চন্দ্রবিন্দু
পর্ব_৪
জান্নাতুল_নাঈমা
বিন্দুর কান দুটো গরম হয়ে যায়। মস্তিষ্ক শূন্য শূন্য লাগে। বুকের গভীরে থাকা ছোট্ট হৃদয় আর ছটফট করে না। অস্থিরতা কমে যায় আচমকা। অনুভূতিদের গা গুলায়। ভালোবাসাও বুঝি এভাবে ঘৃণা হয়ে যায়?
বিন্দু দু পা পেছায়। তারপর ঘুরে দাঁড়ায়। স্থির থাকে না এক মুহুর্তও। ছুটে যায় নিজের বাড়িতে। নিজের ঘরে৷ কল্ললী সঙ্গে সঙ্গে ছুটে আসে৷ বিন্দু মুখের ওপর দরজা বন্ধ করে দেয়। কল্ললী আঁতকে উঠে। আবেগের তাড়নায় কোনো সর্বনাশ বয়ে আনবে না তো মেয়েটা? দরজায় ঠকঠক শব্দ তুলে কল্ললী। কণ্ঠে স্নেহ মেখে ডাকে বিন্দুকে।
‘ বিন্দু মা আমার দরজা খোল। ‘
ভয়ে থরথর করে কাঁপতে থাকে কল্ললী। বিন্দু সাড়া দিচ্ছে না কেন? তার সে ভয় বেশিক্ষণ টেকে না। একটুক্ষণ পরই বিন্দুর স্বাভাবিক কণ্ঠস্বর পায়।
‘ হরি ঘটককে খবর দাও মা। মাস্টার সাহেব যদি বিয়ে না করে থাকে। তবে কালই যেন প্রস্তুতি নিয়ে আসে। ‘
নিমেষেই চোখ জ্বলজ্বল করে উঠে কল্ললীর। খুশিতে চিৎকার করে ডাকে ছোটো মেয়ে বৃন্দাকে। পরোক্ষণেই আবার দপ করে নিভে যায়। বিন্দু এত স্বাভাবিক কী করে? ফের দরজা ধাক্কায় সে।
‘ দরজাটা খোল মা। ‘
‘ আমাকে একা থাকতে দাও মা। মানসিক ভাবে প্রস্তুতি নেওয়ার শক্তি করতে দাও। যাও তোরজোর শুরু করো। তোমার বড়ো মেয়ের বিয়ে হবে শিগগিরই। ‘
কল্ললী থামে। শান্ত হয়ে ভাবে সত্যি বিন্দুকে একা ছাড়া উচিত। অঘটন কিছু ঘটাবে না নিশ্চয়ই। তাই যদি ঘটাতো। বিয়ের বন্দোবস্ত করতে বলতো না।
হরি ঘটক খবর পেয়ে এহসান মাস্টারের বাড়ি খবর দেয়। তারা জানায় আগামীকালই তবে বিয়ে। এহসান মাস্টারের বয়স বত্রিশ। বিন্দুর থেকে বয়সে ষোল বছরের বড়ো৷ কল্ললীর কাছে বয়সটা কোনো সমস্যা নয়৷ তার থেকে বিন্দুর বাবা আঠারো বছরের বড়ো ছিল৷ এতে কোনো সমস্যা হয়নি৷ সংসারটা সুখেই চলছিল৷ দুটি মেয়েও হয়েছে। এরপর একদিন আল্লাহর ডাক পেয়ে মানুষটা চলে গেলেন৷ তবুও সেই সুখের সংসার সে ফেলে যায়নি। মেয়ে দুটোকে আঁকড়ে বেঁচে আছে৷ কেন আছে? মানুষটাকে ভালোবেসেই তো। জীবিত মানুষকে ভালোবাসার এক শান্তি আবার মৃত মানুষকে ভালোবেসে মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করা আরেক শান্তির।
আজ বিন্দুর বিয়ে। পাড়ার মহিলারা এসেছে। বিন্দুর গায়ে হলুদ মাখাবে বলে। লাল পাড়ে বাসন্তী রাঙা শাড়ি পরেছে বিন্দু৷ মুখে কোনো প্রসাধনী মাখেনি। গায়ে কোনো গহনাও পরেনি৷ তবুও মেয়েটার মাঝে অপরূপ স্নিগ্ধতা এসে মিশে গেছে যেন। শীতল পাটিতে বসে আছে বিন্দু। প্রথমে তার মা তাকে হলুদ ছুঁয়ালো। এরপর চন্দ্রর মা। এরপর সাহেরা। একে একে সবাই বিন্দুর গায়ে হলুদ ছোঁয়াল। বিন্দু নিশ্চুপ। উদাস তার দৃষ্টি। কে এলো কে গেল৷ কে তাকে হলুদ দিলো এতে তার কিছুমাত্র যায়-আসে না। কল্ললী খুব যত্ন করে মেয়েকে গোসল করিয়ে দিলো। বিন্দু শুধু নিঃশ্বাসই ফেলল। এর বেশি কোনো প্রতিক্রিয়া তার মধ্যে দেখা গেল না।
দুপুরের পরই বরপক্ষ চলে এলো৷ পাত্র দেখে কানাঘুষা শুরু করল সকলে। অমন সুন্দর, মোমের মতো বিন্দুর জন্য এমন পেট মোটা, কালো, খসখসে বর জুটল! বিন্দুর বর দেখে চারদিকে হতাশার সুর ভাসতে লাগলো৷ বিন্দু কিছুই বলল না। বলল কল্ললী।
‘ বিন্দুর বর কালো হোক, পেট মোটা ভুড়িওয়ালা হোক এতে আমাদের কিচ্ছুটি আসে যায় না। শুধু লোকটা ঠকবাজ, বেইমান, প্রতারক শ্রেণীর যেন না হয়। এটুকুই কামনা করি। ‘
কল্ললীর কথাটা চায়না বেগমের গায়ে লাগলো খুব। কল্ললী যে চন্দ্রকে অপমান করল এতে কোনো সন্দেহ নেই।
খুব সুন্দর ভাবে ত্রুটিহীন বিয়ে হয়ে গেল বিন্দুর। কনে বিদায় কালে বিন্দু মা আর বোনকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কাঁদল। এত চিৎকার করে, গা ভাসিয়ে কোনো বউ বাপের বাড়ি থেকে বিদায় কালে কান্না করে জানতো না সাহেরা৷ এ প্রথম দেখল। আর বুঝতে পারলো এই কান্না শুধু শশুর ঘরে চলে যাচ্ছে বলে নয়৷ এই কান্নায় মিশে আছে চন্দ্রের বউ হতে না পাড়ার তীব্র যন্ত্রণা। দীর্ঘশ্বাস ফেলল সাহেরা। মনে মনে ক্ষমা চাইল বিন্দুর কাছে৷ এরপর এগিয়ে গিয়ে বিন্দুর কাঁধে হাত রাখল। কান্নারত বিন্দু ঘুরে তাকাতেই সাহেরা শক্ত করে জড়িয়ে ধরল ওকে। কানের কাছে ফিসফিস করে বলল,
‘ ধন্যবাদ তোমাকে বিন্দু। ভাগ্যকে মেনে নিয়ে নিজের জীবনটা গুছিয়ে নাও। ‘
বিন্দুর ভেতরটা নড়ে উঠে। বুকের ভেতর থেকে উপচে আসে কান্নারা। সাহেরাকে আপাদমস্তক দেখে মনে মনে বলে,
‘ চন্দ্রর বউ তুমি! তুমিই চন্দ্রর বউ। ‘
এরপর সাহেরার পেটের দিকে তাকায়। আর চট করে একটা কাণ্ড করে বসে। মাটিতে দুই হাঁটু গেঁড়ে বসে সাহেরার কোমর জড়িয়ে ধরে ওর তলপেটে চুমু খায় দুটো। আর বিড়বিড় করে বলে,
‘ আমার এক জীবনের আফসোস তুই আমার চন্দ্রর সন্তান। কিন্তু আমার আর চন্দ্রের সন্তান নয়। ‘
এরপর উঠে দাঁড়িয়ে চোখের জল মুছে নেয়। সাহেরা নির্বাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। কল্ললী তাড়া দিলো।
‘ বিন্দু মা আয় এদিকে। জামাই অপেক্ষা করছে। ‘
