Golpo কষ্টের গল্প খাঁচায় বন্দী ফুল

খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ৫৩


খাঁচায়বন্দীফুল

jannatul_ferdous_জান্নাতুল_ফেরদৌস

পর্ব- ৫৩

রাত গভীর থেকে আরও গভীর হয়ে গেছে।
আকাশে অনেক মেঘ জমেছে। কালো আর ধূসর মেঘগুলো যেন ধীরে ধীরে পুরো আকাশটাকে ঢেকে ফেলছে। চাঁদের আলো কোথাও নেই। মাঝে মাঝে মেঘের ফাঁক দিয়ে বিদ্যুতের নীরব ঝলক দেখা যাচ্ছে, কিন্তু বজ্রের শব্দ এখনো শোনা যাচ্ছে না। ঝড় আসার আগের সেই অদ্ভুত নীরবতা চারপাশে। কবরস্থানের চারদিকে ঝোড়ো বাতাস বইছে। শিরীষ গাছের শুকনো পাতাগুলো বাতাসে কাঁপতে কাঁপতে মাটিতে ঝরে পড়ছে। মাটির ভেজা গন্ধের সাথে মিশে আছে পুরনো ঘাস আর শিশির ভেজা রাতের ঠান্ডা বাতাস।
প্রধানদের পুরনো কবরস্থানের এক কোণে বসে আছে তুযা।

সে একটি কবরের পাশে নীরবে বসে আছে।
মানিকের কবর। কবরের পাথরের গায়ে রাতের শিশির জমে ঝিকমিক করছে। তুযা হাঁটু গেড়ে বসে হাত দিয়ে কবরের পাথরটা আলতোভাবে ছুঁয়ে আছে। তার মুখে ক্লান্তির ছাপ, চোখে গভীর অস্থিরতার ছায়া।
বাতাস একটু জোরে বইছে এখন।
তুযার চুল এলোমেলো হয়ে মুখের উপর এসে পড়ছে। কালো পোশাকটা বাতাসে হালকা কাঁপছে। দূরে কোথাও রাতের কুকুরের ডাক ভেসে আসছে, আবার মিলিয়েও যাচ্ছে।
আকাশের মেঘগুলো আরও ঘন হয়ে উঠেছে।
হঠাৎ আকাশের এক প্রান্তে বিদ্যুতের আলো ঝলকে উঠল। সেই আলোর ছায়া কবরস্থানের কবরগুলোর উপর পড়ে অদ্ভুত এক নির্জন রূপ তৈরি করল।

ধীরে ধীরে বৃষ্টি পড়তে শুরু করল।
প্রথমে খুব ছোট ছোট ফোঁটা। তারপর একটু একটু করে বৃষ্টির বেগ বাড়তে লাগল। বৃষ্টির ফোঁটা তুযার মুখে, চুলে আর কবরের পাথরের উপর পড়ছে। ভেজা মাটির গন্ধ আরও তীব্র হয়ে উঠছে। তুযা এখনো বসে আছে। তার চোখে ক্লান্তি, কিন্তু মুখে কোনো আতঙ্ক নেই।
চারপাশে শুধু বৃষ্টি, বাতাস আর রাতের অন্ধকার।
কবরস্থানের শিরীষ গাছগুলোর পাতায় বৃষ্টির শব্দ মিশে একটা ভারী, শান্ত কিন্তু বিষণ্ন পরিবেশ তৈরি করছে।

চিৎ হয়ে শুয়ে পড়লো ফলক টার পাশে। হাসতে হাসতে বলতে লাগলো
“একটা কবরের সংখ্যা কমাই দিলাম রহমতের মা। তোমার ছোট পোলারে গাঙ্গে ফালাই দিয়া আইছি। ওয় মাটি পাওয়ার যোগ্যই না। নাহহহহ। ও আমার জীবন ডা নষ্ট করছে রহমান এর মা। শুনতাছো তুমি?”

