খাঁচায় বন্দী ফুল
jannatul_ferdous_জান্নাতুল_ফেরদৌস
৪০ এর শেষাংশ
ডিপ গ্রীন কালার কাঞ্জিভরম শাড়ি পরেছে নদী। মাথায় দিয়েছে গোল্ডেন কালার দোপাট্টা। হালকা মেকআপ সাথে খোপায় বেলি ফুলের গাজরা। সজ্জিত স্টেজে বসে মেহেদী পরছে হাতে। দুজন মেহেদী আর্টিস্ট হাতে নকশা আঁকছে মেহেদী কোণ দিয়ে। ফুলমালা আঞ্জুমান এর দেওয়া থ্রি-পিস টা পরে বসে আছে নদীর পাশেই। মেহেদী দেওয়া দেখছে। মাঝেমধ্যে চারিদিকে চোখ বোলাচ্ছে চারিদিকে কোথাও তুযা কে দেখা যায় কিনা। সুন্দর করে সেজেছে, তুযা দেখে না জানি কত্ত কত্ত প্রশংসা করবে। কিন্তু চোখেই পড়ছে না মানুষ টাকে।
ফুলমালা উঠে এদিক ওদিক খুঁজতে শুরু করলো। হাঁটতে হাঁটতে ধাক্কা লেগে যায় অদিতির সাথে। অদিতি ফুলমালা কে ধরে বলে
“এভাবে ঘুরছো কেনো? পড়ে যাবে তো। কাওকে খুঁজছো নাকি?”
ফুলমালা মুখ ভাড় করে বলল
“হ। তুযা ভাই কে”
অদিতি ঈষৎ কপাল কুচকালো
“দাদাভাই কে কেনো খুঁজো? কোনো দরকার? আমাকে বলতে পারো”
“তোমারে কইলে হইবো না ভাবি। হেরেই লাগবো”
অদিতি ফুলমালার হাত ধরে নিয়ে রান্নাঘরে যায়। ফুলমালা অবাক হয়ে বলে
“কই নিয়া যান ভাবি?”
অদিতি ফুলমালা কে দাঁড় করিয়ে হাত ধরে বলল
“সত্যি কথা বলোতো ফুলমালা। দাদাভাই এর পিছনে এতো ঘুরার কারণ কি?”
ফুলমালা মাথা নিচু করে বলল
“কাওরে কইবা না তো?”
অদিতি মাথা দুদিকে নেড়ে বলে
“উহু”
ফুলমালা লজ্জা মিশ্রিত কন্ঠে বলে
“আমি তুযা ভাইরে ম্যালা ভালোবাসি ভাবি। কিন্তু হ্যা কেমন জানি”
চোখ ভিজে উঠে ফুলমালার অদিতি প্রশ্ন করে
“কেমন?”
“এক্কেরে পাষাণ। আমার মনের কথা ইট্টুও বোঝে না ভাবি। সব সময় ফাঁকি দিয়া চলে আমারে।”
অদিতি ভাবেও নি এমন টা। ভেবেছিলো তুযার কোনো প্ল্যান এ বুঝি ফুলমালা কে ব্যাবহার করছে। এদিকে বোকা মেয়েটা যে তুযা কে মন দিয়ে বসে আছে, তা ভাবতেই ভীষণ অবাক হয় অদিতি। ফুলমালার থুতনি ধরে বলে
“বড় মা কে বলে, বড় জা হয়ে যাও আমার”
ফুলমালা প্রথমে বুঝতে পারে না অদিতির কথা
“তোমার বড়…..
কথা টা বুঝে আসতেই ফুলমালা ভীষণ লজ্জা পায়। ছুটে পালায় অদিতির থেকে। এক দৌড়ে বেড়িয়ে আসে রান্নাঘর থেকে। তুযা ঘর্মাক্ত শরীরে হন্তদন্ত হয়ে রুমে যাচ্ছিলো। বোকা কিশোরি ছুটে এসে প্রিয় পুরুষটার গায়ে হামলে পড়লো অসাবধানতা বসত। তুযা ফুলমালা কে সোজা করে দাড় করিয়ে বলে
“এমন ছোটাছুটি করছিস কেনো? বাড়ি ভর্তি কত্ত লোক। হয় তুই ব্যাথা পাবি, নয় যার গায়ে পড়বি সে ব্যাথা পাবে। যা চুপ করে বোস এক জায়গা”
কথা গুলো বলে তুযা ফের চলে গেলো। ফুলমালা মন খারাপ করে একা একাই আওড়ালো
“এত ভাষণ দিতে পারলো, অথচ দেখবার পারলো না আমি যে সাজছি। হুহহহ। ব্যাডা তো ন, কইষ্টা বড়ই। ধুররর”
ফের গিয়ে নদীর পাশে বসলো। অদিতি মিটি মিটি হাসছে ফুলমালার কান্ড দেখে। শেষে কিনা তুযা কে ভালোবাসলো মেয়েটা। পিছনে ঘুরতেই ঠুকে গেলো সাইফের সাথে। সাইফ চোখ ছোট ছোট করে তাকিয়ে আছে অদিতির দিকে। অদিতি ঢোক গিলে বলল
“এখানে কি করছেন?”
“তোমার কান্ড দেখছি। হাসছো কেনো একা একা?”
অদিতি অল্প রাগ দেখিয়ে বলল
“পাড়া-পড়শীদের ডেকো নিয়ে হাসবো নাকি?”
সাইফ অদিতির গাল দুটো চেপে ধরে ঠোঁটে একটা চুমু খেলো
“বেশ কথা শিখেছো দেখছি”
অদিতি সাইফকে ঠেলে সরিয়ে বলল
“এখানে বদমাইশি করবেন না বলে দিলাম। বাড়ি ভর্তি অনেক লোক আছে”
সাইফ অদিতির শাড়ির আচলের নিচের অংশ কামড় দিয়ে ধরে বলল
“তাহলে চলো রুমে যাই”
অদিতি রাগে গটগট করতে করতে মিষ্টি রেডি করতে গেলো।
“সব সময় এইসব ই ঘুরে মাথায়।”
অদিতি যেখানেই যাচ্ছে, সাইফ আচল দাঁত দিয়ে ধরে ওর পিছু পিছু যাচ্ছে। অদিতি বেশ বিরক্ত হচ্ছে ওর এমন ব্যাবহারে
“কি হচ্ছে টা কি। মানুষ জনের মধ্যে ইজ্জত টা খোয়ানোর শখ হয়েছে?”
“ইজ্জত তো কবেই খেয়ে দিয়েছো তুমি। মানুষ একটু খেলে কি ই বা হবে?”
দুজনে তর্ক করতে করতে যাচ্ছিলো তখন সামনে পড়লো তুযা। সাইফ অদিতি কে এভাবে দেখে নিজের হাসি আটকালো বহু কষ্টে। গলা খাকারি দিয়ে বলল
“তুই ওর পিছ পিছ ওমন ঘুরছিস কেনো?”
সাইফ মুখ থেকে আচল এর অংশ টা ছেড়ে দিয়ে বলল
“রুমে যেতে বলছি, যাচ্ছে না”
তুযা দাঁত দিয়ে নিচের ঠোঁট কামড়ে বলে
“সালার বাড়ির লোক হুদাই আমারে দোষে। তুই আমার থেকেও বড় বেহায়া। আইজ আমি সবাইরে জানামুই”
অদিতি কথা ঘুরাতে বলল
“ফুলমালা আপনাকে ডাকে”
তুযা সাইফের হাত ছেড়ে দিয়ে বলে
“ওর আবার কি হলো?”
“জানিনা। খুব দরকার বলল”
তুযা হন্তদন্ত হয়ে ছুটলো। সাইফ অদিতির ঘাড়ে ধরে নিজের দিকে ফিরিয়ে বলল
“ফুলমালা দাদাভাই কে ডাকলো কখন?”
অদিতি হেসে বলল
“ও আপনি বুঝবেন না। সিক্রেট”
অদিতি আবার রান্নাঘরের দিকে যাচ্ছিলো বলে সাইফ টেনে ধরলো। অদিতি বিরক্ত হয়ে বলল
“এমন করছেন কেনো? কি সমস্যা আপনার?”
সাইফ অদিতি কে আপাদমস্তক দেখে বলল
“শাড়িটায় মানাচ্ছে না তোমায়। চলো চেঞ্জ করবে চলো”
“ইশশশশ। খালি শাড়ি খোলার ধান্দা। ও আমি বুঝি হুহহ। পাল্টাবো না শাড়ি। এটাই পরে থাকবো”
সাইফ টেবিলে থাকা একটা মিষ্টি তুলে এনে সেটা চিপে সব সিরা অদিতির শাড়িতে লাগিয়ে দিলো।
“নাও। এবার চিপচিপে হয়ে থাকো দেখি কত পারো।”
অদিতি কাঁদো কাঁদো মুখ করে বলল
“এটা কি করলেন আপনি? কত্ত কাজ রয়েছে আমার। আপনি খুব খারাপ”
সাইফ অদিতির বাহু টেনে ধরে বলল
“চলো শাড়ি পাল্টে নাও।”
অদিতি ঝাড়ি মেরে সরিয়ে দিয়ে বলল
“তাতে আপনার কি? আমার শাড়ি আমি পাল্টাবো, আপনার এখানে কাজ কি?”
“একটা খুলে আরেকটা পরার মাঝের সময়টা আমার কাজ। চলো”
অদিতি চোখ বুজে অল্প ঢুলে পড়লো। সাইফ চট করে ধরে ফেলে তাকে।
“অদিতি, এই অদিতি? কি হলো তোমার? খারাপ লাগছে?”
অদিতি ছোট করে বলল
“দুর্বল লাগছে ভীষণ।”
সাইফ ব্যাস্ত হয়ে পড়লো অদিতির অসুস্থতায়। ধরে রুমে নিয়ে আসলো। শাড়ি থেকে সেফটি পিন খুলে বলল
“দাঁড়াও আগে তোয়ালে ভিজিয়ে নিয়ে আসি।”
তোয়ালে ভিজিয়ে এনে অদিতির গা মুছে দিলো। শাড়ি পাল্টে অদিতি নিচে আসতে চাইলো। সাইফ আসতে দিলো না।
“তোমার শরীর ঠিক নেই। একদম নিচে যাবে না। শোও এখানে”
অদিতি এবার মুসিবতে পড়লো। কিচ্ছু হয়নি আসলে। সাইফের থেকে রেহাই পেতে একটু নাটক করেছিলো শুধু। সাইফ, অদিতির জোড়াজুড়ি তে বুঝে ফেলেছে সব নাটক। সাইফ শান্ত হয়ে গেলো। ছেড়ে দিলো অদিতিকে। অদিতি একটু ঘাবড়ে গেলো। সাইফ মন খারাপ করে উঠে গেলো সেখান থেকে। ঘর থেকে বেরিয়ে গেলো দ্রুত। অদিতি বোকা বনে গেলো। কি হলো আবার? যাক অন্তত এবার নিশ্চিন্তে কাজ তো করতে পারবে।
নিচে শাওনের বাড়ি থেকে লোকজন এসেছে। নদীর মেহেদী দেখতে। তাদের আপ্যায়নে পুরো দমে কাজ চলছে। অদিতি, সায়রা, আঞ্জুমান, লতিফা সকলেই কাজে ব্যাস্ত। তুযা আর সাইফ কোথাও একটা বেরিয়েছে। শাওনের ছোট ভাই সোহান খুব চিপকাচ্ছে ফুলমালার সাথে। ফুলমালা বড় বিরক্ত হচ্ছে এমন ব্যাবহারে। বারবার গা ঘেষছে বেয়াইন বেয়াইন বলে। এটা ওটা জিজ্ঞেস করছে। ছবিও তুলতে চাইছে। ফুলমালা ভয়ে কিছু বলছেও না। অতিথি দের সাথে খারাপ ব্যাবহার করায় যদি পরে ওকেই দোষ দেয় সবাই। তুযা ভাইকেও দেখা যাচ্ছে না। ওকে বল্লেই তো ছেলেটাকে একটা চটকনা লাগিয়ে দিতো।
ফুলমালা পারছে না কেদে ফেলতে। সব সীমা অতিক্রম করে ছেলেটা স্পর্শ করলো ফুলমালার উদরে। ফুলমালা এক দৌড়ে ঘরে চলে গেলো কাদতে কাদতে। সারাদিন অনুষ্ঠানের ঝামেলা সামলে খুবই ক্লান্ত অদিতি। ঘড়িতে দেখলো রাত ১০ টা বেজে গেছে। রুমে গিয়ে আগে ফ্রেশ হয়ে চুল বেণি করে নিলো। সাইফ শুয়ে শুয়ে ফোন চাপছে। অদিতি ভাবলো একটু স্বামীর বুকে মাথা রাখলে বুঝি ক্লান্তি যাবে। কিন্তু ওর ভাবনায় এক বালতি পানি ঢেলে দিয়ে অদিতি বিছানায় যেতেই সাইফ উঠে গেলো। মুখ টা এখনো সেই বাংলা পাঁচ। অদিতি তাকিয়ে রইলো সাইফের যাওয়ার দিকে।
এখনো রেগে বোম হয়ে আছে? ভাবলো এক কাপ কফি করে দিয়ে যদি স্বামীর মন পাওয়া যায়। কিচেনে গিয়ে কফি বানিয়েও আনলো। ব্যালকনির সোফায় বসে মোবাইল চাপছে সাইফ। অদিতি কফির কাপটা এগিয়ে দিলো সাইফের দিকে। সাইফ সারা দেয় না। কফিটাও নেয় না। অদিতি নিজেই বলল
“কি হলো নিন”
তাও কথা বলে না। অদিতি সাইফের সামনে এসে দাড়ায়।
“নিন না।”
সাইফ না তাকিয়েই বলল
“কফি লাগবে না আমার। যেতে পারো।”
অদিতি বুঝেছে সাইফ রাগ করে আছে। কাপটা নামিয়ে পিছন থেকে জড়িয়ে ধরলো সাইফের গলা। আদুরে গলায় বলল
“শুনুন না। চলুন না শুয়ে পড়ি। আমার ভীষণ ক্লান্ত লাগছে”
সাইফ এক ঝটকায় সরিয়ে দিলো অদিতি কে।
“ধরবে না আমায়। তোমার ক্লান্ত লাগছে তাতে আমি কি করবো?”
অদিতি আর দাঁড়ায় না সেখানে। সোজা গিয়ে বিছানায় শুয়ে পড়ে। বালিশে মুখ গুজে ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাদছে অদিতি। হঠাৎ হঠাৎ সাইফের এমন জিদ ভালো লাগে না অদিতির। সব রাগ-জিদ ওর ওপরেই কেনো উগড়ে দিতে হয়।
বেশ অনেকটা সময় পর সাইফ শুতে আসে। অদিতি তখনো ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাদছে। সাইফ পাশে শুয়ে পড়লো। অদিতির কান্নাও ভালো লাগছে না। আবার কাছে যেতেও ইচ্ছে করছে না। শান্ত গলায় বলল
“কাঁদছো কেনো এখন? তোমার তো খুশি হওয়ার কথা। আমি আর কাছে আসছি না তোমার। আমার ছোঁয়া তো খারাপ লাগে তোমার। আজকাল অসুস্থ হওয়ারও বাহানা দিচ্ছো। আর স্পর্শ করবো না তোমায়। এবার খুশি তো?”
অদিতির কান্নার তোপ আরো বাড়লো। সাইফ অনেকক্ষণ ধৈর্য ধরে শুয়ে থাকলেও এখন আর ভালো লাগছে না। অদিতির দিকে ফিরে মাথা উঁচু করে বলল
“ধরলেও ভালো লাগে না, আবার ধরছি না বলেও কাঁদছো। এসব কি অদিতি? আর কতদিন বাচ্চা থাকবে?”
অদিতি কেদেই চলেছে। সাইফ পিছন থেকে জড়িয়ে ধরলো।
“আর কেদোনা প্লিজ। আমি আর কিচ্ছু বলবো না। মাফ চাই এবার। এই মেয়েরা এমন কেনো? দোষ ও করবে আবার কাদবেও নিজেই। ওরে মাফ চাই রে। আর শাড়ি খুলতে চাইবো না। এবার চুপ যাও।”
অদিতি এবার শুধু হেঁচকি তুলে তুলে কাঁদছে। সাইফ অদিতিকে টেনেটুনে নিজের দিকে ফেরালো।
“এই মেয়েরা সব পারে। কোথায় আমার রাগ ভাঙানোর কথা ছিলো। তা না উনি নিজে রেগে বসে আছে। এরাই ভালো করে জানে সোজা আঙুলে কি করে ঘি উঠাতে হয়।”
চলবে?
[ অবশেষে হইছে। অনেক ভয় পেয়ে গেছিলাম যে কি হলো 🥹 ফাইনালি আপলোড হয়েছে 🥺। আগের পর্বে কিন্তু রিয়্যাক্ট পূরণ করেননি 🙂 এটায় অবশ্যই করবেন। আমি আপনাদের জন্য লিখি। তাই আপনারা সমর্থন না করলে কি করে হবে বলুন। কেমন হলো জানিও পাখিরা 🥲। আর বলিও কে কোথায় ভোট দিলা 🫠]
Share On:
TAGS: খাঁচায় বন্দী ফুল, জান্নাতুল ফেরদৌস
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ১৫
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ৩৮ এর প্রথমাংশ
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ২৭
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ১৭
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ২২
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ৬
-
খাঁচায় বন্দী ফুল ৪০ এর প্রথমাংশ
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ২৬
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ১৬
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ১১