Golpo romantic golpo জল তরঙ্গের প্রেম

জল তরঙ্গের প্রেম পর্ব ১৫


জলতরঙ্গেরপ্রেম

পর্ব সংখ্যা;১৫

লেখনীতেনবনীতাচৌধুরি

দীর্ঘ রজনীর বুক ছিঁড়ে এক ফালি চাঁদ উঠেছে। অন্ধকার আকাশের বুকে উড়ে যাচ্ছে এক ঝাঁক নাম না জানা পাখি।

পুকুরের সান বাঁধানো ঘাটের শেষ সিঁড়িটাতে; কলসি আর রশি হাতে বসে আছে তরী। পা জোড়া পানিতে থাকার দরুন পায়ের কাছে সেলোয়ার ভিজে চুপচুপে হয়ে গেছে। সেদিকে খেয়াল নেই তরীর। অন্ধকারের মাঝে আজ তার একটু ও ভয় করছে না। আজ যেনো তার বোধ শক্তি লোপ পেয়েছে। পদ্ম ফুলের ন্যায় দীঘল কালো মণির চোখ জোড়া দিয়ে অবিরাম পানি ঝরছে।

খিঁচে চোখ জোড়া বুঁজে নিলো তরী। তখনকার পরিস্থিতির কথা ভাবতেই অশ্রুরা বাঁধ ভাঙলো।

              *******

তরঙ্গ মুচকি হাসলো। অন্ধকারে তার হাসি বোঝা গেলো না। তবে মৃদ্যু শব্দ ভেসে এলো।

–” তুমি জানো আমি মিথ্যা কথা বলি না। আমিই ছিলাম তরীর সাথে আম্মু। শুধু ছিলাম না। ও কে জড়িয়ে ধরেছি। এমনকি চুমু ও খেয়েছি। ওই যে, কানের পাশে। খুব নরম ওর কানটা।”

–” একদম বাজে কথা বলবি না তরঙ্গ। এতোদিন তোর বহু বাঁদরামি সহ্য করেছি। এমন সিরিয়াস মূহুর্তে মজা করবি না বলে দিলাম।”

মায়ের কথায় গম্ভীর হয়ে উঠলো তরঙ্গের চোয়াল।

–” বাঁদরামি করবো কেন? তোমরা কি এখানে অন্য কাউকে আশা করছিলে?”

উত্তেজনার বশে সাহনারার শ্বাস দ্রুত গতিতে ছুটছে। নিজেকে সামলাতে না পেরে চেঁচিয়ে উঠলেন তিনি।

–” হ্যাঁ, এখানে রাকিব ছিলো।”

–” তুমি সিউর আম্মু? যে এখানে রাকিব ভাই ই ছিলো? ঠিকঠাক দেখেছিলে তো দরজা বন্ধ করার আগে!”

তরঙ্গের সূক্ষ্ম খোঁচার আঁচ পেতেই ঢোক গিললো সাহনারা আর বুসরা। একে অপরের দিকে তাকালো দুজনে। ভীড় ঢেলে কেউ একজন গিয়ে কাচারি ঘরের লাইট জ্বালিয়ে দিলো। মূহুর্তে দিনের আলোর মতো সব স্পষ্ট হয়ে উঠলো। হঠাৎ, আলো পড়তেই সবাই চোখে হাত চেপে ধরলো। চোখে আলো সহে যেতেই স্বাভাবিক ভাবে তাকালো সবাই। এর মাঝে তরঙ্গ বললো;-

–” হয় তরীর সাথে আমার বিয়ের ব্যবস্থা করুন। নয়তো আমাকে দাফন করার ব্যবস্থা করুন।”

–” পাগল হলে নাকি তরঙ্গ!”

–” তরী জান কে না পেলে হয়ে যাবো। আমি বেঁচে থাকতে ও অন্য কারো হতে পারবে না। না ওকে অন্য কারো হতে দিবো! না আমি হবো।”

–” আর যাই হোক। ওই মেয়ের সাথে আমি তোমার বিয়ে দিবো না। মরে গেলে ও না।”

মায়ের কথা শেষ হতেই; পকেট হাতড়ে একটা ছোট্ট ছুরি বের করলো তরঙ্গ। হাতের ছুরিটা বাম হাতের রগ বরাবর ধরলো সে। ছেলের এহেন পাগলামি দেখে অন্তর আত্মা শুকিয়ে গেলো সাহনারা। তরঙ্গের রাগ সম্পর্কে ওনার ধারণা আছে। ছেলেটা বেশ জেদি। নিজের পছন্দের বস্তু আদায় করতে জেদের সর্বোচ্চ সীমা ছেলেটা পার করতে পারে। এতে নিজের ক্ষতি করতে ও একবার ভাবে না। সেখানে তরী কেবল প্রিয়তেই থেমে নেই। তার আসক্তি মেয়েটা। তড়িঘড়ি করে সাহনারা বললেন;-

–” হাত থেকে ছু*রিটা ফেলো দাও তরঙ্গ বাপ। তুই ছাড়া আমার কেউ নেই আব্বা।”

–” তরীকে আমার সাথে বিয়ে দিবে কিনা বলো? হ্যাঁ অথবা না!”

নীরবতা ছেদ করে করে; ফুঁপিয়ে তরী জবাব দিলো।

–” আমি আপ..নাকে বিয়ে কর..বো না তরঙ্গ। আপনার যা ইচ্ছে তাই করুন।”

তরীর এ কথা বলতে দেরী হলো। তরঙ্গ নিজের হাতে ছুরি চালাতে দেরী করলো না। মূহুর্তে ফিনকি দিয়ে রক্ত ছুটলো তার হাত দিয়ে।

–” তুই হীনা এই জীবনে মূল্যহীন তরী জান। আমি বেঁচে থাকলে তোকে কেউ আমার থেকে আলাদা করতে পারবে না।”

ছেলের এহেন কাজে সাহনারা ছুটে এলেন। ছেলের হাত ধরে তুলে দেখলেন রক্ত বের হচ্ছে। হন্তদন্ত হয়ে নিজের আঁচলে টান বসালেন তিনি। কাপড়ের টুকরো টা বেঁধে দিলেন তরঙ্গের কব্জিতে। তরঙ্গের এমন পাগলামিতে তরী অবাক চোখে তাকিয়ে রইলো। সে বুঝতে পারছে না কি করবে। রক্ত দেখলে বরাবর ই তার শরীর কাঁপে। হাত থেকে র*ক্ত বের হচ্ছে দেখে ও তরঙ্গের মধ্যে পরিবর্তন দেখা গেলো না। সে আগের মতোই দৃঢ় প্রত্যয়ে সুধালো;-

–” বিয়ে দিবে কিনা বলো আম্মু?”

–” আমার কথা শোন বাপ।”

–” কি শোনাতে চাইছো তুমি? আমার সব পছন্দতেই তোমার কেবল না বলতে হয়। তুমি বড্ড স্বার্থপরের মতো কাজ করছো আম্মু।”

–” তরঙ্গ?”

–” তবে এবার বাকি সত্যি গুলো বলা যাক আম্মু?”

–” কিসের সত্যি?”

মা – ছেলের এই যুদ্ধে সবাই চুপচাপ তাকিয়ে আছে। তর্ক – বিতর্কের কেন্দ্র বিন্দু হয়ে থাকা মেয়েটি এখন ও নিশ্চুপ। নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে তরী— চোখের কোণ বেয়ে নীরবে গড়িয়ে পড়ছে জল। ভয়ের চাপে বার বার শুকনো ঢোক গিলছে সে, হাত দুটো অজান্তেই শক্ত হয়ে আছে। এই সব ঝামেলা তার জন্যই হচ্ছে। তরঙ্গ এগিয়ে এলো। কোনো দ্বিধা না রেখে তরীকে নিজের দিকে টেনে নিলো, বুকে চেপে ধরলো তাকে। তার কণ্ঠ সংযত করে বললো;-

–” তোমরা হয়তো ভুলে গেছো, আম্মু…”

এক মুহূর্ত থেমে সে তাকালো সবার দিকে, তারপর আবার বললো;-

–” তুমি ও, চাচি। তোমরা সকালে আমার রুমের সামনে দাঁড়িয়ে যা পরিকল্পনা করেছিলে— আমি সব শুনেছি। আর একটা কথা… আমার গাড়ির ব্যাক সিটে হিডেন ক্যামেরা আর মাইক সেট করা আছে।”

তার কণ্ঠ আর ও শীতল হয়ে এলো।

–” ও গুলো অবশ্য তরীর জন্যই বসানো ছিল। কিন্তু শেষমেশ… তোমরাই সেখানে ধরা পড়ে গেছো। এতে অবশ্য আমার ই লাভ হয়েছে। এই যে আমার তরকারি জান কে পেয়ে যাবো।”

সব কথা শুনে, আলামিন সরকার গম্ভীর পুরুষালি কন্ঠে চেঁচিয়ে উঠলেন। তার কন্ঠে রাগে কেঁপে কেঁপে উঠছে। বোঝাই যাচ্ছে নিজের বোন আর বুসরা উপরের খুব রেগে আছেন তিনি।

–” তুই এতো নিচে নামতে পারলি সানু। ছিঃ, আমার ঘৃণা হচ্ছে তোকে নিজের বোন পরিচয় দিতে।”

হঠাৎ, মাথা ঘুরে উঠতেই পড়ে যেতে নিলেন সাহনারা। বুসরা ধরে ফেললো। তার হাত, পা থরথর করে কাঁপছে। প্রেশার বেড়ে যাচ্ছে তরতরিয়ে। জা’কে নিয়ে গিয়ে চেয়ারে বসিয়ে দিলো বুসরা। দুজনেই চুপ করে আছে। কি জবাব দিবে বুঝতে পারছেন না তারা। তরীকে ছেড়ে মামার পাশে গিয়ে দাঁড়ালো তরঙ্গ।

–” এখন তোমার কি সিদ্ধান্ত মামা? তুমি অন্তত তরীর গায়ের রঙ আর বয়স নিয়ে দোষ ধরো না।”

আলামিন সরকার ছিঃ, ছিঃ করে উঠলেন। বোনের কাজে এখন তিনি তরীর দিকে তাকাতে পারছেন না। মেয়েটাকে বাড়িতে ডেকে এনে অপমান করলেন। তরী চুপ করে আছে। মেঝেতে তার দৃষ্টি রাখা। আলামিন সরকার এগিয়ে এলেন। তরী নিকট দাঁড়িয়ে তার মাথায় হাত রাখলেন তিনি।

–” আমি অত্যন্ত দুঃখিত মা। আমার বাড়িতে এসে তোমাকে এমন অপমান, অপদস্থ হতে হলো। আমার বোনের কাজে আমি সত্যিই লজ্জিত। আমাকে ক্ষমা করো তরী মা।”

কথা শেষ করে কাচারি ঘর থেকে বেরিয়ে উঠোনে এসে দাঁড়ালেন তিনি। তরঙ্গ ও তরীর হাত ধরে বেরিয়ে এলো। আলামিন সরকার কাজি কে খবর দিলেন। কাজি আসতেই সবার উপস্থিতিতে ওদের দুজনকে পবিত্র বন্ধনে আবদ্ধ করে দিলো। তরঙ্গের তরকারি জান সারা জীবনের মতো তার হালাল স্ত্রী-তে রূপান্তরিত হলো। কবুল বলার মূহুর্তে তরঙ্গের চোখে – মুখে দেখা দিলো বিশ্বজয়ের হাসি। কিছু করতে না পেরে অগত্যা অগ্নি চোখে বিয়েটা দেখেছিলো সাহানারা। বিয়ে শেষ হতেই তরীকে একান্তে ডেকে নিয়ে গিয়েছিল বুসরা আর সাহনারা।

কটূক্তির কথার আঘাতে ঝাঁঝরা করে দিলো তার তনুমন। তিনিই তরীকে পুকুরের ঘাটে কলসি আর রশি হাতে রেখে গিয়েছিলেন। সেই থেকে ওভাবেই বসে আছে তরী। ভিবনা ছেড়ে বেরিয়ে এলো সে। কোনো মতে কান্না আটকে আকাশের দিকে তাকালো তরী।

–” আপনি যদি মানুষের মনে রঙ নিয়ে ভেদাভেদ করার ইচ্ছে দেন। তবে গায়ের রঙে এত পার্থক্য কেন, আল্লাহ্? সবাইকে কি এক রঙে সৃষ্টি করা যেত না? আমাকেই কেন কালো হতে হলো? আমি তো বিশেষ কিছু চাইনি। শুধু চাইছিলাম, অন্য সবার মতো স্বাভাবিক ভাবে বাঁচতে। কিন্তু আমার এই রঙটাই যেন সবার চোখে কাঁটার মতো বিঁধে। মানুষ হিসেবে আমি পরে থাকি। আর আমার মা… তিনি কেন এত তাড়াতাড়ি চলে গেলেন? তিনি থাকলে হয়তো এসব কথা একা শুনতে হতো না। তার পাশে থাকলে হয়তো নিজেকে এতটা অসহায় ও লাগতো না। কালো না হলে হয়তো এত খোঁটা শুনতে হতো না। এতটা অস্বস্তি নিয়ে বাঁচতে হতো না। বয়সের আগেই বয়স নিয়ে কথা শুনতে হতো না। বলুন না আল্লাহ্, এতে কি সত্যিই আমার কোনো দোষ আছে?”

বুক ছিঁড়ে আর্তনাদ বেরিয়ে এলো তরীর। ফুঁপিয়ে উঠলো সে। ফের আকাশের দিকে তাকিয়ে। ভাঙা ভাঙা কন্ঠে সুধালো সে;-

–” কালো হওয়া কি পাপ আল্লাহ্? পাপ ই বোধ হয়। না হয় আমার কপালে এতো কষ্ট থাকতো না। পঁচিশ বছর হওয়ার পর ও অবিবাহিত বলে কথা শুনতে হতো না। এই সমাজের মানুষের কাছে বাহ্যিক রূপ ই সব। শুধু শুধু মানুষ মিথ্যে বলে। মন সুন্দর হলেই এই পৃথিবীতে ভালো থাকা যায় না। আপনি তো অন্তরজামী আল্লাহ্। আমাকে ক্ষমা করবেন। এই জীবন আমি আর রাখতে পারবো না। আত্মহত্যা মহাপাপ জেনে ও সেই পাপের সারথি হচ্ছি।”

চলবে

( প্রিয় পাঠক মহল,

আমার হাত পুড়ে যাওয়ার দরুন পর্বটা ছোটো হয়েছে। দুঃখিত আমি। কালকের মতো পড়া শেষে মন্তব্য জানাবেন। যতো বেশি মন্তব্য জানাবেন। ততো তাড়াতাড়ি পরের পর্ব পাবেন।)

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply