Golpo কষ্টের গল্প খাঁচায় বন্দী ফুল

খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ৪৮ এর শেষাংশ


খাঁচায়বন্দীফুল

jannatul_ferdous_জান্নাতুল_ফেরদৌস

৪৮ এর শেষাংশ

দীঘি কলেজে অ্যাপ্লাই করার পর থেকে বেশ বিন্দাস লাইফ কাটাচ্ছিলো। কোনো পড়াশোনা নেই কিচ্ছু নেই। মাধ্যম পরীক্ষার পর থেকেই এই সুন্দর জীবন টা উপভোগ করলো সে। কিন্তু সেসব কে পিছনে ফেলো সময় এগিয়ে চলছে। চলে গেছে কয়েকটা মাস। দীঘির কলেজে এডমিশন হয়ে গেছে। আজ থেকে কলেজে যেতে বলেছে তার বাবা। রেডি হয়ে সোফায় বসে ঝিমাচ্ছে দীঘি। অদিতি ভেজা চুল ঝাড়তে ঝাড়তে নিচে এলো। দীঘিকে ঝিমুতে দেখে বলল
“কি হলো আপু? খাচ্ছো না কেনো?”

দীঘি নিভু নিভু চোখে বলল
“ স্যালাড এ একটু বিষ মিশিয়ে দাও ভাবি।”

“কি সব উদ্ভট কথা বলছো বলোতো। তুমি না কত চাঙ্গা। ওমন নেতিয়ে পড়লে কেনো?”

“আমার কলেজ যেতে ভাল্লাগে না ভাবি।”

“কখনো কি গিয়ে দেখেছো? কেমন লাগে বুঝলে কি করে। প্রথম দিন, যাও সুন্দর মতো বেড়িয়ে পরো।”

অদিতি কিচেনে যেতে যেতে বলল
“পাশের ফ্ল্যাটে খুব গন্ডগোল চলে। কাল ছাদ থেকেও আওয়াজ পেয়েছিলাম, আবার সকাল সকাল পুলিশের গাড়ি ঢুকলো দেখলাম”

দীঘি হচকচিয়ে উঠলো
“ঝামেলা লাগছে?
আগে বলবা তো।
আমার ঝামেলা দেখতে যেই ভালো লাগে, কি বলবো। দাড়াও চেয়ার আর এক প্যাকেট পপকর্ন নিয়ে আসি। আমি আর আজ কলেজ যাচ্ছি না হু। আমি ছাদে গেলাম। তুমি কোল্ডড্রিং নিয়ে এসোওওও”

দীঘি এক দৌড়ে চলে গেলো ছাদে। অদিতি হতবাক দীঘির কান্ডে। মেয়েটা কী ধাতু দিয়ে তৈরি আল্লাহ ই জানে। ওদিকে সকাল থেকে অদিতির অদিতির সাথে কথা বলার চেষ্টা করছে। কিন্তু অদিতি রেগে মেগে একসার। রাগের কারণ টা হলো গতকাল এক মেয়ে এমপ্লয়ির সাথে ফেসবুকে ছবি দেখেছে সাইফ এর। তাও আবার দীঘি দেখিয়েছে অদিতিকে। সাইফ বলেছে একটা পার্টিতে মেয়েটা এসেছিলো একটা সেলফি রিকুয়েষ্ট করতে। সাইফ ব্যাস তার ক্যামেরার দিকে একটু তাকিয়ে মুচকি হেসেছিলো। কিন্তু দীঘি এমন একটা পারসো, সে দিনকে রাত বোঝাতেও সক্ষম। নিশ্চিত অদিতির মাথায় এই নেগেটিভ চিন্তার ভূতটা ওই ঢুকিয়েছে।

ছাদের কোণা ঘেষে উঁকি ঝুকি দিচ্ছে দীঘি। দ চেষ্টা করছে কোনো ভাবে দেখা যায় কিনা। আচমকাই পিঠে দুম করে এক কিল পড়লো। দীঘি চমকে পিছনে তাকালো। অগ্নিমূর্তি হয়ে তাকিয়ে আছে সায়রা। অদিতির থেকে শুনেছে দীঘি কলেজে না গিয়ে ছাদে এসেছে পাশের ফ্ল্যাটের ঝামেলা দেখতে। পিঠে হাত বুলাতে বুলাতে মুখ ভার করে নিচে আসলো দীঘি। ব্যাগ টা কাঁধে ঝুলিয়ে বেড়িয়ে গেলো কলেজের জন্য।
বাড়ির লোক গুলো বড্ড স্বার্থপর হয়ে যাচ্ছে। হ্যাপিনেস গুলো আর বুঝছে না।

অদিতি রুমে গেলো সাইফ কে ডাকতে। বেলা দশটা বেজে যাচ্ছে, এখনো ওঠার নাম নেই। কিন্তু রুমে গিয়ে দেখলো সাইফ উঠে গেছে, উঠে তো গেছেই রেডিও হয়ে নিয়েছে। অদিতি ফোনটা নিয়ে বিছানায় বসলো। সাইফ আয়নায় তাকিয়েই বলল
“রেডি হয়ে নাও বউ। ঘুরতে নিয়ে যাব”

অদিতি পিটপিট করে তাকিয়ে বলল
“ঘুরতে মানে?”

“বাইকে ঘুরতে নিয়ে যাবো চলো। শাড়ি পরে যাবে?”

অদিতি মোবাইল রেখে এগিয়ে আসে
“বাইক কোথায় পেলেন?”

সাইফ ঘড়ি পরতে পরতে এগিয়ে এসে বলল
“আমার তিনটা বাইক”

“কখনো দেখিনি তো”

“কখনো গ্যারেজে যাও? যে দেখবে? যাও জলদি শাড়ি পরে নাও। মেরুন শাড়ি পরো বউ। সেদিনের মতন, যেদিন মায়ের দেওয়া মেরুন শাড়িতে তোমায় প্রথম দেখেছিলাম। উফফ আমি তো ফিদা হয়ে গেছিলাম”

অদিতি লজ্জা পেলো একটু। মাথা নিচু করে বলল
“আপনি একটু বেশি বেশিই বলেন”

“আমার বউ, আমি বলতেই পারি। যাও দ্রুত রেডি হও”

অদিতি সেই শাড়িটাই পরলো যেটা আঞ্জুমান সেদিন দিয়েছিলো। শাড়ি পরা টা নদী থাকতেই শিখে নিয়েছে। আজ চুল খুলল না। খোপা বাধলো। মাথা জোরা বড় খোপা হলো। সামনে কপালের কাছে ছোট চুল গুলো মাঝখান থেকে ভাগ করে দুদিকে করে দিলো। ঠোটে লাগালো অল্প পরিমাণে পিংক লিপিস্টিক। হাতে সাইফের দেওয়া চিকন দুইটা স্বর্নের চুড়ি চিকচিক করছে। গলায় পাতলা একটা চেইন। ব্যাস এটুকুতেই রমনী কে অপরুপা লাগছে।

আগাগোড়া পরখ করলো সাইফ। অদিতি ভ্রু উচিয়ে বোঝালো, কেমন লাগছে?
সাইফ অবিলম্বে বুকে হাত চেপে ধরে চোখ বন্ধ করে কপাল কুচকালো। অদিতি হাসলো, সাইফও হেসে ফেললো। নিজের বাহু অদিতির দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল
“যাওয়া যাক”

অদিতিও স্বামীর বাহু নিজের বাহু দিয়ে জড়িয়ে ধরলো। দুজনে বেড়িয়ে এলো ঘর থেকে। নিচে নামতেই তাদের খুশি খুশি মনটা ফাটা বেলুনের মতো ফুস হয়ে যায়। ড্রইং রুমে ১০-১২ জন পুলিশ গমগমে পায়ে ঢুকলো। বাড়ির চারিদিকে তারা দেখতে থাকে। সাইফ এগিয়ে যায় তাদের দিকে।
“কি ব্যাপার অফিসার? সব ঠিক আছে তো?”

অফিসার সাইফের দিকে তাকিয়ে সন্দিহান চোখে জিজ্ঞেস করলো
“আপনি কে?”

“সাইফ চৌধুরী”

“হাবিব চৌধুরী আপনারা বাবা?”

“না। আমার বাবা হাসান চৌধুরী। হাবিব চৌধুরী আমার কাকা। কোনো প্রবলেম স্যার?”

“অনেক বড় প্রবলেম মি. সাইফ। ডাকুন। আপনার গুনধর কাকা কে ডাকুন”

সাইফ অদিতিকে ইশারা দিলো হাবিব কে ডেকে আনতে। অদিতি গেলো হাবিবের ঘরে। সাইফ তাদের উদ্দেশ্যে বলল
“বসুন আপনারা”

“আমরা বসতে আসিনি”

মিনিট পাঁচেক অতিক্রম হওয়ার পরেও তারা আসছে না। ওসি হাতের ঘড়ি দেখছে বারবার। হঠাৎ একজন কনস্টেবল বলল
“স্যার ওইযে গাড়ি বেড়িয়ে যাচ্ছে বাড়ি থেকে”

“ওহ নো”

সবাই হুরমুড়িয়ে দৌড় লাগালো গাড়ির পিছ পিছ। কিন্তু তারা সদর দরজা পার হওয়ার আগেই গাড়ি বেড়িয়ে গেলো। কনস্টেবল রাও গাড়িতে উঠলো। সাইফ তাদের পিছু পিছু গেলে অফিসার বলল
“ওনাকে ধরতে না পারলে, আপনাদেরও ছেড়ে কথা বলবো না”

সবাই গাড়িতে উঠে পিছু নিলো হাবিবের গাড়ির। অদিতিও দৌড়ে বাইরে আসে। সাইফের বাহুতে হাত রেখে বলল
“কি হলো বলুন তো? কাকা কে যখনই বললাম পুলিশ এসেছে, আপনার সাথে দেখা করতে চায়। কাকা ওইপাশের দরজা দিয়ে দৌড়ে বেরিয়ে গেলো”

সাইফ চিন্তিত হয়ে তাকিয়ে রইলো সড়কের দিকে
“আমিও তো বুঝতে পারছি না। কি হলো বলোতো। চলো বাড়ির ভিতরে চলো। কাকিয়া কে জিজ্ঞেস করি”

সায়রা রুমে বসে বসে কাঁদছে। অদিতি আর সাইফ যেতেই কান্নার তোপ আরো বাড়লো। সাইফ ও সায়রার পাশে মেঝেতে বসে পড়লো। সায়রা সাইফকে জড়িয়ে ধরে কেঁদেই চলেছে।
“কাকিয়া? কাকিয়া শান্ত হও। কি হয়েছে? আমাকে খুলে বলো সব। কি করেছে কাকা?”

সায়রা কাঁদতে কাঁদতে বলল
“তোর কাকা টাকার লোভে অবৈধ ব্যাবসায় জড়িয়ে ছিলো রে বাবা। এখন আমি কি করবো? আমার মেয়েটার কি ভবিষ্যত হবে? ও সাইফ তুই কিছু কর বাবা”

সাইফ বোঝে না সায়রার কথার আগা মাথা।
“কি ব্যাবসায় জড়িয়েছিলো? কি করেছে কাকা?”

“ড্রাগস এর ব্যাবসা করতোওওওও”

সাইফ আর অদিতি যেনো আকাশ থেকে পড়লো। বাড়ির মধ্যে থেকে হাবিব এমন কাজ করেছো আর তারা জানতেও পারো নি?
“কবে থেকে এমন চলছে কাকিয়া? আর আগে কেনো বলোনি আমাদের?”


মানিক কে কবর দেওয়ার পর সারা রাত তুযা কবরস্থানে কাটিয়েছে। সবাই কত করে অনুরোধ করলো বাড়ি ফিরতে। কিন্তু ফিরলো না। কার সাথে বাড়ি ফিরবে? একা কোনো দিনও ফিরেছে নাকি? সবসময় তো সাথে মানিকও থাকতো। কত দুঃখের সঙ্গী ছেলেটা। সকাল হয়ে বেলা উঠলে তুযা বাড়ি ফিরলো। সারা গায়ে মাটি লাগানো। অনেকটা সময় নিয়ে গোসল করলো। মানিকের মা সকালে এসে কবরের পাশে পরে অনেকক্ষণ কেঁদে গেছে। তুযা গোসল করে এসে বসার ঘরে সোফায় বসলো। লতিফা বেগম পাশে বসে বললেন
“ফুলের বিয়া ঠিক হইছে। আইজ পাকা কথা হইবো।”

তুযা বিরক্তি তে চোখ বুজে নিলো। সব সমস্যা এক সময়ে এসেছে জীবনে। কপাল কুচকে বলল
“খবর দিলো কে?”

“সকালে হান্নান পত্র নিয়া আইছে। কইলো আইজ পাকা কতা কইতে আইবো। আমি না কইরা দিছি। কেউ যাইতে পারবো না”

তুযা কিছুক্ষণ চুপ করে রইলো চোখ বন্ধ করে রইল। হঠাৎ বলল
“আমি যাবো”

লতিফা একটু অবাক হলো তুযার কথায়। কাঁধে হাত রেখে বলল
“তোর যাওন লাগবো না বাপ। তোর নাই মাথা-টাথা ঠিক এহন। কি কইতে কি কবি। বুঝস ই তো মাইয়া ডার বিয়া।”

তুযা শুনলো না। দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল
“আমার যাইতে হইবো মা। ফুল আমার অপেক্ষায় থাকবো”

আর দেরি না করে উঠে গেলো তুযা। ঘরে গিয়ে পাঞ্জাবি পরে বেরিয়ে গেলো। লতিফা অনেকবার বারণ করলেও শুনলো না। জিপ নিয়ে রওনা হলো ফুলমালার বাড়ির উদ্দেশ্যে। খানিক পথ গিয়ে বাজার দেখে জিপ থামালো। কিনে নিলো কিছু ফলমূল মিষ্টি। এতবছর পর যাচ্ছে, কিছু না নিয়ে গেলে হয়? সাথে ফুলমালার জন্য নীল রঙা একখানা শাড়িও নিলো। ফের জিপ ছুটিয়ে চলে গেলো ফুলমালাদের বাড়িতে। গাড়ি গিয়ে থামলো দোতলা বাড়িটার সামনে। আগের যুগের ছোট্ট দোতলা বাড়ি। জিপ থামতেই চোখে পড়লো বাড়ির আঙিনায় আরো কিছু গরুর গাড়ি। বুঝলো পাত্রপক্ষ এসেছে। তুযাকে দেখে দৌড়ে আসে ফুলমালার আইবুড়ো কাকা। বয়স ৫০ পেরিয়ে গেছে। বিয়ে করেনি এখনো।

তুযা কে জাপটে ধরে সে কি আদর
“বাপজান তুমি আইছো? কত্ত বছর পর আইলা এই গরীবের বাড়িতে। আহো আহো, ম্যালা ভালো দিনে আইছো। ফুলের হশুর বাড়ি থিকা লোক আইছে। ভিতরে কথা কইতাছে। আসো আসো”

জিনিস গুলো জিপ থেকে উনিই নিলেন। তুযা জোর করলো অবশ্য নিজে নিতে, বয়স্ক মানুষ এতকিছু নিতে কষ্ট হবে। কিন্তু উনি দিলেন না কিচ্ছু তুযার কাছে। তুযা ভিতরে ঢুকলো। বসার ঘরের সোফায় ৮-৯ জন লোক। ফুলমালা একটা চেয়ারে গুটিশুটি মেরে বসে আছে মাথা নিচু করে। খয়েরী রঙের একটা শাড়ি পরে, মাথায় বড় করে ঘোমটা টেনে বসে আছে। তুযা কে ঢুকতে দেখেই ফুলমালার বাবা উঠে দাড়ালেন
“আরে আব্বাজান তুমি? আসো আসো। আমার কত্ত বড় সৌভাগ্য।”

বাবার কথায় মাথা তুলে তাকালো ফুল মালা। চোখাচোখি হলো তুযার সাথে। সাদা পাঞ্জাবির হাতা গোটাতে গোটাতে এগিয়ে আসছে। দাড়ি গুলো আগের থেকে বেশ বড় হয়েছে। চোখের নিচে কেমন কালসিটে দাগ জমেছে। ফুলের চোখ চিকচিক করে ওঠে। আনন্দ অশ্রু তে ভিজে ওঠে তার নেত্রপল্লব। সে জানতো, তুযা ভাই তার বিয়ের খবর শুনে ঠিক ছুটে আসবেন। মুখে মুখেই শুধু বলে ভালোবাসে না, মনে মনে ঠিকই বাসে। অবুঝ কিশোরি কান্না আড়াল করতে ফের ঘোমটার তলে লুকায়। ফুলমালার বাবা গর্ব করে পাত্র পক্ষের সাথে তুযার পরিচয় করিয়ে দেয়
“ও হলো আমার ভায়রা ব্যাটা। ফুলহারা গ্রামের প্রধান ওয়াহাব চৌধুরীর ছেলে। তুযাউন চৌধুরী।”

পাত্রের বাবা উঠে দাড়িয়ে তুযার সাথে কুশল বিনিময় করে। প্রধান দের ক্ষমতা প্রতিপত সম্পর্কে তারা অবগত। আরেকটা চেয়ার এনে দিলে তুযাও বসলো। কিন্তু ফুলমালা বড় অবাক হচ্ছে তুযার এমন শান্ত ব্যাবহারে। নিশ্চয়ই তার ভিতরে ভিতরে গভীর কোনো পরিকল্পনা চলে। ফুলমালা ঘোমটা তুলে আড় চোখে দেখে তুযা কে। তুযা ও ওর দিকেই তাকিয়ে আছে।

আমি সর্বোচ্চ চেষ্টা করি যত তারাতাড়ি আপনাদের পছন্দের গল্প দেওয়া যায়। অনেকটা সময় লাগে লিখতে 😑
অবশ্যই সুন্দর একটি কমেন্ট করে আপনাদের মতামত জানাবেন। আমি শুধু আপনাদের জন্যই লিখি বই আসার পরেও। তাই আপনারাও আমার সঙ্গ দেবেন। সবাইকে অনেক অনেক ভালোবাসা। নন ফলোয়ার পাঠক রা ফলো করে রাখবেন। অনেকে ইনবক্সে বলে যে গল্প খুঁজে পায় না। ফলো দিয়ে রাখুন, গল্প একাই আপনার ফিডে চলে যাবে।
আর নূর-এ-সাহাবাদ কেমন লেগেছে আপনাদের?

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply