Golpo romantic golpo জল তরঙ্গের প্রেম

জল তরঙ্গের প্রেম পর্ব ৮


জলতরঙ্গেরপ্রেম

পর্ব সংখ্যা;০৮

লেখনীতেনবনীতাচৌধুরি

–” বউ হোস আমার। তরঙ্গ দেওয়ানের বউ! আমি জেনে কি করবো মানে?”

কপালের চামড়া কুঁচকে এলো তরীর। ছেলেটা কি পুরোই পাগল হলো নাকি? এতোদিন ভালোবাসি বলে দাবী করতো। এখন তো ডিরেক্ট বউ বলছে। কিছুক্ষণ চুপ থেকে তরঙ্গ কে কিছু কঠিন কথা শোনানোর প্রস্তুতি নিলো তরী। কিন্তু সে মুখ খোলার আগেই তরঙ্গ ফের সুধালো;-

–” এখন আবার প্যান প্যান করিস না। যে তুই আমার বউ হলি কবে।”

তরঙ্গ থামলো, গম্ভীর মুখ জুড়ে দেখা দিলো একরাশ মুগ্ধতা।

–” বউ তো তুই আমার ই হবি। দুই দিন আগে আর পরে। সমস্যা কি এখনি বউ ডাকলে? অভ্যাস করে নে।”

তরী দীর্ঘ শ্বাস চাপলো। তরঙ্গের সাথে শুধু শুধু তর্ক করার কোনো মানেই হয় না।

–” আর কিছু?”

–” ও যা বলছিলাম। তোর কটা জামা আছে? জলদি বল।”

তরী কোনো জবাব দেওয়ার প্রয়োজন বোধ করলো না। গটগটিয়ে হেঁটে সরে গেলো সে। তরঙ্গ কিছুক্ষণ তার চলে যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে রইলো। অতঃপর নিঃশব্দে নিজের ঘরের দিকে পা বাড়ালো সে।

ঘরে ঢুকেই কার্বাড থেকে কালো শার্ট আর প্যান্ট টা বের করলো তরঙ্গ। ওয়াশরুমে গিয়ে দ্রুত ফ্রেশ হয়ে ফিরে এলো সে। পোশাক গুলো গায়ে জড়িয়ে, আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়ালো তরঙ্গ। থুতনিতে হাত রেখে গাল এদিক ওদিক ঘুরিয়ে নিজেকে পরখ করলো সে। বেয়ার্ড গুলো সামান্য বেড়েছে। পর পর হা করে দাঁত দেখলো। দাঁত ও সাদা। বাকি সব তো ঠিকিই আছে। নিজ মনে বিরবিরালো তরঙ্গ;-

–” সুন্দর ই তো লাগছে আমাকে। তবে সিনিয়র পাত্তা দেয় না কেন?”

দেখা শেষে, ওয়ারড্রবের ওপর রাখা হেলমেট আর বাইকের চাবি টা তুলে নিয়ে নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে বেরিয়ে গেলো রুম থেকে।


পূর্ণিমার ভরা চাঁদের আলোয় চারপাশ যেন ধুয়ে-মুছে পরিষ্কার।

স্বচ্ছ পানিতে সেই আলো পড়ে পুকুরের পানি ঝলমল করে উঠেছে। নিস্তব্ধ রাতের বুকে রুপালি ঢেউ নেচে বেড়াচ্ছে মৃদু বাতাসে। খোলা চুলে বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে তরী। চাঁদের আলো এসে তার মুখের ওপর পড়েছে। চোখ জোড়া দূরের আকাশে স্থির। অথচ মন যেন অন্যখানে। আকাশ থেকে চোখ ফিরিয়ে তরঙ্গের বারান্দার দিকে তাকালো তরী। রুমের লাইট বন্ধ। তার মানে ছেলেটা এখনো বাড়ি ফিরেনি।

–” আপু?”

তিন্নির ডাকে ধ্যান হুঁশ ফিরলো তরীর। অলগোছে চুলে হাত খোঁপা করে রুমে ফিরলো সে। পড়ার টেবিলে মাথা রেখে তার দিকে তাকিয়ে আছে তিন্নি। মলিন হেসে তরী জিজ্ঞেস করলো;-

–” হোমওয়ার্ক শেষ?”

–” হু,”

–” যাও ছুটি।”

খুশিতে চিকচিক করে উঠলো তিন্নির চোখ। বোনের দিকে তাকিয়ে অবাক স্বরে প্রশ্ন করলো সে।

–” এতো তাড়াতাড়ি?”

–” হ্যাঁ, যা নিচে গিয়ে টিভি দেখ।”

মাথা নাড়িয়ে, পড়ার টেবিল গুছিয়ে রুম থেকে বেরিয়ে গেলো তিন্নি। বোন চলে যেতেই ছাদ থেকে তুলে আনা পোশাক গুলো একে একে ভাঁজ করে ওয়ারড্রবে রেখে দিলো তরী। পুরো রুমে চোখ বুলিয়ে দেখলো কিছু অগোছালো আছে কিনা। অতঃপর জামা কাপড়ের ব্যাগটা কার্বাডের উপর থেকে নামিয়ে জামা কাপড় গোছানোতে মন দিলো সে। না হয় সকালে এসে আবার চাচি বকা বকি শুরু করবে। কখন বের হবে তা তরীর জানা নেই। রাতের খাবার খাওয়ার সময় চাচি বলবে। এটা ও জানে সে।


ড্রয়িং রুমের মেঝেতে বসে টিভিতে কাটুন দেখছে তিন্নি।

মেঝেতে বসার কারণ, টিভির সাউন্ড কম রাখার দরুন ওতো দূরে সোফায় বসলে কথা বুঝতে পারছে না বাচ্চা টা। কলিং বেল বাজতেই টিভির সামনে থেকে ছুটে দরজার সামনে এসে থামলো তিন্নি। উপরের ছিটকিনি দেওয়া। লাফিয়ে লাফিয়ে ছিটকিনি টা খুলে ফেললো সে। মাথায় হেলমেট লাগিয়ে শপিং ব্যাগ হাতে তরঙ্গ দাঁড়িয়ে। মিষ্টি হাসলো তিন্নি।

–” এসো ভাইয়া।”

পায়ের স্নিকার্স টা খুলে ধীর পায়ে ঘরের ভেতর প্রবেশ করল তরঙ্গ। ঘরে ঢুকেই ড্রয়িং রুমে চোখ বুলালো সে। পুরো ড্রয়িং রুম ফাঁকা। কৌতূহল না দমিয়ে প্রশ্ন করলো তরঙ্গ;-

–” এই টেমা, আব্বু আর জেঠু এখনো বাড়ি ফেরেনি? বাড়ির পরিবেশ এতো শান্ত কেন?”

দরজাতে ছিটকিনি দিয়ে দৌড়ে নিজের জায়গায় এসে পুনরায় বসে পড়লো তিন্নি। টিভির সাউন্ড কিঞ্চিত বাড়িয়ে জবাব দিলো সে।

–” চাচ্চু ব্যবসার কাজে রাজশাহী গেছে। আব্বু এখনো ফেরেনি।”

হাত উঠিয়ে ঘড়ির দিকে তাকাল তরঙ্গ। রাত সাড়ে নয়টা বাজে। প্রতিদিন সাতটার আগেই তার বাবা আর জেঠু অফিস থেকে বাড়ি ফিরে আসেন। সাড়ে দশটার আগেই রাতের খাবার সেরে শুয়ে পড়েন তাঁরা। মাঝে মধ্যে নয়টার পর বাড়ি ফিরলে বাবা আর জেঠুর কাছে বকুনি খেতে হয় তরঙ্গকে।

বেশি ভাবল না সে। শপিং ব্যাগ গুলো হাতে নিয়ে সিঁড়ির দিকে এগিয়ে গেল তরঙ্গ। মা আর চাচির চোখে পড়ার আগেই তরীর হাতে ব্যাগ গুলো তুলে দিতে হবে। নয়তো আবার অকারণে হাজারটা প্রশ্ন করবে তাকে। তরী কে কথা শোনাতে ও ভুলবেন না। পায়ের শব্দ যতটা সম্ভব চেপে রেখে সিঁড়িতে পা রাখল তরঙ্গ। উপরে এসে তরীদের রুমের সামনে দাঁড়িয়ে পড়লো। তখন যাওয়ার সময় তরী রেগে গিয়েছিলো। এখনো সেই রাগ না থাকলেই হলো। বিসমিল্লাহ পড়ে দরজাতে নক করলো তরঙ্গ।

দরজায় নক পড়তেই তিন্নির শেষ জামাটা ব্যাগে রেখে সোজা হয়ে দাঁড়ালো তরী। সে ভাবলো তিন্নি এসেছে। সাত পাঁচ না ভেবে বাইরের মানুষটিকে ভেতরে আসার অনুমতি দিলো তরী।

–” ভেতরে আয়।”

দরজা ঢেলে রুমে প্রবেশ করলো তরঙ্গ। অতঃপর আগের ন্যায় দরজা ভেজিয়ে দিলো সে। তরঙ্গ কে দেখে কপালের চামড়া সংকুচিত হয়ে এলো তরীর। তাকে আরেক দফা অবাক করে দিয়ে; তার নিকটে এসে দাঁড়ালো ছেলেটা।

–” ম্যাম, মেজাজ ঠান্ডা হয়েছে আপনার? একটু প্রেম করা যাবে?”

তরঙ্গের মায়া, মায়া কন্ঠের কথায় তরী অগ্নি চোখে তাকালো। তরীর দৃষ্টিতে দৃষ্টি মিলতেই লাফিয়ে সরে গেলো তরঙ্গ। কাঁচুমাচু ভঙ্গিতে সুধালো সে।

–” এমন করছিস কেন? একটু প্রেম ই তো করতে চেয়েছি। বাসর করবো তো বলিনি।”

কপট রাগ দেখিয়ে তরী বললো,

–” যখন তখন আমার রুমে আসা বন্ধ করুন তরঙ্গ। নয়ত আমি বাধ্য হবো আব্বু আর চাচা কে এসব জানাতে।”

–” কি সব?”

–” রাত বিরেতে আমার রুমে আসা।”

ঠোঁট কামড়ে বিস্তর হাসলো তরঙ্গ। শপিং ব্যাগ গুলো বিছানায় রেখে। তরীর সামনে বসে পড়লো সে।

–” প্রথমত, এই বাড়ির সম্পত্তিতে আমার ও অধিকার আছে। দ্বিতীয়ত, সেই অধিকার অনুযায়ী বাড়ির প্রতিটা রুমে আমি যেতে পারবো। তাই কারো কাছে বিচার দিলে ও। সেই বিচারের রায় আমি মানবো, তা তোকে কে বলেছে?”

–” আমাকে এমন অপমানের মানে কি তরঙ্গ? আপনার থেকে আমি একটু সম্মান চেয়েছি। বড় হই আপনার। এতোটুকু আশা করতেই পারি। এসব বেহায়াপনা বন্ধ করলে খুশি হতাম।”

তরীর ঝাঁঝালো কন্ঠের কথার, বিপরীতে তরঙ্গ নিরট মুখে জবাব দিলো।

–” আমি তোকে ভালবাসি তরী। আমাকে একটু ভালোবাস! সব ভন্ডামি ছেড়ে ভদ্র হয়ে যাবো। একটু ও বেহায়াপনা করবো না। সত্যি বলছি।”

বিরক্তি আর রাগের সংমিশ্রণে নাকের পাটাতন ফুলে উঠলো তরীর। নিজের থেকে ছোটো কাজিন ভাইয়ের থেকে এমন হ্যারেসমেন্ট আর মেনে নিতে পারছে না সে। এসব তার কাম্য নয়। তরঙ্গের এই অত্যাচার দিনকে দিন বেড়েই চলেছে। এখনি লাগাম না টানলে ছেলেটার পাগলামি বাড়বে। এখন একাকী বলছে। দুই দিন পর লোক সমাজে বলবে।

–” সমস্যা যেহেতু আমার। তবে আপনি এই বাড়িতে থাকুন। আমি বাড়ি ছেড়ে দিচ্ছি।”

তরীর মুখে এমন কথা শুনে শুকনো ঢোক গিললো তরঙ্গ।

–” কি বলছিস এসব?”

–” ঠিক ই বলেছি। হয় আমাকে বিরক্ত করা বন্ধ করুন। নয়তো আমি বাড়ি ছাড়তে বাধ্য হবো তরঙ্গ।”

কঠিন মুখে কথা গুলো শেষ করে হন হন করে বারান্দায় চলে এলো তরী। তরঙ্গ ওভাবেই বসে তাকিয়ে রইলো তরীর যাওয়ার পথ পানে। তার জিভ টা ভারি হয়ে উঠেছে। কি বলবে বুঝতে পারছে না। তরী কে কি সে সত্যিই এতো টা জ্বালিয়েছে? যে তরী বাড়ি ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে? তবে কি মেয়েটার মনে সত্যিই তার জন্য কোনো ভালোবাসা নেই। একটু ভালোবাসলে কি হয়? তরীর কি একটু ও দয়া হয় না তার প্রতি?

ভাবনা রেখে, বসা থেকে উঠে বারান্দার দরজার কাছে এসে দাঁড়ালো তরঙ্গ। মেঝেতে তাকিয়ে থেকে বলে উঠলো সে।

–” আমার ভালোবাসা যদি তোর কাছে বিরক্তির কারণ হয়। তবে আমি আর তোকে বিরক্ত করবো না। তবে এটা ভাবিস না। যে আমি তোকে ভালবাসা ছেড়ে দিবো। সময় বুঝে তোকে ঠিকি নিজের করে নিবো। একটু অপেক্ষা করিস তরকারি জান। তুই আমার ই হবি।”

তরঙ্গ রুম থেকে চলে যেতেই বারান্দার গ্রিলে হাত রাখলো তরী। নিচু কন্ঠে গেয়ে উঠলো দুই লাইন গান।

–“পোড়া মনে ভালবাসা,বাসা বাধে না।
পোড়া মনে ভালবাসা,বাসা বাধে না।”

চলবে

( প্রিয় চড়ুই মহল,
কেমন হয়েছে জানাবেন কিন্তু! আর গল্পে একটু রেসপন্স করিয়েন। রিচেক দেইনি।)

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply