কি_আবেশে (৩৫)
জেরিন_আক্তার
মেরাব স্নেহার সাথে হাসি-তামাশা করে ওয়াশরুমে চলে যায়। এরপরে শাওয়ার নিয়ে বের হয়। স্নেহা মেরাবের জন্য টি-শার্ট আর ট্রাউজার বের করে দিলো। মেরাব আয়নার সামনে গিয়ে স্নেহাকে বলল,
“দেখো তো লিপস্টিকের দাগ চলে গিয়েছে নাকি?”
স্নেহা এগিয়ে এসে মেরাবের পেছনে দাঁড়ায়। মেরাবের ফর্সা শরীরটা লাল হয়ে আছে। হয়তো লিপস্টিকের দাগ তুলতে ঘষা দিয়েছে। স্নেহা মেরাবের পিঠে হাত ছোঁয়াতে চেয়েও হাত ফিরিয়ে নিয়ে এলো। মেরাব আয়নায় সেটা দেখে হেসে বলল,
“ছুঁয়ে দেখো!”
স্নেহা লজ্জা পেয়ে চলে গেলো। মেরাব স্নেহার কাছে এসে সামনাসামনি দাড়ালো। স্নেহা মাথা নত করে চলে যেতে চাইলে মেরাব স্নেহার হাত দুটো নিয়ে নিজের বুকে রাখলো। স্নেহা চোখ বন্ধ করে নিয়ে হাত সরাতে চাইলো। মেরাব আরও শক্ত করে হাত দুটো ধরে রাখলো। স্নেহা কাপা-কাপা চোখে তাকালো।
রাতে খাবার টেবিলে সবাই চুপচাপ বসে খাচ্ছে। কারো মুখে কোনো কথা নেই। মেরাব শুধু মুখটিপে হেসে যাচ্ছে। মাহিন বড় ইতস্তায় পড়ে গেলো। মেরাবের হাসি ওর একটুও ভালো লাগছে না। সাইদার কথাই ঠিক হলো, মেরাবকে কিছু করা যাবে না। উল্টো ওদেরই আরো ধুয়ে দিয়েছে।
মাহিন আর এভাবে চুপচাপ থাকতে পারলো না। শেষমেষ ফাহমিদা খানকে বলে উঠলো,
“বড় আম্মু, দেখেন না আপনার ছেলে আমাদের দেখে হাসছে।”
ফাহমিদা খান মাহিনের দিকে তাকিয়ে বললেন,
“হাসতেই পারে, এতে আবার তোমার কি হলো?”
“বড় আম্মু, একটু আগে না ওর সাথে মজা করতে গিয়েছিলাম। ও সেটা বুঝে ফেলে এরপরে থেকে আমাদের দেখে হাসছে।”
ফাহমিদা খান তখন মেরাবের দিকে তাকিয়ে বললেন,
“মেরাব, হাসি বন্ধ করে চুপচাপ খাও!”
মেরাব মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানিয়ে মাহিনের দিকে তাকিয়ে আবারও হেসে উঠলো। আর বলল,
“দুলাভাই! আজও কি জেগে জেগে আড্ডা দিবেন নাকি?”
মাহিন হাসার চেষ্টা করে বলল,
“নাহ, আজ মুড নেই ”
সবাই খাবার খেয়ে চলে গেলো। এরপরে ফাহমিদা খান, সাহারা খান আর স্নেহা খেতে বসলো। খাবার খেয়ে তিনজনেই যে যার যার মতো রুমে চলে গেলো। এদিকে রহিমা আন্টি আজ সব কাজ গুছিয়ে ফেললেন। স্নেহা রুমে এসে মেরাবকে বলল,
“কফি খাবেন?”
“এখন?”
“হুম। বানিয়ে আনি?”
“ঠিক আছে যাও!”
মেরাব বিছানার হেডবোর্ডে হেলান দিয়ে বসলো। স্নেহাও এর কিছুক্ষন পরে হাতে কফি নিয়ে আসে। এসে মেরাবের হাতে দেয়। মেরাব ফোন স্ক্রল করতে করতে স্নেহার কাছে মিষ্টি একটা আবদার করে বসলো।
“স্নেহা, শোনো না!”
“হুমম, বলুন!”
“তোমার চুলগুলো ছেড়ে দাওনা!”
স্নেহা ভ্রু উঠিয়ে বলে উঠলো,
“হঠাৎ, এইরকম বায়না?”
মেরাব কফিতে চুমুক দিয়ে বলল,
“মন চাইলো!”
স্নেহা মুচকি হেসে চুলগুলো ছেড়ে দিলো। মেরাব স্নেহার দিকে তাকিয়ে বলল,
“খুব সুন্দর লাগে তোমাকে এই ভাবে দেখতে। আমার কাছে তো অসম্ভব সুন্দর লাগে।”
মেরাব কফিতে আবারও চুমুক দিয়ে বলল,
“যেদিন দেশে এলাম, সেদিন কলেজে তোমার ওই চুল দেখেই বাবাকে বলেছিলাম তোমাকে খুঁজে এনে দিতে। বাবাকে বলেছিলাম তোমাকে চিনি না। অচেনা তুমি। কিন্তু আমার কাছে সবচেয়ে চেনা লোকই ছিলে তুমি। বলতে গেলে, তোমার সাথে ধাক্কা খাওয়া, এই বাড়িতে আসার পরে না চেনা এগুলো প্ল্যান করেই এসেছিলাম।”
স্নেহা যেনো আকাশ থেকে পড়লো। এই লোক এতদিনে বলে কি? স্নেহার আগেই সন্দেহ হয়েছিলো মেরাবের মনে কিছু একটা চলছে। আর শেষে এসে তাই হলো।
স্নেহা মেরাবের কাছে এসে বলল,
“আপনি আমায় এতো ভালোবাসতেন তাহলে বলেননি কেনো?”
“বলাটা কি খুব জরুরি ছিলো?”
“যদি আপনি আসার আগে আমার বিয়ে হয়ে যেতো তখন কি করতেন? তাহলে তো এখন কাদতে হতো!”
মেরাব স্নেহাকে এক ঝটকায় নিজের কাছে এনে বলল,
“আমাকে শুধু শুধু কাঁদানো এতো সোজা। তুমি জানতেও পারোনি তোমার পেছনে কতজন লোক লাগিয়েছিলাম। ওরা যাই হোক তোমার বিয়ে হতে দিতো না।”
স্নেহা অবাক হয়ে বলল,
“কি বলছেন, কে কে ছিলো?”
মেরাব নাম বলতে গিয়েও থেমে গেলো। হেয়ালি কণ্ঠে বলে উঠলো,
“তা তো বলবো না।”
“কেনো বলুন?”
“না! বলা যাবে না।”
“বলুন না প্লিজ প্লিজ প্লিজ!”
“বলেছি তো বলবো না। ওরা আমার সিক্রেট লোক। তুমি জেনে গেলে সমস্যা হবে।”
“হবে না, বলুন। এখন তো আমি আপনারই হয়ে গিয়েছি।”
“তবুও আমি বলবো না।”
“কান্না করে দিবো কিন্তু?”
“এই সরো! কান্নাকাটির কোনো সিন্ নেই আজ!”
স্নেহা মেরাবের বুকের কাছে গিয়ে আদুরে গলায় বলল,
“বলুন না একটু শুনি। এই একটুই শুনবো।”
“বলবো না।”
স্নেহা রেগে গিয়ে বলল,
“বলবেন না।”
“না।”
স্নেহা বালিশ দিয়ে মেরাবকে মারতে মারতে বিছানায় শুইয়ে ফেলে। মেরাব স্নেহার দুহাত ধরে বিছানায় শুইয়ে নিজে তার উপরে উঠে যায়। স্নেহার মুখে থেকে চুলগুলো সরিয়ে দিয়ে গভীর গলায় বলল,
“এতোকিছু জেনে কি করবে? শুধু জেনে রাখো আমি তোমার ভালোবাসি। অনেক ভালোবাসি।”
স্নেহা শান্ত হয়ে গেলো। মেরাবের এই চোখের গভীরতা বুঝতে চাইলো কিন্তু বুঝতে পারলো না। তবে এইটুকু বুঝতে পারলো মেরাব তাকে অনেক ভালোবাসে। পাগলের মতো ভালোবাসে।
মেরাব স্নেহার হাত ছেড়ে দিলো। স্নেহা আলতো করে মেরাবের দুগালে হাত রেখে মোলায়েম কণ্ঠে বলল,
“আপনি কয়েকবছর ধরে নিঃশব্দে ভালোবেসে গিয়েছেন আমায়। আমি সেটা জানতেও পারিনি। হয়তো এতগুলো বছর আপনার মতো ভালোবাসতে পারিনি। তবে আপনাকে যেদিন প্রথম দেখেছি সেদিন থেকেই ভালোবেসে গিয়েছি। আপনাকেও আমি অনেক অনেক ভালোবাসি।”
মেরাব স্নেহার কপালে চুমু খেয়ে বলল,
“অনেক ভালোবাসি। পাগলের মতো ভালোবাসি।প্রচন্ড ভালোবাসি। আর শেষে, ভালোবাসি বলেই ভালোবাসি।”
ঠিক এই সময় রুমে ঠাস করে ঢুকে পড়ে মাহিন। দুজনকে এভাবে থাকতে দেখে চোখ ছানাবড়া। এটাই সুযোগ মেরাবকে কথা শোনানোর। কালকে থেকে অনেক পচিয়েছে ওদের। এখন যেনো সুযোগ একটা পেলো। সাথে সাথে গলা খাকারি দিয়ে বলে উঠলো,
“ছি, ছি, রোজা-রমজানের দিনে চারিপাশে কি কি দেখতে হচ্ছে। আল্লাহ এদের একটু হেদায়েত দাও।”
মেরাব চট করে উঠে বসে মাহিনের দিকে তাকালো। মাহিন দাঁত বের করে হেসে ফেললো। স্নেহা মেরাবের পেছনে মুখ লুকালো। মেরাব স্নেহাকে ছেড়ে মাহিনের দিকে এগিয়ে গেলো। এরপরে মাহিনের গলা ধরে রুমের বাহিরে যেতে যেতে বলল,
“কি যেনো বলছিলেন ভাই?”
“কি আর বলবো, আমাদের আশেপাশের পরিবেশটা কেমন জানি হয়ে গিয়েছে।”
“সিরিয়াসলি! আপনি রোজা-রমজানের দিনে কিছু দেখেছেন?”
মাহিন মাথা নাড়িয়ে বলল,
“না কিচ্ছু দেখিনি। আসলে আমার চোখ অন্ধ ভাই। কিছু টাকা সাহায্য দিয়েন।”
মেরাব সুন্দর একটা হাসি দিয়ে হাই তুলে সাইদাকে ডাকলো। সাইদাকে ডাকার কারণ কি মাহিন বুঝতে পারছে না। এদিকে সাইদা ওর রুম থেকে বেরিয়ে এলো। মেরাব মাহিনকে রেখে সাইদার কাছে এসে দাড়ালো। এরপরে সাইদার কানে কানে ফিসফিস করে বলল,
“সাইদা খবর কি রাখিস?”
সাইদাও একই রকম করে বলে বলল,
“কি হয়েছে?”
“এখানে এসে দেখলাম তোর জামাই কার সাথে যেনো মিষ্টি মিষ্টি করে কথা বলছে। মিস ইউ ও বলেছে। তাই তোকে বলতে এলাম। আগেই জামাইকে হাতে মুঠোয় নিয়ে রাখিস নাহলে পরে কিন্তু পরকীয়া করে বিয়ে করবে টেরও পাবি না। এখনই কিছু বল। আর আমি যে তোকে বলে দিলাম সেটা বলিস না। নাহলে অস্বীকার করবে।”
সাইদা কথাটা শোনা মাত্রই দাঁত চেপে বলল,
“আজ ওর একদিন কি আমার একদিন!”
বলেই সাইদা মাহিনের দিকে এগিয়ে গেলো। এরপরে মাহিনের হাত ধরে টেনে নিয়ে গেলো রুমের দিকে। মেরাব মাহিনের দিকে তাকিয়ে হেসে রুমে চলে এলো। স্নেহা তখন ব্যালকনিতে। দাড়িয়ে ছিলো। সামনের চুলগুলো হালকা বাতাসে, হালকা হালকা উড়ছে। মেরাব পেছনে থেকে মৃদু কণ্ঠে একটা গানের সুর আওড়ালো,,
“যেই আমার হলি অলি গলির ভিড়ে,
তোকে একলা খোঁজার অজুহাত!
এই মন বলেছে,তোর মনে গলেছে,
হলো প্রেমেরই আজ শুরু
আর!
তোকে বলবো ভাবি কিছু চুপ কথাতে,
ছিলি কল্পনাতে, ছিলি রূপকথাতে।
আজ তোর নামে রাত নামে,
দিন কাটে ভোর!
আমার মন তোর পাড়ায়,
এসেছে তোরই আশকারায়!”
স্নেহা মেরাবের থেকে গানটা শুনে পেছনে ফিরলো। মুচকি হেসে মেরাবকে জড়িয়ে ধরলো। মেরাব স্নেহাকে পাঁজা কোলে নিয়ে রুমে ঢুকলো। বিছানায় শুইয়ে দিয়ে স্নেহার গলায় মুখ ডুবিয়ে দিলো। স্নেহা মেরাবের চুল খামচে ধরলো। মেরাব স্নেহার গলায় মুখ গুজে রেখেই বলে উঠলো,
“এখন তোমাকে প্যারা দিতে ইচ্ছে করছে কিন্তু কি করবো? তোমার রোজা নষ্ট হয়ে যাবে। যা আমি সজ্ঞানে করতে পারবো না। তাহলে এখন কি করবো জান?”
মেরাব স্নেহাকে ছেড়ে উঠে বসলো। স্নেহা লজ্জায় অন্যদিক ফিরে শুলো। মেরাব বড় বড় শ্বাস ছেড়ে ব্যালকনিতে চলে গেলো। স্নেহা উঠে বসলো। ব্যালকনির দিকে তাকিয়ে রইলো। হঠাৎ রুমের দরজায় নক করলেন ফাহমিদা খান। কণ্ঠে অস্থিরতা….
“মেরাব, মেরাব! বাবা দরজাটা খুলো না!”
স্নেহা শাড়ি ঠিক করে চুলগুলো হাতখোপা করতে করতে দরজা খুলে দিলো। ফাহমিদা খান রুমে ঢুকে মেরাবকে খুজলেন। স্নেহাকে বললেন,
“মেরাব কোথায়? বাহিরে গিয়েছে নাকি?”
“না মামনি, আজ বাহিরে যায়নি। ব্যালকনিতে আছে।”
ফাহমিদা খান তৎক্ষণাৎ ব্যালকনিতে চলে গেলেন। মেরাব পেছনে ফিরলে ফাহমিদা খান কাদতে কাদতে বললেন,
“মেরাব, শোনো না। দেখো এই নাম্বার থেকে কল এসেছিলো। বলল উনি নাকি তোমার বাবাকে আটকে রেখেছে।”
মেরাব চোখ-মুখ কুঁচকে ফোনটা হাতে নিয়ে বলল,
“কি বললে? কে কল দিয়েছে? আর বাবা কোথায়?”
“তোমার বাবা নামাজের পরে বোর হচ্ছিলো বলে বেরিয়েছিল আর ফিরেনি। এখন আবার এই নাম্বার থেকে ফোন এসেছে। বলছে তোমার বাবাকে আটকে রেখেছেন।”
চলবে….
কালকে মেরাবের মায়ের খুনের বিষয়টা ক্লিয়ার করে দিবো। আর পরবর্তী পর্ব কালকে রাত আট টায় দিবো। ইনশাআল্লাহ। যারা যারা পড়বে অবশ্যই রিএক্ট দিবে।
ভুল-ত্রুটি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। কেউ বাজে মন্তব্য করবেন না। রেসপন্স করবেন!!!!!!
[হেশট্যাগ ব্যবহার ছাড়া কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ]
Share On:
TAGS: কি আবেশে, জেরিন আক্তার
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
কি আবেশে পর্ব ৭
-
কি আবেশে গল্পের লিংক
-
কি আবেশে পর্ব ২৫
-
কি আবেশে পর্ব ১০(স্পেশাল পার্ট)
-
কি আবেশে পর্ব ১
-
কি আবেশে পর্ব ৬
-
কি আবেশে পর্ব ৩৪
-
কি আবেশে পর্ব ১৫
-
কি আবেশে পর্ব ৫
-
কি আবেশে পর্ব ৩৩