Golpo romantic golpo কি আবেশে

কি আবেশে পর্ব ৭


কি_আবেশে (০৭)

জেরিন_আক্তার

মেরাবের ব্যবহার এক মুহূর্তে এতটা পাল্টে যাবে স্নেহার কল্পনার বাহিরে ছিলো। স্নেহা এখনও মনে হচ্ছে স্বপ্ন দেখছে। ঘোরে চলে গিয়েছে। সাথে সাথে মনে করতে নিলো একটু আগের কথা। ভাবতে থাকে, একটা মানুষ এতটা মায়ের পাগল হতে পারে। যে কি না শুধু একটু কথার জন্য ঝড় বাঁধিয়ে ফেলেছিলো। স্নেহা গালে হাত দিয়ে বসে পড়লো বিছানায়। আজ মেরাবের থেকে এই থাপ্পড়টা আশা করেছিলো না। পরক্ষনেই মনটা প্রচন্ড খারাপ হয়ে গেলো।

মেরাব বাড়ি থেকে বেরিয়ে গাড়ি নিয়ে চলে যায়। এর মাঝে আসিফকে কল দিয়ে রেডি হতে বলে। আসিফ কিছুই বুঝতে পারে না। মেরাবকে জিজ্ঞাসা করে কিন্তু মেরাব এর কোনো উত্তরই দেয় না। শুধু বলে রেডি হয়ে বাসার সামনে দাড়িয়ে থাকতে। আসিফ মেরাবের কথা মতো রেডি হয়ে দাঁড়ায় নিজের বাসার সামনে।

মেরাব মিনিট বিশেক পরে আসিফের বাসার সামনে এসে গাড়ি থামায়। এরপরে আসিফকেউ গাড়িতে উঠতে বলে। আসিফ মেরাবের পাশের সিটে উঠে বসতে বসতে মশকরা করে বলে উঠে,

‘ কিরে ভাই, নতুন বউ রেখে বের হলি কেনো? বউ কাছে ঘেঁষতে দেয়নি? নাকি বলেছে প্লিজ আমাকে ছুবেন না। ’

মেরাব গম্ভীর গলায় বলে,

‘ বাজে কথা বলিস না তো! এমনেই মেজাজ চড়া, এরপরে কি বলে ফেলবো ঠিক নেই। ’

‘ কেন ভাই, কি হয়েছে? ’

মেরাব হেয়ালি কণ্ঠে বলে,

‘ ওসব ছাড়! এখন চল লং ড্রাইভে যাবো! ’

আসিফ মেরাবের দিকে হা হয়ে তাকিয়ে রইলো। পরক্ষনেই বলে উঠে,

‘ তু্ই লং ড্রাইভে যাবি তাও আবার বাড়িতে নতুন বউ বসিয়ে রেখে? ভাই সত্যি করে বলতো ব্যাপার কি? ’

মেরাব গাড়ি স্টার্ট দিয়ে বলতে শুরু করে,

‘ ভাই কি বলবো, আর কেউ না জানলেও তু্ই জানিস আমার মায়ের মৃত্যুটা স্বাভাবিক ভাবে হয়নি। সবাই জানে স্বাভাবিক ভাবেই হয়েছে। আর আমি আমার মাকে নিয়ে কোনো কথা শুনতে পারি না আর স্নেহা আজ আমার মাকে নিয়েই কথা বলেছে যা সহ্য করতে পারিনি। ’

‘ বুঝতে পেরেছি। তাহলে এই নিয়ে ঝামেলা করে চলে এসেছিস? ’

‘ হুম। ’

‘ তাহলে বাড়ি ফিরে কি বলবি? ’

‘ ওই কিছু একটা বলে দিবো। ’

‘ আর স্নেহাকে? ’

‘ জানি না। ’

স্নেহা শাড়ি চেঞ্জ করে বসে রইলো মেরাবের জন্য। মনে মনে নিজেকেই গালি দিচ্ছে—কেনো যে উনার সাথে বেশি কথা বলতে গেলাম। কথা না বলাই ভালো ছিলো। উনি যে এতো রাগী বোঝাই যায় না। ইনোসেন্ট হয়ে থাকে আর ভিতরে ভিতরে এতো রাগ। স্নেহা তু্ই আসলেই হাদারাম। তোর বুদ্ধিশুদ্ধি নেই। তু্ই ভুল সময়ে ভুল কথা বলেছিলি। তু্ই তো কয়টা দিন পরেও বলতে পারতি। কিন্তু না, তোর আজ না বললে তো হচ্ছিলো না। এখন থাক একা একা।

কথাগুলো বিড় বিড় করে দরজার দিকে তাকালো। আফসোসের সুরে বিড় বিড় করে বলে উঠলো,, ইশ, বাসর রাত নিয়ে কত স্বপ্ন ছিলো। উনার সাথে একসাথে নতুন জীবনটা শুরু করবো, উনার সাথে গল্প করবো। কিচ্ছু হলো না। উপহার হিসেবে থাপ্পড় দিয়ে গেলো বজ্জাতটায়।

মেরাব যে বাড়ি থেকে বের হয়ে গিয়েছে এটা কেউ দেখেনি বা খেয়ালও করেনি। সেক্ষেত্রে মেরাবেরও চিন্তা নেই।

আরও একটা নতুন সকাল,,,

স্নেহা ঘুম থেকে উঠে ফ্রেশ হয়ে নিচে নেমে আসে। এখন সে এই বাড়ির নতুন বউ। সকাল সকাল উঠে নিচে এসে কিছু না কিছু করতেই হবে। নাহলে কেউ তাকে বউ বলবে না। কথাগুলো আওড়াতে আওড়াতে কিচেনে এসে রহিমা আন্টির পাশে দাঁড়ায়। রহিমা বেগম বলে উঠেন,

‘ তুমি এখানে কেনো? কিছু লাগলে আমাকে বলতে?’

স্নেহা মুচকি হেসে বলে,

‘ না, কিছু লাগবে না। আপনার সাথে কিছু কাজ করে দেই? ’

রহিমা বেগম হেসে বলেন,

‘ কি বলো, কোনো কাজ করতে হবে না। তুমি হলে নতুন বউ। তুমি রুমে চলে যাও! ’

স্নেহা যায় না। কিচেনেই তার রহিমা আন্টির সাথে দাড়িয়ে থাকে। টুকটাক কথা বলে আবার নয়তো এটা-সেটা এগিয়ে দেয়।

আস্তে আস্তে সব মানুষ ঘুম থেকে উঠে যায়। মৌ আগে নিচে নামে। মারুফুল খান আর ফাহমিদা খান একসাথে আসেন। এরপরে আরিফুল খান। ফাহমিদা খান কিচেনে স্নেহাকে দেখে একটু অবাক হলেন। ধীর পায়ে এগিয়ে এসে বলেন,

‘ স্নেহা তু্ই কিচেনে? ’

রহিমা বেগম বলেন,

‘ আপা, স্নেহা আরও আগে এসেছে। এখানে এসে আমাকে বলে কাজ করবে। পরে আমি করতে দেইনি। ’

‘ একদম ঠিক করেছো। ’

রহিমা বেগম সবার জন্য চা নিয়ে যাবেন ঠিক সেই সময় ফাহমিদা খান তাকে থামিয়ে দিয়ে বলেন,

‘ চা গুলো আজকে স্নেহা দিয়ে আসুক। ’

স্নেহা মাথা নাড়িয়ে ট্রে টা হাতে নিয়ে সবার সামনে গেলো। মারুফুল খান আর আরিফুল খানকে চা দিয়ে আবারও কিচেনে এলো। ফাহমিদা খান স্নেহার দিকে তাকিয়ে বলেন,

‘ স্নেহা, মেরাব উঠেনি? ’

স্নেহার মুখের হাসিটা ফুস করে উবে গেলো। ভাবতে লাগলো কি বলবে। মেরাব তো সারারাত বাড়িই ফিরেনি। আর তার জন্যেই তো ফিরেনি। এখন এটা বলবে কি করে? স্নেহা চুপ থেকে আমতা আমতা করে বলে,

‘ মামিমা, উনি উনিতো মনে হয় সকালে হাঁটতে বের হলো! এরপরে তো ফিরেনি। ’

ফাহমিদা খান হেসে বলেন,

‘ ওহ, আচ্ছা। ’

এর কিছুক্ষন পরেই মেরাব বাড়ির সদর দরজা দিয়ে ঢুকলো। হাতে গাড়ির চাবি। চুলগুলো খানিকটা এলোমেলো। মেরাব কোনোদিকে না তাকিয়ে সোজা সিঁড়ি বেয়ে উপরে চলে গেলো। সবার চোখে মেরাবকে স্বাভাবিক দেখা গেলেও মারুফুল খানের কাছে স্বাভাবিক মনে হলো না। তার মনে হচ্ছে মেরাব রাতে বাড়িতে ছিলো না। স্নেহাদের বাড়ি থেকে এসে পাঞ্জাবী পাল্টিয়ে যে শার্ট-প্যান্ট পড়েছিলো সেগুলোই পড়ে আছে। মেরাব তিন বেলাই জামাকাপড় চেঞ্জ করে। এই বেশে মেরাবকে দেখে তার মনে হচ্ছে মেরাব সারারাত বাহিরেই কাটিয়েছে।

ফাহমিদা খান স্নেহাকে বলেন,

‘ স্নেহা মেরাব কি সকালে কফি খেয়েছে? ’

‘ না, মামিমা। উনি উঠেই চলে গিয়েছিলেন। ’

‘ ওহ, দাড়া আমি কফি বানিয়ে দিচ্ছি। তু্ই নিয়ে দিয়ে আয়! ’

স্নেহা বলে,

‘ ঠিক আছে। মামিমা। ’

ফাহমিদা খান বলেন,

‘ কি তখন থেকে মামিমা মামিমা করছিস? এখন কি তোর মামি হই, শাশুড়ি হই। ’

এদিকে মারুফুল খান চায়ের কাপ টা রেখে উঠে সিঁড়ি বেয়ে উপরে চলে গেলেন। মেরাবের রুমে এসে দেখেন মেরাব কাভার্ড থেকে জামাকাপড় বের করছে। মারুফুল খান ধীর গলায় বলেন,

‘ মেরাব, রাতে কোথায় ছিলে? ’

মেরাব গম্ভীর গলায় বলে,

‘ জানোই যখন তাহলে জানতে চাইছো কেনো? ’

এই বলে মেরাব ওয়াশরুমে ঢুকলো। মারুফুল খান শিওর হলেন মেরাব বাড়িতে ছিলো না। তাহলে ছিলো কোথায়? আর স্নেহাই কেনো মিথ্যে বললো সবাইকে? প্রশ্নগুলো মারুফুল খানের মাথায় গিজগিজ করছে।

সেই সময়ে স্নেহা রুমে ঢুকলো। মারুফুল খান তখন রুম থেকে বেরিয়ে গেলেন। স্নেহা কফি হাতে নিয়ে দাড়িয়ে রইলো। মেরাব ওয়াশরুম থেকে বের হলে কফিটা মেরাবের হাতেই দিবে। যা হবার হবে, পরে দেখা যাবে।

মেরাব সারারাত ঘুমায়নি, মাথাটা থম মেরে আছে বলে একবারে শাওয়ার নিয়ে ওয়াশরুম থেকে বের হলো। স্নেহা সাথে সাথে মেরাবের সামনে গিয়ে কফির মগটা এগিয়ে দিলো। মেরাব পাশ কাটিয়ে চলে যেতে যেতে বলে,

‘ ওখানে রাখো! ’

মেরাবের কথা না শুনে স্নেহা কফি হাতে নিয়েই দাড়িয়ে থাকে। মেরাব আয়নায় নিজেকে দেখে চুলগুলো ঠিক করে স্নেহার হাতে থেকে কফির মগটা নিয়ে বিছানায় বসে। একহাতে কফি খেতে থাকে আরেক হাতে ফোন স্ক্রল করতে থাকে।

স্নেহা মেরাবের দিকে তাকিয়ে রইলো। ভাবতে লাগলো, এই মানুষটাই কি রাতে অমন রেগে গিয়ে থাপ্পড় মেরেছিলো। বোঝাই যাচ্ছে না। মেরাব চট করে স্নেহার দিকে তাকালো। স্নেহার কোনো হেলদোল নেই। তার দিকে তাকিয়ে আছে তো আছেই। মেরাব তাকানোর পরেও চোখ সরাচ্ছে না।

মেরাব ভ্রু উঠিয়ে বোঝালো,, কি হয়েছে?

স্নেহা মাথা নাড়িয়ে বোঝায়,, কিছু না।

এরপরে স্নেহা চলে যায় রুম থেকে। মেরাব স্নেহার যাওয়ার পানে তাকিয়ে মুচকি হেসে বিড় বিড় করে বলে,,, ভেবেছিলাম এ হয়তো রেগে থাকবে কিন্তু তা তো উল্টো।

খাবার টেবিলে সবাই একসাথে বসে সকালের নাস্তা করছে। মেরাবও এসেছে। মেরাবের পাশেই দাড়িয়ে আছে স্নেহা। চোখ-মুখে খানিকটা লজ্জা, খানিকটা সংকোচ।

মারুফুল খান খেতে খেতে বলেন,

‘ আরিফ, সাদাফ কি আসবে না? ’

আরিফুল খান বলেন,

‘ ভাইজান ওকে ফোন দিচ্ছি কিন্তু পাচ্ছি না। ছেলেটা কোনো কিছু না বলে হুট্ করে দেশের বাড়িতে চলে গেলো আবার এর মধ্যে ফোন বন্ধ করে রেখেছে। ’

মেরাব সাদাফের কথা শুনতেই আড়চোখে স্নেহার দিকে তাকালো। স্নেহার মাঝে কোনো প্রতিক্রিয়া নেই। মেরাব জানতো সাদাফ স্নেহাকে পছন্দ করে। আর বিয়ের কথা চলাকালীনই সাদাফ চলে গিয়েছে। মেরাব স্নেহার দিকে তাকিয়ে এটা নিশ্চিত হলো, সাদাফ যে তাকে পছন্দ করতো এটা সে জানে না বা সেও সাদাফকে নিয়ে ওইরকম কিছু ভাবে না।

এর মধ্যে মারুফুল খান স্নেহাকে বলেন,

‘ স্নেহা তুমি যদি পড়াটা কন্টিনিউ করতে চাও তাহলে করতে পারো। আমাদের কোনো অসুবিধা নেই। ’

স্নেহা সাথে সাথে মেরাবের দিকে তাকালো। মেরাবও বলে,

‘ স্নেহা তুমি পড়তে চাইলে পড়তে পারো। না করবো না আমি। সাপোর্ট করে যাবো। ’

স্নেহা বলে,

‘ কিন্তু আমার বই গুলো তো আমাদের বাড়িতে। নিয়ে আসতে হবে। ’

মারুফুল খান মেরাবের দিকে তাকিয়ে বলেন,

‘ তাহলে মেরাব আজ তুমি স্নেহাকে নিয়ে একবার শশুরবাড়ি দিয়ে ঘুরে আসো আর বই গুলোও নিয়ে এসো। আর আজ শশুরবাড়ি যাওয়াটা তো নিয়মের মধ্যেই পড়ে। তুমি নিয়মও পালন করো আবার শশুরের সাথে না হয় কথাও বলে এসো। ’

মেরাব বাঁকা হেসে বলে,

‘ হুম কথা তো বলতেই হবে। উনার সাথে অনেক বোঝাপড়া বাকি আছে। ’

স্নেহা চোখ ছোট ছোট করে তাকালো মেরাবের দিকে। মারুফুল খান মেরাবের কথাটা বুঝতে না পেরে বলে উঠেন,

‘ বোঝাপড়া মানে? ’

মেরাব পরক্ষনেই মুখে এক চিলতে হাসি ফুটিয়ে বলে,

‘ উনি শশুর হন আর আমি উনার জামাই। সেক্ষেত্রে তো আমাদের সম্পর্কটা অন্যরকম। আর তার সাথে তো আমার ভালো করে কথাই হচ্ছে না। সেটাই বোঝাতে চেয়েছি। ’

সবাই হেসে উঠলো মেরাবের কথা শুনে। কিন্তু মেরাবের মনে মনে প্রচন্ড রাগ হচ্ছে।

চলবে….

পরবর্তী পর্ব কালকে দুপুর ২ টায় আসবে ইনশাআল্লাহ। এর আগে কোনো পর্ব আসবে না।
ভুল-ত্রুটি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। কেউ বাজে মন্তব্য করবেন না। রেসপন্স করবেন!!!!!!

[হেশট্যাগ ব্যবহার ছাড়া কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ]

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply