Golpo কষ্টের গল্প খাঁচায় বন্দী ফুল

খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ৪৮ এর প্রথমাংশ


খাঁচায়বন্দীফুল

jannatul_ferdous_জান্নাতুল_ফেরদৌস

৪৮ এর প্রথমাংশ

সকাল বেলা তুযার ফুলমালাদের বাড়িতে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু এরই মধ্যে ঘটে গেছে এক অঘটন। গত কালকে শহর থেকে ফেরার পর তুযা কে বাড়িতে দিয়া তারপর সে নিজের বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হয়। মাঝপথে রাশেদের লোকেরা আক্রমণ করে মানিক কে। ওরা ভেবেছিলো সাথে তুযাও আছে। কিন্তু তুযা কে না পেয়ে মানিক কে বেধম মার মেরেছে ওরা। তুযা খবর টা পেয়েছে ভোর বেলা। সকালে বাজারে যাওয়া মানুষ মানিক কে রাস্তায় পড়ে থাকতে দেখে ডাক্তারের কাছে নেয়। কিন্তু ডাক্তার জানায় এত জখম উনি সারাতে পারবেন না। দ্রুত ডাক্তারের কাছে নিতে হবে, শরীরের অবস্থা বেগতিক। আরো আগেই নেওয়া উচিত ছিলো। মানিকের পরিবারের আর্থিক অবস্থা তেমন ভালো না। পাশের গ্রামে হাসপাতাল, সেখানে নেওয়া বা খরচ বহন করা সম্ভব না তাদের পক্ষে। পরবর্তী তে তুযা কে খবর দেওয়া হয়। তুযা উঠেই ছুটে আসে জিপ নিয়ে। মানিক কে জিপে তুলে রওনা হয় হাসপাতালের দিকে।

ছেলেটা সারকক্ষন তুযা কে সঙ্গ দিয়েছে। গতকালকে এই ঝড় বৃষ্টির মধ্যেও একা ছাড়েনি তুযা কে। বাড়ি ওবদি সাথে সাথে এসেছে। তারপর নিজে ফিরার পথে আহত হয়। তুযার শরীরের রক্ত টগবগ করছে। এত দিন রাশেদের অনেক অত্যাচার অপকর্ম সহ্য করেছে কিন্তু এবার খুনোখুনি হয়েই যাবে। হাসপাতালে নেওয়ার পর মানিক কে দ্রুত চিকিৎসা দেওয়া শুরু হলো। স্বয়ং ওয়াহাব চৌধুরীর ছেলে নিজে এসেছে সাথে। কিন্তু ডাক্তার জানালো শরীরের অবস্থা একদমই ভালো নয়। সারারাত ওভাবে পড়ে থাকায় অনেক রক্ত বেরিয়ে গেছে। আরও আগে হসপিটালে আনা প্রয়োজন ছিল। তুযাকে পাঠালো পাশের রক্তদান শিবিরের ক্লাবে রক্তের খোঁজে।

মানিকের মা আর বোন কেদেই চলেছে। ডাক্তার মানিককে অপারেশন থিয়েটারে ঢুকালো। শরীরের বিভিন্ন জায়গায় মারাত্মক ক্ষত। মাথার পিছনের দিকটা অনেকটা ফেটে গেছে। পায়ে পিঠে এমনকি বাহুতেও অনেক কুপানো হয়েছে ধারালো কিছু দিয়ে।

নানান ব্যস্ততার মধ্যে তুযা ভুলতে বসলো ফুলমালার কথা। সেখানে গিয়ে একজনকে পেয়েও গেল যে রক্ত দিতে ইচ্ছুক। তবে তাকে ক্লাবে পাওয়া গেল না, তাকে খুঁজতে ক্লাবের সভাপতি এর সাথে বাড়িতে যেতে হলো। গ্রামে তারা এমন একটি সংঘ তৈরি করেছে সেখানে যারা যারা রক্ত দিতে চান তারা নাম এবং ঠিকানা লিখিয়ে গেছে। কারোর রক্তের প্রয়োজন পড়লে আর এলাকায় ঘুরতে হবে না রক্ত দানকারীর খোঁজে। ক্লাবে গেলেই তাদের লিস্ট পাওয়া যাবে কারা কারা রক্ত দিতে ইচ্ছুক।

ঠিকানা মত বাড়ি গিয়ে লোকটাকে নিয়ে হাসপাতালের উদ্দেশ্যে রওনা দিলো তুযা। হেঁটে না, একপ্রকার লোকটাকে নিয়ে দৌড়াচ্ছে। লোকটা কিছুক্ষণ বাদে বিরক্ত হয়ে বলল
“আরে মশাই, এমনে হাটা যায়? আস্তে চলেন না”

“ভাই একটু তাড়াতাড়ি চলেন, রোগীর অবস্থা ভালো না খুব খারাপ”

হয়তো তুযার আসতে বড্ড দেরি হয়ে গেল। তুযা যখন লোকটাকে নিয়ে হাসপাতালের ভিতরে ঢুকলো, দেখলো গেটের সামনে মানিকের মা বসে দেয়ালে হেলান দিয়ে আছে। একদম নড়চড় নেই। শোকে মানুষ স্তব্ধ হলে যেরকম হয়। মানিকের ছোট বোন পাশে বসে কেঁদেই চলেছে। ডাক্তার দুজন মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছেন। আর নার্স মানিকের মাকে বারবার কিছু বোঝানোর চেষ্টা করছে। তখনই তুযার চোখ গেল পাশেই একটা স্ট্রেচারের বড় সাদা কাপড়ে মোড়ানো। রক্ত দেওয়ার জন্য নিয়ে আসা লোকটা তুযার বাহুতে ধাক্কা দিয়ে বলল
“ও ভাই, কই রোগী কই? চলেন আপনার না রোগীর অবস্থা ভালো না”

রোজা শুকনা ঢোক গিলে এক দৌড়ে চলে গেল স্ট্রেচারের কাছে। মুখের সামনের কাপড়টা সরানোর সহজ পাচ্ছে না। নিজেকে মনে মনে অনেক শক্ত করছে এটা কখনোই মানিক না মানিক হতেই পারে না। ডাক্তারটি তুযার কাঁধে হাত রেখে মৃদু চাপ দিল। তুযা কাঁপাকাঁপা হাতে সাদা কাপড়টা সরাতেই দৃশ্যমান হলো মানিকের জখম মুখশ্রী। কপালে চোখের নিচে থুতনিতে নাকে সহ বিভিন্ন জায়গায় নীলচে জখম হয়ে আছে। তুযার পাষাণ সত্তা চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যাচ্ছে। শক্ত আখি যুগল চিরে বেরিয়ে আসছে বেদনার জল। দুহাতে মানিকের মুখ আগলে নিয়ে ঝাকাতে ঝাকাতে আর্তনাদ করে উঠলো

“এই মানিক, মানিক। ওই মানিক। তুই আর বেইমানি করিস না ভাই। ওঠ, ওঠ না। দাদা ওঠ। তুই আর বেইমানি করিস না দাদা। আমার সাথে তুই অন্তত বেইমানি করিস না। তুই তো আমারে বুঝস, ক? তুই তো জানিস আমি কতজনরে হারাইছি। তুই জানিস না? ভাই যাইস না। একটাবার থাকা ভাই, একটা বার তাকা”

মানিক তাকায় না। তুযার আহাজারিতে হাসপাতালের অনেক লোক জড়ো হয়ে গেছে সেখানে। ডাক্তাররা তাদের সামাল দিতে রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছে। কিন্তু তুযাকে কিছু বলার সাহস পাচ্ছে না। মানিকের মা ও জ্ঞান হারালো, ঢলে পড়লো মেঝেতে। খবর পেয়ে তুযার দলবল ছুটে এসেছে। শফিক ও হাসনাত তুযাকে সামলাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। বাকিরা ভ্যান ডেকে মানিকের লাশ নেওয়ার ব্যবস্থা করছে। হাসনাত জিপ চালালো। তুযাকে পাশে বসিয়ে ধরে রেখেছে শফিক। ভ্যানে মানিকের লা’শের সাথেও দুজন আছে ওদের লোক। মানিকের মা আর বোনকে আরেকটা ভ্যানে উঠিয়ে তাদের সাথে দুজন গেল।

তুযা যেন আরও বেশি পাথর হয়ে গেছে। চোখ দুটো রক্তিম বর্ণ ধারণ করেছে। মনিপুরের শেষ মাথায় আসতে গাড়ি থামাতে বলল। ৫ মিনিট মত গাড়ি দাঁড় করিয়ে রাখার পরে পিছন থেকে ভ্যান এসে তাদের পাশাপাশি হলো। তো যা ভ্যান ওয়ালা কে নির্দেশ দিল
“ওকে প্রধানদের পারিবারিক কবরস্থানের সামনে নিয়ে যাওয়া হোক”

শফিক তুযার দিকে অবাক হয়ে মিনমিনে গলায় বলল
“কিন্তু সাহেব ওটা তো শুধু আপনাদের পারিবারিক কবরস্থান”

তুযার চোখ এখনো ভ্যানে রাখা সাদা কাপড়ে মোড়ানো লাশের দিকে নিবদ্ধ
“ও আমার পরিবারের লোকই ছিল তাই ও প্রধানদের কবরস্থানে থাকবে”

তুযার নির্দেশ পেয়ে ভ্যানওয়ালা ও চলতে শুরু করল। ভ্যান এসে থামল চৌধুরী বাড়ির মাঠে। তার অপর প্রান্তেই আছে কবরস্থান। এখানে লাশ নামানো হলো প্রিয়জনদেরকে শেষবার দর্শন দেয়ার জন্য। যদিও লাশটা দেখার অবস্থায় আর নেই। তুযা নির্দেশ দিয়ে দিল লাশ দ্রুত দাফনের ব্যবস্থা করতে হবে। নয়তো পুলিশ এসে যাবে ঘটনাস্থলে। পুলিশ এলে কেসটা পুলিশের হাতে চলে যাবে। কিন্তু পুলিশের বিচার তুযার পছন্দ হবে না। সে এ বিষয়টা নিজের হাতে করতে চায়।

ওয়াহাব চৌধুরী দেখেছেন তুযার সাথে মানিকের সখ্যতা। যে কোন দরকার এই ছেলেটা ঝাপিয়ে পড়েছ তুযার বিপদে। সব সময় পাশে থেকেছে। তাই তুযার এবারের সিদ্ধান্তে ওয়াহাব চৌধুরীর অনুরোধ করলেন না। তাছাড়া নিজের ছেলের জিদের কাছে টিকতেও পারবেন না জেনেই চুপ থাকলো।


বহুদিন পর ছাদে এসেছে অদিতি। গোসল করে জামা কাপড় ছাদের রশিতে মেলে দিয়ে রেলিং ঘেঁষে দাঁড়িয়ে চোখ বন্ধ করে হওয়া অনুভব করছে। বাতাসে ভেজা চুলগুলো উড়িয়ে দিচ্ছে বারবার। শাড়ির আঁচলটাও উড়ছে। এখন বিকেল সময়, আকাশটাও বেশ মেঘ মেঘ। ঝড়ো হাওয়া বইছে। অদিতির বেশ ভালো লাগছে আবহাওয়া টা। এমন আবহাওয়া তার বরাবরের প্রিয়। ছাদে অনেক রকমের ফুলের গাছ লাগিয়ে ছিল নদী। এগিয়ে গিয়ে সেখান থেকে একটা নয়ন তারা ফুল তুলে নিয়ে কানের পিঠে গুজলো। আনমনেই হাসলো একা একা। রান্না ঘরের গরমের মধ্যে থেকে বেড়িয়ে গোসল করে এসে এত ঠান্ডা আবহাওয়া তার হৃদয় জুড়িয়ে দিচ্ছে। দোলনা টায় গিয়ে বসলো। সাইফ রুমে ঘুমাচ্ছে। আজ অফিস থেকে দুপুরেই ফিরে এসেছে। অবস্থা এবার বেগতিক বাতাস পড়ে গিয়ে ঝিরিঝিরি বৃষ্টি পড়তে শুরু করল অদিতি জামা কাপড় গুলো উঠিয়ে দৌড়ে নিচে নেমে চলে গেল।

ঝাপটায় অল্প ভিজেও গেছে। জামাকাপড় গুলো ব্যালকনিতে রেখে তোয়ালে দিয়ে গায়ের পানি ঝাড়তে ঝাড়তে রুমে ঢুকলো। সাইফ তখনো উপুর হয়ে ঘুমাচ্ছে। কম্ফোর্টার কোমড় পর্যন্ত ঢাকা। দু’দিন ধরে বাহিরে বৃষ্টি হওয়ায় আবহাওয়া বেশ ঠান্ডা। সাইফ বেঘোরে ঘুমাচ্ছে। অদিতি এখন একটু মিস করতে লাগলো সাইফের দুষ্টুমি গুলো। লোকটা জেগে থাকলে এতখনে কত রংঢং করতো। অদিতি আলতো করে হাত বুলালো সাইফের পিঠে। চুল গুলোতেও নিজের নরম আঙুল গুলো দিয়ে বিলি কাটতে লাগলো। অদিতির স্পর্শে সাইফের ঘুম হালকা হলো। পিটপিট করে তাকাতেই প্রথমে চোখে পড়লো প্রিয়তমা স্ত্রীর মুখটা। গোসলের পর বড্ড স্নিগ্ধ লাগছে তাকে। চুলগুলো থেকে টুপটাপ পানি ঝড়ছে। ঠোঁটে লাজুক হাসি, মাথা নিচু করে আছে। সাইফ উপুড় থেকে চিৎ হয়ে শুয়ে পড়লো। অদিতির হাত ধরে হ্যাচকা টান মেরে নিয়ে এলো নিজের বুকে। কম্ফর্টার দিয়ে মুড়িয়ে নিলো অদিতিকে সহ।

“কাজ সেরে একটু শুয়ে বসে থাকতে পারো না? খালু টইটই করো এদিক ওদিক। আমাকেও তো একটু ভালো বাসতে পারো অবসরে। হু?”

অদিতি জবাব দিলো না। গুটিশুটি মেরে শুয়ে রইলো সাইফের বুকে।


ধরনীর বুকে রাত নেমেছে। দোতলার বারান্দার রেলিং ধরে এক মনে বাইরের আকাশ দেখছে ফুলমালা। আজ দুইটা দিন হলো তুযা কে দেখে না। বুকের ভিতর হাহাকার জমে থাকে সবসময়। চাপদাড়ি ওয়ালা সেই চওড়া মুখটা ছুঁয়ে দেখার আশা জাগে বারবার। মনকে সংযত করতে চেয়েও পারে না। আজ পাত্রপক্ষ এসে দেখে গেছে। পছন্দও হয়েছে তাদের। কাল দিন তারিখ ঠিক হবে। তুযা কে যে করেই হোক একটা খবর পাঠানোর ব্যাবস্থা করতে হবে। কিন্তু কি করে? এখন কাদলেও তারা বাবা তাকে বাইরে যেতে দেবে না। আর তুযা দের বাড়ি বেশ দূরেও। ইচ্ছে করছে ছুটে পালিয়ে যেতে। ঘরের ভিতর থেকে ফুলমালার বাবার গলা শোনা যায়
“মালা, ও মালা”

ফুলমালা চোখ জোড়া মুছে নিলো শাড়ির আঁচলে। পিছনে ফিরলো থমথমে মুখে। ওর বাবার মুখটা খুউব উচ্ছ্বসিত লাগছে।
“মা রে, হাফিজ সাহেব খবর নিয়ে এসেছে। তোদের বিয়ে সামনে যে শুক্রবার, তার পরের শুক্রবারে। তুই ম্যালা সুখী হবি রে মা। ম্যালা সুখী”

ফুলমালা কথা বলল না। বাবা চলে গেলো আবারো। বাইরে ঝমঝম করে বৃষ্টি পড়ছে। ফুলমালা ডুকরে কেঁদে উঠলো
“আপনি কোথায় তুযা ভাই? কোথায় আপনি? আপনার ফুল যে পুইড়া যাইতেছে তুযা ভাই। আপনে আমারে লইয়া যান।”
কাদতে কাদতে মেঝেতে বসে পড়লো ফুলমালা।

আপনাদের কিছু কথা বলি। আমি কি একবারও বলেছি? যে বাঁচায় বন্দী ফুল শেষ। অনেকেই আপনারা ভাবছেন যে এটা শেষ। আপনাদের বলি, এটা শেষ না। আরো বেশ কতগুলো পর্ব আসবে। আর কাল থেকে আসছে বাইজিদ শাহ্ আর মেহেরুন্নেসা তাদের গল্প নিয়ে। খাঁচায় বন্দী ফুলও চলবে। ভাববেন না এটা বন্ধ রাখবো বা কয়েকদিন পরপর দিবো। আমি নিয়মিত কতটা সেটা আপনারা জানেন। তাই ভরসা রাখবেন। আর অবশ্যই রিয়্যাক্ট দিবেন এবং একটি কমেন্ট করবেন 🤍🫶

আপনাদের সাপোর্ট ই আমাকে অনুপ্রেরণা জোগায়। কথাটা মনে রাখবেন। 🤍🫶
তুযা কে ঘরে তুলছেন তো 😌

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply