল্পে অ’কথ্য ভাষা এবং স”হিং’সতার উপাদান রয়েছে। ১৮ বছরের কম বয়সী বা সং’বে’দনশীল পাঠকদের জন্য উপযুক্ত নয়। পাঠক নিজ দায়িত্বে পড়বেন।
বর্ষাকালের মাঝামাঝি সময়, আষাঢ় গিয়ে শ্রাবণ পড়েছে সবে। অন্যান্য বছরের তুলনায় এবার বৃষ্টি হয়নি বললেই চলে। কদিন ধরেই ক্ষণে ক্ষণে উত্তর দিক দিয়ে ধমকা হাওয়া বইছে। মাথার উপর বিশালাকার নীল আকাশটা কখনো কালো মেঘে ছেয়ে যাচ্ছে তো কখনো আঁধার কাটিয়ে সূর্যের তীর্যক রশ্মি পৃথিবীতে আসছে। পর্যাপ্ত বর্ষণ না হওয়ার ফলে দেশের বেশ কয়েকটি অঞ্চলে খরা দেখা দিয়েছে। আকাশের ঘন কালো মেঘগুলো সবুজে ঢাকা প্রকৃতিটাকে লোভ দেখিয়ে যাচ্ছে প্রতিনিয়ত।
আসরের নামাজ পড়ে বেলকনিতে দাঁড়িয়ে আছি।আজকাল অন্তরে বড্ড বেশি দহন হয়। যখনই আমার অনিশ্চিত ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করি তখনই আতংক ধরে যায়। আমার যখন সতেরো বছর চলছে তখন দাদি আমাদের সবাই কে ছেড়ে চলে যান। তবে মারা যাওয়ার আগে সবসময় বলতেন জাহান বুবুরে সাবধানে থাকিস। আমাগো বংশে কার জানি কু নজর লাগছে। এই যে দেখনা আমার ফুলের মতো একমাত্র মাইয়াডা অকালে ঝইরা গেল। দাদির কথাগুলোই এখন সত্যি মনে হচ্ছে। আমি আঠারো তে পা দেওয়ার সাথে সাথেই জীবনের মোড় পালটে যায়।আর তখন থেকেই সহজ জীবনটা দুঃস্বপ্ন হয়ে দাঁড়ায়। তার মধ্যে ইফান চৌধুরীর আগমনটা সবচেয়ে ভয়ংকর। লোকটাকে এতদিনে বিন্দু মাত্র বুঝে উঠতে পারলাম না। শুধু মনে হয় অনেক রহস্যই তার মধ্যে লুকিয়ে আছে যা আমার কল্পনার বাহিরে।
আয়নার সামনে দাড়িয়ে কোমর পর্যন্ত লম্বা ঘন কালো চুলগুলোকে লুজ করে আলগোছে খোপা করে, বাহুতে শাড়ির আচলটা তুলে নিলাম। গলায় বেশ কয়েকটি জায়গায় অ’স্বস্তিকর দাগগুলো এখনো দৃশ্যমান। আমি ফেইস পাউডার জায়গাগুলো তে লাগানোর সময় ভেসে উঠল সকালের দৃশ্যটি।ইফান নুলক চৌধুরী আর নোহার সাথে পরিচয় করিয়ে দিলেও পঙ্কজ ছেলেটার সাথে দেয়নি। বিধায় ছেলেটা নিজেই আমার দিকে হেসে হাত বাড়িয়ে দেয়।
–“হেই বিউটিফুল আ’ম পঙ্কজ। সবাই ভালোবেসে পঙ্কি বলে ডাকে। তুমিও না হয় ভালোবেসে প…”
বাকিটা আর উচ্চারণ করতে পারে নি, তার আগেই ইফান তার ঠোঁটে আঙ্গুল দেখিয়ে চুপ করিয়ে দেয়। অতঃপর বলে উঠে,
–“সসস প্রেম ভালোবাসা আমার আর আমার বউয়ের কারোর ডিকশনারীতেই নাই। আমরা দু’জনেই গভীর জলের মাছ ।এখন আবার তুইও ঐখানে ডুব দিতে আসিস না।”
এইটুকু বলে ইফান সবাই কে একবার আড় চোখে দেখে পঙ্কজকে হিসহিসিয়ে বলে,
–“বাই এনি চান্স ঐ সাহসটা যদি দেখাতে চাস, তাহলে তর এটা সারাজীবনের জন্য শুইয়ে দিবো। সো বি কেয়ারফুল।”
কথাটা বলার সময় ইফান পঙ্কজের মেইন পয়েন্টে হালকা থাপড়ে বুঝায়। এটা কারো চোখে না পড়লেও আমার দৃষ্টি এড়ায় নি। কত বড় ব’জ্জাত লোক ভাবা যায়। অতঃপর ইফান পঙ্কজকে চোখ মেরে বাহুতে আলতো করে চাপরে ঠোঁট বাঁকায়। পঙ্কজের মুখটা কালো হয়ে গেলেও তৎক্ষনাৎ আবার হেসেও দেয়। কিছু বলবে তার আগেই ইফান এক হাত পেন্টের পকেটে ঢুকিয়ে আরেক হাত দিয়ে আমার কোমর ধরে শিস বাজাতে বাজাতে আমাকে রুমে নিয়ে চলে আসে।
অযাচিত কারণে লোকটা বড্ড বেশি রেগেছিল। সকালের সামনে প্রকাশ না করলেও আমাকে একা পেয়ে সব রাগ ঝেরেছে। রুমে নিয়ে এসেই শক্ত থাবায় আমার গলা চেপে ধরে। আমি কি বসে থাকার মেয়ে? নিউটনের তৃতীয় সূত্রের মতো বিপরীতমুখী প্রতিক্রিয়া না দেখিয়ে বসে থাকবো! আমিও শক্ত করে ওর ঘন সিকলি কালো চুলগুলো দু হাতে মুঠো করে নিই। আমার এমন কাজে সে কখনোই রেগে যায় না। এবারো তাই হলো, জিহ্বের ডগা দিয়ে গাল ঠেলে নিঃশব্দে হাসে। অতঃপর দেয়ালের সাথে আমাকে মিশিয়ে সেও আমার সাথে অবশিষ্ট দূরত্ব ঘুচায়।
–“স্বামীর সাথে রাতে জম্পেশ কালা পিরিতি করেছ এটা লোক দেখানো মন্দ না। বরং লোকে আমার ছোট ভাইয়ের বীরত্বের প্রশংসা করবে। কিন্তু পর পুরুষের সামনে টইটই করবে এটা আবার কোন বা’ল ফালানির কাজ বউ।”
আমিও ইফানের কথায় চোখ সুরু করে জিহ্বার ডগা দিয়ে গাল ঠেলে ওর মেইন পয়েন্টে তাকিয়ে চিন্তিত ভঙ্গিমায় বলে উঠলাম ,
–“আপনার ছোট ভাই আবার কোন জীবনে বীরত্বের কাজ করলো? ঐটা তো কাপুরুষের মতো কাজ করা ছাড়া আর কিছুই করতে পারে না।”
ইফান আমার দৃষ্টি অনুযায়ী সেখানে তাকিয়ে আচমকা পেন্টের চেইন খুলে দিলো। আমি ওর এমন কান্ডে চরম আশ্চর্য । মুখের কথা শেষ না করে তৎক্ষনাৎ দৃষ্টি সরিয়ে ওর দিকে তাকাতেই দেখলাম ঠোঁট কামড়ে হাসছে।
–“অসভ্য।”
–“আরে বউ নিচে দেখ।”
ঠোঁট কামড়ে হাসার ফলে সমান তালে তরঙ্গায়িত হচ্ছে ইফানের প্রসস্থ ঢেউ খেলানো বুকটা।
–“কি হলো একবার দেখই না– ছোট ভাই কাল রাতের পর থেকে কেমন যেন গ্লো করছে।”
আমি কোনো দিক না ভেবেই বোকার মতো ঐখানে তাকাতেই হো হো করে হেসে উঠে। আমি হতবাক নয়নে ইফানের দিকে তাকিয়ে। এটা কি ধরনের মানুষ ভেবে পাচ্ছি না। ইফানের নির্ল’জ্জতার কোনো লিমিট নেই। হাসতে হাসতে আবার জিপার টেনে নিল।আমার কোমরের শাড়ির উন্মুক্ত ভাজে হাত ঢুকিয়ে তার সাথে চেপে ধরে। এই মূহুর্তে আমি বাকহীন।অবশ্য তেমন কিছু দেখি নি। ব্ল্যাক কালার জাঙ্গিয়াটা ছাড়া।
–“আজকেও কি ঐ দিনের মতো সোনার বাংলা দেখতে চেয়েছিলে বউ? ওকে তবে এখন সময় নেই রাতে এসে দেখাবো কেমন। আর হ্যা আসার সময় সান্ডার তেল নিয়ে আসবো কি বল ?”
কথাটা বলেই চোখ মা’রলো। আমি ইফানের হাতের বাঁধন ছাড়াতে ছাড়াতে দাঁত কটমট করে আওড়ালাম,
–“শালা খা”ইষ্টা।”
ইফান বাহিরে যাওয়ার আগে আমার ঠোঁটে গাঢ় চুম্বন এঁকে দেয়। অতঃপর কড়াভাবে বলে যায়– সে আসার আগে যেন রুম থেকে না বের হই। তার দৃষ্টি নাকি সবসময় আমার উপর থাকবে। আমি বুঝতে পারি না ও আসলে কি চায়? কেন আমার সাথে এত সহজ। কিন্তু আমি তো জানি সে যা দেখায় তা না, তাহলে?
এসব ভেবে ভেবেই এতগুলো দিন এই বাড়িতে কেটে গেল। মনের ভিতর হাজারো চিন্তা ঘুরপাক করে। যতই সমীকরণ মিলাতে বসি অতঃপর সেই একই জায়গায় আটকা পরে যাই। তখনই ভেতর থেকে দীর্ঘশ্বাস বেড়িয়ে আসে। আমার এই জটিল সমীকরণ না মিললে আজীবন আটকা পড়ে থাকতে হবে শ্বাসরুদ্ধকর এই কাল কুঠুরিতে।
ইফান চলে যাওয়ার পর আমি আর রুম থেকে বের হইনি। আজ ভেবেছিলাম ভার্সিটি যাবো। তা আর হলো কই? কোথা থেকে কতগুলো কাউয়া উড়ে এসে জুড়ে বসেছে আমার রাতের ঘুম হারাম করার জন্য।
দুপুরে আমাকে নিচে নামতে না দেখে পলিই রুমে এসে খাবার দিয়ে যায়। বেশ কিছুক্ষণ সে আমার রুমে ছিল। তখন জানতে পারি নুলক চৌধুরী আর নাবিলা চৌধুরী ইকবাল চৌধুরীর চাচাতো বোন ছিলেন। তখন আমি পলিকে শুধাই,
–“ওমা আমি এখানে এতদিন ধরে আছি একবারো তো বললে না কেউ?”
–“তুমি তো জিজ্ঞেসই করনি কখনো তাই আরকি বলা হয়নি।”
পলির কথাতেও যুক্তি আছে। এই বাড়ির মানুষগুলোর সাথে আমিই সেইসব নিয়ে কখনো কথায় বলি নি। কিন্তু অনেকবার মনে প্রশ্ন এসেছে নাবিলা চৌধুরী কিভাবে ইকবাল চৌধুরী কে বিয়ে করেছিলো। এখন কাজিন জানার পর, জানার ইচ্ছেটা আরো প্রবল হলো।
–“আচ্ছা পলি তুমি কি জান কিভাবে মা আর বাবার বিয়ে টা হয়েছে?”
–“আমার বিয়ের সাত কি আট মাস হয়েছে। তুমি তো জানই বিয়ে টা একটা দূ’র্ঘটনা ছিলো। তাই অন্যদের মতো এতটা স্বাভাবিক ভাবে এখানো সবার সাথে মিশতে পারি নি। ঐজন্যই কাউকে কখনো কিছু জিজ্ঞেস করে উঠতে পারি না। তবে জান ভাবি আমারো জানার খুবই ইচ্ছে। কিভাবে কি হলো।”
অনেকক্ষণ আমরা গল্প করি। তারপর পলি চলে যায় নিচে। সকালে ইতি গিয়ে দেখে দাদি অসুস্থ। এর পর থেকেই দাদিকে নিয়ে সকলে ব্যস্ত দিন পার করছে।নুলক আর নাবিলা চৌধুরী সকাল থেকেই দাদির কাছে আছে। আমারও মন চাচ্ছিলো না তাদের সামনে যাবার। আবার ইফানও কড়াকড়ি বলে গেছে সে আসার আগে নিচে যেন না যাই। আমি তো তার বাধ্য বউ নই যে তার কথা শুনবো।
এই বাড়িতে নাবিলা চৌধুরীই আমাকে দেখতে পারতো না। আর বাকি সবাই আমার সাথে সহজ ছিল। সবার থেকে দাদি একটু বেশিই। তিনি সব সময় আমাকে এটা সেটা বুঝায় কিভাবে সংসারের হাল ধরতে হয়। মোট কথা যথেষ্ট স্নেহ করেন। তাই নিচে যাওয়ার ইচ্ছে না থাকলেও দাদির জন্য রুম থেকে বের হলাম। এই চৌধুরী বাড়িটা বিশাল বড়। বাড়ির নিচ তলায় দাদি আর নাবিলা চৌধুরীর রুম। আর বাকি সবাই দু তলায় আর তিন তলায়। নাবিলা চৌধুরীর রুম আর তিন তলায় চাচা শ্বশুরের দুই ছেলে মেয়ের রুমে কখনো যাওয়া হয়নি। তাদের সাথে অবশ্য এখনো সামনাসামনি দেখায় হয়নি।পড়াশোনার জন্য ইউএস এ থাকে।
আমি সিঁড়ি দিয়ে নামছি ঠিক তখনই পঙ্কজ ছেলেটার সাথে মুখোমুখি হই। আমি এক পলক তাকিয়ে দৃষ্টি সরিয়ে নিলাম। লোকটার তাকানোটা একটা মেয়ের জন্য ভীষণ অস্বস্তিকর। আমি সাইট দিয়ে চলে যেতে নিলে রাশভারি পুরুষালী কন্ঠ কানে আসে,
–“এইভাবে তাকালে কিন্তু কারো কারো রাতের ঘুম হারাম হয়ে যেতে পারে, ভাবি জান।”
আমি পিছন ফিরে একবার লোকটার মুখের দিকে তাকালাম। পঙ্কজ মুচকি হেসে হেসে চুইংগাম চিবাচ্ছে। আমি এরকম অচেনা লু’চ্চা টাইপের লোকের সাথে কথা বলতে চাইলাম না। বিয়ের পর থেকে মুখটা কেমন জানি আস্তাগফিরুল্লা মার্কা হয়ে গেছে। ভালো কথা বের হতেই চায় না। মুখের আর দোষ কি? লোক বুঝেই মুখ নিজেই খুলে যায়। কিন্তু এখন মুখ খারাপ করলে চলবে না। একটু আগেই নামাজ কালাম পড়ে এসেছি। আমি একটা সিঁড়ি নামতেই আবার পঙ্কজের গলার স্বর ভেসে আসে,
–“ইফান কি এখনো রুমে?”
আমি আবার থামলাম। ঘাড় ঘুরিয়ে সুক্ষ্ম নজরে তাকাতেই পঙ্কজ বলে উঠলো,
–“না মানে তোমার রুমের দরজা বন্ধ ছিলো তো তাই।”
আমাকে লু’চ্চা চাউনি দিয়ে স্কেন করতে করতে বাক্যটি আওড়ায়। আমি এবার শিউর শা’লা বিশাল বড় খা’ইষ্ঠা। ভালো ব্যবহার এদের আবার শরীর চুলকায়। আমি মুখ না খুললে তো লাই পেয়ে বসবে।
–“আরে ভাবি তুমি,,,”
রান্না ঘর থেকে দুধের গ্লাস হাতে নিয়ে বোধহয় দাদির রুমের দিকে যাচ্ছিল পলি। আমাকে সিঁড়ি তে দেখেই এদিকে আসে। তবে এখানে পঙ্কজ ছেলেটাও আছে তা আশা করে নি। কেমন অপ্রস্তুত হয়ে পড়লো মেয়েটা। পলির উপস্থিতিতে পঙ্কজ আমার থেকে দৃষ্টি সরিয়ে পলিকেও স্কেন করে নিল। যা আমি লক্ষ করে পলির কাছে গেলাম। ওকে নিয়ে দাদির রুমের দিকে যাবো তার আগে আবার পিছনে তাকালাম। লোকটা একই ভাবে চুইংগাম চিবাতে চিবাতে এদিকেই তাকিয়ে শ’য়তানের মতো হাসছে। আর সময় নষ্ট না করে পলির সাথে যেতে যেতে ছাড়লাম এক অ’শ্রাব্য গালি,
–“আমার কুড়ি বছরের অবিজ্ঞতায় এমন বাইনচো”দ দেখি নি।”
চলবে,,,,,,
(অনেক চাপের মধ্যে আছি। তাই তাড়াহুড়ো করে লিখেছি। নেক্সট পার্ট থেকে গল্পে একটু একটু করে টুইস্ট রাখবো। যাই হোক গঠনমূলক মন্তব্য করো। হ্যাপি রিডিং 🥲🫶)
Share On:
TAGS: জান্নাত মুন, জাহানারা
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
জাহানারা পর্ব ৬৭+৬৮
-
জাহানারা গল্পের লিংক
-
জাহানারা পর্ব ১৯+২০
-
জাহানারা পর্ব ৫
-
জাহানারা পর্ব ২৯+৩০
-
জাহানারা পর্ব ৭
-
জাহানারা পর্ব ৩৩+৩৪
-
জাহানারা পর্ব ৯
-
জাহানারা পর্ব ৬১+৬২
-
জাহানারা পর্ব ২৩+২৪