Golpo romantic golpo চন্দ্রবিন্দু

চন্দ্রবিন্দু পর্ব ১


‘ বিবাহিত পুরুষকে ভালোবেসে সম্পর্ক রাখাকে কী বলে জানিস? পরকীয়া বলে, পরকীয়া! ‘

মায়ের বলা স্পষ্ট বাক্য শুনে চমকে উঠল বিন্দু৷ সে পরকীয়া করছে? চন্দ্রর সঙ্গে তার এখন পরকীয়ার সম্পর্ক! মা কীভাবে এমন একটি কথা তাকে বলল? অভিমানে বুক ভার হয় বিন্দুর। যন্ত্রণায় ছটফট করে ছোট্ট হৃদয়। গোপনে গোপনে কেঁদে কেঁদে গলা ভেঙে ফেলেছে সে। সেই ভাঙা কণ্ঠে বেরিয়ে আসে। কত অসহায়ত্ব কণ্ঠে। কতই না বেদনার সুর।

‘ ছোটোবেলা থেকে যাকে ভালোবাসি। যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল আমিই হবো তার বউ। আজ তার সঙ্গে আমার কেবল পরকীয়ার সম্পর্ক? তুমি কীভাবে বলতে পারো মা? তুমি তো সব জানো। তুমি নিজেও তো চন্দ্রর সঙ্গে আমার বিয়ের স্বপ্ন দেখতে। ও বাড়ির সঙ্গে তোমার সম্পর্ক, সখ্যতা সবই তো আমাদের কেন্দ্র করে। ‘

বিন্দু থামে। দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছাড়ে। তারপর ডুকরে উঠে। বিন্দুর মা কল্ললী দু কদম এগোয়। হাঁটুতে মুখ গুঁজে বিছানায় বসে থাকা বিন্দু কাঁদছে। মায়ের বুক কেঁপে উঠে। বিরহ যন্ত্রণায় ছটফট করছে তার ষোল বছরের কিশোরী কন্যা। মা হয়ে সে তা দু-চোখে দেখছে, সহ্য করছে। চন্দ্রর ওপর ভীষণ রাগ হচ্ছে তার। রাগ হচ্ছে চন্দ্রর পরিবারের উপরও। এক কথায় তারা সবে মিলে বিন্দুকে ঠকিয়েছে। চন্দ্র প্রতারণা করেছে তার ছোট্ট মেয়েটির সঙ্গে। কল্ললীর বুক চিরে দীর্ঘশ্বাস বেরোয়। একবার ভাবে মেয়েকে জড়িয়ে ধরবে। সান্ত্বনা দেবে। পরোক্ষণেই মত পাল্টায়। বিন্দুকে সে কোনো সান্ত্বনা দেবে না। আর না হবে বিন্দুর আশ্রয়। মেয়ে নিজেকে নিজেই সামলাক। পৃথিবীর স্বার্থপর, বেইমান মানুষ গুলো চিনুক। সবচেয়ে বড়ো কথা পুরুষ মানুষের ব্যাপারে অভিজ্ঞতা হোক। যে নরম মনটা আজ আগুনের তাপে গলে গলে পড়ছে৷ সে মনটা একদিন ঠিক বরফের মতো শক্ত হয়ে উঠুক। কল্ললী চলে গেল৷ সন্ধ্যা নামছে। চুলো ধরাতে হবে। বিন্দু কাঁদছে। প্রকৃতির আলো মিলিয়ে আঁধার নামলো। সেই আঁধারে তলিয়ে গেল বিন্দুর চোখের জল, মনের যন্ত্রণা।


‘ বউকে ঘরে রেখে তুই যাচ্ছিস প্রেমিকাকে এক নজর দেখতে! তুই আসলে কী চন্দ্র? কেন ঠকালি বিন্দুকে। কেনই বা এখন ঘরের বউটাকে ঠকাচ্ছিস?’

ধবধবে সাদা পাঞ্জাবির ওপর কালো চাদর জড়ালো চন্দ্র। ঘার অবধি সিলকি সিলকি চুলগুলো ঝুঁটি বেঁধে ফেলল পেছনে। তারপর সিগারেটের প্যাকেটটা পাঞ্জাবির পকেটে ঢুকাতে ঢুকাতে বাল্য বন্ধু স্বপনকে বলল,
‘ লাইটার আছে? ‘

স্বপন বলল,
‘ তা আছে তুই এবার আমার কথার উত্তর দে। ‘

চন্দ্র ফিচেল হেসে রুম ছাড়ল। স্বপন দৌড়াল
পিছু পিছু। ‘ এই ছেলেটা না কক্ষনো সহজ হবে না। ‘ মনে মনে ভাবলো স্বপন।

সিঁড়ি বেয়ে নামছে ভূঁইয়া পরিবারের বড়ো ছেলে, চন্দ্রশেখর ভূঁইয়া। জমিদার বা ভূ-সম্পত্তিধারী পরিবারগুলোর মধ্যে প্রচলিত ভূঁইয়া বংশ। সেই বংশের ছেলে চন্দ্রশেখর। এই চন্দ্রশেখরই ছিল বিন্দুর বাগদত্তা।

চন্দ্র নিচে নামতেই তার নববধূ এক হাত ঘোমটা টেনে লাজুক লাজুক মুখে সামনে এসে দাঁড়াল। চন্দ্রর দৃষ্টি নিচে ছিল। বউ সামনে এলেই চোখ তুলল। নববধূর নাম, সাহেরা খাতুন ছিল। এখন সে সাহেরা বেগম। লজ্জায় মাখানো চোখ দুটি মেলে তাকালো সাহেরা। বউয়ের লজ্জা দেখে চন্দ্রর চোখে তীক্ষ্ণতা, ঠোঁটে বাঁকা হাসি। সাহেরার লজ্জা বাড়ল ও হাসিতে। মস্তক নত করে বলল,
‘ আমি আপনার ঘরেই যাচ্ছিলাম। আম্মা বলল আপনি সকালবেলা গরম গরম পরোটার সঙ্গে আলু ভাজা খেতে পছন্দ করেন। আমি পরোটা বানিয়েছি। আপনি আসুন এলেই তেলে গরম করে দিব। ‘

সাহেরা চন্দ্রর আম্মাকে আম্মা বলছে৷ বুঝতে পারলো চন্দ্র। শুধু আম্মাই ডাকছে না। তার পছন্দ অপছন্দের কথাও জেনে নিচ্ছে৷ চন্দ্রর মাথায় চিন্তা আসে৷ তার আম্মা তো এই বিয়েটাই মানেনি৷ গতকাল রাত পর্যন্ত যিনি রাগান্বিত ছিল তার আকস্মিক বিয়েতে। সাহেরাকে পুত্রবধূ হিসেবে মানতে নারাজ ছিল। অথচ আজ রাত ফুরাতেই সাহেরাকে রান্না ঘরে ঢুকতে দিয়েছে। তার পছন্দের কথা জানিয়েছে। এই না ভদ্রমহিলা সাহেরাকে বাড়িতে থাকতে দেবে না। তাহলে রান্না ঘরে ঢুলালো কী করে? আহারে মমতাময়ী মা, আহারে নারী হৃদয়। নিশ্চয়ই মায়ায় পড়েছে সাহেরার সুন্দর মুখখানির ওপর। নিশ্চয়ই নারীর বিবেকে টান দিয়েছে, মেয়েটির কীই বা দোষ। তার ছেলে বিয়ে করে না আনলে তো সে বউ হয়ে আসতে পারতো না। চন্দ্র মনে মনে খুব হাসে খুব। তারপর ভোজনালয়ে চলে যায়। সাহেরার হাতের গরম গরম পরোটা সাথে আলুভাজা আর ঘি খায়। স্বপন নতুন বউয়ের হাতের পরোটা খেয়ে খুব প্রশংসা করে। সে প্রশংসা শুনেও চন্দ্র বাঁকা হাসে।

এরপর স্বপনকে নিয়ে চন্দ্র বেরিয়ে যায়৷ বিন্দু বুঝি বেরিয়েছে এইক্ষণে। অভিমানী বিন্দু। চন্দ্র কী তার অভিমান ভাঙাতে পারবে?

মেট্রিক পাশ করে আর কলেজে ভর্তি হয়নি বিন্দু। কারণ তার পড়াশোনার সীমাবদ্ধতা এ পর্যন্তই ছিল। বিন্দু দেখতে আহামরি সুন্দরী নয়। তবে তার চেহেরায় মাধুর্য আছে। ওর গলায় একটা সোনার চিকন চেইন আছে। যার রঙ আর ওর গায়ের রঙ একে অপরের সিঙ্গে মিলেমিশে যায়। অর্থাৎ বিন্দুর গায়ের রঙ সোনা বরণ। ওর চুল গুলো কুচকুচে কালো, চুলের পরতে পরতে কত যে ঢেউ। মানে ওর চুলগুলো কোঁকড়া চুলের অধিকারী। বিন্দুর চোখ দুটোর সঙ্গে হরিণীর চোখের কোনো পার্থক্য নেই যেন। বন্যপ্রাণী হরিনী চন্দ্রর খুব পছন্দ। বিন্দুর চিকন, মসৃণ ঠোঁটের উপরে ছোট্ট ছোট্ট লোম। যা চন্দ্রর গভীর আবেগ। এই বিন্দুর যখন দশ বছর। তখন চন্দ্রর বয়স বিশ। দুজনার বয়সের পার্থক্য পাক্কা দশ৷ ছোট্ট বিন্দুকে তখন থেকেই পছন্দ করে। ভালোবাসে চন্দ্র। তাদের বাড়িও পাশাপাশি। সম্পর্কে তারা প্রতিবেশী। চন্দ্ররা সম্ভ্রান্ত পরিবার হলেও বিন্দু নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়ে। বিন্দুর মা বিধবা নারী। তার বড়ো মেয়ে বিন্দু৷ ছোটো মেয়ের নাম বৃন্দা। তার বয়স এখন দশ বছর। এবার ক্লাশ ফোরে পড়ে। কল্লোলী সেলাইয়ের কাজ পারে৷ মহিলাদের জামা-কাপড় থেকে শুরু করে কাঁথা সেলাই সবই সে করে। বেশ ভালো পয়সাও আসে এতে করে। আবাদি কিছু জমি আছে। গৃহপালিত কিছু পশুপাখি পেলে সংসারটা মোটামুটি চলে যায়। এখন তো বিন্দুও দুটো টিউশনি করে৷ এ গ্রামের মেয়েদের মধ্যে বিন্দুই মেট্রিক পাশ করল। এর আগে কেউ মেট্রিক পাশ করেনি। চন্দ্রর আদেশ ছিল, ‘ বিন্দু তুই এর বেশি পড়তে পারবি না। বেশি শিক্ষিতা মেয়ে আমার পছন্দ নয়। ‘

বিন্দু জানতো সে চন্দ্রর বউ হবে। তাই আর কলেজে ভর্তি হয়নি। তাছাড়া কলেজটা গ্রাম থেকে বেশ দূরে। কলেজে ভর্তি হওয়া বেশ টাকা পয়সারও ব্যাপার। তাই আর পড়াশোনা করার ইচ্ছে নেই তার।

পছন্দের নারী , আবেগের চূড়ান্ত মানবীটিকে এক নজর দেখতে ছুটে এলো চন্দ্র।

মিঠাইপুর গ্রামে ভূঁইয়া পরিবার ছাড়াও স্বনামধন্য আরেকটি পরিবার মির্জা পরিবার। সেই পরিবারে মাতৃহীন ছোট্ট বালক গুগুল। গুগুলকে বারোশ টাকা মাইনে পড়ায় বিন্দু। গুগুলের বয়স আট বছর। গুগুলের বাবা সামাদ মির্জা বিন্দুকে খুব পছন্দ করে। বিন্দুর সৌজন্যতা, নমনীয়তা সবচেয়ে বড়ো কথা গুগুলের প্রতি বিন্দুর স্নেহ দেখে মুগ্ধ হয় সামাদ মির্জা। গুগুলকে পড়ানো শেষ করে বাড়ি ফিরবে বিন্দু। হেঁটে চার মিনিটের পথ। সামাদ মির্জা বিন্দুর পিছু পিছু বেরুলো। বিন্দু অস্বস্তিতে ভুগল একটু। সামাদ মির্জা বুদ্ধিমান লোক। তাই বলল,
‘ তোমার কি অস্বস্তি হচ্ছে বিন্দু? আচ্ছা আমি চলে যাই। ভাবলাম একা একা যাচ্ছো। সঙ্গ দিলে খুশি হবে। ‘

বিন্দু কী বলবে? ভেবে পেলো না। তাই নীরব থাকলো। সামাদ মির্জা ফিরে গেল। সে ভেবেছিল তার কথার পিঠে বিন্দু বলবে,

‘ না না সামাদ ভাই আমার অস্বস্তি হচ্ছে না। আপনি আসুন কোনো সমস্যা নেই। ‘

হতাশ সামাদ মির্জা। ফিরে গেল ঘরে। বিন্দু আরো কয়েক কদম এগুতেই চন্দ্রশেখর এসে দাঁড়াল ওর সামনে। বিন্দু চমকে উঠল। চন্দ্রর দিকে এক পলক তাকিয়েই ওর দৃষ্টি লালবর্ণ হতে শুরু করল। বুকের ভেতর চলছে ঝড়ের তাণ্ডব। চন্দ্র যেন স্বাভাবিক। ঠিক ছয় বছর আগে যেমন চোখে তাকিয়ে বিন্দুর প্রেমে পড়ল। অমন চোখে তাকিয়ে আছে। দৃঢ় চোখে দুষ্টুমিতে ভরা। এমন চোখও বুঝি পুরুষের হয়? বিন্দুর রাগ হচ্ছে। দুঃখে মরে যেতে ইচ্ছে করছে। কখনো চন্দ্রর পায়ে লুটিয়ে পড়তে ইচ্ছে করছে।
‘ কেন এমন করলে চন্দ্র? কেন? ‘

পরোক্ষণেই আবার দা দিয়ে ঘাড়ে কোপ দিতে ইচ্ছে করে।
‘ কেন প্রতারণা করলে চন্দ্র কেন? তুমি যে আমার মনের স্বামী। আমি তোমার মনের বঁধু। ‘

নিজের চিত্তকে সংযত করল বিন্দু। তীব্র ক্ষোভ নিয়ে চন্দ্রকে পাশ কাটিয়ে চলে যেতে উদ্যত হলো। মুহুর্তেই চন্দ্র ওর হাত টেনে ধরল৷ বিন্দু সঙ্গে সঙ্গে চোখ বুঁজে নেয়। ওর গাল বেয়ে টপটপিয়ে জল গড়ায়। পৃথিবী যেন মৃত্তিকা কাঁপিয়ে ডুকরে কেঁদে উঠে।
‘ চন্দ্র শুনছো এ বিন্দুর চোখের জলকণা নয়। এ বিন্দুর চোখের রক্তধারা! ‘

~ক্রমশ~

চন্দ্রবিন্দু

সূচনা_পর্ব

জান্নাতুল_নাঈমা

[ প্রিয় পাঠক, কেমন আছেন বলুন তো? কত গল্প মাথায় জানেন? সময়ের অভাবে প্রকাশ করতে পারি না। তাই ছোট্ট একটি রোমান্টিক গল্প নিয়ে হাজির হলাম। দোয়া করুন প্লিজ যেন রাইটিং ব্লক কাটে। আর প্রেমছন্দে তালবাহানাটা লিখতে পারি নিঃসংকোচে। ]

ভালোবাসা নেবেন সবাই কিন্তু… আর হ্যাঁ সবাই বেশি বেশি কমেন্ট শেয়ার করে পোস্টটা সবার মাঝে পৌঁছে দেবেন প্লিজজ।

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply