খাঁচায়বন্দীফুল
jannatul_ferdous_জান্নাতুল_ফেরদৌস
পর্ব – ৩৭
রাত্রির দ্বিতীয় প্রহর চলমান। বাহিরে ঝুম বৃষ্টি। ব্যালকনির স্বচ্ছ কাঁচে বার বার ছিটে আসছে বৃষ্টির কণা। সেখানে বসে বৃষ্টি বিলাস করছে এক সুখী দম্পতি। যারা একে অপরের পরিপূরক। বাইরে ঠান্ডা আর কম্ফোর্টার এর ভিতরের উষ্ণতায় চোখে ঘুম লেগে আসছে অদিতির। নিভু নিভু চোখে তাকালো সাইফের মুখ পানে।
সাইফের মুখ ভাড়। অদিতির কথাটার মানে সে বুঝতে পারেনি। আর না অদিতি বুঝিয়ে বলছে। তা নিয়ে মুখ বেজার করে বসে আছে। অদিতি নিজের নরম হাতটা সাইফের দাড়িতে বুলিয়ে বলল
“কী হলো? মুখটা ওমন করে থাকলে আমার বুঝি ভালো লাগে?”
সাইফ ভ্রু কুঞ্চিত করে অদিতির দিকে তাকালো
“তুমিও আমার থেকে কথা লুকাও?”
“ইশশ, আপনি লুকান না বুঝি? আপনি লুকিয়েছেন। তাই আমিও লুকাচ্ছি”
সাইফ এর কপালের ভাজ গাঢ় হলো। বেশ চালাক আছে অদিতি। যতটা বোকা সোকা ভেবেছিলো, তা মোটেও না। সাইফ হাফ ছেড়ে বলল
“তোমাকে তো বলেই দিলাম সব। এখন তুমি বলো”
অদিতি সাইফের বুকের সাথে আরো মিশে গেলো। দৃষ্টি বাহিরের বর্ষণে। কিছুক্ষণ নিশ্চুপ থেকে হঠাৎ বলে উঠলো
“নদী আপু আপনাকে ভালোবাসতো”
সাইফের কর্ণকুহরে কথা টা পৌঁছাতেই শরীরে যেন ঝাকুনি দিলো। বিষ্ময়ে চোখ কপালে তার। এ কি বলছে অদিতি? নদী-দীঘি দুজন কেই বোন এর নজরেই দেখেছে ছোট থেকে। যদিও দীঘি একটু বেশিই আপন, আর ভাইয়া ভাইয়া করে ডাকে বেশি। নদী অতটা মিশতো না। কিন্তু নদী তাই বলে সাইফ কে ভালোবাসতে পারে? এ হতে পারে না। সাইফ কপট রাগ দেখিয়ে অদিতিকে বলল
“তুমি জানো তুমি কি বলছো? এসব ফালতু কথার মানে কি অদিতি?”
অদিতি জানতো সাইফ জানার পর এমন কিছুই বলবে। অদিতির ভাবনার মাঝেই সাইফ আবার বলল
“তুমি কিসের ভিত্তিতে এমন কথা বলছো? না মানে আমি ঠিক বুঝলাম না….”
সাইফের কথা শেষ হওয়ার আগেই অদিতি বলল
“এজন্যই আপনাকে বলতে চাইনি। তবুও শুনতে চাচ্ছেন”
সাইফ বিরক্ত হলো
“আচ্ছা বলো”
অদিতি দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলতে শুরু করলো।
“যেদিন আমাদের বাড়িতে কাবিন করা হলো। তারপর দিন দীঘি আপুর মন মেজাজ খুব খারাপ ছিলো। কিচেনে পানি নিতে এসেছিলো। আমি বললাম মুখ বেজার কেনো? প্রথমে বলতে চাচ্ছিলো না। আমি আরেকটু জোর দিতেই কেদে ফেললো। বলল কাল নদী আপুকে বাসর সাজানোর কথা বলতেই, নদী আপু চড় মেরেছে দীঘি আপু কে। আমার খুব অবাক লেগেছিলো। এই সামান্য কথায় কেউ কাউকে মারে?”
“তো এতে কি প্রমাণ হলো? নদী আমাকে ভালো বাসে? হাউ ক্যান ইউ সে দিস?”
অদিতি কপাল কুচকে বলল
“না তাতে কিচ্ছু প্রমাণ হয় না। প্রমান তো তখন হলো যখন আমি নদী আপুর ডায়েরি আর তার বান্ধবীর সাথে কথা বলতে শুনলাম।”
“তুমুল ভাইয়া দেখতে আসার আগের দিন নদী আপুর ওই লাল চুলের বান্ধবী টা কল করলো। আমি ধরলাম। উনি বলল। কিরে বেবি? তোকে না বললাম ক’দিন আমার বাড়িতে এসে থেকে যা। চোখের সামনে সাইফ ভাইয়ার বউ সেজে গুজে ঘুরছে, তোর কি একটুও কষ্ট হয় না? কি দিয়ে তৈরি রে তুই? যাকে ভালোবাসিস এতকাল ধরে, তার বউকে দেখেও হিংসা হয় না তোর?
আমি কথা বললাল না কোনো। উনি হ্যালো হ্যালো করে কেটে দিলো। তারপর আমি ফোনটা নিয়ে আপুকে দিই। আর ডায়েরিটা পেয়েছিলাম কাকিয়া যখন আমাকে আপুর ঘর গোছাতে বলেছিলো।”
অদিতি একটু চুপ থাকলো। সাইফ এক মনে অদিতির কথা শুনছে। বলতে বলতে অদিতির চোখের পাতা ভিজে উঠেছে। আঙুল দিয়ে চোখের কার্নিশ মুছে বলল
“ডায়রিটা পরে তো আমারই হিংসা লাগছিলো। কেউ আমার স্বামী কে নিয়ে তার অনুভূতি এভাবে লিখবে? অথচ দেখুন, নদী আপু কত মহান। যাকে কিশোরী বয়স থেকে ভালোবাসে, তার স্ত্রীর প্রতি এতটুকু হিংসা জন্মায়নি।”
সাইফ বাকরুদ্ধ। অদিতিও চুপ করে আছে।
“ডায়েরির শেষ কয়েকটা পাতায় আমি তুমুল ভাইয়াকে নিয়ে লেখা দেখলাম। আমি চাই তার এই ভালোবাসা যেন তাকে সুখের সাগরে ভাসিয়ে দেয়। নিজের ভিতর খুব অপরাধ বোধ কাজ করছিলো জানেন?”
অদিতি আষ্টেপৃষ্টে জরিয়ে রেখেছে স্বামী কে। যেনো ছেড়ে দিলেই বুঝি হারিয়ে যাবে। সাইফ ও নিজ স্ত্রীর কপালে চুমু খেলো
“বিশ্বাস করো, সারা জীবন নদী কে নিজের বোন ভেবে এসেছি। তাই ওর হাজার অনুভূতি ও আমার ভিতরে পৌছাতে পারতো না। আমার অনুভুতি গভীরে পৌছেছিলো ওই দিন। যেদিন কয়েকজন মেয়ে তোমাকে টেনে এনে আমার সামনে ফেলেছিলো।”
সাইফ দম নিলো। আবার বলতে শুরু করলো
“সেদিন তোমাকে দেখে কি যে এক অনুভূতি হলো। ওমন আগে কখনো হয় নি। পরে একবার হয়েছিলো। যেদিন তুমি প্রথম শাড়ি পরে সিড়ি দিয়ে নামছিলে। অন্য কোনো নারীর প্রতি আমি কখনোই এমন মুগ্ধতা নিয়ে দেখি নি, আর দেখার কথা চিন্তাও করি না”
“নদীর প্রেম আমরা দুজন মিলে পূর্ণতা দিবো। এখন আমায় একটু ভালোবাসতে দাও বাচ্চা বিড়াল টা”
সাইফ আর কথা না বাড়িয়ে কম্ফোর্টার সহ পাজা কটে কোলে তুলে নিলো অদিতিকে।
“আজকের বৃষ্টির রাতটা আমাদের ভালোবাসার সাক্ষি হোক প্রিয়তমা”
—
গ্রামের ফুরফুরে হাওয়ায় গরম এতটা গায়ে লাগে না। তুযার বরাবরের প্রিয় জায়গা হাওরের পাড়। শীতেও এখানে আড্ডা দিয়েছে। গরমে তো কথাই নেই। পারে তো নাওয়া খাওয়া ফেলে এখানেই পরে থাকে। তুযা মাচাল এর ওপর লুঙ্গি হাটুর ওপরে উঠিয়ে বসে আছে। সাথে একদল ছেলেপুলে। মানিক সিগারেট তুযার ঠোঁটে ধরছে, টান দেওয়া হলে আবার সরিয়ে নিচ্ছে।
বাতাসে এক পাজা ধোয়া উড়িয়ে মানিক কে বলল
“বিয়া করবি মাইনকা?”
মানিক সিগারেট টা আবার তুযার ঠোটে ধরে বলল
“কী যে কন না ভাই। আমারে মাইয়া দিবো কেডা?”
“তর জন্যে একখান মাইয়া আমি দেখছি রে। পাশের গায়ের মকবুল চাচার মাইয়া। কালা হইলেও, খুব লক্ষি আর ভালা। তোর মায়ের সাথে বুনবো ভালো”
বিয়ের কথা শুনে মানিক খুব লজ্জা পেলো। খুচিও হলো অবশ্য। তুযা মানিকের মুচকি মুচকি হাসা দেখে নিজেও হাসলো। মানিকের কাধে চাপড় দিয়ে বলল
“ যাহহহ, এই খুশির সংবাদের পর, আমারে একটু ‘আকা বাঁকা মেঠো পথে কোন রুপসি হেটে যায়’ গানে কোমড় দুলিয়ে দেখা”
মানিকের হাসি মুখটা ফের চুপসে গেলো
“কি কন ভাই? আমি কি মাইয়া নাকি? আমি ক্যাম্নে কোমড় দোলামু?”
তুযার পায়ের কাছে বসে থাকা শফিক বলল
“ছোট সাহেব আমি কিন্তু পারি”
“তাই? তয় দেখা?”
শফিক উঠে দাড়িয়ে বলল
“গান কেডা গাইবো?”
তুযা মানিকের কাধে কনুই ঠেকিয়ে সবার উদ্দেশ্যে বলল
“অই তরা গান ধরোস না ক্যা?”
সবাই গোল হয়ে দাঁড়িয়ে হাততালি দিতে লাগলো আর গান ধরলো
বৃষ্টি পড়ে টাপুর টুপুর। পায়ে দিয়ে সোনার নুপুর
আঁকা বাঁকা মেঠো পথে। কোন রুপসি হেটে যায়
সাথে শফিকের কোমড় দুলানো নাচ। যদিও মেয়েদের মতো হবে না। তবুও খারাপ না।
তুযা হো হো করে হাসতে লাগলো। হাসি মজার মধ্যেই তুযার চোখে পরলো এক লোক এক মহিলাকে চুলের মুঠি ধরে মারতে মারতে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। তুযা হাত ইশারা করে থামতে বলল সবাই কে। তুযার দৃষ্টি অনুসরণ করে সকলেই সেদিকে তাকালো। মানিক বলল
“ওই হালা আর ভালো হইবো না। বউ ডারে পত্তেক দিন মারে ভাই”
তুযা ভ্রু গুটিয়ে বলল
“ কে রে এইডা?”
“ওই যে মাছ ধরে মানু, মানুর বড় ছাওয়াল রমিজ এইডা। খুব খারাপ ভাই। বউডা হারা ডা দিন কাম করে, অহন তো আমনেগো ফ্যাক্টরিতে কাম ও লইছে। তাও ধইরা মারে”
তুযা মাচাল থেকে নেমে দাড়ালো
“নিয়া আয় তো আমার কাছে। বহুত দিন মানুষ মারি না। ওরে আইজ ভবের গাড়া গাড়মু। লই আয়”
কয়েকজন ছুটে গিয়ে মহিলাটিকে রমিজের থেকল ছাড়ালো। রমিজ কে পিঠমোড়া করে ধরে এনে তুযার সামনে দাড় করায়। তুযা গামছা কোমরে বেধে বলল
“কিরে? তুই বলে বউ মারস রোজ?”
রমিজ তুযা কে ভালো মতোই চিনে। ও যে যমের হাতে এসে পরছে, তা হারে হারে টের পাচ্ছে।
“না ছুডো সাহেব। ওয় পরকিয়া করে ওই মিন্টু জাইলার সাথে”
রমিজের স্ত্রী আহাজারি করে কেদে ওঠে
“আল্লাহ সইবো না ছুডো সাহেব। এত বড় মিথ্যা অপবাদ দিতাসে উনি আমারে। হ্যায় কাম কাইজ তো করেই না। নেশা-পিন্না কইরা আইয়া আমারে রোজ পিডায়”
তুযা ধমকে উঠলো মহিলা কে
“এত দিন ধইরা বাল ফালাইতে মাইর খাইতেছো? প্রধান বাড়ি কি চিনো না?”
রমিজের গলায় গামছা পেচিয়ে ধরে বলল
“আরো মারবি বউ?”
“না না জীবনেও না। আর কোনো দিন মারতাম না ছুডো সাহেব”
তুযা বলল
“বুঝিস। আর কোনো দিন এই কথা আমার কানে গেলে কিন্তু তোর মাথা ডা হাওরের পারে থাকবো, আর দেহ ডা ফালাই দিয়া আমু মনিপুর জঙ্গলে”
রমিজ আকুতি করে বলল
“জীবনেও মারমু না আর ছোট সাহেব। আমারে ক্ষমা কইরা দেন”
তুযা চেচিয়ে সবাইকে বলল
“হুনছস সবাই? ওয় ভালা হইয়া গেছে। এই খুশিতে আবারা নাচা-গানা হইবো। এই বার রমিজ নাচবো। এই তোরা গান ধর”
চলবে?
অবশ্যই একটি মন্তব্য করবেন 😌🫶
আপনাদের রেসপন্স এত কমে যাচ্ছে কেনো 🙂
Share On:
TAGS: খাঁচায় বন্দী ফুল, জান্নাতুল ফেরদৌস
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ১৪
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ৩৫
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ৩০
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ২৯
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ১৬
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ৩১
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ২৮
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ২৭
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ২০
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ৩৪