চন্দ্রবিন্দু
পর্ব_৭ (শেষ পর্ব)
জান্নাতুল_নাঈমা
বিন্দুর যখন ঘুম ভাঙে তখন ভর দুপুর। এত সময় ঘুমিয়েছে সে। আহারে কতদিনের ঘুম! ঘুম ভাঙতেই চারপাশে দৃষ্টি বুলালো বিন্দু। বুকের ভেতর গুনগুনিয়ে কেঁদে উঠল। হাহাকার বেরিয়ে এলো মুখ ফুটে চন্দ্র! চন্দ্র! চন্দ্র!!!
ত্বরিত উঠে দাঁড়ায় বিন্দু। অস্থির হয়ে উঠে খুব। চন্দ্র তাকে ডেকেছিল৷ তার ডাকেই সে ছুটে এসেছে। কেন ডাকল চন্দ্র? কেন? ভাবতে ভাবতেই ঘরটা তন্নতন্ন করে কী যেন খুঁজতে লাগলো৷ এক পর্যায়ে গিয়ে পাটি উঠাতেই দেখতে পেলো সাদা একটি কাগজ মুড়িয়ে পড়ে আছে৷ নিমেষে ছিনিয়ে নিলো যেন কাগজটা। বিন্দুর হাত কাঁপছে! কী লিখেছে চন্দ্র? তার জন্য নিশ্চয়ই কিছু লিখে গেছে। যেটুকু বলা হয়নি অথচ বলার ছিল তা অবশ্যই চিঠিতে বলে গেছে চন্দ্র৷ বিন্দু আর দেরি করে না। কাগজটা খুলে ফেলে।
বিন্দু…প্রিয়তমা আমার!
বড্ড ভালোবাসি তোমায়। এই যে নাম ধরে ডাকছি কত ভালোবাসি বলেই ডাকছি৷ এই যে লিখছি তীব্র ভালোবাসা থেকেই লিখছি।
বিন্দু?
শুনেছিলাম, মানুষ মারা যাওয়ার আগে নাকি টের পায়? আমি বোধহয় পেয়েছি। ভেতরে থাকা আত্মাটা ছটফট করছে খুব। যে পৃথিবীতে বিন্দু আমার না। সে পৃথিবীতে আমার আত্মা তো ছটফটই করবেই তাই না?
বিন্দু?
তুমি লাল শাড়ি পরেছিলে তাই না…
কথা ছিল লাল শাড়িতে বউ হবে আমার। দোষ আমার। দোষী আমাকে তুমি ভালোবাসতে পারবে না। এ আমার জানা ছিল না৷ আমার জানা ছিল বিন্দু সব ভাবে সব অবস্থায় শুধু চন্দ্রের। বুকের ভেতর ধাক্কা লেগেছে বিন্দু। সেই ধাক্কা সামলে কিছুকাল টিকছি। কিন্তু খুব বেশিদিন টিকব না।
বিন্দু?
সব সত্যি বলতে অনেক সময় নিলাম। কেন নিলাম সবটাই বলব৷ তবে আমার আবদার এই সত্যি তুমি ছাড়া পৃথিবীর কেউ জানতে পারবে না আর।
শোনো বিন্দু,
চন্দ্র তোমায় ছাড়া দ্বিতীয় কোনো নারীর দিকে প্রেমিকের দৃষ্টিতে তাকিয়েও দেখেনি। তবে কি ভাবছো পুরুষের দৃষ্টিতে তাকিয়েছি? আর তাই সাহেরা গর্ভবতী হয়েছে.. হাহাহা। আরে পাগলি এই চন্দ্রর পৌরুষ এত সস্তা না রে।
তবে সাহেরা কে? অস্থির হইও না। নিজেকে সামলাও। আজ থেকে নিজেকে সামলেই তোমায় বাঁচতে হবে।
বিন্দু তুমি কি রোকনকে চিনতে? আমার জীবনের সব গল্পই তো তোমার জানা। এই মুহুর্তে মনে করতে পারছি বা রোকনের কথা তোমাকে বলেছিলাম কিনা। আমি ঢাকা গিয়েছিলাম রোকনের বিয়ে খেতে৷ রোকন খুব তাড়া দেওয়ায় আটদিন আগেই চলে যাই। বিয়ে আসন্ন। তুমি তো জানো আমি বড়ো ত্যাঁদর। ওর বিয়ের আগের দিন ছোট্ট একটা আয়োজন করি। সে আয়োজনে অনেক ধরনের ব্যবস্থাই ছিল। রাগ করো না বিন্দু। সিগারেট ছাড়া নিয়মিত অন্য কোনো নেশা আমি করতাম না। কিন্তু ওইদিন ওয়াইনের ব্যবস্থা করেছিলাম। বন্ধুদের সঙ্গে মজামস্তি করতে করতে এত বেশি খেয়ে ফেলছিলাম যে রোকনের বাড়িতে ড্রাইভ করে ফেরার মতো অবস্থা আমার ছিল না। রোকন ভদ্র ছেলে৷ নেশাটেশা করে না। সেদিনও করেনি৷ তাই আমাকে বলল,
‘ চন্দ্র তুই আজ পারবি না চাবি দে আমি ড্রাইভ করি। ‘
কথাটা আমার ইগোতে আঘাত করল। নেশা করেছি বলে আমি পারব না কেন? রোকনকে ধাক্কা মেরে সরিয়ে দিয়ে বললাম,
‘ ব্যাটা পারি কি না পারি দেখ। ‘
এরপর আমি ড্রাইভিং সিটে বসলাম। রোকন পেছনের সিটে গিয়ে বসতে বসতে বলল,
‘ আচ্ছা সাবধানে আমার শরীর ব্যথা করছে। একটু শুবো।’
এই বলে ও পেছনে চলে গেল। আমার কথা, আচরণে ও আশ্বস্ত ছিল আমি পারব। কিন্তু কিছুদূর যাওয়ার পর আমি নিজের প্রতি বিশ্বাস হারিয়ে ফেললাম। একটা পথ দুটো দেখি৷ একটা গাড়ি চারটে হয়ে যায়। এমন অবস্থায় আচমকা একটা ট্রাকের মুখোমুখি হতেই প্রাণ বাঁচাতে গাড়ির ডোর খুলে লাফ দিই আমি। নিজের জান বাঁচাতে এতটাই ব্যস্ত ছিলাম যে পেছনে যে রোকন ছিল ভুলেই গেছি। ব্যস, সবটা এক নিমেষে শেষ হয়ে গেল! রোকনের বডির অনেক অংশ খুঁজেই পায়নি পুলিশ। আমার অবস্থা তখন পাগলপ্রায়! পুলিশের সন্দেহ আমার দিকে। আমিও জানি আমি কী করেছি। রোকনকে খু ন করেছি আমি। ভেতরে ভেতরে দিশেহারা, উন্মাদ হয়ে গেলাম। ওদিকে সাহেরার অবস্থা করুণ। প্রেমিককে হারিয়ে নয় বরং নিজের ভবিষ্যৎ স্বামী আর সন্তানের বাবা হয়ে। আমি আশ্চর্য হয়ে গিয়েছিলাম। রোকনের মতো শান্ত, ভদ্র ছেলে বিয়ের আগেই সাহেরার সঙ্গে সেই গভীরতায় গিয়েছিল। যার চিহ্ন তাদের অনাগত সন্তান। এবার আমার অপরাধ বোধ আরও বেড়ে গেল৷ আমি একটা অনাগত শিশুকে এতিম করে দিলাম। শুধু তাই নয় এই সন্তানের বৈধতা বিশেষ প্রয়োজন। রোকন এ কারণেই বিয়ে নিয়ে তাড়াহুড়ো করছিল। কিন্তু সবটা শেষ হয়ে গেল আমার জন্য শুধু আমার জন্য।
সাহেরা জ্ঞান হারাচ্ছে বারবার। আমার অপরাধবোধ এতটাই তীব্র হয় যে আমি একান্তে সাহেরার কাছে মাফ চাইতে যাই। সব শুনে সাহেরা ক্ষেপে উঠে। আমাকে সে পুলিশে দেবে। আমি চন্দ্র বিরাট আত্ম সম্মানওয়ালা, নির্ভীক ব্যক্তি সে মুহুর্তে ভয় পেয়ে যাই। সর্বনাশা এক ভয়। যা শেষ করে দিলো সবটা।
সাহেরার কাছে ক্ষমা চাই। সাহেরা তখন নরম হয়। কাঁদতে কাঁদতে বলে,
‘ কী করে ক্ষমা করব? আমার গর্ভে যে আছে তার হবে একবার ভাবুন। যদি আমরা বিবাহিত থাকতাম তাহলে কোনো সমস্যা হতো না। কিন্তু এখন তো বেঁচে থাকাও কঠিন। মরা ছাড়া যে আমার উপায় নেই। এই সমাজ আমাকে বা আমার সন্তানকে না মানবে আর না বাঁচতে দেবে। ‘
আমি নিশ্চুপ। সাহেরা হঠাৎ আমার পায়ে লুটিয়ে পড়ে।
‘ আপনার ভুলে একজন পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছে। এক প্রাণ হত্যা করেছেন। আরও দুটো প্রাণকে হত্যা করবেন না। আপনি আমার সন্তানের বৈধতা দিন। দয়া করুন। আমাদের বাঁচান। ‘
আমি খু নী! আমি অপরাধী! আমি রোকনকে হত্যা করেছি! এই কথা গুলো আমার মস্তিষ্ক খেয়ে ফেলে। আমি বোধবুদ্ধিহীন অবস্থায় বিয়ে করে নেই সাহেরাকে।
বিন্দু?
এটাই ছিল সেই সত্যি। যা আমি বলতে পারিনি।
বিন্দু রোকনের অবৈধ অংশকে বৈধতা দিয়ে গেলাম। কিন্তু তোমাকে আমার জন্য বৈধ করতে পারলাম না। ঠিক এই যন্ত্রণাটাই আমাকে শেষ করে দিচ্ছে।
এই সত্যিটাই তোমাকে আজীবন দুঃখী করে দিলো। আমাকে ক্ষমা করো বিন্দু।
আমি ভুল। আমার মতো দোষী, অপরাধী, খুনীর জন্য তোমার মতো পবিত্র ফুল অপেক্ষা করেনি।
অথচ আমি আশায় ছিলাম, আমি তোমাকে আমার বউ করব। সাহেরাকে গ্রহণ করে তুমি সেদিন আমার জীবনে না এলেও আমার ভেতরটা বিশ্বাস করেছিল সব সত্যি জানার পর তুমি আমাকে ছেড়ে যাবে না। সেই বিশ্বাসটা তখনি ভাঙল যখন তুমি এহসান মাস্টারের স্ত্রী। যখন তোমার শরীরে এহসান মাস্টারের স্পর্শ!
বিন্দু?
চন্দ্র তোমাকে ভালোবাসে। এই সহজ সত্যি আজ পৃথিবীলোকে কঠিন। তুমি সহজ নিও। অনুরোধ কঠিন ভেবো না৷
আমি তোমার প্রেমিক বিন্দু, প্রতারক নই।
বিন্দু? প্রিয়তমা আমার…
বড্ড ভালোবাসি!
চিঠিটা পড়া শেষ করে উথাল-পাথাল করতে করতে জ্ঞান হারালো বিন্দু।
~সমাপ্ত~
এক ঘেয়েমিতার বাইরে গিয়ে একটু ডিফারেন্ট লেখার চেষ্টা। জানি ভালো হয়নি। হযবরল লিখছি। এজন্য একটু লজ্জিত…। ভুলত্রুটি ক্ষমা করবেন।
Share On:
TAGS: চন্দ্রবিন্দু, জান্নাতুল নাঈমা
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
চন্দ্রবিন্দু পর্ব ৬
-
চন্দ্রবিন্দু পর্ব ৩
-
চন্দ্রবিন্দু পর্ব ২
-
চন্দ্রবিন্দু পর্ব ৫
-
চন্দ্রবিন্দু পর্ব ১
-
চন্দ্রবিন্দু গল্পের লিংক
-
চন্দ্রবিন্দু পর্ব ৪