Golpo romantic golpo চন্দ্রবিন্দু

চন্দ্রবিন্দু পর্ব ৩


চন্দ্রবিন্দু

পর্ব_৩

জান্নাতুল_নাঈমা

বিএ পাশ পাত্র৷ এক বাপের এক ব্যাটা। স্কুলে মাস্টারি করে। চন্দ্রের মতো ভবঘুরে নয়। নিরেট ভদ্রলোক। ছয় ভরি স্বর্ণ দিয়ে সাজিয়ে নেবে বিন্দুকে। কাবিন হবে তিনলাখ টাকা। তাও নগদে দিয়ে দেবে। এমন একজন মেয়ে জামাই নিয়েই তো সবাই স্বপ্ন দেখে। কল্ললী খুশিতে না পারছে চিৎকার করে সবাইকে জানাতে। তাই ছোটো মেয়ে বৃন্দাকে দিয়ে ও বাড়ি খবর পাঠালো। খবর শুনতেই চায়না বেগম নতুন বউ সাহেরা আর মেয়ে চামেলিকে নিয়ে চলে এলো। সঙ্গে আনলো লাল টুকটুকে একটা বেনারসি শাড়ি৷ এসেই কল্ললীকে বলল,

‘ শোনো কল্ললী ভাগ্যচক্রে বিন্দু আমার ছেলের বউ হয়নি। তাতে কী? ও তো আমার নিজের মেয়ের মতোই। তাই এই মায়ের দেওয়া শাড়ি পরেই আজ ও তিন কবুল পড়বে। ‘

এক গাল হেসে কল্ললী বলল,

‘ শুকরিয়া ভাবি। বিন্দু তবে এ শাড়ি পরেই কবুল পরবে। ‘

চামেলি আর সাহেরা বিন্দুর ঘরে গেল। বিন্দু কাঁদছে। সে কিছুতেই মনকে মানাতে পারছে না৷ চন্দ্র কত সহজে অন্যের স্বামী হয়ে গেল। তবে বিন্দুর কেন অন্যের বউ হতে কষ্ট হচ্ছে? চন্দ্র পুরুষ বিন্দু নারী এটাই কি তবে পার্থক্য? যুগে যুগে নারীরাই কেন কষ্ট পাবে? অবহেলিত হবে৷ কেনই বা প্রতারণার ভাগীদার কেবল নারীকেই হতে হবে?

বিন্দুর হৃৎস্পন্দন বন্ধ হয়ে আসে৷ চন্দ্র ছাড়া কাউকে সে স্বামী হিসেবে মানতে পারবে না৷ চন্দ্র ছাড়া কাউকে দিতে পারবে না নিজেকে ছোঁয়ার অধিকার।

মনে মনে বিন্দু এ পণ করতেই চন্দ্রর বউ সাহেরা এসে উপস্থিত হলো তার সামনে। এক নিমেষে চুরমার হয়ে গেল বিন্দুর পণ। বুকের গভীরে ছোট্ট হৃদয়টা ছটফটিয়ে উঠল এ কথা ভেবেই চন্দ্র তো তার নয়। সে এখন অন্যকারো! দু-চোখ বন্ধ করে নিলো বিন্দু। দু’হাতে নিজের কান দুটো চেপে ধরে বলল,

‘ না এ হতে পারে না৷ মিথ্যে সব মিথ্যে। ‘

সাহেরা আর চামেলি চমকে উঠল। সাহেরা চামেলির দিকে ভীত স্বরে তাকিয়ে বলল,

‘ বিন্দু এমন করছে কেন? ‘

চামেলি ঢোক গিলে। কী বলবে ভেবে না পেয়ে শুধু এটুকু বলে,

‘ মনে হয় আপা এই বিয়েতে রাজি না। ‘

সাহেরা অবাক হয়। জোর করে বিয়ে দিচ্ছে বিন্দুকে? কেন বিন্দু তো ছোট্ট মেয়ে এক্ষুনি কেন বিয়ে দিতে হবে? তাই এগিয়ে এসে বিন্দুর মাথায় হাত রাখে। প্রশ্ন করে,
‘ তুমি এই বিয়ে করতে চাও না? ‘

আকস্মিক সাহেরার হাত সরিয়ে দূরে সরে বসে বিন্দু। শরীর জ্বলে উঠে কেমন৷ সহ্য হয় না কিছুতেই সহ্য হয় না এই নারীকে। বিন্দু সহ্য করতে পারছে না৷ কেন এসেছে কেন? চিৎকার করে বিন্দু।

‘ সরে যাও, চলে যাও। ছুঁবে না আমাকে। আমার সব কেড়ে নিয়েছো তুমি সব। চন্দ্র আমার ছিল আমার। ও আমাকে কথা দিয়েছিল। আমরা বছরের পর বছর একে অপরকে নিয়ে স্বপ্ন দেখেছি! ‘

বিন্দুর ক্রন্দনরত প্রলাপ শুনে আঁতকে উঠে সাহেরা। তবে সেদিন বিন্দুর ওভাবে বেরিয়ে যাওয়া আর আজকের কান্নার কারণ এটাই? সাহেরার মাথা ঘুরে যায় তক্ষুনি। তবে এই কি সেই যার কথা চন্দ্র বলেছিল! সাহেরার চোখ দুটো ভিজে উঠে। ঠোঁট কামড়ে কান্না আটকায় সে৷ এরপর বিন্দুর ঘর ছেড়ে বেরিয়ে যায়।

ত্বরিত গতিতে হাঁটছে সাহেরা। মাথার ঘোমটা প্রায় সরে গেছে। বিন্দুদের গেট দিয়ে বেরুতে উদ্যত হতেই চন্দ্রর মুখোমুখি হলো সে৷ মুহুর্তেই চোখের পানি মুছে ফেলল সাহেরা। চন্দ্রকে উদ্ভ্রান্তের মতো দেখাচ্ছে। চোখজোড়া লালচে ভীষণ। সাহেরার দৃষ্টি গিয়ে চন্দ্রের বুক বরাবর আটকালো। নিঃশ্বাসের তীব্র উঠানামা স্পষ্ট। আহারে মানুষটার বুকে ঝড় বয়ে যাচ্ছে। ভেবেই মাথার ঘোমটা টানলো। এরপর চন্দ্রকে বলল,

‘ বিন্দু কাঁদছে। বাচ্চা মেয়ে ইশ, কত যন্ত্রণায় ভুগছে। ‘

চন্দ্র আর দাঁড়ায় না। হন্তদন্ত হয়ে সাহেরাকে পাশ কাটাতে উদ্যত হয়। সাহেরা আচমকা তার একটা হাত চেপে ধরে। চন্দ্র ঘাড় ফিরিয়ে তাকায় সাহেরার দিকে। অশ্রুজলে সিক্ত সাহেরার চোখ। চন্দ্র দৃষ্টি ফিরিয়ে নেয়। নিঃশ্বাস ফেলে অস্থির ভাবে। সাহেরা আকুতি নিয়ে বলে,

‘ বিন্দুকে বাঁচান। বিয়েটা হতে দেবেন না। ও পারবে না৷ আপনাকে ছেড়ে অন্য কাউকে নিয়ে বাঁচতে পারবে না। ‘

কথার শেষে চন্দ্রর হাত ছেড়ে দেয় সাহেরা। চন্দ্র নিঃশব্দে চলে যায় বিন্দুর কাছে। সাহেরার বুকের ভেতর ধড়াস করে উঠে। শরীর খারাপ লাগে ভীষণ। সে এক দৌড়ে চলে যায় ভূঁইয়া বাড়িতে…। কিন্তু ঘর পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে না৷ জ্ঞান হারায় আচমকা!


বিন্দু শাড়ি পরবে না, সাজবে না, বউ হবে না অন্য কারো। আদেশ চন্দ্রের, সিদ্ধান্ত বিন্দুর। কল্ললী পড়ল বিপদে। পাত্রপক্ষকে একটি মিথ্যা সংবাদ পাঠালো। তার মামা মারা গেছে। তাই আয়োজন স্থগিত। চন্দ্র বিন্দুর ঘরে। বিন্দু বিছানায় বসে আছে। চন্দ্র ওর দুই পা জড়িয়ে মেঝেতে বসেছে৷ এ প্রথম চন্দ্রের চোখে জল দেখল বিন্দু। কত আকুতি চন্দ্রের কণ্ঠে।

‘ বিয়ে করো না বিন্দু। আমার হৃদয়ে তুমি ছাড়া আর কেউ নেই। আমি তোমাকে সবটা বলব সব। কেন কীভাবে আমি সাহেরাকে বিয়ে করেছি। আমাকে সময় দাও বিন্দু। ‘

বিন্দু গলে গেল। ঝরা পাতার মতো ঝরে গেল তার সব রাগ, অভিমান। যাকে ভালোবাসে তার কান্না কী সহ্য করা যায়? চন্দ্রের এই রূপ যে সে প্রথমবার দেখল। সর্বদা সবক্ষেত্রে মাথা উঁচু রাখা চন্দ্রর নত মাথা কেবল তার জন্যই হয়েছে। ভালোবাসে চন্দ্র বিন্দুকে আজও একইভাবে ভালোবাসে। শব্দ করে কাঁদতে থাকে বিন্দু। জড়িয়ে ধরা পা দু’টো ছেড়ে উঠে দাঁড়ায় চন্দ্র৷ সযত্নে বিন্দুর মাথাটা বুকে জড়িয়ে নেয়। বিন্দুর কান্নার বেগ বাড়ে। কাঁদতে কাঁদতে চন্দ্রকে প্রশ্ন করে,
‘ তুমি কি ওকে ছুঁয়ে দেখেছো? বাসর হয়েছে তোমাদের? ‘

চন্দ্র নিশ্চুপ। বিন্দুর কণ্ঠে উতলা।
‘ বলো না চন্দ্র। একবার বলো শুধু একবার বলো তুমি ওকে ছোঁওনি। বলো চন্দ্র বলো। আমি আর পারছি চন্দ্র, এই চাপ আমি আর নিতে পারছি না। সত্যি বলো। ‘

এবারও চন্দ্র নিশ্চুপ। বিন্দু মুখ তুলে তাকায়। বিগলিত কণ্ঠে ফের বলে,

‘ বিন্দু ছাড়া তুমি অন্য কাউকে ছুঁয়ে দেখোনি চন্দ্র একটা বার স্বীকার করো। ‘

চন্দ্র মাথা নাড়ে। স্বীকার করে সে সাহেরাকে একটুও ছুঁয়ে দেখেনি। কান্না জড়িত মুখে আচমকা হেসে উঠে বিন্দু। হাত বাড়িয়ে আকুতি করে।
‘ কথা দাও কক্ষনো ওকে ছুঁবে না। ‘

চন্দ্র কথা দেয়। এবার বিন্দু প্রশ্ন করে।

‘ কেন বিয়ে করলে ওকে? ‘

চন্দ্র বিন্দুকে ছেড়ে দেয়। প্রস্তুতি নেয় সবটা বলার। তক্ষুনি শুনতে পায় চামেলির কণ্ঠস্বর।

‘ ভাইয়াআআ ভাবি অজ্ঞান হয়ে গেছে! ‘

চন্দ্র সরে যায় বিন্দুর থেকে৷ চলে যায় ঘর ছেড়ে। যাওয়ার আগে বিন্দুকে বলে যায়।
‘ চিন্তা করো না। আমি তোমারই আছি৷ তোমাকে আমি বিয়ে করব। বউ হবে তুমি আমার।’

চন্দ্র চলে যেতেই বিন্দু চমকে উঠে। তাকে বিয়ে করলে সাহেরার কী হবে? কোথায় যাবে? বুকের ভেতর ফের ঝড় উঠে বিন্দুর। অপেক্ষা করে চন্দ্রের আসার। কিন্তু চন্দ্র সেদিন আর আসে না। পরেরদিন বা তার পরেরদিন তাও আসে না৷ সাতদিন চলে গেলে ধৈর্য্য হারায় বিন্দু। বৃন্দাকে পাঠায় ও বাড়িতে। চন্দ্রর খোঁজ নিতে৷ আধঘন্টা পর বৃন্দা ফেরে। বিন্দুকে জানায়, চন্দ্র শহরে গিয়েছে গুরুত্বপূর্ণ একটি কাজে। কবে ফিরবে কেউ জানে না৷ বিন্দু অবাক হয়। চন্দ্র শহরে গিয়েছে? এর আগে যখনি গেছে তাকে জানিয়ে গেছে। এবারই প্রথম তাকে জানালো না। সাহেরা নিশ্চয়ই জানে। অথচ সে জানতে পারলো না। চন্দ্র জানালো না তাকে৷ বিন্দুর হৃদয়ে ক্ষতের ওপর ক্ষত জন্মায়৷ দু-চোখ বেয়ে অশ্রু গড়ায়। শুরু হয় অপেক্ষা। চন্দ্র ফিরে আসার অপেক্ষা। সেই অপেক্ষায় কেটে যায় দুটো মাস। তবুও চন্দ্র ফিরে আসে না। এক দুপুরে হঠাৎ চন্দ্রর বোন চামেলি এসে মিষ্টি দিয়ে যায়। কল্ললী জানতে চায়,
‘ হঠাৎ মিষ্টি যে? ‘

চামেলি আনন্দিত চিত্তে জানায়,

‘ আমি ফুম্মা হবো গো কাকি ফুম্মা হবো। ‘

ভেতর ঘর থেকে ছুটে আসে বিন্দু। থরথর করে কাঁপতে কাঁপতে জিজ্ঞেস করে,

‘ কী বললি চামেলি! কী বললি তুই? ‘

চামেলি চুপ হয়ে যায়। বিন্দু চেপে ধরে চামেলিকে। অদ্ভুত আচরণ করে প্রশ্ন করে বারবার।

‘ কী বললি চামেলি কী বললি তুই? ‘

ভয় পেয়ে চামেলি ছুটে পালিয়ে যায়৷ বিন্দু চিৎকার করে ডাকে চামেলিকে।

‘ চামেলি শোন, শোন চামেলি, এমন মজা তুই আর কক্ষনো করবি না। এমন মিথ্যা আর কক্ষনো বলবি না। আমি কিন্তু তোকে খুব শাসন করব। ‘

কথাগুলো বলতে বলতে বিন্দুর মাথা চক্কর দিয়ে উঠে। তবুও সে স্থির থাকে না। ছুটে বেরিয়ে যায় বাড়ি থেকে। চন্দ্রর বাড়ির সামনে যেতেই ও বাড়ির কাজের মহিলাকে মিষ্টি খেতে খেতে বেরুতে দেখে। বিন্দু গিয়ে তাকে চেপে ধরে।

‘ কীসের মিষ্টি খাও ডলি খালা কীসের মিষ্টি। ‘

ডলি খালা আবার খুব দুষ্টু প্রকৃতির মহিলা। বিন্দুকে তেমন একটা পছন্দও করে না। তার মতে বিন্দু গরিব ঘরের মেয়ে। সে চন্দ্র সাহেবের বউ হবার যোগ্যতা রাখে না। বিন্দু কেন বামন হয়ে চাঁদে হাত দেবে? চন্দ্র সাহেবের জন্য সাহেরাই ঠিক। মারাত্মক সুন্দরী। নিশ্চয়ই খুব বড়ো ঘরেরও মেয়ে৷ তাই বিন্দু যেন সত্যি মেনে নিয়ে নিজেকে মানিয়ে নেয় সেজন্য সত্যিটা অনায়াসে বলেই দিলো৷

‘ চন্দ্র সাহেব তো বাবা হতে চলেছে তুমি জানো না?’

~ক্রমশ~
ভুল ত্রুটি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। আগামী পর্বে বিন্দুর বিয়ে বলুন তো কার সাথে?

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply