Golpo কষ্টের গল্প খাঁচায় বন্দী ফুল

খাঁচায় বন্দী ফুল ৪০ এর প্রথমাংশ


খাঁচায়বন্দীফুল

jannatul_ferdous_জান্নাতুল_ফেরদৌস

৪০ এর প্রথমাংশ

ফ্লোরে হাটু লুটিয়ে বসে খাটে হেলান দিয়ে চোখ বন্ধ করে আছে সাইফ। অদিতি এখনো ভীত চোখে দাড়িয়ে। সাইফ চোখ বন্ধ রেখেই শার্টের বোতাম খুলতে শুরু করলো। সাদা শার্টটা খুলে ছুঁড়ে ফেললো মেঝেতে। অদিতির দিকে তাকিয়ে বলল
“ভয় পেয়েছো?”
অদিতি জবাব দেয় না। কাজুমাচু হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে দেয়াল ঘেঁষে। সাইফ হাত ইশারা করে অদিতিকে কাছে আসতে বলে। অদিতি মনে নানা সংশয় নিয়ে গুটি গুটি পায়ে এগিয়ে আসে সাইফের দিকে। সাইফের কাছাকাছি আসতে অদিতির হাত ধরে হ্যাচকা টান দিয়ে নিজের কোলে বসিয়ে দেয়। অদিতির দিকে মুখ বাড়াতেই অদিতি নাক সিটকালো। সাইফ অদিতির ঘাড়ে মুখ ডুবিয়ে ঘোর লাগা গলায় বলল
“তুমি কি জানো? একমাত্র তোমার কাছেই আমি দুর্বল হতে পারি”

অদিতি সাইফকে ঠেলে সরানোর ব্যর্থ চেষ্টা করছে। সাইফ আরো আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরল অদিতিকে। অদিতি কাঁপা কাঁপা গলায় বলল
“আ…আপনার গায়ে…….”

সাইফ অদিতির ঠোঁটে আঙুল ঠেকিয়ে বলল
“হুশশশশ, আজ কোনো প্রশ্ন করো না। বড্ড তোমার পিপাসা পেয়েছে। মেটাতে দাওওওওও”

…….

কবিতা আর ফুলমালা, চৌধুরী বাড়িটা ঘুরে ঘুরে দেখছে। যদিও গ্রামের বাড়িটাও অনেকটাই বড়, কিন্তু এই বাড়িতে সব জিনিস কেমন অন্যরকম। আধুনিক সব জিনিসে মোড়া বাড়িটা। সন্ধ্যা হয়ে আসলেও ছাদ থেকে নামেনা দুজন। এদিকে লতিফা খুঁজে খুঁজে হন্যি হচ্ছে। আর ওরা গিয়ে বসে আছে ছাদে। লতিফা তুযা কে বলল
“ও তুযা, দেখ না মাইয়া দুই টা গেলো কই। হারা বাড়িতেও তো নাই”

তুযা ম্যাগাজিন টা উল্টে পাল্টে দেখছে
“কই আর যাইবো। দেহো আছে কোথাও”
“তুই ইট্টু দেখ না”
তুযা বাধ্য হয়ে নিজেই গেলো খুজতে। নদীর ঘরে, দীঘির ঘরে কোথাও নেই। অদিতির ঘরে নক করলো তুযা। তখনো অদিতি স্বামী কে সন্তুষ্ট করতে মরিয়া। সাইফের উন্মাদনা থেকে ছাড়াতে পারছে না নিজেকে। তুযা কয়েকবার দরজায় টোকা দিয়েই ক্ষান্ত হলো। বিবাহিত দম্পতি ভর সন্ধ্যে বেলা দরজা বন্ধ করে রুমে আছে। তাদের ডাকা টা নির্বোধের ন্যায় হয়। নিজের বোকামো বুঝতে পেরে নিজেকেই কয়েকটা গালাগাল দিলো তুযা। এ আবার বিশাল বিচারক। নিজের বেলায় ও ছাড় নেই। নিজে ভুল করলে নিজেকেই গালি দেয়।

অগত্যা চলে গেলো ছাদের দিকে। জায়গাটা ঘুটঘুটে অন্ধকার। সিড়ি দিয়ে পায়ের অনুমানে উপরে উঠলো তুযা। আচমকা করো সাথে বেশ জোড়ে ধাক্কা খেলো।
“ওমাআআআআ”
ফুলমালা পরে যেতে নিলে জাপটে ধরে ফেললো তুযা।
“ফুল! তুই এইখানে কি করস? আর কবিতা কোথায়?”
“আব্বা আমিও এইহানে”
কবিতার গলা পেয়ে একটু শান্ত হলো তুযা। আজ দুটোকেই ঘাড়াবে নিচে নিয়ে। এই অন্ধকারে পেত্নীর মতো ছাদে যাওয়া? দুহাতে দুজনের হাত ধরে নিচে নিয়ে আসলো।

নদী মুখ ভাড় করে বসে আছে সোফায়। তুমুল কল ধরছে না। সকাল থেকে ফোনে পাচ্ছে না তাকে। এদের প্ল্যান কিছুতেই ঢুকছে না নদীর মাথায়। শুধু সাইফ যেমন বলছে তেমনই করে যাচ্ছে। ফুলমালা এসে নদীর পাশে বসলো। বহু আগে সে একবার দেখেছিলো নদীকে। প্রধান বাড়ির এক অনুষ্ঠানে। নদীর থুতনি ধরে বলল
“তুমার বিয়া বুবু? হেই কুন ছুডো কালে তোমারে দেখছি।”
নদী মুচকি হাসলো। মেয়েটা বড় মিষ্টি।
“তোমাকেও তো কত ছোট দেখেছিলাম। বড় হয়ে গেছো”
“হ কয় দিন পর আমারো বিয়া হইবো”
ফুলমালার সহজ সরল কথায় হাসলো নদী। দীঘি আর কবিতা খেলছে। কালকে মেহেদি অনুষ্ঠান সেই সকল প্রস্তুতি চলছে। মেহেদিটা বাড়ির ভিতরেই করবে। আঞ্জুমান ফুলমালা কে একটা সবুজ রঙের জরজেট থ্রি-পিস দিলো কালকের অনুষ্ঠানে পরার জন্য। ফুলমালা তো ভীষণ খুশি। এটা পরলে নিশ্চয়ই তাকে খুব সুন্দর লাগবে তুযা ও নিশ্চয়ই পছন্দ করবে ওকে। বোকা নারী টি নিজের চাইতে দ্বিগুণ বয়সী এক বেপরোয়া পুরুষকে মন দিয়ে বসেছে। ফুলমালার মিটি হাসি দেখে নদী মৃদু গুতা দিলো।
“কি হলো? অমন হাসছো কেনো একা একা?”

ফুলমালা খিলখিল করে হেসে দিয়ে বলল
“অহন না, পরে কমু”

থ্রি-পিস টা নিজের জন্য বরাদ্দকৃত ঘরটায় রেখে আবার ছুটে আসে রান্না ঘরে। অদিতি ভেজা চুল পিঠে ছেড়ে রেখে সকলের জন্য নাস্তা তৈরি করছে। ফুলমালা এগিয়ে এসে অদিতির চুলে হাত বুলায়।
“সুন্দর ভাবি! তুমার এত চুল ক্যাম্নে হইলো গো?”
অদিতি হেসে বলল
“তোমার লাগবে কিছু?”
ফুলমালা অদিতির চুল মুঠো করতে গিয়ে ঘার থেকে চুল সরিয়ে দেখলো, ঘারের কয়েকটা জায়গায় রক্ত জমে লাল হয়ে আছে। ফুলমালা হা করে তাকিয়ে রইলো অদিতির দিকে। মনে মনে বলল
“আহারে এত সুন্দর মাইয়াডারে জামাই এম্নে মারপ? ধুর মন ডাই গেলো খারাপ হইয়া”
ফুলমালা কিছু না বলে বেরিয়ে আসলো রান্না ঘর থেকে। ফের আবার নদী পাশটায় মুখ ভাড় করে বসলো। নদী ফুলমালার কাধ ধরে বলল
“কি হলো? একটু আগেই তো খুব হাসছিলে”
“তোমারে কইতে পারি বুবু। আগে কও কাওরে কইবানা”
“আচ্ছা বলবোনা। বলো”

ফুলমালা চারিদিকে নজর বুলিয়ে নদীর কানে কানে ফিসফিস করে বলল
“ওই যে সুন্দর ভাবি ডা আছে না? হ্যার জামাই হেরে কি মারা টাই না মারে বুবু। শরীর ডায় রক্ত জইমা জইমা গেছে”

নদী কপাল কুচকায়। সাইফ মারবে অদিতিকে? এও আবার হতে পারে নাকি? ফুলমালাকে বলল
“তুমি কীভাবে জানলে?”
ফুলমালা খুব আফসোস এর সাথে বললো
“হের চুল দেখতে যাইয়া দেখছি বুবু। ফর্সা গলা ডার মইধ্যে কত্ত রক্ত জমছে”

নদীর কাছে মুখ এগিয়ে নিয়ে ফিসফিস করে বলল
“মনে হয় কামড়াইছে বুবু। পাগল টাগল নাকি হের জামাই?”

নদী বুঝতে পেরে ফিক করে হেসে ফেললো। ফুলমালা বোকা বনে গেলো নদীর হাসি দেখে।
“ও বুবু, তুমি হাসতেছো ক্যা?”
নদী হাসতে হাসতেই বলল
“শোনো, আর কাওকে কিন্তু এসব বলিও না বুঝলে”

ফুলমালা না বুঝেই ঘাড় কাত করলো। কিন্তু এই কথা আর কারো কাছে না বললে কি তার পেটের ভাত হযম হবে। একা একা বকতে বকতে তুযার ঘরে গেলো
“নদী বুবু রে তো ভালোই দেহন যায়। তবুও ভাবির কথা হুইনা হাসলো। নিজের ভাই বলে পতিবাদ করলো না। তবে তুযা ভাই অবশ্যই পতিবাদ করবো”

তুযা বিছানায় বসে সিগারেট টানছে। ফুলমালা কিছু না বলে গটগট করে ঢুকে পরলো ঘরে। তুযা মিটিমিটি হাসলো। ফুল টাও তার স্বভাব পেয়েছে। ঘরে ঢুকার আগে অনুমতি নেয় না। ধপাধপ হেটে এসে তুযার সামনে দাড়ালো।
“তুযা ভাই, একখান বিচার লইয়া আইছি”

তুযা ফুলমালার দিকে তাকিয়ে বলল
“বল”
“ওই যে সুন্দর ভাবি ডা আছে না?”
“অদিতি?”
“হ উনি”
তুযা ধোয়া উড়িয়ে বলল
“ওয় আবার কি করলো তরে?”
“হ্যায় আবার করবো কি? করছে তো হের জামাই”
তুযা ভ্রু কুচকালো
“ওর জামাই তোরে কি করলো?”
ফুলমালা বিরক্ত হলো তুযার কথাও। পুরো কথাটা না শুনে ভুলভাল প্রশ্ন করে যাচ্ছে।
“আরে আমারে করবো ক্যান? হের জামাই হেরে কি মারাটাই না মারছে। আমার কথা বিশ্বাস না হইলে আসেন, আসেন আমার লগে। এহনো হের গায়ে দাগ আছে।”

তুযা পরলো ভাবনায়। সাইফ অদিতিকে কেনো মারলো? ফুলমালাকে ইশারা করলো বসতে। ফুলমালা বসতেই বলল
“আইচ্ছা ক তো, কি দেখছোস তুই?”
“হের গতরে মাইর এর দাগ দেখছি”

তুযা নড়েচড়ে বসলো।
“তুই ক্যাম্নে নিশ্চিত যে ওইডা মাইর এর দাগ। অন্য কিছুরও তো হইতে পারে তাই না? তুই তো আর নিজের চোখে মারতে দেখোস নাই। না দেখছোস?”

ফুলমালা মুখটা ছোট করে বলল
“ওইটা মাইর এর ই দাগ তুযা ভাই। নইলে ঘাড়ের মইধ্যে আবার কিসের রক্ত জমবো”

“মানে?”

“মানে হইলো। ভাবির ঘাড় দিয়া রক্ত জমাট বাইন্ধা বাইন্ধা রইছে। ওই হানে কি আর পইড়া গেলে ব্যাথা হইয়া হইছে? নিশ্চিত আপনের ভাই মারছে। গলা দিয়াও কেমন খামচির দাগ”

তুযার বোধগম্য হতেই মুচকি হাসলো। ফুলমালার দিকে তাকিয়ে বলল
“তুই এহনো ছোট আছস রে ফুল”

“আমি ছুডো হইতে পারি। কিন্তু আমি সব বুঝি। আমনে বিচার করবেন কিনা তাই কন”

তুযা খাটের স্ট্যান্ডে হেলান দিয়ে বলল
“ওরে মারে নাই ফুল। ওর জামাই ওরে সোহাগ করছে। বুঝছস তুই? আদর করছে আদর”

ফিচলে হাসলো তুযা
“অহন বুঝবি না। আগে বড় হ হ্যার পর বুঝবি”

ফুলমালা বোকা চাহনিতে তুযা কে বলল
“তাইলে তো হ্যায় কষ্টও পাইছে”
“কষ্ট পায় নাই। তুই অত বুঝবি না। বড় হ, সব বুঝবি”

“নদী বুবু হাসলো ক্যান তাইলে?”
“সর্বনাশ! তুই আবার নদীরেও কইছস?”

এর মধ্যেই ঘরের সামনে নদীর গলা শোনা যায়
“দাদাভাই আসবো?”
তুযা গলা উচিয়ে বলল
“আয়”

নদী রুমে ঢুকে ফুলমালা কে বলল
“বড়মা তোমাকে ডাকছে। যাও।”

ফুলমালা বেরিয়ে গেলে নদী তুযার কাছে এগিয়ে এলো । তুযা নদীর হাত ধরে নিজের পাশে বসালো।
“কিছু বলবি?”

নদী মলিন মুখে চিন্তিত কন্ঠে বলল
“কি হচ্ছে বলোতো দাদা ভাই। আর এরপরই বা কি হবে? আমার কিন্তু ভীষণ চিন্তা হচ্ছে।”

তুযা নদীর মাথায় হাত দিয়ে বলল
“তোর কোন চিন্তা নেই। তুই তোর মত থাক। হাসি খুশি থাক। সব আমরা দেখে নিবো। সব ঠিকঠাক হবে। চিন্তা করিস না।”

নদী মাথা নিচু করে বলল
“সারাদিন ও ফোন ধরেনি”

“ও বাড়িতে গেছে। কালই চলে আসবে”

নদী উঠে রুমে চলে গেলো। ফুলমালা নদীর ঘরের পাশ দিয়েই আসছিলো। নদী ওর হাবভাবে অনেকটা বুঝতে পেরেছে, তুযা কে নিয়ে মেয়েটার ভিতর কিছু একটা চলে।”

আজকাল সাইফ খুব একটা কথা বলে না নদীর সাথে। যেদিন থেকে শুনেছে নদী সাইফ কে ভালোবাসতো, সেদিন থেকে কথা বলা ছেড়ে দিয়েছে বললেই চলে।

আজ তুযার নির্দেশে কয়েকজন কে ভীষণ পিটিয়েছে। মাথা এমনিতেই খারাপ। সব জিদ রাগ কমাতে ও সব সময় অদিতিকেই কাছে টেনে নেয়। বাচ্চা বউটা তার সব সয়ে নেয় মুখ বুজে। সাইফ অদিতির খোজে নিচে এলো। চামেলি কাদছে অদিতির পাশে বসে। অদিতি শান্তনা দিচ্ছে তাকে। সাইফ ডাকতেই চামেলি উঠে যায়। অদিতি এগিয়ে এসে সাইফকে বলে
“চামেলি আপা আপনাকে দেখে ওমন করে উঠে গেলো কেনো?”

সাইফ নিরুদ্বেগ ভাব নিয়ে বলল
“আমি কি করে বলবো?”

চলবে?

[ প্রচন্ড মাথা ব্যাথা আর জ্বর নিয়ে লিখলাম। পাঠিকাদের কথা ভেবে শুধু। অবশ্যই ১.৭K পূরণ করবা কিন্ত পাখিরা। আর কাল সকালে কিছু স্পেশাল আসতে চলেছে। রেডি থেকো]

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply