খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ৩৯
jannatul_ferdous_জান্নাতুল_ফেরদৌস
পর্ব – ৩৯
শহরের যানযট পেরিয়ে বাড়ি ফিরছে আজ তুমুল। দীর্ঘদিন পরিবার ছেড়ে ঢাকায় অবস্থান করার পর আজ নিজ গৃহে ফিরতে চলেছে। বাড়িতে গোলযোগ বেধেছে। মা তার মেয়ে দেখছে বিয়ে করাবে বলে। এদিকে ছেলে তার প্রিয়তমা কে বিয়ে করে বসে আছে তা মায়ের অজানাই। কোন মেয়ের বাপ কে নাকি আবার কথা দিয়ে বসেছে। কাল দিন ঠিক করবে এও বলেছে। কিন্তু এখন মা কে ফোনে বললে উনি হা-হুতাশ করবেন। আর এত কথা ফোনে বোঝানো সম্ভব নয় বিধায় তুমুলকে ছুটতে হচ্ছে রাজশাহী। সময় বেশি দিতে পারবে না বাড়িতে। কাল থেকে পরশুই ফিরতে হবে আবার।
সাইফ পই পই করে বলে দিয়েছে। কোনো ভাবে পরশু আসা যেনো মিস না হয়। মা কে কিভাবে বোঝাবে সেই চিন্তা মাথায় যটলা বেধে আছে তুমুলের। অসুস্থ থেকে সেরে ওঠার পর রাশেদা অনেক বার বলেছিলো বাড়ি ফিরতে। ফেরেনি তুমুল। অতঃপর আজ ফিরছে, কেবল মা কে বোঝাতে। কিন্তু বাড়ি পৌঁছে তুমুলের পূর্বের ভাবনায় ছেদ ঘটলো। বাড়িতে বেশ লোকজন। ড্রইংরুমেও মানুষের আনাগোনা টের পাচ্ছে বাইরে থেকে। তুহিন কে দেখা গেলো পাঞ্জাবির হাতা গোটাতে গোটাতে ব্যাস্ত পায়ে কোথাও যাচ্ছে।
তুমুল টেনে ধরলো হাত। তুহিন হেচকা টান অনুভব করে পিছন দিকে তাকালো। তুমুল এর চেহারা টা দেখেই হাসি ফুটলো তার মুখে
“আরে ভাইয়া? কখন এলে?”
তুহিন জড়িয়ে ধরলো তুমুলকে। তুমুল ও মৃদু আলিঙ্গন করে বলল
“এখন বলতো, বাড়িতে হচ্ছে টা কি?”
তুহিন মুখ গোমড়া করে বলল
“কাকি তোমার জন্য মেয়ে দেখেছে। আজ তাদের বাড়িতে ডেকেছে পাকা কথা বলতে”
তুমুল কপাল কুচকে বলল
“মানে? তুই আটকাসনি ওদের? বলিস নি আমি….
“কি করে বলতাম ভাইয়া। তুই এসে বুঝিয়ে বললে তবেই কাকি বুঝতে। নয়তো এদিকে হুড়োস্থুল কান্ড বেধে যেতো। এসেছো ভালো হয়েছে, যাও ভেতরে গিয়ে ঠান্ডা মাথায় কথা বলো”
তুমুল ভিতরে ঢুকে দেখলো তার পাত্রী রুপে আর কেউ না তারই কলেজ লাইফের বান্ধবী মিরা বসে আছে। প্রথমে মিরা কে দেখে বুঝতে না পারলেও সকলের ব্যাবহারে তুমুল নিশ্চিত হলো। রাশেদা বেগম এগিয়ে এসে তুমুল কে চুপিচুপি বলল
“এসেছিস? যা আগে ফ্রেশ হয়ে ভালো একটা পাঞ্জাবি পরে আয়। যাহহ”
তুমুল মায়ের হাত ধরে টেনে আড়ালে নিয়ে গেলো
“এখানে কি হচ্ছে মা? তুমি আমাকে একবার জিজ্ঞেস করবে না?”
“তোকে আবার জিজ্ঞেস করার কি আছে? আমি তোর মা, আমি যা ভালো বুঝবো সেটাই তো করবো। এখন কোন কথা না বলে চুপচাপ রেডি হয়ে আয়। মীরার বাবা-মা অপেক্ষা করছে তোর জন্য।”
তুমুল ঈষৎ ভ্রু কুচকে বলল
“ মা তুমি বুঝতে পারছো না। তুমি আগে আমার কথা শোনো আমার তোমার সাথে খুব দরকারী কথা আছে।”
রাশেদা কপোট রাগ দেখিয়ে বলল
“যেটা বলছি আগে সেটা কর। খালি বেশি কথা। যা রেডি হয়ে, আগে মিরার বাবা মার সাথে কথা বলবি। তারপর তোর সব কথা শোনা হবে যা।”
বাড়িতে অতিথি থাকায় নিজের মায়ের সম্মানের কথা ভেবে তুমুল কিছু বলল না। সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠতে উঠতে দাঁতে দাঁত পিষে বলল
“বালের এক বিয়ে করেছি। ওদিকে বউকে দিয়ে দিচ্ছে অন্যজনের সাথে বিয়ে, এদিকে আমারটা এসে বাড়িতে হাজির। এমন জীবনের কোন মানেই হয় না”
রুমে গিয়ে হাতমুখ ধুয়ে সাদা রঙের পাঞ্জাবি টা পড়ে নিচে নামলো তুমুল। মিরা নতুন বউয়ের মত ঘোমটা টেনে গুটি শুটি হয়ে সোফায় বসে আছে। তুমুলের ইচ্ছা করছে ওর কান বরাবর ঠাটিয়ে একটা চড় মেরে দিতে। এমনিতে ধিঙ্গি মেয়ের মতো জিন্স আর শার্ট পড়ে ঘুরে বেড়ায়। আজ এক্কেবারে বউ সেজে হাজির হয়েছে তার বাড়িতে। ছোটবেলার বন্ধু, একবার তো তুমুলকে জিজ্ঞেস করলেও পারতো তা না নাচতে নাচতে চলে এসেছে বিয়ে করতে। মিরার বাবা হেসে তুমুল কে বলল
“তা বাবা, কি অবস্থা তোমার? ভালো আছো তো?”
তুমুল জোরপূর্বক একটু হাসি টেনে বলল
“আমার আর অবস্থা, আমার লাভ লস নাই আঙ্কেল। আমার জীবন ডাই লস”
তুমুলের কথাবার্তা বেগতিক দেখে রাশেদা বেগম মিরার বাবাকে বলল
“তাহলে ভাইজান এবার পাকা কথায় আসা যাক”
কিন্তু মিরার মা বলল
“ও মা সে কি আপা। ছেলে মেয়ে দুজনের একটা আলাদা কথা বলে নিবে না?”
মিরার সাথে তুমুল কথা বললে যে বিয়ে ভেস্তে যাবে তার আশেদা বেগম খুব ভালো করেই জানেন। তাই প্রসঙ্গ পাল্টাতে বললেন
“কি যে বলেন না আপা। ওদের আবার কথা বলার কি আছে? ওরা তো বন্ধু। দুজন দুজনকে খুব ভালো করে চেনে এবং জানে। তাছাড়া মিরা মাও তো রাজি।”
“মিরা রাজি, কিন্তু….
মিরার মা তুমুলের দিকে তাকাতেই এর রাশেদা বেগম বললো
“ও কি বলবে? আরে আমরা যা বলব তাই তো ওর মত। তাই নারে তুমুল?”
তুমুল হ্যাঁ বা না কিছুই বলল না। মিরা নিজেই বলল
“আন্টি সমস্যা নেই। আমরা কথা বলে নিচ্ছি”
মিরা উঠে দাড়ালো। তুমুলও দাড়ালো সাথে। দুজনে গেলো তুমুলদের বাড়ির সামনের গার্ডেনে। মিরা আজ কেমন লাজুক লাজুক আচরণ করছে তুমুলের সামনে। যা দেখে তুমুলের গা জ্বলে যাচ্ছে। সবার চোখের আড়াল হতেই তুমুল টেনে ধরলো মিরার চুলের গোছা। এমন দিনে যে তুমুল এমন ব্যাবহার করতে পারে ভাবনায়ও ছিলো না মিরার। নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে তুমুলকে বলল
“কি হচ্ছে এসব তুমুল? এমন করছিস কেনো?”
তুমুক কোমরে হাত দিয়ে দাড়িয়ে মিরার দিকে ঝুকে বলল
“আমি একবারও বলেছিলাম যে তোকে বিয়ে করবো?”
মিরা মুচকি হেসে বলল
“সে আবার বলার কি আছে? তুই আর আমি ছোট বেলার বন্ধু। আমাদের জুটি তো এক্কেবারে পারফেক্ট হবে”
তুমুল ভ্রু গুটিয়ে বলল
“দেখ মিরু, এই মিরু শোন না। তুই তো আমার বন্ধু বল? তুই তো আমাকে বুঝিস”
মিরা হাসলো
“সে আবার বলতে?”
তুমুল কন্ঠ নিচু করে বলল
“দেখ আমি একটা মেয়েকে ভালোবেসে বিয়ে করেছি আরো তিন মাস আগে”
মিরার লাজুক হাসি মূহুর্তেই মিইয়ে গেলো। ভিজে উঠলো অক্ষিযুগল। তুমুল অন্যদিকে ফিরে বলল
“এখনো জানাইনি মা কে। জানাবো ঘুব শিঘ্রই। তুই আমায় হেল্প কর……
তুমুলের কথা শেষ হওয়ার আগেই মিরা হাটা ধরলো। তুমুলও গেলো পিছন পিছন। মিরা ড্রইং রুমে ঢুকে সরাসরি সবার উদ্দেশ্যে বলল
“সরি এভরিওয়ান, একটা ছোট্ট মিস-আন্ডাসট্যান্ডিং ছিলো। আসলে আমরা বন্ধুই ঠিক আছি। এর চেয়ে বেশি হলে বোধহয় সেটা….
অল্প দম নিলো মিরা
“আই থিংক আপনারা বুঝতে পারছেন। বাবা তাহলে চলো আমরা আসি”
মিরার বাবা জানে মিরাকে, কোনো কারণ ছাড়া এমন বলেনি। সবাইকে বিদায় জানিয়ে মিরার বাবা সম্মানের সহিত বেড়িয়ে গেলো। আজ রাশেদা বেগম ছাড়বে না তুমুলকে।
—
এই প্রথমবার ফুলমালা শহরে যাচ্ছে। উদ্দেশ্য নদীর বিয়ে। তুযা দের বাড়িতে থাকার সুবাদে তাকেও যেতে হচ্ছে ঢাকায়। কবিতাও ভিষণ খুশি শহরের এতো গাড়ি, মানুষজন কখনো দেখেনি ওরা। আকবর গাড়ি চালাচ্ছে। তুযা আকবর এর পাশে বসেছে। পিছনের সিটে লতিফা বেগম আর ওয়াহাব চৌধুরী। তার পিছনে কবিতা আর ফুলমালা। তুযা ঘাড় ঘুরিয়ে পিছনে তাকালো
“ফুল! বমি পাচ্ছে নাকি?”
“না তুযা ভাই। আমি ঠিক আছি”
তুযা গলা করে ডাকলো
“কবিতা?”
“আমারও সমস্যা হইতাছে না”
দীর্ঘ কয়েক ঘন্টা জার্নি করে গাড়ি এসে থামলো চৌধুরী বাড়ির গেটে। বাড়িতে ডেকোরেশন এর কাজ করছে লোকজন। বিয়ের এখনো ৭ দিন বাকি। এখন থেকেই প্রস্তুতি চলছে সবকিছুর। ফুলমালার পরনে কলাপাতা রঙের শাড়ি। দু’হাতে শাড়ির মাঝখানের অংশ উঁচু করে ধরে চারিদিকে ঘুরে ঘুরে শুধু বাড়ি দেখছে। শহরের বাড়ি এর আগে কখনো দেখেনি ফুলমালা।
বাড়িতে ঢুকতে সবার প্রথমে সামনে এলো অদিতি। সকলকে বিনয়ের সাথে আপ্যায়ন করলো। ফুলোমালার খুব ভালো লেগেছে অদিতিকে। সকলের ড্রইংরুমে বসে নাস্তা করছে, এমন সময় সাইফ বাড়িতে ঢুকলো মোটা এক শাল গায়ে জড়িয়ে। লতিফা বেগম চা খেতে খেতে সাইফের দিকে তাকিয়ে বলল
“কিরে? এই গরমের মধ্যে তোর কি শীত লাগছে? শাল জড়িয়েছিস কেন? জ্বর টর এলো নাকি বাবা?”
সাইফ ছোট্ট করে বলল
“না বড়মা। আমি ঠিক আছি”
ড্রয়িং রুমে এক মুহূর্ত না দাঁড়িয়ে সাইফ চলে গেল নিজেদের ঘরে। ঘরে ঢুকেই গায়ের শাল খুলে মেঝেতে ছুড়ে মারলো। শরীর ভর্তি রক্তের দাগ। মূলত শার্টের লালচে রক্তের দাগ আড়াল করতে এই দুপুরবেলা গায়ে শাল জড়িয়ে বাড়িতে ফিরেছে সাইফ। সাইফের এমন অবস্থা দেখে দ্রুত নিজেদের ঘরে চলে আসা অদিতি কি হয়েছে সেটা দেখার জন্য। গায়ের শার্ট ভর্তি লাল রক্তের দাগ দেখে অবাক হয়ে যায় অদিতি। ব্যস্ত হয়ে এগিয়ে যায় সাইফের দিকে
“একি! কি হয়েছে আপনার? এত রক্ত কেন গায়ে?”
চলবে?
[ মন ভাঙার এক পর্যায়েও আমার নিয়মিত পাঠক দের কথা ভেবে আমি গল্প দিলাম। অবশ্যই ১.৭k রিয়্যাক্ট পূর্ণ করবেন। তারপর পরবর্তী পর্ব দিবো। আজ সাইফ আর অদিতির কাহিনি বেশি ছিলো না। পরবর্তী পর্বে পাবেন]
Share On:
TAGS: খাঁচায় বন্দী ফুল, জান্নাতুল ফেরদৌস
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ২৫
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ১৯
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ২৭
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ৬
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ১০
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ২৮
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ৩৭
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ৩৮ এর প্রথমাংশ
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ৩৫
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ৫