খাঁচায়বন্দীফুল
jannatul_ferdous_জান্নাতুল_ফেরদৌস
৪৬ এর শেষাংশ
সন্ধ্যা থেকে সাইফ রিশার সাথে সাদে বসে গল্প করছে। অদিতি কফি দেওয়ার অযুহাতে একবার গেছিলো দেখতে, ওরা কি কথা বলছে। কিন্তু সাইফ অদিতিকে নিচে চলে যেতে বলেছে। অদিতি কিচেনে রান্না করছে আর বারবার সিড়ির দিকে তাকাচ্ছে। রাত হয়ে গেলো তাও দুটো নামছে না। রাগে অদিতির কান্না চলে আসছে যেনো। টুনটান শব্দে পাশে থাকা ফোনটা বেজে উঠলো। অদিতি ফোন হাতে নিয়ে দেখলো অপরিচিত নম্বর। রিসিভ করে কানে নিতেই ওপাশ থেকে ভেসে আসে পরিচিত কন্ঠস্বর
“বুড়ি। ভালো আছিস?”
“মাহিদ ভাই”
অদিতির চোখ জোড়া চিকচিক করে ওঠে। ভাইয়ের মতো করে বড় করা সেই মাহিদ। কাকির ভয়ে লুকিয়ে মজা কিনে দিতো। স্কুলে যাওয়ার পথে দাঁড়িয়ে থাকতো কাকির ভয়ে। টিফিন এর টাকা টা আলগোছে হাতে গুজে দিতো। অদিতির গলা ধরে আসে
“কেমন আছো মাহিদ ভাই?”
“আমি ভালো আছি বুড়ি। তুই কেমন আছিস?”
“আমিও খুব ভালো আছি। তুমি আমার নাম্বার কি করে পেলে?”
“তোর সই লতা, ও এনেছিলো প্রধান বাড়ির বড় মার কাছ থেকে। লতার বোন প্রিয়তার বিয়ে হয়েছে আবার রহিম চাচার ছেলের সাথে। ওর কাছেই শুনলাম তোর চৌধুরী বাড়ির ব্যাটার সাথে বিয়ে হয়েছে।”
“তোমাদের কতদিন হলো দেখি না ভাই। তোমাদের কথা আমার ভীষণ মনে পরে। এসো একদিন আমাদের বাড়ি”
“ সেদিন কল দিয়েছিলাম। তোর স্বামী খুব খারাপ ব্যাবহার করেছে আমার সাথে। সে বাড়ি কি করে যাই বল। কই শশুড় বাড়ি আসলি, দেখা করলি না তো ভাইয়ের সাথে।”
“আসলে ভাই আমার দাদি শাশুড়ী মারা গেছিলো। এমন সময় গেছি। তাই দেখা করা হয় নি। আর ও তোমায় চিনতে পারেনি। তাই আরকি……”
ওপাশ থেকে কিছু বলার আগেই কেউ কাঁধে হাত রাখলো অদিতির। অদিতি চমকে পিছনে তাকায়। ফুলমালা অবাক হয়ে বলল
“ও মা ভাবি। ডরাইছেন? ক্ষমা করেন, আমার ডাক দিয়া আসা উচিত আছিলো।”
অদিতি ফোনে বলল
“ভাই পরে কল করছি”
ফুলমালা বলল
“ও ভাবি, তোমার সোয়ামী ওই ছেড়ির সাথে কি কটে গো। হায় আল্লাহ, দেখো আন্ধার হইয়া গেছে বাইরে। দুই ছ্যাড়া – ছেড়ি অহনো ছাদে। কিছু কও না ক্যান তুমি?”
অদিতির চোখ ভরে আসে পানিতে। হাতের উল্টো পিঠে মুছে আবার সবজি কাটায় মন দিলো। ফুলমালা সিড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলো দীঘি কানে হেডফোন দিয়ে ছাদের দিকেই যাচ্ছে।
মুখোমুখি নেমে এলো রিশা আর সাইফ। দীঘি ওদের সামনে দাড়িয়ে ভ্রু কুচকে বলল
“তোমরা কোথায় ছিলে?”
রিশা রেগে বলল
“ছোট, ছোটোর মতো থাক। এত পাকনামি কিসের?”
দীঘি কড়া চোখে তাকালো একবার সাইফের দিকে। রিশা নিচে চলে গেলো। সাইফ গেলো নিজেদের রুমে। অদিতি রান্নাবান্না শেষ করে ঘরে গেলো ঘন্টা খানেক পর। সাইফ ব্যালকনি তে বসে মোবাইল চাপছে। অদিতি ফ্রেশ হয়ে চুল আঁচড়াচ্ছে। সাইফ পিছন থেকে জড়িয়ে ধরলো এসে। ঘন চুলে মুখ ডুবিয়ে হিসহিসিয়ে বলল
“আজ তোমাকে ভীষণ আবেদনময়ী লাগছে”
অদিতি এক ঝটকায় সরিয়ে দিলো সাইফ কে। সাইফ অবাক হলো না মোটেও। জানতো এমন আচরণ করবে অদিতি। তবে এতোটাও যে রেগে যাবে ভাবে নি। ফের জড়িয়ে ধরলো অদিতির কোমড়। অদিতি নিজেকে ছাড়ানোর জন্য ছুটাছুটি করতে লাগলো। কথা বলতে গিয়ে কেঁদে ফেললো
“ছেড়ে দিন আমাকে। ছাড়ুন। আমার কেউ নেই দুনিয়াতে। তাই এমন করেন আমার সাথে। কই আমার বেলায় তো এমন হয় না। কলেজের একজন শুধু ফোন করেছিলো তাই আমাকে আপনি…….। ছেড়ে দিন আমায়। কালই চলে যাবো আমি বাড়ি ছেড়ে”
“কোথায় যাবে?”
“যেদিকে দুচোখ যায়। তবুও এই সংসারে থাকবো না আমি। আমার স্বামীর ভাগ আমি কাউকে দিবো না। প্রয়োজনে আমিই চলে যাবো। আপনি যার সাথে যা খুশি করিয়েন। কিচ্ছু বলবো না”
“যদি বলি দরকারের জন্য, বিশ্বাস করবে?”
“না, করবো না। আপনি সরুন”
সাইফ অদিতির কপালে কপাল ঠেকিয়ে নিচু স্বরে বলল
“আমায় বিশ্বাস করো বাচ্চা বিড়াল টাহহ। আমি আমার বউ ছাড়া কারও দিকে তাকাই না। আমি দাদাভাই এর জন্য এমনটা করছি। তুমি…..”
“কি দরকার আগে বলুন আমায়।”
“কাওকে বলবে না বলো”
“বলবো না”
—
রান্নার ঝাঁঝে কাশতে কাশতে উঠল তুমুল। চোখ মুখ কুঁচকে কাশতে কাশতে বিছানা থেকে নিচে নামলো। হাত মুঠো করে মুখে চেপে ধরে গেল রান্নাঘরে। নদীকে পেছন থেকে বলল
“ কি রান্না করছো? ঘুমাতে পারছি না তো”
নদী কথা বলল না। রান্না করতে ব্যস্ত। তুমুল এগিয়ে গিয়ে পিছন থেকে জড়িয়ে ধরলো। ঘাড়ে থুতনি ঠেকিয়ে বলল
“এই বউ। সংসার করতে ভালো লাগছে না তোমার? বলো”
নদী মুচকি হাসলো
“লাগছে তো।”
“তাহলে মন খারাপ কেনো?”
কথা বলতে বলতে আবার কাশতে শুরু করলো তুমুল। নদী বলল
“যান ঘরে যান। আমি আসছি”
তুমুল যেতে যেতে বলল
“তারাতাড়ি এসো”
সকালে বাজার থেকে ফিরছে তুযা। আক্কাস মাষ্টারের বাড়ি গাছ-পালা কাটা হচ্ছে। বাড়ি ভাঙা হচ্ছে। অনেক মানুষ জন সেখানে। একজন ভদ্র সভ্য কোট প্যান্ট পরা লোক কে দেখা গেলো মোটা এক খাতা হাতে। কপাল ঘেমে একাকার। এতদিন এ বাড়িতে একটাও কুত্তা পর্যন্ত দেখা মেলেনি। আজ এত লোক। তুযা লুঙ্গির কুচি ধরে এগিয়ে গেলো লোকটার কাছে
“এই যে ভাই।”
লোকটা রুমাল দিয়ে কপাল মুছে বলল
“কিছু বলবেন? সময় নেই ভাই আমার হাতে। এখন শুনতে পারবো না”
মানিক চেতে গেলো লোকটার ওপর
“ওই মিয়া! জানো এইডা কে? আমগো ছুডো সাহেব। প্রধান বাবুর ছাওয়াল। একদম কাইট্টা রাইখা দিমু এলাকায়”
তুযা হাত ইশারা করে থামালো মানিক কে। লোকটা শুকনো ঢোক গিলল। তুযা নরম গলায় বলল
“এখানে কি হচ্ছে বলুন তো। বাড়িটা ভাঙা হচ্ছে কেন?”
“বাড়িটা আমার স্যার কিনে নিয়েছেন। এখানে ফার্ম করা হবে। গরুর ফার্ম”
তুযার কপালে সূক্ষ্ম ভাজ পড়লো।
“কে বেচেছে এই বাড়ি? বাড়ির মালিক তো শুনেছি মারা গেছে কয় বছর আগেই”
“বাড়ি, ওনার মেয়ে মিস জোৎস্না বাড়িটা বিক্রি করেছেন”
তুযার শ্বাসপ্রশ্বাস স্বাভাবিক থেকে থমকে গেলো হঠাৎ। জোৎস্নার ব্যাপারে কারো থেকে প্রথম বার শুনছে। এক ধ্যানে তাকিয়ে রইলো লোকটার দিকে।
“কে বেচেছে?”
লোকটা বেজায় বিরক্ত হলো। এক কথা বারবার জিজ্ঞেস করছে লোকটা। বিরক্তি নিয়েই বলল
“মিস জোৎস্না”
“মিস? মিসেস হবে”
লোকটা খাতার ভাজ থেকে ফর্ম টা বের করো তুযার সামনে ধরলো।
“দেখুন ওনার সাইন”
তুযা থাবা দিয়ে কাগজ টা নিলো হাত থেকে। স্পষ্ট জোৎস্নার সই। ওর স্বামীর পরিচয় নেই কেনো? গোটা ফর্মে সব ধরনের বায়োডাটা থাকলেও জোৎস্নার স্বামীর কোনো নাম গন্ধ নেই। কপাল কুচকে তাকালো লোকটার দিকে
“আচ্ছা ওনার স্বামী রে চিনেন আমনে?”
“তার স্বামী কে কী করে চিনবো বলুন? মনে তো হয় স্বামী নেই। নইলে কেউ মিস লিখতো না”
তুযা কাগজ টা বাড়িয়ে দিয়ে বলল
“ওর তো বিয়ে হয়ে গেছিলো।”
“হয়তো ডিভোর্স হয়ে গেছে।”
তুযার বুকের ভিতরের যন্ত্রণা ধীরে ধীরে বাড়তে লাগলো। পা দুটো নড়ছে না। ফর্মে তার বাড়ির এ্যাড্রেস টা নেই। শুধু ঢাকা দোওয়া ঠিকানা। এত বড় ঢাকার শহরে কাওকে খোঁজা যায় নাকি? লোকটা চলে যেতে নিলে তুযা আবার টেনে ধরলো
“ওওও ভাই। ভাই একটু বলেন না, ওর বাড়ি কই?”
লোকটা তুযার মুখের অস্থিরতা স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে।
“আমি তো জানি না ভাই। আমি তো আমার স্যারের নির্দেশে এখানে এসেছি। আর কিছু তো আমি জানি না ভাই”
তুযার চোখ দুটো চিকচিক করে উঠলো। এ কেমন দোটানা। রবের কাছে চাইলো ভুলে যেতে, আর সে তাকে ফের দোটানার মুখে ফেলে দিলো। এক দিকে ভুলে যাওয়ার যুদ্ধ, অন্যদিকে ফিরে আসার প্রার্থনা। মানিক তুযা কে ধরে নিয়ে গেলো বাড়ির দিকে।
“ভাই আমনে আর এসব ভাইবেন না তো কইলাম। যে গেছে সে তো গেছেই। তারে মনে রাইখা কি করবেন? ক্যান তার খোঁজ নেওনের চেষ্টা করেন”
তুযা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল
“পাওনের আশা ম্যালা আগেই ছাইড়া দিছি রে। গোপনে খোঁজ নেওয়া টা অভ্যাস।”
তুযা চুপচাপ হাটছে। কিছুক্ষণ পর বলল
“ওর যদি বিয়া হইয়া থাকে তাইলে ওর স্বামী কই? আর যদি বিয়া নাই হইয়া থাকে, তাইলে এতদিন কই রইছে। একবারও তো গেরামে আসে নাই”
“সাধারণ একটা কথা নিয়া এত ক্যান ভাবতেছেন ভাই কন তো। বাদ দেন না। হের বিয়া হইয়া গেছে, অহন ভালো থাকুক”
চালার পাড়ের বাশের মাচালে বসলো ওরা। মানিক সিগারেট ধরিয়ে দিলো ঠোঁটে। তুযা ধোয়া ফুকে বলল
“ওরে শ্যাষ বারের মতো হইলেও একবার দেখবার চাই রে মানিক। ওরে আমার দুই তিন ডা কথা কওনের আছে”
“কিচ্ছু কওন লাগবো না ভাই। ভুইলা যান না ক্যান হেরে?”
মানিকের চোখ ভিজে উঠে কথা বলতে গিয়ে। তুযার সাথে চলতে চলতে কী যে ভক্ত হয়ে গেছে তার। সুখে-দুঃখে আপদে বিপদে, রাত-বিরেত নেই তুযার সব দরকারে ছোটে সে। তুযা মানিকের কাধে কনুই ঠেকালো।
“বুঝলি মানিক, ওয় যদি ডিভোর্সিও হয় বা বিধবা ও হয়। তাও আমি ওরে গ্রহণ করতে রাজি।”
“আর ফুল আপা?”
তুযার গাঢ় ভাবনায় ছেদ ঘটালো। ফুল এর ব্যাপারে ভাবাই হয় নি আর। মুচকি হেসে বলল
“নিয়তি এমন ক্যান রে মানিক। যারে আমি চাই, সে বিবাগী। আর যে আমারে চায়, আমি তার হইতে পারতেছি না। দুনিয়ায় এত অমিল ক্যান রে মাইনসের মধ্যে। যে যারে চায় তারে পাইতে পারে না?”
চালার বাতাসে তুযার চুল গুলো উড়ছে। মাচালে শুয়ে পড়লো। আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল
“মানিইইইক।”
“জ্বি ভাই”
“আমি মরলে, আমার কবরের পাশে রোজ আইবি তুই। আর যদি কোনো দিন জোৎস্নার দেহা পাস, ওরে বলিস। আমি ওরে দেখার আকাঙ্খা বুকে লইয়াই নাই হইয়া গেছি। ওরে আমার কবর দেহাইতে লইয়া যাইস একদিন”
“ভাই আমনে এমন কইয়েন না তো। আমার কান্দন আহে”
মানিক চোখ মুছছে বারবার। তুযা মানিক কে কাঁদতে দেখে হো হো করে হেসে উঠলো।
“পাগলা চুদা কান্দিস না। যা একটু নাচ দেখা”
চলবে?
আপনাদের কনটেস্টের কথা মনে আছে তো? বই গিফট দিবো দু’জন পাঠক এবং ফলোয়ার কে। তার জন্য অবশ্যই পেইজ টা ফলো দিয়ে রাখতে হবে।
আর কিছু কথা বলি। আমি জানি আপনাদের পছন্দের গল্প পড়তে আপনাদের ভালো লাগে। কিন্তু আমার বিষয় টাও একটু ভাবুন। ১৪০০-১৬০০ শব্দ লিখতে আমার ৩ ঘন্টার ও বেশি সময় লাগে। আমার তো আর মুখস্থ না, যে গটাগট লিখে ফেলবো এক ঘন্টায়। আমি অন্যদের মতো সপ্তাহে ২ পর্ব দিচ্ছি না। আমি রোজ পর্ব দিই। আপনারা প্লিইইইজ একটু মানিয়ে নিয়েন 🥹।
রিয়্যাক্ট পূরণ করিয়েন প্রিয় পাঠক/পাঠিকা রা। আর অবশ্যই সুন্দর একটা কমেন্ট করবেন যেনো মন ছুঁয়ে যায়য়য়য়য় 😌🫶😩
আমাদের ম্যাসেঞ্জার গ্রুপে আড্ডা দিতে চাইলে ম্যাসেজ দিবেন 😌🫶
Share On:
TAGS: খাঁচায় বন্দী ফুল, জান্নাতুল ফেরদৌস
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ৩৬(প্রথমাংশ +শেষাংশ)
-
খাঁচায় বন্দী ফুল ৩৮ এর শেষাংশ
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ৩০
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ২০
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ২২
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ৩৫
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ৩৮ এর প্রথমাংশ
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ৪০ এর শেষাংশ
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ২৭
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ৭