Golpo romantic golpo জল তরঙ্গের প্রেম

জল তরঙ্গের প্রেম পর্ব ৫


জলতরঙ্গেরপ্রেম

পর্ব সংখ্যা;০৫

লেখনীতেনবনীতাচৌধুরি

দেওয়ান বাড়ির ড্রয়িং রুম জুড়ে পিনপতন নীরবতা বিরাজমান।

সবার মাঝে মাথা নিচু করে বসে আছে তরী। সুফিয়ান তার বাবা – মা কে নিয়ে বেরিয়ে গেছে বাড়ি থেকে। ফোরকান দেওয়ান মাথা নিচু করে বসে আছেন। কি বলবেন, বুঝতে পারছেন না তিনি। পঁচিশ বছরের এক কন্যার বার বার বিয়ে ভাঙার পর। সেই কন্যা দায়গ্রস্ত পিতার মুখে কথা বলার ভাষা থাকে না। তেমন দশাই ফোরকান দেওয়ানের। তবে বুসরা বেগম বেশিক্ষণ ভদ্রের বেশ ধরে বসে থাকতে পারলেন না। ডাইনিং টেবিলের পাশ থেকে সরে এসে ঝাঁঝালো স্বরে বললেন তিনি;-

–” এইবার অন্তত মরতে পারিস তুই। দুই, দুই বার বিয়ে ভেঙেছে। এই জীবনে আর বেঁচে থেকে কি করবি?”

তরী মাথা তুললো না। ওভাবেই বসে থাকলো সে। ফোরকান দেওয়ান এই ঝামেলায় থাকতে চাইলেন না। তিনি চশমা হাতে নিয়ে ঘরের দিকে চলে গেলেন। স্বামী কে যেতে দেখে বুসরার এক ধাপ সাহস বাড়লো। আপাতত সে আর সাহনারা বেগম ছাড়া কেউ নেই ড্রয়িং রুমে। তরঙ্গ উপরে নিজের রুমে।

বিয়ের ভাঙার পর পর সে রুমে চলে গিয়েছিল। কেউ অবশ্য তাকে সন্দেহ করেনি বিয়ে ভাঙার জন্য। সুফিয়ান বলে ছিলো, তরী কে তার পছন্দ হয়নি। এই কথা শুনে সুফিয়ানের মা ও লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে ছিলো। ছটফট কিছু কথা শুনিয়ে। ছেলে আর স্বামী কে নিয়ে প্রস্থান করে ছিলেন মোহনা।

ভাসুর কে যেতে দেখে সাহনারা এগিয়ে এলো। বাঁকা হেসে বলে উঠলো সে।

–” তুমি এই মেয়ে কে সহ্য করো কীভাবে ভাবি? আমার সৎ মেয়ে হলে; রাস্তার ফকিরের সাথে ধরে বেঁধে বিয়ে দিয়ে হলে ও। এই কলঙ্ক ঘাড় থেকে নামাতাম। এখন তো ভয় হয়। কখন আমার তরঙ্গের দিকে হাত বাড়ায়।”

সাহনারা থামলেন। পর মুহূর্তে তাচ্ছিল্যে হেসে সুধালেন তিনি।

–” অবশ্য পাতিলের তলার মতো। কালো গায়ের রঙ হলে ফকির ও বিয়ে করবে কেনো? একে তো মাইয়া মানুষ। তার উপর কালা।”

–” কিছু বলিও না ভাবি। তিনি সম্মাননীয় মানুষ। কিছু বললে গায়ে ফোস্কা পড়বে। জানোই তো কালো গায়ে ফোস্কা পড়লে। কুকুর ও আর ফিরে তাকাবে না।”

কথা শেষে গা জ্বালানো হাসি দিলো সাহনারা আর বুসরা। সবটাই তরী কে কষ্ট দেওয়ার চেষ্টা। তরীর গাল বেয়ে অশ্রুর ধারা নামলো। আর সহ্য করতে না পেরে সোফা ছাড়লো সে। ছুটে উপরে নিজে রুমে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিলো তরী। ছিটকিনি দিয়ে দরজার সাথে পিঠ ঠেকিয়ে মেঝেতে বসে পড়লো সে। দৌড়ের গতিতে খোমটা পড়ে গেছে মাথা থেকে। আচঁল টা লুটোপুটি খাচ্ছে মেঝেতে। হাঁটুতে মুখ গুঁজে ঠুকরে উঠলো তরী।

–” গায়ের রঙ যদি সাদা ই না দিবেন। তবে এই পৃথিবীতে মা ছাড়া বাঁচিয়ে রেখেছেন কেন আল্লাহ্? আমার বোনটার জন্য আত্মহত্যা ও করতে পারি না।”

তরীর হাহাকার পূর্ণ কথা গুলো দেয়ালে বেজে তার কানে এসে লাগলো। কেউ দেখলো না তরীর সেই কান্না। বাম হাতের উপুর পিষ্ট দিয়ে ঠোঁটে মাখা কৃত্রিম রঙ মুছে নিলো সে। শাড়িতে মারা সেফটিপিন গুলো অগোছালো হাতে খুলে সাধারন থ্রি পিজ নিয়ে ওয়াশরুমে ঢুকে পড়লো তরী।


বিকেল সাড়ে চার টা বাজে।

সূর্যের তীক্ষ্ম সোনালী রঙ; আরো গাড়ো হয়ে কমলা বর্ণ ধারণ করেছে। ক্লান্ত দেহে ঘর্মাক্ত স্কুল ড্রেস পরিহিত তিন্নি সদর দরজা দিয়ে প্রবেশ করলো। ড্রয়িং রুম সম্পূর্ণ টা খালি। সাদা বাতি গুলো ও নেভানো। সূর্যের আলো এসে মেঝেতে পড়েছে। হাতের টিফিন বক্স টা রান্না ঘরে রেখে উপরে এলো তিন্নি। সারাদিনের ক্লান্তি বাচ্চাটার চোখে মুখে ফুটে উঠেছে।

শুভ্র বর্ণের মুখ টা কেমন স্যাত বর্ণ ধারণ করেছে। যেনো মুখের সব রক্ত উধাও হয়ে গেছে। বিশ মিনিটের পথ হেঁটে আসার দরুন এমন হয়েছে। তরী অবশ্য তাকে রিকশা ভাড়া দিয়েছিলো। কিন্তু তিন্নি তা খরচা করেনি।

বিকেলের সময় হওয়াতে বুসরা আর সাহনারা দুজনেই নিজেদের রুমে। তরঙ্গ ছাদে থাকে এই সময়ে। তরী তখন ছাদের গাছ গুলোতে পানি দেয় কিনা। এই কথা অবশ্য তিন্নি ছাড়া কেউ জানে না। সে কাউকে কখনো বলে ও নি। হিতে বোনকে কথা শুনতে হবে। মুখে তালা ঝুলিয়ে রাখার অভ্যাস তার বেশ পাকা।

বয়সে ছোট হলে ও ভেতরে ভেতরে এক ধরনের পরিণত বোধ জন্ম নিয়েছে তার মধ্যে। কোন কথা কোথায় থামাতে হয়, কাকে কী বলতে নেই—এই বোধ তিন্নি অল্প বয়সেই আয়ত্ত করেছে। কারণ সে জানে, অযথা কিছু ফাঁস হলে বোন কে কথার খোঁচা সহ্য করতে হবে।

পড়ার টেবিলে ব্যাগ রেখে হাত মুখ ধুতে চলে গেলো তিন্নি।


শেষ বিকেলের কমলা নীলচে আকাশের বুক ছিঁড়ে পাখিরা উড়োউড়ি করছে। কারো ঘরে ফেরার তাড়া। কেউ বা মুক্তির সাধে উড়ছে।

ছাদের দক্ষিণ পাশে, পানির ঝাঝারি হাতে ফুল গাছ গুলোতে পানি দিচ্ছে তরী। দুপুরের শাড়ি পাল্টে এখন নীল থ্রি পিছ পরেছে সে।

অদূরে, সন্ধ্যার ম্লান আলোয় দোলনায় আলতো দোল খাচ্ছে তরঙ্গ। তার কোলে রাখা গিটার। আঙুলের ফাঁকে অনুচ্চারিত এক সুর আটকে আছে। পরনে সাদা মাটা টি-শার্ট, আর লুঙ্গি। সাধারণ এই বেশে তরঙ্গ কে দারুন মানিয়েছে। তরঙ্গ প্রতিদিন নিয়ম করে লুঙ্গি পরে না। মন ভালো থাকলে সপ্তাহে দুইবার পরে। নয়তো মাসে ও লুঙ্গির ধারে কাছে যায় না। তার লুঙ্গি পরার কারণ তরীকে জ্বালানো। মেয়েটা বড্ড বিরক্ত হয় তরঙ্গ কে লুঙ্গি পরতে দেখলে। তাতে ও অবশ্য তরঙ্গের দোষ আছে। গিটার টা একবার উল্টে, পাল্টে দেখে। চোরা দৃষ্টিতে তরীর দিকে তাকালো তরঙ্গ।

তরীর এদিকে কোনো ভ্রূক্ষেপ নেই। সে ব্যস্ত টবের গাছগুলোতে পানি দিতে। জল ধারার ক্ষীণ শব্দে ছাদজুড়ে স্থিরতা নেমে এসেছে। তরীর মুখে গাম্ভীর্যের ছাপ; যেনো পৃথিবীর সবচেয়ে জরুরি দায়িত্বটাই এখন তার হাতে। প্রতিটি পাতায়, প্রতিটি কুঁড়িতে সে মন ঢেলে দিচ্ছে।

তরঙ্গের ঠোঁটে মৃদু হাসি ফুটে উঠল। তার সিনিয়র সবকিছুতেই যত্নশীল —গাছ, আকাশ, সময়, নিয়ম, পরিবার। শুধু তার প্রতি ই যতো অনীহা। ঠোঁট কামড়ে চোখ বুঁজলো তরঙ্গ। গিটারের তাঁরে টুং টাং শব্দ তুলে গেয়ে উঠলো সে।

–” স্বপ্নে তোমার আনাগোনা।
নেমে আসে ভোর, থাকে তবু ঘোর।
হাওয়ায় হাওয়ায় জানাশোনা।

সারা রাতভর চোখের ভেতর
স্বপ্নে তোমার আনাগোনা।
নেমে আসে ভোর, থাকে তবু ঘোর
হাওয়ায় হাওয়ায় জানাশোনা।

তুমি দেখা দিলে তাই।
মনে জাগে প্রেম প্রেম কল্পনা।
আমি তোমার হতে চাই,
এটা মিথ্যে কোনো গল্প না।
আমি তোমার হতে চাই,
এটা মিথ্যে কোনো গল্প না।

ও, ছুঁয়েছো হৃদয় আমার প্রেমেরই আবির মেখে।
ডুবেছি তোমার মাঝে নিজেকে আড়াল রেখে।
ছুঁয়েছো হৃদয় আমার প্রেমেরই আবির মেখে।
ডুবেছি তোমার মাঝে নিজেকে আড়াল রেখে।”

তরঙ্গের গানের সুরে, তখনি তরীর হাত থেমে গিয়েছিলো। এতক্ষণ সে মুগ্ধ চোখে তরঙ্গের দিকে তাকিয়ে গান শুনছিলো। তরঙ্গের গানের গলা বরাবর ই প্রশংসানীয়। তরী তা মনে মনে শিকার করলে ও। তরঙ্গের সামনে কোনো দিন সরাসরি প্রশংসা করেনি। তরঙ্গ চোখ মেলে সরাসরি তরীর দিকে তাকালো। তরী তখনো ধ্যানে। তা দেখে গিটার পাশে রেখে তরঙ্গ উঠে দাঁড়ালো। অলগোছে তরীর পাশে এসে থামলো সে।

–” একবার ভালোবেসে দেখতেই পারিস। অভিযোগের সুযোগ দিতে দিবো না তোকে।”

খুব কাছ থেকে তরঙ্গের কন্ঠ শুনে, তরী চমকে উঠলো। সাথে ভ্রু কুঁচকে নিলো সে। যেনো তরঙ্গের এই কাজে বেশ বিরক্ত হয়েছে তরী। কিছুক্ষণ চুপ থেকে সে বললো।

–” সন্ধ্যা দুপুরে ছাদে এসে ষাঁড়ের মতো গান গাওয়ার মানে বুঝলাম না! আপনার গানের শব্দে আমার মাথা ধরে গেছে।”

তরঙ্গ চোখ ছোটো করে নিলো। মাত্র না এই মেয়ের চোখে মুগ্ধতা ছিলো। এতো জলদি চেহারার পরিবর্তন?

–” তোর মতো এতো জলদি গিরগিটি ও রূপ বদলাতে পারবে না তরী জান। এতক্ষণ দিব্বি আমার গান শুনলি। এখন আমাকেই ষাঁড় বলছিস?”

তরী নাকের পাটাতন ফুলিয়ে সরে যেতে চাইলো। তরঙ্গ দিলো না। বাম হাতের কনুই চেপে ধরলো তার।

–” আমি কেনো লুঙ্গি পরি বল তো?”

–” ফাজলামি করেন?”

ক্রুর হাসলো তরঙ্গ,

–” ফাজলামি করবো কেন? আচ্ছা আমিই বলি। আমার বাপের কি কম টাকা। তবুও লুঙ্গি পরি। কারণ, আমার শান্তি প্রয়োজন। ট্রাউজারে সেই শান্তি নেই। যা লুঙ্গিতে পাওয়া যায়।”

বিরক্তির শেষ পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছালো তরী। ধৈর্য্যের বাদ ভেঙে সুধালো সে।

–” আপনি বরং কিছু পরিয়েন না। তাহলে শান্তি চারপাশ দিয়ে ভেসে ভেসে আসবে।”

কথা শেষে তরী দাঁড়ালো না। দ্রুত পায়ে ছাদ থেকে প্রস্থান করলো সে।

চলবে

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply