Golpo কষ্টের গল্প খাঁচায় বন্দী ফুল

খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ৩৩


কপি করা কঠোর ভাবে নিষিদ্ধ ⚠️

খাঁচায়বন্দীফুল

jannatul_ferdous_জান্নাতুল_ফেরদৌস

পর্ব – ৩৩

চামেলির চিৎকার ড্রইং রুম অবদি পৌঁছেছে। সকলেই ছুট লাগালো চিৎকার এর শব্দে। নদীর রুমের সামনে হাত দিয়ে মুখ চেপে বড় বড় চোখে তাকিয়ে আছে চামেলি। সবার আগে এলো অদিতি।
“কি হয়েছে চামেলি আ…..”

নদীর রুমে চোখ পড়তেই দেখা গেলো নদীর ঝুলন্ত পা দুটো। মুখ হা হয়ে গেলো অদিতির। চিৎকার দিলো সে ও। সকলে চলে এসেছে ততক্ষণে দরজার সামনে। সকলের চোখের সামনে নদী ফ্যানের সাথে ঝুলে আছে।

সাইফ একলাফে গিয়ে নদীর খাটের ওপর উঠে পা উচু করে ধরলো নদীর। হাবিব চৌধুরী ও এসে গলা থেকে ছাড়িয়ে নেয় ওড়না। ধপাস করে নিস্তেজ দেহটা পড়লো খাটের ওপর। সায়রা আর আঞ্জুমান ক্রমশ চিৎকার করেই চলেছে। আচমকা এমন ঘটনায় সবাই আতঙ্কিত। সাইফ নদীর নাকের কাছে আঙুল দিলো। সাইফের শিরদাঁড়া বেয়ে একটা শীতল স্রোত বয়ে গেলো। শুধু সবার দিকে তাকিয়ে দুদিকে ঘাড় নাড়লো।

আচমকা সবাই নিরব হয়ে গেলো রুমের। সাইফ ও নিশ্চুপ হয়ে গেলো । নিশ্বাস চলছে না নদীর। হাবিব ধপ করে বসে পড়লো ফ্লোরে। সাইফ কী মনে করে কোলে তুলে নিলো নদীকে। চিৎকার করে ডাকলো ড্রাইভার কে।
“শামীম দ্রুত গাড়ি বের কর”

নদীকে কোলে নিয়েই ছুটলো বাইরে। পিছন পিছন ছুটলো অদিতি আর হাসান চৌধুরী। নদীকে গাড়িতে তুলে সোজা নিয়ে যাওয়া হলো হাসপাতালে। ইমারজেন্সি তে নেওয়া হলো তাকে। ডাক্তার ছুটে আসে। ঘারে আঙুল চেপে ধরে বলল
“বেচে আছে। বেচে আছে”

হচকচিয়ে যায় সবাই। ডাক্তার গলা করে ডাকে নার্স কে
“দ্রুত আইসিইউ তে ঢুকাও পেশেন্ট কে। অবস্থা খুবই আশঙ্কাজনক”

প্রায় ঘন্টা পেরিয়ে গেছে। ডাক্তার এখনো আসেনি। হাসান চৌধুরী ভীষণ অস্থির। অদিতিও মনে মনে খুব প্রার্থনা করছে যাতে নদী বেচে যায়। সাইফ দেয়ালে মাথা ঠেকিয়ে দাড়িয়ে আছে। ডাক্তার এসে হাসান চৌধুরী কে সম্মানের সহিত বললেন
“স্যার আপনি টেনশন করবেন না। পেশেন্ট বেচে তো গেছেন কিন্তু…. “

“কিন্তু কি ডক্টর?”

সাইফ এগিয়ে এলো ডাক্তার এর কাছে। ডাক্তার শান্ত গলায় বলল
“ওনার শ্বাসনালি তে মারাত্মক আঘাত লেগেছে। নিশ্বাস দীর্ঘক্ষণ আটকে থাকায় মস্তিষ্কে অক্সিজেন এর ঘাটতি দেখা দিয়েছে। হয়তে মেমোরি লস হতে পারে। আল্লাহ কে ডাকুন”

ডাক্তারের কথা শুনে সায়রা আর নিজেকে সামলাতে পারল না। চেয়ার আঁকড়ে ধরে বসে পড়ল সে। ঠোঁট কাঁপছে, চোখ বেয়ে অঝোরে জল পড়ছে।
“আমার মেয়েটা…”
কথাটা শেষ করতে পারল না সায়রা।
হাবিব চৌধুরী স্ত্রীর কাঁধে হাত রাখলেন। নিজের কণ্ঠও কাঁপছে, তবু শক্ত থাকার চেষ্টা করছেন।
“আল্লাহ বড়। যা হবার হবে। এখন ভেঙে পড়লে চলবে না।”
সায়রা এক ঝটকায় সরিয়ে দিলো হাবিব চৌধুরীর হাত
“ছোবেন না আমায়। কে বলেছিলো আমার মেয়েটাকে এত শাসন করতে। হুটহাট কোনো কিছু করার মেয়ে না নদী। কেন শুনলেন না ওর কথা”

সাইফ একটু দূরে দাঁড়িয়ে সব শুনছিল। ডাক্তারের কথাটা বারবার মাথার ভেতর ঘুরছে।
মেমোরি লস।
অদিতি ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে সাইফের পাশে দাঁড়াল।
“সব ঠিক হয়ে যাবে,”
ফিসফিস করে বলল সে।
কিন্তু সাইফ কোনো উত্তর দিল না। তার চোখ আটকে আছে আইসিইউর বন্ধ দরজার দিকে।
কয়েক ঘণ্টা পর নার্স এসে জানাল, নদী এখনো অচেতন। আইসিইউতে রাখা হয়েছে, লাইফ সাপোর্টে আছে।
সায়রা ছেলের মতো করে সাইফের হাত ধরে ফেলল হঠাৎ।
“সাইফ… তুই বল তো, আমার নদী কি আমাকে চিনবে? ও কি সত্যিই….”
এই প্রশ্নের কোনো উত্তর নেই। তবু গলা শক্ত করে বলল,
“চিনবে কাকিয়া। আল্লাহর ওপর ভরসা রাখো”
অদিতি চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিল। তার ভেতরেও অজানা ভয়। যদি নদী বাঁচে, কিন্তু সব ভুলে যায়? যদি এই ঘরটাই তার কাছে অপরিচিত হয়ে যায়?
তুমুল কে ভুলে যায় যদি? ওদের যে বিয়ে হয়েছে। সেসব কি ভুলে যাবে সত্যিই?

অদিতি আর হাসান চৌধুরী কে বাড়িতে পাঠিয়ে দেওয়া হলো। হাবিব চৌধুরী সাইফ কেও বাড়িতে পাঠিয়ে দিলেন। সায়রার খেয়াল রাখতে শুধু আঞ্জুমান রয়ে গেলো। অদিতি ভাবলো বাড়িতে গিয়েই তুমুলের সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করবে।

বাড়ি পৌছাতে অনেক রাত হলো অদিতির। ড্রইং এ পায়চারি করছে কি করে তুমুলের সাথে যোগাযোগ করা যায়। ওই বাড়ির কারো নাম্বার এই অদিতির কাছে। অদিতি একবার ভাবলো দিঘির কাছে সাহায্য চাইবে। কিন্তু দীঘির সাথে কথা বলে জানতে পারলো দীঘির কাছেও তুমুলের বা তুমুলের বাড়ির কারো নাম্বারই নেই।

—-

রাত গভীর। আকাশে রূপালী থালার মত বিশাল চাঁদ উঠেছে। চৌধুরীদের কবরস্থান টা একেবারে ফুলের বাগানের ন্যায়। ওহাব চৌধুরীর বিশেষ পরিচর্যায় সব সময় পরিষ্কার এবং অগাছা মুক্ত থাকে। সেখানে তার গুরুজন রা শুয়ে আছে।

মেহেরজান এর কবরটা তে এখনো ইটের দেওয়াল তোলা হয় নি। বাশের বেড়া দেওয়া। চারিপাশে সবুজ ঘাস। সেই ঘাসের ওপর বসে কবরের বেড়ায় মাথা ঠেকিয়ে এক দৃষ্টিতে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে তুযা। আনমনে বলতে লাগলো
“আর কয়ডা দিন তো থাইকা গেলেও পারতা। জানো আমি এহন কাম করি। বাবার ফ্যাক্টরি, তারপর মিলের হিসাব নিকাশ দ্যাখ-শোন সব আমি করি। তুমি খুশি হইছো না শুইনা?”

হাসে তুযা। একা একাই হাসে। হাসতে হাসে চোখে পানি চলে আসে
“ও রহমানের মা। কথা কও না ক্যান। এতক্ষণ তো আমারে ঝাড়ু দিয়া দৌড়ানি দিতা। অহন দেও না ক্যা?”

খানিক চুপ থাকলো। ফের বলল
“কী ভাবতেছো? বাড়ি যাই না ক্যান? কি করতে যামু কও। অহন কী আর তুমি আছো যে ভাত বাইরা বইয়া থাকবা? ওই যে ছোট্ট মাইয়াডা। ওয় থাহে মাজে সাজে।”

তুযার বুক চিরে বেরিয়ে আসে দীর্ঘশ্বাস।
“তুমারে আমার ম্যালা মনে পরে মেহের। বাড়ি গেলেই তুৃমার কথা মনে পরে। এই দুঃখে বাড়িই যাইতে মনে ধরে না।”

“বইতাম ওই ডাঙার পাড়ে। শালার হেই হানে বইলেও ওই ঘাতিনী রে মনে পরে। আমি যামু কনে মেহের। কও তো। মনডায় এহন চায় তোমার ধারের কাছেই একখান ঘর করি।”

গেটের সামনে থেকে হারিকেন হাতে কেউ একজন তুযা কে ডাকে। তুযা ঠিকঠাক শুনতে পায় না। হারিকেন বহন করা লোকটি এগিয়ে আসে আরো। তুযা এখন স্পষ্ট দেখলো মানিক কে
“ভাই। কবিতার জ্বর মাথায় উঠছে। জলদি আহেন। হাসপাতালে লইতে হইবো”

দু’টো দিন পার হয়ে গেছে নদী লাইফ সাপোর্টে আছে। চৌধুরী পরিবারের হাসপাতালে যাতায়াত চলছে। হাসান চৌধুরী এ’কদিন একবারের জন্যও যায় নি। পাছে মিডিয়ার লোক জেনে যায়।

তাদের বাড়ির মেয়ে সুইসাইড করতে চেয়েছিলো। বিষয়টা বিরাট বড় সমস্যার মুখে ফেলতে পারে।

নদীর চোখের পাতা কেঁপে উঠল। মনিটরের শব্দ একটু বদলালো। নার্স ছুটে এলো।
“ডক্টর! পেশেন্ট রেসপন্স করছে।”
সবাইকে বাইরে রাখা হলো। মিনিট দশেক পর ডাক্তার বেরিয়ে এসে বললেন,
“জ্ঞান ফিরেছে। কিন্তু এখনো কিছু বলা যাচ্ছে না। আমরা অবজারভেশনে রাখবো।”
সায়রা কাঁদতে কাঁদতেই সিজদায় পড়ে গেল।
“আল্লাহ… আমার মেয়েটাকে ফিরিয়ে দাও।”

পরদিন
নদী আধখোলা চোখে তাকিয়ে আছে সাদা সিলিংয়ের দিকে। চারপাশে অচেনা শব্দ, অচেনা গন্ধ। গলায় ব্যথা, কথা বলতে কষ্ট হচ্ছে।
সায়রা ধীরে কাছে এগিয়ে গেল।
“মা…মা ঠিক আছিস তুই?”

নদীর চোখ ধীরে ধীরে সায়রার মুখে এসে থামল। কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকল সে।
তারপর খুব আস্তে, ভাঙা কণ্ঠে বলল
“কী?”

ঘরটা হঠাৎ নিস্তব্ধ হয়ে গেল।
সায়রার হাত থেকে ওড়নাটা পড়ে গেল মেঝেতে। চোখে যেন অন্ধকার নেমে এলো।
ডাক্তার শান্ত স্বরে বললেন,
“এটাই আমরা আশঙ্কা করছিলাম। স্মৃতির বড় একটা অংশ আপাতত কাজ করছে না।”
সাইফ দরজার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল। নদীর দিকে তাকিয়ে তার বুকের ভেতরটা আজ মোচড় দিচ্ছে। বাড়ির দ্বায়িত্ববান মেয়েটাই আজ কাওকে চিনছে না।

কিন্তু কি এমন হলো যার জন্য নদী এত বড় দুর্ঘটনা ঘটাতে উদ্যত হলো। শুধু মাত্র তুমুলের অ্যাক্সিডেন্টের শুনে তো আর আত্মহত্যা করতে যাবে না। সবার মনে একই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে। কিন্তু অদিতি খেয়াল করল হাবিব চৌধুরীর ঠোটে খেলে যাচ্ছে কুটিল হাসি।

অদিতি এমনি ছোট মানুষ। তার উপর শহরে এসেছে কয়দিন হলো। কলেজ ব্যতীত কোথাও যাওয়া হয়নি। কোন হাসপাতালে তুমুল আছে সেটাও জানে না। আর জানলেও বা কি যেতেও পারতো না চিনে।

নদীকে আরো দুদিন হসপিটালে রাখবে বলল ডাক্তার। অদিতি দুপুর বেলা তেই বাড়িতে চলে এলো। অতীতের মনে শুধু ঘুরপাক খাচ্ছে কি করে তুমুলের খোঁজ পাওয়া যায়। হঠাৎ মাথায় আসলো চামেলীর কথা।

ছুটে গেল চামেলীর কাছে।
“চামেলি আপা তুমি তো অনেক বছর হলো শহরে আছো। তুমি নিশ্চয়ই শহরের অনেক কিছু চেনো।”

চামেলি স্বাভাবিক ভাবে উত্তর দিল
“ হ ম্যালা কিছুই তো চিনি। কেন হইসে?”

অদিতি চামেলির হাত ধরে বলল
“তুমি একটু নদী আপার স্বামীর খোঁজ করবে বোন? ভীষণ উপকার হতো আমার।”

চামেলি চারিদিকে চোখ বুলিয়ে বলল
“এই বাড়ির মাইয়া। এই বাড়ির লোক বুঝুক ভাবি। আমনে কেরে এর মধ্যে ঢুকতাসেন? আমনে চুপ থাকেন। এমনেই বাড়ির বউ গোরে দোষের সীমা নাই। দ্যাহেন না আমনের চাচা হশুর এ, উঠতে বইতে আমনেরে কতা হুনায়”

“সে শুনাক। তুমি একটু সাহায্য করো না। ভাইয়া সুস্থ হয়ে ফিরে এসে যদি দেখে নদী আপার অন্য কোথাও বিয়ে হয়ে গেছে, আর আমি কিচ্ছু করিনি এমনকি তাকে আটকাতে ওবদি পারিনি। ভীষণ খারাপ হবে গো”

চামেলি কিছুটা বিরক্তি নিয়ে বলল
“আমনেও না! তা খুজমু কই? এই ঢাকার শহর জানেন? ম্যালা বড়। এই হানে এমনে এমনে মানুষ খুজুন যায় না। আর আমি তো হ্যারে দেহিও নাই”

কথা টা ঠিকই বলেছে চামেলি। এখন অদিতি করবে টা কি। নদীর সুস্থ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা ছাড়া উপায় নেই দেখা যায়।

ফ্রেশ হয়ে ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাড়িয়ে ফোনে কথা বলছে সাইফ। আজ অফিসে যাবে। দৌড়াদৌড়ি তে অফিস টফিস সিকেয় তুলেছে। অদিতির ফোনটা বাজছে অনেকক্ষণ হলো। সাইফ কিছুটা বিরক্ত হচ্ছে এবার। এই মেয়েটাকে ফোনটা দিয়ে কোনো লাভ ই হলো না। কোথায় সে থাকে আর কোথায় তার ফোন?

সাইফ ই এগিয়ে গেলো না পেরে। নম্বর টা সেভ করা নয়। সাইফ এর মনে উদয় হলো, আবার কোথাও রোহান নয় তো?

ফোন রুসিভ করতেই ওপাশ থেকে শোনা যায় এক পুরুষালী কন্ঠস্বর
“হ্যালো অদিতি, আমি তোর মাহিদ ভাই বলছি পাখি”

চলবে?

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply