জল তরঙ্গের প্রেম
পর্ব সংখ্যা;০৩
লেখনীতেনবনীতাচৌধুরি
সূর্য মাথার উপর উঠে পড়েছে। সকাল পেরিয়ে দুপুর হয়ে এসেছে।
ফোরকান দেওয়ানের গাড়ি টা সদর দরজায় এসে থামলো। দরজা খুলে নেমে এলো মধ্য বয়স্ক চার জন পুরুষ আর দুই জন নারী। সবার মাঝে সাদা পাঞ্জাবী পরা এক সাঁইত্রিশ উর্ধ্ব পুরুষ। নাম তার সুফিয়ান। পেশা, বর্তমানে একটা মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে চাকরি করছে। গালে খোঁচা ভর্তি দাঁড়িতে ভরা। মাথায় অর্ধেকের বেশি চুল নেই। গাড়ি থেকে নেমে ফোরকান দেওয়ান তার উদ্দেশ্যে বললেন;-
–” চলো বাবা। ভেতরে এসো।”
একে একে বাড়িতে ঢুকে পড়লো সবাই। ওদের বাড়িতে ঢুকতে দেখে বুসরা এগিয়ে এলো। মহিলা দু’জন কে সোফায় এনে বসিয়ে কিচেনে গেলেন তিনি। তরীর রান্না শেষ। অবশিষ্ট থাকা এঁটো হাড়ি, পাতিল গুলো ধুয়ে রাখছে সে। তা দেখে গমগমে কন্ঠে বুসরা বললেন;-
–” তোমার কাজ শেষ হলে ঘরে যাও। ওনারা এসে পড়েছেন।”
–” এই পাতিল গুলো ধোঁয়া শেষ করে যাচ্ছি।”
বুসরার বিরক্তি বাড়লো। নাকের পাটাতন ফুলিয়ে তরীর দিকে তাকালেন তিনি। ঘেমে নেয়ে শ্যাম বর্ণের তরীর করুণ অবস্থা। আগুনের তাপে তার মুখশ্রী লাল বর্ণ ধারণ করেছে। সাথে থুতনি আর তীরের অনুরূপ খাড়া নাকে কেমন তেল ছিপছিপে করছে। পরণের নেভি ব্লু থ্রি পিজ টা ঘেমে; পিঠ পিছে সিটিয়ে আছে। এই রুপে বড্ড বাজে দেখাচ্ছে তরী কে। বর পক্ষের কেউ দেখলে বিয়ে ভাঙবে বুসরা নিশ্চিত।
–” ওনাদের আর কাজ দেখাতে হবে না। যথেষ্ট কাজ হয়েছে।”
তরীর হাত থামলো না। ব্যস্ত হাতে শেষ হাড়ি টা ধুয়ে। কোমরে বাঁধা ওড়না খুলে নিলো। তা দেখে সস্থির শ্বাস ছাড়লো বুসরা। ত্যাড়া মেয়ে টা চোখের সামনে থেকে দূর হলেই শান্তি। সতিন কাঁটা না থাকলে ও জলজ্যান্ত দুটো অশান্তি রেখে গেছে তার জন্য। একটা বিদায় হলে শান্তি। বিরক্তি নিয়ে বুসরা আওড়ালো;-
–” তোমার মায়ের বেনারসি শাড়ি টা। তোমার ঘরে রেখে এসেছি। গোসল করে শাড়ি টা পরে। একটু সেজে নিও।”
তরী প্রতিউত্তর করলো না। মাথা নামিয়ে চলে যেতে নিতে আটকালেন বুসরা। নিজের সভ্য রুপ ছেড়ে আসল রুপে ফিরলেন তিনি।
–” বোবা হয়ে গেছিস নাকি? সকাল থেকে কোনো প্রশ্নের ই উত্তর দিচ্ছিস না। দেমাগ দেখাচ্ছিস আমার সঙ্গে?”
ক্লান্ত তরী সল্প বিস্তর হাসলো। তা দেখে গা জ্বলে গেলো বুসরার। ধীর স্বরে তরী বলে উঠলো;-
–” মা মারা যাওয়ার দিন। ওনার সাথে আমার জবান, রাগ, জেদ সব কিছুকেই কবর দেওয়া হয়ে ছিলো। তারপর থেকে তো আপনাদের হাতের পুতুলের মতো চালাচ্ছেন। আমি ও সবটা মেনে নিয়ে চলছি। তাহলে আজ হঠাৎ এই প্রশ্ন করছেন যে?”
–” বেশ কথা শিখেছিস দেখছি? তোর বিয়ে এখনো হয়ে যায়নি। তবে এতো তেজ আসছে কোথা থেকে।”
–” আমার থেকে চাচি। আমার শরীরে বহুত তেজ। সেগুলো থেকে একটু তেজ তরকারি কে দান করেছি। আপনার লাগবে?”
পেছন থেকে তরঙ্গের কন্ঠে দুজনে ঘুরে দাঁড়ালো। এই মূহুর্তে এখানে তরঙ্গ কে আশা করেনি তরী। তরী বাদে পরিবারের সবার চোখে তরঙ্গ গম্ভীর, ভদ্র স্বভাবের পুরুষ। বড়দের দশ কথাতেও যে তর্ক করে না। কিন্তু তরীর ক্ষেত্রে সেই নিয়ম সম্পূর্ণ ভিন্ন। তরীর নিকট তরঙ্গ ঘাড় ত্যাড়া, উগ্র, আর রগচটা এক যুবক। ঠোঁট কাঁটা ও বটে। জিভের মাথায় যার সবসময় কথা উপস্থিত থাকে।
বুসরা অপ্রস্তুত হাসলেন। তা দেখে তরঙ্গ ও মিষ্টি হাসলো। গলা খেকাড়ি দিয়ে বললো সে;-
–” আপনার তেজ লাগবে চাচি? দিবো?”
বুসরা জিভ কাটলো।
–” কি যে বলছো না তরঙ্গ। আমি তেজ দিয়ে কি করবো?”
–” কেনো? তরীর মতো বোবা হয়ে থাকবেন। ঘরে শান্তি বজায় থাকবে।”
বুসরা চুপ হয়ে গেলেন। তরঙ্গের সাথে কথা বাড়ানো মানে নিজের বিপদ নিজে ডাকা। কথার জালে ফাঁসিয়ে মানুষ কে নাকানিচোবানি খাওয়াতে ওস্তাদ সে। বড় বড় কদমে প্রস্থান করলো বুসরা। তরঙ্গ সেদিকে তাকিয়ে। চোখ ঘুরিয়ে তরীতে দৃষ্টি নিক্ষেপ করলো।
–” আমাকে কথা শোনাতে গেলে ঠিকিই তোর মুখে খই ফোটে। তোর সৎ মা যখন তোকে এতো কথা শোনায় তখন কিছু বলিস না কেন?”
–” আমার বিষয়ে আপনাকে মাথা ঘামাতে হবে না তরঙ্গ। নিজের চরকায় তেল দিন।”
জেদের বশে, কিচেন কাউন্টারে লাথি বসালো তরঙ্গ। তরী কে ধরতে নিয়ে ও ধরলো না সে।
–” কেবল ভালোবাসি বলে তোর সব কথা সহ্য করি। তাই বলে ভাবিস না। যে তোর অপমানে আমি তোকে ভালোবাসা ছেড়ে দিবো। তরঙ্গ দেওয়ানের ভালোবাসা এতো ঠুনকো না।”
তরী ধারালো দৃষ্টিতে তরঙ্গের দিকে তাকালো। দু’হাত জোড়া করে বলল সে;-
–” দয়া করে নির্লজ্জের মতো ‘ভালোবাসা’, ‘ভালোবাসি’ শব্দগুলো উচ্চারণ করবেন না তরঙ্গ। আমার জীবনে এমনিতেই কলঙ্কের অভাব নেই।”
তরঙ্গ ঢোক গিললো, নরম স্বরে সুধালো;-
–” তবে আরেকটু কলঙ্ক সহ্য কর না তরী জান। করুণা করে আমাকে একটু ভালোবাস।”
তরী আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারলো না। লজ্জায় তার কান ঝা, ঝা করে উঠলো। নিজের থেকে ছোটো বয়সের একটা ছেলের মুখ থেকে ভালোবাসার কথা শুনতে কারোই ভালো লাগবে না। নিজের উপর ঘৃণা লাগবে। তরীর ও তেমন লাগছে।
আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে শাড়ি ঠিক করছে তরী।
খয়েরি কাতান শাড়ি টা পরা শেষ। তবে এখনো কুঁচি গুলো এলো মেলো। বিরক্তি নিয়ে কুঁচি ঠিক করাতে ব্যস্ত হলো সে। মুখে এখনো কোনো প্রসাধনী ব্যবহার করেনি তরী। একা শাড়ি পরতে গিয়ে বেহাল দশা তার।
–” তরী তরী এর্লাচি!
তরীর বাড়ি করাসি।
তরী যদি জানতো!
তরঙ্গের বুকে মাথা ঠেকিয়ে কাঁদতো।”
হঠাৎ, তরঙ্গের কন্ঠে অদ্ভুত কবিতা শুনে শাড়ির কুঁচি হাতে পেছনে ফিরে তাকালো তরী। তরঙ্গ কার্ণিশে দাঁড়িয়ে জানলার কাঁচের সাথে লেপ্টে আছে। তরী অবাক হলো। ভারী কন্ঠে সুধালো সে;-
–” এখানে কি?”
তরঙ্গ বাঁকা হাসলো। কাঁচে তিন আঙুল দিয়ে ঠক ঠক শব্দ করে বললো;-
–” তরী রানী, দরজা খোল। না হয় আমি জানলার শিক বাঁকিয়ে ফেললো।”
–” পাগলামি বাদ দিয়ে নিচে যান। না হয় আমি সবাই কে ডেকে বিচার দিবো। সেটা নিশ্চয়ই আপনার সাজানো ইমেজ নষ্ট করে দিবে।”
তরঙ্গ ভড়কালো না। জানলার শিকে হাত দিয়ে। শরীরের সবোর্চ্চ শক্তি ক্ষইয়ে শিক দুটো দুই দিকে টান দিলো। মূহুর্তে পুরোনো লোহার শিক দুটো বাঁকিয়ে গেলো। প্রাপ্তির হাসি খেলে গেলো তরঙ্গের চোখে, মুখে। শিক গুলো আরেকটু বাঁকানোর চেষ্টা করলো সে।
তা দেখে তরী আঁতকে উঠলো। এদিক ওদিক চেয়ে তরঙ্গ কে ভেতরে আসতে দেওয়ার থেকে; আটকানোর পথ খুঁজলো সে। কিন্তু ততক্ষণে তরঙ্গ রুমে ঢুকে পড়লো। জানলার থাই টেনে লক করে দিলো তা।
–” সাজছিস কেন?”
–” বিয়ে করতে!”
তরী ঝাঁঝালো স্বরে জবাব দিলো। তরঙ্গ বক্র হাসলো। এক পা, দুই পা করে তরীর নিকটে এসে থামলো সে।
–” শাড়ি টা চেন্জ করে আয়। আমি চাইছি না বড়মার বিয়ের শাড়িটা নষ্ট হোক।”
তরী আঁতকে উঠলো। ছিটকে সে তরঙ্গের কাছ থেকে সরে গেলো। মায়ের শেষ চিহ্নটুকু যদি তরঙ্গ নষ্ট করে দেয়। তবে সে কি নিয়ে বাঁচবে?
চলবে
( প্রিয় পাঠক মহল,
একটু বিপদে আছি। খুব ব্যস্ত ছিলাম এই দুইদিন। সাথে হাতের ব্যথা ও আছে। পনেরো শো রিয়েক্ট আর দেড় কমেন্ট হলে পরবর্তী পর্ব পাবেন।)
Share On:
TAGS: জল তরঙ্গের প্রেম, নবনীতা চৌধুরী
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
She is my Obsession পর্ব ২৭
-
She is my Obsession পর্ব ৩
-
She is my Obsession পর্ব ৩২
-
জল তরঙ্গের প্রেম পর্ব ৪
-
She is my Obsession পর্ব ১০
-
She is my Obsession পর্ব ৭
-
She is my Obsession পর্ব ২১
-
She is my Obsession পর্ব ১৬
-
She is my Obsession পর্ব ২০
-
She is my Obsession পর্ব ৩০