বিন্দু পা বাড়ায়। এহসান গিয়ে গাড়িতে উঠেছে। বিন্দু গেইটের সামনে মায়ের সঙ্গে দাঁড়িয়ে আছে। বিন্দুর শশুর ঘর থেকে লোক এসেছে মাত্র দুজন। একজন ওর শশুর। সে গিয়েও গাড়িতে বসেছে। আর একজন ওর ননদ। নাম এমি। বয়সে বিন্দুর চেয়ে বড়ো। সে দাঁড়িয়ে আছে বিন্দুর পাশে৷ কল্ললী মেয়েকে এগিয়ে দিলো গাড়ি পর্যন্ত। বিন্দু এহসানের পাশে বসল। ড্রাইভার গাড়ি স্টার্ট দিয়েছে। বিন্দু চলে যাচ্ছে শশুর বাড়ি…
দীর্ঘ দুই মাস পর বাড়ি ফিরল চন্দ্র। কত কথা জমা মনে। সব বলবে বিন্দুকে। মেয়েটা নিশ্চয়ই অভিমানে চোখ ভাসিয়েছে এতদিন। আর নাহ। আর বিন্দুকে কাঁদতে দেবে না সে। এবার সব সত্যি বলবেই বলবে।
মধ্যরাতে বাড়ি ফিরেছে চন্দ্র। ঘুমানোর আগে বিন্দুকে ভাবতে ভাবতেই ঘুমিয়েছে। ভোরবেলা বেশ জঘন্য একটা স্বপ্ন দেখে ঘুম ভাঙল। স্বপ্নটা এমন –
বিন্দু লাল টুকটুকে শাড়ি পরেছে। বাসর ঘরে বসে আছে বধু রূপে। বর বেশে সে বাসর ঘরে ঢুকবে। এমন সময় অচেনা এক লোক বর বেশে বাসর ঘরে ঢুকে পড়ল। আর তার মুখের ওপর দরজা বন্ধ করে দিলো।
ঘুম থেকে হন্তদন্ত হয়ে উঠল চন্দ্র। তার বুকের ভেতর কেমন ফাঁকা ফাঁকা লাগছে। এমন বিশ্রী ধরনের স্বপ্ন এর আগে সে কক্ষনো দেখেনি। হৃৎস্পন্দন কাঁপছে কেন এভাবে? বিন্দু ঠিক আছে তো? ভুল হয়ে গেল। বাড়ি ফিরে ঘুমানো উচিত হয়নি তার। উচিত ছিল আগে বিন্দুর সাথে দেখা করা। কল্ললী কাকি রাগ করতো, তিতা কথা শোনাতে৷ তাকে কী? চন্দ্র আর দেরি করে না৷ শুধু একটা লুঙ্গি পরনে তার। গায়ে সেন্ডো গেঞ্জিও নেই। ওভাবেই সে বিন্দুর বাড়ির দিকে ছুটল। সিঁড়ি বেয়ে নামতেই সাহেরা সামনে পড়ল। চন্দ্র দেখেও দেখল না। সাহেরা টের পেতেই আঁতকে উঠল। এবার চন্দ্রকে কীভাবে সামলাবে?
বিন্দুদের বাড়িতে ঢুকতেই কল্ললীর মুখোমুখি হলো চন্দ্র। কল্ললী কী যেন হিসেব করছে। চন্দ্র এসে জিজ্ঞেস করল,
‘ কেমন আছো কাকি মা? ‘
কল্ললী সে জবাব না দিয়ে বলল,
‘ চন্দ্র! বাড়ি ফিরেছো তবে? বেশ ভালো কথা একজন বাড়লো তবে। ‘
চন্দ্র ভ্রু কুঁচকে বলল,
‘ কী বাড়ল? ‘
‘ সদস্য। ‘
‘ কীসের সদস্য, কী বলছো? ‘
কল্ললী এবার মিষ্টি হেসে উত্তর দিলো,
‘ বিন্দুর বউ ভাতে বাপের বাড়ির দিক থেকে কে কে যাবে সেই সদস্য সংখ্যার হিসেব। ‘
কল্ললী কথা শেষ করতেই হরি ঘটক এসে উপস্থিত হলো। কল্ললীকে বলল,
‘ কয়জন হইল গো? ‘
কল্ললী বেশ উৎসুক হয়ে বলল,
‘ ষোলজন হিসাব ছিল এই আর একজন বাড়ল। ‘
হরি ঘটক বলল,
‘ ইনি কে?’
‘ ভূঁইয়া বাড়ির বড়ো ছেলে। সম্পর্কে বিন্দুর বড়ো ভাই’ই হয়! ‘
~ক্রমশ~
[ ভুলত্রুটি ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন ]
Share On:
TAGS: চন্দ্রবিন্দু, জান্নাতুল নাঈমা
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE