Golpo কষ্টের গল্প খাঁচায় বন্দী ফুল

খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ৫০


খাঁচায় বন্দী ফুল

jannatul_ferdous_জান্নাতুল_ফেরদৌস

পর্ব – ৫০

দেখতে দেখতে পেরিয়ে গেছে ৪ টা দিন। আজ তুযা ফের ঢাকায় যাবে। রেডি হয়ে ঘর থেকে বের হতেই পড়লো লতিফার সামনে। তার হাতে একখানা খাম। তুযা ভ্রু কুচকে জিজ্ঞেস করলো
“এটা কি?”

“ফুলমালার আব্বায় নিমন্তন্ন পত্র পাঠাইছে। আর ফুলে কইছে যেনো তোর কাছেই দেওয়া হয়। নে ধর”

তুযা খামটা নিয়ে বালিশের তলায় রেখে বেড়িয়ে গেলো। দেরি করার সময় নেই। ঢাকা পৌঁছাতে পৌঁছাতে তার বিকাল হলো। এমনিতেই যানবাহন, ধূলো ময়লা, অতিরিক্ত মানুষজনের জন্য ঢাকা ওর পছন্দ নয়। তবুও বারবার আসতে হচ্ছে। সেই মহিলা হোস্টেলে গেলো ফের। দরজার সামনে দাড়িয়ে টোকা দিতেও হাত পা কাপছে। বুকেট ভিতরটাও ধুকপুক করছে। এতবছর পর জোৎস্নার মুখোমুখি হতে চলেছে। নানা জড়তা সংশয় নিয়ে কলিং বেলে চাপ দিলো। দুই বার আাপতেই সেই আগের দিনের মহিলাটা এসে দরজা খুলল।

তুযা কে আজ বেশ পরিপাটি দেখাচ্ছে। মহিলাটা আগাগোড়া পরখ করে, স্বভাব সুলভ খ্যাক খ্যাক করে বলল
“ওহ, তুমি? তা আইজকা আবার কি চাই?”

“ওই যে সেদিন এসেছিলাম জোৎস্নার খোঁজে। ও এসেছে তো?”

মহিলা টা কপাল কুচকে বিরক্তি নিয়ে বলল
“ওয় নাই এইহানে। চইলা গেছে”

তুযার কপালে ভাজ পড়লো
“চলে গেছে মানে? কোথায় গেছে? আপনি না বললেন আমায় আজ আসতে”

“মরণ, ওয় কাইল আইছে ফিরা। আহনের কতা আছিলো আইজ। একদিন আগেই আইবো জানি আমি? আইছে পরেই তোমার কথা কইছি, হেয় ব্যাগ, বোচকা লইয়া বাইর হইছে। কইয়া গেলো হোস্টেল ছাইড়া দিমুব। ভাড়া মিটিয়ে চইলা গেলো।”

তুযার কপালে সূক্ষ্ম ভাজ পড়লো। জোৎস্না কেনো ওর থেকে পালিয়ে বেড়াচ্ছে? কেনো দেখা করতে চায় না ওর সাথে?
“আচ্ছা আন্টি, ওর স্বামী কোথায় থাকে বলতে পারেন?”

“ওয় বিয়া করে নাই হুনছি। হাচা-মিছা ওয় ই জানে। অহন যাও তো বাপু। আমার ম্যালা কাম আছে”

তুযার মুখের ওপর দরজা বন্ধ করে দিলো মহিলাটি। তুযার হাত-পা অবশ হয়ে আসে। শরীর যেন নিজের সক্ষমতা হারিয়েছে। ধপাস করে বসে পড়ে দরজার সামনে। সে কোনো হিসাব মিলাতে পারছে না জোৎস্নার এমন ব্যবহারের কারণ কি। এতকাল তো ভেবেছিল তার বিয়ে হয়ে গেছে এখন শুনছে বিয়েও হয়নি। এবার আর কোন পথ দেখছে না তএযা। হঠাৎ করে মাথায় এলো সাইফের সাথে যোগাযোগ করে কোন ভাবে সেই ম্যানেজারের থেকে জোৎস্নার ভাইয়ের নাম্বারটা ম্যানেজ করতে হবে।

এর মধ্যে হঠাৎ করে পকেটে ফোন বেজে উঠল। পকেট থেকে মোবাইলটা বের করে দেখলো সাইফের নাম্বার। রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে শোনা যায় সাইফের আতঙ্কিত কণ্ঠস্বর
“দাদাভাই কোথায় তুমি?

“কি হয়েছে?”

সাইফ বলল
“কাকাই পুলিশ এর হেফাজত থেকে পালাতে গিয়ে গুলি খেয়েছে। বাবাও প্রেসার ফল করেছে। আমি একা কিচ্ছু সামাল দিতে পারছি না। তুমি এসো প্লিজ। রাতের মধ্যেই এসো”

তুযার ভ্রূদ্বয় সংকুচিত হলো
“আমি ঢাকাতেই আছি। এক ঘন্টায় পৌঁছাচ্ছি।”


খড়ের বিশাল পালাটা হেলান দিয়ে তুযার পথ চেয়ে আছে ফুলমালা। কি পাষাণ লোকটা, এখনো আসছে না। সেদিন পাত্রপক্ষের সামনেও কিচ্ছু টি না বলে চলে গেছিলো। সে কত আশা নিয়ে বসে ছিলো, এই বুঝি তুযা ভাই বাবা কে বলবে ফুলের কোথাও বিয়ে হবে না, আমি বিয়ে করবো ওকে। টু শব্দটি না করেই চলে গেলো। আর আজ বি’ষ খাওয়ার কথা শুনেও আসছে না। ফুল তো চিঠিতে লিখে দিয়েছিলো, আজ সন্ধ্যার মধ্যে এসে না নিয়ে গেলে বি’ষ খেয়ে নিবে। বাজার থেকে বি’ষের শিশি কিনে এনে কোমড়ে গুজে রেখেছে, এও লিখে দিয়েছিলো। তুযা ভাই কি তবুও আসবে না?

ধরনীর বুকে সন্ধ্যা নামছে। চারিদিকে আস্তে আস্তে অন্ধকার হয়ে আসছে। দুই চোখের পানিতে ফুলমালার বুক ভিজে যাচ্ছে। প্রকৃতিতে গর্জন করছে মেঘেরা। কখন যানি হুড়মুড়িয়ে নেমে পড়বে। বোকা কিশোরি এখনো তার পছন্দের পাষাণ পুরুষ টার অপেক্ষায় বসে। সে জানেও না যে লোকটা তার চিঠি পড়েও দেখে নি। হঠাৎ জিপ থামার শব্দে ফুলমালার টনক নড়লো। উঠে দাঁড়িয়ে শাড়ির আচলে চোখ মুছতে মুছতে ছুটে গেলো জিপের কাছে। বিষন্ন মনে উড়ে গেলো এক ঝাক রঙিন প্রজাপতি। কিন্তু তাদের উড়াউড়ি বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না। জিপের কাছে যেতেই ফুলমালা দেখলো জিপ থেকে নামলো তুযার মা-বাবা এবং কর্মচারী আকবর।

ওয়াহাব চৌধুরী কে সালাম দিয়ে ফুলমালা মলিন মুখে লতিফা কে বলল
“খালাম্মা, তুযা ভাই আইবো না?”

লতিফা ব্যাস্ত হয়ে ফুলমালার মাথায় ঘোমটা টেনে দিল
“হায় হায়, তুই ওমন ভরা সাঝের কালে চুল টুল আগলা দিয়া বাড়ির বাইর ক্যান হইছোস? জানোস না? বিয়ার আগে ওমন হুটহাট বাইর হইতে হয় না। মন্দ বাতাস লাগে গায়ে। চল ঘরে চল।”

ফুলমালা ওদের সাথে যেতে যেতে আরো একবার বলল
“তুযা ভাই……

“হের কি আর আহনের সময় আছে? হেয় গেছে ঢাকায়। কোন জনমে এক মাইয়া রে মনে ধরছিলো, হের নাকি খোঁজ পাইছে। আমার যে কত যন্ত্রণা।”

লতিফার কথা গুলো ফুলমালার বুকে তীরের মতো বিধলো। তুযা জোৎস্নার খোজ পেয়েছে? তাহলে কেনো আসবে ওর কাছে? আর আসবে না তো। এখন বুঝতে পারছে, ফুলের বি’ষ খাওয়ার কথাও কেনো তার দৃষ্টি আকর্ষণ করেনি। সে তো জোৎস্না কে ভালোবাসে।

ফুলমালা ঢুলতে ঢুলতে নিজের ঘরে গিয়ে মেঝেতে বসে পড়লো ধপ করে।
“আমার অনুভূতি তার কাছে এতই ঠুনকো বুঝি? আমার আত্মহত্যার চেষ্টার চেয়েও তার প্রাক্তন প্রেমিকার সাথো সাক্ষাৎ বেশি দামি? আমি অহেতুক এক মোহের পিছে ছুটছি? উনি তো কোনো কালেই ভালো বাসলো না আমায়। সামান্য পরিমান অনুভূতি থাকলেও সে আমাকে বাচানোর জন্য আসতো। তার সাথে তো কালও দেখা করা যেত। হয়তো আজই যেতে বলেছে, আর সে কথা ফেলতে পারেনি।”

ফুলমালা কাঁদতে কাঁদতে মেঝেতে লুটিয়ে পড়ে
“আমি তো তার সব মেনে নিয়ে ছিলাম। তাহলে কেনো সে আমায় গ্রহণ করলো না? কেনো তার জীবনে জোৎস্নাই সব। আমি কেউ না, আমি তার কেউ না”

সে রাতে ফুলমালার গগণ বিদারী কান্নার সাক্ষী ছিলো ঘরের চার দেওয়াল। কিন্তু ঝড়ের শেষে সেই আকাশ ও পরিষ্কার হয়েছিলো। শেষ বার চোখ মোছার পর সেই চোখে আর তুযার জন্য কোনো ভালোবাসা ছিলো না। ওই যে বলে না? নারী ভালোবাসায় দুঃখ পেলে যে জিদ তৈরি হয়। তারা সোনার থালা ছুড়ে আসতেও দ্বিধাবোধ করে না। তেমন টাই হলো ফুলের সাথে। সিদ্ধান্ত নিলো আজকের পর থেকে আর কাঁদবে না তুযার জন্য।

মাঝরাতেই গোসল করে নিলো। নতুন জীবনে পা দিতে যাচ্ছে, কঠোর হতে হবে তাকে। যতটা পাষাণ তুযা হয়েছে, তার দ্বিগুণ পাষাণ সে হয়ে দেখাবে। এত ভালোবাসার পর কেনো তাকে ফিরিয়ে দেওয়া হবে। কোনোদিন তুযা এসে ভালোবাসা নিবেদন করলেও আর গ্রহণ করবে না সে। উনি থাকুক ওনার প্রাক্তন কে নিয়ে।


অদিতির সারা টা রাত কেটেছে হাসপাতালে। হাসান চৌধুরী গুরুতর অসুস্থ। হাবিব চৌধুরীরও কাঁধে গুলি লেগেছে। নদী খবর পেয়ে ছুটে এসেছে বাবা কে দেখতে। কিন্তু সায়রা তাকে ঘেঁষতেও দেয় নি বাবার কাছে। অনেকক্ষণ আকুতি মিনতি করেও মায়ের মন গলাতে না পেরে ফিরে গেছে নদী।

অপারেশন হওয়ার পরও পুলিশের নজরদারি তে আছে হাবিব। সন্ধ্যায় অপারেশন হলেও জ্ঞান ফিরেছে ভোর রাতে। কাচের দরজার বাইরে পুলিশ দেখে হাবিব এর শ্বাস-প্রশ্বাস এর গতি বাড়লো। নার্স কে দিয়ে খবর পাঠালো তুযা কে ডাকতে। তুযা মাত্রই ফ্রেশ হয়ে এসে চা খাচ্ছে গেটের সামনে দাড়িয়ে। সাইফ অদিতিকে বাড়িতে ছাড়তে গেছে। নার্স এসে খবর দিল হাবিব দেখা করতে চায়। তুযা চা শেষ করে তবেই গেল। ঢোকার সময় পুলিশ বাধা দিলো। কে জানে আবাট কোন প্ল্যান করবে। তুযা তাদের তেল মেরে বলল
“আসলে হয়েছে কী, ওনার তো কোনো ছেলেপুলে নেই। আমি বাড়ির বড় ছেলে। একটাবার দেখা না করে মরে গেলে তার আফসোস থেকে যাবে না?”

অফিসার কপাল কুচকে বলল
“উনি মরতে যাবে কেন? ওনার অপারেশন সাকসেসফুল। উনি এখন আউট অফ ডেঞ্জার”

তুযা দাত কেলিয়ে হাসলো
“মরণ কি আর বইলা কইয়া আহে সাহেব। যাইতে দেন না আমারে”

“না না, আপনাকে যেতো দেওয়া যাবে না। আপনার চালচলন সুবিধা জনক লাগছে না। পরে আসামি কে পালাতে যদি সাহায্য করেন”

“বাশটা দিলাম ই আমি, আবার আমি টাইন্না বাইর করতে যামু কোন দুঃখে অপিষাড়”

ওসি রেগে উঠলো তুযার ব্যাঙ্গ শুনে।
“এই এই কি বললেন আপনি?”

“কইলাম কি, আমগো বাড়ির পাশের মকবুল। মুরগির দুধের পায়েস করছিলো ওর বউ। খাইতে যাইয়া গলায় ঠেইকা মইরা গেছে। আবার ওই পুব পাড়ার কানাই। জাতে হিন্দু, তাল গাছের সাথে ধাক্কা খাইয়া মইরা গেছে। তেমনি আমার কাকা যদি মইরা যায় আমার লগে দেহা না কইরা”

কনস্টেবল কিছু বলতে নিলে ওসি থামিয়ে দিলো। বিরক্ত হয়ে তুযা কে বলল
“আপনি যান তো যান। বাড়ির বড় ছেলে হয়েছেন, কাকা কে বোঝাতে পারেন নি এসব ভুলভাল কাজ না করতে”

“বুঝাইছি, তয় উল্টা ডা”

আর কথা না বাড়িয়ে তুযা কেবিনে ঢুকে গেলো। হাবিব বেডে হেলান দিয়ে শুয়ে আছে। তুযা কে দেখেই আকুল হয়ে উঠলো
“ও তুযা, বাপ রে। কিছু একটা কর। আমি এখন কি করবো বল দেখি। পুলিশ কোথ থেকে যেন সব প্রমান পেয়ে গেছে। আমাকে বাঁচা বাবা”

তুযা টুল টা টেনে হাবিব এর পাশে বসলো
“গুলি খাওয়ার পরও ত্যাজ কমে নাই? পুলিশ ধরছে, বাড়ির লোক যাইয়া ছাড়াই আনতো। পলাইতে গেছো ক্যা বুইড়া কালে। নকশা দেখে আর বাচি না। নিজেরে কি পালোয়ানের ধন ডা ভাবো? যে পুলিশের সাথে দৌড়ে পারবা? ওই যে বাইরে হালা গো খাড়া দেখতেছো। ওগোরে ট্রেনিং দিয়াই চাকরিতে নামাইছে। তোমার মতো হরিদাস রে ধরা ওগো ঘটনাই না”

“আচ্ছা এসব কথা ছাড় না। এখন আমি কি করবো? সব ডকুমেন্ট কি করে ফাস হলো?”

তুযা গাড়ির চাবি দিয়ে আয়েশি ভঙ্গিতে কান খোঁচাচ্ছে। হঠাৎ বলে উঠলো
“তোমার গোডাউনে ক্যামেরা লাগাইছিলাম। ওইখান থিকাই সমস্ত পেপার পাইছি। তয় সিসিটিভি কোন হালায় জানি আমার হাত থিকা ছুটাই নিয়া গেছে। প্রথমে হ্যাক করলো। পরে দেখি ক্যামেরাই গায়েব। নয়তো ভিডিও সহ দিতাম পুলিশ রে। প্রমাণ জোরদার হইতো। শালার চোরের ওপরেও বাটপার আছে দ্যাশে”

হাবিব এর চোখ চড়ক গাছ। এতসব কিছু তুযা করেছে? শুকনো ঢোক গিলে বলল
“আমার এত বড় সর্বনাশ কবে করলি বাপ?”

“তোমারে বাশ দেওয়ার জন্য আমি ২৪ ঘন্টা রেডি কাকা। আরো লাগলে কইও”

হাবিব কে চুমু দেখিয়ে বেড়িয়ে গেলো তুযা। গেটের সামনেই সাইফের সাথে দেখা। সাইফ কিছু খাবার নিয়ে এসেছে। তুযা মুখ বাকিয়ে বলল
“ওই বাল ডারে গিলায়া লাভ আছে?”

সাইফ তবুও খাবার নিয়ে রুমে ঢুকলো। বেডের পাশের টেবিলটায় রাখতেই হাবিব মুখ ঘুরিয়ে নিলো।
“খাবো না এখন। রেখে যা”

সাইফ এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে হাবিব এর দিকে। হাবিব হঠাৎ খেয়াল করলো সাইফের দৃষ্টি
“কিছু বলবি?”

“এত নাটক করে দাদাভাই কে তুমি অযথাই কেনো ঘুড়াচ্ছো কাকাই? কেনো মিথ্যা লোভ দেখাচ্ছো?”

হাবিব কিছুটা ভড়কে গেল
“জোৎস্না বুবু কে কেনো মারলে কাকাই?”

দেখতে দেখতে সাইফ অদিতি আর তুযা কে নিয়ে লিখার ৫০ পর্ব হয়ে গেলো। কেমন অনুভূতি আপনাদের?
আগের পর্বের রিয়্যাক্ট খুবই কম 🙂
এটায় যেনো ভালো হয় প্রিয় পাঠক ☺️🫶
গল্প হারিয়ে না ফেলতে পেইজে ফলো দিয়ে রাখুন।

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply