জলতরঙ্গেরপ্রেম
পর্ব সংখ্যা;০৯
লেখনীতেনবনীতাচৌধুরি
রাত সাড়ে দশটা বাজে।
চামচের টুংটাং শব্দে মুখরিত হয়ে আছে দেওয়ান বাড়ির ড্রয়িং রুম। ফ্যানের ঘূর্ণনের মৃদু আওয়াজের সঙ্গে চামচ নাড়ার শব্দ অদ্ভুত এক সুর তৈরি করছে। ডাইনিং স্পেসে সবাই যার যার মতো করে খাওয়ায় ব্যস্ত।
ফোরকান দেওয়ান এর বিপরীত দিকের চেয়ার টা আজ ফাঁকা। ফারহান দেওয়ান বাড়িতে নেই বলেই চেয়ার টা শূন্য পড়ে আছে। তরঙ্গ আর তিন্নি পাশাপাশি বসেছে। বুশরা বসেছেন ফোরকান দেওয়ানের পাশে, তাঁর পাশেই সাহনারা। তরী সবার প্লেটে খাবার পরিবেশন করে দিচ্ছে।
সবাই কে মাছের পিছ দেওয়া শেষে তরঙ্গের পাশে এসে থামলো সে। তাকে পাশে এসে দাঁড়াতে দেখে ও তরঙ্গ নিচু মস্তকে প্লেটের দিকে তাকিয়ে রইলো। তা দেখে তরী, চামচে মাছের পিছ তুলে তরঙ্গের পাতে দিতে নিতেই তরঙ্গ বলে উঠলো;-
–” আমি মাছ খাবো না।”
তরঙ্গের কথায় বিস্ময়ে হতবাক হয়ে তার দিকে তাকালো তরী। এই বারে ও তরঙ্গ তাকালো না তরীর দিকে। তরী কে উপেক্ষা করেই দাঁড়িয়ে পড়লো সে। তাকে দাঁড়াতে দেখে ফোরকান দেওয়ান মাথা তুলে তরঙ্গের দিকে তাকালেন। কিছুক্ষণ চুপ থেকে গম্ভীর কন্ঠে সুধালেন তিনি।
–” খাবার রেখে উঠছো কেনো তরঙ্গ? প্লেটের খাবার শেষ করে তারপর উঠো।”
নিরট কন্ঠে তরঙ্গ বললো,
–” আমার খিদে নেই জেঠু।”
ছেলের জবাবে সাহনারা বলে উঠলেন;-
–” কি বলছিস তরঙ্গ? সন্ধ্যায় ও তো নাশতা করিসনি। তাহলে পেট ভরলো কিভাবে?”
–” আমি বলেছি খিদে নেই। পেট ভরা তো বলিনি আম্মু।”
ফোরকান দেওয়ান কিংবা সাহনারা—কার ও ঠোঁটেই আর কথা ফুটে উঠলো না। তার আগেই আচমকা চেয়ার ঠেলে; একবার ও পেছনে না তাকিয়ে। দীর্ঘ পায়ে ডাইনিং স্পেস পেরিয়ে সিঁড়ির দিকে অদৃশ্য হয়ে গেল তরঙ্গ। ছেলের সরে যাওয়ার পথে কিছুক্ষণ স্থির হয়ে রইল সাহনারার দৃষ্টি। চোখের গভীরে এক চিলতে বিস্ময়। ফোরকান দেওয়ানের কথা সচরাচর তরঙ্গ পেলে না। তবে আজ কি হলো ছেলেটার? শরীর খারাপ নাকি?
দীর্ঘ শ্বাস ছেড়ে, পর মুহূর্তেই নিজেকে সামলে নিলেন তিনি। ধীর ভঙ্গিতে মুখ ফেরালেন ভাসুরের দিকে। ঠোঁটের কোণে টেনে আনলেন সংযত এক মৃদু হাসি। যে হাসিতে ফুটে উঠলো সাহনারার ভেতরকার উচ্ছ্বাস। অতঃপর শান্ত ভঙ্গিমায়, মাপা স্বরে কথা শুরু করলেন সাহনারা।
–” ভাইজান কিছু কথা ছিলো আপনার সাথে।”
সাহনারার কথায় খাওয়া থামিয়ে ওনার দিকে তাকালেন ফোরকান দেওয়ান। চোখের চশমা টা ঠিক করে বসলেন তিনি।
–” বলো?”
–” আমার ভাইয়ের মেয়ের বিয়ে সামনের শুক্রবার।”
–” হ্যাঁ?”
–” তাই আমাদের সপরিবারে দাওয়াত করেছে ভাইজান। কালকেই চলে যেতে বলেছেন সবাই কে নিয়ে। এখন আপনি যদি যেতেন আমাদের সঙ্গে।”
সাহনারার কথায় কিছুক্ষণ গম্ভীর মুখে চুপ করে রইলেন তিনি। কিছু একটা ভেবে ফোরকান দেওয়ান বললেন।
–” আমি শুক্রবার যাবো। ফারহান কে বৃহস্পতিবার সকালে পাঠিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করবো।”
ফোরকান দেওয়ান – এর কথায় আনন্দের দীপ্তি ঝলসে উঠল সাহনারার চোখে। বহু প্রতীক্ষিত স্বস্তি নেমে এলো তাঁর ভেতরটায়। ভাসুরের সম্মতি মিলতে আবার খাওয়ায় মন দিলেন তিনি। সবাই কে খাবার বেড়ে দেওয়া শেষে, তরী এসে তিন্নির পাশে খেতে বসে পড়লো। খেতে বসার মিনিট পাঁচেক পর ও মুখে খাবার তুললো না সে। অন্যমনস্ক ভঙ্গিতে থালার ভাত গুলো আঙুলের ডগায় নাড়াচাড়া করে যাচ্ছে তরী। শ্যামবর্ণের মুখে মেঘ জমে তা কালো বর্ণ ধারণ করেছে। তরীর মনমরা সেই রূপ টেবিলে খেতে বসা কেউই খেয়াল করলো না।
সেভাবেই আরো মিনিট পাঁচেক কেটে গেল। তবুও এক লোকমা ভাত ও মুখে তুলল না সে। গলার কাছে যেন অদৃশ্য এক কাঁটা আটকে আছে তার। খাবার গিলতে পারছে না; বুকের ভেতর জমে থাকা কথা গুলোই যেন প্রতিটি লোকমার পথ রুদ্ধ করে রেখেছে তরীর। তিন্নির ডাকে নড়েচড়ে বসলো সে।
–” তুমি খাচ্ছো না কেন আপু?”
তিন্নির প্রশ্নে ফোঁড়ন কাটলেন বুসরা। যেনো এতক্ষণ এই সুযোগের অপেক্ষায় ছিলেন তিনি।
–” বাবা বাড়ি বসে আর কতো গিলবে তিন্নি। পেটে ও তো সইতে হবে তোমার বোনের।”
বুশরার কথায় চমকে সামনে তাকাল তরী। চারপাশে একবার চোখ বুলিয়ে নিল সে। বাবা ইতো মধ্যে উঠে গেছে। চাচি ও রান্না ঘরে চলে গেছে। এই মুহূর্তে ডাইনিং স্পেসে আছে শুধু সে, তিন্নি আর বুশরা। জিভ দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে নিল তরী। পর পর ক্লান্ত ভাঙা স্বরে জবাব দিল সে।
–” আমার সাথে ঝামেলা করতে চান কেন মা? এই পৃথিবীতে আমার তো কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই। ছোটো বোনটা ছাড়া আপন কেউ ও নেই। মা চলে গেছেন চার বছর। হতভাগা আমার সাথে ঝামেলা করে কি শান্তি পান আপনি?”
কথা শেষ করতে না করতেই তিন্নি হঠাৎ ঝাঁপিয়ে পড়ে আঁকড়ে ধরলো তরীকে। বোনের বলা প্রতিটি শব্দ যেন তিন্নির শিশু মনে তীরের মতো বিঁধেছে। তার চোখ বেয়ে নেমে এসেছে টলমলে অশ্রু, গাল ভিজে উঠেছে সেই অশ্রু ধারায়। তরীর সেই কণ্ঠ জুড়ে ছিল অবসাদ আর অসহায়ত্ব। কিন্তু বুসরা তাতে ও ধমলেন না। ঠোঁট বাঁকিয়ে ভেংচি কাটলেন তিনি।
–” হতভাগ্য তোমার না আমার। হতভাগ্য বলেই সতীনের রেখে যাওয়া সতীন কাঁটা পালছি।”
বোন কে চুপ করে কথা শুনতে দেখে তিন্নি দাঁড়িয়ে পড়লো। গাল মুছে রাগী কন্ঠে বলে উঠলো সে।
–” আপনি আমার আপু কে এসব বলছেন কেন? আপু তো আপনাকে কিছু করেনি।”
–” এইটুকু বয়সেই আমার সাথে তর্ক করছো? বোনের সঙ্গে থেকে তার মতোই হচ্ছো দেখছি।”
–” তাতে আপনার কি।”
তিন্নির গলার আওয়াজ বাড়তেই তরী উঠে পড়লো। বোনের হাত ধরে টেনে নিয়ে গেলো তাকে বেসিনের দিকে। রাগে পুশতে পুশতে তিন্নি দাঁড়িয়ে পড়লো। বোনের হাত ছাড়িয়ে দৌড় দিলো উপরের দিকে। পেছনে দাঁড়ানো তরীর শত ডাকে ও বাচ্চা টা থামলো না।
বারান্দায় গিটার হাতে বসে আছে তরঙ্গ।
মাঝে মধ্যে দুই, এক বার গিটারের তাঁরে আঙুল চালিয়ে সুর তুলতে গিয়ে ও থেমে যাচ্ছে সে। নিজের গিটারের সুর আজ নিজের কাছে ই বিচ্ছিরি ঠেকছে তরঙ্গের নিকট। মনের মধ্যে শান্তি না থাকলে যা হয়। কোলের উপর থেকে গিটার টা নামিয়ে দোলনায় রেখে দিয়ে। দোলনা ছেড়ে দাঁড়ালো তরঙ্গ। আচমকা দরজায় কড়া নাড়ার শব্দে তরঙ্গ গমগমে কন্ঠে প্রশ্ন করলো;-
–” কে?”
–” আমি ভাইয়া।”
–” ভেতরে আয়।”
পা টিপে টিপে এঁটো হাতে রুমে প্রবেশ করলো তিন্নি। এঁটো হাতে টলমলে চোখের তিন্নি কে দেখে এগিয়ে এলো তরঙ্গ। দুই পায়ের ট্রাউজার কিঞ্চিত টেনে তিন্নির সামনে হাঁটু গেড়ে বসলো সে।
–” কি হয়েছে টেমা? কাঁদছিস কেন?”
তরঙ্গের আহ্লাদ পূর্ণ কন্ঠ কর্ণকুহরে প্রবেশ করতে; পুনরায় ঝরঝরিয়ে কেঁদে দিলো তিন্নি। এগিয়ে এসে ভাইয়ের গলা জড়িয়ে ধরলো সে। তরঙ্গ ও আলতো হাতে স্নেহের পরশ বুলিয়ে দিলো বোনের পিঠে।
–” আপু কে আবার বকেছে ওনি।”
তিন্নির ওনি সম্বধনে কাকে বোঝাতে চাইলো তরঙ্গ বুঝলো না। মেয়েটার চোখের পানিতে তরঙ্গের ঘাড়ের র্টি-শার্টের কিছুটা অংশ ভিজে উঠেছে।
–” কে আম্মু?”
–” না,”
–” কি বললো?”
–” বলেছে, আপু নাকি ওনার সতিনের কাঁটা। বসে বসে বাবার বাড়ির ভাত খায়।”
তিন্নির থেমে থেমে বলা কথা গুলো শিশার অনুরূপ তরঙ্গের কানে পৌঁছালো। মূহুর্তে চোয়াল শক্ত হয়ে এলো তার। কিন্তু তিন্নি সামনে থাকায় নিজেকে বহু কষ্টে সামলালো তরঙ্গ। বোন কে বুক থেকে সরিয়ে সামনে দাঁড় করালো। বৃদ্ধা আঙ্গুলের সাহায্যে তিন্নির চোখ মুছে গালের চুল গুলো কানের পেছনে গুঁজে দিলো সে।
–” তুই ঘরে যা টেমা। আর একদম কাঁদবি না। ভাইয়া আছি না। সব ঠিক করে দিবো। কেমন?”
–” হুহ।”
–” কান্না বন্ধ কর। তাহলে কাল যাওয়ার পথে চকলেট কিনে দিবো।”
তরঙ্গের মুখে চকলেটের কথা শুনতেই কান্না গিলে নিলো বাচ্চাটা। তরঙ্গ তীক্ষ্ম ভ্রু জোড়া নাচাতেই হেসে ফেললো তিন্নি।
–” তুমি খুব ভালো ভাইয়া।”
বোনের প্রশংসায় মলিন হাসলো সে। কিছু মনে পড়তেই অনুসন্ধানী কন্ঠে তরঙ্গ বলে উঠলো;-
–” তোকে কাজ দিয়েছিলাম যে করেছিস?”
–” কি কাজ?”
–” বলেছিলাম না, তোর বোনের সামনে আমার সুনাম করবি। না না এসব তো আর সহ্য করা যাচ্ছে না। বুঝেছি, এবার একটা সিদ্ধান্ত আমাকে নিতেই হবে!”
তিন্নি চোখ ছোটো ছোটো করে নিলো। কোমল গালে থাকা অবশিষ্ট পানির ফোঁটা টা হাতের তালুতে মুছে প্রশ্ন করলো সে;-
–” কি সিদ্ধান্ত?”
–” রাস্তার পাশের পান দোকানের করিম দাদার সাথে তোকে বিয়ে দিয়ে এই বাড়ি থেকে তাড়াতে হবে। এমন শালি আমার প্রয়োজন নেই।”
তরঙ্গের চুপসে যাওয়া মুখ ভঙ্গিমায় পেট চেপে ফিচ ফিচ করে হেসে উঠলো তিন্নি। তরঙ্গ ও তাল মেলাল।
–” এইবার যা।”
মাথা নাড়িয়ে রুম থেকে বেরিয়ে গেলো তিন্নি। তিন্নি চলে যেতেই দাঁড়িয়ে পড়লো তরঙ্গ। তার মস্তিষ্ক জুড়ে তিন্নির বলা কথা গুলো ঘুরছে। চাচির আজ-কাল বেশ সাহস বেড়েছে। সময় অসময়ে তরী কে কথা শোনাতে ছাড়ছেন না। রাগে দপদপ করে উঠলো তরঙ্গের মস্তিষ্ক। হাতের কাছে থাকা ফুলের টব টা হাতের মুঠোয় শক্ত করে চেপে ধরতেই ভেঙে গেলো তা। কাঁচের ভাঙা অংশ গুলো ক্ষণের মধ্যেই তরঙ্গের হাতে গেঁথে, লাল তরলের অস্তিত্ব দেখা দিলো। সেদিকে একবার তাকিয়ে, আবার চোখ ফিরিয়ে নিলো সে।
–” আমার ভালোবাসা সহ্য হয় না তোর। অথচ দিব্বি মানুষের কটু কথা হজম করিস। এ কেমন অনিয়ম তোর তরী জান?”
চলবে
( প্রিয় পাঠক মহল,
কেমন হয়েছে জানাবেন কিন্তু? মেজর সাহেব সাহেব আর শুভ্রতা কে পড়ছেন তো বইটই থেকে? আর তিন দিন পর কিন্তু দাম বেড়ে যাবে।)
Share On:
TAGS: জল তরঙ্গের প্রেম, নবনীতা চৌধুরী
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
জল তরঙ্গের প্রেম পর্ব ৩
-
জল তরঙ্গের প্রেম পর্ব ৬
-
She is my Obsession পর্ব ১২
-
She is my Obsession পর্ব ৩৩
-
জল তরঙ্গের প্রেম পর্ব ২
-
She is my Obsession পর্ব ৭
-
She is my Obsession পর্ব ২১
-
She is my Obsession পর্ব ৩৪
-
She is my Obsession পর্ব ৩০
-
She is my Obsession পর্ব ১৪