Golpo কষ্টের গল্প খাঁচায় বন্দী ফুল

খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ৩৮ এর প্রথমাংশ


খাঁচায় বন্দী ফুল

jannatul_ferdous_জান্নাতুল_ফেরদৌস

৩৮ এর প্রথমাংশ

সারারাত বৃষ্টির দরুন বেশ ঠান্ডা আজ ভোরের প্রকৃতি টা। এই আবহাওয়া টা ঘুমের জন্য বড্ড মানানসই। গায়ে কম্ফোর্টার জড়িয়ে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন অদিতি আর সাইফ। দুজন দুজনকে আষ্টেপৃষ্টে বেধে জবরদস্ত একখানা ঘুম দিচ্ছে। বেলা বেশি না, ৭ টা মতো বাজে। তাদের শান্তির ঘুম বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না। দরজার ঠকঠক শব্দ ক্রমশ বেড়েই চলেছে। অপরিপক্ক ঘুমটা নষ্ট হওয়ায় বিরক্তিতে কপাল কুচকে আসে সাইফ এর। অদিতির এখনো কোনো হেলদোল নেই। সাইফের অল্প শব্দেই ঘুম ভেঙে যায়। কিন্তু অদিতি ঠিক তার উল্টোটা।

চোখ মেলে তাকিয়ে সাইফ অদিতির মুখটা প্রথমে দেখলো। কি সুন্দর নিষ্পাপ লাগে ঘুমন্ত চেহারাটা। সাইফের বুকের ওপর গুটিশুটি মেরে শুয়ে আছে। এজন্যই বিড়ালের বাচ্চা বলে সাইফ। আলতো করে ঠোট ছোয়ালো ছোট্ট বউটার কপালে। দরজার ওপাশের মানুষটা বোধহয় এবার দরজাটা ভেঙেই ফেলবে। সাইফের বিরক্তি এবার রাগে রুপ নিলো। অদিতিকে আস্তে করে বালিশে শুইয়ে দিয়ে, চড়া মেজাজ নিয়ে গেলো দরজার সামনে। ওপাশে নদী বা দীঘি থাকলে তো আজ রক্ষে নেই। কিন্তু দরজা খুলে সাইফের চোখ কপালে উঠে গেলো। কোথায় ভেবেছিলো দুটো কথা শুনিয়ে দেবে। এখন দেখে হাসান চৌধুরী নিজে দাড়িয়ে আছে।

“কি হয়েছে বাবা কোনো সমস্যা?”

হাসান চৌধুরী গম্ভীর গলায় বলল
“সমস্যা হবে কেন? শাওন দের বাড়ি থেকে আজ আংটি পড়াতে আসবে নদীকে। তুমি আমার সাথে মার্কেটে চলো। ওদের সকলের জন্য গিফট কিনতে হবে”

“এত তারাতাড়িই আংটি….?”

হাসান চৌধুরী কিছু না বলেই নিচে চলে গেলো। সাইফও রুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে নিলো। অদিতি মাত্র উঠেছে। ঘুম ভাঙতেই দেখলো সাইফ রেডি সেডি হয়ে আয়নার সামনে দাড়িয়ে আছে। পরনে অফ হোয়াইট ব্র্যান্ডেড শার্ট। ফরমাল প্যান্ট। হাতে ঘড়ি পরতে পরতে বলল
“উঠে পড়ুন মিসেস। কলেজ তো শিকেয় তুলেছেন। দেখেন আজ ক্লাসে যাওয়া যায় নাকি”

বেশ দেখছিলো সাইফ কে। কলেজের কথা উঠাতেই মেজাজ বিগড়ে গেলো অদিতির। যে কয়দিন কলেজে গেছে, গন্ডগোল ছাড়া ভালো কিছু হয়নি। কলেজের নাম শুনলেই মেজাজ টা খারাপ হয়ে যায়। অদিতির মলিন মুখটার দিকে তাকিয়ে সাইফ বলল
“আবার কি হলো?”

অদিতি মুখ ভাড় করে বলল
“কলেজে গেলেই তো আপনার আর আমার ঝামেলা হয়। যাবো না আমি কলেজে। পরে আবার ঝামেলা হবে”

সাইফ অদিতির দিকে এগিয়ে এসে বলল
“কেউ তোমার নাম জিজ্ঞেস করলে বলবে, মিসেস অদিতি চৌধুরী। ব্যাস, তাহলেই আর কোনো ঝামেলা হবে না”

অদিতির মাথায় ঢুকলো না। সাইফ উঠতে নিলে শার্ট টেনে ধরলো
“এতে কি হবে?”

“নামের আগে মিসেস শুনে মানুষ বুঝবে তুমি বিবাহিত। ওই ছেলেটা যে তোমার পিছনে লেগেছিলো, ও কিন্তু জানতো না যে তুমি ম্যারিড। জানলে কখনোই এমন করতো না”

অদিতি উঠে ফ্রেশ হয়ে নেয়। একেবারে রেডি হয়ে সাইফের সাথে নিচে আসে। অদিতিকে ব্যাগ নিয়ে নামতে দেখে সায়রা বলল
“একি বউ মা? কোথায় যাচ্ছো তুমি?”

“কলেজে”

অদিতির উত্তর যেন রাগ ধরিয়ে দিলো সায়রার শরীরে। আঞ্জুমান যদিও কিছু বলল না। তবে সায়রা বলল
“আজ বাড়িতে অতিথিরা আসবে। আর বাড়ির বউ বাড়ি থাকবে না? এটা কি ঠিক ভাইজান?”

হাসান চৌধুরী কিছু বলল না। সাইফ বলল
“বেঠিক এর কিছু দেখছি না তো কাকিয়া। অদিতির কেনো থাকতে হবে?”

“আশ্চর্য ও এ বাড়ির বউ না? ওর ননদের আংটি পড়ানো হবে আজ। ওর থাকা টা তো দায়িত্ব”

সাইফ তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়ে বলল
“ওহহ এখন বুঝি দায়িত্ব? এমনিতে তো খুব বলো, ও কিছু বললেই আমাদের বিষয়ে নাক গলাবে না। অদিতি কিছু জিজ্ঞেস করলেই, তোমার জানার অধিকার নেই। আজ কেনো দায়িত্বের কথা উঠছে?”

হাবিব চৌধুরী ধমকের স্বরে বলল
“হ্যা হ্যা নিয়ে যাও তোমার স্ত্রী কে কোথায় নিয়ে যাবে”
সাইফ ও বলল
“তুমিও তোমার স্ত্রী কে চুপ করাও”
“একদম মুখ সামলে কথা বলবে। কাকি হয় তোমার।”
“বউ মার বিষয়ে এসব বলতে তোমাদেরও বিবেকে বাধা উচিৎ”

হাসান চৌধুরীর ধমকে থামলো দুই পক্ষ
“আহহ, কি হচ্ছে টা কি? বাড়িটা কে এবার চিড়িয়াখানা বানিয়ে ফেলবে? অতিথিরা বিকেলে আসবে, অদিতির ক্লাস শেষ হবে ২ টায়। চলে আসবে তারপর। এখন চুপ করে খাও”
অদিতি ছোট করে বলল
“নদী আপু খেতে আসে নি?”

সায়রা ঝাঝিয়ে উঠে বলল
“সে চিন্তা তোমার করতে হবে না”

সাইফ হাসান চৌধুরীর দিকে তাকিয়ে দু’হাত উচু করে ভ্রু নাচালো। সবাই তাকালো সায়রার দিকে। একটু আগে যে সাইফ ঠিকই বলেছে তা আবার প্রমাণ হলো। হাসান চৌধুরী এবার ছাড়লেন না। কড়া গলায় বলল
“তোমার সমস্যা কি সায়রা? তোমার সাহস হয় কি করে সব সময় আমার বউ মার সাথে খারাপ ব্যাবহার করার? যাই হোক সব কিছু নিয়ে ওকে কথা শোনাতে ছাড়ো না তুমি। ও এ বাড়ির একমাত্র বউ। সবার খেয়াল রাখা ওর কর্তব্য। আর ও খারাপ কিছু বলেছে নাকি। যাও গিয়ে দেখো নদী কেনো এলো না”

সকলের সামনে অপমানে সায়রার মুখ থমথমে হয়ে গেলো। হাসান চৌধুরী হাবিব চৌধুরী কে বলল
“হাবিব, এমন যদি চলতে থাকে। তাহলে আমার আর সম্ভব না দুই পরিবার এক ছাদের নিচে থাকা।”

হাবিব মলিন মুখে বলল
“দুই পরিবার কেনো বলছো ভাইজান? আমরা কি দুই পরিবার?”

হাসান চৌধুরী কোনো কথা না বলে উঠে গেলো টেবিল ছেড়ে। অদিতিকে নিয়ে সাইফও বেড়িয়ে গেলো। অদিতির মনটা খারাপ। কেনো যেনো এ বাড়ির সকলে তাকে আপন করতে পারছে না। অদিতি তো সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে সকলের মন জেতার। কিন্তু তবুও যেন কেউ আপন করছে না তাকে। কি এক যন্ত্রণা তাকে ঘিরে ধরেছে, কিনারা করতে পারছে না। গাড়ি চলছে শহরের চওড়া হাইওয়ে ধরে। অদিতি আনমনে তাকিয়ে আছে বাইরের দিকে।

সাইফ স্ত্রীর উদাসীনতা দেখে বলল
“আমার ভালোবাসা কি তোমার কাছে যথেষ্ট নয়?”
“হঠাৎ এ কথা কেনো? বললেন?”
“জাস্ট অ্যানসার মাই কোয়েশ্চেন”

অদিতি শুধু ওপর নিচ মাথা নাড়লো। সাইফ মিররের দিকে তাকিয়ে বলল
“তাহলে অন্যকারো মন পাওয়ার আাশায় কেনো লেগে থাকো তাদের পিছে? যে ভালোবাসার, সে এমনিতেই বাসে অদিতি। তাদের মন জেতার চেষ্টা করতে হয় না।”

“তবুও। আমি চাই সকলের সাথে মিশে চলতে।”
“তুমি তোমার দিক থেকে ঠিকই আছো। তারপরেও যদি কারো ভালো না লাগে, সেটা তাদের সমস্যা, তোমার নয়”

কলেজের সামনে গাড়ি থামতেই অদিতি নামলো। সাইফ ও নামলো। আফিয়া আর মুশফিক মন খারাপ করে কি যেনো বলাবলি করছে। অদিতি আর সাইফে দেখতেই চুপ হয়ে গেলো। অদিতি সাইফের উদ্দেশ্যে বলল
“আমি কি আর ওদের সাথে কথা বলবো না?”

“নিশ্চই বলবে। কিন্তু শুধু মেয়েটার সাথে।”
অদিতি ঘাড় নেড়ে ভিতরে গেলো। আফিয়ার সামনে দিয়েই গেলো। কিন্তু আফিয়া কোনো কথা বলল না। উল্টো সরে গেলো অদিতি কে দেখে। আফিয়া ভীষণ মিশুক একটা মেয়ে, তার এমন ব্যাবহার অদিতিকে একটু ভাবালো।

ক্লাসে গিয়ে দেখলো সব সিটে বসে পরেছে স্টুডেন্টরা। পিছনের দুটো সিট খালি। সেখানে গিয়েই বসলো অদিতি। তারও মিনিটি পাচেক পর আফিয়া ঢুকলো ক্লাসে। মুশফিক এর ব্যাগ রাখাই ছিলো কিন্তু আফিয়া এখনো বসে ন। আফিয়া অদিতি কে পাস করে পিছনের সিটে গিয়ে বসলো। অদিতি পিছনে ঘুরে বলল
“আমার পাশে বসলেই তো পারতিস”

আফিয়া কথা বলে না। অদিতি আফিয়ার হাত ধরে বলে
“রেগে আছিস আমার ওপর? কিন্তু আমি কি করেছি বল। সবাই আমার ওপর রাগ ঝাড়ে। উনিও আবার তোরাও”

আফিয়া অদিতির হাত ধরে বলে
“দেখ আমরা তোর ওপর রেগে নেই। আসলে আমাদের মনটা ভালো নেই”
“কেনো কি হয়েছে?”
“সে কি তুই জানিস না? আজ চারদিন হয়ে গেলো রোহান কে খুজে পাওয়া যাচ্ছে না”
“কি বলিস? কোথায় গেছে?”
“কেউ জানে না। পুলিশে খবর দেওয়া হয়েছে। তারাও এখনো কোনো খোঁজ বের করতে পারে নি”

অদিতির কপালে দীর্ঘ ভাজ পরলো। এত বড় একটা ছেলে এমন হুট করে হারিয়ে যেতে পারে নাকি? আফিয়া শুকনো ঢোক গিলে অদিতিকে বলল
“আচ্ছা কোনো ভাবে এতে তোর স্বামীর হাত নেই তো?”

অদিতি চমকে তাকালো আফিয়ার দিকে। সাইফের ব্যাপারে এমন জঘন্য কথা শুনে ইচ্ছে করছে কষিয়ে দুটো চড় আফিয়াকে মেরে দিতে। অদিতি নিজের রাগ কে কন্ট্রোল করলো। চট করে আফিয়ার হাত সরিয়ে দিয়ে বলল
“তুই জানিস তুই কি বলছিস? মাথা ঠিক আছে তোর? তুই চিনিস ওনাকে? এমন জঘন্য একটা কাজ উনি করবেন? আর এসব করে ওনার কি লাভ বলতো”

আফিয়া আকুতি করে বলল
“তুই প্লিজ রেগে যাস না। আমি এজন্য বললাম যে, উনি তো রোহানের ওপর খুব রেগে ছিলো। রাগের বসে…..”

“চুপপ। একদম বাজে কথা বলবি না। আসলে যত নষ্টের গোড়া তুই। না তুই রোহান কে আমার নাম্বার দিতি, আর না আমার স্বামীর সাথে রোহানের ঝামেলা হতো। এসবের ফল আমাকেও ভুগতে হয়েছে। আর এখন আমার স্বামীকেই দোস দিচ্ছিস?”

ক্লাসের মধ্যে সিনক্রিয়েট হবে বলে আফিয়া চুপ করে গেলো। গোটা ক্লাসে একবারও কথা বললো না অদিতির সাথে।

সারারাত বাইরে ছিলো তুযা। সকাল টা আজ বেশ চনমনে। দুইদিন মেঘলা থাকার পর আজ রোদ উঠেছে। গলায় গামছা দিয়ে লুঙ্গির পাড়ের অংশ হাতে ধরে বাড়িতে প্রবেশ করলো প্রধান বাড়ির ছোট সাহেব। সোফায় গা এলিয়ে দিলো ঢুকেই। চোখ দুটোতে বড্ড ঘুম। চেচিয়ে ডাকলো
“মা পানি দাও”

দুই মিনিটের মাথায় তার সামনে পানির গ্লাস বাড়িয়ে ধরলো এক অপরিচিত হাত। তুযা ঘুমঘুম চোখে সামনে তাকালো হাতের মালিক কে দেখার প্রয়াসে। চোখে পড়লো এক সুন্দর মুখশ্রী। কলাপাতা রঙের শাড়ি পরিহিত। হাতে সবুজ রঙের কাচের চুড়ি। চুল গুলো একপাশে বেণি করা। গায়ের রঙটাও বেশ ফর্সা। মাথা নুইয়ে রেখেছে।

তুযা চিনে মেয়েটাকে। তার মায়ের সৎ বোনের মেয়ে। ফুলমালা। গত বছরই ফুলমালার মা মারা গেছে। তুযা পানিটা না ধরায় ফুলমালা নিজেই বলল
“নিন আপনার পানি”

তুযা আধশোয়া থেকে উঠে বসলো
“ফুল তুই?”
মুচকি হাসলো ফুলমালা। তুযা পানির গ্লাসটা নিয়ে বলল
“আসছি তো কাইল বিকেলে। আপনারে তো বাড়ি পাওনই দায়। কই ছিলেন?”

তুযা পানি খেয়ে গ্লাস টা পুনরায় ফুলমালার হাতে দিলো
“আমার আর থাকা না থাকা রে। তা তোর কি খবর বল”

ফুলমালা সোফার অপরপ্রান্তে বসলো
“আব্বায় ভিনদেশে গেছে বানিজ্যের লাইগা। মাস তিনেকের ফের। একা বাড়িতে থাকি কেমনে। নানাও গত হইসে আম্মার পরপর। তাই আব্বায় বলল খালুজান এর বাড়িতে থাকতে”

“হ ভালো করছস। আইচ্ছা থাক ঘুমামু আমি।”

তুযা ঘরে যাওয়ার আগে কবিতার খোঁজ করলো। লতিফা জানালো কবিতা স্কুলে গেছে। ঘরের উদ্দেশ্যে রওনা হতেই ফুলমালা পিছন থেকে ডাকলো
“তুযা ভাই”

তুযা দাড়ালো। ফুলমালা গুটি গুটি পায়ে হেটে এসে লজ্জা মিশ্রিত মুচকি হেসে তুযার দিকে একটা রুমাল বাড়িয়ে দেয়। সাদা রুমাল এ রঙিন সুতায় কাজ করা। তুযা কপাল কুচকে বলে
“কি এইডা?”

ফুলমালা মাথা নিচু করেই লাজুক কন্ঠে বলে
“রুমাল তুযা ভাই। আপনার জন্য আমি নিজ হাতে সেলাই করছি।”

তুযা এর ভাব চক্কর জানে। মনে মনে যে সে তুযা কে পছন্দ করে, তা তুযার বিচক্ষণ মাথা ঠিকই টের পায় তার ব্যাবহারে। কিন্তু এমন একটা ভাব করে তুযা যেনো কিচ্ছু জানে না। রুমাল টা হাতে নিয়ে দেখলো। ফুল পাতার মধ্যে সুন্দর করে লেখা তুযাউন। মৃদু গলা খাকারি দিয়ে রুমাল টা আবার ফুলমালার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলে
“এইয়া দিয়া আমি কি করমু? কবিতা আইলে ওরে দিস ওয় খুশি হইবো”

ফুলমালার খুশি মুখটা বিষন্ন হয়ে যায়। অভিমানের স্বরে বলে
“ক্যান তুযা ভাই? এইডা আমি আপনার লাইগা বানাইছি তো। কবিতারে আরেকটা বানাই দিমু নি আমি। এইডা আপনে রাখেন”

তুযা রুমাল টা ভাজ করে নিলো
“কি বার বার তুযা ভাই তুযা ভাই কস। হেইদিন দেখলাম হইতে। খালি ভাই কইলেই তো হয়”

তুযা চলে গেলো ঘরে। ফুলমালা সে কি খুশি তুযা রুমাল টা নেওয়ায়। বিড়বিড় করে বলল
“যারে স্বামী বানাইবার চাই, তারে মোটেও ভাই কইবার মনে চায় না হুহহ”

রুমাল টা ঘরের কোনো এক কোণে ছুড়ে ফেলে শুয়ে পড়ে তুযা। মেয়েটা নেহাৎ ছাই বনে পানি ঢেলে চলেছে। তুযার দ্বারা আর কাওকে ভালোবাসা হবে না। তার মনে মন একটাই আর সেখানে একজন কেই জায়গা দেওয়া যায়। অনেকল বলে সঠিক মানুষ জীবনে এলে দ্বিতীয় বার ভালোবাসা যায়। তুযা তা একদম মানে না। প্রায় এক যুগ আগে দেওয়া এক মলিন কাপরের ওপর আকা রুমালের মায়া আজও ছাড়তে পারে নি সে। অন্য কারো বোনা রঙিন সুতোয় আজ মন ভুলবে বুঝি?

সেই যে কবে হলুদ কাপড় খানায় জোৎস্না ইংরেজি অক্ষরে দুজনের নাম রঙিন সুতো দিয়ে সেলাই করে দিয়েছিলো। আজও তাতে জোৎস্নার ঘ্রাণ পায় তুযা। আলমারির বিশেষ ড্রয়ারটায় তালা বন্দী সেই রুমাল খানা। তার পাশে অন্য কিছুর জায়গা হবে না। অবুঝ কিশোরি ভুল জায়গায় স্বপ্ন দেখছে। আনমনেই হাসে তুযা। কয়েক বছর হয় খোলা হয় না সেই ড্রয়ার টা। হাতে নেওয়ার সাহস ওবদি হয় না সেই রুমাল খানা।

কিছুক্ষণের মধ্যেই ঘুমের কোলে ঢুলে পরে তুযা। ফুলমালা দিনে বহুবার তুযার ঘরের আশেপাশে ঘুরঘুর করে, উঁকি ঝুকি মারে। কিন্তু তার পছন্দের পুরুষখানা যে সন্ধ্যার আগে উঠবে না।

আজ নিজ হাতে অনেক গুলো পদ রান্না করেছে ফুলমালা। উদ্দেশ্য তুযার মন জয় করা। তুযা আজ বিকেলেই উঠে যায় ঘুম থেকে। হাতমুখ ধুয়ে টেবিলে এসে বসে খাওয়ার জন্য। ফুলমালা নীল শাড়িও পড়েছে। ফিতে দিয়ে চুল বেণি করেছে। লতিফা কে ঘরে আরাম করতে বলে নিজে আসে তুযা কে খাবার দিতে। লতিফাও আরাম পায় বেশ ফুলমালা এসেছে পর থেকে। মেয়েটা বড্ড কাজের। থালায় করে ভাত দিয়ে ছোট ছোট বাটিতে ৭-৮ রকম ভাজি আর তরকারি সব সাজিয়ে তুযা কে পরিবেশন করে। তুযা কবিতাকে ডাকে। ফুলমালা জানায় কবিতা ঘুমে। তুযা খাওয়া থামিয়ে তাকায় ফুলমালার দিকে
“এই অসময়ে ঘুম? ক্যান রে শরীর খারাপ করছে নি মেয়েটার?”

ফুলমালা হেসে বলে
“আরে না। ইশকুল থিকা ফিরছে বাদে গোসল করাই, খাওয়াই ঘুম পারাইছি। পড়া লেখা করে দুপুরে একটু ঘুমান ভালো”

তুযা কিছু না বলে খাওয়ায় মন দিলো
“রান্না তুই করেছিস?”

ফুলমালা খুশি হয়ে যায়
“কেমনে বুঝলেন?”

“না বুঝার কি আছে? রোজ মায়’র হাতের রান্ধন খাই। আইজ পরিবর্তন, তো বুঝমু না?”

“কদভানু চাচিও করতে পারতো”

“ভানু চাচি কখনো রান্ধে না”
“যাই হোক! কেমন হইছে?”

খুব আশা করে প্রশ্ন টা করে ফুলমালা। তুযা বুঝি খুব প্রসংশা করবে। কিন্ত তার আশায় পানি ঢেলে দিয়ে তুযা বলল
“কম খারাপ না”

অর্ধেক খাওয়া করেই উঠে গেলো। তুযার কথা বুঝলো না ফুলমালা। একা একা বিড়বিড় করছে
“কি বলল উনি? খারাপ না? মানে ভালো। না না, বলল কম খারাপ না। তাইলে ম্যালা খারাপ?”

চেয়ারে বসলো মাথায় হাত দিয়ে। কি করলে এই লোকটার মন পাওয়া যাবে?

সন্ধ্যায় শাওনের বাসা থেকে লোক এসেছে। গোটা বিশেক মানুষ। নদীকে আংটি পড়াবে। খাওয়া দাওয়া শেষ করে আসে আংটি পড়ানো পড়ানো পর্বে। নদী সাদা একটা থ্রু-পিস পরেছে। যদিও শাওন শাড়ি পাঠিয়েছিলো। কিন্তু নদী পরেনি।

শাওনের মা তাড়া দিলো নদীকে আংটি পড়াতে। শাওন পাঞ্জাবির পকেট থেকে রিং বক্সটা বের করে খুলতেই অবাক হয়ে গেলো। এটা তো কিনে নি সে? অন্য ডিজাইন কিনেছিলো। কিন্তু এত লোকজনের সামনে এসব বললে নিজেদেরকেই লজ্জায় পরতে হবে বিধায় বলল না। সেটাই পরিয়ে দিলো নদীর আঙুলে।

সকলেই খুশি। একে অপরের সাথে কথা বলায় ব্যাস্ত সবাই। শাওন নদীকে বলল
“আচ্ছা তুমি কি এমনই চুপ করে থাকবে? কথা বলো না কেনো? কার রাতে কল দিলাম। তাও কথা বললে না”

“কাল তো আমি ঘুমোচ্ছিলাম। ঘুমের মধ্যে কল ধরলে আবার আমার মুখ থেকে শুধু গালি বেরোয়। তাই আর….”

“আচ্ছা বাদ দাও। এমন কিছু বলো না, যাতে আমার হার্টবিট ফাস্ট হয়ে যায়”

নদী বোকা বোকা হেসে বলল
“আমি প্রেগন্যান্ট”

শাওনের মুখ থুবড়ে পরার অবস্থা। নদী হচকচিয়ে বলল
“আরে আরে কি হলো?”

শাওন শুকনো ঢোক গিলে বুকে কয়েকটা চাপড় মারলো
“মনে হয় হার্টবিট বন্ধ হয়ে গেছে?”

বুকে হাত দিয়ে উঠে দাড়ালো শাওন।
“এটা কি সত্যি?”

নদী হেসে বলল
“আরে ধুররর। আমি তো আপনার হার্টবিট বাড়াতে বললাম।”

শাওন এদিক ওদিক তাকিয়ে বলল
“অ…অহহ। আমি তো সত্যিই ভেবে ফেলেছিলাম”

“তাই? তাহলে সত্যিই?”

“কীইইইই?”

“আবার মজা করলাম”

আজ বড় করে দিছি। কেমন হলো বলিও 🥹🫶
আজ আমারও দেখার আছে কেমন সারা দেও তোমরা 🔪

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply