কপি করা কঠোর ভাবে নিষিদ্ধ ⚠️
অন্যের গল্প চুরি করে চোরের পরিচয় দিবেন না 🙂
খাঁচায় বন্দী ফুল
jannatul_ferdous_জান্নাতুল_ফেরদৌস
পর্ব – ১৪
” কি প্ল্যান বানালি ভাই। পুরাই কড়া।”
হু হু করে হেসে উঠল সবাই।সুফিয়ান হসপিটালের বেডে শুয়ে শুয়ে সিগারেট টানছে। এক পাজা ধোয়া উড়িয়ে বলল এ
“তো সবে শুরু সামনে কি হয় দেখতে থাক না।”
অমিত বলল
” এতে না হয় বিয়েটা ভাঙলো, কিন্তু নদীর বিয়ে কি তোর সাথে ওর বাড়ির লোক দেবে?”
সুফিয়ান কুটিল হেসে বলল
” দেখ না এরপর কি করি “
রানা বলল
” যাই বলিস ভাই তোর দম আছে কিন্তু। আর বুদ্ধি তো আছেই। তাই বলে তুমুল জোয়ার্দার রুমে মেয়ে ঢুকিয়ে দিলি “
আবার হাসলো সবাই। সুফিয়ান অ্যাস্ট্রেতে সিগারেটের ছাই চেপে বলল
” এখন খুকির বদনাম করতে হবে। খুকির হবু বরের তো বদনাম করা হয়ে গেল। হোটেলে মেয়ে নিয়ে ধরা পড়া কোন ছেলের সাথে নিশ্চয়ই মিনিস্টার হাসান চৌধুরী নিজের বাড়ির মেয়েকে দেবেনা।চলো, এবার মুন্নিকে বদনাম করার পালা”
” দোস্ত তুমুল তো বেল নিয়ে বেরিয়ে যাবে আজকালের মধ্যেই।”
সুফিয়ান হেসে বলল
” ওকে জেলে রাখাটা তো আমার উদ্দেশ্য ছিল না। আমার উদ্দেশ্য ছিল ওর বদনাম করা”
” তাহলে নেক্সট প্ল্যান কি?”
সুফিয়ান বেডে হেলান দিয়ে আয়েশি ভঙ্গিতে বলল
” এবার মুন্নিকে বদনাম করতে হবে। যাতে কোথাও বিয়ে দিতে না পারে….. তারপর আমি দয়ার সাগর হয়ে তার ভার বোঝা কাধে নেব।”
খিলখির করে হেসে উঠল সবাই।
” সাবাস গুরু। এভাবেই এগিয়ে যাও আর আমাদেরও দেখো।”
” আরে আমি মন্ত্রীর বাড়ির জামাই হলে তোদের দেখবো না? “
সকলে হাসাহাসি শুরু করল। সুফিয়ান বলল
” অনেক মজা হয়েছে ভাই চল এবার নেক্সট প্ল্যানটা করে নিই।”
চৌধুরী বাড়ির পরিবেশ আজ অন্যরকম। চারিদিক কেমন থমথমে। যেন শোক চলছে কারো। সকলে থমথমে মুখে বসে আছে ড্রয়িং রুমে। হাসান চৌধুরী এদিক-ওদিক পায়েচারি করছে টেনশনে। কত বড় অসম্মান হলো তার।
জিদ দেখিয়ে বলল
” এত বড় অসম্মান আমি এর আগে কোনদিনও হইনি। কত মানুষজন জেনে গেছে এই ঘটনা। সব লোকজন ইনভাইট করা হয়ে গেছে। এখন আমাদের হবু মেয়ের জামাই নাকি হোটেলে মেয়ে নিয়ে ধরা পড়েছে। ছিঃ। আমার মান ইজ্জত সব না ধুলোয় মিশে গেল?”
সাইফ বাবাকে সান্ত্বনা দিতে বলল
” বাবা হয়েছে এবার থামো। যা হওয়ার হয়ে গেছে। আমরা ওদের সাথে বসে কথা বলব।”
হাসান চৌধুরী আরো যেন তেতে উঠলেন
” কথা? কিসের কথা ওদের মতো লোকেদের সাথে? আর কোন কথা। না যত যাই হয়ে যাক, ওই বাড়িতে আমি আমার মেয়ে বিয়ে দিবো না। ফোন করো তুমুলের মাকে, জানিয়ে দাও সবটা। যে ওই বাড়িতে আমরা আত্মীয় করছি না “
নদীর চোখ বারবার পানিতে ঝাপসা হয়ে আসছে। সব সময় তার সাথেই কেন এমন হয়। আঞ্জুমান বেগম হাসান চৌধুরী কে বললেন
” আপনি একটু চুপ করুন তো। মেয়েটার কথা অন্তত ভাবুন, কি চলছে মনের মধ্যে।”
হাসান চৌধুরীর নদীর দিকে তাকিয়ে বলল
” তুই একদম ভাবি না মা। এসব নিয়ে একদম চিন্তা করবি না। এসব বাজে ছেলে তুই ডিজার্ভ ই করিস না।”
নদী সোফা থেকে উঠে এক দৌড়ে ঘরে চলে গেল। সকলে পেছন পেছন ডাকতে ডাকতে গেল
” নদী, এই নদী।”
হাসান চৌধুরীর ধমকে থামে সবাই
” যেতে দাও ওকে।”
নদী দৌড়ে ঘরে গিয়ে খিল এটে দিল। সবসময় তার সাথেই কেন এমন হয়। সবে জীবনটা ভালো হতে শুরু করল। আমার সবকিছু এলোমেলো হয়ে গেল ঘূর্ণিঝড়ের মতো। মানুষ তাকে এত ভালবেসে কেন ঠকায়? হঠাৎ করে নদী কান্না থামিয়ে শক্ত মুখে উঠে বসে।
“এবার আমি আর কাঁদবো না। আর কাঁদবো না আমি। এবার আমি এত শক্ত কঠিন নারী হব, আমাকে ঠকানোর আগে কাউকে ১০০ বার ভাবতে হবে। আর তুমুল কে ও আমাকে ঠকানোর জবাব দিতে হবে।”
তবুও নদীর মনে সংশয়। সত্যিই কি তুমুল এমন করতে পারে? কেন জানিনা সবাই বললেও বিশ্বাস হচ্ছে না নদীর। নদী বলল
” আমার তার সাথে দেখা করতেই হবে। সত্যিটা আমার জানতেই হবে। যদি ঘটনা সত্যি হয়ে থাকে তাহলে এর জবাব ওনাকে দিতে হবে যে উনি এমনটা কেন করল আমার সাথে।”
এর মধ্যে বাইরে চিৎকার চেঁচামেচি শুনতে পায় নদী। হাসান চৌধুরীর গলা বেশি শোনাচ্ছে। নদীর দরজা খুলে ওড়না গায়ে জড়িয়ে ড্রয়িং রুমের দিকে গেল। তুমুল দাঁড়িয়ে আছে সাথে তুমুলের মা এবং ছোট কাকা। চৌধুরী চিৎকার করে করে বলছেন
” কোন সাহসে আপনারা আমার বাড়ির চৌকাঠ মাড়িয়েছেন? বেরিয়ে যান আপনার চরিত্রহীন ছেলেকে নিয়ে। আমরা আমাদের মেয়েকে আইবুড়ো রাখবো তাও আপনার ছেলের মত চরিত্রহীন এর কাছে তুলে দেব না”
রাশেদা বেগম অনুরোধ করে বলছেন
” ভাইজান একটু বসে আমাদের কথাটা শুনুন। কোনো ভুল বোঝাবুঝি হচ্ছে। কেউ ফাসাচ্ছে আমার ছেলেকে। আমার ছেলে মটেও এমন না। ও এমনটা করতেই পারে না।”
ফাইভ জিদ দেখিয়ে বলল
” সে হাতেনাতে ধরা পড়ার পর সকলেই সাধু সাজে। হোটেলে এক রুমের মধ্যে আটক করেছে পুলিশ আপনার ছেলে কে কোনো যৌন*কর্মীর সাথে। তারপরও কোন সাহসে আপনার এত বড় বড় কথা বলছেন?”
তুমুলের কাকা তুমুলের মাকে বলল
” ভাবিজান, চলুন এখান থেকে। আমরা এনাদের যতই বোঝাই, এনারা আমাদের বিশ্বাস করবেন না। কারণ এনারা তো আর তুমুল কে ছোট থেকে চেনেন না। আমরা তুমুলকে চিনি। আমরা জানি ও এমনটা করতে পারেনা। চলুন আপনি। তুমুল চল।
” দাঁড়াও কাকাই”
তুমুলের কথায় পা থামালো তুমুলের কাকা এবং মা। তুমুল গিয়ে নদীর সামনাসামনি দাঁড়ালো
” তোমার গোটা পরিবার আমাকে ভুল বুঝুক, পুরো দুনিয়া আমাকে ভুল বুঝুক আমার কিছু যায় আসে না। যদি তুমিও বিশ্বাস করে থাকো এমন নোংরা কাজ আমি করেছি আমি আর একটা কথা না বলে এখান থেকে চলে যাব। আর তুমি যদি আমাকে বিশ্বাস করো যে এরকম কোন কাজ আমি করতেই পারিনা। তাহলে আমি সকলকে প্রমাণ করে দেখাবো, আমি নির্দোষ।”
নদী কান্না করেই চলেছে। তোমার কাঠ কাঠ গলায় বলল
” তুমি শুধু একবার বলো, বিশ্বাস কর তুমি এই ঘটনা? তোমারও কি মনে হয় আমি এত নোংরা?”
নদী এবার তুমুলের দিকে তাকালো
টলোমলো চোখে দুদিকে মাথা নাড়লো। অর্থাৎ না। সে বিশ্বাস করে না তুমুল এমনটা করতে পারে।
তুমুল মুচকি হাসলো।
” চলো মা। কাকাই চলো।”
ওরা তিনজনই বেরিয়ে গেল চৌধুরী বাড়ি থেকে। সাইফ বাবাকে বলল
” চোরের মায়ের আবার বড় গলা। নদীর জন্য অন্য পাত্র দেখতে হবে বাবা। অনেক গেস্টদের ইনভাইট করা হয়ে গেছে। নয়তো আমাদের ইজ্জত আর থাকবেনা। যেটুকু আছে সেটুকু তোলো মিশে যাবে।”
হাসান চৌধুরী ছেলের কথা সম্মতি জানিয়ে উপর নিচ মাথা নাড়ালো।
তুমুল বেরিয়ে গিয়ে মা আর কাকাকে বাড়িতে পাঠিয়ে দিয়ে সে চলে গেল হোটেল রেডিসনে। রাতে নদীর সাথে কথা শেষে খাবার খেয়ে ঘুমিয়েছে। কিন্তু সেই ঘুম এত গাঢ় কি করে হলো যে ঘরের মধ্যে কেউ একটা মেয়ে ঢুকিয়ে দিয়ে গেল আর কিছু বলতেই পারবে না। এমন ঘুম তুমুল কখনোই ঘুমায় না। হয়তো ওখান থেকে আনা খাবারে কিছু মেশানো ছিলো। সবটা বের করতে হবে তুমুলকে। স্পিড বাড়িয়ে গাড়ি চালাচ্ছে তুমুল। ফোনে কল আসলো। তুমুল ফোনটা হাতে নিয়ে দেখলো নদীর নাম্বার। গাড়ির স্পিড কমিয়ে ফোনটা রিসিভ করে কানে নিল
” বলো “
নদী কাদছে। ফুপাতে ফুপাতে কথাই বলতে পারছে না। তুমুল গাড়ি রাস্তার পাশে ব্রেক করলো। দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে খুব আদুরে গলায় বলল
” পাখিইইইইই। কেদো না। প্লিজ কেদো না। আমাকে ২ টা দিন সময় দাও। আমি প্রমাণ করে দেবো আমি নির্দোষ।”
নদীর কান্নার তোপ আরো বাড়লো।
” চাচ্চু আমার জন্য অন্য জায়গায় ছেলে দেখছে”
তুমুল এর কপাল কুচকে এলো আপনা-আপনি।
” এই খেলাটা যেই খেলুক। এর শেষ আমি দেখবো “
ফোন কেটে দিলো তুমুল। আবার গাড়িতে উঠে গাড়ি স্টার্ট দিলো। কল দিলো কোনো বন্ধুর নাম্বারে
” হ্যালো “
তুমুল ড্রাইভ করতে করতেই কথা বলল
” রাতুল?”
” হ্যা তুমুল বল। কিরে কি অবস্থা? “
” সিসিটিভি হ্যাক করতে পারবি?”
ওপাশ থেকে হাসলো
” এ তো আমার বায়ে হাত কা খেল। কিন্তু কার বাড়ির?”
” হোটেল রেডিসন”
তুযার জ্ঞান ফিরেছে। সকালে ঘিরে দাড়িয়ে আছে চারিদিকে। তাহমিদা বেগম গেছেন স্যুপ বানাতে। মেহেরজান বেগম তুযার ডান হাত ধরে বসে কাদছে। মানিক আবারও নিয়ে এসেছে ডাক্তার কে। ডাক্তার কতগুলো ওষুধ লিখে দিয়ে গেলো। সবাই কে বলল ঘরের বাইরে থাকতে। প্রধান বাবুর অনুরোধে ডাক্তার বাড়িতেই রইলো। কখন কি হয় বলা যায় না। সবাই এক এক করে ঘর থেকে বেড়িয়ে গেলো। মেহের জান তুযার হাত ছেড়ে উঠতে গেলে তুযা মেহেরজানের হাত শক্ত করে ধরলো। মেহেরজান তুযার মাথার পাশে বসে বলল
” ও ডাক্তার, আমি থাকি না আমার তুযার কাছে।”
ডাক্তার অমত করলো না। কারণ তুযার সম্পর্কে সেও ভালো করেই অবগত। কখন আবার কি করে বসে, ওকে কন্ট্রোল করার জন্য কেউ থাকুক। তুযা নিজের মাথা মেহেরজানের কোলে তুলে দিলো। মেহেরজান ক্রন্দনরত অবস্থায় তুযার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে।
” অত নড়িস না, দেখস না হাতে সুই ঢুকাই রাখছে কত্ত বড় একটা।”
তুযা শান্ত একদম। চোখ মুখ শুষ্ক। ঠান্ডা গলায় বলল
” তুমি হারা রাইত জাইগা আছো ক্যান? প্রেশার বাইরা যাইবো তো”
মেহেরজান কেদে ফেলল
” আল্লাহ আমার ম’রণ দেয় না ক্যান? আমার এডি আর ভাল্লাগতেছে না। তোর হঠাৎ কইরা কি হইলো রে ভাই? তোর তো সহযে অশোক হয় না”
তুযা নিশ্চুপ। চোখের পাতা স্থির। কার্ণিশ বেয়ে গড়িয়ে পড়লো নোনা জল।
” দাদি। আমার বুক ডার মইধ্যে খুব পোড়ে।”
মেহেরজানের হাত নিজের বুকে ধরে বলল
” এই যে এই খানে। এই খানে বড় পোড়ে”
” একটু বিশ্রাম নে। ভালো লাগবো”
” শুইয়া থাকলে আমার অসুখ বাড়বো দাদি। আমারে এগুলা খুইলা দিতে কও। আমি হাওরের পার দিয়া একটু ঘুইরা আসি।”
” অহন ঘুরন লাগবো না”
তুযা চেচাতে শুরু করলো
” এই বা’ল এর ডাক্তার। খোল এসব। আমি এসব পড়ে থাকতে পারবো না।”
তুযা হাতে থাকা স্যালাইন এর লাইন এক টানে খুলে ফেললো। সেখান থেকে ফিনকি দিয়ে র’ক্ত ঝড়ছে। উঠে বেরিয়ে আসলো বাইরে। ডাক্তার বারণ করলো ওকে আটকাতে। তুযা বাইকে করে মানিক কে নিয়ে গেলো হাওরের পারে। কনকনে বাতাস। তুযার গায়ে শার্টের ওপর শুধু দেশি তাতিদের বানানো মোটা একটা শাল।
চুল গুলো বাতাসে উড়ছে। মাচাল এ বসে সিগারেট এর ধোয়া উড়াচ্ছে। হঠাৎ মানিক কে বলল
” মাইনকা?”
” জ্বি ছোট সাহেব”
তুযা বিরক্ত হয়ে বলল
” তোরে কত্তবার কইছি ওসব বা’ল ছাল আমারে কইবি না। আমারে ভাই কবি।”
” আচ্ছা ভাই”
তুযা সিগারেটে আরেকটা টান দিয়ে বলল
” আমি ম্যালা খারাপ তাই না?”
মানিক হাসলো
” কিডা কইছে ভাই? আমনে ম্যালা ভালা। ম্যালাআআ ভালা”
তুযা ঠোট বেকিয়ে মাথা নেড়ে বলল
” না রে। আমি ম্যালা খারাপ। তয় আমি এত খারাপ আছিলাম না রে মাইনকা। আমি বহুত ভালা আছিলাম ছোটকালে। হ। মায় কইছে”
” আমি ক্যান এত খারাপ হইলাম কইতে পারস?”
” না ভাই”
তুযা বাশের চটার মাচাল এর ওপর টানটান হয়ে শুয়ে পড়লো। আকাশের দিকে তাকিয়ে হাসে। মানিকের দিকে তাকিয়ে বলল
” কিরে। শুনতে চাস না ক্যান আমি কেন এত খারাপ হইলাম”
মানিক বলল
” আমার হুনন লাগবো না ভাই। কারণ আমার কাছে আপনে খারাপ না। ম্যালা ভালো”
” যাহহহ তোর কাছে দুঃখের কতা কইয়াও শান্তি নাই”
মানিক ঢোক গিলল। ভয়ে ভয়ে বলল
” ভাই ওই ছবি ডা কার আসলে?”
তুযা আকাশের দিকে তাকিয়ে জোরে জোরে হাসলো
” জোৎস্না রে জোৎস্না। আমার জোৎস্না। বিশ্বাস ঘাতিনী জোৎস্না”
মানিক আরেকটা সিগারেট ধরিয়ে তুযার ঠোটে দিলো।
” থাক ভাই। ওসব কথা বাদ দেন”
মানিকের কাছে তুযার ফোনটা বেজে উঠলো। মানিক বলল
” ভাই নদী বুবু কল দিছে”
নদী সচরাচর তুযা কে কল দেয় না। এখন যখন দিয়েছে অবশ্যই কারণ আছে। তুযা উঠে বসলো। ফোন কানে নিতেই ওপাশ থেকে শোনা গেলো নদীর কান্নারত কন্ঠ
” দাদাভাই!…… “
” কিরেএএএএ। এই নদীইইই। কান্দস ক্যান? কে কি কইছে তোরে? ক খালি আমারে। আরে তুই কানতেছস ক্যান?”
নদী কাদতে কাদতে সব ঘটনা বলল তুযা কে। তুযা তুমুলের ঘটনা শুনলো মনোযোগ দিয়ে।
“তো তুই কি করে এত নিশ্চিত যে ওই ছেলেটা নির্দোষ? “
নদী কাঁদতে কাঁদতে জবাব দিল
” আমার মন বলছে দাদাভাই ও কিছু করেনি। ও নির্দোষ।”
তুযা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল
” তুই একদম কাঁদবি না। আমি কাল আইতেছি ঢাকায়। কোন মাঙ্গের পো করতেছে এসব, সব বাইর করমু। আর তোর বিয়ে আমি ওই পোলার লগেই দিমু”
নদী একটু শান্ত হল
” বিয়ে হওয়াটা বড় কথা নয় দাদাভাই। আমি চাই ওই লোকটা নির্দোষ প্রমাণ হোক। এতেই আমি খুশি।”
তুযা মুচকি হেসে বলল
” আমার বোন যেই ডায় খুশি, আমিও ওইডাই করমু।”
সন্ধ্যায় তুমুল নিজের বন্ধুর বাসায় গেল। হ্যাক করে ফেলেছে রেডিসনের সিসিটিভি ফুটেজ। তাতে দেখা গেল, তিনটা ৫৬ মিনিটে দুজন মুখোশ পরা ছেলে শাড়ি পরা সেজেগুজে থাকা মেয়েটাকে নিয়ে ভিতরে ঢুকছে। তারা হোটেলে চেক ইন ও করলো রিসিপশনে। তারপর থার্ড ফ্লোরের দিকে গেল। রাতুল থার্ড ফ্লোরের সিসিটিভি ফুটেজ বের করল। সেখানে একজন স্টাফ তাদের কিছু একটা দিল। সম্ভবত সেটাই, ঘুমের ডুপ্লিকেট চাবি। তারা রেকর্ড করে নিল সবটা।
ছেলে দুজন মুখোশ পরা থাকলো মেয়েটা ছিল খোলামেলা। এই মেয়েটাকে খুঁজে বের করতে হবে। তুমুল ভিডিও টা পুলিশ স্টেশনে নিয়ে গেল। ওসি পুরো ভিডিওটা দেখে বলল
” আমরা অত্যন্ত দুঃখিত তুমুল সাহেব। তবে অপরাধী নিশ্চয়ই শাস্তি পাবে।”
তুমুল রেগে গিয়ে বলল
“কোন প্রমাণ ছাড়া কোন কারন ছাড়া হুট করে কেউ একজন বলল আর আপনারা একটা পদক্ষেপ নিয়ে বসলেন। আমার সমাজে যে মানহানি হল তার দায়ভারকে নেবে?”
” দেখুন সাহেব আমাদের দিক থেকে আমরা একদমই সম্পূর্ণ ঠিক ছিলাম। তবে আমরা এখন সবাইকে জানিয়ে দিতে পারি যে আপনারা নির্দোষ।”
তুমুল আর রাতুল সেখান থেকে চলে এলো। রাতুলকে বাসায় নামিয়ে দিয়ে তুমুল চলে এলো চৌধুরী বাড়িতে। সবাইকে ডেকে সেই ভিডিওটা দেখালো। চৌধুরী সাহেব বললেন
” হতে পারে কেউ তোমার সাথে শত্রুতা করে এমন করেছে। যাই হোক, বুঝলাম তুমি নির্দোষ কিন্তু আমি যেটা একবার বলেছি বলেছিই। আমরা তোমাদের সাথে সম্পর্ক করতে পারবোনা। ক্ষমা করিও আমাদের।”
তুমুল নদীর দিকে একবার তাকালো। নদী তুমুলের চোখে চোখ পড়তে চোখ নামিয়ে নিল। তুমুল সবার উদ্দেশ্যে বলল
” আসছি “
আর এক মুহূর্ত দাঁড়ালো না তুমুল। দ্রুত পায়ে বেরিয়ে গেল চৌধুরী বাড়ি থেকে। যতদূর দেখা যায় নদী তাকিয়ে রইল, কিন্তু তুমুল একবারও পিছনে ঘুরে দেখল না। নদী নিজের ঘরে চলে গেলো।
যাক একটা ব্যাপার তো মিটলো। তুমুল নির্দোষ প্রমাণিতো হলো। আজ রাত টা ঘুম হবে নদীর।
ভোর ৫:৩০ নদীর ফোনটা সমানে বাজছে। নদী ঘুম ঘুম চোখে মোবাইলটা বিছানা হাতরে বের করল। স্ক্রিনে তুমুলের নাম্বার দেখতেই চট করে উঠে বসলো। এত ভোরে ফোন করল আবার কোন সমস্যা হলো নাকি?
নদী তাড়াতাড়ি ফোনটা রিসিভ করে কানে নিয়ে বলল
” হ্যালো! “
” তোমার বাড়ির পাশের পার্কে অপেক্ষা করছি “
বলেই ফোনটা কেটে দিলো তুমুল। নদী ভরকে গেল তুমুলের এমন ব্যবহারে। উঠে চোখে মুখে পানি দিয়ে চুল আঁচড়ে নিল সামান্য। মাথায় ওড়না দিয়ে শালটা গায়ে জড়িয়ে আস্তে করে রুম থেকে বের হল। বাড়ির কেউ কখনো ওঠেনি। সাবধানে ধীরে সুস্থে গেট খুলে বেরিয়ে গেল বাইরে। নদীর বাসা থেকে পার্কে যেতে দুই মিনিট লাগে। পার্কটা খুব একটা বড় নয় মানুষ যেন তেমন আসেনা। বিকেলে বাবা মায়েরা বাচ্চাদের নিয়ে হাঁটতে আসে এদিকে। নদী পার্কের গেট পেরিয়ে ভিতরে ঢুকতেই দেখল তুমুল কালো হুডি আর কালো প্যান্ট পড়ে দাঁড়িয়ে আছে। হাতে দুটো ব্যাডমিন্টন।
নদী তুমুলের মতিগতি বুঝতে না পেরে আরো কাছে এগিয়ে গেল। সবে ভোরের আলো ফুটেছে। এত ভোরে কেন এসেছে তোমার এখানে? নদী কাছে এগিয়ে যেতেই তুমুল একটা ব্যাডমিন্টন নদীর দিকে বাড়িয়ে দিল।
নদী কপাল কুচকে বলল
” এসব কি?”
” তোমার না ড্রিম ছিল শীতের ভোরে পার্টনারের সাথে ব্যাডমিন্টন খেলার”
নদীর চোখ ছানাবড়া হয়ে গেল। আমতা আমতা করে বলল
” আ….আপনি কি করে জানলেন? “
” সিক্রেট”
বলেই চোখ টিপলো তুমুল। হেসে ফেললো নদীও। তুমলও হাসলো। নদী বলল
” আপনার বাকা দাঁতের জন্য হাসলে আপনাকে আরো বেশি সুন্দর লাগে”
তুমুল মুচকি হেসে বলল
” চলুন খেলা যাক”
দুজনে ব্যাডমিন্টন খেললো তারা। নদী আজ ভীষণ খুশি। যেই স্বপ্ন গুলোর কথা কখনো কাওকে মুখ ফুটে বলতেই পারেনি, সে গুলো কেউ নিজে থেকে পূরণ করছে।
কিছুক্ষণ খেলার পর থামলো দুজন। বেশ গরম লাগছে। তুমুল হুডি খুলে কোমড়ে বাধলো। ভিতরে সাদা অফ শোল্ডার টিশার্ট পড়া। কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমেছে। কপালের কাছের চুল গুলোও ভিজল উঠেছে ঘামে। নদীর দিকে চোখ পড়তেই হাসলো তুমুল
” ওভাবে কি দেখছেন ম্যাম?”
নদী বলল
” আপনাকে দেখছি”
কিন্তু হঠাৎ নদীর মন খারাপ হয়ে গেলো। ঝলমলে রোদের মতো মুখটা ঢেকে গেলো বিষন্নতায়। তুমুল নদীর মনোভাব বুঝলো।
” বিয়ে নিয়ে ভাবছেন ম্যাডাম?”
” চাচ্চু এক কথার মানুষ। উনি যেটা বলেছে সেটাই করবে”
তুমুল নদীর দিকে তাকিয়ে বলল
” আপনি কি চান?”
নদী কথা বলে না। চুপ করে মাথা নিচু করে থাকে। তুমুল বলে
” বুঝেছি। আপনি আমাকেও চান। আবার ফ্যামিলিকে বলার সাহস ও পান না। আমাকেই কিছু করতে হবে”
নদী মুগ্ধ হয়ে তাকায় তুমুলের দিকে। এই লোকটা কি যাদু জানে? সব কথা না বলতেই বুঝে নেয় যে
” আমি না বললেও সব বুঝে যান কি করে?”
তুমুল চট করে জবাব দেয়
” ভালোবাসি যে”
নদী অবাক হয়ে যায় তুমুলের কথায়।
” ভালোবাসেন?”
তুমুল বলে
” কেন আপনি বাসেন না?”
নদী মাথা নিচু করে জবাব দেয়
” না তো”
তুমুল বাইকে উঠে পড়ে তক্ষুনি
” তাহলে বাই। যে ভালোবাসে না তার সাথে আমার কোনো কথা নেই। ভালোবাসলে একটা কথা ছিলো।”
আর এক মিনিটও সময় দিলো না তুমুল বাইক টেনে চলে গেলো। মূহুর্তের মধ্যে বাইকে রাস্তা পেরিয়ে চোখের আড়াল হয়ে গেলো। নদী থ মেরে দাড়িয়ে আছে।
কি বলতে কি বলে ফেললো, তুমুল রেগে গেলো। আর কি আসবে না? নদী নানান চিন্তা করতে করতে বাড়িতে ঢুকলো। গেট পার হতেই সায়রা বলল
” কোথায় গেছিলি?”
নদী মিথ্যে বলল আজ মা কে
” হাটতে বেরিয়েছিলাম একটু। ভাবলাম ভালো লাগবে”
হাবিব চৌধুরী বলল
” হ্যা ভালো করেছিস। সকালে হাটাহাটি করলে মাইন্ড ফ্রেশ হয়। যা ফ্রেশ হয়ে আয়। নাস্তা করবো”
সাইফ আজ থেকে তাদের অফিসে বসবে। এতদিন হাবিব একাই দেখাশোনা করেছে, আজ থেকে সাইফ বসবে অফিসে। একদম রেডি হয়ে নিচে নামলো সাইফ। খেয়ে দেয়ে বেড়িয়ে গেলো অফিসে। আজ তুযার আসার কথা ছিলো।
কিন্তু নদী ফোন করে বলেছে যে সবটা মিটেছে। কিন্তু তাও তুযা ঢাকায় আসবে অদিতির খোজে। ভোরে ভোরে রওনা হলো। সাথে মানিক আর হাসনাত। বাড়ির গাড়ি নিয়ে গেলো তিনজন। কুঠির সামনে গাড়ি থামতেই কয়েকজন মেয়ে দৌড়ে এলো তাদের কাছে,
” বাবু আমাকে নিন, অনেক ভালো সা*র্ভিস দিবো।”
” বাবু আমাকে নিন, অনেক কম রেটে পাবেন”
মানিক তুযার পিছনে গিয়ে লুকালো
” ভাই এডি কি কয় এরা? সরতে কন, আমার ডর করে”
তুযা বন্দুক বের করা মাত্রই সব ভু দৌড় লাগালো। তুযা কুটিল হেসে কুঠির ভিতর ঢুকলো। গুলাবো সোফায় হেলান দিয়ে শুয়ে শুয়ে পান চিবোচ্ছে। দুজন মেয়ে তার পা টিপছে বসে বসে। তুযা হুরহর করে ভিতরে ঢুকেই গুলাবোর মাথায় পিস্তল তাক করলো।
গুলাবো চেচিয়ে উঠলো ভয়ে।
” একি, কে আপনি। আমাকে মারতে চাচ্ছেন কেন?”
তুযা হিংস্র বাঘের মতো তাকিয়ে আছে গুলাবোর দিকে
” অদিতি কোথায়?”
গুলাবো দুহাত উচু করে বলল
” কে অদিতি? কার কথা বলছেন সাহেব?”
তুযা মানিকের দিকে তাকাতেই মানিক ফোন থেকে অদিতির ছবি বের করে গুলাবোর সামনে ধরলো।ছবিটা দেখা মাত্রই গুলাবোর মুখ আপনা আপনি হা হয়ে গেলো। এ তো মন্ত্রীর ছেলে নিয়ে গেছে। এ কথা বললে তো মন্ত্রী তার ব্যাবসা সহ কুঠি তুলে দেবে।
গুলাবো আমতা আমতা করে বলল
” ইয়ে সাহেব আসলে”
তুযা ক্ষিপ্র গতিতে গিয়ে গুলার মাথায় বন্দুকের নল চেপে ধরলো
” জানের মায়া থাকলে বল”
গুলাবো জোরে কেদে উঠলো
” বলছি সাহেব বলছি। দয়া করে মারবেন না।”
” বল”
” ওই মেয়েটাকে ওর বাবা নিয়ে এসেছিলো। কিন্তু কোনো কোনো খরিদ্দার ওকে দেখার আগেই, সেদিনই ওকে কিনে নিয়ে গেছে এক বাবু”
তুযা দাতে দাত চিপে বলল
” কে নিয়ে গেছে ঠিকানা বল”
” ইয়ে, মন্ত্রী হাসান চৌধুরীর ছেলে নিয়ে গেছে বাবুউউউ। আমায় মারবেন না দয়া করে”
গুলাবোর মুখে হাসান চৌধুরীর নাম শুনে পায়ের তলা থেকে যেন মাটি সরে গেলো তুযার। সাইফ ওই মেয়েকে কি করতে নিয়ে গেছে?
তুযা বন্দুক নামিয়ে নিলো। মনে মনে হাসলো
” যাক আমি না খাই আমার ভাই খাইছে।”
তবে ওখান থেকেও ওরে আমি নিয়া আমু। তুযা বন্দুক কোমরে গুজে বেরিয়ে এলো কুঠি থেকে। গাড়িতে করে সোজা চলে এলো চৌধুরী বাড়ীতে। কয়েকবার কলিং বেল চাপলো।
আঞ্জুমান আর অদিতি কিচেনে রান্না করছে। আঞ্জুমান কলিং বেল শুনে বলল
” ওই যে এসেছে বোধহয়। অদিতি, দরজা টা খোল তো মা”
অদিতি প্রশ্ন করলো
” কে এসেছে মা?”
” আমাদের বড় ছেলে। তোর ভাসুর হয়। ওর ই তো আসার কথা। যা দরজা টা খোল”
অদিতি মাতায় আচল টেনে দিলো। দরজা খুলে দিতেই অদিতি যেন আকাশ থেকে পড়লো। দরজার সামনে তুযা দাড়িয়ে আছে। অদিতিকে দেখেই ভয়ংকর হাসি দিলো তুযা। অদিতির দিকে এগিয়ে এসে বলল
” বুলবুলি। আমাকে ছেড়ে এতদিন থাকতে বুঝি খুউব কষ্ট হয়েছে?”
অদিতি পিছিয়ে গেলো। কাপা কাপা গলায় বলল
” আ….আপনি?”
তুযা বড় করে ঘার নাড়লো
” হ্যা আমি। আমিই তোমার নাগড় এর বড় ভাই। এবার চলো আমার সাথে।”
পরবর্তী পর্ব পাওয়ার আগেই ভুল বুঝবেন না। এখনো অনেক কিছু বাকি আছে। সুন্দর সুন্দর কমেন্ট করবেন ☺️🫶 আমার আপনাদের কমেন্ট পড়তে খুবই ভালো লাগে 😩
Share On:
TAGS: খাঁচায় বন্দী ফুল, জান্নাতুল ফেরদৌস
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ১৫
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ২০
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ৫
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ১০
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ১৮
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ১৭
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ১৬
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ১
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ১৩
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ১২