বৃষ্টির ঝমঝম শব্দের দরুন চাপা পড়ে যাচ্ছে তুযার বুক ফাটা আর্তনাদ। গগণ বিদারী কান্নায় ফেটে পড়লো যেনো।
“আমার জোৎস্না রে মাইরা ফালাইলো। আমার জীবন ডা নষ্ট করলো। ওয় কেমনে পারলো দাদি। কেমনে পারলো? আমারে না কইতো, আমি ওগো বড় পোলা? গোটা দুনিয়ার সাথে জালিয়াতি করলেও পরিবার এর কাছে আমি তিল পরিমান দোষ করি নাই। আমি আমার সব ভাই-বোন, চাচা-চাচি রে আগলাই রাখছি। আমি জীবন দিতেও প্রস্তত থাকি ওগো লাইগা। ওরা আমার এত বড় সর্বনাশ ক্যাম্নে করলো।”

বৃষ্টির পানিতে ভিজে চুপচুপে তার সর্বাঙ্গ। দূরে কোথাও ভাড়ি শব্দে বাজ পড়লো। তুযা চিৎকার করে কেঁদে কেঁদে বলল
“ওই মানিক। মানিক শুনছস? তুই না আমারে কইতি, আমি এত বেহায়া ক্যান? ক্যান আমি জোৎস্নার লাইগা অহনো পাগল। প্রেমিক দের বেহায়া হইতে হয় রে। তুই জানলি না মানিক, আমার জোৎস্না আমারে ছাইড়া যায় নাই রে। ওরা আমার জোৎস্না রে মাইরা ফালাইছে।”

আচমকা কান্না থামাল তুযা। চোখ মুখ হয়ে উঠলো কঠিন। উঠে বসলো তৎক্ষনাৎ। চোয়াল শক্ত করে বলতে লাগল
“তাই আমিও ওরে জোৎস্নার কাছে পাঠাই দিছি। সেই গাঙ্গেই ফালাইছি, যেখানে ওরা জোৎস্না রে ফালাইছে। ও রহমানের মা, আমি কি ভুল করছি কও? ওহহহ তুমি তো কথা কইবানা। তেমার পোলা হয় তো”

কি মনে করে উঠে দাড়ালো আবার। হাটতে শুরু করলো বাড়ির দিকে।
“হালার আমি কানলাম? হুরু, পাগল টাগল হইলাম নাকি? আমার আবার দুঃখ লাগলো আইজ?”

হো হো করে হাসতে লাগলো তুযা। ভোর বেলা দীঘি আর অদিতি বাড়ি ফিরার পর বেড়িয়ে এসেছিল তুযা। হাসান চৌধুরী ভাই কে খোঁজার চেষ্টা করবে না জানিয়ে দিয়েছে। বাড়িতে শুধু সায়রার ই শোক। আর সকলেই স্বাভাবিক।


মাহিদের গ্রামের একতলা বাড়িটার ভেতরে আজ অন্যরকম সাজ। পুরো ঘরটা লাল আর সোনালি রঙের কাপড়ে হালকা করে সাজানো হয়েছে। জানালার পাশে ছোট ছোট গাঁদা ফুলের মালা ঝুলছে। বাতাসে মৃদু ফুলের গন্ধ ভেসে আসছে। ঘরের মাঝখানে রাখা খাটের উপর বিছানা পাতা হয়েছে লাল চাদরে।
খাটের এক কোণে চুপচাপ বসে আছে ফুলমালা।
সে লালটুকুটুকে বেনারসি শাড়ি পরেছে। শাড়িটার আঁচল মাথার উপর টেনে ঘোমটার মতো করে রাখা। কপালে ছোট্ট লাল টিপ। বেনারসির সোনালি কাজগুলো ঘরের হালকা আলোর নিচে ঝিকমিক করছে। ফুলমালা খুব চুপচাপ বসে আছে। হাতদুটো নিজের কোলের উপর রাখা। মাঝে মাঝে আঙুলগুলো ধীরে ধীরে জড়িয়ে যাচ্ছে, যেন ভেতরের অস্থিরতা সে লুকানোর চেষ্টা করছে।
তার বুকটা ভয়ে একটু একটু করে কাঁপছে।
বাইরে রাত নেমে এসেছে। দূরে কোথাও ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক শোনা যাচ্ছে। ঘরের ভেতরের নীরবতা যেন আরও গভীর। হঠাৎ দরজাটা ধীরে খুলল। ভেতরে ঢুকল মাহিদ।

পাতলা সাদা পাঞ্জাবি পরেছে। চুল একটু এলোমেলো, মুখে হালকা ক্লান্তির ছাপ। কিন্তু চোখে শান্ত একটা উজ্জ্বলতা আছে। মাহিদ ধীরে ধীরে খাটের দিকে এগোল। ফুলমালা মাথা নিচু করে বসে আছে । তার বুকের ভেতর ধুকধুক শব্দটা যেন নিজের কানেই শোনা যাচ্ছে।
মাহিদ একটু দূরে দাঁড়িয়ে নরম গলায় বলল
“ফুলমালা…”

ফুলমালা ধীরে উত্তর দিল
“জি…”

তার কণ্ঠ একটু কাঁপছে।
মাহিদ আরেকটু কাছে এসে বলল
“ভয় পাচ্ছো?”

ফুলমালা কিছুক্ষণ চুপ রইল। তারপর খুব আস্তে বলল
“সেরকম কিছু না”

মাহিদ হালকা করে হাসল। তার হাসিটা শান্ত, যেন রাতের অস্থিরতাকে একটু নরম করে দিচ্ছে।
“এত ভয় পাওয়ার কিছু নেই। তুমি চাইলে পোষাক পাল্টে নিতে পারো”

ফুলমালা মাথা নিচু করে রইল।
ঘরের ভেতর বাতাসটা যেন আরও শান্ত হয়ে উঠেছে যেন। মাহিদ খুব ধীরে বলল
“আচ্ছা তাহলে ঘুমিয়ে পড়তে পারো”

ফুলমালা একটু সাহস নিয়ে মাথা তুলল।
ঘোমটার ফাঁক দিয়ে তার চোখ দুটো দেখা যাচ্ছে ভয় আর সংকোচ মিশ্রণ। বাইরে হালকা বাতাস বইছে। জানালার পর্দা ধীরে ধীরে নড়ছে।

মাহিদ খুব নরম গলায় বলল
“আমি চাই তুমি এখানে নিরাপদ অনুভব করো। তোমার অস্বস্তি আমার ভালো লাগছে না। আমি তাহলে অন্য ঘরে গিয়ে ঘুমাবো ফুল?”
ফুলমালা চকিতে তাকালো মাহিদের দিকে। বুকের মধ্যে শুরু হলো চিনচিনে ব্যাথা। ফুল নামটা একজন ই ডাকতো তাকে। ফুলমালা কোনো কথা বলল না। ঘরের ভেতর একটা শান্ত নিরবতা নেমে এলো। মাহিদ এক দৃষ্টিতে দেখছে তার নব বিবাহিতা স্ত্রী কে। কি সুন্দর রমণী টা তার স্ত্রী। আচমকাই নির্লজ্জের মতো বলে উঠলো
“আমি তোমাকে অনেক ভালোবাসি ফুল”

ফুলমালা তাকালো আড় চোখে। সাহস করে বলল
“এরই মধ্যে ভালোও বেসে ফেললেন”

মাহিদ হাসলো
“তোমায় কে বলল এরই মধ্যে বাসলাম? বাসি তো সেই কবে থেকেই”

“মানে?”

মাহিদ খাটের স্ট্যান্ডে হেলান দিয়ে সিলিং এর দিকে তাকিয়ে বলল
“অনেক দিন আগে একবার সাই দের পুষকুনিতে এক মেয়ে পিছলে পড়েছিলো। সেই কালেই প্রেমে পড়লাম তার। তারপর কত চাইলাম আল্লাহর কাছে, তাহাজ্জুদ এও চাইলাম। আল্লাহ দিয়ে দিলো”

ফুলমালা চুপ করে শুনছে। মাহিদ দীর্ঘশ্বাস ফেলে হাসলো
“আবার অন্য একদিন বলবো। আজ ঘুমাও। আমি পাশের ঘরে ঘুমাতে পারবোনা কিন্তু। তখন কথার কথা বলেছিলাম। তোমার পাশে অল্প একটু জায়গা দিলেই হবে। বেশি জায়গা লাগবে না আমার।”


ছাদের এক পাশে দাঁড়িয়ে ছিল সাইফ আর অদিতি। দুজনেই নীরবে দূরের শহরের আলো দেখছিল। রাতের আকাশে মেঘ জমে আছে। দূরে রাস্তার বাতির হলুদ আলো কুয়াশার মতো ছড়িয়ে পড়েছে। নিচের উঠান থেকে মাঝে মাঝে কুকুরের ডাক ভেসে আসছে। বাতাসে ভেজা মাটির গন্ধ।
সাইফ আস্তে করে নিজের হাত দিয়ে অদিতির কাঁধটা একটু ঘিরে ধরল। অদিতি মাথা হেলিয়ে তার কাঁধে একটু ভর দিল। কোনো কথা নেই দুজনের মাঝে । শুধু নীরবতা আর রাতের শব্দ।
হঠাৎ হালকা বৃষ্টি শুরু হলো। চিলেকোঠার টিনে বৃষ্টির শব্দ টাপ টাপ টাপ… একটা মিষ্টি সুর তৈরি করল।

সাইফ হালকা হাসল।
“চল, ভিজি।”
অদিতি একটু অবাক হয়ে বলল
“এখন?”
“হ্যাঁ।”
সাইফ একটু দুষ্টু ভঙ্গিতে বলল
“আজ ভেজার ইচ্ছা করছে।”

অদিতি মৃদু হাসল।
“ আপনার ঠান্ডা লাগবে তো।”
“লাগবে না। আর লাগলেও সমস্যা নেই।”

দুজনেই ধীরে ধীরে ছাদের খোলা জায়গার দিকে এগোল।বৃষ্টির ফোঁটা এসে তাদের চুলে, কাঁধে, শাড়ির আঁচলে পড়তে লাগল। অদিতি মিষ্টি রঙের শাড়ি পরে ছিল। হালকা ভেজা শাড়ির ভাঁজগুলো বাতাসে নরমভাবে নড়ছিল। বৃষ্টির পানিতে শাড়ির রঙ আরও গভীর হয়ে উঠছিল, আর আঁচলের কোণটা ধীরে ধীরে কাঁধের পাশে এসে পড়লো।

মুখে ছোট্ট শান্ত হাসি। চোখে আর ক্লান্তি নেই। ভেজা চুলের কয়েকটা গোছা কপালে এসে লেগে গেল। বৃষ্টির ফোঁটা তার গাল বেয়ে ধীরে গড়িয়ে পড়ছে।

অদিতি দূরের আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে। আর সাইফ চুপ করে তাকিয়ে আছে অদিতির দিকে। চোখে এক রাশ মুগ্ধতার আলো।

খুব আস্তে বলল
“ভেজা অবস্থায় তোমাকে খুব সুন্দরী লাগছে।”

অদিতি লজ্জা পেয়ে মাথা নিচু করল।
“এমন করে বলবেন না।”
সাইফ একটু কাছে এসে বলল
“সত্যি বলছি।”

বৃষ্টির শব্দ, রাতের বাতাস আর ছাদের নীরবতা সব মিলিয়ে একটা শান্ত অনুভূতি ছড়িয়ে গেলো।
সাইফ খুব ধীরে বলল
“জানো বৃষ্টি আমার ভীষণ প্রিয়। তার চেয়েও প্রিয় তুমি”
অদিতি কিছু বলল না। শুধু হালকা হাসল।
দুজনেই চুপচাপ বৃষ্টি দেখতে লাগল।
মনে হলো রাতটা শুধু তাদের দুজনের জন্যই নেমে এসেছে ভালোবাসার এক শান্ত, নরম মুহূর্ত হয়ে।

কিছুক্ষণ পর অদিতি বলল
“এবার চলুন। আর কত ভিজবেন? অসুস্থ হয়ে যাব তো।”

“চলো”

সাইফ কোলে তুলে নিলো অদিতি কে। রুমে নিয়ে ভেজা শাড়ি পাল্টে দিলো। শরীর টা কেমন গরম হয়ে উঠছে। ভিজতে না ভিজতেই বোধহয় জ্বরের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। সাইফ জামাকাপড় পাল্টে ট্রাউজার পরলো। তোয়ালে দিয়ে মাথা মুছতে মুছতে ল্যাপটপ নিয়ে বসলো। এর ই মধ্যে কল আসলো ফোনে। স্ক্রিনে তুযার নম্বর দেখা যায়
“হ্যা দাদাভাই বলো”

ওপাশ থেকে দীর্ঘক্ষণ কিছু বলল। সাইফ চুপচাপ শুনলো
“কি বলছো তুমি দাদাভাই? মাথা ঠিক আছে তোমার?”

কেমন হইছে বলিও পাখিরা। আজ একটু ব্যাস্ত ছিলাম। ছোট হলো। 🥹
পরের পর্ব বড় দিবো। কেমন হইছে বলিও 🥹🫶

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply