Golpo কষ্টের গল্প খাঁচায় বন্দী ফুল

খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ৪২ এর শেষাংশ


খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ৪২ এর শেষাংশ

jannatul_ferdous_জান্নাতুল_ফেরদৌস

৪২ এর শেষাংশ

তুমুলের আগমনে আর কেউ খুশি না হলেও শাওনের মা বেশ খুশি হলো। সাথে শাওনের বোনও। আজ তো ভদ্রমহিলা বিয়ে পাকা করে তবেই যাবে। তুমুল মুখে হাসির রেখা টেনে এগিয়ে এলো নদীর কাছে। তুমুল কে দেখে নদী আরও আবেগপ্লুৎ হয়ে পড়লো। চোখের পানি এবার আরো বাধ মানছে না যেনো। নিজের স্বামী সামনে থাকতে অন্য ছেলের নামে গায়ে হলুদ পড়ার মতো দুর্ভাগ্য কারো না হোক মনে মনে প্রার্থনা করছে।

সায়রা এতক্ষণ খুব কাদছিল। কিন্তু যেই তুমুলকে দেখলো, তার কান্নারত মুখশ্রী বদলে গিয়ে রাগে পরিণত হলো। শাড়ির কুচি ধরে এগিয়ে গেল তুমুলের সামনে। দাঁতে দাঁত পিষে বিড়বিড় করে বলল
“এই অভদ্র ছেলে, তুমি এখানে কেন এসেছ? তোমার কি লজ্জা বোধ নেই নাকি? বোঝো যে তোমাকে আমরা পছন্দ করি না, তারপর ও এই বাড়িতে কেন আসো বারবার?”

তুমুলের হাসি আরো প্রশস্ত হলো। দাঁত কেলিয়ে হেসে বলল
“সে প্রশ্নের উত্তরটা আজ নয়, কাল দেবো শাশুড়ি মা। আপাতত সামনে যেতে দিন, আমার বউকে হলুদ দিতে দিন।”

সায়রা কিছু বলার আগেই শাওনের মা এসে বগল দাবা করে সামনে নিয়ে গেল তুমুলকে। সামনে টেনে নিয়ে গিয়ে বলল
“আরে বাবা এসো এসো। তুমি হলুদ দেবে না? তাড়াতাড়ি এসো।”

নদী পিরিতে হাঁটু মুড়ে বসে আছে। চোখ দুটো ভাসছে পানিতে। তুমুল ওর সামনে বসলো। হাত দিয়ে সরা থেকে হলুদ তুলে নিয়ে নদীর গাল স্পর্শ করাতেই নদীর মুখে হাসি ফুটল। তুমুল নদীর গালে ছোয়ানো হাতটা এনে চুমু খেলো। শাওনের মা হেসে আঞ্জুমান কে বলল
“ছেলেটা বেশ লক্ষী তাই না?”

আঞ্জুমান সৌজন্যমূলক হেসে ঘাড় কাত করলো। তার মনের ভিতর নানা সংশয়, চিন্তা। এই ছেলে আবার কোন রকম বিয়ে ভাঙ্গার মতলব নিয়ে ঘোরাঘুরি করছে না তো? নদীর বিয়ের কথা চলছে পর থেকে এই ছেলে আসা যাওয়া লেগেই আছে। আঞ্জুমান মনে মনে ভাবলো
“কথা বলতে হবে ওর সাথে”

হলুদ শেষে গোসল করিয়ে নদীকে নিচে আনা হলো। পার্লারের মেয়েরা আসবে একটু পর নদীকে সাজাতে। দীঘি সোফায় বসে বসে হাই তুলছে।
“কি বালের বিয়ে? কিচ্ছু ইন্টারেস্টিং লাগছে না। ধুররর। এর চেয়ে সিরিয়ালে নায়ক নায়িকার বিয়ে হলেও বেশি এক্সাইটেড থাকি”
ফুলমালা এসে দীঘির পাশে বসলো। দীঘি ফুলমালার কাঁধে মাথা নামিয়ে চোখ বুজে বলল
“হ্যারে ফুল! দাদাভাই এর কাছে কেউ আসলে তোর খুব জ্বলে না রে?”

ফুলমালা কপাল কুচকে বলল
“হ আফা, ম্যালা জ্বলে। আর খালি জ্বলে নাকি। মনে হয় কাচা চাবাইয়া খাই”

দীঘি হাতে তালি দিয়ে উঠে বসলো
“এক্সাক্টলি!”

দীঘির এমন কান্ডে চমকে উঠে ফুলমালা। বুকে থুথু নিয়ে দীঘির দিকে তাকায়। দীঘি ফুলমালার গলা জড়িয়ে ধরে বলল
“আচ্ছা কেউ যদি তোর গা ঘেষে তাহলপ কেমন লাগবে? বা দাদাভাই যদি অন্যকারো সাথে…..”

ফুলমালা গোলগোল চোখ করে তাকিয়ে আছে। বয়সে দুজন সমান হলেও, দীঘির কথার মার-প্যাচের কাছে ফুলমালা নেহাৎ দুধ-ভাত। ধীঘি শুভর দিকে দেখিয়ে বলল
“ওই মাল টা কে দেখতে পাচ্ছিস?”

ফুলমালা শুভ কে একবার দেখে হ্যা সূচক মাথা নাড়লো। দীঘি ফুলমালার কানে কানে বলল
“ওই মাল টা কে একটা শিক্ষা দিতে হবে। আমার কাছে একটা প্ল্যান আছে। চহহহ।”

ফুলমালা টেনে ধরলো দীঘির হাত
“থাকনা আপা। বিয়া বাড়ি, পরে গন্ডগোল হইয়া গেলে সবাই কিন্তু তোমারে খুব বকবো”

দীঘি কিছুটা বিরক্তি নিয়ে বলল
“ধুর বা’ল। এই বালের বিয়েতে থেকে কোনো লাভ আছে? কি হচ্ছে এখানে বলতো। মনে হচ্ছে মরা বাড়িতে বসে আছি। কিছু ইন্টারেস্টিং করতে হবে তো”

ফুলমালা সোফায় গেড়ে বসে বলল
“তাইলে আমার একখান শর্ত আছে। যদি তুমি রাজি থাকো, তাইলে আমি তোমার সাথে আছি”

দিঘি ফুলমালা কে অপাদমস্তক দেখে মনে মনে বলল
“মালটাকে যতটা বোকাচোদা ভেবেছিলাম, আসলে তা না। হেব্বি শেয়ানা আছে”

মুখে বলল
“বল। শুনি কি শর্ত”

ফুলমালা চারিদিকে চোখ বুলিয়ে, দীঘিকে চোখ ইশারা করে দেখালো রিশার দিকে
“ওটা কেউ শিক্ষা দিতে হবে”

দীঘি অবাক হওয়ার মতো চোখ বড় বড় করে বলল
“হ্যাঁ তো দিয়ে দেবো, এতে এত ঢং করে বলার কি আছে?”

“না, তোমার আবার বোন হয়তো। তাই বললাম আর কি”

“তাতে কোন বাল ছেড়া গেছে? এরকম চরিত্রহীন মেয়েকে টাইট দিতে আমার এক বারও ভাবতে হবে না সম্পর্কের ব্যাপারে। সে বন ই হোক আর যে বাল ই হোক”

ফুলমালা কে নিয়ে যেতে যেতে দীঘি বলল
“আগে বল, বাজে চা বানাতে পারিস?”

ফুলমালা খুশি মুখে বলল
“ না আপা, আমি ম্যালা ভালো চা বানাই”
“তাইলে তোরে দিয়ে হবে না। তুই দাঁড়িয়ে থাক, আমি বানাচ্ছি”

দীঘির কয়েক মুঠো কাঁচা মরিচ ব্লেন্ড করে সেটাকে রস করে ছেঁকে নিলো হাতে গ্লাভস পড়ে। তারপর সেটা দিয়ে চা বানালো। ফুল মালা বড় বড় চোখ করে তাকিয়ে আছে। দীঘির চিন্তা ভাবনা যে এত ভয়ানক তা কল্পনাও করেনি। চা টা ফুলমালার হাতে দিয়ে বলল
“যা, চা টা ওই নমুনা টাকে দে”

“তুমি গিয়ে দাও না”
“ওরে ভোম্বল, আমি গেলে সন্দেহ করবে, তুই যা”

ফুলমালা চায়ের কাপটা হাতে নিয়ে এগিয়ে গেল শুভ’র দিকে। শুভ ফোনে কথা বলছিল। ফুলমালা কে দেখে ফোনটা কান থেকে নামিয়ে এক গাল বিটলে হাসলো
“আরে বেয়াইন নাকি? চা নিয়ে যাচ্ছেন? তা কার জন্য নিয়ে যাচ্ছেন?”

ফুলমালা অল্প হেসে বলল
“আপনি খাবেন?”
শুভ ফ্লার্ট করে বলল
“বেয়াইনের মিষ্টি হাতের মিষ্টি চা। না খেয়ে থাকা যায় নাকি? দিন দিন”

শুভ চায়ের কাপটা হাতে নেওয়ার সাথে সাথে সিঁড়ি দিয়ে নেমে এলো তুযা। অগ্নি চোখে তাকিয়ে আছে ফুলমালার দিকে। ফুলমালার দিকে চোখ গরম করে বললো
“কি হচ্ছে এখানে?”

শুভ হেসে তুযাকে বলল
“আরে ভাইজান দেখুন, সুন্দরী বেয়াইন আমাকে মিষ্টি করে চা বানিয়ে নিয়ে মিষ্টি করে হেসে দিলো। আহা কি সুন্দর কি সুন্দর”

তুযা ফুলমালার হাত মুঠো করে ধরলো। দাঁতে দাঁত পিষে বলল
“চল ওদিকে চল”
ফুলমালা বড় বড় চোখ করে তাকালো শুভর দিকে। এভাবে যদি তুযা ওকে নিয়ে যায় তাহলে তো দীঘির প্ল্যানটা পুরো হবে না। ফুলমালা কিছু বলার আগেই তুযা হুরহুর করে টানতে টানতে নিয়ে গেল ফুল মালাকে। ফুলমালা যাওয়ার পরে শুভ চা টা মুখে দিতেই থুথু করে ফেলে দিয়ে চিৎকার করে উঠলো। কি ঝাল কি ঝাল, ঠোঁট জিভ পুড়ছে যেন। ডাইনিং থেকে একটা পানির বোতল নিয়ে দৌড়ে গেল বাড়ির বাইরে।

ঢক ঢক করে খানিকটা গিলে তারপর মুখে ঢালতে লাগলো। মাথা উঁচু করতেই দেখল সামনের দিকে দাঁড়িয়ে আছে বুকে হাত গুজে।
“শোন মন্দির ছাওয়াল। এবারের মত ছেড়ে দিলাম হালকাতেই। পরের বার আমার সাথে লাগতে এলে পাছায় বাঁশ ঢুকিয়ে হাতে হারিকেন ধরিয়ে মাঝ রাস্তায় দাঁড় করিয়ে দিয়ে আসবো হনুমান কোথাকার।”

দীঘি বাড়ির ভেতর চলে গেলো এবার একটু শান্তি লাগছে । এখন রিশার পালা। কিন্তু ফুলমালা কে তো কোথাও দেখা যাচ্ছে না।

অদিতি রুমে হলুদ শাড়ি পরে রেডি হচ্ছে। গোলাপি পাড়ের হলুদ শাড়ির সাথে, পিংক কালার ব্লাউজ। আঁচল ছেড়ে রেখেছে শাড়ির। খোপায় কাচা গাঁদা ফুলের একটা মালা জড়ালো। মুখে কোন মেকাপের প্রলেপ নেই। অল্প করে কাজল, আইলানার এবং ঠোঁটে লিপস্টিক লাগালো। গলার চিকন একটা হার কানে স্বাভাবিক দুটো সোনার দুল। মোটা রুলি দুটো হাতে পড়তে গিয়ে খেয়াল করলো সাইফ দরজা হেলান দিয়ে এক মনে দেখে যাচ্ছে অদিতিকে। দুহাত পকেটের গুঁজে দরজা হেলান দিয়ে তাকিয়ে আছে ড্রেসিং টেবিলের দিকে। চোখে অদ্ভুত এক নেশা। অদিতির মৃদু হেসে চোখ নামিয়ে নিল। চুরি দুটো হাতে পড়ে পিছনে ফিরতেই দেখলো সাইফ ওর একদম গা ঘেসে দাঁড়িয়ে আছে। অদিতি ভ্রু কুচকে বলল
“বাড়ির সব পুরুষরা হলুদ পাঞ্জাবি পড়েছে, আপনি কালো শার্ট পরে কেন দাঁড়িয়ে আছেন?”

