Golpo romantic golpo কি আবেশে

কি আবেশে পর্ব ৫


কি_আবেশে (০৫)

জেরিন_আক্তার

মারুফুল খান মেরাব আর স্নেহাকে দেখে রুমের সামনে থেকে দু-পা পিছিয়ে যান। মেরাব সেটা দেখতে পেয়ে সাথে সাথে স্নেহাকে সোজা করে খানিকটা বিরক্তি প্রকাশ করে বলে,

‘ দেখে চলতে পারো না। একবারে গায়ের উপরে এসে পড়তে হবে? ’

স্নেহা স্তব্ধ মেরাবের কথা শুনে। যেই মেরাবকে কিছু বলার জন্য মুখ খুলবে ঠিক তখনই মেরাব স্নেহার মুখ চেপে ধরে। স্নেহা ড্যাব ড্যাব চোখে তাকালো মেরাবের দিকে। মেরাব একটু গলা উঁচিয়ে শব্দ করে বলে উঠে,

‘ তোমার শক্তি নেই? খাও না নাকি? একটু চুল ধরে টান দেওয়াতেই পড়ে যেতে হবে। ভাগ্গিস ধরেছিলাম নাহলে তো দাঁত সবকটা এখনই ভাঙতো! ’

মারুফুল খান চলে যান জায়গা থেকে। মেরাব দরজার বাহিরে এসে হালকা উঁকি দিয়ে দেখে তার বাবা আছে কি না। যেই দেখেছে চলে গিয়েছে ঠিক তখন মেরাব স্নেহার মুখ ছেড়ে দেয়। স্নেহা তখনও একধ্যানে মেরাবের দিকে তাকিয়ে আছে। মেরাব স্নেহাকে সজাগ করতে ধমক দেয়,

‘ এই এই মেয়ে! জেগে জেগে স্বপ্ন দেখছো নাকি? ’

স্নেহা ঘোর থেকে বেরিয়ে বলে,

‘ আ আসলে বড় মামা আমাদের একসাথে হয়তো দেখে নিয়েছে। ’

মেরাব বলে,

‘ হুম, তাতো দেখে নিয়েছে। সেটা ম্যানেজও করতে পেরেছি। এটা নিয়ে মনে হয়না আর ভাববে। আর তুমি! তুমি আমার উপরে এসে পড়লে কেনো? ’

স্নেহা আঙুল উঠিয়ে বলে,

‘ দেখুন সবসময় আমাকে দোষারোপ করবেন না। আপনি আমার চুল ধরে টান দিয়েছেন। আর এতো জোরেই দিয়েছেন যে আমি সেটায় ব্যালেন্স হারিয়ে ফেলেছিলাম। ’

মেরাব স্নেহার আঙুলের উপরে নিজের আঙুল দিয়ে বলে,

‘ এইটুকুতেই ব্যালেন্স হারিয়ে ফেলেছো। আর তোমার এইসব ছেলেমানুষি দেখে তোমার স্বামী যে তোমাকে ইচ্ছেমতো ধোলাই দিবে তখন কি করবে? ’

‘ আপনিও সাদাফ ভাইয়ার মতো বলছেন? ’

মেরাব তপ্ত শ্বাস ছেড়ে বলে উঠে,

‘ দেখো, আমাকে কারো সাথে কম্পেয়ার করবে না। আর কি জন্যে এসেছিলে তাড়াতাড়ি বলে এখানে থেকে কেটে পড়ো! ’

স্নেহা নিশ্চুপ হয়ে গেলো। ভাবতে লাগলো কিসের জন্য এসেছে। সত্যিই তো কিসের জন্য এসেছে সে। কোনো কারণও তো নেই। সাথে কি বাহানা দিবে তাও তো ভেবে আসেনি।

স্নেহা হাত কচলাতে কচলাতে বলে,

‘ আসলে আমরা তো চলে যাচ্ছি, তাই আপনাকে বলতে এসেছি। ’

মেরাব পট করে বলে উঠে,

‘ ঠিক আছে, দেখে যেও! ’

স্নেহা বোকা বনে গেলো। মনে মনে ভাবতে লাগলো এই লোকটা তো একটু সুন্দর করেও বলতে পারতো। নাহয় একটু এগিয়েই দিতে পারতো। কিন্তু তার মধ্যে গুরুগম্ভীর ভাবটা বেশি। নিজে থেকে আগ বাড়িয়ে একটা কথাও বলে না।

মেরাব গাড়ির চাবি নিয়ে বের হতে হতে বলে,

‘ এসো! ’

‘ কোথায়? ’

