Golpo romantic golpo জাহানারা

জাহানারা পর্ব ৭০


জাহানারা পর্ব ৭০

জান্নাত_মুন

পর্ব :৭০
🚫ক’পি করা নিষিদ্ধ

🔞 সতর্কবার্তা:
এই গল্পে অ’কথ্য ভাষা এবং স”হিং’সতার উপাদান রয়েছে। ১৮ বছরের কম বয়সী বা সং’বে’দনশীল পাঠকদের জন্য উপযুক্ত নয়। পাঠক নিজ দায়িত্বে পড়বেন।

–“আহ্ !”

ইফান তার অনর্গল কথা বলার মধ্যেই আচমকা মুখ দিয়ে মৃদু ব্যথাতুর আওয়াজ বের করে উঠলো। ফলে বাক্যটি অসম্পূর্ণই রয়ে যায়। ইফান হালকা চোখ ঘুরিয়ে আমার পানে তাকায়। আমি ইফানের ঘাড়ে শক্ত করে কা’মড়ে ধরেছি। হঠাৎ আমার এরূপ আচরণে ভীষণ রকম আশ্চর্য হলো সে। আর হঠাৎই আমার এমন ব্যবহারের কারণ খুঁজে পাচ্ছে না। এদিকে আমি নিজের শরীরের সর্বশক্তি দিয়ে ইফানের গলা জড়িয়ে ধরে তার ঘাড়ে দাঁত বসিয়ে দিচ্ছি। ইফান আমাকে সরাল না। আর না তো কোনো প্রকার চেষ্টা করল। বরং দাঁতে দাঁত চেপে আমার দেওয়া য’ন্ত্রণাটুকু সহ্য করে নিতে লাগল।

বেশ খানিকটা সময় গড়িয়ে গেল। আমার সূচালো দাঁতগুলো ইফানের ঘাড়ের চামড়া ভেদ করতেই সেখান থেকে র’ক্ত বেরিয়ে আসল। না, ইফান এখনো কোনো প্রকার প্রতিক্রিয়া করছে না। বরং আমার কর্মকাণ্ডকে নীরবে সাঁই জানাচ্ছে। মুখে র’ক্তের নোনা স্বাদ পেয়ে বাধ্য হয়ে ইফানেকে ছেড়ে দিলাম। অতঃপর সেখানেই মুখ গুঁজে ফুপিয়ে উঠলাম। ফলে ইফানের বলিষ্ঠ দেহ ভাঁজে লেপ্টে থাকা আমার সরু লতানো দেহ কম্পিত হতে থাকে। আমাকে ফুপিয়ে উঠতে দেখে ইফান তপ্ত শ্বাস ছেড়ে আলতো হাতে আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে হাস্কি স্বরে হিসহিসিয়ে ডেকে উঠল,
–“বুলবুলি।”

ইফানের গলার স্বর কর্ণপাত হতেই আমি স্থির হয়ে গেলাম। চলছে কিছু সময়ের নীরবতা। আমি এখনো শক্ত করে ইফানের গলা জড়িয়ে ধরে তার ঘাড়ে মুখ ডুবিয়ে আছি। ইফান আমার মাথায় শব্দ করে চুমু খেল। অতঃপর ফের হাস্কি স্বরে হিসহিসিয়ে ডেকে উঠল,
–“জান, হোয়াটস রং?”

আমার থেকে কোনো উত্তর আসল না। ইফান এবার আমার চিবুক উপরে তুলতে তুলতে বলল,”লুক অ্যাট মি।”

ইফান আমার মুখ তার সোজাসুজি এনে আমার এলোমেলো চেহারায় দৃষ্টিপাত করল। ফর্সা মুখ সম্পূর্ণ লাল হয়ে আছে। আঁখিযুগল জলে থৈথৈ করছে। কোমল রাঙা ওষ্ঠ জোড়া থিরথির করে কাঁপছে। একই সাথে নাকের পাঠা ফুলে উঠছে। নেশায় বোধ হয়ে থাকা মেয়েটা নিজেকে সব সময়ের মতো আজও তেজস্বী প্রমাণ করতে মিথ্যা রাগ দেখাচ্ছে দেখে ইফান আনমনে স্মিথ হাসল। অতঃপর সে আমার দিকে হাত বাড়িয়ে দিতেই মুখ ঘুরিয়ে নিলাম। ইফান ফের ঠোঁট বাঁকাল। আমার কোমর ধরে টেনে তার শরীরের সাথে আরও মিশিয়ে নেয়। আমি না চাইতেও জোর করে আমার ঠোঁটে লেগে থাকা র’ক্তটুকু মুছে দিয়ে আমার মুখাদল দু’হাতের মধ্যে পুরে আদুরে কণ্ঠে শুধায়,
–“বেইব কি হয়েছে তোর? আর ইউ ফিলিং ব্যাড?”

আগের ন্যায় মুখ ভার করে ইফানের থেকে দৃষ্টি নামিয়ে বসে আছি। ইফানের কোনো প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছি না দেখে ইফান হতাশ হয়ে দীর্ঘ শ্বাস ছেড়ে মৃদু স্বরে ডেকে উঠল,
–“বুলবুলি।”

ইফানের কন্ঠ বেশ ভার শুনাল। এবার আমি আবারও ফুপিয়ে উঠলাম। ইফান এবার আর আশ্চর্য হল না। হয় তো আমার সিচুয়েশন ফিল করতে পারছে খানিকটা। ইফান তার মুখ এগিয়ে আনতে লাগল আমার কপালে একটা চুমু খাওয়ার জন্য, তখনই আমি “ওয়াক্” করে মুখ ভর্তি ব’মি করে ভাসিয়ে দিলাম ইফানের শরীর। ইফান তৎক্ষনাৎ খানিকটা ভরকে গেলেও মূহুর্তেই স্বাভাবিক হয়ে যায়। আমি ব’মি করে ক্লান্তিতে ঢেলে পড়লাম ইফানের বুকে। অতঃপর চোখ বুজবার আগ অব্ধি ফিসফিস করে বলতে লাগলাম,
–“আই হেইট য়্যু। আই হেইট য়্যু। আই হেইট য়্যু।”

জ্ঞান হারিয়ে ইফানের বুকে লেপ্টে রইলাম। ইফান তপ্ত শ্বাস ছেড়ে আমার মাথা তার বুকের বাম পাশে শক্ত করে চেপে ধরে। অতঃপর চোখ বন্ধ করে ব্যথাতুর স্বরে হিসহিসিয়ে বলে উঠে,
–“হুম, আরও বেশি ঘৃণা কর। ঠিক এতটাই ঘৃণা কর যেন তোমার বুকের ভেতর দাউদাউ করে জ্বলতে থাকা য’ন্ত্রণাগুলো আমার বেইমান হৃদয়টাকে ঝলসে দেয়। তোমার লুকায়িত সব কষ্ট আমার হোক, আগুনপাখি। আই ডিজার্ভ দিস। বাট নো দিস, এই কলুষিত জীবনের প্রথম এবং শেষ চাওয়া তুমি। আর আজও তোমাকে না পেয়ে দিশেহারা আমি।”


বাংলাদেশ।।

সাতসকালে কুয়াশায় ঢাকা পড়ে আছে চৌধুরী ম্যানশন। ধরিত্রী থেকে অন্ধকার কাটতে না কাটতেই সকলের আগে ঘুম থেকে উঠে বাগানে চলে এসেছে ফারিয়া। বাগানের মাটিতে সবুজ দূর্বাঘাসের উপর কুয়াশা পড়ে মুক্তোর মতো চকচক করছে। ফারিয়া খালি পায়ে ঘাসের উপর হাঁটছে আর গুনগুন করে গান গাইছে। তার মন বেশ প্রফুল্ল লাগছে এখন। মূলত শিশির কণা দিয়ে ফর্সা পা দুটো কে ভাজাবে বলে ঘুম বাদ দিয়ে এই শীতের সকালেও বিছানা ছেড়েছে।

❝বোকা আমি, নাকি বোকা এই মন
হৃদয় জড়ালে আমায় কখন
উনিশ কী কুড়ি সবে আমার তখন
ডুবেছিল তোমাতে এ মন…❞

গুনগুন করে গেয়ে ফারিয়া যখন মূহুর্তটি অনুভব করছে তখনই পিছন থেকে কেউ ওর কানের কাছে ফুঁ দিয়ে কিছু চুল উড়িয়ে দিল। শীতল হাওয়ায় মেয়েটির সারা দেহে যেন একটু মৃদু কম্পন তরঙ্গায়িত হলো। মেয়েটি হঠাৎ অনুভব করল তার ঘাড়ে কারো তপ্ত নিশ্বাস আঁচড়ে পড়ছে। ফারিয়া নিজের চুড়িদার খামচে ধরল। অজানা এক অনুভূতির জন্য বুকটা কেমন ধরফর করছে। তক্ষুনি পুরুষালি হাস্কি স্বর কানে আসে,
–“হোয়াই আর ইউ ট্রাইং টু হার্ট ইয়োরসেল্ফ, বিউটিফুল?”

অতি পরিচিত কন্ঠ শুনে হৃদস্পন্দন গতি হারায় ফারিয়ার। মেয়েটার বুকের ভেতর থেকে আসা ডিপ ডিপ আওয়াজ শুনে ঠোঁট বাঁকাল পঙ্কজ। এদিকে ইংরেজিতে গাধা হওয়ায় পঙ্কজের বাক্যটি সম্পূর্ণ বুঝল না ফারিয়া। পঙ্কজ ফারিয়ার ঘাড়ের কাছ থেকে মুখ সরিয়ে সামনে গিয়ে দাঁড়াল। ফারিয়া একদমই অন্য মেয়েদের মতো নেকা নয়। আর ল’জ্জা বিষয়টা, সেটা তো কোনো কালেই তার মধ্যে ছিল না। তবে এই মূহুর্ত ভীষণ ল’জ্জা লাগছে তার। ফারিয়া ধীরে ধীরে চোখ তুলতেই হ্যান্ডসাম ড্যাসিং লুকে পঙ্কজকে দেখে বেহায়ার মতো মুখ হা করে তাকিয়ে রইল।

ক্লিন ফর্সা চেহারা পঙ্কজের। সিগারেটে পোড়া গাঢ় ব্রাউন কালার ঠোঁট। ফর্সা চেহারায় বড্ড বেশি আকর্ষণ করে পঙ্কজের অধরযুগল। মাথায় ব্ল্যাক হুডি টানা। কিছু চুল কপালে পড়ে আছে। পিয়ার্সিং করা কানে একটি কালো পাথরের ছোট দুল দৃশ্যমান। পঙ্কজের ফ্যাশন স্টাইল দেখে ফারিয়ার কাছে পঙ্কজকে সুপারস্টার মনে হচ্ছে।

নিজের দিকে এমন করে তাকিয়ে থাকতে দেখে পঙ্কজের ডার্ক ব্রাউন ওষ্ঠ কোণে বাঁকা হাসির রেশ উদয় হলো। পঙ্কজ প্যান্টের পকেট থেকে এক হাত বের করে ফারিয়ার চোখের সামনে তুড়ি বাজাতেই মেয়েটার ভ্রম কাটে। এতক্ষণ নির্লজ্জের মতো তাকিয়ে ছিল বুঝতে পেরেই আমতা আমতা করতে থাকে ফারিয়া। পঙ্কজ পুনরায় প্যান্টের পকেটে দু’হাত গুঁজে দাঁড়ায়। ফারিয়ার থেকে অনেক লম্বা হওয়ায় পঙ্কজ খানিকটা ঝুঁকে হাস্কি স্বরে শুধালো,
–“হোয়াট আর ইউ ডুইং হিয়ার সো আর্লি, বিউটিফুল?”

–“আজ সকালটা অনেক সুন্দর।”

–“নট মোর দ্যান ইউ।”

পঙ্কজের তৎক্ষনাৎ প্রতিত্তোরে ফারিয়ার গালে সহসা জাফরানি রং হানা দিল। ফারিয়াকে শ্যাই করতে দেখে পঙ্কজ ঠোঁট বাকিয়ে ফারিয়ার নাকে আলতো করে তর্জনী আঙুল ছুঁইয়ে হাস্কি স্বরে বলল,
–“দিস ইজ ইভেন মোর বিউটিফুল।”

এবার লজ্জায় মেয়েটা জিহ্বা দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে কানে চুলগুলো গুঁজে দিতে দিতে নড়েচড়ে দাঁড়াল। অস্থির মেয়েটাকে দেখে পঙ্কজ অধর কামড়ে নিঃশব্দে হাসে। ফারিয়া প্রসঙ্গ পাল্টাতে শুধালো,
–“এত সকালে পরিপাটি হয়ে? না মানে কোথাও যাচ্ছেন?”

ফারিয়ার কথায় পঙ্কজ ঝটপট পকেট থেকে হাত বের করে, হাত ঘড়িতে সময় দেখে বলে উঠলো,
–“উফস, আই’ম রানিং লেট। বাই বিউটিফুল।”

পঙ্কজ বাঁকা হেসে চলে যেতে লাগল। তখনই পিছন থেকে ফারিয়ার কন্ঠ ভেসে আসে,
–“আপনি অনেক সুন্দর। তাই আপনাকে খুব ভালো লাগে।”

এক চঞ্চল রমণীর সহজ স্বীকারোক্তিতে পা থামে পঙ্কজের। পঙ্কজ ঘাড় কাঁধ করে ফারিয়ার পানে তাকায়। অতঃপর এক রহস্যময় বাঁকা হাসি উপহার দিয়ে হাস্কি স্বরে বলে,
–“পৃথিবীর চরম বিধ্বংসী রূপগুলোই অতিরঞ্জিত সুন্দর।”

–“মানে?”

অবুঝের ন্যায় শুধালো ফারিয়া। পঙ্কজ উত্তর করলো না। বরং পুনরায় রহস্যময় হেসে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে যেতে গেয়ে উঠলো,

❝যদি তুমি ভালোবাসো ভালো করে ভেবে এসো
খেলে ধরা কোনো খানে রবে না,,
আমি ছুয়ে দিলে পরে অকালেই যাবে ঝরে
গলে যাবে যে বরফ গলে না…❞

পঙ্কজ ফারিয়ার চোখের আড়াল হয়ে যেতেই পঙ্কজের কণ্ঠ আর শুনতে পেল না। ফারিয়ার কোনো কিছু বোধগম্য হল না বিধায় ভাবুক চিত্তে মাথা চুলকাতে লাগল।


মেসেজের টুং টুং শব্দে ঘুমের মধ্যেও বেশ বিরক্ত হল মাহিন। বিছানায় বালিশের উপর মুখ গুঁজে ঘুমাচ্ছিল সে। তবে একটু পরপর মেসেজের শব্দ তাকে ঘুমাতে দিচ্ছে না। অবশেষে বিরক্তি নিয়ে হাতরে বালিশের পাশ থেকে ফোনটা নিল। ফোনের ডিসপ্লে চোখের সামনে ধরতেই ঘুম জড়িত আধখোলা চোখ আটকালো ফোনের স্ক্রিনে। একটা খয়েরী রঙের গাউন পরহিত মেয়ের হাস্যজ্জল চেহারা ভেসে আছে।মাহিন ঘুম জড়িত আধখোলা চোখেই বেশ মনযোগ দিয়ে দেখতে লাগল। হঠাৎই যখন মনে পড়ল মেয়েটাকে সে চেনে তখনই ঘুম উড়ে যায়। মাহিন চোয়াল শক্ত করে আওড়ায়,
–“মিস ঝগড়ুটে !”

পরোক্ষণেই মনে পড়ে তার ফোনে জুইয়ের ছবি কোথা থেকে আসল? মাহিন ফোনে ভালো করে লক্ষ করতে দেখল হোয়াটসঅ্যাপে মম মেসেজ পাঠিয়েছে। মনিরা বেগম জুইয়ের কিছু ছবি দিয়ে লিখেছে,
–“দেখ পছন্দ হয়েছে কিনা। আমার কিন্তু মেয়েটাকে বেশ পছন্দ হয়েছে। এবার তো বিয়ে করে ঘর সংসারে মন দাও। আর কতকাল এত বড় ছেলে দেখে রাখব। এখন এটা বলো না যে, আমি বিয়ে করব না। ছন্নছাড়া ইফান বাবা যদি ঘর সংসারে মন দেয় তাহলে তুমিও পারবে।”

মায়ের হুটহাট এরূপ মেসেজ দেখে মাহিন তাজ্জব বনে গেছে। তার চেয়েও বড় কথা, পৃথিবীতে এত এত মেয়ে থাকতে শেষে কিনা এই ঝগড়ুটে মেয়েটাকে তার মার পছন্দ হলো? মাহিনের ভাবনার মাঝেই মনিরা বেগম আরেকটি মেসেজ পাঠায়।
–“পছন্দ হয়েছে মেয়ে? আমি কি কথা এগোবো?”

মনিরা বেগমের কথায় মাহিন বলার ভাষা খুঁজে পাচ্ছে না। মাহিনের এখন মনে হচ্ছে সে স্বপ্ন দেখছে বোধহয়। কিন্তু না, এটা তো সত্যিই বাস্তব। মাহিন এবার মনিরা বেগমকে মেসেজ পাঠালো,
–“আগেও বলেছি এখনও বলছি, আমি বিয়ে করব না। এ নিয়ে আর কোনো কথা শুনতে চাই না।”

মনিরা বেগম তৎক্ষনাৎ রিপ্লাই দিলো,”হ্যা এখন করবি না, আমি না থাকলে ঠিকই করবি।”

–“মম।”

–“কি মম? তোর যা ইচ্ছে তাই কর। এক মেয়েও জন্ম দিলাম সেও নাকি বিয়েসাদী করবে না। তোরা দুই ভাই বোন নিজেদের মর্জি মতোই চল। আমি থাকলেই কি না থাকলেই কি?”

–“কোথায় আছ তুমি? কিচেনে নাকি রুমে? আমি আসছি?”

–“খবরদার আসবি না। আমার সাথে তোদের কথা নেই। যেদিন মরে যাব সেদিন ঠিকই এই হতভাগী মায়ের কথা মনে পড়বে। তোদের যাই ইচ্ছে তাই কর।”

–“মাআ।”

মাহিনের শেষ মেসেজ আর সেন্ড হলো না। তার মানে মনিরা বেগম আবার ব্লক মেরেছে। এটা নতুন কিছু না। ছেলেমেয়েরা লন্ডনে চলে যাওয়ার পর থেকে মনিরা বেগম এভাবেই সকাল-বিকাল মেসেজ দিয়ে খুঁজ খবর নেয়। আর ছেলেমেয়েরা যখন প্রাপ্ত বয়স্ক হয় তখন থেকেই শুরু হয় এমন ইমোশনাল অত্যাচার। যখন দেখে নিজের সন্তানরা কথা শুনছে না, তখন ব্লক করে দেয়। তারপর আবার এক দু ঘন্টা পর নিজেই ব্লক খুলে। মাহিন দেশে আসার পরও মনিরা বেগমের দীর্ঘসময়ের অভ্যস রয়েই যায়। তাই তো কখনো রুমে এসে বাচ্চাদের ডাকে না। বরং আগের মতোই মেসেজ করে।

মাহিন মায়ের ছেলেমানুষি দেখে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে। অতঃপর ফোন রেখে দিবে তখনই আবারো চোখ আটকায় ফোনের স্ক্রিনে ঝলঝল করা হাস্যোজ্জ্বল মেয়েটার পানে। মাহিন তার মায়ের দেওয়া সবগুলো ছবি এক এক করে দেখতে লাগল। কেন জানি আজ জুইয়ের প্রতি আকর্ষণ কাজ করছে তার। এভাবেই অতিবাহিত হয় অনেকটা সময়। সবগুলো ছবি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে মনযোগ দিয়ে দেখার পর যখন দেখে সব ছবিই দেখা শেষ তখনই হুঁশ ফিরে মাহিনের। তৎক্ষনাৎ ফোন রেখে বিছানা ছাড়তে ছাড়তে বিরক্তি নিয়ে আওড়ালো,
–“ডিজগাস্টিং।”


রাস্তায় দাঁড়িয়ে রাগে ফুঁসছে জুই। ফলে নাকের পাঠা ফুলে উঠছে। জুইকে দেখে ঠোঁট টিপে হাসছে সোমা আর মিনা। রাস্তার পাশেই আবিরের গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। আজও হঠাৎ করে জুইকে কলেজে দিয়ে আসবে অজুহাতে আবির হাজির। কিন্তু বিপত্তি ঘটে মাঝ রাস্তায় এসে আবিরের গাড়ি নষ্ট হয়ে যাওয়ায়। গত দশ মিনিট ধরে রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছে তারা। জুই চোয়াল শক্ত করে বলল,
–“আপনাকে আমি পইপই করে বলেছিলাম আপনার সাথে যাব না। এখন দেখলেন তো। শুনুন আবির ভাই, ভন্ডামি ছাইড়া দেন।”

জুইয়ের শেষ বাক্যে ফিক করে হেসে ফেলল সোমা আর মিনা। জুই কড়া চোখ করে তাকাতেই থেমে গেল। আবির বেশ বিব্রতবোধ করছে। গলা খাঁকারি দিয়ে কণ্ঠ খাদে নামিয়ে বলল,
–“এভাবে বলছ কেন পিচ্চি?”

–“খবরদার আবির ভাই, আপনি এভাবে আমাকে পিচ্চি বলে ডাকবেন না। আমি এখন বড় হয়ে গেছি।”

আবির শার্টের কলার ঠিক করতে করতে ভাবসাব নিয়ে বলল,
–“পিচ্চিকে পিচ্চি বলব না তো কি বলব, বুড়ি?”

জুই দাঁতে দাঁত পিষে বললো, “ফাইজলামি করবেন না। আমার একটা সুন্দর নাম আছে। আপনি আমার নাম ধরে ডাকবেন।”

–“ঠিক আছে জুইবুড়ি।”

–“আবির ভাই..”

জুই তেতে উঠতেই উপস্থিত তিনজন উচ্চ স্বরে হেসে দিল। জুই দাঁতে দাঁত কটমট আওয়াজ করে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে লাগল। জুইকে সিরিয়াস হতে দেখে আবির ভরকে যায়। অতঃপর বড় বড় পা ফেলে জুইয়ের বাহু ধরে আটকে বলে উঠে,
–“সরি সরি আর হবে না।”

গাড়ি ঠিক হতেই আবারো সকলে গাড়িতে উঠে বসল। আবির ড্রাইভিং করছে। তার পাশের সিটে গাল ফুলিয়ে বসে আছে জুই। পিছনে সোমা আর মিনা জুইকে দেখে ঠোঁট কামড়ে হাসছে। ফ্রন্ট মিররে এটা আবার জুই দেখে চেঁচিয়ে উঠলো,
–“আরেকবার দাঁত বের করলে একটা চটকানাা মারবো।”

আবিরের সামনে রাম ধমক খেয়ে সোমা আর মিনার মুখ চুপসে গেল। আবির ফ্রন্ট মিররে লুকিয়ে জুইকে যখন দেখছিল তখনই আচমকা জুইয়ের সাথে চোখাচোখি হয়ে যায়। জুই রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে বলে উঠলো,
–“বয়স হয়তাসে ভন্ডামি ছাইড়া দেন আবির ভাই। নাহলে কিন্তু এইবার খালাম্মার কাছে নালিশ জানিয়ে দিব।”

–“কি নালিশ জানাবে শুনি?”

জুই বাঁকা হেসে মুখে হাত ধরে বড়সড় হাই তুলতে তুলতে বলল, “তেমন কিছু না। শুধু বলব খালাম্মা আপনার ছেলে বুড়া হয়ে যাইতাসে তাড়াতাড়ি বিয়ে দিয়ে দেন। নাহলে পরে বুড়ো ছেলের জন্য মার্কেটে বউ খুঁজে পাবেন না।”

জুইয়ের কথা শুনে সোমা আর মিনা উচ্চ স্বরে হাসিতে ফেটে পড়ল। জুই আবিরের চুপসে যাওয়া চেহারা দেখে মুখে হাত ধরে চাপা হাসতে লাগল। আবির কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলে উঠলো,
–“তখন আমি আম্মাকে বলব বউ কোথাও না পেলে তোমাকেই বউমা করে নিতে। কি বল, কেমন হবে?”

জুই মুখ মুচড়ে বলল, “আজাইরা কথা বলবেন না আবির ভাই। আমি কোন দুঃখে আপনাকে বিয়ে করব বালাইষাট।”

–“ওমা দুঃখে বিয়ে করতে যাবে কেন? আনন্দে করবে।”

–“আহাহা আমার তো খেয়েদেয়ে কাজ নেই যে আপনাকে বিয়ে করতে হবে, উহু।”

জুই মুখ মুচড়ে মুখ ঘুরিয়ে নিল। আবির খানিকটা সময় নিরব থেকে শুধু জুইকে আড় চোখে দেখল। অতঃপর স্টিয়ারিং ঘুরাতে ঘুরাতে মৃদু হেসে বলল,
–“ডেস্টিনি একটা শব্দ আছে। কে বলতে পারে তোমার ডেস্টিনিতে শুধু আমিই আছি।”

এবার জুই আবিরের দিকে তাকালো। একটু ভেবে বলে উঠলো,
–“উমম, যদি না থাকেন তখন?”

বাক্যটা আবিরের কর্ণপাত হতেই কেমন যেন তার দেহে মৃদু কম্পন বয়ে গেল। আবির একটা শুকনো ঢোক গিলে বিরবির করে আওড়ালো,
–“তখন আমি বোধহয় আর বাঁচব না পিচ্চি।”


দুবাই।।

সকাল হতেই সূর্যের আলো ছড়িয়ে পড়েছে সূদুর দিগদিগন্তে। সেই আলোয় মরুভূমির সোনালী বালি ঝলমল করছে। আর আধুনিক উঁচু বিল্ডিংগুলো যেন সেই বালির মধ্যে কাঁচের স্ফটিকের মতো উজ্জ্বল। সম্পূর্ণ শহরটা শান্ত, হালকা ধুলোভরা বাতাসে যেন নতুন দিনের আভা ছড়াচ্ছে। রুম মৃদু অন্ধকারাচ্ছন্ন। আমি ঘুমের মধ্যে নড়েচড়ে উঠছি। কেউ আমাকে আরও কিছুটা আগলে নিল নিজের সাথে। আমি পিটপিট করে চোখ খুলতেই ইফানের ঘুমন্ত মুখশ্রী নজরে পড়ে। আমি খানিকটা সময় সেই ক্লান্ত চেহারায় তাকিয়ে রইলাম।

ইফান আমাকে তার বাহুডোরে আবদ্ধ করে তার বুকের সাথে মিশিয়ে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ধরে আছে। ইফানের বলিষ্ঠ দেহের মাঝে আমাকে একদমই ছোট্ট মনে হয়। গতকাল রাতে বলেছিল, সে কদিন যাবত নির্ঘুমে। তাই আর ডেকে ঘুম ভাঙাতে ইচ্ছে করছে না। এদিকে কম হলেও সকাল নয়টা দশটা বেজে গেছে। আমার মাথাটা এখনো কেমন ভার হয়ে আছে। মাথায় আলতো হাত রাখতেই রাতের কিছু দৃশ্য চোখের সামনে ভেসে উঠলো। দীর্ঘ শ্বাস ছেড়ে ইফানের মুখের দিকে তাকালাম। ঘুমন্ত অবস্থায় লোকটাকে বড্ড বেশি সুন্দর লাগে। আমি হাত বাড়িয়ে আলতো করে ইফানের চুলের ভাজে ভাজে আঙুল ঢুকিয়ে হাত বুলিয়ে দিতে থাকলাম। বোধহয় খানিকটা আরাম পাচ্ছে, তাই আমাকে আরও কাছে টানতে চাইল।

আমি ইফানের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে লোকটার নগ্ন বুকটাতেও চোখ বুলালাম। লোকটার শারা দেহে অনেক ছোট বড় আঘাতের ক্ষতচিহ্ন। আমি ইফানের বুকের ক্ষতচিহ্নগুলোতে আলতো হাত বুলিয়ে দিতে লাগলাম। লোকটার দেহে এখন অনেক টেটু আঁকা। আমার সাথে বিয়ের আগে আরও বেশি ছিল। তারপর সব মুছে দেয়। যতটুকু জানি মাফিয়াদের পুরাতন একটা প্রথা ছিল। যেখানে দেহের টেটু দিয়ে চেনা যেত সে ঠিক কেমন ধরনের অপরাধী এবং ক্ষমতাবান। যার অপরাধ সংখ্যা বেশি সে দেহে তত বেশি ভয়ংকর টেটু আঁকতো। অপরাধ অনুযায়ী টেটুর ধরন আলাদা রকম হয়। ইফানের দেহে ছোট বড় অনেক ধরনের ভয়ংকর টেটুই আছে। তবে ঘাড়ের মধ্যে বিচ্ছু টেটুটা আলাদা নজর কারে।

আমি ইফানের দেহে হাত বুলিয়ে দিতে গিয়ে ওর বাহুতে নজর আটকায়। সেখানেই তো আমার চেহার টেটু আঁকা। আমি টেটুর উপর তর্জনী আঙুল দিয়ে কিছু সময় আঁকিঝুকি করলাম। অনেকটা সময় এভাবেই পেরিয়ে যায়। আমি আর এভাবে শুয়ে থাকতে পারছি না। একই ভাবে অনেকক্ষণ শুয়ে থাকায় শরীরে বি’ষ ব্যথা শুরু হয়েছে। আমি ধীরে ধীরে বিছানা থেকে নেমে পড়লাম। আমার পরনে সফেদা রঙের শার্ট। বোধহয় গতরাতে আমাকে গোসল করিয়ে তার শার্টই পড়িয়ে দিয়েছে, যা আমার হাঁটু অব্ধি ঠেকেছে। আমি খালি পায়ে এগিয়ে গেলাম কালো পর্দায় ঢাকা কাচের দেয়ালের কাছে। ফলে বাইরের আলো একটুও ভেতরে আসতে পারছে না। আমি টান দিয়ে পর্দাটা সরাতেই বাইরের সূর্যের আলো স্বচ্ছ কাচ ভেদ করে চোখেমুখে এসে পড়ল। হঠাৎ এত আলো চোখে পড়ায় চোখ খিচকে নিলাম। আমার ফর্সা মুখশ্রী সূর্যের আলোতে অত্যাধিক ঝিলিক দিয়ে উঠেছে। আমি সময় নিয়ে চোখ খুলে বাইরের দিকে দৃষ্টিপাত করলাম। মূহুর্তেই অবাক হলাম বাইরের সৌন্দর্য দেখে। রাতে আকাশের মেঘগুলো স্পষ্ট ছিলনা। তবে এখন আকাশে ঘুরে বেড়ানো মেঘগুলো অসম্ভব সুন্দর দেখতে লাগছে।

বাইরে বিশাল বড় বড় ভবন। সবগুলোই অত্যাধুনিক আর দেখতে অসম্ভব সুন্দর। দূরে দৃষ্টিপাত করলেই নজরে আসে নীল সমুদ্র। পারস্য উপসাগরের মাঝখানে মানুষের তৈরি বিখ্যাত পাম জুমেইরাহ দ্বীপপুঞ্জকে উপর থেকে পরিষ্কারভাবে একটি পাম গাছের আকারের মতো দেখা যাচ্ছে। এছাড়াও দ্য ওয়ার্ল্ড আইল্যান্ডস নামক ছোট ছোট দ্বীপগুলোকেও সমুদ্রের বুকে ভেসে থাকতে দেখা যাচ্ছে। কি অরুপ সেই দৃশ্য। আবার সমুদ্রের তীরে অবস্থিত পাল তোলা নৌকার আকৃতির বুর্জ আল আর হোটেলটিও এখান থেকে স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান।

কিন্তু যখন উল্টো দিকে তাকালাম, দেখলাম এক অপার্থিব দৃশ্য। আধুনিক কাঁচের দালান আর ব্যস্ত হাইওয়ের ঠিক পাশেই শুরু হয়েছে দিগন্তজোড়া শান্ত সোনালি মরুভূমি। গোধূলির রক্তিম সূর্য যখন আকাশে রাজত্ব করছে, তখন আমার চোখের সামনেই ধূসর বালিয়াড়িগুলো হয়ে উঠছে টকটকে লাল। আধুনিকতার গতি আর মরুভূমির এই নিস্তব্ধতার মেলবন্ধন আমি সচক্ষে যা দেখছি, তা বলে বোঝানো সত্যিই অসম্ভব।

সূর্যের আলো স্বচ্ছ কাচ ভেদ করে বিছানায় ইফানের চোখেমুখে পড়তেই সে বিরক্তি প্রকাশ করে। লোকটার ঘুমের স্বাদ এখনো পুরোপুরি মিটে নি বিধায় মেজাজ তুঙ্গে উঠে গল সঙ্গে সঙ্গে। চোয়াল শক্ত করে চোখ মেলে তাকাতেই ইফানের দৃষ্টি জোড়ায় একরাশ শীতলতা আর মুগ্ধতা চলে এলো। চোখের সামনে কাচের দেয়ালে দু’হাত ঠেকিয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে আছে তার পুরো পৃথিবী। পরনে তারই শার্ট। হাঁটু পর্যন্ত পড়ে আছে ঘন কালো কেশরাশি। পায়ের তালু উঁচিয়ে বাইরে কিছু একটা দেখতে মগ্ন সে। সূর্যের কিরণে মুখের একাংশ ঝলঝল করছে ইফানের চোখের সামনে। গোলাপি অধরযুগলে মৃদু হাসির রেশ। ইফান আমাকে মুগ্ধ নয়নে দেখতে দেখতে আনমনে ঘুম জড়িত মাদকীয় হাস্কি স্বরে আওড়ালো,
–“জান।”

–“হু।”

ইফানের কণ্ঠ কানে আসতেই সহাস্যে প্রতিত্তোর করে পিছনে ফিরলাম। আমার কাছে কেন জানি ইফানের ঘুম জড়িত মাদকীয় কণ্ঠস্বর মন্ত্রপূত মনে হয়। যে কণ্ঠ একটিবার শুনলেই খনিকের জন্য বশীভূত হয়ে যাই। ইফান আমার দিকে তাকিয়ে মৃদু ঠোঁট বাঁকাল। আমি কিছুতা অপ্রস্তুত হয়ে পুনরায় গ্লাসে দু’হাত ঠেকিয়ে বাইরের দিকে তাকালাম। ইফান বিছানা থেকে নেমে আমার কাছে আসতে লাগল। পরনে তার একটা টাউজার, বরাবরের মতো আজও নিম্নাংশে নেমে আছে। এতে অবশ্য কখনোই ইফানের কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। ইফান পিছন থেকে এসে আমার দু’হাতের উপর হাত রেখে আমার সাথে মিশে দাঁড়াল। ইফানের বস্ত্রহীন দেহ আমার শরীর ছুঁতেই কেমন যেন নিজের ভিতর অস্থিরতা কাজ করছে। আমি জিহ্বা দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে শুকনো ঢোক গিললাম। ইফান আমার এক হাতে হাত রেখে আরেক হাতে আমার কাঁধ থেকে চুলগুলো সরিয়ে এক পাশে রাখল। অতঃপর আমার কোমর জড়িয়ে ধরে তার সাথে আরও মিশিয়ে নিয়ে আমার ঘাড়ে মুখ ডুবিয়ে জুড়ে শ্বাস টানল। তারপর ছোট ছোট চুমু এঁকে দিতে থাকে। আমি কোনোরূপ বাঁধা দিলাম না। ইফান আমার ঘাড়ে কখনো ঠোঁট ছুঁইয়ে দিচ্ছে, কখনো নাক ঘষছে, তো কখনো জিহ্বা ছুঁইয়ে দিচ্ছে। ঘাড়ে সেঁতসেঁতে অনুভব করতেই নড়েচড়ে উঠলাম। তবে কেন যেন ইফানকে বারণ করার জন্য মুখ থেকে বুলি আসছে না। আমার অস্থিরতা দেখে ইফান আমার কানের লতিতে আলতো কামড়ে সেখানে ঠোঁট ছুঁইয়ে হিসহিসিয়ে বলে উঠলো,
–“উমম, শরীর এখনো খারাপ লাগছে?”

–“উহু।”

–“এখানে কি করছিলে?”

–“এখান থেকে ভিউ খুব সুন্দর আসে।”

ইফান আমার ঘাড়ে পুনরায় মুখ ডুবিয়ে দিল। তার একটা অবাধ্য হাত আমার কোমর ছুঁইয়ে উদরে আসতেই আমি ইফানের হাতের উপর হাত রাখলাম। কিছুটা সময় আমাদের দু’জনের মধ্যে নীরবতা চলল। ইফানের অবাধ্য হাতের বিচরণ আমাকে ভীষণ বিরক্ত করছে। যখন শার্টের প্রথম বোতাম খুলতে উদ্ধত হয় তখনই আমি ঝটপট ইফানের দিকে ঘুরে দাঁড়ালাম। একটা ঢোক গিলে গলা খাদে নামিয়ে শুধলাম,
–“এমন বিরক্ত করছ কেন?”

–“তুমিও তো করেছ?”

–“কিহ্ আমি কখন করলাম?”

আমার এমন অবাক হওয়া চেহারা দেখে ইফান বাঁকা হেসে আমার ঠোঁটে শব্দ করে একটা চুমু খেয়ে বলল,
–“রাতের কথা কি ভুলে গেছ?”

–“মিথ্যা বলবে না একদম। আমি কিছু করি নি।”

আমার এহেন প্রতিক্রিয়ায় ইফান ঠোঁট কামড়ে চাপা হেসে, হাস্কি স্বরে হিসহিসিয়ে বললো, “তাই? ভালো করে আমাকে দেখ তো, তুমি কি না করেছ।”

আমি ইফানের কথায় বোকা বনে তার দিকে তাকিয়ে দেখলাম। ইফানের গালে কামরের দাগ বসে আছে। নাকের ডগাও অস্বাভাবিক লালছে হয়ে। গলা, ঘার সহ বুকের অনেক জায়গায় কামড়ের দাগ সহ বেশ অনেকগুলো লালছে দাগ রয়েছে। অজানা শঙ্কায় অধর কামড়ে আড় চোখে ইফানের দিকে তাকাতেই ইফানের বাঁকা হাসি লক্ষ করতেই গাল ফুলিয়ে বলে উঠলাম,
–“আমি কিছু করি নি। বোধহয় মশা কামড়েছে।”

–“আমারও তাই মনে হচ্ছে, দাঁতওয়ালা বড় সাইজের কোনো লেডি মশার কাজ।”

আমার কথার পিছে বাক্যটি বলেই ইফান এবার আরও বেশি চাপা হাসতে লাগল। ফলে ওর পেক্স কম্পিত হয়। ইফানকে এভাবে হাসতে দেখে এবার আমার রাগ হল। তাই পাশ কাটিয়ে চলে যেতে চাইলে ইফান আমার বাহুে টান দিয়ে নিজের সামনে এনে আমার ওষ্ঠপুটে ডুব দিল। আজ বহুদিন পর ইফানের উন্মাদ দংশনে আমার ওষ্ঠপুট তীব্র ব্যথায় জর্জরিত হয়ে উঠলো। কিছু সময় পেরতেই ইফান অনুভব করল দম নিতে আমার কষ্ট হচ্ছে। তাই সে অনুভূতির লাগাম টানে। অতঃপর জিহ্বা দিয়ে তার ঠোঁটের আশেপাশটা লেহন করে নিয়ে বৃদ্ধাঙ্গুলি দিয়ে আমার ঠোঁট মুছে দিল। আমি অজানা আড়ষ্টতায় জর্জরিত হয়ে মাথা নিচু করে রাখলাম। ইফান দুই আঙুল দিয়ে আমার থুতনি উপরে তুলে গালে আলতো হাত বুলিয়ে দেয়। আমি আড় চোখে ইফানের ঘাড়ে দৃষ্টি রাখতেই নজরে আসে কালচে হয়ে যাওয়া কামড়ের দাগ। আমি ঠোঁট ভিজিয়ে গলা খাদে নামিয়ে বলে উঠলাম,
–“সরি।”

–“হু?”

ইফান না বুঝার মতো ভ্রু উঁচিয়ে। আমি ইফানের চোখের দিকে এক নজর তাকিয়ে পুনরায় ওর ঘাড়ে দৃষ্টিপাত করে ফের বললাম,
–“সরি।”

–“কি বললে?”

আমি এবার অবাক হয়ে ইফানের চোখের দিকে তাকিয়ে বললাম, “সরি।”

–“কি বলছ শুনতে পাচ্ছি না তো?”

ইফান আমার সাথে মশকরা করছে বোধগম্য হতেই চোয়ালের পেশি শক্ত হয়ে আসল। অতঃপর রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে বলে উঠলাম,
–“অসভ্য, অসভ্য, অসভ্য।”

ইফানকে বকে রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে চলে যেতে নিলে ইফান আচমকা আমাকে কোলে তুলে নিলো। অতঃপর আমার নাকে নাক ঘষে ওয়াশরুমের দিকে এগিয়ে যেতে লাগল।


দুবাই মিরাকল গার্ডেন; বিশ্বের সবচেয়ে বড় প্রাকৃতিক ফুলের বাগান। আমাদের রোলস রয়েস গাড়িটি গেইটের সামনে এসে থামতেই পিছনে ইফানের গার্ডদের দুটো গাড়ি ব্রেক কষলো। ইফান গাড়ি থেকে নেমে আমার দিকের ডোর খুলে হাত বাড়িয়ে দিল। ইফান কালোয় নিজেকে মুড়িয়ে রেখেছে। সুট, লং কোট, বুট, চোখের কালো চশমা, মুখে কালো মাস্ক এমনকি হাতের কালো ফিতার ব্রান্ডের ঘড়িটি সবই যেন তার বিলাসবহুল আভিজাত্যের প্রতীকী। লোকটা বড্ড বেশি সুদর্শন। আমি ইফানের হাত ধরে নেমে সামনের দিকে তাকাতেই চোখ কপালে উঠে যায়।

প্রথমেই নজর আটকে যায় প্রবেশপথের রঙিন ফুলের সুড়ঙ্গটি দেখে। ইফান আমার হাত নিজের হাতের মুঠোয় করে এগিয়ে যেতে থাকে সেই নজরকাড়া ফুলের সুড়ঙ্গ পথ দিয়ে। ভেতরে ঢুকতেই মনে হলো এ যেন মরুভূমির বুকে এক জীবন্ত রূপকথায় পা রেখেছি। চারদিকে লাখো ফুলের মিষ্টি সুবাস আর বর্ণিল নকশা নিমেষেই মন দখল করে নিল। আমি অবাক হয়ে ইফানের দিকে তাকাতেই সে মাস্ক খুলে ঠোঁট বাকিয়ে মৃদু হেসে আমার কপালে চুমু এঁকে দিল। অতঃপর আমার হাত ধরে ভেতরের দিকে এগিয়ে যেতে থাকে। ভেতরে প্রবেশ করতেই চোখে পড়ে হৃদয়, রাজকীয় দুর্গ আর বিশালাকার উড়োজাহাজের আদলে গড়া অসাধারণ সব ফুলের ভাস্কর্য। পথের দু’পাশে রঙের উৎসব আর ফোয়ারার কলতান সহ দুবাই মিরাকল গার্ডেনের সৌন্দর্য দেখে মুগ্ধ হয়ে গেলাম। এখানকার সব মিলিয়ে এটি যেন প্রকৃতির তুলিতে আঁকা এক জাদুকরী স্বপ্নপুরী।

ইফান আমাকে নিয়ে বাগান ঘুরিয়ে দেখাচ্ছে। এত্তো বড় বাগান এরিয়া, অথচ আমি আর ইফান ছাড়া কোনো মানবীর সাড়াশব্দ নেই। থাকবেই বা কিভাবে? আমাকে এখানে ঘুরতে নিয়ে আসবে বলে আজ সারাদিনের জন্য পুরো এরিয়া বুক করে নিয়েছে। অনেকটা সময় আমরা এক সাথে কাটালাম। বেশ অনেকক্ষণ হাঁটার ফলে আমার শরীর খুব খারাপ লাগতে শুরু করল। আমি ক্লান্ত হয়ে হঠাৎই দাঁড়িয়ে পড়লাম। ইফান আমাকে থামতে দেখে আমার পানে তাকালো। আমার শুকনো চেহারা দেখে উদগ্রীব হয়ে উঠে শুধালো,
–“কি হয়েছে জান তোর?”

আমি ইফানের বুকে মাথা রেখে আশ্রয় নিলাম। হঠাৎ আমার এমন আচরণে খানিক ভরকালো ইফান। তবে তার প্রকাশ ঘটলো না। বরং ইফান আমাকে আগলে নিল। আমি খুব ক্লান্ত স্বরে হিসহিসিয়ে বললাম,
–“ভালো লাগছে না বাসায় নিয়ে চল?”

–“হঠাৎ কি হলো তোমার? ওয়েট ডক্টরকে কল করছি।”

–“আমার ভালো লাগছে না কিছু। তুমি আমাকে দেশে নিয়ে চল।”

হঠাৎ এমন আবদারে ইফান এক মূহুর্ত ভাবনায় ডুব দিল। পরক্ষণে আমার মাথায় আলতো করে হাত বুলিয়ে দিয়ে বলে উঠলো,
–“দেশে গিয়ে কি করবে। আমি ডিসিশন নিয়ে নিয়েছি। দুবাই থেকে আমরা সরাসরি ফ্রান্স ব্যাক করব। এন্ড সেখানেই আমার সাথে তুমি পার্মানেন্ট স্টে করবে।”

–“আমি নিজের দেশ ছাড়া কোথাও যাব না। প্লিজ ইফান, আমাকে দেশে নিয়ে চল। এখানে আমি সত্যি অসুস্থ হয়ে যাব। প্লিজ।”

–“দেশে ফিরে কি করবে, যেখানে আমি ফ্রান্স থাকব?”

–“দেশে আমার সব। তুমি আমায় আজই নিয়ে চল। এখানে দম বন্ধ হয়ে আসছে।”

ইফান আরও কিছু বলতে যাবে তার আগেই মাথা তুলে কাতর চোখে তার দিকে তাকালাম। ইফান আমার এই চোখে বেশিক্ষণ দৃষ্টি রাখতে পারলো না বিধায় চোখ সরিয়ে দীর্ঘ শ্বাস ছেড়ে আমাকে কোলে তুলে নিয়ে গার্ডেন থেকে বেরিয়ে আসে। ইফানকে আসতে দেখেই বাইরে অপেক্ষা করতে থাকা গার্ডরা গাড়ির ডোর খুলে দেয়। ইফান আমাকে গাড়িতে বসিয়ে দিয়ে গাড়ি স্টার্ট দেয়।

ইফান ড্রাইভিং করছে আর আমি ওর বাহু জড়িয়ে ধরে কাঁধে মাথা রেখে নিশ্চিন্তে চোখ বুজে রইলাম। ইফান দেশে আসার পর থেকেই আমার মধ্যে পরিবর্তন লক্ষ করেছে। তবে আজ সে সবচেয়ে বেশি আশ্চর্য হচ্ছে। কারণ যে কাজগুলো আমাদের বিবাহিত জীবনে আমি কোনোদিন করি নি, আজ তা করছি। ইফান ফ্রন্ট মিররে আমার ক্লান্ত মুখশ্রী দেখে আদুরে কণ্ঠে শুধালো,
–“জান খুব সিক ফিল করছ?”

–“এ…”

এটুকু উচ্চারণ করতে না করতেই আচমকা বমি চলে আসতে লাগল। আমি মুখে হাত ধরে “ওয়াক” করে উঠলাম। মাঝ পথে ইফান গাড়ির ব্রেক কষে। উত্তেজিত হয়ে আমার সারা মুখে হাত বুলিয়ে বলতে থাকে,
–“এই বাল মিথ্যে বলছিস কেন? তোর শরীর তো খুব খারাপ দেখছি। না, এখনই ডক্টর দেখাতে হবে।”

আমি ইফানের কাঁধে মাথা রেখেই মৃদু স্বরে বললাম, “ডাক্তার দেখানো লাগবে না। তুমি একটু সাওয়ার ফ্রুট অ্যারেঞ্জ করে দাও।”

আমার এমন আবদার শুনে ইফানের চোখ ছোট ছোট হয়ে গেল। এমন অসুস্থতার মধ্যে আমি কিনা টক খেতে চাইছি? কি আর করার? বউ খেতে চেয়েছে মানে ইফান অবশ্যই তার ব্যবস্থা করবে। ইফান আমার মাথায় চুমু খেয়ে হাত বুলিয়ে দিয়ে আদুরে কণ্ঠে বলল,
–“অ্যাজ ইউ উইশ। তুমি বসে থাক আমি আসছি। বাইরে বের হবে না কেমন।”

ইফান কানে গুঁজে রাখা ব্লুটুথ ওয়ান করতে করতে গাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল। আমি দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে সিটে মাথা হেলে দিয়ে নিজ উদরে হাত রেখে আনমনে ভাবতে লাগলাম। বাইরে ইফান গার্ডদের বলতেই সাওয়ার ফ্রুটের ব্যবস্থা করতে, গার্ডরা ব্যস্থ হয়ে উঠল। ইফান গার্ডদের সাথে কথা বলছে তখনই তার ফোন বেজে উঠে।

আমার বড্ড বমি বমি পাচ্ছে। আমি আর গাড়িতে বসে থাকতে পারলাম না বিধায় নেমে পড়লাম। এবার বাইরের মুক্ত হাওয়ায় মন খুলে শ্বাস টানলাম। ইফান কানে ফোন ধরতেই হঠাৎ চেহারার রং পাল্টে গেলে। চোয়াল অত্যাধিক শক্ত এবং একহাত মুষ্টিবদ্ধ করে ফেলেছে। এই তো লোকটা আজ সারাক্ষণ আমার সাথে নমনীয় ছিল তাহলে কি হলো? আমি আর ভাবলাম না। গা গুলিয়ে আসছে বারবার। আমি নিজের উদরে হাত রাখতে যাব তখনই বিকট শব্দ হলো,
–“ঠাস..”

আমার হাত থমকে গেল, থমকালো ইফান। অজানা শঙ্কায় ইফানের কানে ধরে রাখা হাতটি কেঁপে উঠেছে। ইফান ঢোক গিলে ঘাড় আমার দিকে ঘুরাতেই দেখল তার দিকে স্থির একজোড়া কাতর দৃষ্টি। মূহুর্তেই আমি মুখ ভর্তি রক্ত বমি করে উঠলাম। আমার বুক থেকে র’ক্তের স্রোত বইছে। র’ক্তে রঞ্জিত হয়ে উঠেছে আমার গোলাপি শাড়ি। আমি ধীরে ধীরে হেলে পড়ে যাচ্ছি দেখে ইফানের হাত ফসকে মুঠোফোন পড়তেই হুঁশ ফিরল। তৎক্ষনাৎ গগন কাঁপিয়ে চিৎকার করে উঠলো,
–“জারা..”

আর এক মূহুর্ত ব্যয় করো না ইফান। উন্মাদের মতো ছুটে এসে হাঁটু গেরে আমাকে মাটিতে পড়ার আগে ধরে নিল। চারিদিকে গু’লাগু:লির তীব্র আওয়াজ। ইফানের গার্ডরা ইতোমধ্যে অজ্ঞাত শত্রুদের সাথে গু’লাগু’লি শুরু করেছে। আমার চোখ দু’টো জলে থৈথৈ করছে। ইফান আমাকে তার বুকের সাথে শক্ত করে চেপে ধরে হুংকার ছুড়ল,
–“এই বান্দির বাচ্চা, আমার নিষেধের পরও কেন বেরিয়ে এলি?”

–“আমি বড্ড ক্লান্ত। নাউ আই নিড এন্ডলেস স্লিপ ।”

আমার কথায় ইফানের চোয়াল শক্ত হয়ে গেলো। আমার তনু দেহ ঝাঁকিয়ে চিৎকার করে উঠলো,
–“আরেকবার বলে দেখ তোর লা”শ ফেলে দিব বেইমান।”

আমি মৃত্যু যন্ত্রণা নিয়েও ব্যথাতুর হাসলাম। অতঃপর চোখ বন্ধ করে নিতে চাইলেই ইফান পুনরায় আমার দেহ ঝাঁকিয়ে উঠলো,
–“এমন করলে আমি তোকে মে’রে ফেলব।”

চোখ বন্ধ করতেই তপ্ত জল গড়িয়ে পড়ে। আমি পুনরায় ঠোঁট বাকিয়ে হাসলাম। ইফান এবার কাতর স্বরে ডেকে উঠলো,
–“এমন করে ফাঁকি দিস না জান। একজন আমাকে দুনিয়ার সামনে অপরাধী বানিয়ে একা করে পালিয়েছে। তুই আর এমন করিস না। মরে যাব আমি। সত্যি মরে যাব।”

ইফান তার শুকিয়ে কাঠ হয়ে যাওয়া ঠোঁটগুলো জিহ্বা দিয়ে ভিজিয়ে শক্ত কন্ঠে বলে উঠলো,
–“ককিছ্যু হবে না তোর। আমি তোর কিছু হতে দিব না।”

–“কাকে বাঁচাতে চাইছ? নিজের অনাগত সন্তানের খু’নিকে?”

ইফান বাক্য শেষ করেই আমাকে কোলে তুলে নিয়ে উঠার জন্য উদ্ধত হতেই আমার বাক্যটা তার কর্ণপাত হয়। তৎক্ষনাৎ ইফানের সমস্ত অস্তিত্ব থমকে যায়। আমার ধরে রাখা দেহটায় তার হাতজোড়া অবশ হয়ে আসে। আমি খেই হারিয়ে পড়ে যেতে গিয়েও ইফানের হাতে অবেলায় ঝুলে রইলাম। ইতোমধ্যে ইফানের চোখ বেয়ে এক ফোটা তপ্ত জল আমার গালে এসে পড়েছে। এই নিয়ে তৃতীয়বার চোখের জল ফেলল মাফিয়া বস। ইফান কোনো কথা বলছে না। পাথরের মূর্তির মতো অনুভূতিহীন এক দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। আমি নিজের উপর তাচ্ছিল্য করে হেসে বলে উঠলাম,
–“বলেছিলাম না তোমাকে আয়োজন করে পু’ড়াবো, দেখ আজ তোমাকে পু’ড়াতে গিয়ে আমিই সর্বশান্ত। তোমার খুব ঘৃণা আসছে আমার উপর। খুব তাই না। আমারো ঘৃণা লেগেছিলো যখন তোমার মতো জা’নোয়ারের সন্তানকে পেটে ধরেছিলাম, ঠিক আজ থেকে তিন মাস আগে। যেদিন জানলাম আমার পেটে তোমার সন্তান, সেদিন নিজের উপর এতটা ঘৃণা এসেছিলো যে নিজেকেই শেষ করে দিতে চেয়েছিলাম। কিন্তু আমি শেষ হয়ে গেলে কে প্রতিশোধ নিতো আমার বোনের। আমি যে কবিতা আপুকে কথা দিয়েছিলাম তার মৃত্যুর প্রতিশোধ নিব। দেখ আমি কত উন্মাদ আর নিকৃষ্ট হয়ে গেছি। বিশ্বাস কর তবুও আমি নিজের সন্তানকে মা’রতে চাইনি। কোন মা চায় নিজের গর্ভের সন্তানকে মা’রতে? তিনটা রাতদিন জেগে পাগলের মতো কাটিয়েছি। যখনই ভেবেছি এই সন্তান জন্ম দিব তখনই মনে পড়ে যায় তোমার করা সকল পাপের কথা। ভেসে উঠে সেই বীভৎস রাতটির কথা। বিধ্বস্ত অবস্থায় কবিতা আপু আমার কাছে আসে। একটা সদ্য নবজাতকে আমার কোলে দিয়ে বলে ইফান চৌধুরীকে কোনোদিন ক্ষমা না করতে। শেষনিঃশ্বাস অব্ধি আমার হাত ধরে এই একটা বাক্যই বলে। কিভাবে পারতাম নিজের বোনের খু’নির সন্তানকে পৃথিবীতে আনতে? কিভাবে পারতাম একটি মা হারা এতিমকে রেখে নিজের সন্তানের পিতৃ পরিচয় দিতে? কিভাবে পারতাম ভালোবাসার মানুষকে দেওয়া কথা ভাঙতে?
আমার মস্তিষ্ক কাজ করেনি। অন্তদহনে আমি পুড়ে ছারখার হয়ে যাচ্ছিলাম। কেন এলে আমার জীবনে? আজ যে সব হারিয়ে আমি নিঃস্ব। সারাক্ষণ কানে বাজে একটা শিশুর কান্নার আওয়াজ। স্বপ্নেও আমাকে বিদ্রুপ করে বলে মা তুমি খু’নি। আমি কি করে বাঁচব ইফান? এই অপবাদ যে আমাকে জীবিত অবস্থায় মৃত করে দিয়েছে। আমি এই বোঝা নিয়ে বাঁচতে চাই না।”

আমি অনর্গল বলেই গেলাম। গলা আরও বেশি ধরে এসেছে। দেহ কেমন যেন অবশ হয়ে এসেছে। অনেক যন্ত্রণা হচ্ছে। কিন্তু অন্তরের যন্ত্রণার কাছে হাজার গুন তুচ্ছ। ইফান এখনো নির্জীব পাথর বনে আছে। আমি তাচ্ছিল্য করে হাসলাম। অতঃপর কাঁপা কাঁপা গলায় বললাম,
–“আজ আমি ভাগ্যের কাছে খুব বাজে ভাবে হেরে গেলাম। আমার ফুলের মতো জীবনকে তোমরা সবাই তচনচ করে দিলে। আমি সত্যিই আর এই পাপের বোঝা বয়ে বেড়াতে পারছি না। সব হারিয়ে মস্তিষ্ক অচল। তবুও দেখ এইখানে আরেকটা প্রাণ বয়ে বেড়াচ্ছি।”

আমি নিজের র’ক্তাক্ত হাত উদরে রাখলাম। এতক্ষণ ইফান পাথরের মতো অনুভূতিহীন থাকলেও এখন আমার ইশারা অনুযায়ী আমার উদরে তাকাতেই যেন হুঁশ ফিরে। মূহুর্তেই আমাকে শক্ত করে ধরে তার বুকের সাথে মিশিয়ে নেয়। আমি তাচ্ছিল্য করে হাসতে গিয়েও কেঁদে ফেললাম। দম বন্ধ হয়ে আসছে। খুব কষ্ট করে কাঁপা ঠোঁটগুলো নাড়িয়ে বলে উঠলাম,
–“ওকে মারার ক্ষমতা আমার আর হয়নি। আমার বরং এবার মরে যাওয়ায় উচিত। কি পেলাম এই ব্যর্থ জীবনে? হারাতে হারাতে আজ সর্বহারা। তোমরা সবাই ঠিক আর আমাকেই ভুল প্রমাণ করলে। অবশেষে আমিই অপরাধী হলাম। আমি এক ব্যর্থ প্রেমিকা, ব্যর্থ স্ত্রী, ব্যর্থ জননী। আমি ব্যর্থ নারী। সমগ্র পৃথিবীকে জানিয়ে দিও আমায় ঘৃণা করতে।

চলবে,,,,,

প্রায় পাঁচ হাজার শব্দের অনেক পড় পর্ব দিয়েছি। তাড়াহুড়োর কারণে রিচেক করার সময় পাইনি। ভুলত্রুটি থাকলে বুঝে পড়ে নিও। হ্যাপি রিডিং🫶

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply