জল তরঙ্গের প্রেম
পর্ব সংখ্যা;১২
লেখনীতেনবনীতাচৌধুরি
–” এটা কেমন অসভ্যতা তরঙ্গ।”
–” আমাকে যে এতোবার অসভ্য বলছিস। একবার অসভ্যতামি করলে সহ্য করতে পারবি?”
তরঙ্গের ইঙ্গিতময় কথা গুলো বাতাস ছুঁয়ে তরীর কানে পৌঁছাতেই তার গাল জুড়ে লালিমা ছড়িয়ে পড়ল। হঠাৎ করেই এক অদ্ভুত অস্বস্তি তাকে গ্রাস করে বসলো। আজ যেন ছেলেটার কথার বাঁধ ভেঙে গেছে — নির্লজ্জ দুষ্টুমিতে অবলীলায় বলে চলেছে এমন সব কথা, যা বলার নয়। নিজের লাজ ঢাকতে মুখে মিথ্যে রাগের আবরণ টানল তরী। দৃষ্টি নামিয়ে এনে নিচু স্বরে বলল সে—
–” তরঙ্গ! ডোরের লক খুলুন। আমি গাড়ি থেকে নামবো। সবাই কি ভাববে এখন?”
–” আমায় বলে বলুক লোকে মন্দ। তাতে আমার চুল ছিঁড়েছে।”
–” ছিঃ, অসভ্য ।”
বিরক্তি নিয়ে শিরদাঁড়া সোজা করে বসে পড়ল তরী। দরজার লক খুলে বেরিয়ে যাওয়ার জন্য সে সামান্য এগিয়ে এল তরঙ্গের নিকট। সেই মুহূর্তেই তরঙ্গ তার কনুই শক্ত করে চেপে ধরল। অপ্রস্তুত তরীকে এক টানে নিজের দিক থেকে দূরে ঠেলে দিল সে।
–” আমার এতোটা কাছে আছিস না তরী জান। জাউরা হরমোন গুলো নাড়া দিয়ে উঠে। কসম আল্লাহর তোর সর্বনাশ হয়ে যাবে। আমি গাড়ি টাড়ি মানবো না। বিয়ের ও অপেক্ষা করবো না। কলঙ্কের স্পর্শ মেখে দিবো তোর তনুময়।”
শুকনো ঢোক গিলল তরী। তরঙ্গের দৃষ্টি মোটেই স্বাভাবিক লাগছে না। রক্তাভ চোখে সে স্থির হয়ে তাকিয়ে আছে তার দিকে। অস্বাভাবিক ছন্দে ওঠা নামা করছে তার শ্বাস। কপালের মাঝ বরাবর বেয়ে নেমে আসা ঘাম; নাকের আগায় জমে চিক চিক করছে। বার বার জিভ বুলিয়ে ঠোঁট ভেজাচ্ছে সে, যেন ভেতরের অস্থিরতা সামলাতে পারছে না।
তরী অস্বস্তিতে সরে এসে জানালার বাইরে তাকাল। চারপাশে নিস্তব্ধতা —সবাই এরই মধ্যে ভেতরে চলে গেছে। তিন্নিকে ও কোথাও দেখা যাচ্ছে না। মুহূর্তেই তরীর বুকের ভেতর অজানা আশঙ্কা ঘনিয়ে উঠল; ভয়টা যেন ধীরে ধীরে তাকে গ্রাস করতে লাগল।
–” আমাকে যেতে দিন তরঙ্গ। সিনক্রিয়েট করবেন না প্লিজ।”
ফোঁস করে শ্বাস ছাড়লো তরঙ্গ। দু’হাতে মুখ ডলে বলে উঠলো সে।
–” একদম দূরে যাবি না আমাকে ছাড়া। এটা তোর পরিচিত জায়গা না। কোনো ছেলের সাথে তো মিশবি ই না। গট ইট?”
–” আমি ছোটো বাচ্চা না তরঙ্গ। আই’ম রাইট নাও টুয়েন্টি ফাইভ।”
–” তো? আচরণ তো বাচ্চাদের মতোই।”
তরী জবাব দিলো না। সে সিটিয়ে বসে রইলো গাড়ির জানলার সাথে। তরঙ্গ তার অস্বস্তি বুঝতে পেরে মুচকি হাসলো। তরীর হাত দুটো টেনে এনে নিজের মুঠোয় নিলো সে।
–” এতো অবিশ্বাস করিস আমাকে? এতো বার ভালোবাসি বলি। তা বিশ্বাস করিস না। এখন যেই বললাম ছুঁয়ে দিবো। ওমনি এই কথা ধরে গুটিয়ে গেলি?”
–” আমি গুটিয়ে যাইনি।”
–” ভয় পেয়েছিস!”
–” মোটেই না।”
–” তবে কি ধরে নেবো। আমার কথায় তুই লজ্জা পেয়েছিস?”
–” না!”
–” কিছু তো একটা পেয়েছিস তরকারি জান। অস্বীকার করলেই কি! তুই মিথ্যে বলতে পারিস। তোর মায়াবী চোখ জোড়া তো মিথ্যুক না।”
–” করুন বিশ্বাস। এইবার আমাকে যেতে দিন।”
তরঙ্গ লক খুলে দিতেই তরী মুক্তি পাওয়া পাখির মতো তড়িঘড়ি করে গাড়ি থেকে নেমে পড়লো। এক ছুটে ঢুকে পড়লো বাড়ির ভেতরে। একবার ও পেছনে ফিরে তাকালো না সে। গাড়ির দরজা বন্ধ হওয়ার ক্ষীণ শব্দটুকু মিলিয়ে যেতেই গাড়ির ভেতর নেমে এলো দম বন্ধ করা নীরবতা। তরঙ্গ ধীরে ধীরে শরীরটা ছেড়ে দিলো। গা ছাড়া ভঙ্গিতে সামনে ঝুঁকে স্টিয়ারিংয়ের উপর কপাল ঠেকালো সে।
দু’হাতে শক্ত করে চেপে ধরলো স্টিয়ারিং। যেন এই শক্ত ধাতব চক্রটাই তার ভেতরের তোলপাড় সামলানোর একমাত্র অবলম্বন। পরক্ষণেই বুকের ভেতর জমে থাকা অজস্র অব্যক্ত বেদনা আর আটকে রাখতে পারলো না তরঙ্গ। হাহাকার ভরা কণ্ঠে আর্তনাদ করে উঠলো সে—
–” শালা দেহ হইলো রক্ত আর
যৌবন হইলো মশা। উনিশ বিশ
হইলেই বিশ কামড় মারে মেইন পয়েন্টে। এখন আমি কি করি?”
/______/________
বাড়ির সদর দরজা পেরোতেই পাকা উঠোন।
প্রবেশ পথেই টিনের তৈরি কাচারি ঘর। উঠোনের একপাশে চেয়ার পাতা। অপর পাশে রান্না ঘর। উঠোন ফাঁকা দেখে লম্বা বারান্দা পেরিয়ে বসার ঘরে উপস্থিত হলো তরঙ্গ। ড্রয়িং রুমে সবাই উপস্থিত। সাহনারা বোনেদের মাঝে বসে আছে। তার পাশেই বুসরা বসা। তরী আর তিন্নি অন্য পাশের সোফায় বসা। তরঙ্গের দুই মামার মাঝে বড় জন উপস্থিত আছেন। ছোটো জন নেই। তরঙ্গ কে আসতে দেখে বড় মামা আলামিন সরকার জায়গা ছেড়ে উঠে এলেন। হাত বাড়িয়ে হ্যান্ডশেক করলেন তরঙ্গের সাথে।
–” কেমন আছো তরঙ্গ?”
মামার প্রশ্নে হাসার চেষ্টা করলো তরঙ্গ।
–” এইতো একরকম, তুমি?”
–” আজ বাদে কাল মেয়ের বিয়ে বুঝোই তো কেমন থাকবো।”
সৌজন্যমূলক হাসি দিলো তরঙ্গ। পিছিয়ে এসে তিন্নির পাশে বসে পড়লো সে। ভাই কে বসতে দেখেই মাথা তুললো তিন্নি।
–” এতক্ষণ কোথায় ছিলে তুমি?”
বোনের প্রশ্নে মাথা নামিয়ে আনলো তরঙ্গ। সে ও তিন্নির মতো নিচু স্বরেই প্রশ্ন করলো;-
–” গাড়ি পার্ক করছিলাম। কেনো?”
–” এখানে আসার পথে ওই পুকুর পাড়ে আমি দোলনা দেখেছি। তুমি আমাকে নিয়ে যাবে ভাইয়া?”
–” খাওয়া শেষে বিকেলে উঠোনে আসিস। নিবো নে।”
দু’জনের কথোপকথন স্তিমিত হতেই আবার সামনে দৃষ্টি ফেরালো তারা। তরী এতক্ষণ নির্বিকার ভঙ্গিতে সামনে তাকিয়ে থাকলে ও কান পেতে রেখে ছিলো এদিকেই। বাড়ির কাজের ছেলেটি ট্রে ভর্তি ডাবের পানির গ্লাস নিয়ে বসার ঘরে প্রবেশ করলো। তাকে ছেলে বললে ভুল হবে। বয়স চল্লিশ পেরিয়েছে। শরীরের মাংস কম হাড় গোড় বেশি। লম্বায় তরঙ্গের বুক সমাত হবে।
–” গ্লাস গুলো সবার হাতে হাতে তুলে দে রাকু।”
আলামিন সরকারের কথায় রাকিব এগিয়ে এলো।
–” দিচ্ছি সাহেব।”
একে একে সবার হাতে তুলে দিলো ডাবের পানির গ্লাস। পর পর হরেক রকমের পিঠে পরা ট্রে নিয়ে আসলো সে। টুকটাক নাশতা সেরে সবাই কে ফ্রেশ হওয়ার জন্য রুমে পাঠিয়ে দেওয়া হলো। দোতলা বাড়িটির নিচ তলার ঘর গুলো বড়দের জন্য বরাদ্দ। উপরে বাড়ির ছোটো সদস্যরা থাকে।
তরীর থাকার ব্যবস্থা করা হলো রুমার ঘরে। আর তিন্নি থাকবে ঝুমার ঘরে। রুমা, ঝুমা দুজনেই বড় মামার মেয়ে। রুমা গতবার ইন্টার পরীক্ষা দিয়েছিলো। ঝুমার বয়স ষোলো। পনেরো পেরোলে ও মুখে এখনো কিশোরী মাধুর্যের কোমল ছাপ রয়ে গেছে। মেয়েটি দেখতে ভারী মিষ্টি। আর তরঙ্গকে আলাদা একটি ঘর দেওয়া হয়েছে।
সে কারো সাথে এক ঘরে থাকে না। বুঝ হওয়ার পর থেকে তরঙ্গের সঙ্গে কেউ রুম শেয়ার করতে পারেনি। বিছানা তো না ই।
/________/_______
দুপুরের পর থেকে দিনটা যেন ব্যস্ততার রঙে রঙিন হয়ে উঠেছিল। সময়ের ফাঁক গলিয়ে একটু ও অবসর পায়নি কেউ।
তবে এই ভিড় ভাট্টা আর কর্ম ব্যস্ততার মাঝে ও একটা নীরবতা ছিল তরঙ্গ আর তরীর মাঝে। ইচ্ছে থাকলে ও সে তরীকে আর বিরক্ত করেনি। বিরক্ত করবেই বা কীভাবে? আজ বাকিটা দিন তো তাদের দেখাই হয়নি। দুপুরের খাবার শেষ করেই তরঙ্গ মামাদের সঙ্গে — গ্রামের বাজারের দিকে বেরিয়ে পড়েছিল। আজ বাদে কাল গায়ে হলুদ, তাই আয়োজনে যেন কোনো খামতি না থাকে। এই ভেবেই কাঁচা বাজার থেকে শুরু করে মাংসের অর্ডার, সব কিছু দিয়ে এসেছেন তারা।
বিকেলের ম্লান আলো নামতেই ডেকোরেশনের লোকজন এসে হাজির। বাড়ির চারপাশ জুড়ে শুরু হয়ে গেছে সাজ সজ্জার কাজ। এক এক করে টাঙানো হচ্ছে রঙিন বাতির মালা —লাল, নীল, সবুজ, হলুদ আলোয় ধীরে ধীরে ভরে উঠছে পুরো বাড়ি। দূর থেকেই বাড়ির সাজ সজ্জা নজর কাড়ছে। বিকেলের পর থেকে মেহমান আরো বেড়েছে। রুমার খালা – মামারা এসে উপস্থিত হয়েছে। মানুষে গিজ গিজ করছে পুরো বাড়ি। উঠোনে রঙিন বাতি ঝলছে। বিয়ে বিয়ে গন্ধ ছড়াচ্ছে সরকার বাড়িময়। তিন্নি ছোট বাচ্চাদের সাথে উঠোনে ছুটোছুটি করছে।
সন্ধ্যার নামাজ শেষে বাড়ির মহিলারা রান্না ঘরে জড় হয়েছে। আদা, রসুন সহ সব মসলা বাটা বাটি করে নিচ্ছে তারা। তরী রুমার ঘরে। রুমার হলুদের শাড়ির সাথে ব্লাউজের বোতাম সেলাই করছে সে। ট্রেইলাস বোতাম টা সেলাই করেনি। ফের পাঠানোর সময় ও নেই। তাই তরী ই বোতাম টা গেঁথে দিচ্ছে। মুখের মধ্যে মুলতানি মাটির ফেসপ্যাক মেখে তরীর পাশে এসে বসলো রুমা। হাসি হাসি মুখে তরীর উদ্দেশ্যে সে সুধালো;-
–” তুমি খুব গুণী আপু। কি সুন্দর সব কাজ পারো।”
বোতামটাতে শেষবারে সুই ফুটিয়ে মুখ তুললো তরী। মাথার উপর ঘূর্ণায়মান ফ্যানের বাতাসে ও সে ঘেমে উঠেছে।
–” কি যে বলো।”
–” সত্যিই বলেছি। আমার ভাই থাকলে তার সাথে তার বিয়ে পড়িয়ে তোমাকে আমাদের বাড়িতেই রেখে দিতাম আমি।”
দীর্ঘ শ্বাস ছাড়লো রুমা,
–” কিন্তু সেগুড়ে বালি।”
–” সেগুড়ে বালি হবে কেন? আমাকে তোর ভাই ভাবিস না রুমা?”
তরঙ্গের ক্লান্ত কন্ঠে দু’জনে একসাথে দরজার দিকে তাকালো। ঘর্মাক্ত শার্ট পরিহিত তরঙ্গ ঘরে প্রবেশ করলো। এগিয়ে এসে রকিং চেয়ারে বসলো সে।
–” কি করছিস দুটোতে মিলে?”
চলবে
( প্রিয় পাঠক মহল,
কেমন হয়েছে জানাবেন কিন্তু!)
Share On:
TAGS: জল তরঙ্গের প্রেম, নবনীতা চৌধুরী
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
She is my Obsession পর্ব ৩১
-
She is my Obsession পর্ব ১০
-
She is my Obsession পর্ব ৩২
-
She is my Obsession পর্ব ১৪
-
She is my Obsession পর্ব ৮
-
She is my Obsession পর্ব ৩৫
-
জল তরঙ্গের প্রেম পর্ব ৪
-
She is my Obsession পর্ব ৩
-
She is my Obsession পর্ব ১
-
She is my Obsession পর্ব ২৮