‘ আমি রুম থেকে বের হবো! তুমি কি করবে একা একা! ’

স্নেহা রুম থেকে বের হতে হতে বলে,

‘ আপনি কোথায় যাবেন এখন? না মানে গাড়ির চাবি নিয়ে বের হলেন তাই বললাম! ’

মেরাব রুমের দরজা চাপিয়ে দিয়ে বলে উঠে,

‘ বন্ধুর সাথে দেখা করতে। ’

স্নেহা বিড় বিড় করে বলে,,, ভেবেছিলাম হয়তো আমাদের নামিয়ে দিতে যাবে কিন্তু এ তো দেখি তার উল্টো।

মারুফুল খান রুমে এসে বিছানায় বসে পড়লেন। ফাহমিদা খানকে পানি আনতে বললেন। ফাহমিদা খান বেশ আশ্চর্য, কারণ মারুফুল খান মাত্রই রুম থেকে বেরিয়েছিলো আর এতো তাড়াতাড়ি ফিরে এলো। ফিরে এসে আবার পানি চাইছে। ফাহমিদা খান পানির গ্লাসটা এগিয়ে দিয়ে বলেন,

‘ কি হয়েছে তোমার বলোতো? তোমাকে মোটেও ঠিক লাগছে না। ’

মারুফুল খান পানি খেয়ে বলেন,

‘ ফাহমিদা স্নেহাকে তোমার কেমন লাগে? ’

ফাহমিদা খান কপাল কুচকালেন,

‘ কেমন লাগবে, ভালোই তো লাগে। ’

‘ মেরাবের সাথে মানাবে? ’

ফাহমিদা খান বসে বললেন,

‘ তুমি ঠিক কি বলতে চাইছো বলোতো! ’

‘ মেরাবের সাথে স্নেহার বিয়ের কথা বলতে চাইছি।’

ফাহমিদা খান চমকে উঠে বলেন,

‘ কি বলছো! মেরাব বিয়ে করবে ওকে। আর ছেলেরটায় দুদিন হলো এসেছে। তোমার কি ভালো লাগছে না। এখন বিয়ের কথা বলবে আর যদি ও চলে যায় তখন? ’

মারুফুল খান মাথা নাড়িয়ে বলেন,

‘ যাবে না! আমি একটু আগে গিয়েছিলাম ওদের একসাথে দেখলাম আর বুঝতে পারলাম মেরাব স্নেহার সাথে অতটা রাগ দেখালো না। আর আমার মনে হয় মেরাবকে স্নেহাই সোজা করতে পারবে। মেরাবকে যদি স্নেহার সাথে বিয়ে দিতে পারি তাহলে ছেলেটা খুব ভালো থাকবে। ’

ফাহমিদা খান বলেন,

‘ কিন্তু বিয়ে দিলে এরপরে যদি পরে মর্জি ধরে! ’

‘ ধরবেনা। মেরাবের উপরে বিশ্বাস আছে। ’

মেরাব সন্ধ্যার দিকে বাড়ি আসে। ফাহমিদা খান কিচেনে রহিমা আন্টির সাথে রাতের জন্য খাবার রান্না করছিলেন। মেরাব ফাহমিদা খানের দিকে তাকিয়ে সোফায় গিয়ে বসে। মানুষটাকে দেখলে মেরাবের মায়ের কথা মনে পড়ে যায়। মেরাব এখন পর্যন্তও তাকে মা বলে ডাকে না। এই নিয়ে ফাহমিদা খানেরও কষ্ট কম হয়না। তিনি এই মেরাবের জন্য এই বাড়ির বউ হয়ে এলেন। কিন্তু সেই মেরাব এখনও তার মায়ের জায়গায় তাকে বসাতেই পারেনি। তবুও ফাহমিদা খান হাল ছাড়েননি। তিনি মেরাবের আদর, যত্নের কমতি রাখেন না। ফাহমিদা খান মেরাবকে খেয়াল করতেই এগিয়ে এসে বলেন,

‘ মেরাব, কিছু খাবে? ’

‘ কফি দিও! ’

‘ ঠিক আছে, বসো! ’

ফাহমিদা খান চলে যান কিচেনে। রহিমা আন্টি বলেন,

‘ আপা দেন আমি কফি বানিয়ে দেই! ’

‘ না, তুমি অন্য কাজ করো, আমি কফি বানিয়ে দিচ্ছি। ’

ফাহমিদা খান কফি বানিয়ে মেরাবের সামনে নিয়ে আসেন। মেরাবকে কফি দিয়ে পাশেই দাড়িয়ে রইলেন। এরপরে নরম গলায় বলেন,

‘ মেরাব তোমায় একটা কথা বলবো? ’

‘ হুম বলো! ’

‘ বলছিলাম তোমার কি কোনো পছন্দ আছে? মানে কোনো মেয়েকে পছন্দ হয়। ’

মেরাব আচমকা এই কথা শুনতে পেয়ে বিষম খেয়ে উঠে। পরক্ষনেই নিজেকে সামলে নিয়ে বলে,

‘ হঠাৎ এই প্রশ্ন? ’

‘ আসলে তোমার বাবা বলছিলো। তাই আমি জিজ্ঞাসা করলাম। ’

মেরাব সোজাগলায় বলে উঠে,

‘ ওহ। পছন্দ নেই! ’

‘ ওহ আচ্ছা! ’

মেরাব কফি খেয়ে উঠে চলে গেলো। নিজের রুমে এসে ফোনটা বের করে চার্জ দিয়ে ওয়াশরুমে ঢুকলো ফ্রেশ হতে।


মারুফুল খান ফাহমিদা খানের সাথে বুঝে, আলাপ করে সিদ্ধান্ত নেয় মেরাবের সাথে স্নেহার বিয়ের কথাটা এগোবেন। মারুফুল খান আফনান মির্জাকে কল দেন। কিন্তু ফোন বন্ধ বলছে। তাই মারুফুল খান নাফিসা বেগমের ফোনে কল দেন।

‘ হ্যালো, নাফিসা! ’

‘ হ্যা ভাইজান বলো! ’

‘ তোরা ভালোই ভালোই পৌঁছে গিয়েছিস তো? ’

‘ হুম। ভাইজান! ’

‘ কি করছিস এখন? ’

‘ কিছুনা ভাইজান! ’

‘ শোন যার জন্য কল দিয়েছি, আমি আর তোর ভাবি একটা জিনিস ভেবে দেখলাম, মেরাবের সাথে স্নেহাকে ভালো মানায়। স্নেহাকেও খুব পছন্দ হয়। ওদের বিয়ে হলেও মন্দ হবে না। কথা টা তোকে আগেই বলবো কিন্তু বলা হয়ে উঠেনি। এখন তু্ই কি বলিস? ’

নাফিসা বেগম খানিকটা খুশিই হলেন কথাটা শুনে। মেরাবও তো ভালো ছেলেই। তার মধ্যে আবার ভাইয়ের ছেলে। তিনি হেসে বলেন,

‘ ভাইজান, এ তো ভালো কথাই। আমারও বেশ পছন্দ মেরাবকে। ’

‘ শুধু তোর পছন্দ হলে তো হবে না। আফনানের মতামতও নিতে হবে। মেরাব এসেছে থেকে আফনান বললো যে আসবে কিন্তু ও তো এলোই না। এলে না হয় সামনাসামনি কথা বলতাম। ’

‘ ভাইজান স্নেহার বাবাকে নিয়ে চিন্তা করো না। ওরও মেরাবকে অপছন্দ হবে না। ’

‘ তবুও তু্ই একটু বলিস! ’

‘ ঠিক আছে। হসপিটালে থেকে আসুক বলবো। ’

মারুফুল খান ভাবুক গলায় বলে উঠেন,

‘ মনে করে জানাস। যদি রাজি থাকে তাহলে দুই-একের মধ্যেই বিয়েটা সেরে ফেলবো। বলা তো যায় না মেরাব আবার কি করে বসে। ’

‘ হুম, ওর বাবা ফিরলেই বলবো। আর ওর বাবাও এতে সম্মতি দিবেন। ’

‘ ঠিক আছে। তু্ই ওকে বলে একটু তাড়াতাড়ি জানাস। এখন রাখছি। ’

মারুফুল খান কল কেটে দিলেন। এই কথাগুলো আবার মৌ শুনতে পায়। মারুফুল খানের ফোনে কথা বলার সময়ই রুমে আসে। মৌ সব কথা শুনে রুম থেকে বেরিয়ে চলে যায় মেরাবের রুমের দিকে। এখন ভাইকে সবটা জানাবে।

মৌ মেরাবের রুমে এসে দেখে তার ভাই ব্যালকনিতে বসে ফোনে কথা বলছে। মৌ তড়িৎ পায়ে মেরাবের কাছে যায়। মেরাব ফোনে থাকা ব্যক্তিকে বলে,

‘ তোকে পরে ফোন করছি! ’

মৌ এসে দাড়িয়ে থাকে। যা দেখে মেরাব বলে,

‘ কিরে শাকচুন্নি! কিছু বলবি? ’

‘ ভাইয়া, একটা খবর আছে। যা তুমি জানো না ! ’

‘ কি খবর! ’

‘ ভাইয়া, আম্মু আর আব্বু মিলে তোমার সাথে স্নেহা আপুর বিয়ে ঠিক করেছে। ’

মেরাব হাসলো। তবে কোনো প্রতিক্রিয়া দেখালো না। যেনো এইটা শোনার জন্যই অপেক্ষায় ছিলো। মৌ বলে,

‘ ভাইয়া ওরা তোমার সাথে আলোচনা না করেই বিয়ের কথা এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। তাই আমিই তোমাকে জানাতে এলাম। ’

মেরাব মৌকে পাশে বসিয়ে বলে,

‘ ওরা আমাদের বাবা-মা, ওরা যা সিদ্ধান্ত নিবে তা আমাদের ভালোই হবে। খারাপ হবে না। ’

পরক্ষনেই মৌকে বলে,

‘ ওসব ছাড়! এখন একটা কাজ করে দে তো! ’

‘ কি কাজ বলো! ’

‘ আমার মাথাটা টিপে।দে তো! মাথাটা খুব ধরেছে। ’

‘ ঠিক আছে! ’

মৌ উঠে দাড়িয়ে মেরাবের মাথায় হাত দেয়। এর একটু পরেই মেরাব নীরবতা ভেঙে নিরেট গলায় বলে,

‘ মৌ, কেউ যদি কোনো কারণ ছাড়াই তোর জীবনের সবচেয়ে প্ৰিয়, মূল্যবান জিনিস ছিনিয়ে নেয় তখন তু্ই তাকে কি করবি? ’

মৌ স্বাভাবিকভাবেই উত্তর দেয়,

‘ ভাইয়া ওকে একদম মেরে ফেলবো। ’

‘ না, মেরে ফেললে তো এখানেই সব শেষ হলো। সেটাকে ঘুরিয়ে প্রতিশোধ নিতে চাইলে কি করবি? ’

‘ ভাইয়া আমি কোনো প্রতিশোধ বুঝিনা, ওকে একদম মেরেই ফেলবো। ’

মেরাব মুখে বাকা হাসি ফুটিয়ে মনে মনে বলে,,, আমি এমনি এমনি মারবো না। জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে শেষ করে দিবো। শুধু স্নেহার সাথে বিয়ের অপেক্ষা। ওরা আমার মূল্যবান জিনিসটা যেভাবে কেড়ে নিয়েছে আমি ওদেরকে ছাড়বো না। শুধু আল্লাহ আল্লাহ করে বিয়ে পর্যন্ত যাক।


আফনান মির্জা আর স্নেহা মুখোমুখি হয়ে খাবার খেতে বসেছেন। স্নেহা তার মায়ের থেকে বিয়ের কথাটা শুনে মহাখুশি। যাই হোক, যাকে পছন্দ হয়েছিলো তাকে বলার আগেই বিয়ের কথা উঠে এসেছে। যার জন্য স্নেহার খুশির শেষ নেই।

নাফিসা বেগম আফনান মির্জার দিকে তাকিয়ে বলেন,

‘ তোমার সাথে একটা কথা আছে! বলবো? ’

‘ হুম, বলো! ’

‘ বড় ভাইজান ফোন দিয়েছিলো। ভাইজান আর ভাবি ঠিক করেছে স্নেহাকে মেরাবের বউ করে ঘরে তুলবে! তুমি যদি রাজি থাকো তাহলে ওরা তাড়াতাড়িই সব করে ফেলবে। ’

আফনান মির্জা মাথা তুলে আগে স্নেহার দিকে তাকালো। স্নেহা খানিকটা লাজুক হয়ে মাথা নত করে খেতে লাগলো। আফনান মির্জা পরক্ষনেই খাবার খাওয়ায় মনোযোগী হয়ে বলেন,

‘ ঠিক আছে, আমি রাজি। ভাইজানকে সব কিছু করতে বলো! ’

এই কথা শুনে স্নেহা আর বসলো না। লজ্জা পেয়ে টেবিল ছেড়ে চলে গেলো।

চলবে….

দেরি করে দেওয়ার জন্য দুঃখিত। পরবর্তী পর্ব কালকে দুপুর ২ টায় দিবো। ইনশাআল্লাহ।
ভুল-ত্রুটি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। কেউ বাজে মন্তব্য করবেন না। রেসপন্স করবেন!!!!!!

[হেশট্যাগ ব্যবহার ছাড়া কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ]

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply