জলতরঙ্গেরপ্রেম
পর্ব সংখ্যা;১১
লেখনীতেনবনীতাচৌধুরি
এক নতুন দিনের সূচনা। শেষ রাতের তুমুল বর্ষণ ভোরের আকাশে এসে ক্লান্ত হয়ে থেমেছে।
তার উচ্ছ্বাস এখন রূপ নিয়েছে নরম, টিপটিপ বৃষ্টিতে। আকাশ টা ধূসর মেঘে মোড়া, আর সেই মেঘের ফাঁক গলে নেমে আসা বৃষ্টির ফোঁটা গুলো মাটির বুকে আঁকছে নিঃশব্দ এক সুর।
রাত ভর ধুয়ে যাওয়া ধুলো বালি সরিয়ে প্রকৃতি যেন নতুন করে নিজেকে সাজিয়েছে। গাছের পাতায় জমে থাকা বৃষ্টির বিন্দু গুলো ঝিলমিল করছে সকালের আলোয়। ভেজা মাটির গন্ধে ভরে উঠেছে চারপাশ, আর চারদিকে ছড়িয়ে আছে ধোঁয়া – তোলা সবুজের সতেজতা।
ড্রাইভিং সিটে বসে স্টিয়ারিং দৃঢ় হাতে ধরে রেখেছে তরঙ্গ।
ভেজা রাস্তায় ধীর ছন্দে এগিয়ে চলেছে তাদের গাড়িটা। সামনে উইন্ড শিল্ডে টুপটাপ করে পড়া বৃষ্টির ফোঁটা গুলোকে মুছে দিচ্ছে ওয়াইপারের ছন্দময় দোল। তার পাশে সামনের সিটে নিশ্চুপ হয়ে বসে আছে তিন্নি। বাচ্চাটা কখনো জানালার বাইরে বৃষ্টি ভেজা প্রকৃতির দিকে তাকাচ্ছে, কখনো আবার বাচ্চা মনের ভাবনায় ডুবে যাচ্ছে সে।
গাড়ির পেছনের সিটে পাশাপাশি বসেছে তরী, বুসরা আর সাহনারা। ভেজা সকাল আর মৃদু বৃষ্টির আবহে গাড়ির ভেতরটা ও শীতল নীরবতায় চেয়ে আছে। মাঝে মধ্যে কাঁচে বৃষ্টির ফোঁটার শব্দ আর ইঞ্জিনের মৃদু গুঞ্জন ছাড়া চারপাশে আর কোনো শব্দ নেই।সবাই নিজ নিজ চিন্তার ভেতর গুটিয়ে আছে।
সাহনারা আজ বেশ উচ্ছ্বসিত। একমাত্র ভাইয়ের মেয়ের বিয়ে বলে কথা। তার সাথে ওনার মাথায় আরো একটা নতুন বুদ্ধি এসেছে। তরী কে নিজের ছেলের পিছ ছাড়া করার জন্য একদম উত্তম বুদ্ধি। শুধু প্ল্যান মোতাবেক কাজ টা শেষ করতে পারলেই হলো। সাহানারা কে চুপ থাকতে দেখে বুসরা দুজনের মাঝের দূরত্ব গুছিয়ে; সুধালেন;-
–” কি ভাবছো ভাবি?”
জায়ের কথায়, সাহনারা পাশে বসা তরীর দিকে তাকালো। জানলার সাথে মাথা ঠেকিয়ে চোখ বন্ধ করে আছে মেয়েটা। দেখে বোঝা যাচ্ছে না ঘুমাচ্ছে নাকি জাগ্রত। নিচু স্বরে জবাব দিলো সাহনারা।
–” আমার মাথায় একটা জব্বর বুদ্ধি এসেছে বুসরা। ঠিকঠাক মতো ব্যবহার করতে পারলেই হলো।”
সাহনারার কথা বলার ভঙ্গিমায় বুসরা ইচ্ছুক দৃষ্টিতে তার দিকে তাকালো। চোখে মুখে কৌতূহলের মৃদু ঝিলিক খেলে গেলো। মা আর চাচিকে ফিসফিস করে কথা বলতে দেখে তরঙ্গ আলতো চোখ বুলালো লুকিং গ্লাসে। গ্লাসের ছোট্ট প্রতিবিম্বে তরীর মুখশ্রী ধরা না পড়লে ও; স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে বুসরা আর সাহনারাকে। মুহূর্তেই গ্লাসটা সামান্য ঘুরিয়ে নিলো সে — দৃষ্টি গিয়ে থামলো তরীর উপর। ছাই রঙা থ্রি-পিছ পরিহিত তরীর; দীঘির জলের অনুরূপ ডাগর অক্ষি যুগল বুঁজে রাখা। তরঙ্গ দীর্ঘ শ্বাস চাপলো। এই এক জোড়া চোখ ই তার সর্বনাশের কারণ।
শেষ রাতের ঘটনার পর থেকে দুজনের মাঝে আর কোনো কথা হয়নি। তরঙ্গ নিজেই নীরবতা বেছে নিয়েছে। সেই নীরবতা এখন অভিমানে রূপ নিয়েছে। লুকিং গ্লাস থেকে চোখ সরিয়ে রাস্তায় দৃষ্টি স্থির করলো তরঙ্গ। সাহনারা আর বুসরা এখনো নিজেদের মধ্যে ফিসফিস করে কথোপকথন চালিয়ে যাচ্ছে। আচানক চোখ খুলে সোজা হয়ে বসে পড়লো তরী। এক হাতে মাথা চেপে অপর হাতে মুখ টিপে ধরলো সে। বমি পাচ্ছে তার। বহু কষ্টে নিজেকে সামলে চাচির উদ্দেশ্যে বলে উঠলো তরী।
–” চাচি,”
–” হ্যাঁ?”
–” তরঙ্গ কে একটু গাড়ি টা থামাতে বলুন না।”
তরীর কথায় মুখ কালো হয়ে গেলো সাহনারার। বিরক্তি না চেপে কড়া কন্ঠেই বললেন তিনি।
–” এটুকু পথে আবার থামবে কেন বাপু? একটু মুখ চেপে বসো না। এই তো চলে এসেছি।”
চাচির কথায় ফের গাড়ির জানলার সাথে মাথা ঠেকিয়ে চোখ বন্ধ করে নিলো তরী। বৃষ্টির চিকন ছাঁট আর মিষ্টি হাওয়া ও তাকে সস্থি দিতে পারছে না। সাহনারার মনে দয়া হলো কিনা কে জানে। তরঙ্গ কে ডাক দিলেন তিনি।
–” তরঙ্গ সামনে পারলে একটু গাড়ি টা থামাস।”
অন্যমনস্ক তরঙ্গ সম্পূর্ণ কথা না শুনেই প্রশ্ন করে বসলো।
–” কেনো?”
–” তরীর বমি পাচ্ছে।”
তরঙ্গ কোনো জবাব দিলো না। ধীরে ধীরে গাড়ির স্পিড কমিয়ে আনলো সে। অতঃপর হাইওয়ের দীর্ঘ সড়ক ছেড়ে গাড়িটা সাইডে এনে থামিয়ে দিলো। গাড়ি পুরোপুরি থামার আগেই হুড়মুড়িয়ে দরজা খুলে নেমে পড়লো তরী। আর এক মুহূর্ত ও ভেতরে থাকা সম্ভব নয় তার পক্ষে। টলতে টলতে দৌড়ে গিয়ে রাস্তার ধারের এক গাছের অংশ আঁকড়ে ধরলো সে। পর মুহূর্তেই গলা দিয়ে উঠে এলো তীব্র বমির ঢেউ। পেটের ভেতর যা কিছু ছিল, সবটুকু উগরে দিতে লাগলো সে।
তরীর পুতুলের অনুরূপ ছোট্ট দুর্বল শরীরটা কেঁপে উঠছে বারবার। মুখে ক্লান্তির ছাপ চাপিয়ে; চোখে পানির অস্তিত্ব দেখা দিলো। গাছের কাণ্ডে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে হাঁপাচ্ছে তরী। গাড়িতে বসে দূর থেকে দৃশ্যটা দেখে মুখ কুঁচকে উঠলো সাহনারা আর বুসরার। বিরক্তি স্পষ্ট হয়ে উঠলো তাদের চোখে-মুখে।
বুসরা তেতো স্বরে বিড়বিড় করে উঠলেন;-
–” গাড়িতে উঠবার আগে ওষুধ খেতে পারেনি। এখন নাটক করছে। এখন গাড়ি থেকে নেমে দেখবে এই মেয়ে কে!”
–” তোমরা বসো, আমি দেখছি।”
গাড়ির সামনের ড্যাশ বোর্ডে রাখা পানির বোতলটা হাতে তুলে নিলো তরঙ্গ। সিট বেল্ট খুলে দরজা ঠেলে নেমে পড়লো সে। কিছুটা দূরে, রাস্তার ধারের গাছ ধরে দাঁড়িয়ে আছে তরী। বমির ধকলে শরীরটা এখনো কাঁপছে তার। সেই দিকে একবার তাকিয়েই ধীর পায়ে এগিয়ে গেলো তরঙ্গ।
কাছে গিয়ে কোনো কথা বললো না সে। চুপচাপ পানির বোতলটা তরীর দিকে বাড়িয়ে দিলো।
–” চোখে মুখে পানি ছিটিয়ে নে। ভালো লাগবে।”
না তাকিয়েই তরঙ্গের হাত থেকে পানির বোতল নিয়ে নিলো তরী। চোখে মুখে পানি ছিটিয়ে কিছুক্ষণ গাছ ধরে চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলো সে। দুর্বল শরীরের কম্পনে সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারছে না তরী। তরঙ্গ তা খেয়াল করেই জিজ্ঞেস করলো;-
–” ঠিক আছিস?”
–” হু,”
কথা শেষ করেই নিজের শরীরের ভার ছেড়ে দিয়ে জ্ঞান হারালো তরী। দ্রুত পায়ে এগিয়ে এসে তরীকে নিজের বুকের সাথে চেপে ধরলো তরঙ্গ। ঘটনার আকস্মিকতায় তরঙ্গের হৃদস্পন্দন ঘোড়ার গতিতে ছুটতে শুরু করলো।
–” এই তরী জান! কি হয়েছে তোর? এই জান চোখ মেল।”
তরী চোখ মেললো না। তরঙ্গ সময় ব্যয় না করে, কোলে তুলে নিলো তরীকে। বলিষ্ঠ বাহুতে তরীর কোমল তনু জড়িয়ে তড়িৎ গতিতে গাড়ির কাছে এগিয়ে এলো সে। ফন্ট সিটের জানলার গ্লাসে টোকা দিতেই তিন্নি তাকালো। অচেতন বোন কে দেখে উদগ্রীব হয়ে উঠলো তিন্নি। গাড়ির দরজা খুলে ভয়ার্ত চোখে সুধালো সে;-
–” আপুর কি হয়েছে ভাইয়া?”
–” পেছনের সিটে গিয়ে বসো আপু। তরীকে এখানে বসাবো।”
নিঃশব্দে নিজের সিট ছেড়ে দিলো তিন্নি। তরী কে ফন্ট সিটে বসিয়ে নিজে ও ড্রাইভিং সিটে এসে বসলো তরঙ্গ। সাহনারা আর বুসরা আপাতত চোখ বুঁজে আছে। জানলার গ্লাস তুলে দিয়ে এসি অন করে দিলো তরঙ্গ। উষ্ণতা পেতেই ওনাদের ঘুম গাড়ো হয়ে এলো। তরঙ্গ তরীর মুখে পানি ছিটাতে সে চোখ মেলে তাকালো। পেছনে না তাকিয়েই তিন্নির উদ্দেশ্য তরঙ্গ বলে উঠলো;-
–” ঘুমা টেমা, তোর বোন চোখ মেলেছে।”
প্রলম্বিত শ্বাস ত্যাগ করে তরীর কানের নিকট নিজের মুখটা বাড়িয়ে আনলো সে।
–” বড্ড বেশি জ্বালাচ্ছিস তরকারি জান। আমার বাচ্চা কে পৃথিবীতে আনার খবর দিতে গিয়ে অজ্ঞান হওয়ার জায়গায়; না খেয়ে অজ্ঞান হচ্ছিস। নিষ্পাপ বাচ্চাদের বাপ হয়ে আমাকে ও এসব সহ্য করতে হচ্ছে।”
তরঙ্গের নিগূঢ় কন্ঠের কথায়, লজ্জা আর অস্বস্তির তোপে তরীর গাল রক্তিম হয়ে উঠলো। শ্যাম বর্ণের মুখশ্রী মূহুর্তে লালচে কালো বর্ণ ধারণ করলো। তরঙ্গ তা দেখে ঠোঁট কামড়ে হাসলো। হাসি থামিয়ে ড্যাশবোর্ড থেকে আরেকটা পানির বোতল বাড়িয়ে দিলো তরীর পানে।
–” আপাতত পানি খেয়ে রেস্ট কর। কিছুক্ষণের মধ্যে তোর মামা শশুর বাড়ি পৌঁছে যাবো। তখন না হয় বউ আপ্যায়ন করবো তোকে।”
–” একদম অসভ্যতামি করবেন না তরঙ্গ।”
তরীর মিনমিনে স্বরে বলা কথায় তরঙ্গ বেশ মজা পেলো। তাকে অন্যমনস্ক করতে তরঙ্গ আরেকটু অসভ্য হলো।
–” আজ অন্তত একটা লাল জামা টামা পরতি। কি বিধবার মতো ছাই রঙ পরেছিস।”
–” তরঙ্গ!”
–” কি হয়েছে আপু?”
তরীর মৃদ্যু চিৎকারে তিন্নি মাথা এগিয়ে আনলো। ততক্ষণে তরঙ্গ গাড়ি চালাতে শুরু করেছে। এক হাতে স্টিয়ারিং ধরে, নীল শার্টটার বুকের কাছের দুটো বোতাম আলগা করে দিলো সে। পর পর পকেট থেকে সানগ্লাস টা পরে নিলো চোখে। যাতে তরীর দিকে তাকালে ও সে টের না পায়।
–” তোর কাজ তুই ঠিক ভাবে পালন করছিস না টেমা। সেই দুঃখে তোর বোন চেঁচাচ্ছে।”
ঘড়ির কাঁটা সাড়ে বারোটা ছুঁয়েছে। বৃষ্টির ছাঁট আগে থেকে বেড়েছে কিছু টা।
সরকার বাড়ির গেটে এসে তরঙ্গদের গাড়িটা থামলো। গাড়ি থামতেই হৈ হৈ করে বেরিয়ে এলো তরঙ্গের খালা, মামিরা। সাহনারা আর বুসরা ও নেমে পড়লেন গাড়ি থেকে। তিন্নি ও নেমে গেলো। ওরা নামতেই তরঙ্গ গাড়ি লক করে দিলো। দরজার হাতলে প্রেস করে অবাক চোখে তরঙ্গের দিকে তাকালো তরী।
–” এটা কেমন অসভ্যতা তরঙ্গ।”
–” আমাকে যে এতোবার অসভ্য বলছিস। একবার অসভ্যতামি করলে সহ্য করতে পারবি?”
চলবে
( প্রিয় পাঠক মহল,
আপনারা ইদানিং মন্তব্য করা বন্ধ করে দিয়েছেন। যা খুবই বেদনা দায়ক। এমন হলে আমার বুঝে নিতে হবে যে গল্প টা আপনাদের পছন্দ না। এবং এখানেই ইতি টানতে হবে। আপনারা কি বলেন?)
Share On:
TAGS: জল তরঙ্গের প্রেম, নবনীতা চৌধুরী
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
She is my Obsession পর্ব ২
-
She is my Obsession পর্ব ২০
-
She is my Obsession পর্ব ২১
-
She is my Obsession পর্ব ৩৪
-
She is my Obsession পর্ব ৩
-
She is my Obsession পর্ব ২৫
-
She is my Obsession golper link
-
She is my Obsession পর্ব ৩০
-
জল তরঙ্গের প্রেম গল্পের লিংক
-
She is my Obsession পর্ব ১৫