কি_আবেশে (৪১)
জেরিন_আক্তার
মেরাব স্নেহার মান-অভিমানের পালা শেষ হলো। স্নেহা বিছানায় থেকে নেমে রুম থেকে বেরিয়ে গেলো। সাইদার রুমে এসে ঠেকলো। দুজনেই ব্যাগ-পত্র গোছানো শুরু করে দিয়েছে। সকালে চলে যাবে। মাহিনেরও কাজের চাপ বাড়ছে। তাই আর থাকতে চায় না। স্নেহা রুমে ঢুকলো। ওদের জন্য মনটাও খারাপ লাগছে। অনেদিন ছিলো। আবার মেরাবের অসুস্থতার কথা শুনেও চলে এসেছে। অনেক সাহায্য করেছে মাহিন।
স্নেহা মাহিনকে উদ্দেশ্যে বলল,
“দুলাভাই, আর কয়টা দিন থেকে যাননা। বাড়িটা খালি পড়ে যাবে।”
মাহিন শয়তানি করে বলল,
“শ্যালিকা, দুই-তিন সন্তানের জননী হও। বাড়িটা ভরে ফেলো। আমাদের আর কি দরকার।”
স্নেহা লজ্জায় রেগে গিয়ে বলল,
“দুলাভাই..! এ কেমন কথা?”
“ভালো কথা।”
স্নেহা রুমে এসে ব্যালকনি খুলে দিলো। মেরাবেরও ঘুম ভেঙে গিয়েছে। স্নেহা ব্যালকনিতে পা রাখলো। চোখ গেলো বাগানের দিকে। অনেকগুলো বাঁশ রাখা আছে। স্নেহা অবাক হয়ে মেরাবকে বলল,
“এই দেখুন, বাগানে। অনেকগুলো বাঁশ এনে রাখছে। এগুলো দিয়ে করবে কি?”
মেরাব মাথা তুলে বলল,
“বাঁশ দিয়ে কি করবে? নিশ্চই ভালো মানুষদের ভরে দিবে।”
স্নেহা মেরাবের কাছে এসে বসে বলল,
“উফ, সবসময় অন্য কথা বলেন। দেখবেন তো বাঁশ গুলো কেনো এনেছে, তা না! উল্টো বলছেন ভালো মানুষদের দিবে।”
“হুমম।”
স্নেহা বিছানায় থেকে নেমে ব্যালকনিতে গিয়ে বাঁশগুলোর ছবি এনে মেরাবকে দেখিয়ে বলল,
“দেখুন অনেকগুলো বাঁশ। কাউকে দিতে আনেনি। হয়তো প্যান্ডেল করবে।”
মেরাব উঁবু হয়ে শুয়েই বলে উঠলো,
“ওগুলো আমার বিয়ের প্যান্ডেল।”
“আপনার বিয়ে মানে? আপনি বিয়ে করেছেন তো!”
“কে বলেছে বিয়ে করেছি?”
“তাহলে আমি কে?”
মেরাব মাথা তুলে তাকিয়ে মুখে শয়তানি হাসি এনে বলল,
“তুমি তো আমার বিয়ের আগের বউ-প্রেমিকা। বিয়ে তো তোমাকেই করবো। ঈদের পরেই বিয়ের অনুষ্ঠান শুরু হয়ে যাবে। তাই বাঁশগুলো আগেই এনে রাখলো।”
স্নেহা বিছানায় থেকে উঠে মেরাবের উপরে থেকে চাদর সরিয়ে বলল,
“এখন উঠুন। কত বেলা হয়েছে দেখেছেন?”
মেরাব চাদর টেনে নিজের শরীরে জড়িয়ে কাত হয়ে শুয়ে বলল,
“নাহ উঠবো না। পরে, এখন যাও!”
“আমিও যাবো না। উঠুন!”
“আজ না বাপের বাড়ি যাওয়ার কথা ছিলো।”
“আপনিই তো উঠছেন না।”
“এখন উঠবো না। বিকেলে যাবো, সকালে এসে পড়বো। আর ঈদ কোথায় করতে চাও?”
“আপনার সাথে।”
“বলছি কোন বাড়িতে?”
“খান বাড়িতে।”
“ঠিক আছে।”
স্নেহা কাভার্ড থেকে জামাকাপড় বের করে রাখলো। মাহিন আর সাইদা এসে আবার দেখা করে গিয়েছে। মেরাব আবার ওদের বিয়ের প্রোগ্রাম শুরু হওয়ার আগেই আসতে বলেছে। শুরু থেকে ওদেরই থাকতে বলেছে।
মেরাব বিকেলের দিকে স্নেহাকে নিয়ে ওর বাড়িতে চলে গেলো। সেখানে যাওয়ার একটাই কারণ স্নেহাকে একটু খুশি করা। এতদিনে ও মেরাবের জন্য অনেক কষ্ট পেয়েছে। চুপচাপ থেকেছে। কাউকে সেভাবে লজ্জায় বলতে পারেনি। নিশ্চই মায়ের কাছে গিয়ে একটু স্বস্তি পাবে।
মেরাব এই বাড়িতে এসে স্নেহার রুমেই শুয়ে রইলো। গাড়িতে এসে মাথা ঝিমঝিম করছে। স্নেহা মেরাবের পাশ থেকে উঠে মায়ের কাছে গিয়ে কিছু কাজ এগিয়ে দিলো। সন্ধ্যার সময় এসে দেখলো মেরাব ঘুমিয়ে আছে। এমনেই মেরাবের শরীরটা ভালো নেই। স্নেহা বিরক্ত করলো না। আলগোছে ব্যালকনির দরজা লাগিয়ে দিয়ে রুম থেকে বের হলো।
এর এক ঘণ্টা পরে মেরাব ঘুম থেকে উঠে ফ্রেশ হয়ে রুম থেকে বের হলো। নাফিসা বেগম মেরাবকে ডেকে ডাইনিং টেবিলে বসালেন। এসেছে থেকে কিচ্ছু খায়নি। মেরাব ডাইনিং টেবিলে বসতেই স্নেহা রুমে গিয়ে মেরাবের খাবার খাওয়ার আগের ওষুধ নিয়ে এলো। মেরাবের হাতে দিয়ে ওখানেই দাড়িয়ে রইলো। মেরাব ওষুধ খেয়ে কিছু খাবার খেয়ে রুমে এলো। স্নেহা রুমে এসে মেরাবের পাশে বসলো।
সকালবেলা,,,
মেরাব আর স্নেহা খাওয়া-দাওয়া শেষ করে চলে আসার জন্য রওনা হলো। স্নেহাকে আবার ঈদের পরের দিন বাড়িতে পাঠিয়ে দিবে। এরপরেই বিয়ের রিচুয়াল শুরু হবে।
বিকেলবেলা,,,
খান বাড়ির ড্রইং রুমে সবাই বসে আছে। ফাহমিদা খান মেরাবের জন্য ভেজিটেবল স্যুপ বানাচ্ছেন। মেরাব অসুস্থতার জন্য রোজা থাকে না বলতে কেউই ওকে থাকতে দেয় না। তিনবেলাই ওষুধ খেতে হয়।
মেরাব মোবাইল স্ক্রল করছিলো। স্নেহা পাশে বসে টিভি দেখছিলো। মেরাব মোবাইল দেখার পাশাপাশি স্নেহাকে চিমটি কাটছিলো। স্নেহা একহাত দূরে গিয়ে বসলো। মেরাব তবুও চিমটি কাটছিলো। স্নেহা হাই তুলে বলেই উঠলো,
“মামনি, দেখো কেমন করে!”
ফাহমিদা খান কিচেনে থেকেই বলে উঠলেন,
“কেমন করে?”
“তোমার ছেলে মারে!”
মেরাব স্নেহার দিকে তাকিয়ে বলল,
“তোমায় মারলাম কখন? ছি ছি রোজা থেকে মিথ্যে কথা বলতে লজ্জা করে না।”
“কই মিথ্যে বললাম আমি দেখলাম তো আপনি মারলেন।”
“এহ, মিথ্যাবাদী!”
“তাহলে সত্য কি বলুন?”
“আমি তোমায় মারিনি।”
“মেরেছেন।”
“আল্লাহ কি বউ কপালে দিলা। আগে যদি জানতাম এই মেয়ে মিথ্যাবাদী তাহলে বিদেশেই সুন্দরী দেখে একটা মেয়েকে বিয়ে করে নিতাম।”
“করতেন, না করেছিলো কেউ? দরকার হলে এখনও করুন।”
“সত্যিই কিন্তু করবো। মেয়ে কিন্তু রেডিই!”
ফাহমিদা খান দুজনের দিকে তাকিয়ে রইলেন। একেক সময় দুজনকে দেখে মনে হয় ওদের মতো ভদ্র কাপল দুনিয়ায় নেই। আবার একেকসময় দুজনকে দেখে মনে হয় ওদের মতো ঝগড়ুটে একটাও নেই।
ফাহমিদা খান ওদের ঝগড়ার মধ্যে আরেকটু ঘি ঢেলে দিতে বললেন,
“মেরাব, শুনলাম তোমার খালাতো বোন জান্নাত ও নাকি আসতে চাইছে। বলা যায় মেয়েটা তোমার জন্য এখনও পাগল। ছোটবেলায় যখন অবুঝ ছিলে তোমরা কতই না বর-বউ খেলেছো।”
স্নেহা চোখ বড়বড় করে তাকালো মেরাবের দিকে। মেরাব ফাহমিদা খানের দিকে তাকিয়ে বলল,
“সত্যিই খেলেছি নাকি?”
“হুমমম।”
স্নেহা কুশন নিয়ে মেরাবের দিকে ছুড়ে মেরে উঠে দাড়িয়ে বলল,
“আপনার রুমে আসা বন্ধ।”
স্নেহা গটগট করে চলে গেলো। মেরাব ফাহমিদা খানের দিকে তাকিয়ে বলল,
“মা, এইটা না বললেও পারতে।”
রাতে খাবার খেয়ে মেরাব রুমে এলো আগে। স্নেহা এখনও আসেনি। মেরাব আয়নায় দাড়িয়ে নিজেকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে লাগলো। বিশেষ করে কপালের একটা সাইডে কাটা দাগটা। সেদিন এয়ারপোর্ট থেকে নিজে ড্রাইভ করার পেছনেও একটা কারণ ছিলো। সেদিন গাড়িটা এমনি এমনি এক্সিডেন্ট হয়নি। গাড়ির মধ্যে সমস্যা ছিলো বলেই ও নিজেই ড্রাইভ করেছে। মেরাবকে মারার জন্যই এমন করা হয়েছে। মেরাব যদি সেদিন খবরটা না পেতো তাহলে আজ ওর জায়গায় ড্রাইভারটা থাকতো।
মেরাব টি-শার্ট আর ট্রাউজার চেঞ্জ করতে ওয়াশরুমে চলে গেলো। শুধু কালো প্যান্ট পড়ে বের হলো। এরপরে কাভার্ড থেকে কালো শার্ট বের করলো। শার্টটা নতুন হওয়ায় বোতাম খুলতে শুরু করলো। স্নেহা রুমে এসে পেছনে থেকে মেরাবকে বলল,
“আচ্ছা একটা কথা জিজ্ঞাসা করবো?”
“একটা কেনো হাজারটা করো!”
“আপনি কি বিদেশে জিম করতেন? না মানে আর কি?”
মেরাব শয়তানি করে ঠোঁট বাকিয়ে বলল,
“বুঝেছি, সব আমার শরীরটাকে খারাপ করার ধান্দা। নজর লাগাচ্ছো কেনো?”
স্নেহাও তালে তাল মিলিয়ে বলে উঠলো,
“আপনি শরীর বের করে রাখবেন আর আমি দেখলেই দোষ?”
“হুমমম। মহা দোষ।”
“যান তাকাবো না।”
“না, তাকালে আমার কি?”
স্নেহা বিড়বিড় করে বকতে বকতে অন্যদিকে ফিরে দাড়ালো। মেরাব এগিয়ে এসে পেছনে থেকে স্নেহার কোমর ধরে নিজের ঢুকে ঘুরিয়ে নেশালো চোখে তাকালো। আস্তে আস্তে এগিয়ে এসে স্নেহার গলায় মুখ ডুবিয়ে কামড় বসালো। কামড়ের জোর এতটাই বেশি ছিলো যে স্নেহার চোখ দিয়ে পানি পর্যন্ত বের হলো। স্নেহা মেরাবের পিঠ একহাত দিয়ে খামচে ধরলো। যারপরনাই, স্নেহার নখের আঁচড় লাগলো মেরাবের পিঠে। মেরাব স্নেহার চুলগুলো ছেড়ে দিয়ে ঘোর লাগা কণ্ঠে বলল,
“ইশ, চুলগুলো খোলা থাকলে কি যে ভালো লাগে!”
স্নেহা মেরাবকে ধাক্কা দিতে চাইলো কিন্তু মেরাবের সুঠাম দেহের শক্তির সাথে পেরে উঠলো না। এরপরে বলে উঠলো,
“সরুন! ধরবেন না আমায়! কত্ত জোরে কামড় দিয়েছেন।”
মেরাব হাসলো। স্নেহা মেরাবের হাসি দেখে বলে উঠলো,
“কামড় দিয়ে হাসছেন কেনো?”
“নিজের দোষ তো চোখে পড়ে না তোমার। সবসময় তো আমার দোষটাই চোখে পড়ে।”
“আমি কি করেছি?”
মেরাব উল্টো দিক হয়ে দাড়ালো। স্নেহা মেরাবের পিঠে হাত রেখে বলল,
“ইশ, কাটলো কেমন করে?”
মেরাব জোর গলায় বলল,
“একটা রাক্ষসী নখ ডাবিয়ে দিয়েছে।”
স্নেহা রেগেও গেলো আবার মনটাও নরম করলো। মেরাব শার্ট পড়তে শুরু করলো। আর বলল,
“পানি দাও!”
স্নেহা পানি এনে দিলো। মেরাব পানি খেয়ে গ্লাস দিয়ে দিলো। এরপরে শার্ট পড়ে চুল ঠিক করে, পারফিউম লাগিয়ে স্নেহাকে বলল,
“কাছে এসো!”
স্নেহা শুকনো ঢোক গিলে মেরাবের কাছে এলো। মেরাব ওয়ালেট, ফোন আর গাড়ির চাবি নিয়ে বলল,
“আমি বের হচ্ছি। কেউ যেনো না জানে!”
“আ আপনি এই শরীর নিয়ে বের হবেন এখন?”
“হুমমম। কাজ আছে।”
স্নেহা মেরাবকে ধরে বলল,
“না আমি যেতে দিবো না।”
মেরাব স্নেহার দু-গালে হাত রেখে বোঝানোর কণ্ঠে বলল,
“এখন পাগলামি করার সময় নয় স্নেহা। আমাকে যেতেই হবে। শীঘ্রই ফিরে আসবো। দরজা লাগিয়ে ঘুমিয়ে পড়ো। আর ফোনটা কাছে রেখো, আমি কল দিলে মেইন দরজা খুলে দিবে। আর সাথে সাদাফ আছে।”
স্নেহা তবুও অসম্মতি জানালো। কিন্তু মেরাবের কাছে পেরে উঠলো না। মেরাব চলে গেলো। মেরাব খবর পেয়েছে কে ওকে মারতে চেয়েছে। ও এখন ওখানেই যাবে। সাদাফও সাথে এলো। দুজনেই যাবে, এর বাহিরে কাউকে নিয়ে যাবে না বা জানাতে চায় না। মেরাব গ্যারেজে এসে সাদাফকে গাড়ির চাবি দিয়ে নিজে উঠে বসলো। সাদাফ গাড়ি ড্রাইভ করে গাড়ি গ্যারেজ থেকে বের করলো। ওইই গাড়ি ড্রাইভ করবে। ঠিক তখন সামনে এলো মারুফুল খান। বেশ গম্ভীর হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন গাড়ির সামনে। সাদাফ ঢোক গিলে মেরাবের দিকে তাকালো। মেরাব মুখের কোণে এক বাকা হাসি খেলে গেলো।
চলবে….
অনেকদিন পরে দিলাম। যারা যারা পড়বে অবশ্যই রিএক্ট দিবে।
ভুল-ত্রুটি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। কেউ বাজে মন্তব্য করবেন না। রেসপন্স করবেন!!!!!!
[হেশট্যাগ ব্যবহার ছাড়া কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ]
Share On:
TAGS: কি আবেশে, জেরিন আক্তার
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
কি আবেশে পর্ব ১৬
-
কি আবেশে পর্ব ৩৮
-
কি আবেশে পর্ব ৬
-
কি আবেশে পর্ব ১২
-
চোরাবালির পিছুটানে পর্ব ১
-
কি আবেশে পর্ব ৭
-
কি আবেশে পর্ব ৩৪
-
কি আবেশে পর্ব ১৭
-
চোরাবালির পিছুটানে পর্ব ২
-
কি আবেশে পর্ব ২২