খাঁচায়বন্দীফুল
jannatul_ferdous_জান্নাতুল_ফেরদৌস
পর্ব – ৫১
অদিতি বাড়ি ফিরে ক্লান্ত শরীরটা নিয়ে প্রথমে গেল ওয়াশরুমে ফ্রেশ হতে। হাতমুখ ধুয়ে এসে শাড়িটাও পাল্টে নিল। তারপর নিচে গেল নাস্তা রেডি করতে। সাইফ ওকে দিয়েই হাসপাতালে চলে গেছে। যখন ফিরে আসবে তখন যাতে নাস্তা প্রস্তুত থাকে। লোকটা কালকে থেকে না খেয়ে আছে। বাড়িটা সম্পূর্ণ ফাঁকা। কেমন গা ছমছম লাগছে অদিতির কাছে। যখন ও এসেছিল তখনো বাড়িটা মানুষ জনে পরিপূর্ণ। সেদিন পর্যন্ত কত মানুষজন, প্রথমে নদী চলে গেল তারপর হাবিব একে একে যেন বাড়িটা জনমানব শুন্য হয়ে পড়ছে।
নানান ভাবনার মধ্যে আটা মেখে নিল। ময়দার মেখে ঢেকে রেখে গরুর মাংস চাপিয়ে দিল চুলায়। পরোটা বেলছে আর মনে মনে ভাবছে দীঘি কোথায় গেল? এতক্ষণ ধরে এসেছে একবারও রুম থেকে বের হলো না। কাল সকলে গেলেও দীঘি হাসপাতালে যায়নি। নদী বাড়ি থেকে চলে যাওয়ার পরও ছুটে এসেছিল বাবাকে দেখতে। কিন্তু দীঘি একবারের জন্যও যায়নি। অদিতি ভেবে পায়না এই মেয়েটাও তুযার মত প্রচন্ড জেদি কেন। কিন্তু ওর সাথে তোর বাবার কোন সমস্যা নেই তাহলে যায় না কেন। অদিতি পরোটা বেলা রেখে আবার চলে গেল দীঘির ঘরের দিকে।
দীঘির দরজা ঘরের ভিতর থেকে বন্ধ। অদিতি কিছুক্ষণ ভেবে দরজা টোকা দিলো
“দীঘি আপু! দীঘি আপু। জেগে আছো? দরজাটা খোলো?”
মিনিট দুয়েক পর দরজাটা খুললো দীঘি। খুলে দিয়েই ফের চলে গেল খাটের কাছে। চুইংগাম চিবাতে চিবাতে বসলো মোবাইল নিয়ে। এক মনে গেম খেলছে, যেন কিছুই হয়নি ওর। অদিতি এগিয়ে গিয়ে দীঘির সামনে দাঁড়ালো। দিঘী স্ক্রিনেই চোখ রেখে অদিতি কে বলল
“কিছু বলবে?”
“তোমার বাবা ওদিকে অসুস্থ দীঘি আপু। মৃত্যুর সাথে লড়াই করছে। সে যদিও বেঁচে ফিরে তাকে চলে যেতে হবে কারাগারে। তোমার কোন অনুভূতি হচ্ছে না এ নিয়ে? কষ্ট হচ্ছে না? তোমার খারাপ লাগছে না একটুও?”
দীঘি চিবুক শক্ত করে মোবাইলটা চেপে ধরল দুই হাতের মুষ্টিতে। মনে মনে বলল ‘কোনো খুনি আমার বাবা হতে পারে না’ অদিতির দিকে চোখ বড় করে তাকাতেই অদিতি ভ্রু কুচকালো। দীঘি সামলে নিলো নিজেকে।
“কষ্ট পেয়ে আর কি হবে বলো। নিজের দোষেই এমন হয়েছে”
অদিতি কথা বাড়ালো না আর দীঘির সাথে। এ মেয়ে এমনিতেও অনুভূতি হীন। রান্নার কাছে চলে গেলো আবার।
হাবিব চৌধুরীর সামনে চোয়াল শক্ত করে শকুন চোখে তাকিয়ে আছে সাইফ। যেনো এক্ষুণি খেয়ে ফেলবে। বেড সাইড টেবিলের ওপর থাকা ফলের ট্রে থেকে ছুড়ি টা হাতে নিলো সাইফ। হাবিব নড়েচড়ে উঠলো
“বা…বাবা মারিস না আমায়। আমায় ছেড়ে দে বাবা। আমি বলছি, বলছি সবটা”
“দ্রুত”
হাবিব চৌধুরী শুকনো ঢোক গিলে বলতে লাগলো
“তখন দুইহাজার উনিশ সাল। তুযার প্রেম ছিলো ওই ফকিন্নি আক্কাস মাস্টারের মাইয়ার লগে। গেরাম কি গেরাম জানাজানি হইয়া গেছিলো তা।
ভাইজান কে বললাম ওই বাড়ির মেয়ে আনা যাবে না। ভাইজান বলল তুযাউন এর সাথে কথা বলবে। কিন্তু ছেলে শুনলো না। জোৎস্না অন্ত পরাণ তার।”
হাবিব ঢোক গিলল।
“পরে ভাইজান এর অনুমতি নিয়েই ওর ভাইরে শহরের চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে নিয়ে মেরে দি। কিন্তু জোৎস্না পালিয়েছিলো সেখান থেকে। চলে আসছিলো। ধরেও ছিলাম আমরা। চেয়েছিলাম ওকে পাচার দিতে। সব কিছু ওকে এমন ভাবে বুঝিয়েছিলাম যেন সব তুযাই করেছে। তারপর ভাগ্য ওকে সঙ্গ দিলো। আবার পালালো ও। আর খুঁজে পেলাম না। অনেক ভয়ে ছিলাম কোনদিন না তুযার মুখোমুখি হয় ও। আর আমার সত্যিটা সামনে চলে আসে। কিন্তু ও আর কোনো দিনও তুযার মুখোমুখি হয়নি। ঘৃণায় আর মুখ দেখায়নি তুযা কে। শেষ মেষ তুযা যখন ওর খোজ পেয়ে ঢাকাতে আসলো। তখন আমিও খবর পেলাম ও একটা মহিলা হোস্টেলে থাকছে। চিঠি পাঠালাম তুযা মারা গেছে। শেষ বারের মত প্রেমিক এর মুখ দেখতে ফুলহারা গ্রামের দিকে রওনা হয়েছিলো। পরে মেরে দিয়েছি পথেই। দুর্ভাগ্য বসত সেই টার রেকর্ড করে নেয় আমার ই দলে থাকা এক বিশ্বাস ঘাতক। শাওন। যার সাথে নদীর বিয়ে দিতে চেয়েছিলাম। সেই ভিডিও টা পরে দীঘির হাতে”
সাইফের শরীরের রক্ত টগবগ করে উঠে রাগে
“আল্লাহ এজন্যই তোমাকে কোনো ছেলে দেয় নি। তুমি অদিতি কে ও মারার চেষ্টা করেছো কয়েকবার। থুহহ তোমার মত কাকা কে। দাদাভাই যেমনই হোক, পরিবার এর জন্য সে সব করতে পারে। তার সাথে এমন বেইমানি টা কেনো করলে কাকা?”
হাবিব কথা বলে না। বুকের ভিতর ক্রমশ গিট বেধে আসছে। অপরাধবোধ নেই এক ফোটাও, সামনের পথটা ভেবে সে আকুল। সাইফ উঠে গেলো সেখান থেকে। এখানে থাকলে ভুলভাল কিছু হয়ে যাবে।
বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা হতে চলেছে। তুযা ওভারব্রিজ এর ওপর বসে পা দোলাচ্ছে। সাইফ ঘন্টা খানিক সময় ধরে খুঁজে অবশেষে পেয়েছে তুযা কে। কিন্তু কি করে কথাটা বলবে ভেবে পাচ্ছে না। আলগোছে গিয়ে পাশে বসলো। তুযা সাইফের কাধে কনুই ঠেকিয়ে দিয়ে বলল
“কাল মুন্সিগঞ্জ যামু। সাবধানে থাকিস। বাড়িতে দীঘি আর রহমানের মা রে একলা রাইখা কোথাও যাওনের দরকার নাই তোর। দিনে যেই হানেই থাকস, রাইতে বাড়ি ফিরবি।”
সাইফের কথা গলায় আটকে আসছে। মনে হচ্ছে এই কথা শোনার পর তুযা আর বাচবে কিমা সন্দেহ।
“মুন্সিগঞ্জ যাবে কেনো?”
“মুন্সিগঞ্জে জোৎস্নার এক মামা বাড়ি আছে। ওখান থেকে যদি কোনো খবর পাই”
সাইফ হাসফাস করে উঠলে
“দাদাভাই, ওনাকে আর না খুঁজলে হয় না?”
তুযা হাসে। এই একটালোক যে কষ্টেও হাসে। দুই হাত পিছনে ভর করে অল্প ঝুকলো
“ওরে আমার কিছু কওনের আছে। কিছু জিজ্ঞেস করার আছে। ক্যান এত বছর পালাই বেড়াইলো। জিজ্ঞেস না কইরাই কবরে যামু?”
সাইফের চোখের পাতা ভিজে আসে। পা দুটো অস্থির ভাবে কাপতে থাকে। আচমকা তুযা কে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেললো সাইফ। তুযা একটু চমকালো। সাইফের এমন ব্যাবহারে।
“কিরে ভাই? কি হয়েছে তোর? কিছু হয়েছে? এই সাইফ”
সাইফ তুযাকে ছেড়ে তুযা মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বলল “দাদাভাই, জোৎস্না বুবু আর বেচে নেই দাদাভাই।”
তুযা থমকে গেলো সাইফের কথায়
“মানে? তুই কি করে জানলি?”
“বুবুকে কাকা মেরেছে দাদাভাই। কাকা মেরেছে বুবুকে”
তুযা চুপ করে গেলো। যেন পাথরের মূর্তিতে পরিণত হয়েছে। কিছুক্ষণ পর হোহো করে হেসে উঠলো। তার হাসি থামছেই না। হাসতে হাসতে চিৎ হয়ে শুয়ে পড়লো। খুব শোকে মানুষ কাদতে ভুলে যায়। তাই হলো বোধহয়। তুযা হাসি থামিয়ে বলল
“ও তো অনেক আগেই মরে গেছে আমার কাছে। আজ তো শুধু আনুষ্ঠানিকতা পূরণ হলো। আল্লাহ তোরে জান্নাত বাসী করুক রে বেইমান। আল্লাহ তোরে জান…..নাত বাসী করুক”
শেষ কথাটুকু খুব ধীরে বলল তুযা। সাইফ তুযার হাত ধরে টেনে বলল
“চলো বাড়ি নিয়ে যাই তোমায়। রাত হয়ে গেছে দাদাভাই। চলো।”
তুযা গা ছেড়ে দিল। ঢলে পড়লো সাইফের উপর। সাইফ আগলে ধরে রাখতে পারছে না।
গতকালকে সারারাত জাগার পর চোখে ঘুম লেগে এসেছিল অদিতির। মাত্র একটু চোখ বুজেছে। ড্রয়িং রুমে বিকট কিছু পড়ার শব্দে হচকচিয়ে ওঠে অদিতি। ধরফর করতে থাকে বুকে হাত দিয়ে দ্রুত বিছানা থেকে নেমে চলে যায় দরজার সামনে। নিচতলা থেকে দীঘি চিৎকার করে ডাকে
“ভাবি নিচে এসো না ভাবি। খবরদার নিচে এসো না”
তবুও অদিতি দীঘির কথা না শুনে দরজা খুলল। নিচে দেখল দশ বারো জন কালো পোশাক পরা মুখোশধারী লোক। ড্রয়িং রুমের বড় টেবিলটা ভেঙে ফেলেছে। দীঘির হাতে থেকে গল গল করে রক্ত পড়ছে। ছুরি দিয়ে পোচ মেরেছে। দীঘির গলা ছুরি ধরে অদিতিকে বলল
“নিচে আয় নয়তো এক্ষুনি শেষ করে দেবো মালটাকে”
দীঘি চেচিয়ে বলল
“আমাকে মেরে ফেললেও তুমি নিচে আসবে না ভাবি। ঘরে ঢুকো তুমি।”
কয়েকজন দ্রুত পায়ে উঠে গেলো সিড়ি দিয়ে। অদিতি দরজা বন্ধ করতে গেলে বাধা দিলো। বাহির থেকে ঠেলে দরজা খুলে ফেলল দুজন। অদিতির মুখে সামনে কিছু স্প্রে করতেই জ্ঞান হারালো অদিতি। টেনে হিচড়ে নিয়ে আসলো নিচে। দীঘির ঘাড়ে ইনজেকশন পুশ করে ওকেও বেহুশ করা হলে। বাইরে থাকা কালো কাচের গাড়িটাতে তুলে রওনা হলো তারা কোনো এক অজানা গন্তব্যের দিকে। বাড়ির আলো ও নিভিয়ে দিয়ে গেলো।
সাইফ আর তুযা ফিরলো, রাত তখন নয়টার বেশি। তুযা ঢুলছে, সাইফ কোনো রকমে সামলে বাড়ি নিয়ে এলো। কিন্তু পুরো বাড়ি অন্ধকার। চারিদিকে চোখ বুলিয়ে নিজেই জ্বালালো ড্রইং রুমের বিশাল আকার ঝাড়বাতি টা।
“অদিতি। অদিতি”
সাইফ জোরে জোরে ডাকতে লাগলো অদিতি কে। গতকাল সারা রাত হাসপাতালে জেগেছে, ঘুমিয়ে গেছে হয়তো। ওপরে যেতে নিলে চোখে পড়লো ডাইনিং টেবিল টা টুকরো টুকরো হয়ে পড়ে আছে মেঝে জুড়ে। সাইফের মস্তিষ্ক জানান দেয় কোনো এক অজানা ঝড়ের আভাস। দ্রুত পায়ে রুমে গিয়ে দেখলো অদিতি ঘরে নেই। আশেপাশের ঘরে, রান্না ঘরে কোথাও পেলো না। দৌড়ে আসে ড্রইং রুমে।
“দাদাভাই, দেখেছো টেবিলটা ভাঙা। অদিতিকেও পাচ্ছি না।”
কথা বলতে বলতে খেয়াল করলো তুযার পায়ের তলায় রক্ত। তুযা আতঙ্কিত হয়ে বলল
“দীঘি কে ডাক তো”
সাইফ দীঘির ঘরে গিয়েও দেখলো দরহা খোলা। দীঘি ঘরে নেই। হঠাৎ মাথায় এলো সিসিটিভি ফুটেজ এর কথা। যেটা সাইফ বসিয়েছিলো বাড়িতে। দ্রুত ক্যামেরা অপেন করে দেখতে পেলো সেই নরকীয় দৃশ্য। কীভাবে মুখোশ পরা লোক গুলো দীঘির হাতে ছুড়ি মেরেছে আর অদিতিকেও নিয়ে গেছে। সাইফ মাথাধরে ধপ করে বসে পড়লো মেঝেতে।
তুযা বলল
“এসবে ছোট কাকার হাত নেই তো আবার?”
সাইফের চোখ রক্তবর্ণ ধারণ করলো।
“যদি তাই হয়, এবার আমার হাতেই মরবে ও”
দুজনে গাড়ি নিয়ে বেড়িয়ে গেলো হাসপাতালের দিকে। কিন্তু সেখানে হাবিব নেই। পুলিশের চোখ ফাকি দিয়ে ওখান থেকে পালিয়েছে। তুযা কনস্টেবল কে বলল
“একটা অসুস্থ লোক নাকের ডগা থেকে পলাই যায়, আর তোমরা বইসা কড়াত টানো? বাল ফালাইতে পুলিশ হইছো?”
সাইফ কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল
“দাদাভাই, আমার মনে হচ্ছে কোনো পুলিশ অফিসার ও কাকাকে সাহায্য করছে”
তুযারও তাই মনে হলো। নয়তো এত সিকিউরিটি পেরিয়ে কোনো ভাবেই একটা সদ্য অপারেশন হওয়া লোক পালাতে পারতো না। কিন্তু সত্যিই কি অদিতি আর দীঘিকে হাবিব অপহরণ করালো? তুযা কপাল কুচকে বলল
“এতে কাকার কি লাভ বলতো?”
“ওর কোনো বিবেকবোধ আছে নাকি? ও সব করতে পারে। তুমি আমাদের ফার্মহাউসে চলো আমার সাথে। ওখানে কাকা মাঝেমধ্যে রাত কাটাতো। হতেও তো পারে ওদের ওখানেই নিয়ে গেছে”
সাইফ অদিতি কিন্তু এসে গেছে 🥹🫶
কেমন হলো অবশ্যই বলিয়েন।
আর নূর-এ-সাহাবাদ এ ২k পূরণ করে দেন জলদি
Share On:
TAGS: খাঁচায় বন্দী ফুল, জান্নাতুল ফেরদৌস
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
খাঁচায় বন্দী ফুল ৩৮ এর শেষাংশ
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ৩৪
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ৩৫
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ১৩
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ৩৬(প্রথমাংশ +শেষাংশ)
-
খাঁচায় বন্দী ফুল ৪২ এর প্রথমাংশ
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ৩০
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ৪৭
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ৮
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ১৮