সাইফ অদিতির কথার উত্তর দিলো না। কপালের সামনে আসা এলোমেলো চুল গুলো দুহাতে গুছিয়ে কানের পিঠে গুঁজে দিয়ে বলল
“এমন সৌন্দর্য ছড়িয়ো না বন্দিনী। খাঁচার ভিতর আগুন লেগে যাবে যে”

অদিতি সাইফের শার্টের কলার ঠিক করে দিয়ে লাজুক কণ্ঠে বললো
“আপনি সেই খাঁচা, যেখানে আমি স্বেচ্ছায় বন্দি”

সাইফ আলতো করে চুমু এঁকে দিলো অদিতির কপালে।

তুযার শক্ত পুরুষালী হাতে পিষে যাচ্ছে ফুলমালার নরম তুলতুলে হাতটা। নিজের সর্বস্ব শক্তি দিয়ে আঙুল গেড়ে দিয়েছে মেয়েটার ছোট্ট হাতে। অপরাধ, শুভ কে কেন হেসে হেসে চা দিতে গেলো? এত দরদ কিসের তার শুভর প্রতি? শুভর চরিত্র মোটেও ভালো না। বিষয় টা এমন না যে ফুলমালার ওপর তার কোন অনুভূতি কাজ করে। আসলে শুভর চরিত্র ভালো না। ফুলমালার মত সহজ সরল একটা মেয়ে ওর পাল্লায় পড়লে সর্বনাশ। তাই জন্যই তুযা বলছে। কিন্তু ফুলমালার মন ভাবছে অন্য। হাতে ব্যথার তুর আঘাতের মধ্যেও সে সুখ খুঁজে পাচ্ছে । তার ভাবনা তুযা হয়তো শুভর সাথে কথা বলায় হিংসা করছে।

আসলে তুযার ভিতর এমন কোনো অনুভূতি কাজ করে না। কেবল ফুল মালাকে নিরাপদ রাখতে তার এই পদক্ষেপ নেয়া। কিন্তু বোকা কিশোরী যে ভুলভাল ভেবে বসেছে, তার কি হবে এবার?

এদিকে দীঘি সারা বাড়ি খুঁজে মরছে ফুলমালাকে। রিশা হলুদ একটা ওয়ান পিস পরে বেলকনিতে দাঁড়িয়ে মোবাইল চাপছে। দীঘি আলগোছে গিয়ে পাশে দাঁড়ালো। মৃদু গলা খাকারি দিয়ে বলল
“উহুম উহুম। রিশা আপু, দাদা ভাইয়ের মন জয় করার একটা টিপস বলবো?”

রিশা চোখ পাকিয়ে তাকালো দীঘির দিকে
“তুই একদম নাটক কম কর। যখন ওই মেয়েটা আমার সাথে মিসবিহেভ করছিল, তুই একবারও আমার হয়ে কথা বলেছিস ঐ গাইয়া ক্ষ্যাত মেয়েটার সাথে? তোর সাথে আমার কোন কথা নেই। লাগবে না তোর টিপস আর লাগবে না তোর দাদা ভাইকে। সর যা এখান থেকে।

“আরে শোনো আমি তোমাকে বলছি দাদাভাই কি কি পছন্দ করে”

রিশা এবার একটু আশা দেখতে পেলো। কিছুটা আস্বস্ত হয়ে দীঘির দিকে তাকিয়ে রইল কি বলে সেই আশায়। দীঘি বলল
“বেগুনি রঙের লিপস্টিক, আর কালো রঙের শাড়ি। এই দুটো যা দাদা ভাইয়ের পছন্দ না! কি বলবো তোমায়। ফুলমালা তো মাঝে মধ্যেই পড়ে”

রিশা খুশিতে গদগদ হয়ে বলে
“সত্যি বলছিস? তাহলে আমাকে ম্যানেজ করে দে। আমিও পরি।”

কেমন হয়েছে অবশ্যই জানাইও পাখিরা 🫶
আর বোনাস পর্ব পড়েছো কি?
আবার ২k মেম্বার হলে আরেকটা বোনাস পর্ব দিবো।
তারাতাড়ি জয়েন হয়ে যাও 🫶💜

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply