কপি করা কঠোর ভাবে নিষিদ্ধ ⚠️
খাঁচায় বন্দী ফুল
jannatul_ferdous_জান্নাতুল_ফেরদৌস
পর্ব – ১৩
” জোৎস্না! “
ধপাস করে মেঝেতে লুটিয়ে পড়লো তুযা। চোখ দুটো নিভে আসছে। চারিদিক কেমন ঘুরছে। ইহ জগতের কোনো শব্দ কানে যাচ্ছে না। অবশ হয়ে আসতে থাকা হাত দুটো বাড়িয়ে দিলো ছবিটার দিকে।
ফ্ল্যাশব্যাক……
আজ ঢাকায় যাবে তুযা। গন্তব্য স্থল গুলাবোর কুঠি। তার আগে ডাক পড়লো ওয়াহাব এর। আকবর জানালো ওয়াহাব চৌধুরী ডাকছে তাকে। তুযা কিঞ্চিৎ বিরক্ত বোধ করলেও মুখে কিছু বলল না। চলে গেলো বাবার ঘরে। সোফায় বসে মেহেরজান পান সাজাচ্ছে। পান সাজিয়ে খিলি বানানো হলে পাশে রেখে আগে প্রেসারের ওষুধ টা খেয়ে নিলো। তুযা সেই সুযোগে টপ করে পান খিলি টা মুখে পুড়ে দিলো এক দৌড়। এক দৌড়ে ওয়াহাব এর ঘরে। মেহেরজান বেগম ও শুরু করলো বিলাপ। আকবর নিজে গালাগাল থেকে বাচতে মেহেরজান এর থেকে দূরে পালালো।
তুযা পান চিবোতে চিবোতে ঘরে ঢুকে রিমোট খুজতে শুরু করলো। এটা ওর বরাবর এর স্বভাব। এ ঘরে এলে ওর টিভি চালু করতেই হবে। গত বছরই বিদ্যুৎ এসেছে এই গ্রামে। হাসান চৌধুরী শহর থেকে এলইডি টিভি এনে দিয়ে গেছে ভাই কে। ওয়াহাব মাথা নাচিয়ে বলল
” আজ আর খুজে পাবে না রিমোট। আগে আমার কথা শোনো”
তুযা লক্ষি ছেলের মত সোফায় বসলো। ওয়াহাব চৌধুরী বললেন
” শুনলাম ঢাকায় যাচ্ছো?”
তুযা ওপর নিচ মাতা নাড়লো শুধু। কারণ ওর মুখ ভর্তি পানের পিক। নইলে এতক্ষণে বাজে বকে কথার লাইন চ্যুত করে দিতো ওয়াহাব এর। ওয়াহাব চৌধুরী বললেন
” মনিপুর যে জমিটা কিনেছি গত আষাঢ়ে। সেটার কাগজ পত্রে কিছুটা ঘাপলা আছে।আজই সেই দলিল খানা নিয়ে জমির মহুরি দেওয়ানি বাবু কে দেবে। তারপর তোমার যেখানে ইচ্ছে যাও”
তুযা কপাল কুচকে হাত দিয়ে কিছু ইশারা করলো আর মুখে শুধু শব্দ করলো
” উমমমমম…হুহু….নননন”
ওয়াহাব চৌধুরী বুঝলো না ওর কথার মানে। তুযা উঠে গিয়ে বেসিন থেকে কুলি করে এসে বলল
” দলিল টা কোথায়?”
” দেওয়ান খানায় কোনো বাক্সের মধ্যে হবে”
তুযা অলস ভঙ্গিতে বলল
” চাবি কোথায়?”
ওয়াহাব চৌধুরী সংবাদ পত্র হাতে নিয়ে বলল
” চাবি মায়ের কাছে আছে”
” আমার মা নাকি তোমার মা?”
ওয়াহাব চৌধুরী চোখ গরম করে তাকাতেই বলল
” রেগে যাচ্ছো কেন? না বললে বুঝবো কি করে কার মা?”
” আমার মা”
তুযার মনে পড়লো একটু আগে পান খাওয়ার ঘটনা। এবার বুড়ির হাতে পড়লে হেব্বি ক্যালাবে। শীতের মধ্যে বুড়ির সেগুন কাঠের লাঠির বাড়ি। তুযা চট করে ঘার নাড়ালো কয়েকবার। ওয়াহাব চৌধুরী তুযার আচরণ দেখে বলল
” ওমন মৃগী রোগির মতো করছো কেন?”
” তুমি চেয়ে দাও না চাবিটা। আমি গেলে খুব মারবে”
ওয়াহাব বিরক্তিতে উফফফ করে উঠে আকবর কে ডাকলেন
” আকবর, আকবর”
আকবর ছুটে আসে
” জ্বি সাহেব।”
” মায়ের থেকে দেওয়ান খানার চাবিটা নিয়ে দাও তো ওকে”
আকবার মাথা সামান্য এগিয়ে বলল
” সাহেব, কাকে”
ওয়াহাব অগ্নি চোখে তাকালো আকবর এর দিকে। তুযা ফিক করে হেসে ফেললো। আকবর তাকাতেই হাসির শব্দ বাড়লো। হো হো করে হেসে উঠলো ঘরের মধ্যে।
” এ তো দেখি আরো বড় বলদ”
ওয়াহাব ধমক দিয়ে বলল
” এই তুমি হাসছো কেন? আর আকবর তুমি, এমন বলদের মতো প্রশ্ন করা শিখেছো কবে থেকে? দেখছো সামনে তুযাউন দাড়িয়ে আছে আবার জিজ্ঞেস করছো কাকে”
” ক্ষমা করবেন সাহেব ভুল হয়ে গেছে। কিন্তু মা জননির কাছে এখন গেলে আমায় কি যে ছুড়ে মারবে, তার ঠিক নেই সাহেব। দয়া করুন”
ওয়াহাব রেগে উঠে দাড়ালো।
” একটাও কাজের না। সব গুলো খবিশ।”
মেহেরজান বেগমের থেকে চাবি নিয়ে তুযাকে দিলো। তুযা দেওয়ান খানার তালা খুলে ভিতরে ঢুকলো। সচরাচর এই ঘরে কেউ আসে না। কোনো কাগজ বা দলিল পত্রের প্রয়োজন পড়লে তবেই এই ঘর খেলা হয়। বেশির ভাগ তুযা নয়তো আকবর আসে এই ঘরে। টিনের কতগুলো বড় বাক্স একপাশে। অনেক গুলো ছোট ছোট কাঠের বাক্সও আছে। প্রত্যেকটায় তালা দেওয়া। সব গুলোতেই জমি, মামলা, নোটিশ এবং বিভিন্ন সময়ের চুক্তি পত্র। একটা পুরনো আলমারিও আছে। বাক্স গুলোর ওপর বেশ ধুলো পড়েছে।
একটা বাক্স চাবি দিয়ে খুলল তুযা। সব বাক্সের ভিতর ইদুর থেকে কাগজের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে ন্যাপথলিন রাখা। বাক্স খুলেই একটা ন্যাপথলিন বল নাকের কাছে নিয়ে শুকলো তুযা। ঘ্রাণ টা ওর বড্ড ভালো লাগে।
কিন্তু এই বাক্সে সেই দলিলটা নেই। আরেকটা বাক্স খুলল। সেটাতেও নেই। পরের বাক্সটা খুলতেই বেশ কিছু দলিল পেলো। সেখান থেকে কয়েকটা বের করে পড়ে দেখলো। এগুলোও না। আরেকটা দলিল হাতে নেওয়ার সময় দলিলের ভিতর থেকে কি একটা পড়লো মেঝেতে। তুযা ঝুকে সেটা তুলল। ধুলো ঝেড়ে তুলতেই দেখলো একটা ছবি। ছবিটার প্রচ্ছদ অংশ সামনে আনতেই তুযার শরীর হিম হয়ে এলো। বুকের ভিতর টা ভিষণ জোরে মোচর দিলো।
শরীরের প্রত্যেকটা লোমকূপ দাড়িয়ে গেলো তুযার। হাত থেকে পড়ে গেলো দলিলটা। ছবি ধরে রাখা হাতটাও কাপছে। পায়ের তলার মাটি যেন নড়বর করছে। বলিষ্ঠ দেহটাও শক্তিহীন হয়ে আসছে তুযার। খেয়াল করলো ছবিটাও এখন ঝাপসা দেখছে। বারবার কাপা হাতে ছবিটা মুছলো। নাহহহ তাও ঝাপসা দেখাচ্ছে।
ছবিতে ময়লা নেই, তার চোখের নোনা পানিতে ঝাপসা হয়ে আসছে সব। সেই পুরনো স্মৃতি, পুড়নো ক্ষত আবার দগদগে হয়ে উঠলো। সেই ব্যাথায় আবার হৃদয় টা দুমড়ে মুচড়ে যাচ্ছে। তুযা অস্পষ্ট স্বরে আওয়াজ করলো
” জোৎস্না”
কিন্তু নিজের কথা নিজের কান ওবদিই পৌছালো না। হাত থেকে ছবিটা খানিকটা দূরে গিয়ে পড়লো। পা ও শরীরের ভর রাখতে পারলো না। লম্বা, হৃষ্টপুষ্ট দেহটা নিস্তেজ হয়ে লুটিয়ে পড়লো দেওয়ানখানার মেঝেতে।
বাহিরের কোনো শব্দ তার কানে যাচ্ছে না। সব কিছু যেন থেমে গেছে সেখানেই।
চওড়া মুখটা থুবড়ে পরেছে ধুলো জমা মেঝেতে। তুযার নিঃশ্বাস এর সাথে উড়ছে মেঝেতে গড়াগড়ি খাওয়া ধুলো। ছবিটার দিকে হাত বাড়ালো তুযা। আকড়ে নিজের কাছে আনার ব্যার্থ প্রয়াস। চোখ নিভে গেলো। হাত টা ভাড় ছেড়ে দিলো মেঝেতেই। নিভু নিভু চোখে আরো একবার দেখলো ছবিটা। ভিতর থেকে কথা বের করার সর্বোচ্চ চেষ্টা চালাচ্ছে।
” জোৎস্না! আমার ঘাতিনী। আমার প্রাণ নাশিনী”
ব্যাস। চোখ বন্ধ হয়ে গেলো। মস্তিষ্ক এবার একটু শান্তি পেল অচেতন হয়ে। ছবিটা ধূলোর মধ্যেই পড়ে রইলো।
ওয়াহাব চৌধুরী কপালে হাত দিয়ে বসে আছেন। আধা ঘন্টা হয়ে গেলো ছেলেটা দেওয়ানখানা তে গেছে। এখনো ফেরার নাম নেই। কতটা বেয়াক্কেলে ভাবা যায়?
” আকবর গিয়ে দেখো তো”
আকবর, সাহেবের হুকুম পেয়ে গেলো দেওয়ান খানায়। কিন্তু গিয়েই দিলো এক চিৎকার।
” বড় সাহেএএএএএব। বড় সাহেব তাড়াতাড়ি আসুন। ছোট……ছোট সাহেব….. “
ওয়াহাব আকবর এর কথা শুনে দ্রুত দেওয়ান খানারা দিকে যায়। আকবর ডাকছে তুযা কে।
” ছোট সাহেব, ও ছোট সাহেব। উঠুন না। ছোট সাহেব”
ওয়াহাব হন্তদন্ত হয়ে আকুতি করতে লাগলো
” ও তুযা, তুযা রে। বাপজান উঠস না। আমার কেমন জানি লাগতাছে। ও আকবর, আকবর। বাইরের পোলাপান ডিরে ডাক দেও। ওরে এখান থেকে বাইরে নেওয়া লাগবো।”
আকবর মানিকের নাম ধরে ডাকতেই ৪-৫ জন জোয়ান ছেলেপুলে দৌড়ে এলো। তুযা কে ধরাধরি করে নিয়ে সোফায় শুইয়ে দিলো। মেহেরজান ঘর থেকে ছুটে আসে
” হায় হায়, কি হইছে আমার তুযার। ও ভাই, ভাই রে। কথা ক ভাই আমার। ও চান ভাই উঠ না। ওহাব, ওহাব শিগগিরী ডাক্তার ডাক। কি হইলো আমার কইলজার টুকরার।”
তুযার মা ঘরে কোরআন পড়ছিলো। বাইরের চেচামেচি শুনে দ্রুত সেখানে আসলো। মানিক গেছে বাইক নিয়ে ডাক্তার কে আনতে। তুযার মা এসে তুযার মাথার কাছে হুড়মুড়িয়ে পড়লো
” ও তুযা, বাবু ওঠ, ওঠ না। ও তুযা। কেউ একটু পানি আনো না। ওর চোখে মুখে ছিটা দেই।”
আকবর গ্লাসে করে পানি এনে দিলো। তুযার চোখে মুখে পানির ছিটা দিয়েও চৈতন্য করা গেলো না। মেহেরজান বেগম কান্না শুরু করে দিয়েছেন।
আরও ১০ মিনিট পর মানিক এলো ডাক্তার নিয়ে। ডাক্তার দ্রুত ভিতরে ঢুকে তুযাকে চেকআপ করতে লাগলো।
” ওনাকে স্যালাইন লাগানোর ব্যাবস্থা করতে হবে”
ডাক্তার স্টেথোস্কোপ দিয়ে তুযার হার্টবিট দেখলো। স্যালাইন লাগিয়ে ডাক্তার বলল
” আপনারা এখানে চেচামেচি কম করুন। এটাই ওনার জন্য ভালো হবে। কিছুক্ষণের মধ্যে জ্ঞান ফিরে যাবে সমস্যা নেই “
ওয়াহাব এর দিকে তাকিয়ে বলল
” আপনি আমার সাথে একটু বাইরে আসেন প্রধান বাবু। আপনার সাথে আমার কিছু জরুরী কথা আছে “
ওহাব বিলম্ব না করে ডাক্তারের পিছন পিছন চলে এলো।
” কি বুঝলেন ডাক্তারবাবু?”
ডাক্তার দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে ছোট করে বলল
” সেই সমস্যা “
ওহাব চৌধুরীর চোখ বড় বড় করে তাকালেন ডাক্তারের দিকে।
” কে বলছেন ডাক্তার বাবু এতদিন পরে হঠাৎ? আপনি ঠিক বলছেন তো? “
” ওর জ্ঞান ফিরে ওর ব্যবহারই আপনারা বুঝতে পারবেন। আমার কি মনে হয় প্রধান বাবু, ওকে ঢাকায় নিয়ে ভালো কোন সাইক্রেটিস্ট দেখান।”
ওহাব চৌধুরী চিন্তিত কন্ঠে বলল
” কিন্তু ও তো সম্পূর্ণ স্বাভাবিক হয়ে গেছিল “
” হয়তো এমন কিছু হয়েছে যাতে ওর পুরনো স্মৃতি আবার মনে পড়েছে। কিংবা সে বেদনা গুলো অন্য কোন কারণে আবার জাগ্রত হয়েছে। যাহোক এমন কিছু ঘটেছে “
ওহাব চৌধুরীর চিন্তিত মুখ দেখে ডাক্তার বলল
” অত চিন্তা করবেন। না মাথা ঠান্ডা রাখুন। দেখুন ওকে এই গ্রাম ছেড়ে দূরে পাঠানো যায় কিনা। ওকে কোন কাজের মধ্যে ব্যস্ত রাখুন “
ওহাব চৌধুরীর কথা বলতে বলতে কেঁদে ফেলল।
” ওর জন্য আমি কি কি না করছি ডাক্তারবাবু, খালি ওর ভালো থাকার জন্য। আমার বাবার শেখানো সৎ আদর্শ আমি ভাঙছি ওর জন্য। বাড়ির মধ্যে বাইজি খানা পর্যন্ত তৈরি করছি। ওর নেই অন্যায় সমস্ত মেনে নিছি। যােত ভালো থাকে । “
ডাক্তার ওহাব চৌধুরীকে আশ্বস্ত করে বললেন
” আপনি একজন পিতার সর্বস্ব করেছেন। আল্লাহকে ডাকুন বাকিটা আল্লাহ ভরসা “
ডাক্তার চলে গেল। তুযার এখনো স্যালাইন চলছে কিন্তু জ্ঞান ফেরেনি। ওহাব চৌধুরী চিন্তিতভাবে রুমের মধ্যে পায়চারি করছে। মেহেরজান বেগম এখনো গুনগুনিয়ে কেঁদে চলেছে।
” ওহ কি জবর দোস্ত প্ল্যান বানিয়েছিস সুফিয়ান। সাইফ তো তোকে দেখে পুরো ইমোশনাল হয়ে যাবে “
বন্ধুর দিকে তাকিয়ে কুটিল হাসি দিল সুফিয়ান। পরিচিত এক বন্ধুর হসপিটালে এসে, হাত-পা মাথা ব্যান্ডেজ করিয়ে অন্য বন্ধুকে দিয়ে কল দিয়ে সাইফ কে বলেছে যে সুফিয়ান গাড়ি এক্সিডেন্ট করেছে।
” দেখ না কি খেলাটা খেলি।”
পাশ থেকে আর একজন বলল,
” তুই যাই বলিস সুফিয়ান ওর চাইতে সুন্দর সুন্দর মেয়ে আমরাই তোকে খুঁজে দিতে পারতাম।”
” সুন্দর ধুয়ে পানি খেলে কি আর লাইফ চলবে রে?”
সবাই হুহু করে করে হেসে উঠলো
” চৌধুরী বাড়ির বড় মেয়ে, গ্রামে- শহরে, এদেশে – বিদেশে মিলিয়ে কত কত কোটি টাকার মালিক ওরা জানিস? একবার ওই বাড়ির জামাই হতে পারলে লাইফ সেট হয়ে যাবে।”
” কে বুদ্ধি রে ভাই তোর আয় পা দুটো এগিয়ে দে তোকে একটা সালাম করি “
আরেকজন সতর্ক করতে বলল
” এই তোরা চুপ কর সাইফ এসে গেছে “
তাই ব্যস্ত পায় কেবিনে প্রবেশ করল। পাশে থাকা বন্ধুরা মন মরা হওয়ার নাটক করছে। আর একজন কেঁদে দিয়ে গিয়ে সাইফের গলা জড়িয়ে ধরে বলল
” তুই এসেছিস ভাই, দেখ না কি অবস্থা হয়েছে ওর। একটুর জন্য বেঁচে গেছে ভাই। তা না হলে কি যে….?”
প্যাচ প্যাচ করে কেঁদে ফেলল ছেলেটা। সবটাই নাটক। সুফিয়ানের সাজানো নাটক। সাইফ চিন্তিত কন্ঠে বলল
” এসব কি করে হলো? “
সুফিয়ান চোখ দিয়ে ইশারা দিতেই মনির বলল
” কেন হলো জানতে চাস? জানতে চাস তুই?”
সুফিয়ান অসুস্থ হওয়ার নাটক করতে করতে বলল
” ভাই বাদ দে না”
সাইফ বলল
” কি হয়েছে বল আমায়”
আরেক জনকে ডাক্তার সাজিয়ে রেখেছে সে এসে বলল
” আপনারা প্লিজ বাইরে যান রোগীর কন্ডিশন ভালো না।”
সাইফ বাইরে চলে গেল। সবাই সাইফ কে আশ্বস্ত করল তুই যা আমরা ওর সাথে আছি। সাইফ আরও কিছুক্ষণ সময় থেকে তারপর বাড়ি চলে আসে।
সাই হসপিটাল থেকে বেরিয়েই ভন্ডর দল আবার কেবিনে ঢুকে।
” বল ভাই এর পরের প্ল্যান কি?”
সুফিয়ান মনিরের হাতে ২০০০০ টাকা দিয়ে বলল।
“কানে কানে বলতে হবে, সবাই এদিকে আয়”
নদী গোসল করে তোয়ালেতে চুল মুছছে। ভাবনায় আজ সাইফ ভাই নেই। আছে শুধু তুমূলকে নিয়ে ভাবছে। কিন্তু ওই লোকটা নিয়ে সে কেন এত ভাবছে? সে নিজেও বলতে পারেনা?
তুমুলের নাম্বার থেকে কল আসলো তখনই। নদী ফোন হাতে নিয়ে বলল। বাহহ লোক টার আয়ু আছে
ফোন রিসিভ করতেই ওইপাশ থেকে শোনা যায় তুমুলের হাস্কি কণ্ঠস্বর
” কি করছেন মিসসস? “
” কিছু না “
” মানুষ কিছু না কিছু তো করেই শুয়ে থাকে বসে থাকে দাঁড়িয়ে থাকে তা আপনি কোন পজিশনে আছেন?”
নদীর ঠোঁটের ডগায় মিষ্টি হাসে জমলো।
” বেশ কথা বলেন তো আপনি। কে শিখিয়েছে এত কথা।”
” সত্যি বলব? “
” হুমমমমমম”
” আরে আপনার কন্ঠে হুমমম টা তো মারাত্মক শোনায়। আরেক বার বলুন তো।”
নদী হেসে ফেললো। বেশ অনেকটা সময় নিয়ে হাসলো। ফোনের অপর প্রান্তে তুমূল নিশ্চুপ হয়ে শুনলো নদীর রিনরিনে কন্ঠের হাসি। মুগ্ধ কণ্ঠে বললো
” এই প্রথম আপনার হাসি শুনলাম। আপনার হাসি এত সুন্দর বলেই বুঝি বেশি হাসেন না? আবার মানুষ হার্ট এটাক করতে পারে “
নদী মুচকি হেসে উত্তর দিল
” আপনার সাথে কথা বললে না হেসে উপায় আছে?”
” তাহলে আরেকটা কথা বলি? “
” হ্যাঁ নিশ্চয়ই। বলুন না”
” আপনার এই হাসি আমি সারা জীবন শুনতে চাই “
নদী এবার নিশ্চুপ হয়ে গেল। সাথে আরো নিশ্চুপ হলো ফোনের অপরপ্রান্তে থাকা মানুষটাও। আর কিছু সময় পেরোলো কারো মুখে কোন কথা নেই। তুমুল ই আগে বলল
” কি হলো শোনাবেন না?”
নদী উত্তর দেয় না। একটা কথা বলল লোকটা। এসব কথার আবার উত্তর দেয়া যায় নাকি। লজ্জা করে না বুঝি। তুমুল আবারো বলল
” কথা বলছেন না কেন? “
নদী প্রসঙ্গ পাল্টাতে বলল
” আচ্ছা আপনার বয়স কত?”
” টুয়েন্টি নাইন”
” আমি আপনার অনেক ছোট হবো”
” হলে হবেন তো কি হয়েছে?”
নদী একটু দ্বিধা নিয়েই বলল
” না মানে, আপনি আমাকে সেদিন থেকে আপনি আপনি বলছেন। আমি তো আপনার অনেক ছোট। আমাকে তুমি করে বলতে পারেন।”
” বউ হওয়ার আগে আমি কাউকে তুমি তুমি বলতে পারব। না তবে অন্য কেউ যদি চায়, আমাকে বলতে পারে”
নদী হেসে উত্তর দিল
” আমার আবার এত শখ নেই”
” শখ থাকলে সে বলছে কেন?”
নদী মিষ্টি গলায় বলল
” আচ্ছা আমার ভুল, হয়েছে ক্ষমা করে দিন স্যার”
” করতে পারি একটা শর্ত আছে”
নদীর কপাল কুচকে বলল
” শর্ত? কি শর্ত? “
” ভিডিও কল দিতে হবে”
নদীর চোখ কপালে ওঠার যো। এমনিতেই ভিডিও কলে কথা বলতে তোর খুব অস্বস্তি হয়। তার ওপর আবার তুমুলের সাথে। ওতো সামনাসামনি থাকলেও তুমুলের দিকে তাকাতে পারে না। দাঁত দিয়ে জিভ কেটে বলে
” শাস্তিটা একটু বেশি হয়ে গেল না?”
তুমূল বলল
” শাস্তি দিচ্ছি না, আবদার করছি। এই প্রথম আপনার কাছে কিছু আবদার করলাম। আমি তোর পূরণ করবেন না মিস?”
নদী খুব বিড়ম্বনায় পড়ল। কি জ্বালা রে বাবা। এবার না করবে কি করে? আবার কল দিতে অস্বস্তি হচ্ছে। অনেক ভেবেচিন্তে, দিশা বিশা না পেয়ে ভিডিও কল করতে রাজি হল।
তুমুল কল রিসিভ করে কোনো কথা বলছে না। শুধু এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে নদীর দিকে। কেমন অদ্ভুত চাহনি তুমূলের। নদীর ভেজা চুল দেখে বলল
” এই রাত বিরেতে গোসল করেছেন কেন? জ্বর বাঁধানোর শখ হলো বুঝি?”
নদী কথা বলছে না মুখের সামনে ফোন ধরে নিচের দিকে তাকিয়ে আছে। তুমুল বলল
” একটু তাকাবেন?”
” আপনার দেখা হয়ে গেছে?”
তুমূল মুচকি হেসে বলল
” কেন হলে কি করবেন? “
” ফোন রাখবো”
” আর একটু দেখি না। আচ্ছা থাক রেখেই দেন। আমার হওয়ার পর না হয় মন ভরে দেখবো। তখন তো অধিকার থাকবে। এখন তো অধিকার নেই, তাই কিছু বলতে পারছি না”
তুমুল দেখল নদী তাকাচ্ছে না।
” আপনি চাইলে আমাকে দেখতে পারেন আমি আবার কিছু মনে করব না “
নদী লাজুক হাসি দিয়ে বলল
” রাখছি আল্লাহ হাফেজ।”
তুমূলকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে ফোন কেটে দিলো। কলটা কেটে যেন হাফ ছেড়ে বাঁচলো নদী।
কিন্তু তুমূল আবার কল করলো। রিসিভ করে কানে নিতেই বলল
” এই মুখের উপর এমন খট কল কেটে দেন কেন?”
নদী ছোট করে বলল
” আমি ভাবলাম আপনার কথা বলা শেষ “
তুমূল বলল
” ডিনার হয়েছে?”
নদী বলল
” কোথায় আছেন আপনি?”
“রেডিসন ব্লু হোটেল।”
” আমাদের বাসায় এসে থাকতে পারতেন। হোটেলে থাকতে গেলেন কেন আবার?”
তুমুল বলল
” বিয়ের আগে শশুড় বাড়ি থাকা ভালো থাকায় না”
নদী আবারও হাসলো
” আপনিও না। আচ্ছা এখন কি আমি কলটা রাখতে পারি? মা খেতে ডাকছে।”
” শিওর।”
নদী ফোন কেটে দিয়ে আনমেই হেসে উঠলো। মনে মনে ভাবলো
” আজ কত্তগুলো দিন পর মন খুলে হাসলাম। মানুষ টা সত্যিই অসাধারণ। এই দুই দিনেই এতটা ক্লোজ হয়ে গেছে”
ফোনে টুনটুন শব্দে একটা ছোট ম্যাসেজ আসলো
” খাওয়া শেষে যেন কল করা হয়। কেউ একজন তার অপেক্ষায় থাকবে”
নদী হেসে ফোনটা বালিশের ওপর রেখে ড্রইং রুমে গেলো। আঞ্জুমান বেগম নদীর দিকে তাকিয়ে বলল
” আজ বেশ খুশি খুশি লাগছে আমার সোনা মা কে”
নদী মুখ কাচু মাচু করে বলল
” কই?”
” আমার চোখ ফাকি দিস না বুঝলি”
নদী মুচকি হাসলো। আজ অযথাই তার খুশি লাগছে কেন জানি? খাবার খেতে শুরু করলো। সাইফ আসলো বাসায়। সবার মুখে একই প্রশ্ন
” কিরে সুফিয়ান ঠিক আছে তো?”
সাইফ সোফায় বসে বলল
” কোনো মতে প্রাণে বেচে গেছে। কিন্তু কন্ডিশন ভালো নয়”
আঞ্জুমান বলল
” আল্লাহ ছেলেটাকে সুস্থ করে তুলুক। তুই খেতে বসবি, ফ্রেশ হয়ে আয়।”
সাইফ কয়েক সিড়ি উঠে অদিতিকল চোখ দিয়ে ইশারা করলো।
সাইফ যাওয়ার পর পর অদিতিও গেলো রুমে। সাইফ হাত মুখ ধুয়ে বিছানায় এসে বসেছে। অদিতি রুমে যেতেই সাইফের দৃষ্টি ভঙ্গি বদলে গেলো। হাতের আঙ্গুল দিয়ে ইশারা করলো কাছে আসতে। অদিতি কিছুটা এগিয়ে আসতেই সাইফ একটানে অদিতিকে নিজের সাথে মিশিয়ে নিলো। চোখে কেমন অদ্ভুত মাদকতা। অদিতির ঘাড়ে মুখ ডুবিয়ে বলল
” সারাদিন এত দূরে দূরে থাকো কেন”
উষ্ণ ঠোট গলায় ঘষে দিয়ে বলল
” তোমার শরীর ঠিক আছে?”
অদিতি কপাল কুচকে বলল
” হ্যা শরীর ঠিকই তো”
” আরে গাধা সেটা না”
” তাহলে?”
” পিরিয়ড শেষ হয়েছে?”
অদিতি ওপর নিচ মাথা নাড়লো। সাইফের ঠোটে দুষ্ট হাসি খেলে গেলো। নদীর গালের নরম মাংসে মৃদু কামড় দিয়ে বলল
” আজ তোমায় অনেক ভালোবাসবো বিড়াল ছানা”
অদিতির চোখ মুখ নেতিয়ে গেলো ভয় আর আড়ষ্টতায়। কামড় দেওয়া জায়গায় ছোট ছোট কয়েকটা চুমু খেলো সাইফ। অদিতির নরম লালচে ঠোঁট জোড়ায় নিজের ঠোট ছোয়াতেই অদিতি সাইফের ঘাড়ের অংশের টিশার্ট খামচে ধরলো।
” বাবুউউউউউ, আরে ও বউমা। কোথায় গেলে তোমরা।”
আঞ্জুমান এর চিৎকার কানে যেতেই ছেড়ে দিলো দুজন দুজনকে। অদিতি ঠোট মুছতে মুছতে দৌড়ে বেরোলো ঘর থেকে। সাইফ নিজের ঠোট জিভ দিয়ে ভিজিয়ে বলল
” ওফফফফ, ইয়াম্মি”
নিজে কথাটা বলে নিজেই হাসলো। ফোনটা নিয়ে চলে গেলো নিচে খাবার খেতে।
খাওয়া দাওয়া করে অদিতি শাশুড়ির সাথে সব গুছিয়ে রাখলো। আঞ্জুমান বলল
” অনেক করেছিস বাবু। যাহহহ শুতে যা। অনেক রাত হলো”
সাইফ অদিতির জন্য অপেক্ষা করতে করতে বিরক্ত হয়ে যাচ্ছে
অদিতি আসছে না। রাগ করে একাই শুয়ে পড়লো। অদিতি এলেও কথা বলবে না। বেশ খানিক সময় পর অদিতি ঘরে এলো। দেখলো সাইপ উল্টো দিক ফিরে শুয়ে আছে। অদিতি ফ্রেশ হয়ে এসে চুল বেণি করে সাইফের পাশে শুয়ে পড়লো।
সাইফ ভিতরে ভিতরে ফুসছে। অদিতি একটা কথাও জিজ্ঞেস করছে না ওকে। অন্তত সরি তো বলা উচিৎ ছিলো। সেটাও বলছে না। অদিতি ভাবলো সাইফ ঘুমিয়ে গেছে।
কোনো কথা না বলে চুপচাপ শুয়ে রইলো। সাইফ মনে মনে জিদ ধরে আছে নিজেও কথা বলবে না। আবার বউ কে কাছে পেতেও ইচ্ছা করছে।
নানান চিন্তা ভাবনা সব উপড়ে ফেলে পিছন থেকে জড়িয়ে ধরলো অদিতিকে। ঘাড়ে পর পর কয়েকটা কিস করলো। অদিতি বলল
” আপনি ঘুমান নি?”
সাইফ অদিতির ঘারে কামড় বসিয়ে দিলো। অদিতি ব্যাথায় উফফফ করে উঠলো।
” এতক্ষণ দেরি করলে কেন আসতে?”
” মায়ের সাথে কাজ করছিলাম”
সাইফ অদিতি কে নিজের দিকে ফেরালো। নাকে নাক ঘষে দিয়ে বলল
” আজ আমি তোমাকে মন ভরে ভালোবাসবো, আর তুমি লক্ষি বিড়াল ছানার মত আমার বুকে মিশে থাকবে কেমন?”
অদিতি সাইফকে মৃদু ধাক্কা দিয়ে সরানোর চেষ্টা করলো। কিন্তু সাইফের কাছে অদিতির শক্তি নেহাৎ এক তেজপাতার মতো। সাইফ নিজের বলিষ্ঠ বাহুদ্বয়ে আবদ্ধ করে নিলো অদিতি কে। দীর্ঘ চুম্বনে ভিজিয়ে দিলো অদিতির ওষ্ঠদ্বয়। পরম আদরে মিশিয়ে নিলো নিজের সাথে। শাড়ির আচল ধরে টান দিলো খুলে ফেলার জন্য। কিন্তু টানছে তাও খুলে আসছে না। সাইফ বিরক্ত হয়ে বলল
” এই বা’ল ডা খুলে না ক্যান?”
অদিতি ফিক করে হেসে ফেললো
” সেফটিপিন লাগানো”
তাদের এই উন্মাদ প্রেম পর্ব ভোর রাত অবদি চলল। শেষ রাতে সাইফ অদিতিকে নিজের বুকে নিয়ে ঘুমিয়েছিলো। সেই ঘুম ভাঙলো অদিতির ৮ টায়। ঘুম ভাঙতেই ঘড়ির দিকে তাকালো
” ৮ টা বেজে গেছে। ইশশশ দেরি করে ফেললাম উঠতে”
কিন্তু সাইফ আষ্টেপৃষ্টে জরিয়ে রেখেছে। অদিতি কোনো মতো নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে ওয়াশরুমে গেলো। গোসল করে গাঢ় বেগুনি রঙের একটা শাড়ি পড়লো। চুল মুছে আচড়ে নিয়ে নিচে নামলো।
কিন্তু ড্রইং রুমে কেবল আঞ্জুমান আর নদী বসে। অদিতি তড়িঘড়ি করে নিচে নেমে বলল
” আজ উঠতে দেরি হয়ে গেছে মা। সরি”
আঞ্জুমান অবাক হয়ে বলল
” ঘুম ভাঙতে দেরি হয়েছে তাই সরি বলছিস কেন?”
নদী হাসলো অদিতির দিকে তাকিয়ে। অদিতি এই প্রথন নদীকে হাসতে দেখলো
” বাহহ আপুর হাসি তো মাশাল্লাহ খুব সুন্দর। আমি আজকে দেখলাম আপনাকে হাসতে”
হাসান চৌধুরী এলেন থমথমে মুখে। তার মুখ দেখেই বোঝা যাচ্ছে কিছু খারাপ ঘটেছে। আঞ্জুমান সোফা থেকে উঠে দাড়িয়ে বলল
” কি হয়েছে? আপনাকে চিন্তিত দেখাচ্ছে কেন?”
হাসান চৌধুরী প্রথমে আঞ্জুমান এর দিকে তাকালো তারপর নদীর দিকে। আঞ্জুমান আবার বলল
” বলুন না কি হয়েছে?”
হাসান চৌধুরী নদীর দিকে তাকিয়ে চোখ নামিয়ে নিয়ে বলল
” তুমূলকে হোটেল রেডিসনে একটি মেয়ের সাথে পাওয়া গেছে। পুলিশ গ্রেফতার করেছে ওদের।”
চলবে?
আসলে হইছে কি, আম্মু বাসায় নাই। সব কাজ ওরা আমায় দিয়ে করাচ্ছে। লেখার সময় পাচ্ছি না 🥹🥺। একটু ছোট হলেও মানিয়ে নিও পাখিরা 🫶😩
Share On:
TAGS: খাঁচায় বন্দী ফুল, জান্নাতুল ফেরদৌস
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ৪
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ৭
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ১০
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ৬
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ১৭
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ১৬
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ১৯
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ১৪
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ২০
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ১৫