Golpo কষ্টের গল্প খাঁচায় বন্দী ফুল

খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ১০


কপি করা কঠোর ভাবে নিষিদ্ধ ⚠️
দয়া করে কপি করে কেউ চোরের পরিচয় দেবেন না

খাঁচায় বন্দী ফুল

jannatul_ferdous_জান্নাতুল_ফেরদৌস

পর্ব – ১০

তুযা রাতেই বেড়িয়েছে অদিতির সৎ বাবার বাড়িতে যাওয়ার উদ্দেশ্যে। এই শীতের রাতে বাইকে চেপে এত দুর যাওয়া তাও আবার সাথে ১৩ টা বাইক। তুযা বাইক বাড়ির অনেক আগে রেখে গেলো। শব্দ পেয়ে পালাতে পারে হা রাম জাদা। গ্রামের রাস্তা, এমনিতেই গাড়ি চলে না। তাছাড়া শীতের রাত, এক সাথে ১২-১৩ টা বাইকের শব্দে আশে পাশের মানুষ ই সজাগ হয়ে যায়। বাইকে দুজন করে লোক। কোনো টায় আবার ৩ জন। ১ জন করে প্রত্যেক বাইকের সাথে একজনকে রেখে বাকিদের নিয়ে গেলো। তুযা আসার আগেই কয়েকজন কে দিয়ে খোজ নিয়েছে। তারা বাড়ির খোজ দিয়েছে।

বাড়িটা টিনের। কাঠের দরজায় টোকা দিলেই ভিতর থেকে নারী কন্ঠ ভেসে আসে।
” কে?”

তুযা ভ্রু গুটিয়ে নেয়। হাত উচু করে সবাইকে ইশারা দেয় চুপ থাকতে। মনে মনে ভাবছে
” ভুল বাড়িতে এলাম না তো?”

মানিক ফিসফিস করে বলল
” ছোট সাহেব, এত রাইতে ডাকলে তো কেউই দরজা খুলবো না। এরা তো আরো খুলবো না”

তুযা ফিচলে হাসলো।
” ওরা একাই খুলবে। চল আমার সাথে”


হাবিবের কথা মতো অদিতি বাইরে চলে যাচ্ছিলো। সেই মূহুর্তেই দীঘি পিছন থেকে ডাকলো
” শোনো”

অদিতি পিছনে ফিরে দীঘি কে দেখে হাসলো।
” কিছু বলবে?”

দীঘি এগিয়ে এসে অদিতির হাত ধরে বলল
” সরি ভাবি। আসলে আমিও তোমার সাথে ভালো ব্যাবহার করিনি। তুমি কিছু মনে রেখো না কেমন?”

অদিতি হেসে বলল
” আমি কিচ্ছু মনে করিনি”

দীঘি অদিতির হাত ধরে টেনে বলল
” তুমি ওদিকে কোথায় যাচ্ছো? এসো ভাইয়ার সাথে বসো আমরা ছবি তুলবো। এসো।”

অদিতি বলল
” কাকা বাবু বলল নদী আপু বাইরে আছে, আমি ডেকে নিয়ে আসছি তুমি যাও”

দীঘি বোকা বনে গেলো
” কীইইইইইই বলছো তুমি? আপু এই শীতের মধ্যে বাইরে কেন থাকতে যাবে? আপু তো নিজের ঘরে আছে। এসো তুমি”

অদিতি একবার পিছনে তাকালো আবার দীঘির দিকে তাকিয়ে বলল
” আচ্ছা চলো”

অদিতি কে ফিরে আসতে দেখে হাবিবের মাথায় আকাশ ভেঙে পড়লো। এ মেয়ে ফিরে কী করে এলো। অদিতি হাবিবের সামনে দাড়িয়ে বলল
” কাকা আপু ঘরে আছে। আমি ডেকে দিচ্ছি”

হাবিব রাগে কটমট করতে করতে বাইরে চলে গেলো। এই তুযা টাকেও কাজের সময় পাওয়া যায় না।

সাইফ অদিতির দিকে দেখছে বারবার। এই তিন দিনে মেয়েটাকে কীভাবে ভালোবেসে ফেলল। কি ভেবে আনলো আর কেমন তার অনুভূতি। আঞ্জুমান দীঘিকে বলল
” কিরে নদী কোথায়? রাত হচ্ছে। তোরা বাসর ঘর সাজাবি না? যা ফুল এসে গেছে। নদী কে নিয়ে দু বোনে বাসর ঘর সাজা।”

দীঘি তো মহা খুশি। বাসর ঘর সাজাবে। নাচতে নাচতে এক দৌড়ে চলে গেলো নদীর রুমে। নদী মোবাইল সাইফের ছবি বুকে জড়িয়ে নিরবে অশ্রু বিসর্জন দিচ্ছে। দীঘি ঘরের সামনে থেকে চেচাতে চেচাতে ঢুকলো
” আপুউউউ, এই আপুউউউ। আরে কি করছিস তুই ঘরে?”

নদী দীঘির কন্ঠ পেয়ে হকচকিয়ে উঠলো দ্রুত চোখের পানি মুছে মোবাইলের স্ক্রিন বন্ধ করলো।
দীঘি নদীর কাছে দাড়িয়ে খুশিতে গদগদ হয়ে বলল
” মনি মা বলেছে তোকে আর আমাকে সাইফ ভাইয়া আর ভাবির বাসর ঘর সাজাতে। আমার তো ভীষণ আনন্দ লাগছে। আমি কোনো দিন বাসর ঘর সাজাইনি। চল না, চল না, চল না।”

নদী দীঘির দিকে র ক্ত চক্ষু নিয়ে তাকালো। যেন পৃথিবীর সমস্ত ক্রোধ জমা হয়েছে তার দৃষ্টিতে। দীঘি নিজেও জানে না সে বোন কে কি বলেছে। অজান্তেই বোনের কলিজায় ছুড়ি মেরেছে দীঘি। নদী উঠছে না দেখে দীঘি নদীর হাত ধরে টান দিয়ে বলল
” আপু চল না, বাসর ঘর সাজা….”

কথাটা শেষ হওয়ার আগেই বেশ জোরে একটা চ’ড় পড়লো দীঘির গালে। নদী সজোরে একটা থা’প্পড় দিলো দীঘির গালে। দীঘি যেন আশ্চর্যের সর্বোচ্চ স্তরে। গালে হাত দিয়ে বড় বড় চোখ করে তাকিয়ে আছে নদীর দিকে। কী এমন বলল যে তাকে মারতে হলো। কখনে নদী বোনের গায়ে হাত তুলে নি। ভাই বোনের মা’রামা’রি স্বাভাবিক কিন্তু নদী দীঘিকে ছোট থেকেই মায়ের মতো আগলে রেখেছে। আজ এই সামান্য কথায় দীঘিকে মারলো? একমাত্র নদীই জানে, কথাটা মোটেও কোনো স্বাভাবিক কথা ছিলো না।

দীঘির আশ্চর্য মূহুর্তেই কষ্টে রুপ নিলো। কাদতে কাদতে বেরিয়ে গেলো ঘর থেকে। নিজের ঘরে গিয়ে দরজা আটকে রইলো দীঘি। বিছানায় শুয়ে শুয়ে জোরে জোরে কাদতে লাগলো।

নদী, দীঘি কাওকে না পেয়ে আঞ্জুমান ফুলের দোকানের লোকদের দিয়েই ঘর সাজালো। নানান রঙের গোলাপ, জারবেরা, জিপসি আরো কয়েক রকম ফুল দিয়ে সুন্দর করে সাজানো হলো বাসর ঘর।

সাদা ধবধবে বিছানার চাদরের মাঝখানে লাল গোলাপের পাপরি দিয়ে লিখো S মধ্যে একটা লাভ একে অপর পাশে লিখলো A

কোনো মেয়ে কেই পাচ্ছে না আঞ্জুমান। শাশুড়ি রা কি আর বউকে বাসর ঘরে দিয়ে আসতে পারে। আঞ্জুমান বিরক্ত হয়ে নিজেই নদীর ঘরে গেলো। নদী বোনকে মা’রার অনুশোচনায় কেদে অস্থির। কোন দিকে যাবে সে?

এর মধ্যে আঞ্জুমান ডাকলো
” নদীরে, ও নদী।”
নদী আচলে চোখ মুখ মুছে উঠে দাড়ালো
” হ্যা মনি মা বলো”

” কি রে। তোদের কি হয়েছে আজ বলতো। বাসর না হয় আমরা লোক দিয়ে সাজালাম। তাই বলে শাশুড়ী হয়ে কি আর বউকে বাসর ঘরে দিয়ে আসতে পারি? যা বউ মা কে ঘরে দিয়ে আয়”

নদী আঞ্জুমান এর মুখের ওপর কিছু বলতে পারে না। বাধ্য হয়ে আঞ্জুমান এর পিছন পিছন যায়। অদিতি সোফায় বসে সাইফের পাশে। নদী এসে ছোট করে বলল
” চলো”

অদিতির যেতেও কেৃন লজ্জা লাগছে। আস্তে করে উঠে নদীর সাথে গেলো। নদী অদিতির বাহু ধরে নিয়ে যাচ্ছে। সাইফ সেদিকে তাকিয়ে মুচকি হাসলো। নদী এক পা করে যাচ্ছে আর মনে হচ্ছে যেন কূয়োয় ঝাপ দিতে যাচ্ছে। প্রতিটা ধাও সে মৃ’ত্যুর দিকে এগোচ্ছে। নিজের সর্বোচ্চ শক্তি প্রয়োগ করেও পা ঢুলছে নদীর। হাটতে পারছে না। ঘরের সামনে এসে অদিতি কে বলল
” তুমি ভিতরে যাও। আমি নিচে যাচ্ছি। “

নদী না চাইতেও একবার তাকালো ঘরের দিকে। পুরো ঘর ফুলের গন্ধে মো মো করছে। বিছানা ফুলে ফুলে সাজানো। এখানে আজ তার স্বপ্নের পুরুষ বাসর করবে। নদী আর এক মূহুর্তও দাড়ালো না ওখানে।

এক দৌড়ে নিচে নেমে এলো। ড্রইং রুমেও অপেক্ষা করলো না। সোজা নিজের ঘরে। হাসান চৌধুরী বললেন
” সবাই ঘুমাতে যাও। অনেক রাত হয়েছে। “

সাইফ সবার আগে উঠলো। হাসান চৌধুরী মিনমিন করে বলল
” এ ছেলের লজ্জা সরম কোনো কালেই হবে না”

সাইফ রুমে ঢুকে দেখলো অদিতি খাটের এক কোণে বসে আছে। মাথা নিচু করে শাড়ির আচল আঙুলে পেঁচাচ্ছে বারবার। সাইফ সামনে যাতেই মাথা আরো নিচু করলো যেন থুতনি গিয়ে বুকে ঠেকছে।

সাইফ অদিতির সামনে হাটু মুড়ে বসে বলল
” আপনি কি একটুও জানেন না যে বাসর ঘরে স্বামী প্রবেশ করলে তাকে সালাম করতে হয়”

অদিতি কতাটা শোনা মাত্রই তারাহুরো করে নেমে সাইফ কে সালাম করতে যায়। সাইফ অদিতি কে ধরে ফেলে পায়ে হাত দেওয়ার আগেই। বুকে জড়িয়ে নেয় শক্ত করে।

হালাল স্পর্শ। এই স্পর্শে যেন আলাদাই শান্তি আছে। অদিতি লজ্জায় তাকাতে পারছে না সাইফের দিকে। সাইফ অদিতির থুতনি ধরে মুখ উচু করলো।

অদিতির কানে কানে ঘোর লাগা কন্ঠে বলল
” তাকাও”

অদিতি চোখ আরো খিচে বন্ধ করে নিলো। সাইফ অদিতির নাকে নাক ঘষে দিয়ে আবারও আদুরে গলায় বলল
” তাকাও না”
অদিতি তাও তাকালো না। অস্বস্তি হচ্ছে তার। নিশ্বাস ভাড়ি হয়ে আসছে। সাইফ অদিতির থুতনি ধরে ঠোটে একটা চুমু খেলো। আরো একটা চুমু দিলো ঠোটে। পরপর তিনটা চুমু দিলো।

অদিতি এবার তাকালো পিট পিট করে সাইফ বলল
” আমাকে দিবে না?”

অদিতি জবাব দেয় না। সাইফ পকেট থেকে এক জোরা স্বর্ণের চুড়ি বের করে অদিতির হাতে পড়িয়ে দিলো। তারপর হাতেও একটা চুমু খেলো।
” আমি চাই তুমি সব সময় এই চুড়ি জোড়া পড়ে থাকো”

” অনেক রাত হয়েছে। চলো বিড়াল ছানা। আজকে আমার বুকে ঘুমাবে”


সকাল সকাল জোয়ার্দার বাড়ির আবহাওয়া গরম। এ বাড়ির বড় ছেলের জন্য আজ মেয়ে দেখতে যাওয়ার কথা। রাজশাহী থেকে ঢাকা যাবে, এখান থেকে রওনা হওয়ার কথা ৮ টায়। মেয়ের বাড়িতে ১১ টার মধ্যে উপস্থিত থাকবে বলে কথা দিয়েছে এ বাড়ির কর্তী রাশেদা বেগম। ৮ টা পেরিয়ে ৯ টা বেজে গেছে তাও বড় সাহেব বাড়ি আসেনি। তাও যে সে বাড়িতে যাচ্ছে না তারা। মিনিস্টার হাসান চৌধুরীর বাড়িতে যাচ্ছে মেয়ে দেখতে। যদি উপস্থিতই হয় দেরিতে, তাহলে তাদের ব্যাক্তিত্ব কে ঠুনকো মনে করবে চৌধুরী পরিবার। ছোট ছেলে তুহিন রেডি হয়ে মায়ের পাশে দাড়িয়ে আছে। তুহিনের কাকা শামীম জোয়ার্দার ও পায়চারি করছে রুমের মধ্যে।

শামীমের মেয়ে নিশি সেলফি তুলতে ব্যাস্ত। রাশেদা একের পর এক কল করছে তুমূল কে। ধরার নাম ই নেই।

রাস্তায় জ্যামে আটকে ফর্সা মুখটা লাল বর্ণ ধারণ করেছে তুমূল এর। আজ মা নিশ্চয়ই খুব রেগে যাবেন। শীতের মধ্যে বাইক নিয়ে এত ভোরে বের হয়েছে। হাত পা জমে যাচ্ছে যেন ঠান্ডায়। সামনে একটা অ্যা’ক্সি’ডেন্ট হয়েছে সব গাড়ি জ্যামে আটকে।

ফোনটাও পকেটে সাইলেন্ট করা রিং হচ্ছে যে বলতেই পারবে না। আরও ৩০ মিনিট পর তুমূল বাড়িতে পৌছায়। হেলমেট খুলে সিল্কি চুল গুলো ব্যাক ব্রাশ করতে করতে বারিতে ঢুকে তুমূল। সদর দরজা পার হতেই ৫ জোড়া চোখ শকুন দৃষ্টিতে তাকিয়ে তার ওপর। যেন এক্ষুনি খেয়ে ফেলবে।

তুমূল প্রসঙ্গ এড়াতে বলল
” রাস্তায় একটা এ্যা’ক্সি’ডেন্ট হয়েছে। তাই জ্যামে আটকে গেছিলাম। চলো চলো। “

একটা শুভ কাজে যাচ্ছে বলে রাশেদা কথা বাড়ালো না। তবে বাড়ি এসে সুদে আসলে সবটা ফেরত পাবে তুহিন।

গাড়িতে গিয়ে খেজুরের রসের বোতলটা রেখে ড্রাইভারের পাশের সিটে বসলো। ড্রাইভার মজার ছলে বলল
” আপনারই তো জীবন বড় সাহেব। বাড়ির বিষয়- সম্পত্তি সব বুঝে পেয়ে গেছেন, সব দেখা শোনা করছেন। জীবন ঝিংকা লা লা। এহন বিয়া কইরা প্যারা বাড়ানোর দরকার ছিলো?”

তুমূল ব্যাঙাত্বক স্বরে বলল
” চুর বয়সে চু* খাচ্ছি, খুউব খাচ্ছি আরাম পাচ্ছি। তাই এবার বিয়ে করবো তোমার কোনো সমস্যা? “

” আপনার ইচ্ছা।”

দুটো গাড়ি নিয়ে রওনা হলো তারা হাসান চৌধুরীর বাড়ি। দুই ঘন্টায়ই পৌঁছে যায় তারা। বাড়ির সামনে আসতেই হাসান চৌধুরী হাবিব চৌধুরী আর সাইফ তাদের স্বাগতম জানালো। মিষ্টির প্যাকেট গুলো ড্রাইভার একে একে ভিতরে নিলো।

কিন্তু খেজুরের রস টা তুমূল নিজে নিলো। বাড়িতে প্রবেশ করে তারা সোফায় বসলো সকলে। টুকটাক কথা বার্তাও হলো। অদিতি আর সায়রা তাদের নাস্তা এগিয়ে দিলো।

নিশি তো সাইফ কে দেখেই ক্রাশ খেয়েছে। একে তো পটাতেই হবে যে করেই হোক। সাইফের গা ঘেষে দাড়িয়ে মৃদু কাশি দিলে
” উহুম, উহুম”

সাইফ তাকাতেই বলল
” হাই আমি নিশি। আপনি?”

সাইফ স্মিত হেসে বলল
” সাইফ চৌধুরী”

তুমূল অধীর অপেক্ষায় বসে আছে নদীর জন্য। মনে মনে বলল
” আপনার কাঁদার দিন ঘুচতে চলেছে ম্যাডাম। তুমূল জোয়ার্দার এসে গেছে। আপনার জন্য, শুধু এবং শুধু আপনার জন্য।”

গল্পের রিয়্যাক্ট কমেন্ট এমন চাঙ্গে উঠলে কিন্তু গল্প দিবো না 🥹🥲

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply